মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

তারাপদ রায়ের গল্প কৃষ্ণলক্ষ্মী

ক্রিস্টাইন মনরো, নাম শুনে মনে হতে পারে পরমা সুন্দরী। মেরিলিন মনরোর আত্মীয়া। কিন্তু তা নয়। সে একটি কলহ পরায়ণা অথচ নরম মনের কালো মেয়ে। কালো তা সে যতই কালো হোক, তার থেকেও সে অনেক বেশি কালো। চেহারায়, চরিত্রে। অকালমৃতা চিত্রতারকা স্বপ্নসুন্দরী মেরিলিন মনরোর সঙ্গে তার কোনও তুলনাই হয় না।

ক্রিষ্টাইন মনরোকে পাড়ার আট-দশ জনের মতো আমরাও ডাকতাম ক্রিষ বলে। এই ‘ক্রিষ’ বানানে ‘ৃ’ ফলা দিয়ে ‘ক’, তার পরে ‘শ’ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু তার চেহারার সঙ্গে মিল দিতে গেলে হাস্যকর হবে। তবে আমার বাঙাল উচ্চারণে বোধহয় ‘ক্রিষ’ আর ‘কৃশ’ এই দুই শব্দের বিশেষ কোনও পার্থক্য থাকে না।


সে যা হোক, ক্রিষ এ দেশের মেয়ে নয়। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল মার্কিন দেশের পশ্চিম উপকূলে এক বিখ্যাত উপনগরীতে। সে বাড়ি বাড়ি কাজ করে বেড়াত। ঘর ঝাড়া, বাসন মাজা, কাপড় কাচা— ঠিক এখানে ঠিকে ঝি-রা বাড়ি বাড়ি ঘুরে যেমন কাজ করে। ও দেশে সবই প্রায় মেশিনে হয়— কাপড় কাচার মেশিন, বাসন মাজার মেশিন, ঘর ঝাড়ার ভ্যাকুয়াম মেশিন, এমনকী মশলা গুঁড়ো করার মেশিন, তরকারি কোটার মেশিন। কাজের মেয়েরা মেশিনে এই সব কাজ সারতে একটা বাড়িতে আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের বেশি সময় নিত না। প্রত্যেক দিন আসত না। এক দিন অন্তর কিংবা সপ্তাহে দু’দিন। তাতেই তাদের মাস মাইনে ভারতীয় টাকার অঙ্কে বহু হাজার টাকা দাঁড়াত।

আমরা তখন থাকতাম একটা কাঠের বাড়িতে, একতলায়। কাঠের বারান্দাওলা বাড়ি। সামনে কাঠের রেলিং। মাটি থেকে প্রায় আট ফুট উঁচু। নড়বড়ে রেলিং, বেশি ভর দিতে নেই। তবে পুরনো দিনের বারান্দাটা খুব আরামদায়ক। সারা দিন রোদ আসে। হালকা শীতের দেশে খুব ভাল লাগে। সকালে, দুপুরে একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকতে থাকতে কখনও চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ি।

ক্রিষের একটা পুরনো শিভ্রোলে গাড়ি আছে। বিশেষ চলে না। মাঝে মাঝে দেখি রাস্তা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের মহিলা সুযোগ পেলেই তাকে ধমকে দেন। সে কিন্তু গাড়ি ছাড়ে না। এটাতেই যাতায়াত বা ঠেলাঠেলি করে। মাঝে মাঝে তার গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। পাড়ার লোকেরা তার গাড়িটাকে চিনে ফেলেছে। হর্ন-এর বাজনা সহজে থামে না। তারা রাগারাগি করে। হাসাহাসিও করে।

ক্রিষেরা থাকে আমাদের অঞ্চল থেকে অদূরে সমুদ্রের কাছে। একটা পুরনো পাড়ায়। তারা বহু পুরুষ ধরে এ শহরে থাকে। লোকের মুখে মুখে তাদের জায়গার নাম ওল্ড টাউন। পৃথিবীর সব জায়গাতেই এ রকম হয়। আদি শহর গড়ে ওঠে জলাজঙ্গলের মধ্যে। তার পর ধীরে ধীরে নতুন শহর আসে। পুরনো শহরে প্রথম দিকে লোকেরা ঘিঞ্জি বাড়িতে সংকীর্ণ গলির মধ্যে বসবাস করে। অদূরে নতুন আধুনিক শহর গড়ে ওঠে।

এই পুরনো শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একেবারে ঘিঞ্জি পাড়ায় ক্রিষেরা থাকে। ক্রিষদের বাড়িতে ছোটবড় অনেকগুলি ছেলেমেয়ে ভাইবোন মিলে দশ-বারো জন হবে। ক্রিষের বাবা গুণ্ডা ধরনের লোক। কথায় কথায় রাস্তাঘাটে, ফুটবল মাঠে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। আজ কিছু দিন জেলে আছে। এ বার সহজে ছাড়া পাবে না।

এ দিকে ক্রিষের মা যে কোথায়, তা কেউ জানে না। ক্রিষের ছোট বোন দু’বছর হল নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মেয়েদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বেশ সাধারণ ব্যাপার। অনেক সংসার উচ্ছন্নে চলে যায়। তবে ক্রিষ সংসারের হাল ধরেছে। ভাইবোনদের শাসন করে ভালবেসে, কোলেপিঠে করে বড় করছে। তবে সবাই মানুষ হয়নি। মানুষ হয়ও না। এক দিন ক্রিষ আমার কাছে অভিযোগ করেছিল তার পরের যে ভাই, তার থেকে মাত্র বছর তিনেকের ছোট, সেই তাকে গড়েপিঠে মানুষ করার চেষ্টা করছে। সে সন্ধ্যাবেলা মদ খেয়ে এসে ক্রিষকে একা ঘরে পেয়ে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল।

এ সব ঘটনা বলায় ক্রিষের তেমন কোনও দ্বিধা ছিল না। পরের দিন কাজ করতে এসে আমাকে বলেছিল, জানো ড্যাড, ও আমাকে রেপ করা চেষ্টা করেছিল। এ সব আমার জানার কথা নয়, শোনার কথা নয়। কিন্তু ক্রিষ আমাকে বলত।

ক্রিষের কাজ ছিল আমাদের বাড়িতে সপ্তাহে তিন দিন— সোম, বুধ, শুক্রবার। এ সব দিন সাতসকালে সে তার ভাঙা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। তার হাতের কাজ ছিল যেমন ক্ষিপ্র, তেমনই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমার স্ত্রী মিনতি অবশ্য তাকে খুব পছন্দ করত না। বড় বেশি মাথা গলাত মিনতির রান্নাবান্নায়। কোনও মহিলাই রান্নার কাজে অন্যের মাথা গলানো মোটেই পছন্দ করে না। তার কাজ ভাল ছিল এবং সে বিশ্বাসী ছিল। এ ছাড়া সে অনেক রকম খুটখাট কাজ জানত। ওখানেও বাড়িতে বিদ্যুৎ হঠাৎ হঠাৎ অফ হয়ে যেত। আমাদের এখানকার মতোই অনেক দিনের পুরনো লাইন বেশ খারাপ হয়। এ ছাড়া প্রেশার কুকারের ঢাকনি আটকে গেলে সেটা খোলা, ছুঁচের মধ্যে সুতো পরানো, সিলিং-এর ইলেকট্রিক বাল্ব ফিউজ হলে সেটা বদলানো মিনতির সাধ্য ছিল না। আমারও আয়ত্ত নেই, চেষ্টাও করিনি। সেই সেই সময়ে ক্রিষের খোঁজ পড়ত।

এই রকম খোঁজ করতে গিয়ে রীতিমত গোলমালে পড়েছিলাম। এক দিন সন্ধেবেলা মিনতির সুটকেসের ডালাটা খুলছিল না। আমরা দু’জনেই জানি ক্রিষের এই ডালা খুলতে পাঁচ মিনিটও লাগবে না। তার হাতে নানা রকম কায়দা। জোরও সাংঘাতিক।

ক্রিষের ঠিকানা ও ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল। তার বাড়ি যদিও চিনি না, তবু তাদের এলাকায় গিয়ে তাকে খোঁজ করতে পারতাম। কিন্তু ক্রিষ আমাকে বারবার নিষেধ করেছে তাদের বাড়িতে, পাড়ায় যেতে। বলেছে, ড্যাড তুমি ওখানে যেও না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে যাবে না। ওরা দুর্দান্ত। সব নাইফার। তখন নাইফার মানে জানতাম না। পরে জেনেছি, নাইফার হল তারা, যারা নাইফ নিয়ে অর্থাৎ ছুরি নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি করে।

আমার যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু আজ বাধ্য হয়ে ক্রিষকে ফোন করতে হল। ফোন করে ভয়ানক ভুল করেছিলাম। ফোনটা প্রথমে কিছুক্ষণ বাজল। তার পর ঘটাং করে কেটে গেল। যেন কেউ তুলে রেখে দিল। ওইটুকু সময়ের মধ্যে দারুণ হইচই, চিৎকার চেঁচামেচি, গালাগাল কানে এসে পৌঁছল। এ দিকে আবার ফোন করব কি না ভাবছি, ফোনটা নিজেই বেজে উঠল। আমি ফোন ধরতেই আবার সেই চিৎকার চেঁচামেচি, হইহল্লা। হইহল্লা ছাপিয়ে ক্রিষের কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। অত্যন্ত ক্রদ্ধ এবং উত্তেজিত কণ্ঠ। সে কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করছে। বুঝতে পারলাম আমাকেই। নিশ্চয়ই টেলিফোনের ডায়ালে আমার ফোন নম্বর দেখেছে। কিন্তু আমার ওপর রাগটা কেন, সেটা বুঝতে পারলাম না। বিশেষত, তার বিজাতীয় ভাষায় তাড়াতাড়ি যা বলছিল এবং তার ঘরের মধ্যে যে পরিমাণ গোলমাল চলছিল তার মধ্যে কিছু বোঝা কঠিন। আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। মিনতির সুটকেসের তালা হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে হল।

পর দিন সকালবেলা ক্রিষ এসে হাজির। একমাথা না আঁচড়ানো কোঁকড়া চুল, চোখ ছলোছলো। সে এসে গতকাল রাতে ফোনে অসভ্যতা করার কথা স্বীকার করে ক্ষমা চাইল। একটু পরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আগের দিন রাতে কেনই বা অমন আচরণ করেছিল কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু এটুকু অনুমান করতে পারলাম, আগের রাতের ঘটনার জন্য অনুশোচনা করছে। চুপ করে রইলাম। সত্যি, কিছু বলার ছিল না। এ বার কান্না থামিয়ে চোখের জল মুছে সে আমাকে বলল, ড্যাড, সত্যি তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ? দু-তিন বার এ রকম বলার পরে আমি তখন বললাম, তুমি এমন কী করেছ, তোমাকে ক্ষমা করতে হবে? ক্রিষ কবুল করল, আমি খুব খারাপ মেয়ে, মদ খাই, হাসিস খাই, বন্ধুদের নিয়ে হল্লা করি। একটু থেমে সে বলল, হাসিস খেলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। তা ছাড়া কাল রাত্রে তোমার ফোনটা যখন এল, ফোনটা ধরে আমার হাতে দিয়ে বলল, এই নে, তোকে কোনও এক খদ্দের খুঁজছে। আমার সেই বন্ধু জর্জ, তাকে সঙ্গে সঙ্গে একটা লাথি মেরেছি। এই ঘটনার পর ক্রিষের সঙ্গে আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সপ্তাহে তিন দিন এমনিতে সে আমাদের বাড়ির কাজে আসত। আধ ঘণ্টাখানেক সময় সে বাড়ির মধ্যে ঝড় তুলে কাজ করত। তার পর সময় বাঁচলে আমাদের সঙ্গে বসে গল্পগুজব করত।

প্রত্যেক বার কলকাতা থেকে ফেরার সময় মিনতি মুড়ির মোয়া, নারকেল নাড়ু এ সব নিয়ে যেত। সেগুলো দু-একটা টুকটাক সে ক্রিষকে দিয়েছে। ক্রিষের জন্যে মায়া হত। অনেক এলেবেলে উল্টোপাল্টা কথা বলত। দুপুরবেলা যখন কাজ সেরে নিজের ডেরায় ফিরত আমাদের বাড়ির বারান্দায় আমি ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমোতাম কিংবা খবরের কাগজ পড়তাম। কোনও কোনও দিন হাতে সময় থাকলে ফুটপাথের পাশে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা থেকে আমাকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলত— ড্যাড, ও ড্যাড, দরজা খুলে রেখে বাইরের বারান্দায় ঘুমিও না। মা এখন ঘুমোবে। বাইরের দরজা খোলা রেখো না। যাও, ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়ো।

এক এক দিন হাত ভর্তি পামফল কিংবা ছোট ছোট কাঁচা টোম্যাটো নিয়ে আসত। বুড়ি ঠাকুমার মতো সেগুলো রান্নাঘরে তরকারির আলমারিতে গুছিয়ে রাখত। ছোট টোম্যাটো, কাঁচা পামফল এই সব তরকারির মধ্যে দিতে বলত। বলত, বেশি মাংস খাবে না।

দরজা খোলা দেখে এক একদিন রাগারাগি করত, এটা কি তোমাদের দেশ ইণ্ডিয়া নাকি? এখানে কত চোর, ডাকাত জানো? ওকে অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করিনি, আমাদের কলকাতাতেও চোর ডাকাতের কোনও অভাব নেই। বস্তি এলাকাগুলো মার্কিনি কৃষ্ণাঙ্গপল্লির চেয়ে নিরাপদ নয়।

এর মধ্যে এক দিন একটা ঘটনা ঘটল। আমি স্বচক্ষে এমন দৃশ্য কখনও দেখিনি। তন্দ্রাঘোরে যেমন অন্যান্য দিন দুপুরে বারান্দার চেয়ারে শুয়ে থাকি সেদিনও তাই হয়েছিল। হঠাৎ দ্রুত গুলির শব্দ। এক জন লোক, অল্পবয়সী যুবক দেখলেই মনে হয় গুণ্ডা গুণ্ডা ভাব, রাস্তা দিয়ে উদ্যত রিভলভার নিয়ে আমাদের বাড়ির পিছন দিকে ছুটে গেল। রাস্তায় গাড়িঘোড়া থমকে থেমে গেছে। পথচারী লোকজন ত্র্যস্ত ভাবে এ দিক-ও দিক লুকোনোর চেষ্টা করছে। কেউই জানে না, কী ব্যাপার। এক নিমেষের মধ্যে পুলিশের গাড়ি ছুটে এল। সশস্ত্র গাড়ি থেকে লাফিয়ে আমাদের পাশের গলিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকল। তাদের মাথার ওপরে পাহারা দিতে লাগল বন্দুকধারীরা। একটু পরে গুলির লড়াই, অত্যন্ত অসম লড়াই এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি অ্যাম্বুলেন্স এল, ষ্ট্রেচারে করে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে একটি দেহ নিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে গেল। তখনও আমাদের দেশের মতোই চার দিক থেকে লোকজন ছুটে আসছে গুলিযুদ্ধ দেখার জন্য। আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হয়ে গেল। পুলিশ আমাদের বারান্দায় এসে বলে গেল, তোমার তো সাহস খুব। গুলি চলার সময় ঘরে চলে যাওনি কেন? আমি পুলিশের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলাম। মিনতি তখন ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। ‘এখন অবশ্য তোমরা নিরাপদ’, এই বলে পুলিশ চলে গেল।

যা জানতে পারলাম স্যাম বলে এক সদ্য যুবক ধীরে ধীরে দুর্দান্ত ক্রিমিন্যাল হয়ে উঠছিল। সে বড় রাস্তায় একটি ব্যাঙ্ক লুঠ করে আমাদের গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। এ রকম তো কতই হয়। বিকেলের মধ্যে আমরা ঘটনাটা প্রায় ভুলে গেলাম। ঘুরে এসে দেখি, বন্ধ ঘরের সামনে বারান্দায় সিঁড়ির ওপর বসে ক্রিষ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখটোখ মুছে সে বলল, তার বন্ধু স্যাম আজ দুপুরে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। আমি বললাম, সে তো আমাদের বাড়ির পিছনেই! তখন ক্রিষের খেয়াল হল। হ্যাঁ, ও যে গলির কথা বলছে, সেটা ঠিক আমাদের পিছনেই। সে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জানাল, স্যাম তার বাল্যবন্ধু। আজ বছর দুয়েক হল সে সাংঘাতিক বখে গিয়েছে। আজকে যে ব্যাঙ্ক ডাকাতি করতে গিয়েছিল এটাই বোধহয় তার প্রথম চেষ্টা। স্যামের মতো ভাল ছেলে যাতে খুব কিছু অন্যায় না করে, তাই ভগবান তাকে কাছে টেনে নিলেন।

ক্রিষের কাহিনি শুনে আমার স্ত্রী মিনতির চোখ ছলছল করছিল। তার পর ক্রিষকে ডেকে তুলে নিয়ে ভিতরের ঘরে গেল। যেখানে মিনতির পুজোর জায়গা আছে। সারা পৃথিবীর যে কোনও জায়গাতেই যাক, তার সঙ্গে একটা সুটকেস থাকে ঘরের কোনায় অল্প একটু জায়গায়। সুটকেস থেকে জিনিসগুলো বের করে সাজায়। সেগুলো পুজোর জিনিস— লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কালী এই সব ছবি। পিতলের মূর্তি থাকে। পুজো হয়, আবার যেগুলো বেশি আছে, যেমন ছোট ছোট পিতলের লক্ষ্মী বা গণেশ মূর্তি, তার দু’একটা মিনতি ভালবেসে কাউকে কাউকে উপহার দেয়। কালীঘাট মন্দিরের পাশে ফুটপাথের অনেক দোকানে এই সব ঢেলে পাইকারি দরে বিক্রি হয়। ওর থেকে একটা পিতলের লক্ষ্মী খুব ছোট যা হাতব্যাগে রাখা যায়, ক্রিষকে মিনতি উপহার দিল। তাকে বোঝানো হল, তুমি হলে কালোলক্ষ্মী আর এ হল সোনালক্ষ্মী।

আমাদের প্রবাসের দিন শেষ হয়ে এল। ক্রিষ আমাদের বাড়ির সঙ্গে অন্তরঙ্গ মিশে গেছে। দুপুরে কাজ সেরে ফেরার পথে অনেকক্ষণ বসে যেত। আমাদের খাওয়ার সময় থাকলে একটা বাটিতে ডালভাত নিয়ে আমাদের মতোই মেখে খেত। মিনতির কাছ থেকে বেসন দিয়ে বেগুনভাজা এমনকী সর্ষে বাটা দিয়ে স্যামন মাছের ঝোল রান্না করা সে শিখেছিল। চমৎকার হাত ছিল রান্নার। আমরা ভালবেসে খেয়েছি।

আমাদের পল্লীগাঁয়ে পুরনো দিনের পুকুরঘাটের মতো বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে সে কত রকম যে গল্প করত। এক বার বলেছিল, আমার গায়ের রং কালো হলে কী হবে, আমার গায়ে খাঁটি বিলিতি সাহেবের রক্ত আছে। এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। সে কিন্তু মাতা মেরীর নামে শপথ করে বলল, ঘটনাটা শুনলে বুঝতে পারবে। এর পরে যা বলল, তার ঠাকুমা-ঠাকুরদা এক পর্যটক সাহেবকে কেটে খেয়েছিল।

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে এই কাহিনি। এ রকম আরও অনেক কাহিনি কৃষ্ণলক্ষ্মী আমাদের বলেছে। বার্কলে ডয়েট রোডে হালকা শীতে দূর থেকে প্রশান্ত সাগরের খাঁড়ির বাতাস আসছে ধেয়ে ধেয়ে। কয়েকটা সমুদ্র চিল আকাশে ঘুরে ঘুরে উড়ছে। এক সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণা কৃষ্ণবালিকা অতীত ভবিষ্যৎ কত কী নিয়ে কত রকম কথা বলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাতব্যাগ থেকে পিতলের লক্ষ্মীটা বার করে তাকে চুমু খাচ্ছে। এই লক্ষ্মীর পরে মিনতি তাকে একটা রুদ্রাক্ষের মালা দিয়েছিল। সেটা সব সময় গলায় পরা থাকত। আমাকে বলেছিল, ওর ছেলে বন্ধুরা এমনকী মেয়ে বন্ধুরাও চেষ্টা করে এই মালাটা নিয়ে নিতে।

আমাদের ফিরে আসার দু’দিন আগে থেকেই কৃষ্ণলক্ষ্মী নিরুদ্দেশ। যাওয়ার আগে সে আর দেখা করতে আসেনি। আশা করেছিলাম, অন্তত এক বার মুখ দেখিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিল না। সানফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে প্লেন রাত এগারোটায়। আজকাল সিকিউরিটি চেকিংয়ের জন্য তিন ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছতে হয়। পৌঁছে শুল্ক, অভিবাসন, নিরাপত্তা এই সব মিটিয়ে বিমানের দিকে এগোচ্ছি, এতক্ষণ ব্যস্ততায় ও উত্তেজনায় খেয়াল করিনি বিমানঘাটের প্রবেশপথ দিয়ে সামুদ্রিক বাতাস আসছে, হঠাৎ ক্রিষের গলা শুনতে পেলাম। কৃষ্ণলক্ষ্মী মিনতিকে ‘মম, মম’ করে ডাকছে। মিনতি ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্রিষকে দেখতে পেল। আমারও চোখে পড়ল। ক্রিষ হাত নাড়ছে। হাত নাড়ছে। কিন্তু আমাদের আর কিছু করার নেই। বিমান থেকে ডাক পড়েছে। ধীরে ধীরে বিমানের দিকে এগোলাম। কৃষ্ণলক্ষ্মী বিলীয়মান হতে লাগল। সে তার হাত লম্বা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কত আর লম্বা হবে! ড্যাড ড্যাড, মম মম— চিৎকার আর কানে আসছে না। আমরা উড়োজাহাজের গহ্বরে ঢুকে গেছি।

মিনতি ক্রিষের জন্যে লুকিয়ে চারটে নারকেলের নাড়ু এনেছিল। এগুলো বহু কষ্টে রক্ষা করা। এগুলো নিয়ে প্লেনে ওঠাও বে-আইনি। তবু সুকৌশলে বিমানের লোকদের চোখ এড়িয়ে এনেছিল। কৃষ্ণলক্ষ্মী যে সত্যিই দেখা করবে না সেটা ভাবেনি। এখন কৃষ্ণলক্ষ্মীর ডাক শুনে আর নাড়ুগুলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। বিমানের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মিনতি হাত জোড় করে বিড়বিড় করে তার ব্যাগের থেকে সোনার লক্ষ্মীকে বার করে বলল, সোনালক্ষ্মী আমার কালোলক্ষ্মীকে ভাল রেখো।

1 টি মন্তব্য:

  1. কী সহজ স্বচ্ছন্দ লেখা... নিজের মতো করে কাউকে ভালবাসলে বুঝি এমন করে লেখা যায়...
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন