শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১৪

ফুড়ুৎকার

নাহার মনিকা

বলক তোলা পানির মধ্যে কি এক বিদ্রোহ, পানির শিরা উপশিরা তেজে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বাষ্প হয়, শ্লোগান দিতে চায়- ‘মরবো না, মেঘ- বজ্র হয়ে ঝরবো আবার’...গরর গরর আওয়াজ তুলে সসপ্যানে চায়ের পানি। আমার পায়ে ফ্লিপ-ফ্লপ, চুলার কাছে দাঁড়িয়ে হাতে বাষ্পের উষ্ণ ভাপ মাখি। আম্মা বলে- কুসুম কুসুম গরম। জানলার বাইরে আত্মমগ্ন তুষার ঝরে। সুখী, করুণ, শিশুতোষ, আচ্ছন্ন- যতক্ষণ না নীচে পড়ছে। পড়লেই প্রাপ্তবয়স্ক, পড়লেই নিষিদ্ধ, অচ্ছ্যুৎ! এমন শাদা পড়তে পড়তে কি কোন কলুষিত ভাবনা খামচে ধরে নামে? দেখতে ভালই লাগে, অনেককাল- মনে হয় অনন্তকাল এইসব তুচ্ছ, অদৈনন্দিন মহাজাগতিক ঘোরে আটকে থাকি, কিন্তু আমার মাথায় নরসিংদীর রাস্তাঘাট এসে ঘাই মারে। নিমফুল, দাগলাগা পানির গ্লাস। স্কুলের জংধরা নিঃসঙ্গ টিউবওয়েল। আব্বার সরকারী অফিসের মনমরা সিঁড়ি। ওখানের স্থাবর অস্থাবরের বিনিময়ে এখন এই কুইবেকে আমাদের পরিযায়ী দিনরাত!

অনু দরজাটা ভালোমত বন্ধ করেনি। আর আমি দেশে থাকতে তালা বন্ধ করার অভ্যাস ভুলতে পারি না, প্রথমে কলাপ্সিবল গেইট, সেখানে বড় তালা, ঘটাং। তারপর ভেতরের ছোট গেইটে আরেক তালা, সামান্য ঘটাং। ঘষায় ঘষায় শাদা হয়ে যাওয়া ঘরের কপাটের সোনালী কড়ায় তালা, কোন ঘটাং নাই। অনু’র মন থেকে চুরি চামারির ভয় ডর উড়ে গেছে, দরজা তো অদরকারী, জামা-জ্যাকেটের বোতামেরই খেয়াল নাই!

আম্মা বাসায় থাকলে সকালের চা আমার মত তিরিশ বছরের মেয়েকেও করতে দেয় না। পনেরো বছর হয়ে গেলো মন্ট্রিয়াল শহরে, তাও নিজের হাতে পাতা ফুটিয়ে ঘন চা খাবে। টুকটুকিও নাকি ভালোবেসে খায় এই ঘন দুধেল চা। ওকে কথাবার্তার পর্যায়ে নিয়ে আসতে আম্মার ঝাড়া আট বৎসর লাগলো। এই আট বৎসরে- দু হাত উঁচু করে আম্মা যখন উঁচু শেলফের বইপত্র ঝাড়ে টাড়ে, দেখতে পাই তার চামড়া হাড়- মাংস থেকে সামান্য দূরত্ব বাড়িয়েছে। সেই স্পেসে আট সংখ্যাটা সেঁটে বসে গেছে আংটার মত। তাই নাকি যায়, ইমারতের গাঁথুনি যেমন ভূমির অন্তর্গত কম্পনে খুলে খুলে শিথিল।

কুইবেক সিটিতে থাকা ফরাসী বলা টুকটুকির চোখ নাকি খুব বাঙ্ময়- আম্মার ভাষ্য। ও আমাদের কথা বোঝে না। ইংরেজীও ভালো পারেনা। তবে একদিন বরফ পড়া দেখে যখন হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলে ওঠে - “দেখ দেখ আকাশ হইতে দেবতারা কেমন অশ্রুপাত করিতেছে”- সঙ্গে সঙ্গে আম্মার কালি পড়া চোখে অচেনা বিস্ময়, উঠে আসার ভঙ্গীতে এক দাগ ওষুধের মত হালকা উচ্ছাস যোগ হয়, যেন একটা উট পাখি- মুহূর্তে গোলাপী ফ্লেমিঙ্গো।

অনু খুব বিরক্ত, টুকটুকি সংক্রান্ত যে কোন কথা তিতকুটে লাগে ওর। ওকে কেউ কিছু বলতেও পারে না। টনটনে জেদী ষাড়ের মত কথার শিং তেড়ে আসার ভয় করে সবাই। তার ওপর অনু ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে বায়োলজি পড়ে নিজের খরচে। যেন তেন মজদুরি না, রীতিমত টিচিং এ্যাসিস্ট্যান্টশীপ করে। যতই ও আইশ্যাডো লাগানো শুরু করুক না কেন অথবা ফেসবুক টুইটারে জানবাজি রেখে পড়ে থাকুক, কে কি বলবে?

টুকটুকির মাথাটা নাকি একদম জাংক বাক্স। আর আম্মাও পারে, সারাক্ষণ ওর আগের বাড়ি, আগের বন্ধুরা, মলের ভীড়, খলবল-বকবকের মধ্যে নিজের ছোটবেলার হজমীঅলা, চালতার আঁচার আর ছি-বুড়ির গল্পের চিৎকার গুজে দিয়ে দিয়ে ঘণ্টি বাজায়। স্কুলের সামনের, এমনকি আচারওয়ালাটার কাঁচাপাকা গোঁফটাকেও এঁকে দেয় যাতে সে টুকটুকির স্বপ্নে এসে ধরা দেয়।

চায়ের কাপ নিয়ে দরজায় নক করি। এ ঘরটা ভ্যাপ্সা, মানুষ বসবাসের সহজাত গন্ধ হারিয়ে গিয়ে অস্বাভাবিক কিছু, জানালার বাইরে গাছের পাতায় আলো পড়ে বৈদূর্য্যমণির মতো ফুটে থাকা বরফ থোকার দিকে তাঁকালে সে গন্ধ বড় বেমানান। জানলা খুলে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দিই না। টুকটুকির লেপটা ভাঁজ করাই থাকে। পায়ের দিকে লম্বা বালিশ দঙ্গল করে পাকানো। ও ওর ঘোর কৈশোরের শেষ ষ্টেশনে। তাই বলে ঘুম ভাঙ্গা কণ্ঠ এত বাজখাই শোনাবে? নাকি আমার কল্পনা!

- নোওওপ, আই ডোন্ ওয়ান্ট!...

ওর ডেস্কের ওপর রাজ্যের ষ্টীকার সাঁটা, একের পর এক, একটার ওপর আরেকটা, হিজিবিজি,বিজি ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া জটিল এক কোলাজ। সদর ঘাটের কথা মনে পড়ে, যেন খুব ভোরে ঝালকাঠির লঞ্চ ভিড়ছে, বুড়িগঙ্গার ওপারে কোটি মানুষের প্রত্যুষস্নান, একই রকম, হিজিবিজি কোলাজ। এই ভীড়ে আপন দুই মুখ, আম্মা আর আব্বা।

এই মন্ট্রিয়াল শহরে এসে জোটার আগে আব্বার একটা যুক্তিই সারাক্ষণ টিভির সংবাদের মত পূনরাবৃত্তি হতো- “আমাকে না, দেশের নব্বই পার্সেন্ট মানুষ ডেকে জানতে চাও, সবাই এক পা বাইরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তোমাদের এখানে ভালো লাগে না! ইয়ার্কি মারবে না আমার সঙ্গে”! ক্যানাডায় থাকার জন্য রেফ্যুজি ক্লেইমের প্রাণান্ত চেষ্টাকে একটুও অস্বাভাবিক লাগেনি কখনো!

আম্মা কাঁদে, আম্মা কি বিচিত্র কারণে জানি ফেইসবুক, ইন্টারনেট এসবে আগ্রহবোধ করে না, বাঙ্গালী গ্রোসারীর ক্যালেণ্ডারে ছাপা হওয়া সরষে ক্ষেতের ছবি দেখে বর্ষাকালের মত কাঁদে শুধু। এখানের ন্যাতানো চুপচাপ চারপাশে কান্না ভালো লাগে না। আম্মা কাঁদলে আমি বা অনু কেউ কখনো কোন শান্তনা দেই না। কালেভদ্রে অনু গাদা গাদা ষ্টীকার কিনে এনে রাখে। আম্মা তখন কান্না থামিয়ে সেগুলো নিয়ে পড়ে।

চায়ের সংগে ফ্রি বাংলা ট্যাবলয়েড জমে ভালো। এর পেটের মধ্যে গাদাগাদি করে তাবৎ দুনিয়ার বিজ্ঞাপন। বড় সড় রুইমাছ প্রায় কোলে করে গ্রোসারীর ভেতরে রশিদ মিয়া, দুপাশে সারি সারি শেলফে দেশী ব্রান্ডের মশলা পাতি, গত রোজায় বিশাল ইফতার পার্টির হোষ্ট। আমরা রোজায়ও নাই, পূজায়ও নাই, না কুড়োনো পাতার মত উড়ে আসি, টুক করে এলিয়ে তারপর আবার উড়ে যাই... আমাদের আব্বা আম্মা আসলে গসিপের জ্বালানী ছাড়া তেমন আমলে আনার মত কেউ না। রিয়া ভাবির ভ্রু প্লাকের মূল্যহ্রাস একজোড়া বাঁকানো ভ্রু’কে তৃতীয়ার চাঁদ বানিয়ে কোনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনু বাঙ্গালী দোকানপাটে ঢোকে না। আমাকেও নিয়ে যায় বাংগালী পাড়া ছাড়িয়ে দূরে এক ভিয়েতনামের মেয়ের কাছে। আমরা মদিনা বানু ঝুমার সুলভ কেটারিং- শাম্লি কাবাব আর ছানার জিলেপীর স্বাদ-গন্ধওয়ালা বাতাস পার হয়ে যাই। শীতকালে কম, গরমকালে ভুরভুরে সুঘ্রাণ, ক্ষুধা উদ্রেককারী।

আব্বা ছানার জিলেপী পছন্দ করে খায়, শুধু পছন্দ বললে বড় শাদামাটা শোনায়, বিকারগ্রস্থভাবে পছন্দ। আম্মা নাকি সেজন্য না হলেও শ’খানেক লিটার দুধ ক্ষয় করেছে। এই মিষ্টিটা বড় আজব, কিছুতেই মন বসিয়ে স্থির হবেনা। একদিন কেলেকুষ্টি বিটকেলে শক্ত, একদিন ফুলবেই না। অন্যদিন ফুললো, রংটাও জাঁহাবাজ- আম্মা খুশী মনে ঘুমোতে গেল, সকালে উঠে দেখা গেল তেনারা সব চেপ্টে নেতিয়ে গেছেন। দৈবক্রমে দু একবার শিকে ছিঁড়ে আসলি স্বাদ আর চেহারা দেখা গেলে আব্বা ঘোষণা দিয়ে দেয়- বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজের বাসায় ছানার জিলেপী খেয়ে তার জীবন সার্থক। অঋনী, অপ্রবাসী নিজগৃহে শাকান্ন ভোজনকারী সুখী মানুষের সংজ্ঞা- ব্যাস উলটে গেল!

সেগুলো কি সুখের দিন?

বাংলা ট্যাবলেয়ড এর বিজ্ঞাপন পাতায় ছাপা এই লোকাল মুখগুলি সব চেনা। আমাদের চৌকোনা বাসার খানা- খন্দের অন্তস্থল চষে ফেলতে ফেলতে আমার এদের গল্পগুলোও বের করতে ইচ্ছে করে। ব্লাউজ বানাতে মিনারা পারভীন, ট্রেইন্ড বাই অভিজ্ঞ টেইলার্স ইন মৌচাক মার্কেট, একহাতের তিন আঙ্গুল ঢাকা শহরের গার্মেন্টস এ দূর্ঘটনায় কাটা পড়েছে। সস্তায় মন্ট্রিয়াল টরন্টো ট্রিপ- প্লাইমাউথ ভ্যয়েজার ভ্যানের সামনে মোহাম্মদ আলি মিয়ার রাঙ্গানো দাড়ি, নির্ঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ধূ ধূ হাইওয়েতে গাড়ি চালানো হাসি মুখ। কি করে জানি আমি? আসলে জানি না, বিজ্ঞাপনের পেছনের গল্পগুলো খুঁজে বেড়াই। যদিও সবসময় যে পাই তা না, কিন্তু আছে। থাকতেই হবে। তুচ্ছ হোক, তস্য তুচ্ছ হোক গল্প না থেকে পারেই না।



আজকে আব্বার সঙ্গে দেখা করার দিন। মাসে দুদিন আমার টার্ণ। অন্য দু’সপ্তা অনু। আম্মা সবসময় বলবে- টুকটুকিকে নিয়ে যা। আব্বার ভ্রমণ কেবল দুটো জায়গায়, ক্রাইসিস সেন্টার থেকে সেন্ট্রাল জেলে, জেল থেকে দরকার পড়লে আবার ক্রাইসিস সেন্টারে। সোশ্যাল সার্ভিস থেকে ফোন করে প্রায় সময় আগেই জানিয়ে দেয়। আগে কেউ দেখা করতে যেত না। ফ্রাঁসোয়া যোগাযোগ করার পর থেকে শুরু। দু-একবার আব্বা খুব ধোপদুরস্ত, দু একবার জীবনের যাবতীয় দায় কাঁধে চাপানো পতনমুখী স্থবির।

তাও ভালো। দু’বছর আগে পুলিশের বিশেষ অধ্যাদেশ অনুযায়ী আব্বার তো এই বাসার দু’শ গজের মধ্যে ঢোকা বারণ ছিল। দেখলেই পুলিশ ডাকা যেত। আব্বা কয়েকবার সামনের বাস ষ্টপে এসে বসে থেকেছে। আমরা জানলার পর্দা একটু তুলে দেখেছি। আম্মার মনে হতো টূকটুকি লাফিয়ে উঠে দৌড়ে বাইরে যেতে পারে, লো ভল্যুমে ওর প্রিয় ট্রি-হাউস চ্যানেল চালিয়ে দিলে জেলোটিনের মত জমে যাবে। তারপর নির্বিকারে ঘরের কাজ সারতো। আমি ঘরের ভেতরে গিয়ে চেয়ার টেনে পর্দ্দার ওপরের ঘুলঘুলি দিয়ে তাঁকিয়ে দেখতাম রাস্তায়। আব্বার পরনের প্যান্ট হাঁটুর কাছে অল্প দুমড়ানো। ঘোলা চোখ যেন বাসের অপেক্ষায়, কিন্তু বাস এলো, গেলো, আব্বা নড়লো না। বাসষ্ট্যাণ্ডের পাশে লাইলাক গাছটার মত স্থির থাকলো, ছোট্ট গাছ, ফুল ঝরছে। চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেলে নেমে আসতাম, পায়ের অবশ ভাব ভালো হয়ে গেলে আবারো চেয়ারে উঠে দেখতাম আব্বা চলে গেছে!



লিওনেল গ্রু আন্ডার গ্রাউন্ড রেলওয়ে জাংশন, নামতেই ফ্রাঁসোয়া, দুই হাতে কাগজের কাপ। কফি। হাইতিতে এরা এত ফ্রেঞ্চ নামও রাখতো, বাব্বা। আমি হাসি- ‘আমার দেশে নামে আ-কার থাকলে কেমন মেয়ে মেয়ে শোনায়’। ফ্রাঁসোয়াও হাসে- “তোমার নামটি কিন্তু আমার পছন্দ হইয়াছে। অন্তু- বেশ করিয়া র‍্যাগে মিউজিক এ চালাইয়া দেওয়া যায়”।

ফ্রাঁসোয়াকে দেখলে মনে হয় মূর্তিমান আত্মবিশ্বাস সম্বল করে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ একটু বাদেই বোঝা যায় সে স্বভাবে অস্থির। সোশ্যাল ওয়ার্কার বলেই হয়তো একটা প্রফেশনাল মুখোশ। আব্বা কি আর ওর একলা কেইস? কত ধরনের বৈচিত্র্য ঘিরে দিনাতিপাত করে এরা! এই ছেলেটার ওপর নির্ভর করতে ভালো লাগে। বলেও ফেলতে চেয়েছি-“ আমাকে বিবাহ করিয়া ফেলো। ফ্রাঁসোয়া একটি ঘুষি বাগিয়ে আসবে ভেবে পেটে চালান করে দিয়েছি বাক্যটাকে।

অনু যেমন বলে- ‘ইউ ল্যাক সেলফ কনফিডেন্স, লাইক মোষ্ট অব দ্য বাংলাদেশীস। আমার খুব রাগ হয়, কিন্তু এটাতো সত্যি যে রাস্তা হারালে আমার প্রতি তিরিশ সেকেন্ডে একজনকে থামিয়ে পথের দিশা জানতে ইচ্ছে করে। ফ্রাঁসোয়া কফি কেনে যে দোকানে একই ঠিকানা জানতে পর পর না-হোক তিন দিন গেছি। কানে ব্লু টুথ, আরেক কানে দুল ঝোলানো ছেলেটার শংখশাদা দাঁত আর কালো ঝকঝকে চেহারা আপন লাগতো! তিনদিনের দিন সে হেসে ফেলেছে-“ মাদমোয়াজেল, তুমি বোধ করি শহরে নতুন আসিয়াছো। অপ্রস্তুতের হাসি সপ্রতিভ হয়ে দেখাই, ওকে বলে কি হবে যে পনেরো শীত পার হয়ে গেল এখানে!

ক্রাইসিস সেন্টারের ওয়ার্কারগুলি এমন সন্ধিগ্ধ হয়ে তাঁকায়, যেন আমিও ওদের ইন-হাউস রোগী, চাউনির ছাঁকনিতে আমার ভাবনা ছেঁকে ফেলবে মুহূর্তে। এদের কারো কাছেই টুকটুকিকে ফষ্টার হোমে দিয়ে দেয়া অস্বাভাবিক লাগে না। বাবা মা, বায়োলজিক্যাল হলেও যদি ঠিক ঠাক লালনপালনের দায়িত্ব নিতে না পারে, তাহলে সরকার আছে, এরকম করেই তাদের চিন্তার বিন্যাস।

আব্বা প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল একটা ভদ্র চাকরী যোগাড় করতে। সবাই শুধু পরামর্শ দিতো- ফরাসী ভাষা শেখ। ভাষা শেখা কি সবার কাজ? আম্মা টুকটুকিকে নিয়ে আবার গর্ভবতী, তখন এই নেই করে তিন বছর পার হয়ে গেছে। তাদের রেফ্যুজি ক্লেইম ঝুলে আছে কি কারণে কেউ বলতে পারছে না। ইমিগ্রেশন ক্যানাডা আরেক ছানার জিলেপীর মত, মুড সুইং এ ভোগে। ফোন করলে যন্ত্রস্থ কন্ঠস্বরে ধাতব উত্তর। বছরের বছর ফাইল বন্দী হয়ে থাকার উৎকন্ঠা আর অপেক্ষা।

আম্মার বেশী বয়সের গর্ভাবস্থা, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে চলার মত টাকা সরকার দেয়, কিন্তু আব্বার নাকি খুব মানে লাগে, কাজ না করে পয়সা নিতে। অন্য সবাই যখন নানা ফন্দি ফিকির বের করে আর নিজেরা ক্যাশ টাকায় রেষ্টুরেন্ট এ কাজ করে দেশে প্লট কেনে, আব্বা তখন কেবলই বিষণ্ণতায় ভোগে। আম্মাকে না জানিয়েই টুকটুকিকে ব্যাতশো এডাপ্টেশন সেন্টারে জন্মের আগেই দত্তক দেয়ার লিষ্টে নাম লিখিয়ে এলো। না জানিয়ে তো আর হয়না, একদিনেও না। আম্মা বলে যে তাকে প্রেসার করেছিলো, স্যুটকেসে অতিরিক্ত কাপড় ভরে চাপলে যেমন সেই রকমের। দিনের পর দিন স্যোশাল ওয়ার্কারের প্রশ্নোত্তর, আম্মার গর্ভাবস্থার রিপোর্টের সব ফটোকপি, বাচ্চাটাকে সুস্থ্য সবল প্রসব করাচ্ছে কিনা ইত্যাদি, দিয়ে যাচ্ছিল সেকি আর আম্মাকে না জানিয়ে? ফ্রাঁসোয়া আমার কথায় এই প্রশ্নটা করবেই করবে- “কেন না ইহা তোমাদের সংস্কৃতির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। এইরকম কথাবার্তার দিনে বাসায় ফিরে আমি কিছুক্ষণ আম্মাকে সন্ধিগ্ধ চোখে দেখি।

টুকটুকি’র জন্মের পর হাসপাতালে স্যোশাল ওয়ার্কার হাজির। তার সঙ্গে লাজুক উচ্ছাসে দত্তক নিতে ইচ্ছুক দম্পতি। আম্মার বিস্ময়, শোক, স্থাণু অবয়ব আর থর থর করে কাঁপা শরীরের সামনে তারা তার সই করা কাগজ মেলে ধরলো, আম্মা কাগজে বসানো তার নিজের সইটা ছুঁয়ে দেখার ব্যাকুল চেষ্টা করে, তার আঙ্গুলে একটু আগে টুকটূকির গাল স্পর্শ করার কোমল মায়া। বুকের দুধ খাওয়াতে হয়নি, কেন যেন হচ্ছে না। নার্সরা ফর্মুলা মিল্ক খাইয়ে দিয়েছে।

নিউবর্ণ বেবী ছাড়া আম্মা খুব স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফিরে আসে, আব্বা তখন আমার বিয়ের পাত্র দেখে বেড়াচ্ছে, মরিয়া হয়ে, ক্ষ্যাপাটে হয়ে। অন্তত আমার যদি কোন হিল্লে করে যেতে পারে। কিন্তু ডিপোর্টেশন নোটিশ পাওয়া পরিবারের সঙ্গে এখানে কে আত্মীয়তা করবে! গ্রোসারীর দোকানের মাংস কাটার লোকটারও ক্যানাডিয়ান পাসপোর্ট আছে! আব্বা কারণে অকারণে বাঙ্গালী গ্রোসারীতে গিয়ে আড্ডা দেয়। আমাকে যুক্তিবিদ্ধ করতে একদিন ডাইনিং টেবিলের চেয়ারটা ভেঙ্গে ফেললো। আম্মা তখন তার ঘরের কোনে টুকটুকির বিছানা ঠিক করছিল, কোন দরকার নাই, তাও রুটিন বানিয়ে করে। শাড়ি ছিড়ে অপ্রয়োজনীয় কাঁথা বানায়। লোক্যাল এডাপ্টশন, বিশেষ করে একই প্রদেশের মধ্যে হলে নাকি ফেরত পাওয়ার উপায় আছে। আম্মা তাই নিয়ে সারাদিন ফোনে ব্যস্ত থাকে। চেয়ার ভাঙ্গা শেষ করে আব্বা যখন ছুড়ি-কাঁচির খোঁজ করছে, আম্মা তখন এক দৌড়ে নাইন ওয়ান ওয়ান কল করে দিলো!

ঘরের মধ্যে দণ্ডায়মান নারী-পুরুষ উভয় পুলিশকেই আমি সেদিন ভয় পেয়েছিলাম, বরফকুচি যেমন করে উত্তাপ ভয় পায়। ওদের হাত শক্ত হয়ে দেহের দু’পাশে দোলে, ছন্দহীন। ওরা আব্বাকে নিয়ে গেল, আর আমরা মা -মেয়ে উইমেন শেল্টারে উঠে এলাম। অনু তখনো স্কুল থেকে ফেরেনি।




আম্মা এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। আমি জ্যাকেট, বুটজুতা দরজার পাশে রাখি। আম্মার ম্যাক্সিতে চায়ের দাগ। অনেক বর্ষণক্লান্ত খড়ের চালার মতো তার চোখের পাতা ভারী। কি বলবে আমি জানি, একই সংলাপ, রিপিট বাটন প্রেস করা আছে।

-টুকটুকি কিছুতেই এই চা খায় না।

- জোর কর ক্যান, না খাইলে না খাবে।

- মেয়েটা মইরা যাবে তো!

-না আম্মা মরবে না। চা না খাইলে মানুষ মরে না।

- না, যা আরেকবার দ্যাখ।এই মেয়ে দিন দিন ধাড়ি হচ্ছে, ঘরের কাজ কামে একটু হাত লাগায় না। আম্মার গলার কাছে বিরক্তি হিল হিল করে।


আর আমি টুকটুকিকে কল্পনায় দেখি সে ধুপ ধাপ বের হয়ে যাচ্ছে, হাইহিল বুট, তীব্র পারফিউম, নকল নোখে নীল রং নেইল পোলিশ। টুকটুকি মেট্রো ষ্টেশনের বাইরে চাইনিজ পাংক ছোকড়ার কাছ থেকে পট কিনছে... ওর ঘর ভর্তি ধোঁয়া। ওকে যারা দত্তক নিয়েছিল সে মহিলাটা কিছুটা এমনই দেখতে ছিল!

1 টি মন্তব্য:

  1. অনেকদিন এমন গল্প পড়া হয় না | পড়ে সত্যি বিমোহিত ! ভালো থাকবেন , নিয়মিত লিখবেন |

    উত্তরমুছুন