শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

লুতফুন নাহার লতা'র গল্প : কুইনি


ওকে আমি আনতে চাই নি ।

হঠাত করে বাবা চলে যাওয়ায় ছেলের অবস্থা এতোটাই খারাপ হল যে সে আজ দুদিন ধরে বিছানার সাথে লেপ্টে আছে । কথা বলতেও তার কষ্ট হচ্ছে । ফলে উপায়ান্তর না দেখে আমি সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম ওকে আনতে ।

বন্ধু বিনু যখন খবর দিলো ,কালরাতে তাঁর দরজার কাছে একচোখ কানা একটা ছোট্ট বিড়াল, কারা যেনো ফেলে গেছে । আমি গাড়ী নিয়ে ছুটলাম জামাইকায় বিনুর বাসা থেকে ওকে আনতে । আনার আগে বিনু অনেক পরামর্শ দিল, আমি যেনো অবশ্যই ওর নামে মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স করি , আজই একবার যেনো ডাক্তারের কাছে নেই । ওর চোখটা আসলে কানা নয়, কে যেনো নিষ্ঠুর ভাবে মেরে ক্ষত করে দিয়েছে । ও আমার দিকে পিট পিট করে তাকাচ্ছে । এক চোখে ভালো করে দেখছে না বলে একটু ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়ে আছে ।


বিড়াল নিয়ে গাড়ীতে বসেছি । সিদ্ধার্থ বলল , মা ওর নাম কুইনি । আমি কোন দিনও বাড়ীতে কুকুর বিড়াল পালার পক্ষের লোক নই । আমার নিজের অনেক কাজ , তাছাড়া পালতে হলে যে শিশুর ঘর নেই যার বাবা মা নেই তাকেই পেলে সাহায্য করা সমীচীন। অহেতুক পশু পাখী আটকে রেখে পালা আমার ধাতে নেই । ঢাকায় অবশ্য আমাদের এক বন্ধু উত্তরা ব্যাংকের এম ডি, তৈফুর ভাই দুটি সাদা পুডল দিয়েছিলেন । প্রথমে আনতে না চাইলেও পরে শুধু আনা নয় ওদের চুল কাটা , নখ কাটা , শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো থেকে ফিডার ভরে দুধ খাওয়ানো পর্যন্ত সকল দায়ীত্বও আমার কাঁধে এসে পড়ে । অনেক ভালোবেসে ওদের নাম দিয়েছিলাম কুইনি ,আর কিংকং । সেই কথা মনে করে আজ এই বিড়ালের নাম হল কুইনি । সম্ভবত সারা জীবনই আমাদের কুকুর বা বিড়ালের নাম হবে কুইনি ।

সিদ্ধার্থ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে গাড়ীর পিছনে বসে আছে । যেনো এইমুহূর্তে ওর বেঁচে থাকার এক মাত্র অবলম্বন কুইনি । ও মাত্র ফোর্থ গ্রেড শেষ করেছে এ বছর , এই নয় বছর বয়সের মধ্যে বারে বারে সে বাবা মায়ের পারিবারিক অশান্তির ভেতর দিয়ে গেছে। পাঁচ বছর বয়সে চেনা জানা সব্বাইকে ছেড়ে মায়ের সাথে চিরদিনের জন্যে দেশান্তরী হয়েছে । বিদেশ বিভূইয়ে এসে অচেনা পরিবেশে, অচেনা স্কুলের নতুন ছেলেমেয়েদের সাথে মানিয়ে চলতে হয়েছে । বাংলা ছেড়ে ইংরেজী ভাষা রপ্ত করতে হয়েছে । মায়ের হাত ধরে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে ।এদেশে আসার পরে এক্কেবারে শুরুর দিকে একবার সে তার নানু কে খুলনায় ফোনে কথা বলার সময় বলেছিল । " নানু, আমি আর মা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে চাকরি খুজতেছিলাম , আমাদের তো ছাতা ছিল না তাই বৃষ্টি আর আম্মুর কান্না আমাদেরকে ভিজায় দিচ্ছিল ।"

একটি ফ্যামিলি লাইফের জন্যে এই এতোটুকু বয়সেই প্রানের গভীরে একটি আর্তনাদ গুমরে মরেছে তবু তার দিন কেটেছে নিরাপত্তাহীনতায়, হতাশায়, হয় বাবা নয় মা'কে হারানোর আশংকায়।

আমরা বড়রা যখন আমাদের নিজেস্ব সুখ দুঃখ নিয়ে ডিল করি তখন কিছুতেই বুঝতে চাই না যে ছোটদেরও বলার আছে কিছু । ওদের মনের জগতে একটি বিশাল দাগ কেটে যায় সংসার ভাঙার বেদনা , বিপর্যয় । আমার ছেলেটি তেমনি একটি ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে । যা কিছু আমাদের জীবনে ঘটছে, সে তা কিছুতেই চায় না। সে চায় সুস্থ , সুন্দর , মায়াভরা, শ্রদ্ধা ভালোবাসায় ভরা একটি পারিবারিক জীবন । এর অধিক কিছুই চায় না সে । বাবার গলা জড়িয়ে ধরে দু এক বার বলেছেও সে " বাবা আই ওয়ান্ট মাই ফ্যামিলি ব্যাক ।" না তা হয় নি । দূর্ভাগ্যকে হাসি মুখে জয় করার যে লড়াই , সে লড়াইয়ে আমি বার বার ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছি, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এই বোধ হয় শেষ হয়ে গেলাম , আর হয়ত পারলাম না ! তবু কেমন করে যেনো মাথা রয়ে গেছে উঁচু আর হাসিটুকু বড় সাহায্য করেছে । ঐটুকু বিধাতার দান ।

কুইনিকে ঘরে আনার সময় বাড়ীর পাশের ফুডস্টোর মেটফুড থেকে ওর জন্যে খাবার কিনে আনলাম । পেটস্টোর থেকে লিটার বক্স , জলের বাটি , খাবারের বাটি , ওর নরম বিছানা সব কিনে আনলাম । সিদ্ধার্থ মন প্রান ডুবিয়ে দিল কুইনির যত্নে । পরদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় কুইনি কে কোলে নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসল । সে স্কুলের গেটে নেমে গেলে যতদূর তাকে দেখা যায় কুইনি গাড়ী থেকে গলা বাড়িয়ে চেয়ে রইল ।

ঘরে ফিরে লিভিংরূমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, আবার সেই ভয়ংকর দৃশ্য আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো । এই ঘরের মাঝখানে সবুজ কার্পেটের উপর আমি খুন হয়ে গেছি। আমার হাত দুটো পিঠমোড়া করে বাঁধা, মাথা নুয়ে অসহায় ভঙ্গিতে হাটু মুড়ে নিলডাউন হয়ে আছি । ঠিক অনেক টা সৌদি আরবে শিরচ্ছেদ করার মত । দু বছর আগে যখন এই বাড়ী কিনে এখানে মুভ হয়ে আসি নিজের অজান্তে এই অলুক্ষুনে দুঃস্বপ্ন দেখতে লাগলাম। আসলে ঠিক স্বপ্নও নয় ,কেনো যেনো ঐ ভীতিকর দৃশ্য সামনে এসে দাঁড়াত , আমি যেন দিব্য চোখে দেখতাম ।

সম্বিত ফিরে এলো আপষ্টেট নিউইয়র্ক থেকে পূরবী বসুর ফোনে । তাঁর অফিসে সবাই বলাবলি করছে ম্যানহাটানে টুইন টাওয়ারে আগুন জ্বলছে । পূরবী দি বললেন টিভি অন করতে । তাঁকে ফোনে রেখেই টিভি অন করলাম,একটি টাওয়ারে আগুন আর কালো ধোয়ার ভেতরে কেমন গইয়া গইয়া জ্বলছে আর নিমেষেই চোখের পলকে দেখলাম একটি প্লেন দ্বিতীয় টাওয়ারের পেটের ভেতর ঢুকে গেল। এক চিৎকারে আবার দরজা খুলে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম, ততক্ষনে জামাইকা হিলসের সকল প্রতিবেশী রাস্তায় এসে জমায়েত হয়ে গেছে । ঘরের দরজা হাট করে খোলা পড়ে রইল গাড়ী নিয়ে পাগোলের মত ছুটলাম সিদ্ধার্থের স্কুলে। তাকে নিয়ে এসে থর থর করে কাঁপছি টিভির সামনে দাঁড়িয়ে । কুইনি লাফিয়ে লাফিয়ে একান্ত বডি গার্ডের মত আমার সাথে সাথে রইল । আজ নাইন ইলেভেন ২০০১--

আমেরিকায় মস্ত বিপর্যয় ঘটে গেল । টুইন টাওয়ারের সাথে সাথে একই রকম করে বিপর্যস্ত ,ধূলিসাৎ হয়ে গেলাম আমরাও । একইভাবে আমরাও চলেছি এক ভয়ংকর অনিশ্চিত জীবনের পথ বেয়ে ।

নভেম্বর আসতে আসতে ঠান্ডা পড়ে গেল , রাতে বেশ শীত শীত করে , কুইনি একতলায় তার নিজের নরম বিছানা ছেড়ে আমাদের বিছানায় লেপের উপর গোল হয়ে ঘুমায় ।আমার পছন্দ হয় না । সিদ্ধার্থ হেসে বলে , আহারে কুইনিটা আমাদের কাছে কাছে থাকতে চায় আম্মু ! রাতে পায়ের কাছে নরম নরম স্পর্শ পেয়ে ঘুমের ঘোরে এক ঝটকায় পা ঝাড়া দিতেই কুইনি ছিটকে গিয়ে পড়ল কার্পেটের উপর । আমি চিৎকার করে সিদ্ধার্থকে বললাম, আমার বিছানায় বিড়াল ঘুমাবে ! না কিছুতেই ও আমাদের সাথে ঘুমাতে পারবে না । পরের রাতে আবার , আবার, আবার সেই একই অবস্থা ! আমি অসহ্য হয়ে সিদ্ধার্থের শত মিনতি সত্বেও ওকে বিনুর কাছে ফিরিয়ে দিতে চাইলাম । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম কাল সকালেই ওকে নিয়ে দিয়ে আসব ।

বিকেলে আকাশ কালো করে ঝড় বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে নামলো । পূরবী দি এসেছিলেন ঝড়ের আগেই , এসে তিনি আটকে গেলেন । আমরা একসাথে বসে গান গাইলাম সারা সন্ধ্যে ।পূরবী দি গাইলেন 'আজি প্রনমি তোমারে চলিব নাথ সংসার কাজে " রাতের খাবার খেয়ে বসলাম চা নিয়ে । লিভিং রূমের মাঝখানে আমি খুন হয়ে পড়ে আছি সে কথা বললাম ওনাকে, উনি বললেন ' এসব আর কিছু না, আসলে পারিবারিক ঘটনাটি তোমার আত্মসম্মানে লেগেছে খুব সেটাই অবচেতন মনে দেখছ ।' সেন্টার টেবিলের উপরে রাখা আমার বাগানের সদ্যফোঁটা বেগুনি রঙের লিলি তখনো ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপ্টায় দুলছে ।

ওনার যেতে বেশ রাত হয়ে গেল। আমরা ঘুমাতে যাবার সব আয়োজন শেষে হঠাত দেখি কুইনি তো নেই ! তাকে বিকেল থেকে দেখিনি । সিদ্ধার্থ কান্না জুড়ে দিল। রাত একটা বাজে। এখন ! কী করি ! হাতে টর্চ নিয়ে খুঁজতে বেরুলাম । আমার ডানে জার্মান ফ্যামিলি ওয়াল্টার আর এলকে'র বাড়ী , বায়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রাশিয়া থেকে আসা পচাত্তর বছর বয়সের রুথ এর বাসা , সামনে সাদা আমেরিকান পরিবার জানিনা কোন দেশে তাদের শেকড় তবে তারা শ্রী চিন্ময়ের অনুসারী । শাড়ী পরে , খোপায় ফুল , গলায় মালা আর সন্ধ্যে বেলায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাংলায় গান গায় । ওর বাংলা নাম আশ্রিতা । ওপাশে গ্রীক চার্চ আমি জোর পা চালিয়ে খুঁজছি , সিদ্ধার্থ একা ঘরে । কুইনি নেই । কোথাও কুইনি নেই । ক্লান্ত অবসন্ন পা টেনে টেনে ঘরে ফিরলাম । শেষ রাতের মুষল বৃষ্টিপাতের শব্দের ভেতর থেকে ছেঁকে ছেঁকে একটি মিহি চিকন ম্যা ডাক বের করে আনতে চাইছি কিন্তু পারছি না । আসার পর থেকে কুইনি আমাকে অনেকটা সারপ্রাইজড করে দিয়ে সিদ্ধার্থের মত সরাসরি পরিস্কার মা বলে ডাকত । ও মিউ , মিয়াও , ম্যাও না বলে কেমন ম্যা বলত, আর তা আমাদের কাছে মনে হত মা ।

বাইরে ঠান্ডা । আমরা দুজন কেউ কারো সাথে কথা বলছিনা দুদিন হল । কুইনি নেই । সিদ্ধার্থ কাঁদছে না । আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে । সকালে সিটি থেকে আসা সাইকোলজিক্যাল থেরাপিস্ট ' মিরকো ম্যানুয়েল' এলো তাঁর নির্ধারিত রেগুলার ভিসিট দিতে ।( এদেশে পারিবারিক ভাঙ্গনে আলাদা ভাবে মা ও শিশুকে থেরাপী দেয়া হয়। ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের ঘটনা থাকলে তা আরো বেশী সিরিয়াসলি নেয়া হয় ।) আমার বাড়ীর নানা রকম বিল পরিশোধ করা হয়নি দীর্ঘ দিন। টিভির ডিস লাইন , ইলেক্ট্রিক লাইন , বাসার টেলিফোন, গ্যাস, পানি সকল বিলের ফাইনাল নোটিস মাথার পরে ঝুলছে। বাগানের মালীকে বিদায় দেয়া হয়েছে বহু আগেই,বাড়ীর মর্টগেজ দেবার কেউ নেই। আমার ব্যাংক থেকে দুই বছরের ওয়ার্কম্যান কম্পেন্সেশনে আছি বলে চাকরি আছে বটে কিন্তু বেতন নেই ! বাড়ীর সামনে 'হাউস ফর সেল' সাইন ঝুলছে। এতো সব কিছুর পরেও লিভিং রুমের সেন্টার টেবিলে বেগুনি লিলির গোছা দুলতে দেখে বলল ' তুমি আমার সবচেয়ে ভাল ক্লায়েন্ট কারন তোমার মনের জোর দেখে আমি অভিভূত। বাগান থেকে ফুল তুলে যখন ঘরে রেখেছ, তখন আমার কাজ শেষ। তুমি পারবে । আজ থেকে তোমার ফাইল ক্লোজড ।

ওকে বিদায় দিয়ে এসে কেবল কফির মগ ধোবার জন্যে কিচেনে এসেছি , পিছনের দরজার কাছে সেই মিহি ডাক। চিৎকারে বাড়ী ফাটিয়ে দিয়ে আমি দরজা খুলে দেখি আমার কুইনি । ভেজা , জবু থবু , কাতর ,ক্লিস্ট । শুকিয়ে ইদুরের মত দেখতে হয়েছে, তিন চার দিন কোথায় ছিল , কিভাবে ছিল , কেমন করে এলো কিছুই জানিনা । ছেলে স্কুল থেকে বাড়ীতে এসে কুইনিকে ধরে খুশীতে কাঁদতে থাকল । আর কোন দিন সে কুইনিকে চোখের আড়াল করবে না বার বার সেই প্রতিজ্ঞা করতে থাকল । সেই রাত থেকে কুইনি ঘুমায় আমার আর সিদ্ধার্থের বুকের কাছে , ঠিক মাঝখানে ।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড থেকে আমার ননদের ছেলে আনাম নিউইয়র্কে আমার কাছে বেড়াতে এলো । শত মনকষ্টের ভেতরেও জীবন তো থেমে থাকে না । আনামকে নিয়ে এদিক ওদিক সাধ্যমত ঘুরে দেখাই , একদিন গেলাম লং আইল্যান্ডের গ্লেনকোভে বন্ধু এহসানের বাড়ীতে। বারবিকিউ পার্টি সহ কবিতা ও গানের আড্ডা। পার্টি শেষ হলে বাসার দিকে হাইওয়েতে উঠলাম । সেদিন আমার বোন রানুও আমাদের সাথে । আমরা সবাই মিলে ড্রাইভ ওয়েতে গাড়ী ঢুকতেই দেখি, কুইনি আমাদের জন্য জানালার কাছে রাখা মিউজিক সেন্টারের এমপ্লিফায়ারের উপরে বসে দুই হাতে পর্দা সরিয়ে অপেক্ষায় আছে । গাড়ীর আলো দেখেই সে এক লাফে দরজার কাছে এসে লেজ উচিয়ে ঘুরতে থাকে। এটা তার নিত্যদিনের কাজ । আমাদের অপেক্ষায় থাকে কেউ ! এই আনন্দ আমাদের রাখার জায়গা নেই।


কেমন করে জানিনা চাবী গাড়ীর ভেতরে রেখেই, দিলাম দরজা বন্ধ করে । এইবার ! আমরা ক্লান্ত সবাই , আনাম , সিদ্ধার্থ , রানু ধপাস করে বসে পড়ল দরজার কাছে । ঘরের ভেতরে কুইনি একবার জানালার কাছে লাফিয়ে ওঠে , একবার দরজার ভেতরে থেকে মা , মা, করে ডাকে । ও বুঝতে পারছে আমরা বিপদে পড়েছি । ঘরে ঢুকতে পারছি না । সিদ্ধার্থ কুইনিকে বলতে লাগল আমরা ভুল করে চাবী বন্ধ করে ফেলেছি গাড়ীতে । কুইনি ভেতর থেকে গর গর করতে থাকল । অসম্ভব মেজাজ তার , সিদ্ধার্থকে প্রটেক্ট করা যেনো তার ধর্ম । একবার আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে দুটো সাদা ছোট্ট পুডল তাদের মনিবের সাথে হেটে যাচ্ছে , সিদ্ধার্থের বলটা বাড়ীর সামনের রাস্তার কোনায় পড়েছিল , কুকুর দুটো যেই না সেই বলটাকে শুকতে গেল, কুইনি গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে দুই টাকে কামড়ে খামছে একাকার । কপাল ভালো ওদের মনিবরা আমাকে আগে থেকে চিনতো , নাহলে মামলা মোকদ্দমায় জড়াতে হত । তা কুইনি যতই গর গর করুক ঘর তো সে খুলতে পারল না! সেরাতে শহিদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দিন হোসেনের ছেলে আমার প্রতিবেশী ফাহিম রেজা নূরের বাসায় গিয়ে আমরা ঘুমালাম ।

কী যে একটা সময় পার করেছি আমরা দুজন সে কথা বলে শেষ করা যাবে না । যা করছি তাতেই একটা না একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে । আমার মাথার ঠিক নেই কিছুতেই । এক বছরে সাতবার রোড এক্সিডেন্ট । একবার তো গাড়ীর এয়ারব্যাগ বার্ষ্ট হয়ে আমার পুরো মুখ প্রায় উড়ে গেল । ঝলসে যাওয়া মুখ নিয়ে জামাইকার ম্যারী ইম্যাকুলেট হাসপাতালে থেকে এলাম এক সপ্তার বেশী। এই মুখ আর ভালো হবে তা ভাবিনি কখনো ।

আমাদের বাড়ী বিক্রি হয়ে গেল ২০০২ এর মে মাসে । আমাদেরকে চলে যেতে হবে এখান থেকে , সারা ঘর ভর্তি কার্টুন ভরা জিনিষ পত্র , দেয়াল থেকে পেরেক খুলে খুলে একটা একটা করে সো পিস পেইন্টিং নামাচ্ছি আর আমার হৃতপিন্ড ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে । এর মধ্যে কবি হুমায়ুন আযাদ এলেন আমার বাসায়। উনি বইমেলা উপলক্ষ্যে এসেছিলেন নিউইয়র্কে। বুলবুল মাহফুজা দুজনে ওনার সাথে । জীবনে এই প্রথম আমার বাসায় কাউকে নিজে রান্না না করে চাইনিজ অর্ডার করে খাওয়ালাম । আমার অবস্থা দেখে হাত ধরে বলেছিলেন তুমি পারবে , পারতেই হবে তুমি আমার সিমোন দ্যা বোভোয়ার । ফিরে গিয়ে একটি লেখায় তিনি লিখেওছিলেন সে কথা ।

আমরা যে বাসায় যাচ্ছি সেটি একটি এপার্টমেন্ট বাসা যেখানে পেট এলাউড না । পেট আনতে পারবনা সে মর্মে কাগজ সই করে দিতে হয়েছে। কিছুদিন ধরেই সবাইকে অনুরোধ করছি বিড়ালটা নেবার জন্যে ।কিন্তু কাউকে পাচ্ছিও না । বাসার জিনিস পত্র ফ্রী দিয়ে দিচ্ছি সেটা নিচ্ছে কিন্তু বিড়াল নেবে না কেউ । ইতোমধ্যে কুইনির তিনটি বাচ্চাও হয়ে গেছে । বন্ধু ডাক্তার নার্গিসকে প্রায় হাতে পায়ে ধরে রাজী করালাম। সে তাঁর মেয়ে নারমিন এর জন্যে কেবল বাচ্চা গুলো নেবে ।

কাল সকালে এবাসা থেকে আমাদের চলে যেতে হবে । কুইনির বাচ্চাদের দিয়ে দেয়ায় সে পাগলের মত করতে থাকল । বাচ্চারা দুধ খেত। সারা রাত আমার বাসার চিলেকোঠা ঘরে কুইনি একাএকা দাপিয়ে মরতে থাকল । সকালে কুইনির দিকে চেয়ে আর্তনাদ করে উঠলাম । দুধ ভরা স্তনের ভারে সে হাঁটতে পারছে না । আমার দিকে কাতর চোখে চেয়ে যেনো বলছে ' মা, এ তুমি কি করলে !'

সবুজ কার্পেট ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে । অসহায় আর্তনাদ বুকের ভেতর গুমরে মরে। এই বাড়ী এই ঘর,এই সংসার সব ভেসে যায় নীলজলে । জীবনের এই অনাবশ্যক বেদনা কারো পাওনা হতে পারেনা !

আমরা বাসা মুভ করেছি । নতুন বাসায় কুইনি সহ আমরা । তাকে লুকিয়ে রাখছি । সকালে খাবার টাবার দিয়ে আমি বেরিয়ে যাই, সিদ্ধার্থ স্কুল থেকে এসে বেলা তিনটায় ওকে দেখে । আমি ফিরে এলে সে আমার পায়ে পায়ে জড়ায় । কিছুদিনের মধ্যে সুপার রিকি কেমন করে জানতে পেল আমাদের বাসায় বিড়াল রয়েছে । সে খুব রাগ হল । বুঝিয়ে বলায় সে আমাকে সাত দিন সময় দিল । ইয়েলো পেজ দেখে চারিদিকে কল দিয়ে দিয়ে একটা শেল্টার খুজে বের করলাম । সিদ্ধার্থ গত এক বছর এই নির্মম জীবনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সেও কেমন সহজ করে নিল কুইনির যাওয়াটা । তার মুখ বেদনায় টলমল তবু সে ঝরে পড়ে না ।

সেদিন আমি কাজ থেকে ছুটি নিয়েছি । সিদ্ধার্থ কুইনিকে আদর করে বিদায় জানিয়ে স্কুলে চলে গেল । কুইনিকে আমার নিজের হাতে বানানো সিল্কের চাদরে জড়িয়ে নিয়ে চললাম ম্যানহাটানের আপটাউনে । শেল্টারের সামনে পার্কিং পেয়ে গেলাম । কুইনিকে নিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম । অবাক হয়ে দেখলাম আরো অনেকেই এসেছেন কুকুর, বিড়াল ফেরত দিতে । লাইনের শেষে যখন কাউন্টারে এসে দাঁড়ালাম , ভেতর থেকে মহিলা প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র এগিয়ে দিলে সই করে দিলাম। পঞ্চাশ ডলার ডোনেশান আর কুইনির প্রিয় খাবার ' ডজন খানেক ফ্যান্সি ফিস্টের কৌট দিয়ে দিলাম । কিছুক্ষন পরে একটি খাঁচা এনে কুইনিকে নিয়ে গেল । যাবার বেলায় সে আমার দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে মা বলে ডেকে উঠল , তার পায়ের নখ দিয়ে আমার ডান হাতের পিঠের খানিকটা চামড়া ছিড়ে নিয়ে গেল ।

নিঃস্ব মানুষের মত নত মুখে কুঁজো হয়ে গাড়ীতে ফিরে যেতে যেতে মনে হল ' -- শেষে নিশি শেষে বদন মলিন , ক্লান্ত চরন ,মন উদাসীন, ফিরিয়া চলেছি কোন সুখহীন ভবনে ।'

কতক্ষন গাড়ীতে এভাবে বসে ছিলাম জানিনা , হঠাত আমার অন্তরাত্মা ফেটে পড়ল প্রচন্ড বিপ্লবে, বিদ্রোহে , প্রতিবাদে । না আমি কুইনিকে দেব না । কিছুতেই না । এক লাফে গাড়ী থেকে নেমে ছুটে গিয়ে লাইন টাইন ঠেলে চিৎকার করে এগিয়ে গেলাম । আমার অস্বাভাবিক কন্ঠস্বরে সবাই চমকে তাকালো , ' নো নো ! আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গিভ মাই ক্যাট এয়োয়ে , আই ওয়ান্ট হার ব্যাক । প্লিজ আই ক্যান্ট লিভ উইদাউট হার। প্লিজ লিসেন টু মি ---' আমার আর্তনাদ পৌঁছল না ওদের প্রানে । অনেক ক্ষন পরে ভেতর থেকে একজন এসে বলল সরি উই পুট হার ইন টু স্লিপ । আমি জানতাম না এর মানে । কিছুই বুঝতে না পেরে চিৎকার করে বললাম ' আই উইল ওয়েট ফর হার , হোয়েন সি উইল ওয়েক আপ ? ততোক্ষনে লাইনের লোকজন চোখ মুছতে শুরু করেছে । একজন আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল ' সরি ! সি উইল নেভার ওয়েকয়াপ , সি ইজ ডেড !'

আমার ডেডবডি ম্যানহাটান থেকে আমার মিটসুবিসি মনটেরো চালিয়ে নিয়ে কুইন্সে ফিরে এলো যেমন সে একদিন বাংলাদেশ ছেড়ে, মা ভাইবোন , বন্ধুবান্ধব , বাংলাদেশ রেডিও , টেলিভিশান সব ছেড়ে লন্ডন হয়ে এই দেশে এসেছিল ।

আমি যখন ফিরে এলাম ততোক্ষনে স্কুল ছুটির সময় হয়ে এসেছে । বাসায় না গিয়ে ছেলের স্কুলের গেটে গিয়ে দাঁড়ালাম । সে বেরিয়ে এসেই জানতে চাইল , 'কুইনি কি করল আম্মু ? যেতে চাইল সহজে ?' তাকে আমার ছিলে যাওয়া হাত দেখিয়ে বললাম 'দেখো না বাবু সে কি করেছে ! তার বন্ধুদের পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে চলে গেছে । সে ওখানে খুব ভাল আছে ! খুব আনন্দে ! সিদ্ধার্থের চোখে মুখে একটা বেদনা মাখা হাসির ঝিলিক উজ্জ্বল হয়ে ফুটে রইল ।

সে রাতে আমার ব্রায়ারুডের সাত তলার অন্ধকার ঘরের একটি জানালা, খোলা রইল সারা রাত। বাইরে ও ভিতরে অন্ধকারের ছড়াছড়ি। অমাবস্যার পরের এই শেষ রাতের দিকে আকাশের কোলে হালকা চাঁদের আলো একটি কোমল ব্যথার নরম চাদর বিছায়ে দিয়ে উদাস চেয়ে রইল ।

সিদ্ধার্থ এখন ঘুমুচ্ছে। আজো সে জানে না সেদিন সত্যিই কি হয়েছিল । সে জানতো আমাদের অবস্থা একটু সামলে নিতে পারলে আবার আমরা একটা বাড়ী কিনে কুইনিকে নিয়ে আসতে পারব । আজো সে তাই মাঝে মাঝে বলে ' আচ্ছা মা কুইনি কি আর আমাদের চিনতে পারবে, ও বোধ হয় এখন বুড়ো হয়ে গেছে ! এতো দিন বাঁচার কথা না !' আমি হেসে বলি 'ওরা কখনো কাউকে ভোলে না বাবা , কেবল মানুষ ভুলে যায় সব ।'

আমার সব লেখা তাকে পড়ে শোনাই । কাল সে জেগে উঠলে যখন এই লেখা তাকে পড়ে শোনাবো তখনি কেবল সে জানবে কুইনি সত্যিই ভাল আছে ।



লেখক পরিচিতি
লুতফুন নাহার লতা

গল্পকার। কবি।
আবৃত্তিকার। অভিনেত্রী। একটিভিস্ট।
সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই : চাঁদের উঠোন।
গল্পের বই : জীবন ও যুদ্ধের কোলাজ
নিউ ইয়র্কে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন