সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৩

রানীরঘাটের বৃত্তান্ত

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ


রানীরঘাট যাচ্ছি শুনে মফস্বলের বাসে এক ভদ্রলোক বলেছিলেন—রানীরঘাট যাবেন? দেখবেন মশাই, মহা ত্যাঁদোড় জায়গা। সাবধানে থাকবেন।

—কেন বলুন তো?

—প্রবাদ শোনেননি ‘রানীরঘাটে কে কার বাবা?’

শুনিনি। তবে আমাদের গাঁয়ের পাশে এক বড় গাঁ গোকর্ণ। সারা রাঢ় অঞ্চলে তার নামে প্রবাদ ছিল শুনেছি—’গোকর্ণে কে কার মেসো!’ সব চালু প্রবাদের পেছনেই একটা গপ্পো থাকে। এক্ষেত্রেও ছিল। তখন নাকি ঠ্যাঙাড়েদের যুগ। আক্রান্ত পথিক অন্ধকারে ঠ্যাঙাড়েকে চিনতে পেরে মেসোমশাই বলে চেঁচিয়ে ওঠে। ঠ্যাঙাড়ে তার গলায় বাঁশ চেপে মুণ্ডু উল্টে দিয়ে বলেছিল—’গোকর্ণে কে কার মেসো!’

নিছক গপ্পো হতে পারে, নাও পারে। হয়তো সে-আমলের মাৎস্যন্যায়কে বোঝাতেও এমন গপ্পোর উদ্ভব। কিন্তু রানীরঘাটের বেলায়ও তো একটা গপ্পো থাকার কথা। কী সেটা? খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখি, গপ্পোর নায়ক আমার রীতিমতো চেনা।

সেই গপ্পোটাই অবিকল শুনিয়ে দিচ্ছি। এতটুকু রঙ চড়াচ্ছি না। বরং যতটা রঙ ছিল, ঘষে একটু ফিকে করেই দিলুম। ঈষৎ ধূসর দেখাক না! কিন্তু দার্শনিকতা না, মরাল না, হাতের তালুর মতো স্পষ্ট ব্যাপার। আজকাল জ্ঞান দেবার চেষ্টা করলে লোকে অপমানিত বোধ করে। বিপুলা পৃথ্বী নিরবধি কালের কতটুকই বা জানি যে জ্ঞান দেব?

আরও একটা কথা। নিজেকে গপ্পোর মধ্যে ঢুকিয়ে এক নিরাসক্ত কিংবা ক্রান্তদর্শী চরিত্র করে তোলার লোভও অতিকষ্টে সংবরণ করেছি। যদিও তাই রেওয়াজ।

সে অনেক বছর আগের কথা।...

নদীর ওপারে এক শহর, এপারে এক ঘাট। তার নাম রানীরঘাট। নদীর নাম ভাগীরথী। লোকেরা বলে মাগঙ্গা। মাগঙ্গার কোলে ছোট্ট মেয়ের মতো রানীরঘাট হেসেখেলে দিন কাটায়। গাঁয়ের মেয়ের চোখে শহরের ঘোরলাগা ভাবটুকুও চোখে না পড়ে পারে না। কিন্তু শুধু ওই আলতো ঘোরটুকুই ছিল তখন, আর কিছু না।

একটা বাসস্ট্যান্ড ছিল। কয়েকটা ছোটখাটো দোকান ছিল। রিকশা খান পাঁচেক। এক সময় ঘোড়ার গাড়িও ছিল। সারাদিন বাইরের মানুষের ভিড়ে হইচই বড় বেশি। তারপর সন্ধ্যা হতে না হতে ভিড় কমে যায়। শেষ বাস ছেড়ে যায় সাড়ে সাতটাতেই। বাঁশবনে শেয়াল ডাকে। তক্ষক ডাকে। পেঁচা ডাকে শিমুল গাছে। নিঝুম রাতে ঘাটের ধারে আটচালায় একটা লণ্ঠন। কাদের চাপা গলায় গপ্পসপ্প। আর মাঝে মাঝে ঘাটের ইজারাদার চৌবেজীর চেরা গলায় হাঁক—শম্ভুয়া—আ—আ! শেষ খেয়া ফিরতে হয়তো দেরি করছে।

সেবার শীতে জেলাবোর্ডের সেন্সাসের বাবুরা এসে আধঘণ্টাতেই রানীরঘাটের গণনা শেষ করে ফেলেছিলেন। রোদে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে একজন হঠাৎ তামাশা করে বললেন—আরে, ওই পাগলীটা যে রয়ে গেল! লিখে নাও।

আটচালার ধারে বসে পাগলীটা তখন যাকে দেখছে, চেঁচাচ্ছে—ও বাবারা! ওগো বাবারা! সবাইকে ওর বাবা বলা অভ্যেস। কিন্তু বাবা বলে ডাকছে কেন, কী বলতে চায়, বোঝা যায় না। ভিক্ষে দিলেও তো ছুড়ে গায়ে ফেলে দেয়।

পাশের তেলেভাজার দোকান থেকে ময়রাবুড়ী ফিক করে হেসে বলল—তা লিখে নেবেন তো নিন বাবুরা। লিখুন, সুরেশ্বরী। লোকে বলে সুরিক্ষেপী। সেও তো একটা মানুষ বটে। রানীরঘাটে সাত বছর আগে। সবার নাম লিখলেন, ওর কেন লিখবেন না?

প্রথমবাবু বললেন—আর কে আছে ওর?

—আবার কে থাকবে? যে-যা দয়া করে দেয়, খায়। আটচালাতে ঘুমোয়।

দ্বিতীয়বাবু দেখছিলেন সুরিক্ষেপীকে। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন—মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রেগন্যান্ট্! স্ট্রেঞ্জ!

প্রথমবাবু হেসে ফেললেন—ভাগ্। তুমি তো ব্যাচেলার। কিসে বুঝলে?

—এসব বুঝতে বিয়ে করা লাগে না। দেখ না, জাস্ট লুক অ্যাট দ্য থিং।

সুরিক্ষেপী ছেঁড়া নোংরা শাড়িটা সামলাতে পারে না। অথচ মাথায় ঘোমটাটি থাকা চাই-ই।

প্রথমবাবু দেখলেন। অবাক হয়ে বললেন—সত্যি তো। মানুষ মাইরি এখনও জানোয়ার।

ময়রাবুড়ী ব্যাপারটা লক্ষ করে ভারি গম্ভীর হল। গোমড়ামুখে বলল—মাগঙ্গার চোখের সামনে এই পাপ। সইবে ভেবেছেন? দেখুন না কী হয় পেলয়কাণ্ড! রানীরঘাট ভেসে যাবে। ধুয়ে মুছে যাবে। বেঁচে থাকলে দেখে যাব।

দ্বিতীয়বাবু হো হো করে হেসে বললেন—ও বুড়ীমা, কী করে দেখবে? তুমিও তো ভেসে যাবে।

বুড়ী বিকৃত মুখে গরম তেলে বেগ্নি ছাড়ল। চড়চড় করে আওয়াজ হতে থাকল। কনুই গড়িয়ে জলের ফোঁটা পড়েছে বুঝি। বাবুর কথার জবাব দিল না। পাপের শাস্তি নিজের হাতে দিচ্ছে যে।

প্রথমবাবু চায়ের ভাঁড় ছুড়ে ফেলল আকন্দের ঝোপে। পা বাড়িয়ে আবার রসিকতা করল।

—তাহলে লিখতে হলে দুটো নামই লেখ। সুরেশ্বরী না কী বলল যেন, আর তার পেটে যেটা আছে।

—ছেলে হবে, না মেয়ে হবে তার ঠিক নেই। দ্বিতীয়বাবু সিগারেট ধরিয়ে পা বাড়ালেন।

—একটা কমন নাম দেওয়া যাক্।

—মাথায় আসছে না।

—অজস্র আছে, অজস্র। শোন বলছি। ঊষা, পার্বতী, রেণু, উমা... আঙুল গুনতে গুনতে প্রথমবাবু বললেন। কটা হলো? দাঁড়াও আরও বলছি। রমা।...

সুরি পাগলী চেঁচিয়ে উঠল—বাবারা! ও বাবারা! ওগো বাবারা!

ঘাটের ধারে উঁচু পাড়ে ঘাটের ইজারদার চৌবেজীর গদি। পূর্ণিয়ার লোক। এ ঘাটে আছেন চৌদা বরষ। যখন এসেছিলেন, তখন চুল ছিল কুচকুচে কালো। এখন অর্ধেক পেকে গেছে। ফি-সাল জষ্ঠি মাসের সংক্রান্তিতে গঙ্গাপুজোর মেলার দিন ন্যাড়া হন। ময়না পোষার শখ খুব। খাঁচাটা সামনে ঝুলছে। রামনাম শেখান সকাল-সন্ধ্যা। নিজে পড়েন তুলসীদাসের রামচরিতমানস। কালেকটরিতে এ বছর একইশ হাজার রূপেয়া গুনে দিয়ে ঘাট জিতেছেন। আনা-আনা পারানি। তবে বিলাঞ্চলের যুবতী মেছুনীদের বেলা আনাকড়ি নয়, রাতের জলের ফসল ঝকঝকে রাইখয়রা মাছ। চৌবেজী মাছও খান, মাংসও খান। খৈনি ডলেন, গড়গড়াও টানেন। গদিতে কোলে তাকিয়া নিয়ে বসে ভাঙা উচ্চারণে গানও গেয়ে ওঠেন—’কেম্নে এ গঙ্গাহোবো পার/হামি জানে না সাঁতার।’ মাছের গন্ধ লাগা বেলুন-বেলুন বুক খিলখিল হাসিতে ফুলে ওঠে, দুলে ওঠে।—ওত্তা হাসো মাৎ রী। ফাট্ যায়গা।

—ঘাটোয়ারিবাবু না ঘাটের মড়া। কোথায় শিখলে এমন গান? আ ছি ছি।

আর ফচকেমির সময় নেই। শম্ভু মাঝি ডাক দিয়েছে—এ অষ্টসখী রাধিকে সুন্দরীরা।...

ওদিকে ডাক দিয়েছে ইসমাইল ড্রাইভারের বাসও। হর্নের ভ্যাঁক ভ্যাঁক আওয়াজ চলে যাচ্ছে নদী পেরিয়ে ওপারের ঘাটে।—পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ছেড়ে গেল, ছেড়ে গেল। সবুজ। বাসের ভেতরে লোক, বাইরে লোক, ওপরে লোক। অলীক ফলন্ত বৃক্ষ হেলতে দুলতে যাবে। রাস্তা মহা ফক্কড়বাজ।

—বাবারা। ওগো বাবারা! ও বাবারা! সুরিক্ষেপী মাটিতে থাপ্পড় মেরে সেই হাত কপালে আনে। আবার মাটিতে থাপ্পড়। ধুলোয় কপাল ধূসর।

ময়রাবুড়ী চেঁচায়—চুপ। চুপ। গলায় দোব গরম তেল ঢেলে। লজ্জা করে না বড় গলা করে চ্যাঁচাতে? তখন কোথায় ছিল এ গলা? চিহরিপোকার (শ্রীহরি) কামড় খেয়ে বোবা হয়েছিলি?

মাঘের শেষে রানীরঘাটে শিমুলের ডালপালায় যেন হাজার অলীক বনমোরগ উড়ে এসে বসেছে। লাল লাল ঝুঁটি। ফাল্গুনে তাদের সাদা পালক উড়ে পড়ে মাগঙ্গার বুকে। স্বচ্ছ কালো জল বালির চরে মাথা কুটে কুটে পথ প্রার্থনা করে। যেতে পায় কী পায় না। শ্যাওলায় ঠোঁট ঘষে বেড়ায় মৌরালার ঝাঁক। প্রতিমার খড়বাঁশের টাট উল্টে গেছে যে স্রোতে, তা এখন স্মৃতি এবং পরবর্তী প্রতীক্ষা। মড়াখেকো দাঁড়কাক এসে সেই টাটে বসে সবাইকে খেতে ডাকে—খা খা। ময়রাবুড়ী তাই শুনে বলে—ওই ঘাটের মড়াটাকে খা। এ ঘাটে অনেক মড়া। কোন মড়ার কথা বলে দাঁড়কাক জানে না। সুরিক্ষেপীকে বুড়ী এনেছে চান করাতে। বুড়ীর হাতে কঞ্চি। কঞ্চিটা নাচাতে নাচাতে বলে—ভালো মানুষের বেটি হবি তো বস্। বসে পড় জলে। তাই বলে ওকে ছোঁবে না বুড়ী। নিজে-নিজেই চান করতে হবে সুরিক্ষেপীকে। তাই আবার স্নান। পা ছড়িয়ে আঘাটার জলে বসে কপাল থেকে জলের দিকে এবং জলের দিক থেকে কপালে হাত।—বাবারা! ওগো বাবারা! জল বলে ধুলোমাখা কপাল ধুয়ে যায়, এটাই এখন সুবিধে। বুড়ী বলে—হাতখানা বুকে দে লো, বুকে দে। বাবারা বলে বুকে দে দিকিনি।

শীতটা চলে গেল। গ্রীষ্ম এলো। ঘাটের ধারে আকন্দঝাড়ে ফুল ফুটল। ঘাটোয়ারিজী গঙ্গাপুজোর দিন ন্যাড়া হলেন। আটচালায় সুরিক্ষেপীকে আড়চোখে দেখে দয়া করে ভাত পাঠিয়ে দিলেন। এ বছর অচানক দশ হাজার টাকা বেড়ে গেছে ইজারার দর। তাই বলে চৌবেজী রানীরঘাট ছাড়বেন না। বুড়ো হয়ে মরবেন, তখন কেউ গদি দখল করুক। বড় মায়া বসে গেছে রানীরঘাটে।

বর্ষায় এক রাতে তুলকালাম বৃষ্টি। তার মধ্যে সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হলো আটচালায়। কজন দূর গাঁয়ের গাড়োয়ান গরুমোষের গাড়ি নিয়ে এসে আটকে পড়েছিল। তারাই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ছুটোছুটি করে অবশেষে ময়রাবুড়ীকেই পেল। মানুষের জন্মটা ওইসব গেঁয়ো গাড়লদের কাছে নিশ্চয়ই খুব দামী। তারা একটা হ্যারিকেন দিল পর্যন্ত। আটচালার কোণটাও কাপড় টাঙিয়ে ঘিরে দিল। মেয়েমানুষের আর্তনাদ শুনে তাদের হৃদয় গলে যাচ্ছিল। বৃষ্টি না থাকলে তারা এ সময় দূরে সরে থাকত। মানুষের জন্ম তাদের কাছে বড় পবিত্র ঘটনা। তারা একে সম্মান দিতে চাইছিল। কিন্তু বৃষ্টি! আর বুঝি সময় ছিল না বর্ষাবার। তারা বর্ষার বাপান্ত করছিল।

ময়রাবুড়ী বলল—আগুন চাই যে এখন। দেখ্ দিকি, এ অসময়ে গুখেকোর বেটি এ কী করে বসল।

গাড়োয়ানরা ঘাটোয়ারিবাবুর গদি থেকে শুকনো লাকড়ি এনে দিল। একটু পরে শোনে, ওঁয়া-ওঁয়া কান্নাকাটির মধ্যে বুড়ী হেসে-হেসে আদর করছে—এ রাঙা টুকটুক কোত্থেকে এলো রে! এ ভাঙাঘরে চাঁদের হাট কোন মুখপোড়া বসালে রে। একে আমি কোথায় রাখব রে! আহা, যেমন নাক তেমনি চোখ। যেমন মুখের গড়ন, তেমনি রঙ। ওরে ছোঁড়া, এ মুখ তুই কোথায় পেলিরে?...

সে এক দীর্ঘ পদ্য, ছড়ার সুরে গেয়। রানীরঘাটে সকাল হতে না হতে সুখবর পড়ল ছড়িয়ে। তখনও ফ্যামিলি প্লানিং-এর নামগন্ধ নেই কোথাও। রানীরঘাটের স্থায়ী জনসংখ্যা বাড়ল, এই যথেষ্ট। প্রসূতিকে কড়া চা খাইয়ে খাইয়ে ঢোল করার অবস্থা। ময়রাবুড়ী চোখ পাকিয়ে কপট ধমকায়। বাসের লোক রিকশোর লোক, আর যতসব উটকো লোকের ঝামেলা সে ছাড়া আর কে সামলাবে? সে আঁতুড় আগলে দাঁড়িয়ে বলে—কী দেখার আছে? অ্যাঁ? কারও মা-বোন বিয়োয়নি?

সেন্সাস বাবুদ্বয় অনেকগুলো নাম আওড়ে গিয়েছিল। রানীরঘাট নিল না। আদর করে নাম দিল ফালতু। আসলে এতকাল যেন কাজের মতো কাজ, কিংবা খেলার মতো একটা চমৎকার খেলা পাচ্ছিল না কেউ। এত দিনে পেল। পেল তো এমনভাবে পেল যে হুজুগের মাত্রাটা গেল বেড়ে। ছোকরা কন্ডাক্টররাই লিড নিল। চাঁদার লিস্টিতে প্রথম নাম চৌবেজীর। পাঁচ টাকা। দ্বিতীয় নাম ইসমাইল ড্রাইভার। দু টাকা। ঘাটে ফিস্টি হবে। সুরিক্ষেপীর ব্যাটার জামাপেণ্টুল কিনতে হবে। একখানা নতুন শাড়িই বা কেন কেনা হবে না? এ প্রস্তাব শম্ভু মাঝির। আর সেই দিনই দৈবাৎ এসে পড়েছে একটা নাটুকে দল। লোকে বলে আলকাপ দল। ছেলেটা মেয়ে সেজে নাচে গায়। বেঁটে লোকটা সঙ দিয়ে লোক হাসায়। ঘাটের পিছনের চত্বরে তেরপল টাঙিয়ে আসর হলো। ঘাটবাবুর হ্যাজাগ জ্বলল। রানীরঘাটে এ ছিল উৎসবের রাত। আর তখনও রানীরঘাটে ব্রিজ হয়নি। বিদ্যুৎ আসেনি। মাইক বাজত না। দূর উত্তরের ফরাক্কায় ফিডার ক্যানেলটাও খোঁড়া হয়নি। দেশ দু টুকরো হয়নি। কত কি হয়নি। সে অনেক বছর আগের কথা।...

সুরিক্ষেপীয় চেহারা আহামরি ছিল না। মুখটা ছিল গোলগাল, সরু বেঁটে নাক, নীচের ঠোঁটটা একটু পুরু। গতরটা ছিল থলথলে প্রচুর মাংসে ভরা। ময়রাবুড়ী বলত—সাতশো শ্যালশকুনেও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। শুধু দেখবার মতো জিনিস ছিল তার চুল। কী চুল কী চুল! ছেলে হওয়ার পাঁচদিনের দিন, আঁতুড় থেকে যেদিন বেরোয়, সেই ‘পাঁচোটে’র দিন কঞ্চি তাড়না করে মমতাময়ী বুড়ী তাকে নাইয়ে আনে এবং গড়গড় করে এক বাটি নারকোল তেল ঢেলে দেয় চুলে। সেই একবার তেল। ফলটা হল কী আটচালার ধুলো-ধাসড় মেখে পুরোটা গিয়েছিল জট পাকিয়ে। জটার প্রতি লোকের ভক্তি আছে। পরে যখন রানীরঘাটওলারা সুরিক্ষেপীর জন্যে বাসস্ট্যান্ডের পিছনে একটা ছফুট-চারফুট-সাতফুট মাপের খুপরি বানিয়ে দিয়েছিল, সুরি বাচ্চা কোলে নিয়ে সেখানে বসে বাবাদের ডাকাডাকি করত আর ধর্মভীরু দেহাতী মেয়েরা পয়সা ছুড়ে দিত। পয়সাগুলো সুরি পাল্টা ছুড়ে ফেলবেই। সেই পয়সা ঘাটেরই কেউ না কেউ কুড়িয়ে জোর করে ওর আঁচলে গেরো বেঁধে রাখবেই। তাতে আপত্তি ছিল না সুরির। কিছুতেই আপত্তি ছিল না। পরের গঙ্গাপুজোর আগের দিন ময়রাবুড়ী চুপি চুপি একদলা সিঁদুর ঢেলে দিয়ে এলো সিঁথেতে। চেহারাটা খুব খুলে গেল মেয়েটার। টুকটুক করে তাকিয়ে দেখে বুড়ী বলল, আহা! শাঁখানোয়াখান হলে কী মানান মানত পোড়ারমুখীকে। ব্যস, খবর গেল শম্ভু মাঝির কাছে। ওপারে ঘাটের ওপর শাঁখাপট্টি। তাও জুটে গেল। ময়রাবুড়ী খুপরির সামনে কোমরে দুহাত রেখে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। দেখে দেখে সাধ আর মেটে না। ছেলেপুলের মায়ের যা যা দরকার, তা নইলে চলে! দেখ তো মুখপুড়ীকে এখন কেমন মানিয়েছে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বুড়ী দৌড়ে যায় দোকানের দিকে। রানীরঘাটে পাখপাখালি যত, তত কুকুরবেড়াল। তার উপর কড়াইতে তেল ধোঁয়াচ্ছে।...

সেবার গঙ্গাপুজোর দিন সন্ধেবেলা খুব কালবোশেখি হলো। বিষ্টি হলো। বাইরের লোকেদের খোয়ারের হলো একশেষ। কিন্তু রানীরঘাটে গজিয়ে গেল এক দেবী। আবার কে? ওই সুরিক্ষেপী। সে ‘ক্ষেপী মা’ হয়ে গেল। লোকে তার কাছে জ্ঞাতব্য তথ্য আদায় করতে চায়। ক্ষেপী মা’র শুধু ওই এক কথা—ওগো বাবারা! ও বাবারা! আর ডান হাত কপাল থেকে মাটিতে, মাটি থেকে কপালে। রাতদুপুরে নিঝুম রানীরঘাটে হঠাৎ শোনা যায়—ওগো বাবারা! ও বাবারা!

কিন্তু এত যে যত্নআত্তি লক্ষ্য, তার তলায়-তলায় আরেক তরঙ্গ বইছিল রানীরঘাটে। কাজটা কার হতে পারে? পাপ হোক, পুণ্য হোক, ভালো বা মন্দ হোক, এ একটা ঘটনাই বটে। কে সে? জানোয়ার হোক, মানুষ হোক—দৈবাৎ মতি টলেছিল, কিন্তু কার? নানা ফিকিরে বাচ্চাটার মুখ দেখা হয়, ফিরে এসে রানীরঘাটে মুখ খুঁজে মেলাবার চেষ্টা চলে। মেলে না। চৌবেজী ঘাটোয়ারির নামটাও উঠেছিল। টেকেনি। অত সাফসুতরো মানুষ। গদির সাদা চাদরে এককণা ময়লা পড়তে দেন না। দুবেলা স্নান-আহ্নিক করেন। খালি গায়ে ধবধবে সাদা পৈতে থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়ে। নোংরা দুর্গন্ধ এক নারীশরীরে কোন দুঃখে সুখ খুঁজতে যাবেন? তার ওপর লাখপতি লোক। ইচ্ছে করলেই ওপারের অলিগলি খুঁজে সুন্দরী সংগ্রহ করাটা ডালরোটি খাওয়ার সামিল। কেউ বলেছিল, ইসমাইল ড্রাইভারই বা। যা মদ-তাড়ি খায় লোকটা। রাতের দিকেই ঘটেছে। হিসেবমতো আশ্বিন মাসেই বটে। সে-আশ্বিনে প্রায়ই রাতে ঝড়বৃষ্টি হতো। কিন্তু মনে পড়ল, তখন ইসমাইল অ্যাকসিডেন্ট ক’রে অনেকদিন হাসপাতালে ছিল।

এইভাবে জনাদশেক প্রজননক্ষম পুরুষ মানুষ যারা কিনা ঘাটেরই বাসিন্দা এবং বয়স পনের থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে, সবাইকে যাচাই করে-করে বাদ দেওয়া হলো। অতএব, দায়িত্বটা বাইরের লোকের ঘাড়েই ফেলতে হয়। আশ্বিনে তো ঝড়জল গেছে। বারো মাসই ওই আটচালায় রাতের আশ্রয় নেয় কত জায়গার পথিকজন, গাড়োয়ান, ভিখিরি, ফকির, সন্ন্যাসী—কত রকম মানুষ। কার মাথায় কটকট করে ‘চিহরিপোকা’ কামড়েছিল! শেষ অব্দি হাল ছেড়ে দেওয়া হলো। ও পোকা বিষম পোকা। কামড়ালে উত্তর-পুব জ্ঞানগম্যি থাকে না।

আর দিন যায়, রাত আসে। রাত যায়, দিন। মাস যায়, বছর। ঢ্যাঙা শিমুলে অলীক লালঝুঁটি মোরগের ঝাঁক আসতে ভোলে না। ঘাটোয়ারিজীর ময়না কবীরের দোহার একটি শব্দ পেরিয়ে যেতে-যেতে হিমসিম খায়। ঘাটোয়ারিজীর বাকি চুল সাদা হয়ে ওঠে। ক্ষেপীমায়ের ‘থানে’ পয়সা পড়ে এবং চুরিও যায়। এক শীতে ময়রাবুড়ীও গঙ্গা পায়। ক্ষেপী চেঁচায়—বাবারা! ওগো বাবারা! ও বাবারা!

ফালতু তখন গুটগুট করে হাঁটতে শিখেছে। আর রানীরঘাটের সবাই তার বাবা। আধো-আধো বুলিতে ছোঁড়াটা কাপড় ধরে টানে—বাবা! বাবা! ব্যাপারী, দালাল, ফড়ে, মামলাবাজ, গাড়োয়ান আর বাবু—সবাইকে বাবা ডাক। চৌবেজীর উঁচু গদির ধারে দাঁড়িয়ে ছোট্ট নোংরা হাত বাড়িয়ে ডেকে ওঠে—বাবা। চৌবেজী হাসতে হাসতে ধমকান—ভাগ্! ভাগ্! তাই বলে কেউ ওর গায়ে হাত তুললেই হয়েছে। সারা রানীরঘাট এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

দেখতে দেখতে ফালতু বড় হলো। আবার এক গঙ্গাপুজোর মেলার দিন খুব জলঝড় এলো। সেই রাতে সুরিক্ষেপী কাপড়-চোপড়ে আচমকা বমি করে ভোররাতে ঠাণ্ডা নীলবর্ণ হয়ে মারা পড়ল। মায়ের শুয়েমুতে ছোঁড়াটা বেহদ্দ ঘুমোচ্ছিল। বাঁশবনে বাঁশ কেটে খাটুলি বানানো হলো। ওপাশের শ্মশানে ক্ষেপীমা পুড়ল। রানীরঘাটে সেও একটা দিনের মতো দিন ছিল। আবার চাঁদা তুলে ফিস্টি। আবার এক-আসরগান। শেয়ালমারার ষষ্ঠীপদ কেত্তুনে নিখরচায় গেয়ে গেল। ফালতুকে কেউ যদি শুধোয়—তোর মা কোথায় রে? ফালতু শ্মশানের দিকটায় আঙুল তুলে ছড়া গায়—হো হো! কেপী গেচে, পুলতে/ছসেল পতোল তুলতে। অর্থাৎ কী হাসির কথা! ক্ষেপী গেছে পুড়তে, ছসের পটোল তুলতে। কে শেখাল? শম্ভু মাঝিই বা। সে বড় রসিক মানুষ। নয়তো দিনদুপুরে মাঝগঙ্গায় লগি ঠেলতে ঠেলতে কেউ গায়—’এ ভরা গাঙমে চেকন জোসনা ডুব দিয়ে পার হবি লো সই/সই লো—ও—ও—ও?’

হাফপেন্টুল পরা উদোম-গা ফালতু ভালোরকম বুলি ফুটলে বাসের মাথায় উঠে চ্যাঁচায়—চলে এস! চলে এস! আভি ছোড় দেগা। জলদি ছোড় দেগা!

আর এর ফলটা হলো এই যে সে গতি চিনল। গতিকে ভালোবাসল। ইসমাইলের বাসেই তার জীবনটা জড়িয়ে গেল দেখতে-দেখতে। পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। কখনও ইসমাইলের সঙ্গে গঙ্গা পেরিয়ে শহর। শহরে ইসমাইলের বাড়ি। তার বউ ফালতুর ইতিহাস জানে। দেখলেই মুখটা গম্ভীর করে। জল চাইলে ফুটো এনামেলের গেলাসে জল দেয়। ছিঘেন্নার চূড়ান্তই করে। ইসমাইল কাঁচুমাচু হাসে খালি। কী বলবে। অথচ ছোঁড়াটা খুব কাজের। পাকাচুল তোলে। ফরমাস খাটে। নিজের ছেলেরা ইস্কুলে পড়ে। তারা যেন এ হারামী ড্রাইভারী কাজের ত্রিসীমানা না ঘেঁষে! হাতে স্টিয়ারিং এলে দুনিয়াটা পয়মাল হয়ে যায়, কে বুঝবে? থিতু হয়ে বসা যায় না ঘরে। শয়তানের চাক্কা ঘোরে সারাক্ষণ এই শরীরে। থামতে দিলে তো? আর শয়তান তোমাকে শেষঅব্দি জাহান্নামের দিকেই নিয়ে চলেছে, টের পেয়েও কিছু করার নেই তোমার।...

কতকাল পরে রানীরঘাটে আরেক শীতে এসেছেন সেন্সাসের বাবুরা। এ বাবুরা সেই তাঁরা নন। এঁরা সরকারী বড় সেন্সাসের লোক। এ রানীরঘাটও সে রানীরঘাট নয়। তিনটে বাসরুট এসে মিলেছে ঘাটে। দোকানপাট বেড়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। শ্মশানঘাটের ওপাশে ব্রিজ গড়ে উঠেছে। চৌবেজী ঘাটোয়ারির এই শেষ ইজারা। খাঁচার ময়নাটাও গেছে মরে। আর পাখি পোষেন না। তক্তাপোশের তলায় ঘুণধরা খাঁচাটার কী অবস্থা কেউ জানে না। সেন্সারের বাবুরা ঘুরে-ঘুরে লোক গুনছিলেন। পোষা জীবজন্তুর হিসেবও নিচ্ছিলেন। আরও কত কী তথ্য। লোকসংখ্যা সতের থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাহান্ন। নেহাত পেটেরটা বাদ দিয়ে ধরলে। লোকেরা ব্রিজের দিকেই সরে যাবার তালে ছিল। কিন্তু গিয়ে করবেটা কী? নেহাত ঘর বেঁধে থাকাই হবে। উঁচু পুলের ওপর দিয়ে বাসবোঝাই লোকজন সোজা গিয়ে ওপারে নামবে। এখানে কোথাও আর রাস্তা আগলে দাঁড়াবার সাধ্যি নেই। রানীরঘাট হিম হয়ে ঝিম মেরে গেছে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সময় গোনা! নেহাৎ ভিটের মায়ায় কেউ কেউ থেকে যাবে। সেন্সাসের বাবুরা টের পেলেন, এ বাহান্ন আবার সতেরয় নামবে, কিংবা আরও নেমে সাতে ঠেকলেও অবাক হবার কিছু নেই। যারা দোকানদারি করুতেই এখানে ঘর বেঁধেছে, তারা ওপারে নতুন বাসস্ট্যান্ডের কাছে দু-চার হাত জমির জন্যে মাথা ভাঙছে।

অথচ বাইরে-বাইরে এই মৃত্যুযন্ত্রণা বোঝার উপায় নেই। তেল ফুরোবার আগে সলতে পুড়ছে হু হু করে। রানীরঘাট ভিড় হল্লাজেল্লায় চঞ্চল। মোটর অফিসের টেবিলে শেষ সংখ্যা বসিয়ে সেন্সারের বাবুরা নেমে এলেন চায়ের দোকানে, যেখানে আগের সেন্সাসের দুই বাবু চা খেয়েছিলেন। ওপারে এক টুকরো টিনে লেখা : অন্নপূর্ণা টি স্টল। বাঁকাচোরা হরফ। তার তলায় লেখা প্রোঃ জগন্নাথ—পদবী ধুয়ে গেছে। চা বানাচ্ছে ষোল-সতের বছর বয়সের একটি মেয়ে। শ্যামলা ছিপছিপে গড়ন। দেখতে মন্দ না। ভেতরে দরমাবাতার দেয়াল ঘেঁষে একটা বেঞ্চের কোনায় বসে চা খাচ্ছে এক নবীন যুবক। মাথায় ঝাকড়মাকড় চুল। সরু চিকন গোঁফ। তামাটে রঙ। শক্তসমর্থ চেহারা। তার পরনে তোবড়ানো খাঁকি ফুলপ্যান্ট, আর খয়েরি শার্টের ওপর হাতকাটা সোয়েটার। বাঁ হাতে স্টিলের বালা। ভারি অমায়িক তার হাবভাব।

তার দিকে ঘুরে জগন্নাথের মেয়ে টুকটুকি হাসল।—ও ফালতুদা, তোমার নাম লিখিয়ে দাওনি বাবুদের?

সেন্সাসবাবুদ্বয় বেঞ্চে বসেছেন। ফালতু ভুরু কুঁচকে বলল—কিসের নাম?

হাসতে হাসতে টুকটুকি বলল—ওর নাম লিখুন। ও যে বাদ পড়ে গেল।

প্রথমবাবু বললেন—তুমি বুঝি এখানেই থাকো?

ফালতু নিস্পৃহ ভঙ্গীতে ঘাড় নেড়ে সিগারেট ধরাল। পানুটি কি এখানে? বত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা ঠেঙিয়ে বাস নিয়ে এসেছে একটু আগে। পথে দুবার বিগড়েছিল। ঠেলতে হয়েছে। মালিককে বললে বলেন, আর ক’টা দিন চালিয়ে নে বাবা। নতুন গাড়ি আসছে। ইসমাইলকে বুড়ো করেছে এ গাড়ি। সেই গাড়ি ফালতুকেও বুড়ো করবে।

দ্বিতীয়বাবু কাগজপত্র বের করেছেন ব্যাগ থেকে।—কেউ তো বলেনি তোমার কথা! হুঁ, নামটা বলো ভাই।

ফালতু হেসে বলল—কী হবে?

প্রথমবাবু বোঝাতে শুরু করলেন। টুকটুকিও বলল—ভয় নেই বাবা। কেউ ধরে নিয়ে যাবে না। আমারও নাম লিখে নিয়েছে। নেননি বাবু? বলুন তো একবার।

একটু পরে কাচুমাচু মুখে ফালতু রাজি হল।—লিখুন তাহলে। ফালতুই লিখুন।

—ফালতু! হাসলেন উভয় বাবুই। ওটা নিশ্চয় ডাকনাম? আসল নাম বলো।

মেয়েটা হেসে খুন হল। চায়ে দুধ ঢালতে গিয়ে উনুনে পড়ে গন্ধ উঠল। ফালতু গোঁ ধরে বলল—আসল নকল জানি না স্যার, ফালতু আমার নাম। লিখতে হয় লিখুন, নয় বাদ দিয়ে দিন।

—বেশ, ফালতু। হুঁ, বয়স?

—বিশ-পঁচিশ হবে।

আবার হাসি উঠল অন্নপূর্ণা টি স্টলে।—বিশ, না পঁচিশ?

—যা মনে হয় লিখুন। ফালতু বিরক্ত হয়ে বলল।

—মাঝামাঝি লিখছি। কেমন? জাতি কী ভাই?

একটু চুপ করে থাকার পর ফালতু বলল—হিন্দুই লিখুন।

—বাবার নাম?

হঠাৎ বজ্রাঘাত। জগন্নাথ মেকদারের হাসিখুশি মেয়েটা শক্ত হয়ে গেল। আড়চোখের বাঁকানো দৃষ্টি ফালতুর গায়ে গিয়ে পড়েছে। হঠাৎ রানীরঘাট নিঃঝুম ঝড়ের আগে যখন পাতাটিও গাছে নড়ে না। খালি বাজ পড়ার শব্দ।

—বলো ভাই!

ফালতু বেঞ্চের কোনায় সিগারেট ঘষটে নেভাল। তারপর বলল—মায়ের নাম লিখুন সুরিক্ষেপী। তাহলেই হবে।

তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল জগন্নাথ মেকদারের মেয়ে।—না, সুরেশ্বরী লিখুন। বাবা বলত ক্ষেপীমার নাম সুরেশ্বরী। উইখানে থাকত—মাথায় জটা! আমি দেখিনি। বাবা দেখেছে। ঘাটের কত লোক দেখেছে। গঙ্গাপুজোর সময় নাকি ভর হত। লোকেরা মানত করত।...

সবাই গম্ভীর। তারপর আস্তে বললেন দ্বিতীয়বাবু—হুঁ অজ্ঞাত। এবার বলো, বাড়িতে কে আছে। কখানা ঘর। পোষা জীবজন্তু আছে কি না। বাড়ির গারজেন থাকলে তার নাম কী...

প্রথমবাবু বললেন—ট্রেন চালিও না। একে একে জিজ্ঞেস করো।

ফালতু উঠে দাঁড়াল। বলল—বাড়িটাড়ি নেই। থাকি মোটরআপিসে। তারপর চলে গেল।

বাবুরা চা খাচ্ছেন। তখন গঙ্গায় নেয়ে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে মেয়ের বাবা জগন্নাথ এসে গেল। কোমরে বরাবর বাত। এখন শরীর দু ভাঁজ হয়ে গেছে। কোমর থেকে মাথা অব্দি মাটির সমান্তরাল। তাই হাঁটলে হাত দুটো উড়ন্ত শকুনের ডানার মতো দুপাশে ঝটপট করে। এখন একহাতে ঘটি। ঘটিতে গঙ্গাজল। মাধ্যাকর্ষণের নিয়মে সেই হাতটা ঝুলে স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু ঘটি রাখতেই আবার যে-কে-সেই। সেন্সাসের বাবুদের চা খেতে দেখে খুশি হল। টুকটুকি ঠোঁটের কোনায় হেসে বলল—ফালতুদার নাম লিখে নিয়েছে বাবা। আমিই বললুম তো লিখতে। বাদ পড়ে যেত কেমন।

জগন্নাথ হাসল।... তোর যেন দিদির স্বভাব। বুঝলেন স্যার? সেবারে আপনারা আসেননি। অন্য দু’জন এসেছিলেন। আপনাদের চেয়ে বয়স অনেক কম। দিদি থাকত ওই যে ভিটে দেখছেন, ওখানে। ওই ফালতুর মায়ের নাম লিখিয়েছিল। খুব ভালবাসত মেয়েটাকে।

কথার কথা হিসেবে প্রথমবাবু বললেন—কাকে?

—সুরিক্ষেপীকে। মানে ফালতুর মা। জগন্নাথ রোদে দাঁড়িয়ে পুঁথি খুলল। পুঁথিতে অল্পবিস্তর রঙ চড়বেই। তাই—কোন জাত না কোন জাত, জাত মানামানি নেই। দিদি ঘাটে ফেলে মেয়েটাকে রগড়াত। কী ভাল না বাসত স্যার! ঘাটের অনেকে জানে। দেখেছেও, যারা ছিল তখন। আমার দিদি মুরুক্ষু মেয়ে হলে কী হবে, প্রাণটা ছিল বড়। ফালতুর জন্মের রাতে কি বিষ্টি কী মেঘ। পেলয়ঙ্কর চলছে। তার মধ্যে দিদি কাঠ রে আগুন রে সেঁকা রে পোড়া রে, আপনার মশাই লণ্ঠন রে করে রানীরঘাটের এ-মুড়ো ও-মুড়ো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আজকাল আর অমন মানুষ হয় না স্যার! তো ফালতু এখন মানুষ হয়েছে। এ লাইনে খুব পাকা ড্রাইভার। ও জানেই না এসব কথা। কে ওর চোখে কাজল পরিয়ে গায়ে তেল মাখিয়ে রোদে বসে থাকত জিগ্যেস করুন, বলতে পারবে না।

সেন্সাসের বাবুদ্বয়ের অত সময় নেই। শহরে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের সময় হয়ে এলো। উঠে গেলেন পয়সা দিয়ে। জগন্নাথ একটু বেজারই হল। এক সময় সুরিক্ষেপীর বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারটা রানীরঘাটের মনমেজাজ চাঙ্গা রাখত। কার না মনে পড়ে সে-সব দিন? ফিস্টি। গানের আসর। সুরিক্ষেপীর ঘর গড়ার দিন কত হইচই স্ফূর্তি। যে আসছে, সেই হাত লাগাচ্ছে। জগন্নাথ কত কাপ চা খাইয়েছিল হিসেব নেই। আজকাল সবাই কেমন যেন হয়ে গেছে। ফালতু তখন মোটেই ফালতু ছিল না। এখন ফালতু তো বটে, মানুষই যেন ফালতু হয়ে গেছে। ঘাটোয়ারিজী একটা লাল হাফপেণ্টুল দিয়ে ফালতুকে বলেছিলেন—যেদিন বাবা বলা ছাড়বি, সেদিন থেকে রোজ একপো করে রসগোল্লা। ফালতু ছাড়তেই পারেনি। ও বাবা, তোমার পাখিটাও দাও না! ও বাবা, আমি খৈনি খাব। ও বাবা, দুটো পয়সা দাও। হুঁ, ফক্কুড়ে লোকেরা শিখিয়ে দিত ছোঁড়াটাকে। ঘাটোয়ারিজীকে নাকাল করে ছাড়ত। শুধু ঘাটোয়ারিজী কেন, জগন্নাথের ওপরও লেলিয়ে দিত না? একবার অশ্বিনী দারোগা এসেছেন ঘাটে। কে লেলিয়ে দিয়েছে ফালতুকে। ফালতু দারোগাবাবুর হাফপ্যাণ্টুল খামচে ধরে বলে—ও বাবা, সাইকেল চাপব। বাবা, সাইকেল চাপব। দারোগাবাবু বললেন—এটা সেই পাগলীর বাচ্চাটা না? আহা! রানীরঘাটে সে এক দিনকাল ছিল। দুঁদে দারোগা হো হো করে হেসে সাইকেলের রডে চাপিয়ে সত্যি একচক্কর ঘুরিয়ে দিলেন। নামিয়ে দু-আনা পয়সাও দিলেন। বললেন—কী রে ছোঁড়া? আমার সঙ্গে যাবি? আমার বাড়িতে থাকবি। লেখাপড়া শেখাব। অ্যাঁ? যাবি?

সেদিন ফালতু গেলে ভালই করত। রানীরঘাটের লোকগুলো যেন ছোঁড়াটার মায়ায় পড়ে গিয়েছিল। ও গেলে যেন ঘাট ফাঁকা হয়ে যাবে। এক ফাঁকে শম্ভু মাঝি ডাকল—আয় বে। লৌকোয় চাপবি। ফালতু চলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। দারোগাবাবু সাইকেলে চেপে গেলেন আসামী ধরতে কনকপাড়া-গোপগাঁ।...

তবে ছোঁড়াটার লোভ ছিল না কিছুতে। দিদি একখানা বেগনি হাতে দিলে তো প্রায় সারাদিন ধরে তাই কুচকুচ করে দাঁতে কেটে খাবে। দিদি ওদের মা-ব্যাটার মত যত্ন করত। এখন ভাবলে অবাক লাগে। কেন এমন করত দিদি? কেন কেন করতে করতে জগন্নাথের শীতটা গেল বেড়ে। তোবড়ানো মুখে ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকল।

—বাবা, আমি আসছি।

জগন্নাথ তাকায় মেয়ের দিকে।—নাও! মাথায় পোকা কামড়াল। খদ্দেরপাতি আসবে-টাসবে।

—তুমি দেখ না ততক্ষণ। মরতে তো যাচ্ছি না!

লম্বা পা ফেলে টুকটুকি বাসস্ট্যান্ডের ওপাশে চলে গেল। মা-মরা মেয়ে নিজের জোরে বড় হয়েছে। বাড়টা বড্ড বেশি। ঘাটসুদ্ধু লোক তার কুটুম্ব। মামা খুড়ো কাকা মামী খুড়ি কাকিমা, দাদা বউদি, আরও কত রকম সম্পর্ক মানুষের থাকে।

বাস সিন্ডিকেটের লক্ষ্মণবাবু ডাকেন—ও টুকটুকি, কোথায় যাচ্ছিস? টুকটুকি সোজা বলবে—আপনার কনে খুঁজতে দাদামশাই। লক্ষ্মণবাবু দাড়ি চুলকে বলবেন—ওরে, ওরে। তুইই তো আমার কনে। টুকটুকি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলবে—আমার বর যে ঠিক হয়ে আছে দাদামশাই।

আহা, আগে বলতে হয়।

আর ওই চৌবেজী। ওকে দেখলেই খৈনি ডলতে ডলতে—কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার/হামি জানে না সাঁতার।

ঘাটোয়ারিজী লোটা হাতে শিমুলতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কানে পৈতে জড়ানো। হাতমাটি করা হয়ে গেছে। মোছা হয়নি। নির্মীয়মাণ ব্রিজ দেখছেন। দেখতে দেখতে ঘুরলেন ডাইনে বাঁশবনের দিকে। আকন্দ ও সাঁইবাবলার ঝড়ের পিছনে জগন্নাথের মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতমুখ নেড়ে কথা বলছে কার সঙ্গে। একটু সরলে ঘাটোয়ারিজী অবাক। ওটা ফালতু না? চোখের নজর ইদানীং কমেছে। তাহলেও চিনতে ভুল হল না। হেঁড়ে গলায় কাঁপা-কাঁপা সুরে গেয়ে উঠলেন—’কেমনে হোবো এ গঙ্গা পার...’ টুকটুকি হন হন করে চলে গেল গঙ্গার আঘাটায়। ফালতু একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর বাস অফিসের দিকে হাঁটল। চৌবেজী খুব হাসলেন। কতক্ষণ আপনমনে হাসলেন। হাসার পর গম্ভীর হয়ে গেলেন। মন খারাপ হয়ে গেল।

—টুকটুকি! ও রী টুকটুকি! শুন, শুন! ইধার আ।

—বলো ঘাটোয়ারিজী। যা বলার ঝটপট বলো, আমার শোনার সময় নেই।

—আ রী বৈঠ্বি, তব তো বোলবো।

—হুঁ, বসলুম। বলো।

—হাঁ রী, এত্তো কী ফুসুর-ফাসুর কোরে বেড়াস ফালতুর সঙ্গে?

টুকটুকি মুঠো পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—মারব! তারপর কান্নার ভান করে—হুঁ, মাগো। এবং আবার মুঠো তুলে—মারব!

চৌবেজী নির্লজ্জের মতো ফিসফিস করলেন—সাচ বলছি রী বেটি। বাত তো শুন।

—শুনব না। চিলচ্যাঁচানি চেঁচাল জগন্নাথের মেয়ে।

—পাগলী বেটি—বোল, বিভা করবি তো বোল হামাকে। হামি লাগিয়ে দেবে। চৌবেজী চাপা স্বরে বলতে থাকলেন। আরী! হামি তো ঘাট ছেড়ে চলেই যাবে। তোদের বিভা দেখে যাই। এত্তোকাল ঘাটে থেকে বুঢ়া হোয়ে গেল। হামার বহুত সুখ হোবে, বেটি। বহত ধুমধাড়াক্কা লাগিয়ে দেব।

টুকটুকি ভেংচি কেটে পালিয়ে গেল। তারপর থেকে তারও মন খারাপ। চৌবেজীকে দেখলে সেখান থেকে কেটে পড়ে। জগন্নাথ তাকে ওপারে শহরে পাঠালে সে আঘাটায় জল ভেঙে চলে যায়। শীত যত যায়, জল তত শুকোয়। বালির চড়ায় মাথা কোটে। ওদিকে ঘাটের সামনে বারোমাস দহ। ফালতুকে বিয়ে করলে ঘাটোয়ারিজীর কেন সুখ হবে, টুকটুকি বোঝে না।

শীত ফুরিয়ে বসন্ত এলো। রানীরঘাটের বনভূমি সাধ্যমতো সাজল। এবার নিষ্পত্র চ্যাঙা শিমুল শ্মশানে দাঁড়িয়ে রইল কিংবদন্তীর সেই রাহুচণ্ডাল। ভাগীরথীর বুকে ঘূর্ণি ঘুরে বেড়ায়। ভূতেরা নাইকুণ্ডল খোঁজে আপন-আপন। নাইতে গিয়ে টুকটুকি চেঁচায়—গরু খা, গরু খা, গরু খা! সেই সময় একদিন শম্ভু মাঝি থপথপ করে হেঁটে ফালতুর কাছে এলো।

—কেমন আছিস বাপ ফালতু?

খাতির করে সিগ্রেট দিয়ে ফালতু বলল—ভাল আছি শম্ভুকাকা। তুমি ভাল তো?

রানীরঘাটের সবচেয়ে বড় আর বুড়ো শিরীষগাছের তলায় ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল শম্ভু মাঝি।—বাপ ফালতু রে!

—বলো কাকা—

শম্ভু মাঝি হঠাৎ গামছার খুঁটে চোখ মুছে বলল—জোয়ান হয়েছ। বড় হয়েছ। ভাল রোজগারপাতি করছ।

—তা করছি কাকা—ফালতু অকৃতজ্ঞ নয়। রানীরঘাটের এসব লোকই তাকে মানুষ করেছে, সে জানে। সবাইকে শ্রদ্ধাভক্তি করে চলে।

—এবারে বিয়েটিয়ে করে ফেলো বাপ। আর কদিন আছি? ঘাটও তো উঠে যাচ্ছে। তোমার বিয়েটা দেখেই যাই।

ফালতু হাসল।—আমাকে কে মেয়ে দেবে শম্ভুকাকা?

বুড়ো ঘাটমাঝি তার গায়ে হাত বুলোতে থাকল। লগিধরা কড়াপড়া হাত। লোলচর্ম বাহু। গোঁফ ছাপিয়ে জল ঝরছে। কী স্নেহে কোন মায়ায় কাঁদে এতদিন বাদে, কে বলতে পারে সে গুহ্য কথা?

—যদি ইচ্ছে করো, জগাইকে বলি। লজ্জা করে কী হবে? ঘাটে তো সবাই জেনেছে, তোমাদের বড্ড মনামনি ভাব। বুড়ো ঘাটমাঝি ফ্যাঁচ করে নাকই ঝেড়ে ফেলল, এমন আবেগ এসেছে!

ফালতু হো হো করে হেসে উঠল।—ধ্যাৎ! আমাকে কেন মেয়ে দেবে? কাকার আবার কথা।

শম্ভু গম্ভীর হয়ে বলল—দেবে। দিয়ে বর্তে যাবে। আমরা ঘাটসুদ্ধু গিয়ে ধরব। ঘাটোয়ারিজী বলেছেন, সবাই মিলে ফালতুর বিয়ে দেব। খরচ যা লাগে তিন ভাগ ওনার। খুব ধুমধাম হবে বইকি।...

সেদিনই একটু রাত গড়ালে চৌবেজীর গতিতে সভা বসেছে। পুরনো লোকেরা সবাই এলো। জগন্নাথকেও ডাকা হল। সে-বেচারা কিছুই জানে না। দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে শকুনের ডানার মতো ঝটপট করতে করতে কুঁজো হয়ে এলো। এসেই অবাক। তার খাতিরটা বড্ড বেশি করা হচ্ছে। ধরাধরি করে তাকে উঁচু গদিতে উঠিয়ে দিল লোকেরা। মদন কন্ডাক্টার এখন চুলপাকার দলে। ফালতুর ব্যাপারে সেই বরাবর লিড নিয়েছে। এবারও নিল। চৌবেজীর দিকে তাকিয়ে বলল—তাহলে কথাটা উঠুক ঘাটোয়ারিজী। সবাই সায় দিয়ে বলল—হ্যাঁ, হ্যাঁ। চৌবেজী বললেন—জরুর।

মদন শুরু করল। ফালতুর মা সুরিক্ষেপী থেকেই শুরু করল। ফালতুকে মানুষ করার ইতিবৃত্ত, ফালতুর চালচলন, ইসমাইল ড্রাইভারের স্নেহ (আহা, এখন সে বেঁচে থাকলে কত খুশি হত, এবং কয়েকটি জিভের চুকচুক শব্দ, মাথা নাড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ), খুঁটিনাটি ঘটনা, অশ্বিনী দারোগার আহ্বান (খুব হাসির রোল পড়ে গেল এইতে), ফালতুর দুষ্টুমি—আধঘণ্টারও বেশি। তার সঙ্গে রানীরঘাটেরও নানা ঘটনা জুড়ে দেওয়া হল চারপাশ থেকে। ব্রিজও এলো। রানীরঘাটের অনিবার্য মৃত্যুর প্রসঙ্গও উঠল। (দীর্ঘশ্বাস ও নীরবতা) তারপর জগন্নাথের দিদি—যাকে সবাই বলত ময়রামাসি, তার কথা—এ পাপে রানীরঘাট একদিন ভেসে যাবে। তাই যাচ্ছে। আগের দিনের মানুষেরা যা বলত, ফলে যেত।

এই সময় চৌবেজী মানুষের লোভকেই দায়ী করলেন। তুলসীদাস আওড়ে বললেন—’সেবক সুখ চহ মান ভিখারী/ব্যসনী ধন সুভ গতি বিভিচারী/লোভী জনু চহ চার গুমানী/নভ দুহি দুধ দহত এ প্রাণী।’ মানুষ আকাশ দুহে দুধ চায়। হায় রে লোভ!

জগন্নাথ খুব মাথা নাড়ল। মদন কন্ডাক্টার বলল—তো কথা হচ্ছে, ময়রা মাসির কাছে শোনা কথা, (স্রেফ মিথ্যে কিন্তু) সুরিক্ষেপী মাসির আগের চেনাজানা ছিল। মাসির স্বজাতিরই মেয়ে। স্বামীর অত্যাচারে...

এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ জোরে মাথা নেড়ে বলল—না! না!

শম্ভু মাঝি একটু তফাতে মাটিতে বসে ছিল। বলল—আহা, বলতেই দাও জগাইদা!

মদন একটু হেসে বলল—মাসি আমাকে বলেছিল। সত্যমিথ্যে সেই জানত। আমি যা শুনেছি বলছি। আর স্বজাতি না হলে অমন সেবাযত্ন করত? বলুন সবাই! না কি ঘাটোয়ারিজী, বলুন?

সবাই শোরগোল তুলে বলল—ঠিক ঠিক। বেজাত হলে অমন করবে কেন?

জগন্নাথ গতিক বুঝে গুম হয়ে বলল—হলেও হতে পারে তাহলে।

মদন বলল—আমরা রানীরঘাটওয়ালারা ছেলেটাকে মানুষ করেছি। এখন লায়েক হয়েছে। ভাল কামাচ্ছে। লাইনের নামকরা ড্রাইভার। না হয় লেখাপড়াটাই ভুল করে আমরা শেখাইনি। তাতে কী? যে বিদ্যে ধরেছে, তাই বা মন্দ কী! বইপড়াও বিদ্যা, গাড়ি চালানোও বিদ্যা।

সবাই সায় দিয়ে বললে—একশোবার একশোবার!

মদন বলল—এখন তাহলে ওর একটা বিয়ে দেওয়া দরকার। ওর মা-বাবা নেই তো কী হয়েছে। আমরাই ওর মা-বাবা। আমরাই ওর বিয়ে দেব। চৌবেজী, আপনাকে তিন ভাগ খরচ দিতে হবে। বাকি এক ভাগ আমরা দেব। কী বলো জগাইদা?

আগে থেকে সব সাজানো ব্যাপার। জগন্নাথ না জেনে বলল—নিশ্চয় দেব।

এবার মদন আচমকা পর্দা তুলল।—ফালতুর স্বজাতের কনে রানীরঘাটেই আছে—উপযুক্ত কনে।... মদন চাপা হেসে বলল, না কী চৌবেজী?

—জরুর।

মদন গলা ঝেড়ে বলল—আমরা সবাই জানি। সকালসন্ধ্যে দেখছি ওদের দুটিতে খুব ভাব-ভালবাসা। আমরা এখন বাকিটুকু ছেড়ে দিলুম কনের বাপের হাতে।... বলেই সে চতুর হেসে জগন্নাথের কাঁধে ডান হাতটা রেখে সহাস্যে বলে উঠল—বলো জগাইদা।

আর যায় কোথায়? কুঁজো বুড়ো নড়বড় করে প্রায় ঝাঁপ দিল নীচে। তোবড়ানো মুখখানা যতটা পারে ভয়ঙ্কর করে চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠল—ন্না। আবার ডানা ঝটপট করে গদির দিকে ঘুরে গর্জন করল—না! কক্ষনো না!

শোরগোল শুরু হল। সবাই ওকে বোঝাতে চায়। জগন্নাথের চারদিকে ঘিরে দাঁড়ায়। কাকুতিমিনতি কতরকম। সাধ্যসাধনা। জগন্নাথ দু হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে মাথাটা দুপাশে জোরে দোলাতে দোলাতে বলল—না না না! না না না! না না না...

বুড়ো মানুষ অমন করে কাঁদলে বড্ড খারাপ লাগে। যেন জবাই করা হচ্ছে ওকে। অদ্ভুত লোক তো! দেখব কী দিয়ে বর জোটে মেয়ের।...

তখনও ফরাক্কার ফিডার ক্যানেল খোঁড়া হয়নি। বসন্তের শুরুতেই ভাগীরথীর জল শুকিয়ে যেত। জ্যোৎস্নারাতে বালির চড়ায় বসে যুবক-যুবতীদের চমৎকার প্রেম জমত। ওপারে শহরে বিদ্যুৎ, এপারে রানীরঘাটে বিদ্যুৎ—ভাগীরথীর গর্ভে সে আলো পৌঁছয় না। জ্যোৎস্নাটা ভালই খেলে। রানীরঘাটের নীচে অবশ্যি কিছুটা দহ। দক্ষিণে শ্মশানের ওদিকটায় প্রায় সবই শুকনো, একখানে সেই মাথা কুটতে থাকা জল ঝিলমিল করে বয়ে যায়। ফুরফুরে বাতাসে গা শিরশির করে। দুটিতে বসে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছিল।

—ঘাটের কিসের মিটিং ডেকেছে। গেলে না যে?

—আমাকে ডাকেইনি।

—ডাকবে আবার কী? তুমি ঘাটের লোক নও?

—নাঃ। আমি ফালতু।

—শোনো, তুমি এবারে একটা নাম নাও। ভাল নাম।

—তুমিই দাও না একটা নাম।

—নেবে?

—হুঁউ।

—আগে জানলে ওই গুনতিবাবুদের কাছে...আচ্ছা, ওরা আর লোক গুনতে আসবে না?

—কে জানে! কী নাম দিচ্ছ, দাও আগে।

—দিচ্ছি। নতুন বাসমোটর কবে আসবে তোমার?

—ব্রিজ খুলুক। কেন?

—প্রথম—একেবারে প্রথম পেসেঞ্জার আমি। ভাড়া দেব না কিন্তু। চাপাবে?

—হুঁউ।

—তখন থাকবে কোথায়?

—ওপারে নতুন আপিস হচ্ছে না? সেখানে। আমার থাকার ঘরও হচ্ছে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু পরে আবার—বাবা ওখানে জায়গাই পেল না। লক্ষ্মণ দাদামশাইকে বলতে বলেছিল বাবা। বলেছি তো। সে কথা নেই, শুধু দেখলেই ফক্কুড়ি করে। তুমি বলবে একবার?

—বড় মুখ করে বললে যখন, বলব।

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর—গুনতিবাবুদের কাছে তুমি বাবার নাম বললে না। আমার খুব খারাপ লাগছিল, জানো? যা হোক একটা বললেই পারতে। কী ভাবল ওরা?

—কী ভাববে? বয়ে গেল।

—যাঃ! বাবা না থাকলে চলে? বাবা না থাকলে...

—কী?

—আমার লজ্জা করছে। তুমি হয়তো রেগে কাঁই হয়ে যাবে।

—না, না। বলোই না।

—থাক। তোমার বাবার কথা জানতে ইচ্ছে করে না?

জোরে মাথা দোলাল এবং জ্যোৎস্নামাখা বালিতে আঁচড়া কাটতে থাকল প্রেমিক যুবক। গায়ে ছায়া ফেলে উড়ে গেল একঝাঁক রাতের পাখি। শ্মশানের বাঁশবনে শেয়াল ডেকে উঠল। তার একটু পরে কী একটা শব্দ হল কোথায়। তারপর প্রেমিকা তরুণী উঠে দাঁড়াল ঝটপট। অস্ফুট স্বরে বলল—কে যেন আসছে। আমি যাচ্ছি। এদিকেই আসছে যেন। যাচ্ছি!

ডানা থাকলে উড়ে যেত এভাবে চলে গেল, যেন পা বালি ছোঁয় না। নিঃশব্দে। ফালতু উঠল একটু পরে। সিগারেট ধরাল। আলো দেখেই আওয়াজ এলো—কে ওখানে?

ফালতু লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল—জগাইকাকা নাকি? আমি ফালতু।

—টুকটুকি কই? হাঁড়ির ভেতর থেকে জগন্নাথ কথা বলল যেন।

একটু দ্বিধা হল। তারপর সেটুকু ঝেড়ে ফেলে বলল—কী হয়েছে জগাইকাকা?

জগন্নাথ একটা অদ্ভুত ব্যবহার করল। সে খপ করে ফালতুর হাত দুটো ধরে ফেলল। তারপর মরণকালের ঘড়ঘড় শ্বাসকষ্টের আওয়াজ তুলে বলে উঠল—ফালতু বাবা! তোর হাত দুটো ধরে বলছি রে, এ নিশুতি কাল। মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে বলছি। ঘাটওয়ালারা ষড়যন্ত্র করেছে, জোর করে তোর সঙ্গে আমার টুকটুকির বিয়ে দেবে। ফালতু রে! আবার বলছি, মা গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে আছি—ওরে, তোরা ভাইবোন রে! আমি মহা পাপী রে! টুকটুকি আর তুই ভাইবোন—তোদের বিয়ে হয় না রে...

এক ঝটকায় ফালতু হাত ছাড়িয়ে নিল।

—আমি বলছি বাবা। নিচে মা গঙ্গা, আমি বলছি, আমার পাপের কথা।

ফালতু হুংকার দিতে গিয়ে সামলে নিল। সে জানে, সে দুঃখী। লোকের করুণায় বেঁচেছিল। জোর দেখাতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে যায়। অমনি চুপসে যায়। আস্তে বলল—হতে পারে তুমি লম্পট। হতে পারে বইকি। আমার মা আটচালায় থাকত আর তোমরা রানীরঘাটওয়ালারা... থাক সে কথা। এখন বয়েস হয়েছে তো। বুঝতে পারি সব। কেন আমাকে মানুষ করা, সবই বুঝি।

জগন্নাথ ফ্যাঁচ করে নাক ঝেড়ে পাছায় হাত মোছে। ক্র্যাঁও ক্র্যাঁও করে কুডাক ডাকতে ডাকতে একটা পেঁচা উড়ে যায় শ্মশানের পাশে শিমুলগাছটার দিকে। কোত্থেকে একটা সাদা কুকুর এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একবার কেঁউ করে ডেকেই চুপ করে যায়। লেজ নাড়ে। জ্যোৎস্নায় নিজের ছায়া শোঁকে একবার।

ফালতু আবার বলতে থাকে—আজ পারুলিয়ার নতুন রুটে গাড়ি খারাপ হয়েছিল। মিস্ত্রি ডাকতে পাঠালুম। মাথায় টুপিপরা, সাদা দাড়ি মুখে, এক মুসলমান হাজিসায়েব এলো। চিনলেও চিনবে। ইব্রাহিম হাজি নাম বলল।

ভাঙা গলায় জগন্নাথ বলে—হ্যাঁ। ডাকাত ছিল। পরে তীর্থ করে হাজি হয়েছে। খুব চিনি বাবা, কে না চেনে। খুনের মামলায় জেল হয়েছিল যাবজ্জীবন। তাও জানি।

—কথায়-কথায় বলল, ঘাটে এক পাগলী থাকত—সে বেঁচে আছে, না মারা গেছে? বললুম, মারা গেছে। আমি তারই ছেলে। শুনেই লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরল। তুমি, তারই ছেলে বাবা? আমি তো অবাক। এমন কেন করছে লোকটা? তারপর কিছুতেই আসতে দেবে না। প্যাসেঞ্জার আছে গাড়িভর্তি। শোনে না। মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। বলে—আমার ব্যাটাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাইয়ে দাও। আমার কেমন যেন লাগল। আমি খেতে পারলুম না। সে আমাকে ছাড়বে না। জড়িয়ে ধরে টানাটানি। বলে, আশ্বিন মাসে ঝড়জলের রাতে...

এ পর্যন্ত শুনেই জগন্নাথ বলল—হ্যাঁ, হ্যাঁ। রাতটুকু ওপারে মোক্তারবাবুর বাড়িতে লুকিয়ে থেকে পরদিন আদালতে হাজির হত। অত রাতে তখন খেয়া বন্ধ। শম্ভু গাঁজা খেয়ে মড়া। এদিকে ঝড়জল। ইব্রাহিম আমাকে জায়গা চাইল। খুনী ফেরারকে জেনেশুনে জায়গা দিতে পারলুম না। বললুম, আটচালায় গিয়ে থাকো বরং।

ফালতু সিগারেট ছুঁড়ে ফেলল জোরে। সাদা কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে শুঁকল এবং ছ্যাঁকা খেয়ে ফোঁৎ ফোঁৎ করে নাক ঝাড়তে থাকল।—এতকাল পরে ওর খেয়াল হল সুরিক্ষেপীর কথা। ফালতু দম-আটকানো গলায় বলে উঠল।—ওই ছাতুখোর ঘাটোয়ারি। ওই মাতাল মদন কন্ডাক্টার! আবার দেখি জগাইকাকা তুমি! তুমি আরও এককাঠি সরেস। কী না টুকটুকি আর আমি ভাইবোন। এবার ফালতু গর্জন কিংবা হাহাকার করে উঠল।—কী বাবা দেখাচ্ছো আমাকে সবাই মিলে। রানীরঘাটের মড়াখেকো শেয়ালকুকুরগুলো ফালতুকে বাবা দেখাচ্ছে। আমার বাবার দরকার নেই। হুঁ, বাবা দেখাচ্ছে শালারা! আরে, আমার হাতে যে স্টিয়ারিং ধরে দিয়েছে, সেই আমার বাবা।...

ময়রা মাসি বলেছিল—এ মহাপাপ সইবে না। রানীরঘাট ভেসে যাবে। শেষ অবধি তাই ফলে গেছে। এখন ভাগীরথীর ওপর বিশাল ব্রিজ হয়েছে। ফরাক্কার ফিডার খাল থেকে জল আসছে। বারো মাস নদী কূলে-কূলে ভরা। সেই কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ কাজল-জল আর নেই। শ্যাওলায় গা ঘষে বেড়ানো রূপসী মৌরালার ঝাঁকও আর দেখা যায় না। রোদে-জ্যোৎস্নায় বুকের তলার রুপোলি বালুকণাও আর অলীক মুক্তোর ঝিলিক দেয় না। চৌবেজীর গদি, আটচালা, জগন্নাথের অন্নপূর্ণা টি স্টল জুড়ে আকন্দ সাঁইবাবলা কালকাসুন্দে আর বনতুলসীর জঙ্গল। সুরিক্ষেপীর ‘থানে’, বাসস্ট্যান্ডের চত্বরে, হরেকরঙা গাঁদা ফুলের ঝাড়। এক সাধু এসে আশ্রম খুলেছেন। পিচের রাস্তায় কবে কারা ধানচাষ করেই ফেলবে। বিদ্যুতের শালকাঠের খুঁটি যে যা পেরেছে উপড়ে নিয়ে গেছে। শুধু ঘাট আর শ্মশানের মাঝামাঝি জায়গায় সেই রাহুচণ্ডাল শিমুলটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখনও মাঘ মাসে সে মাথায় লাল পট্টি জড়াতে ভুল করে না।...

ওই একটু দূরে ষাট সত্তর ফুট উঁচু পুলের ওপর দিয়ে ঝকঝকে এক রুপোলি বাস যাচ্ছে পুরন্দরপুর মনসুরগঞ্জো বিনোটি মহিমাপুর। ড্রাইভারটি মধ্যবয়সী। সারা পথ দুধারে যত গ্রাম আছে, যত মানুষ আছে, সবার কাছে তার মোটরগাড়ি সময় জানিয়ে দেয়। ক্ষেতের মুনিশ বলে ওঠে, ফালতুর গাড়ি গেল। নাস্তা এলো কই? স্ল্যাবে ধান শুকোতে দেওয়া চাষী বউ, ঘুটেকুড়ুনী মেয়েটা, খুঁটি ও দুরমুশ হাত গাইগরু বাঁধতে আসা বুড়ী—কার সঙ্গে না কথা বলে যাবে সে। গাড়ির গতি কমিয়ে বলে যাবে—বোনটি ভাল আছে তো? ও বুড়ীমা, কাল দেখিনি কেন? ও বউঠান, মাছ রেখো তো চাট্টিখানি—ফেরার সময় নিয়ে যাবো। ওরা বলবে—ফালতুদার খবর ভাল তো? বাবা ফালতু, দুটো মাথাধরার বড়ি এনে দিস বাবা, আমার সোনার বাবা! বিনোটির মাস্টারমশাই স্কুল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে বলবেন—ফালতু। প্রেসক্রিপশানটা নিয়ে যা বাবা! এই নে টাকা। বেশি লাগলে দিস, দোব’খন।

ফালতু এখনো ফালতু নামেই থেকে গেছে। যে তাকে নতুন নাম দিতে চেয়েছিল, রানীরঘাটের জগন্নাথের মেয়েটা, তার মতো নির্বোধ আর কেই বা ছিল। বাপ যেই না বলা, তোরা ভাইবোন—হতভাগী আপন দাদার সঙ্গে জ্যোৎস্না রাতে মা গঙ্গার বুকে শুয়েছে, এই তীব্র পাপবোধে মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। বিষাক্ত করবী-ফল, কেউ বলে ধুতরো, শিলে বেঁটে গিলে ফেলেছিল। বাপ কোন মতলবে কী বলছে, বুঝবি তো তলিয়ে।



এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই ফালতুর রাগ হয়। স্পিড বাড়ায়। পৃথিবীকে চাকার তলায় মাড়িয়ে শোধ নেয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন