শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

মোমিনুল আজমের গল্প : পোষ্টমাস্টার


সিরাজ আলী ভাতগ্রাম পোষ্ট অফিসের তৃতীয় প্রজন্মের পোষ্টমাস্টার, এটা ঠিক সরকারি চাকুরি না, মাসে হাজার খানেক টাকা সন্মাণীর বিনিময়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার তিন পুরুষ এ পোস্ট অফিসের সাথে জড়িত। তার দাদা ব্রিটিশ রাজের পোষ্টমাস্টার, বাবা পাকিস্থান আর বাংলাদেশ মিলিয়ে কাজ করেছে প্রায় পঁচিশ বছর, তার চাকুরিও কম হলো না, প্রায় সাড়ে তিন যুগের কাছাকাছি। তাদের অর্জনও কম নয়। তিন জেনারেশনের তিনজনই শ্রেষ্ট অবিভাগীয় ডাক কর্মচারির সন্মাননা পেয়েছে। সেসব সস্মাননা ক্রেষ্ট এখনও সযত্নে রেখে দিয়েছে অফিসে। পরিস্কার করতে করতে ক্রেষ্টের নাম নিশানা মুছে গিয়েছে অনেক আগে, কোনটি কার ক্রেষ্ট তা এখন আর পড়ে বোঝার উপায় নেই, তবে সিরাজ আলীর কাছে তা জলের মতো পরিস্কার। পোষ্ট অফিসে নতুন কেউ আসলে কাঠের ভাঙ্গা আলমারি থেকে তিনটি ক্রেষ্ট বের করে রাখবে টেবিলে, টেবিলে রাখার আগে আর একবার পরীক্ষা করে দেখবে চেয়ারের চেয়ে নীচু টেবিলের পায়ার ইটগুলো ঠিকমতো আছে কিনা। তারপর শুরু করবে বর্ণনা -

রাণী ভিক্টোরিয়ার ছবি দেয়া এই ক্রেষ্টটি পেয়েছে দাদা নায়েব আলী , তিনি ছিলেন বিশাল দেহের মানুষ। একবার এই পোষ্ট অফিসে ডাকাত পড়লো, দাদা- চামড়ার ক্যাশ ব্যাগ আর মেইল ব্যাগ বুকের মধ্যে আকড়ে ধরে ছিলেন । ডাকাতরা ব্যাগ নিতে না পেরে দাদাকে ছুরি মেরে যায়। এ খবর চলে যায় ব্রিটিশ রাজের কাছে। সুপারিনটেনডেন্ট এসে নিজ হাতে দাদাকে দিয়ে যায় এ ক্রেষ্ট। তাছাড়া দাদার আর একটি গল্প সিরাজ আলী প্রায়ই গর্ব নিয়ে বলে-' মিয়া বাড়ীর আজগর মিয়া পোষ্ট অফিসের মেঝেতে রাখা মেইল ব্যাগ যেইনা পা দিয়ে সরিয়েছে অমনি দাদা টেলিগ্রাম করেছে কোলকাতায় ' কিক দ্য মেইল ব্যাগ, ডিজঅনার দ্য ক্রাউন, এ্যাকশন সলিসিটেড।' পরের দিন সকালে খাকি হাফ প্যান্ট আর লাল পালকের টুপি পড়া এক ডজন লাল বাহিনী এসে ধরে নিয়ে যায় আজগর মিয়াকে। ৩ মাস জেল খেটে মুক্তি পায় সে। মিয়া বাড়ীর লোক না হলে তিন বছরেও মুক্তি পাওয়া কঠিন ছিল।' এ গল্প বলার সময় সিরাজ আলীর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, আভিজাত্যের একটি দীপ্তি খেলা করে তার চোখে মুখে। বাবা ক্রেষ্ট পেয়েছেন দীর্ঘদিনের সততার সাথে চাকুরি করার জন্য আর আমার এ ক্রেষ্ট আপনাদের সেবা করার স্বীকৃতি-এই বলে তিনটি ক্রেষ্ট আবার তুলে রাখেন আলমারিতে। কোন কোন আগন্তক তার এ গল্প শুনে অভিভূত হয়ে যায়, বলে-' আপনাদের মতো সৎ কর্মচারি আছে বলেই পোস্ট অফিস এখনও টিকে আছে'। আবার কেউ গল্পের মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে- ' চাচা এসেছিলাম এই চিঠিটা রেষ্ট্রি করতে, করে দেন চলে যাই, বাড়ীতে অনেক কাম পড়ে আছে'। গ্রামের কিছু ত্যাদোড় গোছের লোক আছে যারা পোষ্ট অফিসে এসে মাঝে মাঝে বলে-'চাচা, পোষ্ট অফিসের কোন কাম আছে নাকি এখন? লোকজনতো সব কথা মোবাইলেই সারে, তাহলে আপনার এ ঝাপ খোলার দরকার কি? তারচে বরং ভাঙ্গা ঘরটা আমাদের দিয়ে দেন, ঠিক ঠাক করে গালামালের দোকান করি'। 

ভাতগ্রাম পোস্ট অফিসটি বাজারের এককোনায়, পুরনো দোচালা একটি ইটের ঘরে। ঘরের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে লোনাধরা ইট। কব্জা খুলে পড়ে জানালা কানি বগের মতো এক পায়ের উপর ঝুলে আছে, লোহার শিকগুলোর গোড়া থেকে ক্ষয়ে নড়বড়ে দাতের মতো কার্যবিহীনভাবে টিকে আছে। মেঝের ইট সিমেন্ট উঠে গিয়ে এক কোনার লোহার ভল্টটি উটের পিঠের মতো জেগে জনগণের সম্পত্তির নিরাপত্তাবিধানের প্রতীক হিসেবে এখনও আছে, ছুঁচো আরশোলা সে ভল্টের ভিতর স্থায়ী আবাসন গড়ে নিয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে পোষ্ট অফিসের রেকর্ডপত্র রাখা আছে মরিচা ধরা একটি লোহার তৈরি সেলফে যার উপর ধুলোর স্তর পরে কালচে রং ধারণ করেছে। মাকড়সার জাল সে সেলফের উভয় পাশে একটি অস্বচ্ছ আবরণ তৈরি করেছে। বাইরের লেটার বক্সটির রং উঠে মরিচা পড়ে মাঝে মাঝে ছিদ্র হয়েছে, বৃষ্টি বাদলের দিনে তার ভিতর পানি ঢুকে পড়ে। লেটার বক্সে এখন আর কোন চিঠি পড়ে না জন্য তা আর মেরামত করার উদ্যোগ নেয়া হয় না, তবে প্রতিবছর উপরের নির্দেশে বাজার থেকে লাল রং কিনে মেচোয়াক দিয়ে তাতে রং লাগানো হয়। পোস্ট অফিসের এ করুন দশা নিয়ে চিন্তিত সিরাজ আলী। ঝড় বাতাসে যে কোনদিন ভেঙ্গে পড়লে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার পাশাপাশি তার বসার জায়গাও থাকবে না। ডিপিএমজি সাহেবের কাছে এ ঘর মেরামতের কিংবা নতুন ঘর তৈরির ধর্ণা দিয়ে লাভ হয় নি। পোস্ট অফিসের আয় ইনকাম নেই, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশী এসব বলে সবাই পিছিয়ে যায়। সে নিজে থেকে এ ঘর মেরামত করবে এমন আর্থিক সামর্থও তার নেই।

সিরাজ আলী নিজেও এখন চিন্তিত পোষ্ট অফিস আয় ইনকাম নিয়ে। আগে প্রতিদিন ডাক আসতো পলাশ বাড়ী থেকে। সে ডাক ব্যাগে না হলেও ১৫/২০ খানা সাধারন চিঠি, ৫/৭ খানা রেজিষ্ট্রি, এক দেড় হাজার টাকার মানি অর্ডার থাকতো। মাসের ৮/১০ তারিখে মানি অর্ডারের পরিমান যেতো বেড়ে। এ কাজে ফজলুকে প্রায় সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হতো। তখন ফজলুর কথা যেত বেড়ে-

' বেতন পাই ছয়শ টাকা আর কাজ করি সারাদিন, না, এ কাজ আর করবো না, বাজারে আলু পটল বিক্রি করলেও এর চেয়ে অনেক বেশী আয় করতে পারবো'। 

সিরাজ আলী তখন ফজলুকে অনেক বলে কয়ে কাজ করে নিতো। কিছু কাজ সে নিজেও করতো, লোকজনকে খবর দিয়ে বাজারে নিয়ে এসে টাকা বা চিঠি তাদেরকে দিয়ে দিতো। পোস্টমাস্টারের এ কাজ ফজলু আবার পছন্দ করতো না ; সে তখন বলতো-

'সরকার আমারে ঠিক করেছে বাড়ী বাড়ী চিঠি বিলি করার জন্য, আপনি যদি বাজারে ডেকে নিয়ে এসে একাজ করেন তাহলে আমারে রাখার দরকার কি?'

-ঠিক আছে আর করবো না বলে ফজলুকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে সিরাজ আলী ।

এখন প্রতিদিন মেইল ব্যাগ আসার পর আগ্রহ নিয়ে ব্যাগ খোলে সিরাজ আলী, মেইল ব্যাগে এখন কোন চিঠি থাকে না, দু একটা চিঠি যা পাওয়া যায় তা বিভাগীয়, ডাক বিলি বা গ্রহণ সম্পর্কিত সরকারি নির্দেশনা, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ইত্যাদি। ব্যাগ খোলার পর মন খারাপ করে বসে থাকে। পোষ্ট অফিসের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে সে খেই হারিয়ে ফেলে। চিঠিপত্র নেই, আয় ইনকাম নেই তারপরও সরকার যে পোস্ট অফিস রেখেছে, তাকে এবং ফজলুকে মাসে মাসে ভাতা দিচ্ছে, এটিই বা কম কিসে। তবে এভাবে কতদিন চলবে সে চিন্তা করে সে অস্থির হয়। কোনদিন যদি দু চারটি চিঠি বা মানি অর্ডার আসে তখন আনন্দের সীমা থাকে না। ফজলুর জন্য তখন হাক ডাক শুরু হয়ে যায়-

' এই ফজলু, এদিকে আয়, চিঠি ক'খান তাড়াতাড়ি বিলি কর, না জানি এর মাঝে কার কী সুসংবাদ, দুঃসংবাদ আছে। দেরী করিস না কিন্তু আজকেই বিলি করবি'।

ফজলু প্রতিদিন নিয়ম করে এসে দেখে যায় চিঠির হাল হকিকত। চিঠি থাকলে তা নিয়ে যায়, না থাকলে সে নেমে পড়ে ক্ষেত খামারের কাজে। পোষ্ট অফিসের কাজ না থাকার কারনে গত বছর থেকে সে তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে নিজেই চাষাবাদ শুরু করে দিয়েছে। পোষ্ট মাস্টারের ঠাট বজায় রেখে সিরাজ আলী বসে থাকে পোষ্ট অফিসে। বসে বসে পেপার পড়ে দু তিন ঘন্টা। ভাতগ্রামে পেপার আসে না তাই সে রানারকে দিয়ে আনিয়ে নেয় প্রতিদিনের পেপার। এ জন্য রানারকে প্রতিদিন চা সিঙ্গারা খাওয়াতে হয়।

চিঠিপত্র না থাকলেও পত্রিকা আসার পর সময়টা খারাপ কাটে না সিরাজ আলীর। বাজারের অনেকের চেয়ে দিন দুনিয়ার খবর, রাজনীতির খবর ভালো জানে। এ সময় পোষ্ট অফিসে আরও দু চারজন আসে পত্রিকা পড়ার জন্য। পত্রিকা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তাদের সাথে গল্পও জমে ওঠে। ইদানিং পত্রিকার ভিতর বিনোদন পেজের দিকে আগ্রহটা তার বেশি। কিছুদিন আগেও এ অবস্থা ছিল না। আড়চোখে দু একবার বিনোদন পেজের দিকে তাকিয়ে অন্য পেজে চলে যেত সে। কিন্তু এখন বৃহঃস্পতিবারের পেপার আসার সাথে সাথে সে বিনোদন পেজ আলাদা করে রেখে দেয় আলমারির ভিতর। দুপুরের পর যখন কেউ আর পোষ্ট অফিসে আসার থাকে না তখন সে বিনোদন পাতা বের করে ছবি দেখে, নায়িকাদের মাখন কোমল বুকের খাজে তার চোখ আটকে যায়। নায়ক নায়িকাদের প্রেম প্রীতির খবর সে মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে। 

সিরাজ আলী মাঝে মাঝে ভাবে তার অন্তর কলুষতায় ভরে গেছে, এটি কী অলসতায় উপসগর্, হবে হয়তো, তা না হলে তো এমন হবার কথা নয়। সে পোষ্টমাস্টারি করে তার যৌবন কাল থেকে, স্বাধীনতার পর যখন সে পোস্ট অফিসের দায়িত্ব নেয় তখন বিভিন্নমূখি কাজের ঝামেলায় সে সারাদিন ব্যস্ত থাকতো। চিঠির জন্য পোস্ট অফিসে এসে লাইন দিয়ে দাড়িয়ে থাকতো লোকজন। চিঠির ঠিকানা দেখে বাছাই করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতো। এ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ চিঠি চাওয়ার সাহস করতো না। প্রায়ই চিঠির আনন্দ বেদনার সাথী হতো সে। রহীম গাজীর ছেলের চাকুরির চিঠি দেয়ার পর সে শহর থেকে তিন কেজি মিষ্টি এনে বাড়ীতে পাঠিয়েছিল। এতোগুলো মিষ্টি দেখে ঘরের নতুন বউ আনন্দে আটখানা। তার স্বামী যে ভাল চাকুরি করে তার প্রমান সে পেয়েছিল। সেই রহীম গাজীর ছেলে এখন সরকারের বড় পদ থেকে রিটায়ার করে ঢাকায় বাসা বাড়ী করেছে। শোনা যায় সামনের নির্বাচনে সে এ এলাকা থেকে এমপির মনোনয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। যুদ্ধের সময় সাতমাস খোঁজ না পেয়ে আবুল হোসেন ভেবেছিল তার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। ছেলের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বাড়ীতে মিলাদ পর্যন্ত দিয়েছিল। স্বাধীনতার একবছর পর সেই ছেলের চিঠি পায় আবুল হোসেন। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিল সে। এখন ছাড়া পেয়েছে। শীঘ্রই বাড়ী আসবে। এ চিঠি পড়ার পর অনেকেই পোষ্ট অফিসের বারান্দায় আনন্দে কেঁদে উঠেছিল ।

পোষ্ট অফিসে তখন আসতো জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী, বিক্রয়ের জন্য। এক প্যাকেট কনডম একদিন সে নিয়ে গিয়েছিল বাড়ীতে। তা দেখে রাতে নতু বউয়ের হাসি আর থামতেই চায় না। সেই জন্মনিয়ন্ত্রন সামগ্রী আর বিক্রি হয়না। হবে কীভাবে, কেউ তো জানেই না। উপর থেকে বিক্রি করার চাপ আসে। কনডম ফোলালে অনেক বড় বেলুন হয়। তা দেখে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার পোষ্ট অফিসে। সস্তা দামের সে বেলুন দু সপ্তাহেই বিক্রি শেষ। স্কুলের টেক্সট বুক বিক্রয়ের জন্য যখন পোষ্ট অফিসে আসে, তখন তার নাওয়া খাওয়ার সময় ছিল না। 

অফিসে বসে আগে তারতো এমন মনে হয় নি। বয়স ষাট ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। চিত্ত চাঞ্চল্যের বয়স তো আর নেই, সেগুলির ইস্তফা হয়েছে মাজহার আলীর মা মারা যাওয়ার পরপরই। তার পরেও তো অনেকটা সময় সে পার করেছে । এসব ভাবতে ভাবতেই তার দিন চলে যায়। কোন কোন দিন বিকেল গড়ার আগেই পোস্ট অফিসের ভাঙ্গা দরজায় তালা দিয়ে বাড়িতে যায়। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে থাকে। ঘুম থেকে উঠে তার সবকিছু খালি খালি লাগে। মাজহারের মা বেঁচে থাকলে তার সাথে কথা বলে এ সময়টা কাটাতে পারতো, সেই মহিলা এক বর্ষায় ওলা ওঠা রোগের বেগ সামলাতে না পেরে তাকে ফেলে চলে গেল। আগে পোষ্ট অফিসে গিয়ে কাগজ পত্র ঘাটাঘাটি করলে তার এ অস্থিরতা কেটে যেত। কিন্তু পোস্ট অফিসের এ বেহাল অবস্থায় সেখানে গেলে এখন আর অস্থিরতা কাটে না বরং বেড়ে যায়। 

সিরাজ আলী বাইরের টং এর উপর বসে প্রায়ই ভাবে তার জীবনও সংকুচিত হয়ে আসছে পোস্ট অফিসের কাজের মতো। এ গ্রামে এক সময় তার কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। যেখানেই দেখা হোক না কেন তার সাথে কথা বলতো সবাই। কোন বাড়িতে গেলে যেসব বৌ ঝিদের স্বামী বাইরে থাকতো তারা ' চাচা আমার কোন চিঠি আছে' বলেই বাড়ির ভিতর দৌড় দিতো । দু এক মিনিট পরেই এক গ্লাস সরবত বা নিদেনপক্ষে পান সুপারি নিয়ে হাজির হতো তার সামনে। পকেটের ভিতর থেকে একটা চিঠি যদি সে বের করে দিতে পারতো, তাহলে তাদের আনন্দের সীমা থাকতো না। তখন এক দৌড়ে চলে যেত ঘরে, দরজায় খিড়কী দিয়ে পড়তে শুরু করতো সে চিঠি। আর এখন যদি কারও চিঠি আসে তাদেরকে সে চিঠি দিলে আগেই বলে দেয় সে চিঠির মধ্যে কী আছে, অনেকে তা খুলেও দেখে না। 

পোষ্টঅফিসের এ দুরবস্থা আঁচ করতে পেরে এখন মাঝে মাঝে ইন্সপেক্টর আসে, এক সপ্তাহ আগেই সে খবর জানতে পারে সিরাজ আলী। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ভালোমন্দ খাবারের ব্যবস্থা করে। গত ছয় মাসে মাজহারের বৌয়ের দুটো ডিমপাড়া মুরগী সে জবাই করেছে। তারপরও ইন্সপেক্টর কাজ দেখে খিটমিট করে, চলে যাওয়ার সময় মিহি সুরে বলে- 

'মাস্টার সাহেব, চাকুরি তো অনেকদিন করলেন, আর কতো, এবার ক্ষ্যান্ত দেন, নতুন পোস্ট মাস্টার নিয়োগ দেই'।

ইন্সপেক্টরের এ কথায় সিরাজ আলী ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পায়। এ পোস্ট অফিসে তারা কাজ করে তিন পুরুষ। তার বয়স হয়েছে সত্যি, তাই বলে সে তো আর অক্ষম না। কাজ করতে করতে সবকিছু এখন তার নখদর্পনে, অনেকটা হাফেজের মতো বলা যেতে পারে। কোন রিপোর্ট কত তারিখে কোথায় পাঠাতে হবে, তার ক্যাশ ব্যালান্স কত, মাসে কী কী কাজ করতে হবে তা সবসময় তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। এটা সত্যি যে লেখালেখি, পড়াশুনার কাজ এখন সে আর আগের মতো করতে পারে না। লিখতে গেলে হাত কাপে, থিন পেপারে তিন চারটি কার্বন দিয়ে লিখতে গেলে কলমের নিব কাগজের ভিতর ঢুকে যায়, সরকারি আদেশ নির্দেশ অফিসে যা আসে তা পড়তে গেলে সবকিছু লেপটানো কালির মতো মনে হয়। শহর থেকে কিনে আনা অতসী কাচে এখন আর কাজ হয় না। তাই বলে পোষ্ট অফিসের কোন কাজ তো আর থেমে থাকে নি। পোষ্ট অফিস কিংবা বাড়িতে মাজেদকে সামনে বসিয়ে সময়ের আগেই সবকিছু করে নেয়। এ কাজ করতে মাজেদকে কখনও বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায় নি, মাজেদ তখন নিজেকে পোস্টমাস্টার হিসেবে চিন্তা করে। মাঝে মাঝে সিরাজ আলী তার ছেলেকে সামনে রেখে বলে-

'পোস্ট অফিসের কাজ হলো রাজা বাদশার আমলের কাজ। কাজ ছোট হলেও মর্যাদা অনেক বেশি। তাই কাজরে কখনও অবহেলা করবি না। আমার দাদা করেছে, তোর দাদা করেছে, আমি করছি, আল্লা চাহেতো তুইও করবি। তুইও শ্রেষ্ট ডাক কর্মচারি হবি এটা আমার চাওয়া।' 

চাকুরি যদি তাকে ছাড়তেই হয় তবে পোষ্টমাস্টার হবে তার ছেলে মাজহার। ইতোমধ্যে পোস্ট অফিসের কাজও সে শিখে ফেলেছে। মাজহারকে নিয়োগ না দিয়ে ইন্সপেক্টর নতুন পোস্ট মাস্টার হিসেবে আসলে কাকে নিয়োগ দিতে চায়?

মাজহার পোস্ট মাস্টার হলে সে প্রতিদিন এসে বসতে পারবে এ ঘরটায়। এ ঘরে না এসে সে থাকতে পারে না। কেন জানি মনে হয় পোষ্ট অফিসে না আসলে তার খাবার হজম হবে না। ঘর সংসার জমিজমা থেকে পোস্ট অফিসকে তার আপন মনে হয়, শুক্র শনিবার পোস্ট অফিস বন্ধ, বন্ধের দিনেও সে নিয়ম করে আসে, চাবি দিয়ে ঘর খুলে চেয়ারটাতে খানিকক্ষন বসে, এ বয়সেও ঝাড়ু দিয়ে ধুলোবালি পরিস্কার করে, পুরাতন রেকর্ডপত্র যা আছে তার উপর চোখ বুলায়। তার বাবার কাছ থেকে সে যখন দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিল তখন ছোট একটা কাগজে তাকে ও তার বাবাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। দুজনের স্বাক্ষর হয়ে গেলে তার উপরে ইন্সপেক্টর স্বাক্ষর করে সিল দিয়েছিল। তার বাবা মরে গেছে আজ বিশ বছর, আজও এ কাগজটি ক্রমশ কালো হয়ে যাওয়া ফাইলের মাঝে রক্ষিত আছে। বাবার স্বাক্ষর দেখে সিরাজ আলী আপ্লুত হয়ে পড়ে। ভাবে এরকম একটি কাগজে স্বাক্ষর করবে সে আর মাজহার, উপরে থাকবে ইন্সপেক্টরের সিল ও স্বাক্ষর। 

এর মাঝে হঠাৎ করে একদিন খবর না দিয়ে ইন্সপেক্টর আসে, বয়সের কারনে সিরাজ আলীকে অব্যাহতি নেয়ার কথা বলে, অব্যাহতি নেয়ার একটা চিঠিও হাতে ধরিয়ে দেয়। এই প্রথম সিরাজ আলী চিঠি হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কিছুক্ষন কাঁদে যেন তার আত্নার আত্নীয়ের সলিল সমাধী হয়েছে। বয়সের ভারে নতজানু পোস্টমাস্টার কম্পিত হাতে তার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের হাত ধরে মিনতি করে বলে, তার ছেলেকে এ পদে নিয়োগ দেয়ার, এতে তার দাদার হাতে গড়া পোস্ট অফিস ভাল থাকবে। ইন্সপেক্টর তাৎক্ষনিকভাবে মাজহার আলীকে ডেকে তার কাছ থেকে আবেদনপত্র নিয়ে নেয়।

এর মাঝে বাজারে রটে যায় আউয়াল ব্যাপারীর ছেলে আফজাল পরবর্তী পোষ্টমাস্টার হবে, আফজাল দুবার মেট্রিক ফেল করে কয়েক বছর বাবার হোটেলের অন্ন ধ্বংশ করছে। শোনা যায় তাকে কাজে লাগাতে আউয়াল ব্যাপারী ইতোমধ্যে একটা গরু বিক্রী করেছে। সিরাজ আলী বিষয়টি নিশ্চিত হয় যখন একই দিনের ডাকে মাজহার আর আফজালের নামে ইন্টারভিউ কার্ড আসে। সিরাজ আলী কার্ডটি নিজ হাতে আউয়াল ব্যাপারীর দোকানে দিয়ে আসে।

নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা হয়। ডিপিএমজি অফিসে পরীক্ষা। মাজহারের সাথে সিরাজ আলীও ঐ দিন অফিসে যায়, পরীক্ষার সময় ইন্সপেক্টর ঘুর ঘুর করে আফজালের আশেপাশে। না চাইতেই তার উপকারে লেগে থাকে সে। প্রশ্নের উত্তরও বলে দেয় অনেকগুলো। সিরাজ আলী সবকিছু দেখে, তার বুঝতে বাকী থাকেনা কী ঘটতে যাচ্ছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে একফাঁকে ঢুকে পড়ে বড় সাহেবের রুমে।

'স্যার, আমার দাদা, আমার বাবা এ অফিসে পোস্টমাস্টারের চাকুরি করেছে, আমি করছি চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর ধরে। পোস্ট অফিসটা তৈরি করেছে আমাদের পূর্বপুরুষরা। তাই পারিবারিক ধারাবাহিকতায় আমার ছেলেকে যদি পোষ্টমাস্টারের দায়িত্ব দেন তাহলে সে দায়িত্ব নিষ্টার সাথে পালন করবে এ নিশ্চয়তা আপনাকে দিতে পারি। '

এতোগুলো কথা গুছিয়ে বলে সিরাজ আলী হাফ ছেড়ে বাঁচে।

ডিপিএমজ সাহেব আধুনিক লেখাপড়া জানা মানুষ, বিসিএস দিয়ে চাকুরিতে ঢুকেছেন, কম কথা বলেন। সিরাজ আলীর দিকে চোখ তুলে তিনি শুধু বললেন-পোষ্টমাস্টার চাকুরির বিষয়টি উত্তরাধিকারের না, অধিকারের। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় যার যোগ্যতা বেশি তার অধিকার জন্মে নিয়োগ পাওয়ার। আমি কারো অধিকারকে খর্ব করতে পারি না। এই বলে তিনি সামনে রাখা নথিতে আবার মনোনিবেশ করলেন।

সিরাজ আলী ডিপিএমজি স্যারের কথা কী বুঝলো না বুঝলো তা ঠাওর করতে পারছে না। । এ সময় পিছন থেকে ইন্সপেক্টর এসে হাত ধরে বলে- মাস্টার সাহেব চলেন যাই, স্যার এখন লাঞ্চের জন্য উপরে উঠবেন। 

ডিভিশন অফিস থেকে রওনা দিয়ে বাস থেকে সিরাজ আলী নামে ঢোলভাঙ্গায়। বাসেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। বাকীটা রাস্তা তাকে যেতে হবে ভ্যানে, অধিক যাত্রী বহনে সক্ষম রিক্সার বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বাহন। সন্ধ্যার নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে খানা খন্দে ভরা কাঁচা রাস্তায় হোচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে তার ভ্যান। যাত্রীর ভার আর ভাঙ্গা পথে ভ্যান টানতে গিয়ে চালকের শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। মাঝে মাঝে ঘাড়ে ঝোলানো গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মোছে, পরম যত্নে সেই গামছায় আবার মোছে ভ্যানের হ্যান্ডেল। যত্নের কারনে অন্ধকারেও চকচক করছে ভ্যানের হ্যান্ডেল। সিরাজ আলী ভ্যানের গতির সাথে দুলতে দুলতে ভাবে-যখন শারীরিক সামর্থ থাকবে না তখন কী হবে এ ভ্যান চালকের? ভ্যান ও তার যাত্রী টানতে গিয়ে জীবনের সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে যখন অক্ষম হবে তখন তো তাকে বিদায় নিতে হবে তার এ প্রিয় ভ্যান থেকে। এটাই তো নিয়ম, এটাই তো জীবনের রীতি। এসব ভাবতে ভাবতেই সিরাজ আলী পৌঁছে যায় ভাতগ্রাম, তার বিয়াল্লিশ বছরের কর্মময় পোষ্ট অফিসে।


লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম

জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়
পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।

৩টি মন্তব্য:

  1. ভাল লাগল। স্মৃতি বা বিস্মৃতি ভ্রমণ।

    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লাগলো পড়ে। আমাদের ভেঙেপড়া ডাকঘরগুলো আপনার গল্পে যেন কথা বলে উঠল।

    উত্তরমুছুন