শনিবার, ৮ মার্চ, ২০১৪

আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই--মিয়াজাওয়া ইয়াসুমি

প্রবীর বিকাশ সরকার

আজকে আমার শ্বশুরমশাই মিয়াজাওয়া ইয়াসুমি’র (১৯৩৭-২০১১) তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের ৯ মার্চ তিনি আমাদেরকে ছেড়ে অদৃশ্য দেশে চলে যান চিরদিনের জন্য। কিন্তু তিনি আমার জীবনে রেখে গেছেন গভীর গভীর প্রভাব এবং বিস্তর স্মৃতিধন্য ঘটনা। সাধারণত বলা হয়ে থাকে জাপানিদেরকে সহজে বুঝেওঠা যায় না। কিন্তু ১৯৮৫ সালে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছরকাল তাঁকে যেভাবে চিনেছি, জেনেছি এবং বুঝেছি আমার কখনো মনে হয়নি জাপানিরা দুর্বোধ্য। বরং মাঝেমাঝে বাঙালিকেই আমার দুর্বোধ্য মনে হয়। কখন কি করে বসে বলা কঠিন! কিন্তু জাপানিদের একটা পরিশিলীত লাইফ স্টাইল আছে, আছে তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ফলে তাদের সঙ্গে মেলামেশায় অনেক কিছু জানা যায়, হওয়া যায় আত্মবিশ্বাসী এবং অগ্রসর। আনন্দফুর্তি করা যায় উন্মুক্তচিত্তে।

প্রাচীনকাল থেকেই জাপানিরা ধৈর্যশীল, কর্মঠ এবং সমবায়ী। চীনাদের মতোই জাপানিরা সমষ্টিগতভাবে কাজ করে থাকে, বাঙালিরা ব্যক্তিক। কর্মে তাদের যে প্রেম এর তুলনা মেলা ভার! ‘কথা কম কাজ বেশি’ এই হচ্ছে জাপানি। আমার শ্বশুরমশাই ছিলেন এই গুণাগুণের মূর্তপ্রতীক।

১১ জন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারে কনিষ্ঠ। বাবা ছিলেন নাগানো জেলার শিনানোমাচি নামক আধাগ্রাম-আধা শহরের একজন বর্ধিষ্ণু কৃষক। খুব প্রাচীন অভিজাত এক বংশ। সেই বংশের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে শতভাগ সফল ও সুখী মানুষ ছিলেন শ্বশুরমশাই। কোনো বাধাকেই তিনি কখনো বাধা মনে করতেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একেবারে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় জাপান। কৈশোরেই তিনি টোকিও চলে আসেন এবং কঠোর লড়াই করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। অবশ্য তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন আমার শাশুড়িমা মিয়াজাওয়া হিরোকো। তাদের দুই মেয়ে বড়মেয়ে নোরিকো এবং ছোটমেয়ে হিসায়ে। নোরিকোর সঙ্গে আমার বিয়ে হয় ১৯৮৫ সালে। কোনো ছেলে সন্তান ছিল না বলে তাঁরা দুজনেই আমাকে নিজের বড়ছেলে মনে করে আপন করে নিয়েছেন। কোনোদিন সামান্যতম ব্যাপারেও আমার সম্পর্কে অভিযোগ করতে দেখিনি। তবে একবার একটি ঘটনা ঘটেছিল কোম্পানি থেকে ফেরার পথে বন্ধুদের সঙ্গে প্রচুর মদ পান করার ফলে বেশামাল হয়ে পড়ি। সাইকেলে চড়ে ব্যালান্স হারিয়ে একজন জাপানি ভদ্রলোকের ফটকের দেয়ালে প্রচন্ড শব্দে ধাক্কা খাই। দেয়ালে একটু চিড় ধরে যায় আর কিছু হয়নি। কিন্তু বাড়ির মালিক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক রেগেমেগে বেরিয়ে এসে আমাকে গালমন্দ করেন। আমি মাথা নত করে যতই ক্ষমা ভিক্ষা করি না কেন তিনি কিছুতেই আমাকে ছাড়তে রাজি নন। পুলিশে খবর দিলেন। আমিও বাঙালির বাচ্চা জাপানের ৬০০০ বছরের ইতিহাস তুলে তার সভ্য হওয়ার কাহিনী শোনাই! বাংলাদেশের সন্তান বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল জাপানি জাতির কী মহাউপকার করেছেন সেটাও বলি। এইসব একজন বিদেশির মুখে শুনে ভদ্রলোক বেশ দমে গেলেন! আমি যে সাধারণ কায়িক শ্রমিক নই এটা বুঝতে তার সময় লাগলো না। এরমধ্যে পুলিশ এসে গেল। কিছু না বলেই সব দেখলো। খাতায় নোট করলো। তারপর মাটিতে ঘাড় ঝুলিয়ে বসেথাকা আমাকে যত্নের সঙ্গে তুলে নিল গাড়িতে। এরপর আমি আর কিছুই বলতে পারবো না।

রাত তিনটার সময় আমার স্ত্রী ও শ্বশুর আদাচি পুলিশ দপ্তরে এসে হাজির। আমার এলিয়েন রেজিস্ট্রেশন কার্ডে ঠিকানা ছিল। সেই ঠিকানা থেকে বাসার টেলিফোন নম্বর খুঁজে নিয়ে ফোন করেছিল পুলিশ। তখন আমার হুঁশ ফিরে এসেছে। চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গলাটা কাঠ হয়ে গেছে শুকিয়ে। জল চাইতে অফিসার জল দিলেন। আমি তাকে উচ্চমাপের জাপানি ভাষায় ধন্যবাদ দিলাম। বললাম, ‘আমিও পুলিশেরই নাতি এবং ছেলে। তোমার দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার জন্যই এসেছি। কোর্স শেষ হয়েছে। এখন চাকরি করছি। বিয়েও করেছি তোমার দেশের মেয়েকে।’ আফটার অল জাপানের জামাই, খুব সমীহ করলো আমাকে ওরা। অফিসারটি বললেন, ‘তুমি এত ভালো জাপানি কোথায় শিখেছো? এত বিদেশি দেখি কিন্তু এরকম চমৎকার সাবলীল জাপানি শুনিনি!’ তাকে ধন্যবাদ দিলাম আমি। মনে মনে বললাম, ‘আমি রাধাবিনোদ পালের দেশের বাঙালি। বাঙালি খুনি থেকে বিশ্বমাপের মানুষও হতে পারে!’

শ্বশুরমশাই ও আমার স্ত্রী মাথা নত করে ক্ষমা চেয়ে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দিলেন। পরের দিন শনিবার ছিল অফিস বন্ধ। সারাদিন ঘুমালাম। সন্ধেবেলা সুস্থ হলে পরে নোরিকোসহ শ্বশুরের বাসায় গেলাম। হাঁটু গেড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। তিনি হেসে বিয়ারের গ্লাস হাতে দিয়ে বললেন, ‘ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। মাতাল হলে এমন হয়। আমারও হয়। তবে সাবধানে চলতে হবে। সব মানুষ তো সমান নয়। জাপানিদের ভেতরে অনেক কিসিমের লোক আছে’ বলে অর্থপূর্ণভাবে আমার স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

পরে আমার স্ত্রী নোরিকো আমাকে খুলে বললো অনেক কিছু। যেমন ভালো মানুষের মধ্যেও মাফিয়া লুকিয়ে আছে তেমনি কোরিয়ান যারা এই দেশে বিভিন্ন সময় জন্মেছে তারাও জাপানি নামে বসবাস করছে অনেক বছর ধরে তাদেরকে জাপানি থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন। এরা জাপানি বা বিদেশির ওপর সন্তুষ্ট নয়। সত্যিকার জাপানিকে বুঝতে হলে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হবে। পরে অবশ্য চিনতে কষ্ট হতো না কে আসল জাপানি কে বহিরাগত। এরপরও অনেক জাপানির সঙ্গে আমার খিটিমিটি বেঁধেছে। সত্যিকার জাপানিরা বিনয়ী, নিরহঙ্কারী, শান্ত, প্রতিবাদহীন। কিন্তু রেগে গেলে সামুরাই হয়ে যায়! যেটা তারা পার্লহার্বারে বোমা ফেলে দেখিয়েছিল। রুশদের থোতা ভেঙ্গে দিয়েছিল। চার বছর এশিয়া দখলে রেখেছিল। যখনই কোনো জাপানির সঙ্গে খিটিমিটি হয়েছে ওদের আচরণে বুঝতাম প্রতিপক্ষ আসল জাপানি নয়, মাফ চেয়ে সরে যেতাম। তাই বলে চড়-থাপ্পড় মারিনি তা নয়। সেইসময় আমি একটু মেজাজীও ছিলাম। জাপানি জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাসটা জানি বলেই তারা কখনো আমাকে ঘাঁটাতো না, এখন তো নয়ই।

সে যাক, ওই একবারই শ্বশুরমশাই আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আগলে ছিলেন আমার পিতার মতোই আমাকে। একদিন না গেলে অস্থির হয়ে যেতেন, ফোন করতেন কোথায় আছি? কিছু হলো কিনা আবার চিন্তা করতেন। তখন তরুণ আমি পত্রিকা বের করছি, সভাসেমিনার করছি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠন করেছি, আওয়ামী রাজনীতি করছি, এরশাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, প্রভাবশালী বাংলাদেশ সোসাইটি জাপান নামক সংস্থার সক্রিয় কর্মী, আদালতে জাপানি-বাংলা ভাষার দোভাষীর কাজ করছি আবার গবেষণাও করছি চাকরি-বাকরি-সংসারের পাশাপাশি। কী প্রচন্ড ব্যস্ত তখন জাপানে আমি ১৯৮৭ থেকে এক টানা ২০০৪ সাল পর্যন্ত যারা দেখেছেন তারাই জানেন। তবুও সপ্তাহে শনি বা রবিবার বা জাতীয় ছুটির দিনে তাঁকে সময় দিতেই হতো। এর প্রধান কারণও ছিল, জাপানিরা সাধারণত ছেলেসন্তানের সঙ্গে মদপানে আনন্দ পান। এটা জাপানি জাতির প্রাচীন রীতি। এই সঙ্গটার জন্য তিনি প্রতীক্ষায় থাকতেন। আমি অফিস থেকে ফেরার পথে ঢু দিতাম। এক গ্লাস বিয়ার অন্তত চিয়ার্স করে বাসায় ফিরতাম। ছুটির দিনে তো কথাই নেই। সবাই মিলে শ্বশুরমশাইয়ের বাসায় বসে তিন-চার ঘন্টা খানাপিনা চলতো। কী আনন্দেই না সময়টা কেটেছে আমার! আহা, ভাবতে পারি না। বড় আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি, পরিবার নিয়ে আনন্দে কাটাবেন বলে তোচিগি জেলার বিখ্যাত স্বাস্থ্যকর পাহাড়ি জায়গা নাসু কোওগেন গ্রামে ‘বেস্সোও’ বা ‘সামার হাউস’ কিনেছিলেন। দুকামরার ছোট্ট নিটোল একটি বাড়ি। চারদিকে খোলা। সামনে রাস্তা পেছনে ধানীক্ষেত, সবুজ গ্রাম। একেবারে বাংলাদেশের মতো। গ্রীষ্মকালের দীর্ঘ ছুটিতে এবং শীতকালেও দু-তিন দিন কাটাতাম সেখানে। সেখানে শুয়ে বসে লেপটপে অনেক লেখা লিখেছি। তাঁর বদান্যতার শেষ নেই। একবার আমার কাগজ ‘মানচিত্র’ যখন ট্যাবলয়েড ছিল প্রেসে দিয়ে ফেলেছি, ছাপা হচ্ছে কিন্তু টাকা জোগাড় করতে পারছি না। স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে গেলাম তাঁর কাছে, শুনে কালবিলম্ব না করে ৬০,০০০ ইয়েন দিয়ে দিলেন! নিদারুণ এক লজ্জার হাত থেকে বাঁচালেন তিনি আমাকে, সময়টা ১৯৯২-৯৩ হবে।

আমার শ্বশুরমশাইয়ের তিনটি শখ ছিল। এক. বেইজ বল খেলা দেখা। দুই. মাছ ধরা। তিন. ভ্রমণ করা। খেলাধুলা আমি খুব একটা পছন্দ করি না। আলাপ জমতো না। তবে মাছ ধরতে গিয়েছি নদীতে মাঝেমাঝে। যদিও তিনি সদলবলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতেন। আর ছিল ভ্রমণের নেশা। প্রায়শ বন্ধুদের সঙ্গে এখানে সেখানে চলে যেতেন। ব্যবসা দেখতেন শাশুড়ি। কত জায়গায় যে আমাদেরকে নিজে ড্রাইভ করে নিয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। বিখ্যাত সব পর্যটন কেন্দ্র জাপানের। একরাত্রি অনছেন রিয়োকো হোটেলে আনন্দফুর্তি করে পরের দিন ফিরতাম। ৪০ডিগ্রি গরম জলের বাথটাবে শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে নগ্ন শরীরে বসে গল্প করেছি। অবশ্য আরও জাপানি পুরুষরাও ছিলেন। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে উষ্ণ প্রস্রবণ বা পাবলিক স্নানাগারে স্নান করা জাপানি রীতি, মহিলাদের ক্ষেত্রেও তাই। তবে স্নানাগারগুলো পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদাভাবে নির্দিষ্ট। কোথাও কোথাও নরনারী একসঙ্গে নগ্নদেহে উষ্ণজলের আরাম গ্রহণ করার স্নানাগারও ব্যতিক্রম কিছু নয় এদেশে। জাতিগতভাবে জাপানিরা যৌনতার বিষয়ে উদার, প্রকৃতিজাত স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই বিশ্বাস করে। তবে নোংরামি একদম পছন্দ করে না।

শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে শুধু দুজনেও অনেক জায়গায় বেড়াতে গেছি। বিয়ারের সঙ্গে ‘ইয়াকি জানাকা’ বা ‘পোড়া মাছ’ নিজিমাসু খেয়েছি। খুবই নরম সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছ এটা। টোকিওতে আমার বাসস্থান ওহানাজায়া শহরের কাছেই রয়েছে টোকিওর বিখ্যাত একটি শহর আসাকুসা তারপর উয়েনো এই দুই শহরে গ্রীষ্মকালে মাঝে মাঝে শনিবার বা রবিবারে সাইকেলে চড়ে আমি, শ্বশুরমশাই, আমার মেয়ে টিনা ও শ্যালিকার ছেলে ইউদাই বেড়াতে গিয়েছি। ওরা তখন ছোট। সেখানে দুজনে বিয়ার আর ‘ইয়াকিতোরি’বা ‘কাঠিতে পোড়ানো মুরগির মাংশ’ খেয়ে বাসায় ফিরেছি। ফিরে আবার আড্ডা শাশুড়িমা, আমার স্ত্রী ও শ্যালিকা মিলে। বিয়ার, নিহোনশুউ, চুউহাই, রেডওয়াইনের সঙ্গে সুস্বাদু সুশি, সাশিমি (কাচা টুনা ও বুরি নামক সামুদ্রিক মাছের স্লাইস), আজি ও হোক্কে মাছের ভাজা, হোতাতে নামক শামুক, অক্টোপাসের সাশিমি আর সঙ্গে তো গ্রীন সালাদ আছেই। মাঝে মাঝে শাশুড়িমা ‘তেনপুরা’ করতেন এটা জাপানের অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার যা কিনা হাজে মাছ, গলদা চিংড়ি আর সবজির ফ্রাই, অনুপম সুস্বাদ এক জাপানি খাবার। সেইসঙ্গে নিহোন শুউ মদ একেবারে স্বর্গীয় স্বাদ যাকে বলে! উফ্ বেড়ালের মতো চেটেপুটে খাওয়া ছাড়া উপায় নেই! শীতের সময় ঘন হয়ে সবাই মিলে বসতাম শ্বশুরমশাই মধ্যমণি। জাপানিদের বাসায় ফ্রিজে মদ বিয়ার থাকাটা রীতি। তারপরও তিনি দামি শ্যাম্পেন কিনে আনতেন সেটা খুলে নিজেই আমাদের গ্লাসে ঢেলে দিতেন। শ্যাম্পেনের সেই স্বাদ এখনো যেন গলায় লেগে আছে!

মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় বা শ্যালিকার বাসায়ও আমাদের পারিবারিক সমাবেশ হতো। শাশুড়িমা নিজে কতকিছু তৈরি করে নিয়ে আসতেন, তার হাতে ভাজা ‘কারাআগে’ বা ‘মুরগিরি মাংশ ভাজা’ অসাধারণ! নোরিকো, হিসায়েও তৈরি করতো নানা পদ। অধিকাংশই কাচা না হয় আধা সিদ্ধ মাছ বলি আর মাংশ বলি! খাবারের শেষে থাকতো হোক্কাইদোও প্রদেশের বড় বড় সুস্বাদু ‘উমিগানি’ বা ‘সামুদ্রিক কাঁকড়া’ মেশানো গরম মিসো স্যুপ। অসামান্য এক স্বাদু তরল পদার্থ যেটা জাপানিদের রোজ না হলে চলে না। গ্রীষ্মকাল হলে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিতাম আমরা টিভি দেখে দেখে। বৃষ্টির দিনেও তিনি সাইকেলে চড়ে ঠিক চলে আসতেন সঙ্গে বিয়ারের কার্টুন। বসন্তের ‘হানামি তাইকান’ বা ‘সাকুরা ফুল দর্শন’, গ্রীষ্মের ‘হানাবি তাইকাই’ বা ‘আতসবাজির উৎসব’, হেমন্তের ‘কোওয়োও মাৎসুরি’ বা ‘লাল ম্যাপল পাতার সৌন্দর্য দর্শন’ যা জাপানি ইউনিক কালচার তার স্বাদ গ্রহণ করেছি বিখ্যাত জায়গাগুলোতে শ্বশুরমশাইয়ের কল্যাণেই। কত বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান তিনি ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন যেখানে যাওয়া খুবই ব্যয়বহুল! আহা, সেইদিনগুলো ছিল বড় আনন্দের! বড় সুখের! টসটসে রসালো, প্রেমাবেগে টইটম্বুর, রৌদ্রপ্রাণে তেজদীপ্ত! সব স্মৃতির জাদুঘরে জমা হয়ে গেছে।

বড় অকালে চলে গেলেন শ্বশুরমশাই মাত্র ৭৪ বছর বয়সে। যেখানে জাপানিদের গড়আয়ু এখন ৮০। ফুসফুসে ছিদ্র হলে পরে চিকিৎসার বাইরে চলে যায় তার অসুখ। কারণ ছেলেবেলা থেকেই হৃদরোগে ভুগছিলেন তিনি। নিয়মিত ওষুধ খেতেন। তারপরও তাঁর প্রাণশক্তি ছিল প্রচন্ড। সাইকেলে, বাইকে, গাড়িতে করে ফল ও সবজি শহরের বিভিন্ন জাপানি ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরন্টে সরবরাহ করতেন। প্রচন্ড পরিশ্রমী ছিলেন। শত শত মাইল তিনি একাই ড্রাইভ করতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা শক্তিশালী মদ নিহোন শুউ পান করতে পারতেন। পাড়ার পানশালাগুলোতে সন্ধের পর পান করতে যেতেন, গাইতেন গলা ছেড়ে ‘কারাওকে’ এনকা গান। এটা জাপানের শোওয়া যুগের (১৯২৬-৮৯) রীতি। এখনো প্রাণবন্ত এই প্রতিবেশী সম্পর্ক। জাপানিরা সহজে ‘নিনগেন কানকেই’ বা ‘মানবসম্পর্ক’ নষ্ট করতে নারাজ। ‘কিনজো ৎসুকিআই’ বা ‘প্রতিবেশী মেলামেশা’ তাদের অভূতপূর্ব সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

তিনি নেই বড় একাকী কাটে যখন জাপানে থাকি। বিদেশে এত চমৎকার দিলদরিয়া ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ড্রিঙ্কিং পার্টনার আর একজনকেই পেয়েছি রফিকুল আলমকে।

এই দিনে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। নিবেদন করি গভীর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।


লেখক পরিচিতি
প্রবীর বিকাশ সরকার
গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, গবেষক
জাপান  প্রবাসী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন