মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

জাকির তালুকদারের গল্প শত্রু সম্পত্তি


বলা নেই, কওয়া নেই, তিন-চার-ছয়মাস অন্তর ঝুল ওঠে সুরবালার। তখন চল্লিশোত্তর হিন্দু বিধবা, ভাইয়ের সংসারে নিজের ঘ্যাঁট নিজে রেঁধে-খাওয়া সুরবালা কৈশোরে ফিরে আসে আর পরনের কাপড় হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে গোবরলেপা বারান্দায় থেবড়ে বসে নামতা-শতকিয়া- প্রথম ভাগ-বর্ণ পরিচয় স্মৃতি থেকে পড়তে থাকে সুর করে। সেই পড়া কয় বেলা, কয় প্রহর চলবে কেউ বলতে পারে না। ঝুল ওঠার আগের কয়েকদিন ধরে ‘মাথার মদ্যে কেমন জানি করতিছে, বুকের মদ্যে ফাঁকা ফাঁকা ঠেকতিছে, রাত নিশুত হয়- নিঝুম হয়- আলো ফুটে- বিহান হয় আমার ঘুম আসতিছে না রে-- এইসব বলা শুরু করলেই বোঝা যায় সুরবালার ঝুল উঠবে।
তারপর ঝুল ওঠে। সুরবালা ফিরে যায় কৈশোরে, চিৎকারে পাড়া মাথায় তুলে পড়তে শুরু করে--

অ- তে অজগর- অ- অ- অজগর ঐ আসছে তেড়ে
আ- তে আম- আম- আমটি আমি খাব পেড়ে
একে চন্দ্র, দুই-এ, দুই- এ পক্ষ, তিনে নেত্র
তিন এককে তিন
তিন দুগুণে ছয়
তিন তিরিক্ষে নয়
তিন চারে... তিন চারে... তিন চারে...

মোটামুটি দেড়-দুইদিন এই রকম চলবে। এর মধ্যে মাথায় জবা-কুসুম কেশতেল, ঘৃতকুমারীর শাঁস, কপালে শ্বেতচন্দন-বাটা লেপে দেওয়া-- এইসব চলবে। তারপরে দেড়-দুইদিন প্রায় অভুক্ত, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা দেবে যাওয়া, দীর্ঘ বছরের আমিষবঞ্চিতা কৃশকায়া সুরবালা নেতিয়ে পড়বে, ঘুমিয়ে পড়বে, বেশ দীর্ঘমেয়াদি ঘুমে। ঘুম ভাঙলেই দেখা যাবে সে আবার নিজের সঠিক বয়স সঠিক প্রতিবেশ ফিরে পেয়েছে, রোজকার মতো ঘর-কন্নায় মন দিয়েছে।

ইন্দুবালা এ-বাড়িতে এসে অব্দি এই রকমই দেখে আসছে। দেখে আসছিল। এভাবেই মানিয়ে নিয়েছিল সে-ও। চলছিলও এভাবেই। কিন্তু চিরকাল তো আর একভাবে চলে না। এদেরও চলল না।

তবে সুধীর কামার মরার আগে পর্যন্ত পরিবর্তনের বড় কোনো পূর্বাভাষ পাওয়া যায়নি। ইন্দুবালাদের জীবন-যাপনে তেমন কোনো পারিবর্তন আসেনি। আবার আসেনি যে একেবারে তা-ও বলা যাবে না। মানুষ বেঁচে থাকলে, বুঝুক না বুঝুক, একটু বদলাবেই। বয়সে বদলায়, চিন্তাতে বদলায়, জীবন যাপনে বদলায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বদলানো এতই ধীর, সে যে বদলাচ্ছে তা অনেকদিন না গেলে বোঝাই যায় না। তা ইন্দুবালাও বদলাচ্ছিল, সুধীর কামারও বদলাচ্ছিল। একদিন- দুইদিন নয়, প্রায় দুই কুড়ি বছরের সহবত তাদের। ইন্দুবালা যেদিন সুধীর কামারের দখলে এল...

দখলেই এল।

তখন সরু চালের সের আটআনা, জোড়া ইলিশ দেড় টাকা, চাঁদি ছয় টাকা ভরি, সোনা পঞ্চাশ টাকা। আড়াই টাকা দিলে ঘরে পরার শাড়ি। খাসির মাংস আধাসের কিনলে আধপোয়া কলিজা ফাউ পাওয়া যায়।

তখনো হিন্দুস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঁধেনি। বাবুরা যারা প্রথম চোটেই হিন্দুস্তান যাবার, চলে গেছে। কামার-কুমোর-জোলা-কারিগর-ব্যবসাদার হিন্দুরা তখনো হিন্দুস্তান মুখো হয়নি। কিছু কিছু বিহারি মুসলমান এসে ডেরা বেঁধেছে রেললাইনের পশ্চিমে। সরকারই জমি দিয়েছে ওদের সেখানে। তা রেললাইনের ওপার তখন তো টাউনই নয়। টাউন কমিটির কিছু যায়-আসেনি। তখনো একমাত্র সিনেমা হলে কলকাতা-বোম্বইয়া টকি চলে। হিন্দু-মুসলমান মুখ দেখাদেখি বন্ধের কোনো আশঙ্কা জাগেনি। এমনকি টাউন কমিটির প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি তখনও হিন্দু। পৌরসভা হলো তো এই সেদিন। তার আগে পর্যন্ত টাউন কমিটিই শহরের মা-বাপ। কাচারির নামকরা মোক্তার সব ক’জনাই হিন্দু। হাকিমও। হাইস্কুলের মাস্টাররাও বেশিরভাগ হিন্দু।

ইন্দুবালা সেই সময়ে সুধীর কামারের দখলে এল...

দখলেই এল।

বিয়ের মাধ্যমে নয়। তিন তাসের জুয়ার মাধ্যমে।

তখন ইন্দুবালার আঠার-উনিশ। আড়াই বছর আগে বিয়ে হয়েছে চৌকির পাড়ের বৈকুণ্ঠের সাথে। পাইন্যা বৈকুণ্ঠ। রসুলের মোড়ে তার খিলিপানের দোকান। বৈকুণ্ঠের মসলাদার পানের তখন টাউনজোড়া সুনাম। রাতে ঘরে ফেরার সময় মাঝে মাঝে ইন্দুবালার জন্যেও পান নিয়ে আসত। ইন্দুবালা ফরসাই। দোহারা গড়নের ফুলো ফুলো ঠোঁট। তা সেই ঠোঁটেও কী পানের রঙে কম বাহার খোলে!

জুয়াই বৈকুণ্ঠের সব কিছু খেল। শেষে একরাতে বাজি ধরে বসল ইন্দুবালাকে। এক ঘরভর্তি জুয়াড়ি সাক্ষী ছিল। তাদের কেউই প্রায় এখন আর বেঁচে নেই। তো সেই বাজিতেও হেরে গেল বৈকুণ্ঠ। তার পাঁচের জোড়ার ওপর টেক্কা টপ কালার দিয়ে সুধীর কামার বাজি সহ জিতে নিল ইন্দুবালাকে। কেউ প্রতিবাদ করেনি। বউকে বাজিতে তোলা যায়ই। কুরুক্ষেত্রের পাঁচালিতেই তো সবাই শুনতে পায় বউ দ্রৌপদীকে বাজি ধরে ধম্মপুত্তুর যুধিষ্টির জুয়া খেলেছিল শকুনির সাথে। বাজিতে হারায় দ্রৌপদী গেল দুর্যোধনের দখলে। তখন রাজসভায় তার বস্ত্রহরণ। কিন্তু দ্রৌপদীর সহায় তার সখা। কৃষ্ণঠাকুর বলে কথা। সে-ই বাঁচাল দ্রৌপদীর ইজ্জত। দুর্যোধন কাপড় টানতে থাকে, কাপড় আসতেই থাকে, শেষ আর হয় না। দ্রৌপদীকে ন্যাংটো করার খায়েশ মিটল না দুর্যোধনের-দুঃশাসনের। কিন্তু ইন্দুবালা তো আর দ্রৌপদী নয়। তার শাড়িও এগারো হাতের বেশি লম্বা নয়। কাজেই তা খুলতে সুধীর কামারের কয়েকটা হ্যাঁচকা টানের বেশি লাগেনি।

আর বউকে সুধীর কামারের হাতে তুলে দিয়ে বৈকুণ্ঠ দেশান্তরি। রসুলের মোড়ে তার পানের ঢোপের ঝাঁপি ওঠে না। বৈকুণ্ঠের কিছু বাঁধা কাস্টোমার ছিল। বৈকুণ্ঠের সাজা পান ছাড়া তাদের চলত না। বিশেষ করে টাউনের তাড়িখোরের দল আর রাত আটটার দিকে যাদের গন্তব্য ছিল ভবানীগঞ্জের মাগিপাড়া। রাত আটটাই তখনকার দিনে অনেক রাত। কেরোসিনের টেমি আর হ্যারিকেন প্রায় সব ঘরেই নিভে যেত। টাউনের রাস্তায় ততক্ষণে একপাক ঘুরে যেত শেয়ালের দল। তার নয়টায় সিনেমা ভাঙার পর দর্শকদের নিজ নিজ বাড়ি পেতে যতক্ষণ সময় লাগে। তারপর আর একজন লোককেও রাস্তায় পাওয়া যাবে না। তো সিনেমা ভাঙা পর্যন্ত বৈকুণ্ঠের দোকান খোলা থাকত। সিনেমা ভাঙা দর্শক বাড়িতে নিয়ে যেত বৈকুণ্ঠের খিলি পান। কিন্তু ইন্দুবালাকে সুধীর কামারের হাতে তুলে দেবার পরে আর কেউ বৈকুণ্ঠকে দেখেনি। শোনা যায় সেই রাতেই সে নর্থবেঙ্গল মেইল ধরে চলে গেছে হিলি বর্ডারে। বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়ায়।

ইন্দুবালার কি খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন? আজ আর মনে পড়ে না সে দিনের অনুভূতি। তবে অনুভূতি বোধ হয় কিছুই ছিল না। কেননা এমন ঘটনা তার জীবনে ঘটতে পারে, কোনো মেয়ের জীবনে ঘটতে পারে, চরম দুঃস্বপ্নেও তা ভাবতে পারেনি বলেই তার সমস্ত অনুভূতি ভোঁতা-স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে তখন রক্ত-মাংসের পুতুল বৈ আর কিছু নয়। আবার আশ্চর্যের ব্যাপার যে, নিজের সমস্ত অতীতকে মন থেকে মুছে ফেলে সুুধীর কামারের সাথে মানিয়ে নিতে তার বেশিদিন লাগেনি। নিজেদের গুটিয়ে নেবার, সবকিছু সয়ে নেবার শক্তি মেয়েদের এত বেশি! সুধীর কামারেরর বউ মরেছিল মাস আষ্টেক আগে। কোনো ছেলে-পুলে রেখে যায়নি। বাড়িতে থাকার মধ্যে ছিল সুধীর কামারের বাল্যবিধবা বোন সুরবালা।

এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারে ইন্দুবালা। প্রথম প্রথম সুধীর কামার তার ওপর হামলে পড়ত। যেন দখিলসত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করছে জোর করে। তারপরে ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল লোকটা। ভালোও বেসে ফেলল একসময়। এমনকি একদিন তার মরা বউয়ের সিঁদুরের কৌটা বের করে তুলে দিল ইন্দুবালার হাতে।

সুধীর কামারের বোন সুরবালা তার ছোঁয়া এড়িয়ে চলত। খাবারের জল-টল ছুঁতে দিত না ইন্দুবালাকে। ভাইয়ের জন্য রান্না করত নিজেই। সরাসরি কোনো কথা বলতো না ইন্দুবালার সঙ্গে। কথা বললেও তার সঙ্গে যোগ করত খিস্তি। একদিন, সেদিন খুব বর্ষা। সুধীর কামারের নেহাইয়ের আগুন নেভানো। সৃষ্টি ভেসে যাবার মতো বর্ষা। গায়ে সুখের আলসেমি নিয়ে চৌকিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল সুধীর। হঠাৎ বলল-- ইন্দু রাঁধ দেখি আজ, খিঁচুড়ি কেমন পারিস!

আর বোন তো থ! ইন্দুবালাও। আমার হাতের রান্ধন খাবে।

আরে অসুবিধা কী! সব করতিছি, খাওয়া কী দোষ করল?

এইভাবে রান্নাঘরে। সুরবালাও যেন গোপনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। নিজে বিধবা মানুষ। মাছ-মাংশ-পেঁয়াজ ছুঁতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু ভাইয়ের জন্য রাঁধতেই হতো। এখন ইন্দুবালার ওপর ভার পড়ায় শুধু নিজের ঘ্যাঁটটুকু ফুটিয়ে নিলেই হলো।

সিঁদুরের কৌটা, রান্নাঘর, খাবারের জল ধরে একে একে সংসারের সবকিছু। আর ইন্দুবালা খাটিয়ে মেয়েমানুষ। ঘরের কাজের ফাঁকে কামারশালা উঁকি দেয়। জলের চাড়ি ভরে রাখে, নেহাইতে কয়লা গুঁজে দেয়, হাপরের দড়ি টানে। হুঁকোয় ফুঁ দিতে দিতে কামারের দিকে এগিয়ে দেয়া তো আছেই। বছর না ঘুুরতেই ইন্দুবালা ছাড়া সুধীরের আর চলে না।

তো এইভাবে সুধীর কামারের সংসারও চলে এল ইন্দুবালার দখলে। এইভাবেই তার পরের বছরের পর বছর। মাঝখানে কত কিছু ঘটেছে! সুরবালা মরেছে। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান দুইবার যুদ্ধ বেধেছে। একাত্তরের নয় মাস ওরা পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে এ গাঁয়ে- সে গাঁয়ে। কিন্তু ইন্ডিয়া যায়নি। সুধীর অনেকবার বলেছে, তাদের ইন্ডিয়া যাওয়া উচিত। কিন্তু ইন্দুবালার এক গোঁ। ইন্ডিয়া যাবে না। সেই গোঁ এর কাছে হার মেনেছে সুধীর। শেষ পর্যন্ত সেই নয় মাসও পাড়ি দেওয়া গেছে। তারা ফিরে এসে ফের পুড়ে যাওয়া ভিটায় ঘর তুলেছে। কামারশালায় চামড়ার হাপর জুড়েছে, নেহাইতে কয়লা ঠেসে আগুন জ্বেলেছে। নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করেছে পুরনো জীবনযাপন।

সুধীর কামার শুধু একটা জিনিস দেয়নি ইন্দুবালাকে। সন্তান। দিতে যে তার অনিচ্ছা ছিল তা-ও নয়। তবে হয়নি। হয়তো সন্তান জন্মদানে তাদের অক্ষমতা ছিল কোনো একজনের, কিংবা হয়তো দুইজনেরই। এই নিয়ে খুব আলতোভাবে ডাক্তার-বদ্যি করার বায়না ধরেছে ইন্দুবালা। কিন্তু সুধীর পাত্তা দেয়নি। হাবে-ভাবে বুঝিয়েছে ছেলে-মেয়ে না হওয়াতেই তারা ভালো আছে।

বংশ রক্ষার কথা তুললে সুধীর হেসেছে। কামারের আবার বংশরক্ষা। সে কি রাজ-রাজত্ব রেখে যাচ্ছে যে সেসব রক্ষা করার জন্য বংশধর লাগবে?

মোটকথা ইন্দুবালা সন্তান পায়নি। আর সেই না পাওয়ার ফল আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সুধীর কামার মরার সঙ্গে সঙ্গে।

ইন্দুবালা ভেবেছিল-- কেউ জানে না। অন্তত যারা জানত, তারা মরে-টরে গেছে। কিন্তু দেখা গেল সিরাজ মোক্তার জানে। মনেও রেখেছে।

তাদের বাড়ির উত্তরদিকের বাড়িটাই সিরাজ মোক্তারের। সে এখানকার আদি বাসিন্দা নয়। ঐ বাড়িটা ছিল টগর সরকারের। আয়ুব খানের আমলে একবার ইন্ডিয়া-পাকিস্তান য্দ্ধু বাঁধে। সেই সময়ে একটু উত্তেজনা ছড়িয়েছিল টাউন জুড়েও। শোনা যাচ্ছিল, রেললাইনের ওপারের শামসু বিহারির নেতৃত্বে হিন্দুদের জবাই করার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে বিহারিরা। তাদের সঙ্গে আমজাদ খাঁর দলের কসাই পট্টির বাঙালিরাও আছে। সেই গুজব অবশ্য সত্যি হয়নি। কিন্তু অনেক হিন্দু সেই সনেও দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়া পালাল। তাদের মধ্যে টগর সরকারও ছিল। নামমাত্র দামে বাড়ি বিক্রি করেছিল সে সিরাজ মোক্তারের কাছে। সিরাজ মোক্তার তখনো বেশিদিন হয়নি মোক্তারি শুরু করেছে। গাঁ থেকে বিছানাবেডিং, বদনা- জায়নামাজ নিয়ে উঠেছিল মজিদ মোক্তারের বৈঠকখানায়। সেখান থেকে উপর বাজারের নেয়ামতউল্লার বাড়িতে ভাড়া থাকা। তারপরেই সুযোগ বুঝে টগর সরকারের বাড়ি কিনে নেওয়া। তো সিরাজ মোক্তার তাদের প্রতিবেশী হবার অন্তত তিন বছর আগে ইন্দুবালার এই বাড়িতে আগমন।

তবুও সিরাজ মোক্তার ব্যাপারটা জানে। মনেও রেখেছে।

ধবধবে সাদা পায়জামার ওপর গলাবন্ধ আচকান, মাথায় লিয়াকত টুপি পরে আদালতে যেতে দেখেছে সিরাজ মোক্তারকে নিয়মিত ইন্দুবালা। তার পোশাক, তার চলাফেরা, তার চেহারার মধ্যে একটা সম্ভ্রম জাগানিয়া ভাব। সেই সিরাজ মোক্তার একাত্তরের পরে শহর ছেড়ে পালিয়ে ছিল অনেকদিন। বেশ কিছু দিন পর ধরা পড়েছিল মুক্তিবাহিনীর হাতে। একাত্তরের নয়মাস সে নাকি ছিল শান্তি কমিটির মেম্বার। মুক্তিযোদ্ধারা আচ্ছাসে পেঁদিয়ে তাকে ভরে দিয়েছিল হাজতে। দালাল আইনে দুই বছর ফাটক খাটার পরে শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমার সুযোগে ছাড়া পেয়ে যায় সে। করিৎকর্মা মানুষ। কিছুদিনের মধ্যেই গুছিয়ে নিয়েছিল নিজের সেরেস্তা-ব্যবসা, ঘর-বাড়ি। তা শান্তি কমিটি হোক আর যাই-ই হোক, ইন্দুবালা আর সুধীর কামার যথেষ্ট শ্রদ্ধা-ভক্তি করত তাকে। ঘরের লাগোয়া একটা লেখাপড়া জাননেওয়ালা লোক থাকাতে সময়ে-অসময়ে বুদ্ধি-পরামর্শ অন্তত চাওয়া যায়।

কিন্তু সুধীর কামার মরার পর সেই লোকই ইন্দুবালার কাছে এল প্রথম ভক্ষক হয়ে-- দ্যাখো ইন্দুবালা, আইনত-ধর্মত তুমি সুধীর কামারের বউ নও, কেউ নও। তার বিষয়-সম্পত্তির ওপর তোমার কোনো হক নেই। তবু আমি তোমাকে কিছু টাকা দিচ্ছি। ভিটেটার দখল আমাকে দিয়ে দাও।

ইন্দুবালা হতভম্ব! আমি তো বাড়ি বেচতে চাইনি।

আহা বিক্রির কথা আসে কোত্থেকে!

সিরাজ মোক্তারের বিরক্তি আর চাপা থাকে না-- বিক্রি কিসের অ্যা? তোমার কি কোনো অধিকার আছে সুধীর কামারের বাড়ি-ঘরের ওপর? তুমি কি সুধীর কামারের বউ?

এবার ভেঙে পড়ে ইন্দুবালা-- ভিটা-ছাড়া করলে আমি কুন ঠাঁয়ে যাই!

দ্যাখো দেখি, সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে। আরে সময় থাকতে থাকতে টাকা কয়টা নিয়ে কেটে পড়ো। না হলে এইটাও পাবা না শেষে। এই জমি এখন হয়ে যাবে ভেস্টেড ল্যান্ড, মানে শত্রু সম্পত্তি আর কি!



ঐ শালা বুড়া মুক্তার বলল আর শত্রু সম্পত্তি হয়ে গেল!

আশ্বাস দেয় সুশান্ত উকিল। সে আবার হিবৌখ্রী-র লোকাল নেতা। সে ইন্দুবালাকে সাহস যোগায়-- ঐ শালা ব্রিটিশ আমলের মূর্খ মুক্তার জানেই না যে দেশে এখন শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল। ওর বাপেরও ক্ষমতা নাই তোমার ভিটায় হাত লাগায়। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।

কিন্তু নিশ্চিন্তে থাকো বললেই কী আর থাকা যায়! নিশুত রাতে ইন্দুবালার টিনের ওপর ভুতুড়ে ঢিল পড়া শুরু হয়। একরাত দুইরাত নয়। রোজ রাতে! ইন্দুবালা তক্তপোষে জবুথবু বসে ‘ভগমান ভগমান’ জপ করে। কিন্তু ভগমানের নামে ভূত ভাগে না।

চালা ছেড়ে ভূত এবার ঘরে ঢোকে। যে কয়টা কাগজের নোট আর মামুলি সোনা-চাঁদির গয়না রেখে গিয়েছিল সুধীর কামার, সেগুলো উধাও হলো একরাতে। তক্তপোশের নিচে টিনের বাক্সে জিনিসগুলো রেখেছিল ইন্দুবালা। বাক্সসহ সব লোপাট।

কে এসব করাচ্ছে তা জানে ইন্দুবালা। কিন্তু জেনে-বুঝেও কোনো উপায় নাই। শরণ বলতে আছে ঐ সুশান্ত উকিল। সে বোলচাল ঝাড়ে-- দাঁড়াও না! এইসব করে পার পাবে না কেউ। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সেন্ট্রাল কমিটিকে আমি সব জানাচ্ছি। তারা বিবৃতি দিলে পেপার-পত্রিকা সয়লাব হয়ে যাবে। তখন আর কেউ তোমার চুলের ডগাও ছুঁতে পারবে না।

কিন্তু সিরাজ মোক্তার অনেক বেশি ঘাগু। ডিসি-এডিসি রেভিনিউ-এসি ল্যান্ড বরাবর দরখাস্ত পড়ল। এতিমখানার জন্য অর্পিত সম্পত্তি লিজ চেয়ে দরখাস্ত।

এতিমখানা মানে অনেক সওয়াবের কাজ। জনস্বার্থে অর্পিত সম্পত্তি লিজ প্রদানের বিধান সর্বশেষ আইনেও আছে। আর এতিমখানার চেয়ে বড় জনস্বার্থ আর কী আছে। হাদীসে আছে, এতিমের মাথায় একবার দরদের সাথে হাত বুলালে হাজার রাত এবাদতের নেকি পাওয়া যায়।

সেই এতিমখানা কোথায় হবে? কেন, সুধীর কামারের পরিত্যক্ত বাড়িতে! দাগ নং- ৪৩১, খতিয়ান নং- ১২০, মৌজা নিচাবাজার, জমির পরিমাণ সাড়ে ছয় শতক, সীমানা পূর্বে পৌরসভার পাকা সড়ক, পশ্চিমে ভেদরাখাল, উত্তরে জনাব এ্যাড. মোঃ সিরাজ উদ্দিনের বাড়ি, দক্ষিণে মেছো বাজারের শুরু দেয়াল।

এসি ল্যান্ড খবর পাঠায় তহসিলদারকে। তহসিলদার রেকর্ড ঘেঁটে জানায়, ঐ জমি তো অর্পিত সম্পত্তি নয়!

সিরাজ মোক্তার সবজান্তা হাসে। অর্পিত সম্পত্তি নয়, কিন্তু করলেই হয়ে যায়। কেননা, সুধীর কামারের মৃত্যুর পর তার কোনো বৈধ ওয়ারিশ এদেশে নেই।

তহসিলদারও স্থানীয় মানুষ। অবাক হয়ে বলে ক্যান-- তার বউ?

আরে ঐটা তার বউ না। রক্ষিতা। রাখনে মেয়েমানুষ। তার কোনো আইনগত অধিকার নেই ঐ জমির ওপর।

তহসিলদার এবার বোঝে। এসি ল্যান্ডও। বোঝা আরো সহজ হয় যখন সিরাজ মোক্তার পরিমাণমতো পাত্তি গুঁজে দেয় দু’জনের হাতে।

এইবার!

এইবার তোমার আর উপায় নাই ইন্দুবালা! আমার পরামর্শ মানো! এই টাকাগুলো নিয়ে দখল ছাড়ো। অন্য কোথাও যাও!

কই যাব? কার কাছে যাব?

তোমার নিজের আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাও। বাপের কুলে মায়ের কুলে যে আছে, তার কাছে যাও।

না। তিনকুলে কেউ নাই। থাকলেও এই দুই কুড়ি বছর ধরে কোনো যোগাযোগ নাই। তাদের কাউকে ইন্দুবালা চেনে না। ইন্দুবালাকেও চেনে না কেউ।

তাহলে আর কী! ইন্ডিয়াতে যাও। তোমার জাতের ঠিকানা তো ইন্ডিয়াই।

ফোঁস করে ওঠে ইন্দুবালা-- না! ইন্ডিয়া আমি যাবো না। দাঙ্গার মধ্যে যাইনি, দুই দুইবার যুদ্ধ হইছে, যাইনি, তাঁই মরার আগে অনেকবার কইছে, যাইনি! ইন্ডিয়াই আমি যাবো না! কিছুতেই না!

অবাক হয় সিরাজ মোক্তার! ইন্ডিয়ার কথায় তো হিন্দুদের মন নেচে ওঠে। এ যে দেখি উল্টা!

এই সময় ভোট আসে।

আপাতত চাপা পড়ে ব্যাপারটা। চেপে যায় সিরাজ মোক্তার। ভোটে কী হয় বলা যায় না। আওয়ামী লীগ আরেকবার পাওয়ারে এলে বোধহয় হিবৌখ্রীর ব্যাকিংয়ে ইন্দুবালা টিকেই যাবে সুধীর কামারের ভিটায়। সিরাজ মোক্তার তাতেও অবশ্য হাল ছাড়ছে না। নিজে একাত্তরে যাই করুক, নিজের মতাদর্শ যাই হোক, মেঝো ছেলেটাকে কায়দা করে ঢুকিয়ে দিয়েছে যুবলীগে। সে এখন মাঝারি গোছের ক্যাডার। বোমা-ককটেল-পিস্তল নাড়াচাড়া করতেও দেখেছে তাকে। খুশি হয়েছে। ছেলেটা অসময়ে কাজে দেবে। অন্য দুই ছেলে তো বিএনপিতে আছেই।

ভোটে সাজ সাজ রব। সিরাজ মোক্তার পুলকিত হয়ে খেয়াল করে মৌলবাদীরা বিএনপির কাঁধে সওয়ার। বিএনপিও কাঁধ পেতে দিয়েছে সানন্দে। তার দলের নেতারা আওয়াজ দিচ্ছে-- দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইসলাম, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ। ঠিক যেন পাকিস্তান রক্ষার যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ মানে পুরোপুরিই যুদ্ধ। করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে।

আওয়ামী লীগ হারল।

এবার সিরাজ মোক্তারকে পায় কে। ইন্দুবালা এবার ভাগো!

ইন্দুবালা আছড়ে পড়ে সুশান্ত উকিলের দরজায়। কিন্তু সুশান্ত নিজেই এখন ভয়ে কাঁপছে। পারে তো দুয়ারে খিল তুলে বসে থাকে। কে বাঁচে কে বাঁচায়।

ইন্দুদিদি তুমি বরং ইন্ডিয়াতেই যাও! নিচাবাজারের নিতাই সাহারা এখন মালদহে থাকে। তুমি ওদের কাছে উঠতে পারবে। আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি।

না, আমি ইন্ডিয়া যাব না।

কেন?

ইন্দুবালা কেন ইন্ডিয়া যাবে না তা ওরা কেউ বুঝবে না। ইন্ডিয়ায় বৈকুণ্ঠ থাকে। পাইন্যা বৈকুন্ঠ। যে তিন তাসের বাজিতে নিজের বউকে বাজি রেখেছিল। যে জুয়ায় হেরে নিজের বউকে তুলে দিয়েছিল অন্যের হাতে। ইন্ডিয়াতে গেলে যদি তার সাথে দেখা হয়ে যায়! তার সাথে দেখা হওয়ার চেয়ে নরকে যাওয়া ভালো। না, ইন্দুবালা নরকে যাবে কেন? ভগবানের কি বিচার নাই? নরকে গেলে, যাবে ঐ হারামির বাচ্চা, না-মরদ বৈকুণ্ঠ।

ইন্দুবালার ছানিপড়া চোখে আগুন জ্বলে। মরি কী বাঁচি, ইন্ডিয়া যাব না।

রাত যত বাড়ে, ভয় তত বাড়ে। বাড়তে বাড়তে ইন্দুবালা একসময়ে তার নিজের মধ্যে থাকতে পারে না। তার মধ্যে ঢুকে পড়ে সুরবালা। ইন্দুবালা তাকে তাড়াতে চায়। সে বার বার উঁকি দেয়।

অ-তে অজগর ঐ আসছে তেড়ে।
ঝ-তে ঝড় উঠেছে ঈষাণ কোণে।
দ-তে দৈত্যরা সব আসছে ছুটে।
ভূ-তে ভূতের নাচন চারদিকেতে।
হ-তে হায়নারা আজ খুবলে খাবে রক্ত-মাংস।
স-তে সর্প আসে বিষ ছোবলের হুমকি নিয়ে।


অনিবার্য অস্তিত্বহীনতার হুমকি নিয়ে কেরোসিনের ডিবে জ্বালিয়ে হাতের বাঁকা লাঠিটা চেপে ধরে ইন্দুবালা বসে থাকে একরোখা অশ্বের মতো। দমকা বাতাসে কেরোসিনের ডিবেও নিভে যায়। তবু ইন্দুবালা বিড়বিড় করে শপথ উচ্চারণ করে-- ইন্ডিয়া যাব না! আমি ইন্ডিয়া যাব না!


লেখক পরিচিতি
জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার এসময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার। তিনি লেখেন অভিজ্ঞতা থেকে। এবং এই অভিজ্ঞতার জন্য তাকে গ্রামে যেতে হয়নি। তিনি গ্রামেরই মানুষ। এর সঙ্গে  মেল বন্ধন ঘটেছে তাঁর  বহুমূখী পড়াশুনার। তিনি শুরু থেকে সিরিয়াস গল্পকার। কোনো অর্থেই সখ করে লেখেন না। ফলে তাঁর পাঠকও তাঁর সঙ্গে হয়ে ওঠেন সিরিয়াস। সম্ভবত জাকির তালুকদারই সাহিত্যের সেই প্রাচীন বংশের নিঃশ্ব সন্তান যিনি সত্যি সত্যি লেখালেখির জন্য সব ছেড়েছেন। নিজেকে বাজী ধরেছেন। এবং  তাকে পড়া ছাড়া পাঠের পূণ্যি অসম্ভব।
গল্পের পাশাপাশি লিখছেন উপন্যাস ও প্রবন্ধ। প্রথম উপন্যাস কুরসিনামা। মুসলমানমঙ্গল উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকমহলে পরিচিতি পান। তার সর্বশেষ উপন্যাস পিতৃগণ সম্প্রতি জেমকন সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।

1 টি মন্তব্য: