বুধবার, ১২ মার্চ, ২০১৪

পাপিয়া ভট্টাচার্যের গল্প মেজদি

সদর দেউড়িতে ঢোকার মুখে গেটের মাথায় থাবা উঁচিয়ে থাকা দুটো সিংহের মধ্যে বাঁদিকেরটা আমার ছোটবেলাতেই দেখেছি মুন্ডহীন , ডানদিক একাই ঘাড় ঘুরিয়ে পাহারায় থাকত । এক চোখের কোণ খসে গিয়ে বড় একটা গর্ত , সন্ধ্যের একটু আগেই সেখানে ছায়া পড়ত অন্ধকারের , তাতে সিংহটা কেমন জীবন্ত হয়ে উঠত । নিচে খুব অল্প পাওয়ারের টিমটিমে আলো । শরিকি বাড়িতে যা হয় , সবাই ভাবত আরো তো আছে সবাই , আমিই বা কেন পাল্টাব ! ফলে যেদিনই খেলে ফিরতে দেরী হবে ... একহাতে আলো , অন্যহাতে আমার হাত ধরে বকবক করতে করতে মেজদি আমাকে দেউড়িটা পার করে দেবেই ।

সদর দেউড়ির পর দুর্গামন্ডপ , বারবাড়ি , তারপর আরো দুটো মহলের শেষে থাকত মেজদি । এটা আমার বাবার মামার বাড়ি । জমিদারি বহুকাল ঘুচেছে , বাড়িটাই পড়ে আছে শুধু । এখানে ভাঙছে , ওখানে ভাঙছে । আবার সারিয়েও নিচ্ছে এক এক শরিক । শুধু সবচেয়ে শেষে মেজদিদের মহলটা আর সারাই টারাই হয় নি । একতলার লম্বা টানা দালানটার একদিক সবসময় অন্ধকার । মেজদি বলত , এই এই , ওদিকে খবরদার যাবি না , চালের ঘরে কাল একটা শাঁখামুটি সাপ বেরিয়েছিল ।
তাহলে তুমি যাচ্ছ যে !
দূর , আমাকে তো চেনে ওরা । কিছু বলবে না । আর আমি অত বোকা নাকি ! হাততালি দিতে দিতে যাই , ওরা সরে যায় !
চার মহলের প্রত্যেকটাতে ওরকম অন্ধকার দালান ছিল ( এখনও আছে, সাপ ধরাও পড়ত মাঝে মাঝে , ওবাড়িতে একজনও সাপের কামড় খায়নি - এও সত্যি ) আর প্রতি দালানে মেজদির মত তরুণী দিদা ছিল সপরিবারে । বাবার কাকা কাকিমারা , তাদের দিদি বলতাম । মেজদি , সেজদি , ছোড়দি । আর ওদের বররা যথেষ্ট ছোকরা অবস্থা থেকেই দাদু । দারুণ হুল্লোড়বাজ সেজদি বাড়ির পুরুষরা বেরিয়ে গেলে দুটো মহলের মাঝের উঠোনে নেচে দেখাত আমাদের । যে কোন অনুষ্ঠানে নাচ শেখাতও । প্রেমের গল্প করে আমাদের বেশ তাড়াতাড়ি পাকিয়েও দিয়েছিল । খুব আনন্দ করে বাঁচতে জানত সেজদি, যদিও তার জীবনের গোপন দুঃখগুলো আমরা তখনই জানতাম ।
মেজদি আবার সম্পূর্ণ বিপরীত । সারাক্ষণ অসুখের কথা বলতে ভালবাসত । ছেলেমেয়েরা পাত্তা দিত না , মেজদি ধরত আমাকে । ওরা বলত , এই যে এসে গেছে মায়ের বন্ধু , এবার ওকে শোনাও তোমার মাথা ঘোরা আর বুক ধড়ফড় করা গল্প । আমি অবশ্য মন দিয়েই শুনতাম , কারণ সব ব্যথার সঙ্গে মেজদির একটা জোরদার গল্প থাকত । বলার ভঙ্গিটাও টানত আমাকে । মজাও হত বেশ , কিছুটা শোনার পর মুখ কাঁচুমাচু করে বললেই হল , তাই তো মেজদি , মা আমাকে পাঠাল , ভারতী তে নতুন সিনেমা এসেছে , তুমি তো যেতে পারবে না মনে হচ্ছে । মেজদি তখন , সে কি রে , আগে বলবি তো , কটার শো ,কেন পারব না.......করে ছোটাছুটি শুরু করত ।
ওবাড়ির সব মহল তখন গমগমে । আস্তে আস্তে ফাঁকা হচ্ছিল সব , ছেলেরা পড়তে যাচ্ছে বাইরে , মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে টুকটাক । কথা নেই বার্তা নেই , পঞ্চাশ পেরোতে না পেরোতে সেজদির হাসিখুশি হার্টটা হঠাৎ ফেল মেরে বসল। আর সেই শুরু হল এক এক করে খসে পড়া ।
একটু একটু করে সব মহল অন্ধকার , দেউড়ির টিমটিমে আলোটার মত দুচারটে লোকজন । মেজদাদু গেল ক বছর আগে , ছেলেমেয়েরা যে যার মত , মেজদি একা আসর জাগিয়ে ওই ভূতমহলে । আগের মতই ছিপছিপে শরীরে বড় একটা খোঁপা , আগের মতই অসুখের গল্প , দ্রুত কাজ করা । আগের মতই বাবা মার কাছে গিয়ে মেজদির সঙ্গে দেখা করতে গেলে আলো জ্বেলে হাত ধরে দেউড়ি পার করে দেওয়া !
গা ছমছম করে না মেজদি , এই বিশাল বাড়িটায় একা থাকো ?
না রে । একা কই , মনে হয় এঘরে ওঘরেই আছে সব । বাড়ি ছেড়ে কোথায়ই বা যাবে সব বল ।
গতবছর দেউড়িতে আলো নিয়ে এল , দেখলাম ডানদিকের সিংহটা নেই । মেজদি বলল , ও তো অনেকদিন ভেঙে পড়েছে , তুই তাহলে খেয়াল করিসনি । আর কি , এবার সব ফেরার পালা !
আমার মনটা খারাপ লাগল । মেজদি অসুখের কথা বলত , কিন্তু মৃত্যুর কথা কখনও না ।
তারপর এই কদিন মাত্র আগে গেলাম । মেজদি শুয়ে আছে । দেখে ফিরে আসছি , মেজদি চোখ মুছে কাছে থাকা মেয়েটিকে বলল , আলোটা নিয়ে ওকে দেউড়ি পর্যন্ত দিয়ে এসো , ও ভয় পায় ।
এই প্রথম আমাকে দাঁড়াতে এল না মেজদি । আলোটা কিন্তু ঠিক ধরিয়ে দিল অন্যের হাতে । আর কাল ভোররাতে কখন নিঃশব্দে ওই অন্ধকার দেউড়িটা পেরিয়ে মিলিয়ে গেল কোথায় !


লেখক পরিচিতি
পাপিয়া ভট্টাচার্য

জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালা মহকুমায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ। লেখালেখির শুরু নব্বই দশকের গোড়ায়। প্রথমে জেলার লিটিল ম্যাগাজিনে লেখা শুরু, পরে ধীরে ধীরে দেশ, সানন্দা বর্তমান, সাপ্তাহিক বর্তমান ইত্যাদি পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। উপন্যাস 'তরঙ্গ মিলায়ে যায়' ও 'ভাসান'। এছাড়া দেশ পত্রিকার বাছাই লেখকদের গল্প সঙ্কলন, আশাবরী, মুশায়েরা, ললিতাঘাট তাঁর আরো প্রকাশিত বই।

এখন তিনি লিখছেন বড় একটি উপন্যাস।

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগল ! মেজদি'দের মত মানুষেরাই আলোকবর্তীকা হয়ে একটি পরম্পরা তৈরি করেন !

    উত্তরমুছুন