বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নবারুণ ভট্টাচার্য এর গল্প রেবন্তর স্ববধবিলাস

‘No one ever lacks a good reason for suicide’ - Cesare Pavese (1908-50)

কাল এক দীর্ঘ, দীর্ঘ রাত্রিব্যাপী পরিক্রমায় গৃহত্যাগ করিব। পরিক্রমার অন্তে দেখিব তরঙ্গবিক্ষুব্ধ এক অপার জলধি। মৃত্যু কী এমনই দেখিতে? ভাবিলেও রোমাঞ্চকণ্টকিত

আমি। আকশে চন্দ্র ও খদ্যোৎ নক্ষত্র ও মারক গ্রহগণ জাগরূক থাকিবে। শশীকিরণ প্রতিটি ঢেউয়ের ভঙ্গুর শীর্ষে রুপালি চিরুনি দিয়া আঁচড় কাটিবে। সেই চন্দ্রমায়, সেই ফেনিল গর্জনে, রেবন্ত, প্রাণাধিক রেবন্ত, আমি কীভাবে সখা, তোমার প্রস্থানের কথা ভাবিব? তোমার মরবিড আহ্লাদ, তোমার পারভার্স মোহ, তোমার অভাবনীয় একাগ্রতা ও অধ্যাবসায় - কোনটির প্রতি আমি সুবিচার করিব? এ প্রশ্ন বন্ধুবর রেবন্ত তোমাকেই, যদিও জানি আজ তুমি নিরুত্তর থাকিবে। কারণ আজ বাক্যহরা তুমি। নিছকই নিস্তব্ধতা। নৌকার লন্ঠন তুমি, ঝড়ে পালচাপা পড়িয়াছ। তোমার শেষ টেস্টামেন্ট বা সুইসাইড নোট আমার সম্মুখে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলা এক বিচিত্র খেলা বা পরীক্ষা। যদিও ইহাতে পাশ-ফেল নাই, হার-জিত নাই। ফেল এবং কম্পিত হও। ফের কম্পিত হও ও ফেল। আজ নিশীথে, রেবন্ত, আমার হাতে একটুকরা শুভ্র শ্বেত কাগজ, আমকেও আজ লিখিতে হইবে যাহা না লিখিলে নয়। রেবন্ত, এই ঘোরা, বিচিত্র নিশীথে তোমার সুইসাইড নোট বা চরমপত্রটি বার বার পড়িতেছি। যেন, যেন, এক অন্তিম বিদায়গাথা। যেন এক শিশিরের অশ্রুসিক্ত সমাধিলেখ যাহা গুপ্ত ও লুপ্ত কোনো রাত্রিভাষায় লিখিত।

রেবন্ত লিখিয়াছিল,

‘আমার সংগ্রহই আমার সংহারের কারণ ও হেতু হইল। সংসার নাই তাই বন্ধুবরগণ ব্যতিরেকে কেহই বিলাপ করিবে না। এই প্রস্থানের জন্য সংগৃহীত শতাধিক সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার জবানবন্দি আমাকে তাড়া করিতেছে। উহারা যেন বিলাতি অরণ্য যূথবদ্ধ রাজকীয় হাউণ্ডকুকুর এবং আমি নিতান্তই অসহায় একটি নেটিভ শশক। কেন যে ওই মারাক্তক সংগ্রহের নেশা আমাকে গ্রাস করিল? কেন? কেন? কোন সদুত্তর নাই। কেবল এক নিরন্তর নৈকট্যমান পদপাত। আসিতেছে। তাহারা আসিতেছে। আসুক। আমাকে পাইবে না। রেবন্ত কাহাকেও টুকিটিও দিবে না। বাকির খাতায় ফাঁকিটুকু রহিয়া গেল। বিদায়বেলায় গলায় মালা জুটিল না, দড়ি তো জুটিল। তাহাই-বা কম কী?

রেবন্ত

সাবাশ, রেবন্ত, এই হতভাগ্য বন্ধুর কুর্নিশ নাও। অন্তিমে যাহা লখিয়াছ বঙ্গবাসী যুগ যুগ ধরিয়া তাহার রহস্যাস্বাদন করিবে। সত্যই প্রেতপুরিতে জলজ্যান্ত মানুষ কতদিন কাটাইতে পারে? কতদিন কাটানো সম্ভব? গান আসে না তাই। নচেৎ ফুঁপাইয়া ফুঁপাইয়া সাধককবি নরেশচন্দ্রের গান ধরিতাম,

তারাপদ আকাশেতে মনঘুড়িখান উড়তেছিল।
কলুষ কুবাতাস লেগে ঘুড়ি গোত্তা খেয়ে পড়ে গেল।
জ্ঞানমুণ্ডু গেল ছিঁড়ে উড়িয়ে দিলে অমনি পড়ে
মাথা নাই তো উঠবে কী রে, সঙ্গী ছ’জন জয়ী হল।
মায়াকান্নে হল ভারি আর যে সইতে নারি
দারাসুত কালের দড়ি ফাঁস লেগে সব ফেঁসে গেল।
নরেশচন্দ্রের হাঁসা কাঁদা না আসাই যে ভালো ছিল।।

দূর হইতে রেডিওর গান ভাসিয়া আসিতেছিল। কোন কি ফুলের আবছা গন্ধ? কোথাও খিল খিল করিয়া এক বামা কণ্ঠে লাস্য ঝিলিক দিল। আনমনা ছিলাম। সহসা বাতায়নপথে এক এলোমেলো বাতাস রাত্রির ডানায় ভর করিয়া ঘরে খেলিয়া গেল। ফল হইল শুভ্র ও নিষ্কলঙ্ক কাগজের টুকরাটি উড়িয়া গেল। আখেটক যেভাবে পক্ষী ধরে তেমনই তাহাকে ধরিয়া আনিলাম। রেবন্ত ভায়া, তুমিই কি হাওয়ার রূপ ধরিয়া কাগজটিকে উড়াইয়া দিয়াছিলে? তুমি কি চাও না যে উহার উপর আমি যাহাতে উহা লিখি যাহা না লিখিলেই নয়? এখন আর বাপু তোমার ওজর আপত্তি চলিবে না। মৃত্যুর পরে তিব্বতি লামারা যে ক্ষুধার্ত প্রেতের কল্পনা করে, যাহা তোমার মুখেই শুনিয়াছি, তুমি কি এখন সেই ক্ষধার্ত প্রেত? পিশাচসিদ্ধ হইলে পরলোকচর্চায় ব্যুৎপত্তি থাকিলে অবশ্যই প্রেতমণ্ডলে তোমাকে হদিশ করিতাম। কত কথাই তো মনে পড়ে। টালিগঞ্জের তুচ্ছাতিতুচ্ছ এক্সট্রার ভূমিকায় অবতীর্ণা পারুল যাহাকে তুমি গ্রেটা গার্বো বলিতে, সাম্যবাদী বিপ্লবস্বপ্নালু বিমল, বৈদ্যনাথ দারোগা, ক্রিমিনাল কেসে লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল বরদা, তারাপীঠের নিত্যযাত্রী ফটিক, প্রেতবিশারদ ও কাষ্ঠঘানির মালিক রাসমোহন, স্কেপটিক শিক্ষক তারানাথ পালোধি - সবাই, সবকিছু আছে, যথাযথ, স্বস্থানে, স্ব স্ব মহিমায় কিন্তু সর্বত্রই খাঁ খাঁ করিতেছে তোমার শুন্যস্থান। সেই ফাঁকায় নিয়তই ধ্বনিত হইতেছে হাহাকার। পারুলের ঘরে শনিবারের সান্ধ্য আসর বসে। টুংটাং শব্দ হয়, মদিরার বোতল যথানিয়মে খালি হয়, থালায় উছিষ্ট হাড়-কাঁটা জমে কিন্তু বন্ধুদের সিগারেটের ও রাসমোহনের চুরুটের ধোঁয়ায় বিচিত্র কণ্ডলী বৃথাই তোমার সন্ধান করিয়া একসময় ক্লান্ত হইয়া কার্পেটে থিতাইয়া বসে। রেবন্ত তোমার সংগৃহীত সুইসাইড নোটের ফাইলখানি মাঝেমধ্যে খুলিয়া ধরি। শেষ সুইসাইড নোটটি তোমার যাহার বয়ান পাঠান্তে পাঠকেরা ইতোমধ্যেই ঋদ্ধ। তখনও অকুস্থলে পুলিশ আসে নাই। তোমার টেবিল হইতে মলিন স্ফটিকখণ্ডের পেপার ওয়েট সরাইয়া তোমার সুইসাইড নোটটি যে ক্ষিপ্র দক্ষতায় হস্তগত করিয়াছিলাম এবং যেভাবে তোমার বহুমূল্য ফাইলটি বগলদাবা করিয়া পিঠটান দিয়াছিলাম তাহা করিতে হইলে অতি পারঙ্গম তস্করও দু’দণ্ড ভাবিবে। তখন তুমি ঝুলিতেছ যেন স্তব্ধ দেয়ালঘড়িতে এক নিথর পেণ্ডুলাম। মাথাখানি বিসদৃশ কোণে বাঁক নিয়াছে। জিহ্বা নির্গত বিকৃত আনন। জানালার কাঠের পাল্লার উপরে বসিয়া একটি কাক পরিত্রাহি ডাকিতেছে। যেন গলায় দড়ি দেখিবার জন্য পাড়াপড়শিদের বলিতেছে --

ওলো, আলুথালু ছুটিয়া আয়, আত্মঘাতি মহাপাতক গলায় দড়ি দিয়া ঝুলিতেছে। আয়... আয়... কা... কা... কা...।

সে এক সকাল ছিল বটে। এরূপ সকাল গতানুগতিক নয়। প্রিয়বান্ধবনিপাত তো আকছার ঘটে না।

রেবন্তের সংগ্রহ হইতে একটি সুইসাইড নোট

‘পতিদেবতাকে মুখ দেখাইব কি করিয়া? শরিলে কলমক (কলঙ্ক) হয়্যাছে। বিষ খাইলাম। ক্ষমা করিয়া দেও।

হতভাগিনি মানদা’




আর-একটি। ব্যবসায়ীর।

‘আর কাজ করিবার উপায় দেখিতেছি না। দোকানে এবেলা ওবেলা কাবলি আসিতেছে। গিন্নির গহনা আর নাই যে বন্ধক দিব। হইল না। খড়দহের জ্যোতিষ বলিয়াছিল তুলারাশিতে শনি ও শুক্র একঘরে। মঙ্গলের অবসথানও ভালো নয়। আর পারিলাম না।

গন্ধর্ব মালাকার’

আরও একটি। স্বপ্নভঙ্গ সাম্যবাদীর। বিমলেরও এই দশা হইতে পারে। এখনও কে হয় নাই তাহাই মাঝে মাঝে ভাবি।

‘জ্যোতিষদা কমরেড,

শেষবারের মত লাল সেলাম। আত্মহত্যার পথ ঘৃণ্য কিন্তু উপায়ান্তর দেখছি না। কালাচাঁদ ও মোজাম্মেল সহ জনাকয়েকের চক্রান্তে আমি ঝাড়ুদার ইউনিয়নের তহবিল তছরূপ করেছি বলে পার্টি আমাকে বহিষ্কার করেছে। এ অপমান দুঃসহ। নিজেই নিজেকে বহিষ্কার করলাম। আমার পরিবার ভিক্ষা করুক, অনাহারে মরুক, পার্টি যেন সাহায্যের হাত না বাড়ায়। কমরেড লেনিন, কমরেড স্তালিন জিন্দাবাদ। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।

কমরেড অবিনাশ দেবনাথ’

অধ্যাপকের। স্ত্রীকে লেখা শেষ চিঠি।

‘গৌরী,

আজ মনে পড়ছে তোমাকে একসময় কত চিঠি দিয়েছি। বইয়ের মধ্যে করে। বা বন্ধুর বোন শর্মিলা মারফত। আমার শেষ স্বীকারোক্তি এই যে, এই অপমৃত্যু আমার এবং একান্ত আমারই স্বনির্বাচিত। এই বিষাদ, যার কোন ব্যাখ্যা নেই আর আমাকে ক্লান্তিকর দৈনন্দিনের মধ্যে তাড়া করে বেড়াবে না। ডিপ্রেশনের ওষুধ খেয়ে কিছু হয় নি। অন্তত আমর ক্ষেত্রে। তুমি ও টুকাই ভালো থেকো। আমার বইপত্র কলেজ লাইব্রেরিতে দেওয়া যায় কিনা দেখো। এবসার্ড! এবসার্ড! বিদায়।

দেবাংশু’

এইসব মর্মন্তদ নথিগুলি সংগ্রহ করা সহজসাধ্য ছিল না। দুঃসাধ্য বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। পুলিশ, আদালত, মর্গ, হাসপাতাল - অনেক অর্থ ব্যয় করিতে হইয়াছিল রেবন্তকে। অনেক কৌশল অবলম্বন করিতে হইয়াছিল। বহু সময় ওরিজিনাল সুইসাইড নোটটিকে সে হস্তগত করিতে পারে নাই তবে বয়ানগুলি টুকিয়া লইয়াছিল। বলিয়াছিল যে ভবিষ্যতে সংগৃহিত অন্তিম পত্রগুলির ভিত্তিতে সে একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করিবে। সর্বমোট দুইশত ঊনত্রিশটি সুইসাইড নোট রেবন্ত সংগ্রহ করিয়াছিল। আত্মহত্যার বিষয়ে কত যে পণ্ডিতদিগের নাম তাহার কাছে শুনিয়াছি! কিছু কিছু ডায়েরিতে নোট করিয়াছিলাম, যদিও সব নহে।

ডুর্কহাইম, হেনরি এণ্ড শর্ট, গিবস এণ্ড মার্টিন, ফারবার, ফ্রয়েড, ইয়ুং, জালডর্গ, মেনিনজার-- কত কত নাম। আর কত রোমহরর্ষক কাহিনি। দ্বিতীয় সমরকালে জাপানিরা ‘কামিকাজে’ নামে আত্মঘাতী বৈমানিকদের একটি বাহিনী গড়িয়াছিল। ইহারা বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্মিত ক্ষুদ্রাকৃতি ‘ওহকা’ বিমান বোমায় বোঝাই করিয়া মিত্রশক্তির জাহাজ ও ঘাঁটির উপরে আছড়াইয়া পড়িত। জাপানি স্থলবাহিনীতেও ছিল আত্মঘাতী সেনা। ইহাদের নাম ছিল ‘ব্যাঞ্জার চার্জ’। আগুয়ান লাল ফৌজের গতিরোধ করিবার লক্ষ্যে জার্মানরা গড়িয়াছিল সেলফস্তপফেরেইনসাৎজ নামক আত্মঘাতী বাহিনী, প্রাণোৎসর্গই ছিল তাহাদের সামরিক ব্রত। আত্মহত্যার কত দেশে কত বিচিত্র রূপ ও পরিসংখ্যান। স্কট্ল্যাণ্ডে আত্মহত্যার হার ইংলণ্ডের অপরাপর অংশের তুলনায় দ্বিগুণ। আরও কত, কত হিসাব। কত বিয়োগান্ত ও প্রাণবিদারক কাহিনি। ফরাসি দেশে জনৈক ব্যর্থ লেখক তাহার রচনার প্রতি পাঠকদের আকৃষ্ট করার অভিপ্রায়ে আত্মহননের পথ বাছিয়া লয়। কিন্তু নিয়তির এমনই নিষ্ঠুর পরিহাস যে তাহাতেও কোন ফল হয় না। অপঠিত ট্রাজিক লেখকটি অচিরেই বিস্মরণসমুদ্রে নিখোঁজ হইয়া যায়। শেষ দিকে রেবন্ত আলবার্ট কামু নামে কোন লেখকের পুস্তক জোগাড় করিবার চেষ্টা করিয়াছিল। সে প্রায়াস, আমি যতদূর জানি, সফল হয় নাই। কত কথাই-না মনে পড়ে। আবার কত কথা মনে পড়ে না। সহসা সচকিত করিয়া তাহারা যেন বলিয়া ওঠে,

-আরে! এ তো বাপু দেখি বড়ই ঝকমারি। আমিই তো সেই ঘটনা যাহা একবারে ভুলিয়া মারিয়াছ। আইস, পুনরায় স্মৃতিপটে আসিয়া অস্তিত্বের জানান দেই।

সাম্যবাদি বিমলের সহিত প্রায়শই রেবন্তের তর্ক বাধিত।

-এসব তোমার চূড়ান্ত ডেকাডেণ্ট এক শখ। মানুষ বাঁচর লড়াইতে খাবি খাচ্ছে, রোজ চেষ্টা করছে সমাজকে পাল্টাবার, জীবনকে ইন দ্য ট্রু সেন্স অফ দ্য টার্ম অর্থবহ করে তোলার। কোথায় এই লড়াইতে নাম লেখাবে তা না, যত ননসেন্স নিয়েতীমার কারবার। আসলে কী জান? ফিউডাল বংশের স্পয়েল্ট চাইল্ড হলে এরকমই হয়। দুবেলা ঘাম ঝরাতে হলে বুঝতে। এই প্যারাসাইটগিরি ঘুচে যেত।

রেবন্ত সচরাচর তর্কের আহ্বানে সাড়া দিত না। মিটি মিটি হাসিত। কখনও বলিত,

-না বিমল, ভেবে দেখলুম তোমার কথাগুলো ফেলনা নয়। কিন্তু প্রবলেমটা কী জান? প্রোব্যাবলি আই বিলং টু আ অলটুগেদার ডিফারেন্ট টাইম।

-আ ডাইং স্পেসিমেন অফ আ ডেড টাইম। তোমার জন্য খারাপ লাগে রেবন্ত।

-কী করব ভাই! এখন আর এসব লিমিটেশন কাটিয়ে ওঠার সময় নেই। জানি, আমার কালেকশন, আমর রিসার্চ- এগুলোর হয়তো কোন কদর সোসাইটি করবে না।

-কে করবে? তোমার এই মরবিড পারস্যুট নিয়ে ভাবতে সোসাইটির বয়েই গেছে।

তবে একদিন ঠিক তর্কের ঢঙে না হইলেও বিমলকে বাকরুদ্ধ করিয়া দিয়াছিল রেবন্তের শান্ত ঘোষণা,

-শোন বিমল, আত্মহত্যা সমর্থন কর না, ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাপারটাকে একটা গাঁজাখুরি কনসার্ন হিসাবে উড়িয়ে দিও না। কার্ল মার্কসের দুই মেয়েই, এলিনর আর লারা, সুইসাইড করেছিল। এলিনর ১৮৯৮-তে আর লরা ১৯১১-তে, দ্য মেমরেবল ইয়ার, মোহনবাগান শিল্ড জিতল। লরার সঙ্গে তার হাজব্যাণ্ড লাফার্গ-ও সুইসাইড করে। পটাশিয়াম সায়ানাইড ইঞ্জেকশন করে। এরা সকলেই খুব কমিটেড ও ভ্যালুয়েবল ইনডিভিজুয়াল। টম ডিক বা হ্যারি নয়। কে যে, কী কারণে, কখন সুইসাইড করে বসে কোন ঐকিক নিয়ম কষে হিসাব করা যায় না। কিছু বলবে?

-জানি না। আর ভালো লাগছে না। সাবজেক্টটা পাল্টাও।

এইসব বাক্যালাপ যখন চলিত আমার ছিল নির্বাক শ্রোতার ভূমিকা। কী ছাই জানতাম যে এসব গম্ভীর আলোচনায় অংশ লইব? এখনও সে যোগ্যতা অর্জন করিতে পারি নাই। এবারের ইহজীবনে আর অন্যরূপ হইবার আশা কি না। সব কিছু হয় না। কিলাইয়া কাঁঠাল পাকানো যে অসম্ভব তাহা হাড়ে হাড়ে বুঝি। তবে এইটুকু উপলব্ধি করিয়াছি যে, দৃশ্যমান যাহা কিছু বাস্তব তাহাই শেষ নয়। আরও গভীরে আরও অর্থবহ কিছু আছে। সেখান হইতেই চলিতেছে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। কেমন সে দেশ? কেমন সেই দেশের বাসিন্দা? মহাজনবর্ণনায় পড়িয়াছি, ‘দেহ রক্ষার দুইদিন পূর্ব হইতেই ক্ষ্যাপাবাবা (বামাক্ষ্যাপা) লিতে থাকেন- ‘’ ঘোড়াগাড়ি এল, পালকিবেহারা, ভান্ডারি, খানসামা, ঘোড়াগাড়ি এল’’। তাঁহার ভাষা বিচিত্র, কিন্তু গভীর অর্থযুক্ত। তারাক্ষ্যাপা বলিতেন, “তিনি ইঙ্গিতে জানাইলেন, যে বাবা সপ্তাশ্বযোজিত সূর্যালোকের পথে চলিলেন”। এই ইঙ্গিত কি সেই দেশের? তাহার মায়াময় টানই কি রেবন্তকে মাতাল ঘুড়ির মত ধরতাই দিয়া উড়াইয়া দিয়ছিল? এর উত্তর মূর্খের মূর্খ আমি তো জানিই না, সাম্যবাদি বিমলও জানে না। পারুল, বৈদ্যনাথ দারোগা, বরদা, ফটিক, রাসমোহন, তারানাথ পালোধি- কেউই জানে না। রেবন্তই কি ছাই জানিত?

রেবন্তর সংগ্রহ হইতে জনৈক কবির আত্মহননের পূর্বে লেখা শেষ সনেট

আজ রাতে আমি ঘুমচোখে হেঁটে অবাক স্বপ্নচারী
ঘড়ির বাইরে খুঁজে নেব এক সময় হারানো দেশ
সেখানেও আছে হাইওয়ে আর দুপাশেতে ঘরবাড়ি
আলোকবর্ষ দূর থেকে আমি পেয়ে গেছি এস.ও.এস

স্ট্রিটল্যাম্পগুলো আড়াল করতে বাদুড়েরা আসে উড়ে
মৃত জাহাজের ডেকের ওপর প্রেমিকেরা করে গান
এসব জাহাজ হারানো কত-না বন্দর ঘুরে ঘুরে
আমার গভীরে নোঙর ফেলবে, জানিয়েছে আহ্বান

ঘর যদি থাকে, তবে থাকবেই ঘর থেকে চলে যাওয়া
কফিতে যেমন কাফিন এবং সিগারেটে নিকোটিন
লণ্ঠন-ঘুড়ি রাতের আকাশে যদি পেয়ে যায় হাওয়া
উল্টো ক্যালেন্ডারেতে থাকুক পড়ে ভুলভাল দিন

আজ রাতে আমি ঘুম চোখে হেঁটে পেরোব তেপান্তর
দেরি আছে কিনা মালের দোকান তিনহাত অন্তর
জনৈক যন্তর যে কবিও ছিল

ক্যান্সার রোগীর সুইসাইড নোট

‘পেটের ভেতরে সবকিছু পচে গেছে। নিজে অতটা দূর্গন্ধ পাই না কিন্তু অন্যদের মুখ দেখে বুঝি। পরিবারকে অব্যাহতি দিলাম। নিজেকেও। ঈশ্বর, পরজন্মে যেন নিরোগ ও দীর্ঘজীবি হতে পারি।

সুবোধ বনিক’

বেশ্যার সুইসাইড নোট

‘বাবুরা চললাম, তোমরা আস না কারণ আর গতর নাই। যখন ছিল তখন ঢের কামিয়েছি। বাড়িতে দিয়েছি। ওরা খবর নেয় না। বিশেষ আর কি? কাহাকেও দায়ী দিব না।

মেনকা দাসি (টুকু)’

বৃদ্ধের সুইসাইড নোট

‘জানি আত্মনিধন মহাপাপ কিন্তু সংসারে আজ আমার কানাকড়ির মূল্যও নাই। রাতে আধবাটি দুধ খাইতাম। তাহাও উহারা আর বরাদ্দ করে না। মা, তোমার হীন সন্তানকে ক্ষমা করিও। সকল পূর্বপুরুষকে প্রণাম। তাহাদের সব কথা খুলিয়া বলিব। হতভাগ্যের অপমান ও লাঞ্ছনার কোন কাহিনি গোপন করিব না। সংসারে যাহারা থাকিল তাহাদের অভিশাপ দিব না।

সর্বমঙ্গল কামনায়

নুটুবিহারী দাস’

কত বলিব রেবন্ত, কয়েকটি মাত্র নমুনা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করিলাম। কথাগুলি লিখিয়া মনে হইতেছে রেবন্ত, তোমার প্রতি ঋণ কিয়দংশে শোধ হইল। তামাম শোধ করিতে হইলে যে পরিশ্রম করিতে হইবে তাহা এই পৌঢ়ের পক্ষে বড়োই কঠিন এক এক প্রস্তাব।

চিরকূটটিতে এইবার লিখিতে হইবে। পুনরায় বাতায়ন দিয়া সমীরণ আসিতেছে। মৃদুমন্দ। ঘরে পাখাও ঘুরিতেছে। কাল স্বস্ত্রীক পুরী এক্সপ্রেসে রওনা দিব। সমুদ্ররীরের হাওয়া ক্ষুধাবর্ধক। হয়তো গুরুপাক সমুদ্রের মৎস বা রামপাখির সুরুয়া খাওয়া হইবে। জগন্নাথ দেবের পবিত্র ভোগ ও পুরীর প্রসিদ্ধ খাজা ও ছানাপোড়া তো আছই। আমাদের দুজনেরই তো অজীর্ণ অম্বলের ব্যারাম আছে। তাই যাহা যাহা ঔষাধাদি অবশ্যই সঙ্গে লইব সেইগুলি চিরকূটে লিখিতেছি,

১। একোয়া টাইকীটিস, ২। মকরধ্বজ বটিকা, ৩। ডায়াপেপসিন, ৪। এনটেরোস্ট্রেপ

কাল এগুলি অবশ্যই খরিদ করিতে হইবে। হাজার হইলেও দূরদেশ। ভাষাও দূরহ। ঔষধগুলি সঙ্গে থাকিলে নির্ভাবনায় পাড়ি দেওয়া যাইবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন