শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

মনজুরুল আজিম পলাশের গল্প : নক্ষত্রের মানুষ

গল্পের জন্যে কোনো ছদ্ধ নাম এদের নিতে হয়নি! অনিক বা শর্বরী! ছদ্ধনাম কখনই আসলের মত মনে হয়না! আর ছদ্ধ নামের পাত্র-পাত্রীর গল্প কখনো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না! মনে হয়- গল্প থেকে নামগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে! তাই, স্বাভাবিকভাবেই বাস্তব ছেলেটি এবং মেয়েটি এই গল্পের চরিত্র| গল্পের মত এরা ঘুরে বেড়াবে, কিছু কথা বলবে, তাকিয়ে থাকবে পরস্পর চোখের দিকে, কখনো কোনো কথা নয়, একটু গান শুনবে, তাকিয়ে দেখবে আশপাশ, খামাখাই ভালো লাগবে দুজনকে প্রেমের সময় যা হয়- এসব বিষয় আছে এখানেও!


তবু কোনো কোনো যোগাযোগে বা সম্পর্ক্যে বা গল্পে নক্ষত্রের একটা ভুমিকা থাকে! তখন হয়ত তা উল্লেখ করবার একটি গল্প হয়ে উঠে! মেয়েটি নক্ষত্রের সেই কথা আগাম জানিয়ে রেখেছিল ছেলেটিকে| বিজ্ঞান বা কুসংস্কার নিরপেক্ষভাবেই ছেলেটি বিশ্বাস করতে চেয়েছিল সেই কথা! একদিন লং ড্রাইভ করতে করতে ছেলেটি সেই কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিল মেয়েটিকে!

-তুমি নক্ষত্রের কথাটি কিভাবে বলতে পারলে? এত প্রাথমিক সময়ে?

-সেটা আমার কিন্তু মনে হয়েছিল! আমরা একই নক্ষত্রের তৈরী! অনেক সূক্ষতার মিল দেখে আমি তা বুঝেছিলাম!

-কিন্তু মানুষ তো আলাদা, মানে প্রতিটি মানুষ...

-আলাদা হয়েও কত এক দেখো! তোমাকে তো মনে হয় আমারি প্রতিফলন! কিংবা আমি তোমার! তাছাড়া আমার সেভাবে ভাবতে ভালো লেগেছে! তাই তোমাকে জানালাম অনায়াসে!

-ভাবছিলাম তখন, পৃথিবীর আদি অবস্থা থেকে আমাদের অস্তিত্ব ছিল! তারপর আমরা আবার আলাদা আলাদা অবয়ব পেলাম! কি আশ্চর্য... -তোমার ভালো লাগেনি জেনে!

মেয়েটি অনেকটা প্রশ্নহীন আত্ববিশ্বাসের সুরে শেষ কথাটি বলে তাকিয়ে থাকলো গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে! এত নিশ্চিত বিষয়ের কোনো উত্তর তার দরকার নেই! বরং খোপাটি খুলে দিয়ে চুলগুলোকে মুক্ত করলো সে! তার চুল উড়ছে! ছেলেটির প্রচন্ড অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব থাকলেও এই চুল উড়া দেখা বা মেয়েটির অন্যান্য সুক্ষ সৌন্দর্য্য উপভোগ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে না একফোটাও! বরং সব ভালোলাগা দৃশ্যমানভাবে বোঝাতে চায় সে সবসময়! ভাবে, যাকে ভালোলাগে তাকে সেটা জানাতে হবে! এটাকে ভাবনার সততা মনে করা যায়! সুতরাং চুল উড়তে থাকা মেয়েটিকে দেখে ছেলেটির স্বাভাবিক সন্তুষ্টি মেয়েটির মুখের মধ্যে আছড়ে পড়ল|

ছেলেটি এখন কথা না বলেই গাড়ি চালাবে! এরা বুঝতে পারে ঠিক কখন কথা বন্ধ করতে হবে! নিরবতার মধ্য দিয়ে যে একটা যোগাযোগ হতে পারে এটা এরা জানে! আরো জানে, কথা না বললেও ড্রাইভিং করবার সময় পারিপাশ্বিক দৃশ্যগুলো এদের সামনে দিয়ে চলে যাবার সময় প্রায় একই রকম চিন্তার অভিঘাত ও আলোড়ন তৈরী করবে! একটা অলৌকিকতার মত মনে হয় ব্যাপারটা দুজনের কাছে! অনেক আগে এই ঐক্য টের পাবার পর ভেতরে ভেতরে একটা আলাদা উত্তেজনা ওরা উপভোগ করে! যেন হারিয়ে আছে একজন একজনে! 

একটা ক্যারাভান দেখে ছেলেটি যা ভাবে মেয়েটিও কাছাকাছি কিছু ভাবে! একটা ক্যাম্পিং হয়ত কল্পনা করে! আবার অনেকগুলো চলে যাওয়া সাইনবোর্ড থেকে বেছে মেয়েটি যে সাইনবোর্ড-অংশ পরছে ছেলেটির নজর পরেছে হয়ত ঠিক সেটিতেই! অনেক দুরে একটা বৃক্ষ যে একা দাড়িয়ে নির্জনতাটা খান খান করে দিচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে দুজন একইসাথে! একটা ক্যানভাসের ছাদওয়ালা কালো গাড়ির চলে যাওয়া দেখে দুজনেই হয়ত ভাবে এইরকম একটা গাড়ি চালাতে হবে! 

আবার পাশ দিয়ে তুচ্ছ একটা পলিথিনের উড়ে যাওয়াও দেখেছে ওরা দুজন একসাথে! এরা বুঝতে পারে যে এরা এসব একই সাথে দেখতে বা বুঝতে পারে! তাই এই সব নিয়ে আলোচনা করে ওরা নির্জনতাটা ভেঙ্গে ফেলে না! কারণ যোগাযোগটা তো হচ্ছে! বরং কিছুটা ভীত হয়ে পরে এত সব ঐক্যের কারণে! এত এত মিল হবে কেন? কথা না বলেই বরং ওরা ঐক্যের ভীতিটা কিছুটা প্রশমন করে! বরং অনৈক্যের জায়গাগুলো নিয়ে তখন ওরা কথা বলে! এভাবে এরা একটু অনৈক্যের ভানও করে! একটা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র জানান দেয়ার মত! ঐক্যের মধ্যকার বিলীনতা থেকে 'নিজ' হয়ে বের হওয়ার জন্যে! এই জন্যে একত্রে থাকলেও যখনি ছেলেটি বা মেয়েটি একাকী হতে চায় দুজন বরং জায়গা দেয় দুজনকেই! তবু ঘুরে ফিরে বোঝা যায় আসলে ঐক্যটাই এদের বেশি! একক পরিভ্রমন থেকে এরা এভাবেই পরীক্ষিত ঐক্যের কাছে ফেরত আসে! মেয়েটি এতসব বুঝতে পেরেছিল বলেই নক্ষত্রের সেই কথাটা আগেই বলেছিল!

-একটা সিডি কিছু বাজাও!

মেয়েটি নিরবতা ভাঙ্গে! ছেলেটি বাংলা গানের একটি সিডি আলতো করে প্লেয়ারে ঢুকিয়ে দিতেই কিছু গান সেখানে বেজে উঠে যা ঠিক ওরা শুনছিল না! একটু পর সেই এলবাম থেকেই বেজে উঠলো 'এই পথ যদি না শেষ হয়...' গানটা| মুহুর্তের মধ্যেই এই সময়োপযোগী গানটিতে হারিয়ে গেল ছেলেটি-মেয়েটি! গানটি বেজে উঠার সময়টি নিয়ে প্রেম-সংস্কার থেকে মুক্ত হলনা ওরা কিছুতেই! বার বার এই গানটাই ওরা সেদিন বাজাতে থাকে! এত বার এই গানটি আগে শোনা হয়েছে কিন্তু তা দুজনের কাছেই এত প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি কখনো! 'যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়...' আহা ঠিক এই কথাটিই ওরা তখন ভাবছিল! তৃতীয় পক্ষের এই গানটি সেই সময় ওদের সম্পর্ক্যের একটি ভবিষ্যত ইঙ্গিত দিচ্ছিল! ঠিক সেই সময়েই ছেলেটি বা মেয়েটির মনে হয়েছিল এমন একটা পূর্ণতার সময় কেবল মনে হতে থাকে জীবনটা আগে কতটুকু অপূর্ণ ছিল! মানুষের জীবনে অপূর্ণতার সময়টাই কি বেশি হয়? কেন হবে তা? হলে তা মেনে নিতে হয় কেন? মানবিক কারণে না এটাও একটা মানবিক-অক্ষমতা! যে সমঝোতা নিজের বিরুদ্ধে যায় কেন তা বার বার মানুষকে করতে হবে? কিসের এত সন্মানের ভয় মানুষের? 

গানটা বাজতে বাজতে এইরকম কিছু বোধে আক্রান্ত হয় ছেলেটি এবং মেয়েটি! হয়ত আলাদাভাবে হয়তবা একত্রে বোধগুলো দুজনের মনটাকে আড়াল করে! একটু কালো মেঘ যেন চলে আসে! তবু গানটাই ওরা বাজায়! একবার ছেলেটি একবার মেয়েটি গানটা রিপিট করবার জন্যে নব ঠেলে দেয় বাম দিকে! আর কোনো গান সেদিন বাজেনি ওদের গাড়িতে! সেদিন একটা গান-ই জীবনের সবটা অর্থ হয়ে গেল যেন কেমন করে! মনে হলো, গান শুনবার জন্যেও কি তাহলে ব্যক্তিগত মুহূর্ত দরকার হয়? গানটা বাজতেই থাকে! কিন্তু গানটা বাজতে থাকলেও ওদের চলে আসার পথটা একসময় ফুরিয়ে যায়! এমন অপ্রত্যাশিত পথের সমাপ্তি বিশ্বাস করতে পারছিল না দুজনের একজনও! এটা একটা পরিনতি হলো? এমন ওরা চাচ্ছিল না!

-আবার দেখা হবে আমাদের!-গাড়ি থামার পর ওরা একপর্যায়ে একত্রে বলে উঠলো!

-নিশ্চয়ই!- এটাও প্রায় একত্রে বলে দুজন!

আসলে কোনো শেষ একক কথার বা বিদায়ের দায় নিতে চাচ্ছিল না এরা কেউ! ঠিক একটু পরে মেয়েটির চোখের কোনে নিরব জল আসবে, ছেলেটির বুকের ভেতর একটু কান্না! তবু মেয়েটি হেসে বলে উঠে- এইসব গল্পের কাছেই আমরা ফিরে যাব আবার দুজনে, কেমন?! ছেলেটি বলে- চল, তারচে গল্প গুলোকে আমরা বার বার নিয়ে আসব আমাদের কাছে! নিজেরাই জন্মাব গল্প হয়ে!

বিদায় বেলা ছেলেটি-মেয়েটি আরো বলতে থাকে! ঠিক কে আগে বা পরে বলছে বোঝা যাচ্ছে না!

-তুমি স্থির থেক, দেখবে সবকিছু তোমার কাছেই আসবে! গল্পরাও!

-ছুটব না তাহলে একটুও! গল্পের পেছনে?

-না!

-কিন্তু আমি যে পারিনা, এত এত কিছু আমার চারদিকে থাকে, যেতে যে হয় বার বার! আমার নাকি অনেক প্রয়োজন...

-অন্যের প্রয়োজন তুমি কিভাবে হতে পারবে? তাকেই তার প্রয়োজন করে তোলো!অন্যের কাছে তুমি গেলে তখন আর নিজের কাছে আসতে পারবে না| নিজের কাছে থাকাটা জরুরি|

-তাই!

-সত্যি তাই! বরং থেকে যাও, দেখবে সবাই ঠিক আছে, আর সবকিছু তোমার কাছেই ফিরে আসবে!

-সত্যি? তুমি বলছ? আমি বিশ্বাস করতে চাই!

-শুধু বলছি না, আমি নিজেও তাই! ব্যক্তিগত| একটানা একইরকম একইভাবে...

-কিন্তু অমিত তোমার কাছে আসতে চাই! তোমার সঙ্গ আর লং-ড্রাইভ আমাকে জীবন দেয়!

-তুমি তোমার কাছে থাকলেই আমাকে পাবে! আমরাতো ঐক্যবদ্ধ!

-সেটা জানি! তুমি আমার সহজ পাওয়া| কিন্তু হারানোটা খুব কঠিন তোমাকে!তোমাকে হারাতে হলে আমাকেই আমি হারিয়ে ফেলবো!

-এটা ভালো বলেছ! নিজের কাছে থাকাটা তাই জরুরি!

-আবার কখন আমাদের দেখা হচ্ছে?

-চল, একদিন সেই স্বপ্নের দেশে আমরা যাব, যেখানে 'এই পথ যদি না শেষ হয়...' গানটাও বাজবে একটানা, পথটাও একইরকমভাবে থেকে যাবে, আমরাও ফেরত আসা থেকে কেবল বিপরীতেই একইভাবে যেতে থাকব|

একটানা একইরকম একইভাবে...




লেখক পরিচিতি
মনজুরুল আজিম পলাশ 

নো-ফিক্স্ড প্রফেশন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন