মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

শমীক ঘোষের গল্প : একটি অতিলৌকিক কথন অথবা নিছক কইমাছ

পেটোর খোল থেকে কালি তুলে সেজেছে আকাশ। কালো হেলমেটের মত আঁটোসাঁটো, অমনই চাপা। খুব জোরে একটা ঢিল তুলে ছুঁড়ে মারলে ঠক করে শব্দ হবে যেন। ততটাই শক্ত। মরে যাওয়া কালো হিম জমে জমে আকাশ হয়ে গিয়েছে। মধ্য রাত্রের নিভে যাওয়া শহরের, একটা দুটো জেগে থাকা আলো প্রতিফলিত হয়ে আবছা সাদা পোঁচ ফেলেছে কালো রাতের উপর। ফ্যাকাশে মরা একটা চাঁদ। আর তার একটু নিচে, ঠিক আকাশের ঢাল বেয়েই গড়িয়ে নেমে আসছে কালো বলের মত তিনটে পেটো।


আবছা অন্ধকারে সুবল, বাঁ হাতটা মুখের কাছে তুলে নিয়ে আসে। যেন সে সময়কেও থমকে দিতে চায়। স্তব্ধ করে দিতে চায় বোমার এই অনিবার্য পতন। কয়েকটা পল, যেন মহাকালের সমস্ত নিয়মকে তছনছ করে ব্রহ্মাণ্ডের বয়সের মত অনন্ত হয়ে উঠতে চায়।

তিন তিনটে বোমা শরীরে ফাটলে, রক্ত ছিটে উঠে চাঁদের গায়ে লেগে যাবে ।

মানুষটা যেন আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। আটকে থাকতে চায় রেললাইনের পাথরের গায়ে। সে যাবে না। কিছুতেই যাবে না। অথচ প্রায় জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে চারজনে। তাদের পায়ে লেগে রেললাইনের পাথর সরে গিয়ে সর সর শব্দ করছে।

ঋজু সরল রেখা কয়েকটা রেললাইন। দূরে দূরে হলুদ বালবের আলোয় জেগে আছে কোথাও কোথাও। আবার অমোঘ নিয়মে অন্ধকারেও আছে। একটা মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে চারজন। যেন অনেক পুরোনো ধূসর একটা ছবি, হঠাৎ জীবন্ত হয়েছে। একটু পিছনে একটা হাঁড়ি হাতে আরো একজন। আর একদম পিছনে সুবল।

মানুষটা হাত পা ছুঁড়ছে। একটানা মার খেয়ে তার মুখের কষে জমা রক্তের দাগ। দাঁত গুলো ভাঙা। একঘেয়ে বেসুরো সে বলে যাচ্ছে। “ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, আর করব না। মায়ের কিরা, ছেড়ে দে।”

দাঁড়াল তারা– এই খানেই সুবলা।

সুবল অপ্রকৃতিস্থ কিছুটা। মাথা ঝুলে গিয়ে, টেনে টেনে শরীরটাকে যেন নিয়ে যাচ্ছিল। এইখানে? হ্যাঁ বে এইখানে।

কিছুটা বাথরুমের গন্ধ। রেল লাইনের ধারে পড়ে থাকা গুটখার প্যাকেট, প্লাস্টিক, স্যানিটারি ন্যাপকিন, একটা দুটো ব্যবহৃত কন্ডোম। মরা চাঁদ আর দূরের হলুদ বালব জায়গাটায় কিছুটা ছায়া, কিছুটা আলো তৈরী করেছিল। সুবল দাঁড়াল। দেশলাই ঠোকার সামান্য আওয়াজ, একটু আলো ফেলল তার কালো মুখের উপর। তারপর নিভে গিয়ে শুধু লাল একটা সামান্য বিন্দু। সিগারেট জ্বলছে।

মানুষটাকে ওরা উপুড় করে দিয়েছিল। বাঁধা হাতটার মধ্যে দিয়ে দুটো হাত ঢুকিয়ে একজন নিশ্চিত করছিল মানুষটার না দাঁড়ানো, না শোয়া অবস্থান। মানুষটা খুব জোরে কঁকিয়ে উঠছিল। ছেড়ে দে মায়ের কিরা, ছেড়ে দে। সুবল নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। তার পেশী টানটান হয়ে উঠেছে। অপ্রকৃতিস্থ অবস্থাটা যেন আর নেই। জোরে টান দিল সিগারেটের। ছাই ঝাড়ল টোকা মেরে। তারপর দ্রুত বসিয়ে দিল লোকটার কপালে। বাঁ চোখের উপর।

আহহহহ । দীর্ঘ আর্তনাদ, চ্যাপ্টা রেললাইনের ধরে, ব্যাঙবাজি করার চ্যাটোলোইটের মত লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে যেতে হোঁচট খেয়ে পড়ল লাইনের উপর।

হেবো এগিয়ে এসেছে। মাটির হাঁড়িটার মধ্যে আস্তে লাফাচ্ছে কয়েকটা কইমাছ। জ্যান্ত। জল নেই, তবু বাতাসে বেঁচে থাকার প্রাণপন চেষ্টা।

লোকটা মাথা ঝাঁকাচ্ছে খুব জোরে। একজন কষিয়ে তাকে একটা ঘুঁষি মারল। তারপর দু দিক থেকে মাথাটা চেপে ধরল। আরেকজন ততক্ষণে খুলে ফেলেছে লিউকোপ্লাস্ট। সুহাস দ্রুত একটা বসিয়ে দিল সিগারেটটা, কপালের উপর।

আহহহহক। আর্তনাদ করতে চাওয়া লোকটার চোয়াল চেপে ধরল একহাতে। দাঁতের মাঝে আঙুলের চাপ নিশ্চিত করল লোকটার হাঁ মুখ । প্রায় নিঃশব্দে ছোঁ মারার মত, একটা কই মাছ তুলে সুবল ঢুকিয়ে দিল মুখে ভিতর। তারপর খুব জোরে চেপে মুখটা বন্ধ করে রাখল।

জিভের লালায় জলের আর্দ্রতা, আর্দ্রতা টাকরায় গলায়। বোকা কই মাছ জলের সন্ধানে কানকো মারতে মারতে, আলজিভ-গলা-পাকস্থলির উপরিভাগ ছিন্নভিন্ন করতে করতে নামতে লাগল। ততক্ষণে চেপে ধরা মুখে লিউকোপ্লাস্টের আঁটোসাঁটো বাঁধুনি লেগে গিয়েছে। সাদা লিউকোপ্লাস্ট ততক্ষণে লাল হয়ে উঠেছে ভলক ভলক রক্তে। লোকটার চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়।

ছাড়।

ছেড়ে দেওয়া লোকটা উন্মত্ত ষাঁড়ের মত টলতে টলতে পাক খেতে খেতে, গোঙানিতে রক্তে ভাসতে ভাসতে, রেললাইনের পাথর ছিটকোতে ছিটকোতে, রেললাইনে মাথা ঠুকতে লাগল। মৃত্যু তার কাছে এলানো তাকিয়ায় মাথা রাখা নরম হিম নয়। মৃত্যু আসলে বহুক্ষণ ধরে প্রবল যন্ত্রণায় মাথা খোঁড়া সুনিশ্চিত।

সুবল আবার সিগারেট ধরাল। প্যান্টের জিপার খুলে হালকা হতে হতে, সে মোবাইলের বোতাম টিপে কানে দিল। হালকা গলায় বলল, “কই করা হয়ে গিয়েছে।”

ছিন্নভিন্ন কয়েকটা মেঘ, কবন্ধের মত উদ্দেশ্যহীন উড়ে যাচ্ছিল আকাশে। স্ট্রিটল্যাম্পের সাদা আলো ঘন হতে হতে দুধের সরের ঔজ্জ্বল্য দিয়েছিল সামনের রাস্তার ত্বকে। সুবল বাড়ি ফিরছিল। একা টলতে টলতে। ধাক্কা খাচ্ছিল দেওয়ালে দেওয়ালে। গত দু’রাত সে বাড়ি ফেরেনি। সেই রকমই বলা ছিল পার্টির দাদা’দের। এখনো খাতায় কলমে সে অ্যাবস্কন্ডিং। যদিও অসুবিধা নেই। খুনের লাশ শেষ অবধি মিশে যায় ট্রেনে কাটা লাশের দলে। পচে কয়েকদিন মর্গে, তারপর শ্মশানে পুড়ে বায়বীয় হয়ে যায়। আজকের লাশটাও হয়ত যাবে। রাতে গভীর। ঘুমিয়ে পড়েছে বস্তির সব ঘর, শুধু দূর থেকে টিভির চাপা শব্দ ভেসে আসে। হিন্দি ছবির ডায়লগ রাতের বস্তির ভিতর গুমরায়।

সুবল এসে দাঁড়ায় ঘরের দরজায়। ছোট ছোট টোকা মারে দরজার টিনে।

কে, মায়ের চাপা গলা শোনা যায়।

আমি, খোল।

দরজা খোলে। ঘরের ভিতর ঘর দেখা যায় চাপা অন্ধকারে। তক্তপোশের উপর মশারি টাঙিয়ে শুয়ে আছে দাদা আর তার বউ। নিচে মেঝেতে অন্য মশারির ভিতর একপাশে বোন শুয়ে আছে। মাঝে মার জায়গাটা খালি। আরেকপাশে সুবলের শোয়ার জায়গা। তক্তপোশের দিকে মাথা দিয়ে মেঝেতে আড়াআড়ি।

পকেটের ভাঁজ থেকে কাটা পিস্তলটা বার করে সুবল। তারও নিচে টাকাগুলো গোঁজা। কয়েকটা নোট সে গুঁজে দেয় মায়ের হাতে। নিঃশব্দ সেই রাতে মায়ের চোখে চোখ রাখে সুবল। মা’ই চোখ নামিয়ে নেয়। কোন কথা হয় না দু’জনের। সুবল শুয়ে পড়ে।

নেশার ঘোর কাটেনি। তার উপর রক্তপাতের উত্তেজনা। সুবল স্থির হয়ে শোয়। কই করার পর তারা গিয়েছিল মেড়োবুড়ির ঠেকে। চোলাইয়ের ঠেক তখন ভেঙে এসেছে। নেহাতই অচেতন কিছু মাতাল রিকশাচালক ঠেলাওয়ালা তখন নেশার ঘোরে উলটে পড়ে আছে। এদিক ওদিক নুন, কাঁচালঙ্কার অবশেষ ছিটিয়ে রয়েছে। বুড়ি তাদের ঢুকিয়ে দেয় ঘরের ভিতরে। প্লাস্টিক বস্তার পর্দা টেনে দেয়। বুড়োদা আসে না এইখানে, পার্টির বারণ। বুড়োদা শুধু টাকা পাঠিয়ে দেয় মেড়োবুড়িকে। মাদুরের উপর রাখা ছিল বিরিয়ানির প্যাকেট।

টাকা কটা গুনে, জামা বদলে সুবল বিরিয়ানির প্যাকেট খোলে। সাদা সাদা চাল, তার উপর কয়েকটা হলুদ চাল এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভাতের ভিতর একটা আস্ত মুরগির ঠ্যাং। এক গ্রাসে অনেকটা ভাত মুখে তোলে সুবল। তারপর চুমুক দেয় বোতলে। অন্ধকার ঘরটায় বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ সুবলের মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। খুব ছোট তখন সে, বস্তির কয়েকটা ছেলে তাকে জোর করে ঠেলে দিয়েছিল খোলা ম্যানহোলের ভিতর। পচা গন্ধ, কালো নোংরা জল। অন্ধকার, আর মাথার উপরে গোল একটা আকাশ। ছেলেগুলো হাসছিল। আর মাঝে মাঝে ঢিল ছুঁড়ে মারছিল তার দিকে। সুবলের প্রবল রাগ হল। শক্ত হয়ে উঠল পেশীগুলো। আর প্রায় তখনই মুখে মধ্যে একটা অদ্ভুত নোনা ঝাঁঝালো স্বাদ পেল সে। ঠিক যেন দাঁত দিয়ে রক্ত পড়ছে। গিলে ফেলে সুবল। হাত দেয় মুখের ভিতর। বোঝার চেষ্টা করে মুখের ভিতর কোথাও কেটে গিয়েছে কিনা। বুঝতে পারে না। অবাক হয়। আবার গ্রাস তোলে। বিরিয়ানির ভিতর রক্তের গন্ধ পায় সুহাস। অবিকল রক্ত যেন কেউ ছিটিয়ে দিয়েছে বিরিয়ানির ভিতর। থু করে ফেলে। স্লা। কি করছিস বে। কে যেন একটা বলে ওঠে। সে বিরিয়ানির প্যাকেটটা হাতে নেয়। ঘেঁটে দেখতে চায় ভাতগুলো। মুখের কাছে তুলে গন্ধ শোঁকে। বিরিয়ানি স্বাভাবিক মনে হয় তার। সুবল বোতলটা দেখে। তরল খয়েরি পানীয়, মদের ঝাঁঝালো গন্ধ পায়। চুমুক দেয় সুবল। খুন তার জীবনে নতুন কিছু নয়। বিরক্ত হয়ে ওঠে। ঘাম হচ্ছে তার। তার মনে হচ্ছে গলার টাকরায় কি যেন একটা আটকে গেছে। গিলতে পারছে না। সুবল। টাকাগুলো পকেটে নিয়ে নেয়।বিরিয়ানিটা আর খায় না। বাইরে বেরিয়ে শেষ একবার সে চোখ ফিরিয়েছিল ঘরের ভিতর। অবাক হয়ে দেখেছিল, ঘরের মধ্যের নেশায় আসক্ত হয়ে প্রায় অন্ধকারে জড়াজড়ি করে বসে আছে কতকগুলো মানুষ। আর বিরিয়ানির মুরগীর দুটো টুকরো প্যাকেটের বাইরে এসে ডানা ঝাপটানোর মত উড়ে বেড়াচ্ছে ঘরের ভিতর।

সামান্য আওয়াজ হয় তক্তপোশের উপর। চুড়ির আওয়াজ যেন। ফিসফাস আওয়াজ শোনে মেয়েলি কন্ঠে। সুবল নড়ে বসে। তার রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। তক্তপোশের শব্দে নারী পুরুষের আদিম ইচ্ছে তার শরীরেও প্রবাহিত হয়। সুবল দেখে, মা চোখে উপর হাত দেওয়া, ঘুমোচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। আরো দূরে বোনকে দেখা যাচ্ছে না। তক্তপোশে সামান্য দুলুনির আভাস। সুবলের রাগ হয়। ইচ্ছা হয় কাটা পিস্তলটা খুলে চালিয়ে দেয় তক্তপোশের উপর। অশ্লীল একটা শব্দ উচ্চারণ করবার ইচ্ছা হয় । সে উঠে বসে। তক্তপোশের আওয়াজ থেমে যায়। চুড়ির আওয়াজ হয়। দ্রুত চাদর টেনে নেওয়ার শব্দ। সুবলের শরীরের রক্ত খুব জোরে বইতে শুরু করে। আর ঠিক তখনই সে আবার রক্তের গন্ধ পায়। জিভের উপর একটা পিছল নোনতা স্বাদ। ঘন একটা তরলে যেন ভরে যাচ্ছে মুখের ভিতর।

অক্ষম রাগে সুবলের শরীরটা টান টান হয়ে ওঠে। দরজাটা খুলে বেরোনোর সময় সে যেন অন্ধকারে দেখে তক্তপোশের উপর দু’টো শরীর নড়তে শুরু করেছে।

বাইরে বেরিয়ে আসে সুবল। তার শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রাস্তাটা টলমল করে উঠছে। আশেপাশের ঘরের দেওয়ালে ভূমিকম্পের আভাস। সুবল ভয় পায়। হাত দিয়ে ভর দেয় দেওয়ালে। চোখ কচলায়। না সব স্থির। নেশা বেশী হয়ে গিয়েছে স্লা, সে ভাবে। মুখের ভিতর রক্তের স্বাদ যেন টের পায়। এগিয়ে আসে ড্রেনের কাছে। কাঁচা ড্রেনের ভিতর কালো জল, এখানে ওখানে পাঁক জমে আছে। কালো সেই পাঁকের উপর চিক চিক করছে চাঁদের একটা ডিম্বাকৃতি ছায়া। সুবল বমি করার চেষ্টা করে অনেক্ষণ ধরে। বমি হয় না। থুতু ফেলে। আর সেই থুথু ড্রেনের জল স্পর্শ করা মাত্র যেন লাল হয়ে ভেসে যেতে থাকে গোটা ড্রেনটা। দূরের স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোর সামান্য চলকে আসে গলির মুখ অবধি। ঘোলাটে একটা কালো অবয়ব গোটা গলি জুড়ে। আর ড্রেনটা যেন চকচকে অবাস্তব লাল। লাল ঘন রক্ত যেন স্রোত কেটে কেটে ভেসে যাচ্ছে ড্রেন জুড়ে।

সুবল এগিয়ে যেতে থাকে। ঘন সাদা স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোয় উদ্ভাসিত সব কিছু। সুবল হঠাৎ লক্ষ্য করে তার ছায়া হারিয়ে গিয়েছে। সে পিছনে ফিরে ছায়াটা খোঁজার চেষ্টা করে। নেই। অবাক লাগে তার। এইসব কি হচ্ছে। তবে কি পাগলিয়ে গেল সে? নাকি নেশা বেশী হয়ে গেছে?

ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করে সে। মনে পড়ে তক্তপোশের দুলুনি। আবার রাগ হয় তার। দূরে গায়ে গা ঘষছে দুটো কুকুর। মাঝে মাঝে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপাচ্ছে একজন আরেকজনের শরীরে। সুবল তার রাগের একটা অভিমুখ খুঁজে পায়। এদিক সেদিক তাকিয়ে আধলা ইট তুলে নেয় একটা। চুক চুক করে শব্দ করে মুখে। কুকর দুটো এগিয়ে আসে। ল্যাজ নাড়ে। একটা কুকুর মুখটা তুলে ছোট্ট ডাক ছাড়ে আহ্লাদের। সুহাস হঠাৎ ইটটা ছুড়ে মারে তার দিকে। কুকুরটা সরে যেত চায়। পুরোটা পারে না। ইটটা তার মাথা আর ঘাড়ে মাঝামাঝি গিয়ে লাগে। কেঁউ কেঁউ! কুকুরটা শব্দ করে ওঠে। তারপর দৌড়ানোর চেষ্টা করে খানিক দূরে। আরেকটা কুকুর তার শরীরটা শোঁকে। তারপর সুবলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে।

আহত কুকুরটা বমি করতে থাকে। সুবল স্পষ্ট দেখতে পায়- কুকুরদুটোর কানদুটো লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তাদের শরীরটা যেন সবুজ হয়ে জ্বলছে। আর কুকরটার বমির মধ্যে থেকে ভক ভক করে বার হচ্ছে অসংখ্য রক্তাক্ত কইমাছ। পড়ে ছটফট করছে বমির ভিতর।

সুবলের শরীরটা ছেড়ে দেয়। সে কোন মতে নিজেকে টেনে নিয়ে আসে বন্ধ মুদির দোকানের সামনের রকটায়। তারপরে শুয়ে পড়ে। অসম্ভব গরম একটা শরীর যেন সামান্য তাপ দিয়ে দেয় স্তব্ধ মাটিকে। সুবলের মনে হয় মাটিটা যেন ভীষণ ঠাণ্ডা। আর ঠাণ্ডা সেই শীতলতা যেন তার রোমকুপ দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। সুবল চোখ বোজে। মেঝেটা যেন নরম হয়ে আসে। শীতলতায় হারিয়ে যায় সুবল।

রাত ক্রমশ ভোরের দিকে এগোয়। ফ্যাকাশে চাঁদটা হেলতে হেলতে সরে যায় দিগন্তের দিকে। শহরের আলোগুলো কমে আসে আরো। আর স্ট্রীটল্যাম্পের আলোটা হঠাৎ যেন হালকা বিষণ্ণ হয়ে যেতে থাকে। আহত কুকুরটা হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে যায়। তারপরেই পড়ে যায় পাশ ফিরে। মাদি কুকুরটা সরে আসে তার দিকে। মুখ উচু করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে ওঠে। তারপর হাতপা মুড়ে শুয়ে পড়ে মৃত সঙ্গীর শরীরে চিবুক রেখে। এমন সময় আকাশে একটা ছোট্ট সাদা মেঘ হঠাৎ কালো হতে থাকে। এবং ধীরে ধীরে নেমে আসতে থাকে মাটির দিকে।

শহরের খুব কাছে চলে এলে দেখা যায় মেঘটা মোষের অবয়ব নিয়েছে। পিছনে যেন একটা ছোট্ট লেজ আছে তার। এমন সময় বিদ্যুতের মত স্ট্রীট ল্যাম্পের আলো বারবার চমকায়। আর ধূসর ঘূর্ণি বাতাস কুকুরটার পাশ থেকে উড়তে শুরু করে। এর পর যা দেখা যায় তা খানিক আলো খানিক অন্ধকার। আলোর ছটার মত এক পুরুষ ডানা মেলে নেমে আসেন মেঘের ভিতর থেকে। সুবলের শরীর স্পর্শ করেন তিনি। পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেন মাথায়। এই সময় মৃত কুকুরটা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে। তার লোম এবং লেজটা খাড়া হয়ে যায়। জ্যোতির্ময় সেই পুরুষ ঘুমন্ত সুবলের বুকের উপর আড়াআড়ি হাত দুটো নিয়ে আসেন। তারপর বুকের থেকে সমান্তরাল দূরত্বে নিয়ে আসেন হাত দুটো। কালো রোঁয়ার মত অসংখ্য সুতো যেন বেরিয়ে আসতে থাকে ঘুমন্ত সুবলের শরীর থেকে। তার শরীর উদ্ভাসিত হয় আলোয়। মানুষটা খুব ধীর গলায় উচ্চারণ করেন – অত্তাং উপমং কত্বা ন হনেয্য ন ঘাতয়ে। সবাইকে নিজের মত ভাব, কাউকে মেরো না মারতে দিয়ো না। একটা ঘড়ির মত কিছু বার করে আনেন তিনি পোষাকের ভিতর থেকে। সুবলের মাথার একটু উপরে রাখেন। ঘড়িটা আশ্চর্য ভাবে ভেসে থাকে বাতাসে। তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। হঠাৎ সব আলো নিভে যায়। মৃত কুকুরটা আবার ধুপ করে পড়ে যায় মাটিতে। শুধু তার শরীরে লোম খাড়া ছিল খানিক্ষণ যা তার সঙ্গিনী শুঁকে দেখেছিল। স্ট্রীট ল্যাম্পটা দপ দপ করে ওঠে আবার। তারপর জ্বলতেই থাকে।

ঘুম ভাঙার পর একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা গ্রাস করে সুবলকে। তার মনে হয় যেন বুকের ভিতর সব হালকা হয়ে গেছে। সুবল উঠে বসে। তার শরীর হালকা লাগে। বেলা হয়েছে। মুখের ভিতর রক্তের স্বাদটা টের পায় সুবল। থু করে থুতু ফেলে একটু দূরে। কোন রক্তাভাব নেই। সুবল চোখ তোলে। রোদের গায়ে নরম ভাব নেই। মুদির দোকানটা খুলে গিয়েছে। চোখাচুখি হওয়ায় মুদি চোখ সরিয়ে নেয়। বস্তির লোকজন বেরিয়ে এসেছে বাইরে। গুলতানি মারছে ছেলেরা। দূরে রাস্তার উপর মরা কুকুরটা পড়ে রয়েছে। তার মুখে কাছে বমি আর রক্ত। একটু দূরে মাদি কুকুরটা বসে আছে। তার চোখে ঘোলাটে বিষন্নতা। সুবলের মন খারাপ লাগে। সে ধীরে ধীরে হেঁটে যায় মরা কুকুরটার কাছে। হাত রাখে মাথায়। তার চোখে সামান্য জল। মাদী কুকরটা খুব ধীরে একটা শব্দ করে ওঠে। সুবল পিছনে ফিরে দেখে আসে পাশের মানুষগুলো অবাক চোখে তাকে দেখছে।

সুবল লজ্জা পায়। কিছুটা অবাকও হয় সে। তার মনে পড়ে ছেলেবেলায় সে একটা কুকুরের ল্যাজে কালীপটকার প্যাকেট বেঁধে দিয়েছিল। আজ মরা কুকুরটার জন্য তার খারাপ লাগছে! সুবল ঘরে ফেরে। দেখে তার মা একা, স্টোভ ধরিয়েছে । সুবলের হঠাৎ খুব কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে। মনে হয় সে তার মাকে একবার জড়িয়ে ধরে। পরমূহুর্তে সে নিজেই অবাক হয়। নিজেকে সে চিমটি কেটে দেখতে চায়। তার মনে পড়ে গত রাত্রের কথা। গাটা গুলিয়ে ওঠে। বুকের কাছে একটা কষ্ট। তার মনে হয় যেন তার গলায় বিঁধতে বিঁধতে, চিরতে চিরতে নেমে যাচ্ছে পিচ্ছিল একটা কিছু। তার দমবন্ধ হয়ে আসে। গায়ে কাঁটা দেয়।

সুবল চিৎকার করে ওঠে, মা। মা অবাক হয়, তার চোখে ভয়।

-কি? সুবলের মা এগিয়ে আসে।

-কিছু না।

সুবল খুব অবাক চোখে লক্ষ করে মায়ের হাতদুটো যেন খুব শুকনো। যেন কাজ করে করে কড়া পড়ে গিয়েছে। সুবলের মনে পড়ে কাল রাতে মানুষটাকে যখন মারছিল, তখন তার চোখের ভয়টা কেমন ছিল। সুবল মাথা নাড়ায়। সে এইরকম কোনোদিন ভাবেনি।

অস্ফুটে সে বলে ওঠে, মার্ডার কেসে আমি আর নেই স্লা।

সারাদিন আর বাড়ি থেকে বার হতে পারে না সুবল। তার সারাদিন গলায় একটা খচখচে ব্যথা হতে থাকে। মাঝে মাঝে জিভের উপর মোটা একটা নোনতা রক্তের স্বাদ পায় সে। দু’তিন বার থুতু ফেলে দেখতে চায়। থুতুতে রক্ত নেই। অথচ সে রক্তের স্পষ্ট স্বাদ পায় জিভে। তার নাকেও রক্তের গন্ধ লাগা।

কাটা পিস্তলটা বার করে সুবল। খুলে দেখে গুলিগুলো তারপর বাইরে রেখে দেয়। এমন অবসন্ন তার লাগেনি কোনদিন। গা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে। তার করা খুন গুলো একের পর এক নাগাড়ে ঘটে যেতে থাকে তার চোখের সামনে। ইলেকশানের সময় সেই যে প্রথম পেটো মেরেছিল। বাচ্চা একটা ছেলের গায়ে লেগেছিল, পেটোটা ফাটার ঠিক আগে সেই বাচ্চাটা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়েছিল সুবলের দিকে। সুবলের গায়ে কাঁটা দেয়। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।

বিকেল নাগাদ আর পারে না সুবল। মোবাইলটা তুলে নেয়।

-বুড়োদা

-কে সুবল? তোকে মোবাইলে ফোন করতে বারণ করেছি না

-বুড়োদা একটু দরকার আছে

বল।

মানে বুড়োদা আমি...

কি বে বল।

মানে আমি কাল যদি...

ন্যাকামো করছিস কেন সুবল। টাকা দরকার?

-না বুড়োদা, মানে অন্য একটা কিছুকি জোগাড় করে দিতে পারেন, চাকরি টাকরি। আমার আর ভালো লাগছে না। ভয় করছে।

-সকালবেলা মাল খেয়েছিস নাকি?

-না মানে কাল রাত থেকে কি যেন একটা হচ্ছে।

-কি?

-ভয়

অন্যপ্রান্ত চুপ থাকে কিছুক্ষণ। তারপর শোনা যায় আটটা নাগাদ আয়। ক্লাবের পিছনের ঘরে, আমি থাকব। পিস্তলটা আছে তো?

-হ্যাঁ।

-ঠিক আছে।

মোবাইল কেটে যায়। একঘেয়ে একটা শব্দ হতেই থাকে। শব্দটা পাক খায় সুবলের মাথায়। বমি ভাবটা বাড়ছে। সুবল সত্যিই কিছু ঠাহর করতে পারে না। সে কি পাগলিয়ে গেল? যে সুবলের নামে পাঁচটা মার্ডার কেস আছে, আজ অবধি কেউ তাকে ধরেনি, সে হঠাৎ আজ ভয় পাচ্ছে কেন?

ক্লাব ঘরের ঠিক বাইরেটায় অনেকগুলো নতুন ছেলে। সুবল সোজা উঠে গেল দু’তলায়। পিছনের ঘরটার সামনে দু’টো ছেলে। সুবল এদের চেনে। হেবো আর পটলা। বাইরের ঘরের জানলাটা খোলা। সুবল আড়চোখে দেখে নিল। সুবলের দিকে তাকাল, চোখ টিপল, তারপর বলল কি স্লা!

ঘরের ভিতর একটা খুব মিষ্টি সেন্টের ঝাঁঝালো গন্ধ। বুড়োদা বসে আছেন। খুব আস্তে টিভি চলছে। টিভিতে ক্যাট্রিনার নাচ।

হাত দেখিয়ে ইশারা করল বুড়ো দা। বস।

সুবল আড়ষ্ট হয়ে বসল।

কিসের ভয় তোর?

না মানে।

হাসালি মাইরি। ভয় পাচ্ছিস তুই সুবল। ভয় তো তুই পাওয়াবি। ইলেকশন এগিয়ে আসছে। এখন আমাদের ভয় পাওয়াতে হবে। কালকের অ্যাকশনের পর ওদের ছেলেদের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে। কইমাছ হতে কেউ আর রাজী হবে না। বুড়োদা মুচকি হাসেন।

পিস্তলটা এনেছিস?

সুবল মাথা নাড়ায়।

কিসের ভয় তোর সুবল। খাচ্ছিস দাচ্ছিস। হঠাৎ কি হল তোর। প্রেমে ফ্রেমে পড়লি নাকি?

সুবল হাসার চেষ্টা করে। মুখ তুলে দেখে বুড়োদা একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। সুবলের ভয় করে ওঠে।

তোকে কি কেউ ভয় দেখাল? কিছু দেবে বলেছে? কি চাই তোর।

না বুড়োদা বিশ্বাস করুন সেই সব কিছু নয়।

আজ আবার যাবি। মার্ডার করতে হবে না। একজনকে চমকাতে হবে। এখন অ্যাকশনের সময়। এই সময় অনেক কাজ। এখন ওদের ভেঙে দিতে হবে। এখন ভিতু লোকেদের জন্য আমার সময় নেই সুবল। পার্টিরও নেই। বুড়োদার গলায় রাগ।

বুড়োদা মাথার পিছনের সিনারিটা রঙ যেন বদলাচ্ছে। সুবল ঠিক দেখতে পেল, সিনারির হরিণদুটো যেন সবুজ হয়ে গিয়েছে। তাদের সিং-এর বদলে সরু দু’টো কান। একটা হরিণ হঠাৎ বমি করতে লাগল। বমির মধ্যে খলবল খলবল করছে রক্তাক্ত কই মাছ।

সুবল হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর দরজা দিয়ে বাইরে আসার চেষ্টা করল।

দরজার বাইরে হেবো আর পটলা সুবলকে আটকাল। একজন ঘুষি কষাল তার মুখে।পটলা পিছন থেকে হাত আটকে পিস্তলটা বার করে নিল কোমরের ভিতর থেকে। ঠেলতে ঠেলতে ঢুকিয়ে দিল ঘরের ভিতর।

মাইরি তুই। হাসলেন বুড়োদা। হেবো একটা চড় কষাল গালে।

বোকাচোদা বিবেকানন্দ হবি নাকি রে হঠাৎ এত ভালো হওয়ার বাই চাপল কেন বে? বুড়োদার মুখে হাসি।

হেবো আর পটলা দু’জনেই হাসছে। হেবো দুই হাত দিয়ে মৈথুন সংকেত দেখাল।

সুবলের গলার ভিতর জ্বালা জ্বালা করছে। মুখের ভিতর নোনতা স্বাদ। সে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। পিছনের সিনারির রঙ বদলে ঘন লাল। অসংখ্য কইমাছ লাফাচ্ছে তার ভিতর। সুবল একটা ধাক্কা দিল। পিছন থেকে ধরে থাকা পটলা টলে গেল। সুবল সামনের হেবোর পেটের উপর ঘুঁষি মারল। তারপর লাফ দিয়ে সরে এল। বুড়োদা সরে গিয়েছেন। একটু এগিয়ে টেবিলের ড্রয়ারটা খুলছেন। সুবল জানে ওখানে একটা অটোমেটিক আছে। তাকে আরো তাড়াতাড়ি করতে হবে। পটলা সোজা হয়ে পিস্তল বার করেছে। সুবলের মনে হল যেন পিস্তল নয়, ছেলেটার হাতে একটা কালো কই মাছ খলবল করছে। সুবল ছেলেটার হাতে আড়াআড়ি লাথি মারল। পিস্তলটা ছিটকে গেল। সুবল সোজা ছিটকে বেরিয়ে ঝাঁপ দিল সামনের ঘরের খোলা জানলা দিয়ে।

ওপারে ডোবা। তারপর রেললাইন। হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে ডোবার উপর দিয়ে উঠে সুবল দৌড়াতে শুরু করল। পিছনে চার পাঁচটা ছেলে। সুবল আরো জোরে দৌড়তে লাগল। আপ লাইন ধরে ছুটে আসছে একটা ট্রেন। সুবল লাইন বদলাতে গিয়ে হোঁচট খেল। মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। উঠতে উঠতে দেখল প্রথম ছেলেটার হাতে ভোজালি। আর পিছনের সবার হাতে পেটো।

প্রথম ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেল। ট্রেনটা পাস করে গেছে। পেটোগুলো ছুঁড়ে দিল ওরা। আকাশের গা বেয়ে নেমে আসছে তিন তিনটে পেটো। সামান্য উপরে ফ্যাকাশে একটা চাঁদ। সুবলের মনে হল সে যেন একটা ঘড়ির কাঁটার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। আকাশে গায়ে যেন প্রকান্ড একটা ঘড়ি। একটা কাঁটা আরেকটা কাঁটাকে স্পর্শ করে দেবে যে কোন মুহূর্তে।








লেখক পরিচিতি

শমীক ঘোষ

গল্পকার। 
প্রবন্ধকার। 
পড়াশুনা ঃ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
বোম্বে ছেড়ে এখন কোলকাতায় থাকেন। 

1 টি মন্তব্য: