শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

মুরাদুল ইসলামের গল্প : পলায়নপর

এক ধরনের মোহগ্রস্ততা আমরা অনুভব করতে থাকি। আমাদের মনে হয় যে বহুদিন ধরে এইখানে কোন আনন্দ উৎসব হয় না। মনে হয় কোন এক অদ্ভুত পোকা আমাদের জীবন গাছের মূল শেকড়টাকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলছে এবং তার ফলশ্রুতিতে শিরায় শিরায় অনুভব করছি এক ধরনের অন্তঃসার শূন্য শূন্যতা, যেই শূন্যতার কোন তুলনা নেই।


নিজেদের জীবন এবং চারপাশকে আমাদের ভয় হতে শুরু করে এবং এই ভয় আমাদের মধ্যে যেন অলৌকিক ভাবে ঢুকে যায়। আর বুঝতে পারি যত সময় যাচ্ছে তত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছি।

এরকম সময়ে আমাদের জীবন যাপন অনেকটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মত হয়ে যাচ্ছিল। তবুও যখন শুনলাম হিন্দুপাড়ার পঞ্চম লোকটা মারা গেছে তখন আমাদের খারাপ লাগল। পঞ্চম লোকটা অর্থাৎ নরেনের কথা মনে হল। কেউ কেউ বলল, নরেন খুব ভাল লোক ছিল। নরেনের হাসি ও বেদনামাখা মুখ যেন ভেসে উঠল। স্পষ্ট দেখতে পেলাম যেন নরেন হাসছে আর কাঁদছে। তার হাসি ও কান্নার মাঝে এক ধরনের আশ্চর্য মিল ছিল যা অবাক হওয়ার মত। তবুও অবাক হলাম না। কারণ অবাক হওয়ার মত বোধ আমাদের মধ্যে তখন পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল না। শুধু আস্তে আস্তে কথা বলছিলাম, ভয়ে ভয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম বাতাসে আর একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিজেদের মুখের প্রতিচ্ছবি যেন অন্যের মুখে দেখছিলাম।

হঠাৎ হঠাৎ আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম এই ভীতিকর পরিস্থিতি কবে শেষ হবে। সময়কে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মনে হচ্ছিল। যেন তা শেষ হবার নয়। যেন কেয়ামত পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে। যেন এই খানে চারপাশে শত শত বিভিন্ন বয়সী বিদেহী আত্মাকে সঙ্গে নিয়ে নিস্তেজ ও সন্ত্রস্ত অবস্থায় নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকব।

এইসব মনে হওয়ার ফলে আমাদের খারাপ লাগতে শুরু করল। কিন্তু খারাপ লাগলেও কিছু করার ছিল না।

আমরা যখন ভয় ও বিষাদে মাখামাখি হয়ে অবস্থান করছি তখন আবার খবর পেলাম যে নরেনের লাশ শশ্মানে নিয়ে যাওয়ার মত মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সবার ই বাস্তব জ্ঞান ছিল, তবুও আমাদের ভেতর টা হু হু করে উঠল। নরেনের মৃতদেহ একলা কোন ঘরে নির্জন এবং বিমর্ষ হয়ে পড়ে আছে ভাবতেই চোখ জলে ভরে এল।

নরেনের খবর যে নিয়ে এসেছিল সেই রইছুদ্দি বেপারীকে জিজ্ঞেস করলাম, হিন্দুপাড়ার আর কী অবস্থা?

রইছুদ্দি বেপারী এই প্রশ্নের তেমন কোন উত্তর দিতে পারল না। তবুও হিন্দুপাড়ার অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করতে কোন অসুবিধা হল না। শশ্মানে বিরামহীন জ্বলছে চিতা। শশ্মান গ্রামের কাছাকাছি হওয়ায় আকাশের দিকে প্রচণ্ড আবেগে উঠতে থাকা ধোঁয়ার কুন্ডলী এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। তবে ধারণা করে নিলাম এই ধোঁয়ার কুন্ডলী অচিরেই আর দেখা যাবে না। কারণ মৃতকে শশ্মানে নিয়ে আসার মত মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না।

আমরা যখন আকাশের উত্তর কোণের দিকে তাকিয়ে এক ধরণের অপার্থিব ছন্দে আকাশের পানে উঠতে থাকা মানুষ পোড়া ধোঁয়ার কুন্ডলীকে দেখছিলাম আর একরাশ কুচকুচে কালো বিষাদ গড়াগড়ি খাচ্ছিল আমাদের ভেতরে তখন প্রথম দুঃসংবাদটা শুনি। দুঃসংবাদটি ছিল হাফিজদ্দি মৌলানা বিকেলের দিকে মারা গেছেন। তার মৃত মুখের উপর ভনভন করে উড়ছে কয়েকটি স্বাস্থ্যবান মাছি।

এই খবরে আমাদের বিমর্ষতা আরো বাড়ল। আর আমাদের মনে হল হাফিজদ্দি মৌলানা ভাল লোক ছিলেন। তিনি তার স্ত্রীকে অত্যধিক ভালবাসতেন এবং দুই সপ্তাহ আগে যখন তার বউ মারা যাবার আগে পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন তখন হাফিজদ্দি কীভাবে পানি লুকিয়ে রেখেছিলেন তা মনে পড়তে থাকে। আমাদের এও মনে পড়ে যখন রোগাক্রান্ত এবং শীর্ণ শরীর নিয়ে হাফিজদ্দি মৌলানার স্ত্রী গড়িয়ে গড়িয়ে পানির পাত্রের কাছাকাছি গিয়ে সেই পানি খাওয়ার জন্য মুখ হা করেছিলেন তখন দ্রুতবেগে দৌড়ে এসে হাফিজদ্দি মৌলানা পানির পাত্র কেড়ে নিয়ে তা দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। হাফিজদ্দি তার বউকে অনেক ভালবাসতেন তা আগেই বলেছি, তাই তিনি চান নি তার বউ মারা যাক। মূলত সেই কারণেই তিনি পানি খেতে দেন নি। কারণ তখন আমরা জানতাম বা আমাদের জানা ছিল কলেরা রোগীকে পানি খাওয়ালে তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়।

হাফিজদ্দি পানি না দিয়ে তার বউকে বাঁচাতে পারেন নি। সেদিনই একটু পরে তার বউ মারা যান। এর তিনদিন পর উপজেলার সুবোধ ডাক্তার আমাদের গ্রামের ফজিলত মুন্সীর ছোট মেয়েকে দেখতে আসলে তিনি বলেছিলেন রোগীকে লবণ গুড় দিয়ে বেশি বেশি ফুটানো বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে। তখন আমরা অবাক হই এবং আমাদের ভুল ভাঙ্গে। কীভাবে যেন হাফিজদ্দি মৌলানার কাছেও এই খবর পৌছে যায়। তখন তিনি তার স্ত্রীর কবরের পাশে প্রায় মূর্ছিত অবস্থায় ছিলেন। এই খবর পাওয়ার পর হাফিজদ্দি দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন। সেইরকম কান্না কেউ কোনদিন দেখে নি। তার কান্না এবং চিৎকার যেন ফালি ফালি করে কেটে দিচ্ছিল আমাদের হৃদয়কে এবং তীব্র আক্রোশে উঠে যাচ্ছিল উপরে, আরশের পানে।

সেদিন থেকে হাফিজদ্দি মৌলানা দানা পানি ছেড়ে দিলেন। তাকে বুঝিয়ে যে ঘরে নিয়ে যাবে বা কিছু খেতে দিবে এমন অবস্থা তখন কারো ছিল না। কারণ সবার ঘরেই কান্না, সবার ঘরেই অসুস্থ, অর্ধমৃত ও মৃতরা। সবার ঘরেই তখন কলেরা।

হাফিজদ্দি নিজ উদ্যোগেই তার ঘরে গেলেন। কখন গিয়েছিলেন তা কেউ জানে না। তাকেও কলেরা ধরল। এবং শেষ পর্যন্ত তিনিও মারা গেলেন। তার স্ত্রীর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে।

হাফিজদ্দি মৌলানার মৃত্যু আমাদের ভয় ও বিষাদকে আর উশকে দেয় এবং আমরা আমাদের নড়বড়ে ভেতরটাকে খুব ভালভাবে অনুভব করতে থাকি। আমাদের তখন আরো দৃঢ়ভাবে মনে হতে থাকে যেন মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে সময়ের সাথে সাথে।

সন্ধ্যার দিকে আমাদের কয়েকজন গ্রাম পরিভ্রমণে বের হয় গ্রামের অবস্থা জানতে এবং তারা যখন ফিরে এসে সবিস্তারে যা যা দেখে এসেছে তা বর্ননা করে তখন বুঝতে পারি অবস্থা আমাদের আশংকার চেয়েও ভয়াবহ। আকাশের উত্তরকোণে তাকিয়ে কোন ধোঁয়া দেখতে পাই না এবং আশংকা করি যে হিন্দুপাড়ায় ও আমাদের পাড়ার মত ঘরে ঘরে মৃতদেহ পড়ে আছে। সেগুলো শশ্মানে আনার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সুস্থ লোকজন রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে পালাচ্ছে। যেমন আমরা পালিয়ে আছি এখানে।

কিন্তু আমাদের ভয় হচ্ছে এবং সে ভয় বাড়ছে তো বাড়ছেই। কারণ জীবাণু হয়ত ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে বাতাসে। তাছাড়া গ্রাম্য সংস্কার মতে সৎকারবিহীন মৃতদেহ গুলির আত্মারা হয়ত ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে।

তারা আমাদের চেনে। বেশ ভালোভাবেই চেনে। যেহেতু তারা আমাদের আত্মীয় পরিজন ছিল। একসাথে কত হাসি আনন্দ ঠাট্টা তামাসা আমরা মিলে করেছি। আমাদের গায়ের গন্ধ পর্যন্ত তাদের চেনা। তাই তারা যখন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল তখন আমরা যেহেতু নিজেদের বাঁচাতে তাদের একলা ঘরে ফেলে রেখে এসেছিলাম এবং যন্ত্রণা ও পিপাসায় ছটফট করতে করতে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সুতরাং প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে তাদের বিদেহী আত্মারা ছুটে আসতেই পারে। আমরা আমাদের গ্রাম্য সংস্কার থেকে জানি যে সৎকারবিহীন মৃতদেহের বিদেহী আত্মারা খুব প্রতিশোধপরায়ণ হয়।

ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। কিছুদূরের কলাগাছের পাতাগুলো কাঁপছে সন্ধ্যার বাতাসে। আমাদের মনে হতে লাগল অন্ধকার নেমে এলে আমরা কেউ আর বাঁচব না। আমরা জানি না ঠিক কি কারণে অন্ধকারের আসন্ন মুখ দেখেই আমাদের ভেতরটা নড়ে উঠল এবং যেন বুঝতে পারছিলাম তখন বাঁচতে হলে আমাদের ছুটে পালাতে হবে। আমরা তো আগেই জীবন থেকে পালিয়েছি নিজেদের বাঁচানোর জন্য। স্বীয় প্রিয় পরিজনদের অসুস্থ কাতর মরণাপন্ন অবস্থায় একলা রেখে আমরা পালিয়েছি। সুতরাং এখন আবার পালাতে কোন বাঁধা নেই। কিন্তু পালিয়ে আমরা যাব কোথায়? সেই প্রশ্ন ঠিক মাথায় এল না। যারা পলায়নপর তারা হয়ত বা গন্তব্যের ভাবনায় ভাবিত হয় না। পালাতেই সুখ তাদের। অথবা অসুখ।

ঠিক সন্ধ্যা নামার কয়েক মুহুর্ত আগে আমরা ছুটতে শুরু করলাম। আমরা পালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত শত বিদেহী আত্মাদের পিছনে ফেলে, কলেরাকে পিছনে ফেলে। আমরা যাচ্ছি এবং যাচ্ছি। আমরা পালাচ্ছি। অথবা ঘোরপাক খাচ্ছি অন্ধকার গোলকধাঁধায় কিংবা আপন আবর্তে।





লেখক পরিচিত
মুরাদুল ইসলাম

জন্মসাল ১৯৯০।

প্রকাশিত গল্পসংকলন “মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী”। ২০১৪ কলকাতা বইমেলায় সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত।
সিলেটে বসবাস করেন।

ওয়েবসাইটঃ www.muradulislam.me



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন