সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০১৪

তাহমিদুর রহমান এর গল্প - লাল ডায়েরি



মুক্তিযুদ্ধ দ্যাখেনি লিপু। তার জন্ম একবিংশ শতাব্দীতে তাই মুক্তিযুদ্ধ না দ্যাখাটাই স্বাভাবিক কিন্তু তার বাবা মাও মুক্তিযুদ্ধ দ্যাখেনি। তবে তার ভাগ্য ভালো তার দাদী মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে এবং মাঝে মাঝে লিপুর সাথে এ নিয়ে গল্পও করে। তবে দাদীকে নিয়ে লিপুর অনেক সমস্যা। গল্পের মাঝেই দাদী চোখ মোছা শুরু করে। তখন কী আর গল্প শোনা যায়? সে আরো লক্ষ্য করেছে দাদী মাঝে মাঝে মাগো, ওরা বলে কবিতাটি আবৃত্তি করে। সে জানে না এ কবিতার কবি কে? কিন্তু সামনে পেলে সে খুব করে তাকে বকে দিত, দাদীকে শুধু কাঁদায়। দাদী যেন না কাঁদে সেজন্যে সেও গল্প বলা শুরু করে। এক দেশে ছিল এক রাজা আর ছিল তার এক রানী। একদিন হল কী এক দৈত্য রানীকে অপহরণ করে নিয়ে গেল। তারপর রাজ্যে নেমে এল শোক......। দাদী বেশিক্ষণ গল্প শুনতে পারে না, এর মধ্যেই ঘুমিয়ে যায়। প্রত্যেকদিন ঘুমানোর আগে প্রায়ই এমন হয়। সে যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করল তখন থেকে বাবা মার কাছ থেকে দাদীর কাছে ঘুমায়। এখন সে অনেক বড় হয়ে গেছে, ইচ্ছা করলেই একা ঘুমাতে পারে কিন্তু সে একা শোয় না। তার কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। আজ যেমন বিছানায় শুয়েই দাদীকে একটা প্রশ্ন করে বসে,

-দাদী একটা প্রশ্নের উত্তর দিবা?
-কী প্রশ্ন দাদু ভাই?
-না আগে উত্তর দিবা কিনা বল?
দাদী লিপুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-অবশ্যই দিব দাদু ভাই।
-ঐ লাল ডায়েরিটা কার?
দাদী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
-ডায়েরি? ওটা তোমার চাচার।
-চাচার? যে চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিল?
-হুম। সেই চাচা যার জন্যে রাজাকাররা তোমার দাদাকে ধরে নিয়ে গেছিল। তারপর আর খোঁজ খবর পাই নাই।
রাজাকার শব্দটা লিপুর কাছে এখন অনেক পরিচিত। এদের এখন বিচার হচ্ছে, খবরে দেখায়। সে আবার প্রশ্ন করে,
-তুমি তখন কোথায় ছিলে?
-আমি? আমি তখন বাপের বাড়ি। তোমার বাপ তখন আমার পেটে। তোমার দাদাকে ছাড়াই ভারতে পালাইয়া গেছিলাম আমরা সবাই।
-ও।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সে। এসব কথা সে বহুবার শুনেছে। কিন্তু সে তার আসল উদ্দেশ্য ভুলে না। তার আসল আগ্রহ সেই লাল ডায়েরি। এই লাল ডায়েরি সবসময় দাদীর ট্রাংকে থাকে। মাঝে মাঝে বের করে চোখ মুছে। যখন ছোট ছিল তখন কিছু মনে হত না কিন্তু এখন লিপুর জানা দরকার ডায়েরিটাতে আসলে কি আছে?   
-দাদী ডায়েরীটা আমাকে পড়তে দিবা?
-অবশ্যই পড়বে তবে এখন না, আরো বড় হয়ে নাও।

লিপু আর কিছু বলে না কিন্তু চুরি করে হলেও সে পড়বে বলে মনস্থির করে। কিভাবে চুরি করে পড়বে সেটার প্ল্যান করতে করতে ঘুমিয়ে যায় সে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্যাখে দাদী পাশে নেই। ঘুমে টলতে টলতে দরজা খুলে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করে,
-          মামনি, দাদী কই?
-          তোমার দাদী? তোমার বাবার সাথে ডায়েবেটিস চেক করাতে গেছে।
-         
সে আবার ঘুমে টলতে টলতে বিছানায় এসে শোয়। ওদিকে মা চেঁচাচ্ছেন, খবরদার লিপু আর বিছানায় না, যাও তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে পড়তে বস। সে তেমন পাত্তা দেয়না। বিছানায় শুয়ে কী মনে করে দাদীর বালিশের নিচে হাত দেয়। চাবির ছোঁয়া পেতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে সে। দাদী ভুল করে চাবি রেখে গেছে। দ্রুত বিছানার নিচ থেকে ট্রাংকটা বের করে সে। কাপড় চোপড় কিছু উল্টোতেই পেয়ে যায় সেই লাল ডায়েরি। চোখ কচলিয়ে ডায়েরি খুলে পড়তে থাকে সে।

প্রথম পাতা

মা তোমাকেই লিখছি। তোমাকেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মা। আমি তোমাকে না বলে চলে এসেছিলাম সেজন্যে নিশ্চয় আমার উপর রাগ করেছ। কিন্তু কী করব বল? তুমি জানলে কি আসতে দিতে? যদি বলতাম মা আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব, তুমি যেতে দিতে? ক্ষমা কর মা। তোমার জন্যই আমার এত সাহস। দেখ একদিন জয় নিয়েই বাসায় ফিরব।


দ্বিতীয় পাতা

মা আজ আমার মনটা অনেক ভাল। মনে হচ্ছে ভাল ট্রেনিং নিতে পেরেছি। আমাদের কমান্ডারও খুব ভাল। নিজের ভাইয়ের মত দ্যাখে।
আচ্ছা মা বাসায় যে কুমড়ো গাছটা লাগিয়ে এসেছিলাম সেটাতে নিশ্চয় এতদিনে ফুল ফুটেছে। কুমড়ো ধরলে দেখ বেশ মিষ্টি হবে। কুমড়োর ভারে নুয়ে পড়তে পারে গাছটা তাই বাবাকে বলে বাঁশ দিয়ে ঠ্যাকা দিয়ে দিবে। আর সজনে গাছটাও নিশ্চয় সজনে দিতে শুরু করেছে। প্রত্যেকদিন ট্রেনিং নেই আর এইসব স্বপ্ন দেখি মা। তোমরা নিশ্চয় ভাল আছ। তোমার হাতের রান্না করা বড়ির চচ্চড়ি কতদিন খায়না। ট্রেনিং শেষেই ফিরব মা, চিন্তা করো না।

তৃতীয় পাতা

মা আজ প্রথম এ্যাকশনে গিয়েছিলাম। সে কী উত্তেজনা মা। দেখ এখনো লোম খাড়া হয়ে আছে আমার। আমরা সবাই ভালভাবে আবার ক্যাম্পে ফিরে এসেছি। পাকিস্তানী কুত্তাগুলো আমাদের কিছুই করতে পারেনি। খুব ঘুম পেয়েছে মা। পরে তোমায় বলব।

চতুর্থ পাতা

ভুলতে পারছি না। কিছুতেই ভুলতে পারছি না। আমাদের রাজন......। মা আমার চোখের সামনে গুলি...। তারপরও একটুও বুঝতে দেয়নি। যখন আমরা পিছু হটছিলাম তখন ওকে ডাকলাম। দেখি কথা বলে না। কমান্ডার সুজন ভাই আজ আমারে টেনে না আনলে আমিও......। ভাবতে পারছি না মা। কান্না পাচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছে। তোমরা কেমন আছ মা? তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছে।

পঞ্চম আর ষষ্ঠ পাতার মাঝে রক্তের দাগ। লিপু হাত দিয়ে দ্যাগে। শুকনো রক্ত কিন্তু এখনো বোঝা যায়।

সপ্তম পাতা

সামনে অনেক মৃত্যু দেখলাম। এখন মনে হয় শক্ত হয়ে গেছি। কিছু মনে হয় না, কিছুতেই কিছু যায় আসে না। এমন নয় যে কোন অনুভূতি নেই কিন্তু মনে হচ্ছে থেকেও নেই। প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যু খবর শুনি, এটাও একটা কারণ হতে পারে। আজ আমার ডিউটি পড়েছিল নদীর পাশে। পাকিস্তানীগুলো পানিকে যে এত ভয় পায় আগে জানতাম না। তারা পিছু সরেছে। আমরা প্রতীক্ষায় আছি, কখন ওরা আসবে কিংবা আমরা ওদের আক্রমন করব?

অষ্টম পাতা

 আজ যা দেখলাম তা কী কোনদিন ভুলতে পারব? স্কুলটার প্রত্যেকটা ঘরে মেঝেতে জমাট বাধা রক্ত। রক্তের মাঝে মাঝে বুটের দাগ। হ্যাঁ কিছু খালি পায়ের দাগও দ্যাখা যায়। শরীরের ক্ষতবিক্ষত অঙ্গ প্রতঙ্গ পড়ে আছে এদিক ওদিক। এমনকি মানুষের মাথার মগজ পর্যন্ত। মানুষের ব্যবহার্য জিনিসেরও অভাব নেই। ছেড়া শাড়ি, সেন্ডেল, অলঙ্কার, গামছা। রক্তের দাগ প্রমাণ দেয় টেনে হিঁচড়ে লাশগুলোকে নিয়ে গেছে এখান থেকে। এরা কি মানুষ? এসব দেখে কাজল কান্না ধরে রাখতে পারল না। ও আমাদের দলের সবচেয়ে ছোট। সেকি কান্না! আমরা ঠিক করেছি ওকে এসব অপারেশনে আর নিয়ে যাব না।

নবম পাতা

কাজলকে কত বারণ করেছিলাম। কিন্তু শুনল না, এ্যাকশনে সে যাবেই। আজ ওকে কবর দিয়ে ফিরছি। এখন আর কান্না পায় না। কান্নারাও কাঁদতে ভুলে গেছে। ওর পকেটে একটা চিঠি পেয়েছিলাম। ওর বোনকে লেখা। বেচারা বোনকে অনেক ভালবাসত। চিঠিটা ওর কবরেই রেখে দিছি। সুখে থাক কাজল। তোর কথা মনে রাখব। খুব মনে রাখব।

দশম পাতা

ভেবেছিলাম অনেক লিখব মা। ডায়েরি সাথে রেখেছি সেজন্যেই। কিন্তু বেশি লিখতে পারলাম না। এই লেখা যখন লিখছি তখন আমি গুলিবদ্ধ। মা কষ্ট পেয় না। কত ছেলে মারা গেল আমার মত। তবে তোমার ছেলে মরার আগে শখানেক পাকিস্তানীদের মেরেছে। চিন্তা করো না মা। এখানে একটা ক্যাম্পে ডাক্তার আছে, বলছে বেঁচে যাব কিন্তু আমি জানি বাঁচব না। ফজরের আজানটার জন্যে অপেক্ষা করছি।
নারিকেলের নাড়ু খাওয়া হল না মা। তোমার হাতের চাল ভাজাও আর খাওয়া হল না। দুঃখ আমার এই একটাই। তোমার কোলে শুয়ে যদি মরতে পারতাম মা!

আচ্ছা যাও এইসব কথা বলে তোমাকে কষ্ট না দেই। বরং সোমেনের কথা বলি। ওর মত মজার ছেলে আর হয় না। শত কষ্টের মাঝে আমাদের সবাইকে হাসাত। একটা জোকস সে প্রায়ই বলত। তোমাকে বলি শোন, এক ছিল শিক্ষক। সে তার এক ছাত্র কে নিমাই বলে ডাকত। সেই ছাত্র একদিন শিক্ষককে জিজ্ঞেস করল, স্যার আমাকে নিমাই ডাকেন কেন? আমার নামত নিমাই না, আমার নাম নিজাম। তখন শিক্ষক বলল, তুই আমাকে প্রতিদিন নিমাই পাতা এনেদিস তাই তোকে নিমাই বলি। তখন ছাত্রটি উত্তর দিল, স্যার তাহলে আমি আপনাকে জাম পাতা এনে দিব, আমাকে এখন থেকে জামাই বলে ডাকবেন। হা হা হা......। মা তুমি হাসছ। নিশ্চয় হাসছ।


এরপর কলমের আঁকি বুকি। হয়ত তার লিখতে কষ্ট হচ্ছিল। তারপর ছোট ছোট করে লেখা,

সময় হয়ে গেছে মা। সময় হয়ে গেছে। বিদায় মা। ভাল থেক।



পড়া শেষ হতেই ঘরে ঢুকে দাদী। দ্যাখে লিপু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন