শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

সঞ্জয় মন্ডল এর গল্পঃ সম্পর্ক

শুয়ে শুয়ে খোলা জানলার দিকে তাকালো নীলাদ্রি। আজকে তার এখনই ঘুম থেকে উঠবার একদম ইচ্ছে ছিল না। আর্ট কলেজ ছুটি। একটু আলসেমি ঘুম দেবে ভেবেছিলো। কিন্তু নাঃ। ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। একবার ভেঙ্গে গেলে আর এ ঘুম এখন কিছুতেই জোড়া লাগবে না। চায়ের তেষ্টা পেল, তবু কিছুতেই বিছানা ছেড়ে উঠতেও ইচ্ছে করছে না। তখনই-

ডোরবেলটা বাজলো মনে হলো।

অনিল আর সুনন্দা আসবে। আর্ট কলেজেই ওদের সাথে দেখা হয়েছিল। বন্ধু? নাঃ, ঠিক বন্ধুও নয়, তরল-বন্ধু। বেশী পরিচিত। স্রেফ আড্ডা মারবে বলে আসবে। ছুটির দিন। ছুটির দিনে একা ঘরে বসে থাকলে বড্ড একঘেঁয়ে লাগে যদি না নতুন কোন চিন্তা-ভাবনা মাথায় চক্কর না কাটে। মদ্যপানটাও একটু বেশী হয়ে যায়। আর ভাবনাটা একবার ছোঁয়া পেলে তখন অন্য কাউকে আর ভালো লাগে না। ওয়ার্করুমের ওই চার-দেওয়ালের মধ্যে সারাটা দিন, কখনো রাতও কেটে যায়। 

কিন্তু ওরা তো আসবে দশটার সময়! এখন আবার কে এলো?

ঘুমচোখে একরাশ অনিচ্ছা নিয়ে দরজা খুলে যাকে দেখল সে অর্পিতা ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। সিঁড়ির শেষের একধাপ আগে একটু তেরছাভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যতই সে বেঁকে দাঁড়িয়ে থাকুক নীলাদ্রির চিনতে এক মুহূর্তের বেশী সময় লাগেনি। লাগবার কথাও নয়। সাত বছরে সে এতটুকুও পাল্টায়নি। কিংবা, পাল্টেছে বইকি। সেটা সাতবছর আগেই পাল্টে গিয়েছিল। 

‘বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নিশ্চয় আসোনি, ভেতরে এসো’ – নিজের স্বরটা তার নিজের কাছেই গম্ভীর শোনাল।

অর্পিতার মনে হলো সে এক্ষুনি ফিরে যেতে পারলে ভালো হতো কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়। এখানে আসার আগে সে অনেকদিন ধরে ভেবেছে। মনে মনে এই সিঁড়িগুলোর এক-একটা ধাপে সে অনেকবার পা রেখেও ফিরে গেছে। অনেক...অনেকদিন। নীলাদ্রির কাছে না আসার জন্য যতগুলো যুক্তি সে বারবার সযত্নে বেছেছে, তার থেকে অন্তত একটা বেশী যুক্তি এখানে আসার জন্য তার সামনে খাড়া হয়ে গেছে অনায়াসে। শিক্ষিত, সহজবোধ্য বিচারে যে কারণটা খুব স্বাভাবিক ভাবে এসে যায় সেটা হলো, যে মেয়ে আজ থেকে সাত বছর আগে আপাত কোন কারণ ছাড়াই একঘন্টার নোটিশে নীলাদ্রির সাথে দেড় বছরের সম্ভাবনাময় সম্পর্ককে সিগারেটের শেষাংশের মতো টুস্‌কি মেরে ছুঁড়ে ফেলেছিলো, সে কেন আবার নিলাদ্রির সাথে দেখা করতে এসেছে। এতবছর পরে? কেন? 

অর্পিতা নিলাদ্রীর পেছন পেছন ঘরে ঢুকলো। ঘর তো নয়, হলঘর। ড্রয়িংরুম। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সবকিছুই নিখুঁত পরিপাট করে সাজানো। কোথাও অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই। প্রতিটি জিনিস এমনভাবে রাখা আছে যে বোঝা গেল না ঘরের ইণ্টিরিয়র ডিজাইন অনুযায়ী প্রতিটি জিনিস কেনা হয়েছিলো না কেনা জিনিসগুলো ঠিকভাবে সাজানোর জন্যই ঘরের নকশা করা হয়েছে। 

নিলাদ্রি পেছন ফিরে ঘুরে বলল, ‘চাইলে সদর দরজাটা খোলা রাখতে পারো, কাগজে ছবি বেরিয়েছে কিন্তু অল্পবয়সী, এমন আর্টিস্টদের লোকে, বিশেষকরে মেয়েরা একদম বিশ্বাস করে না। অবশ্য তুমি তো বিবাহিতা, তার উপর সে বিয়ে পাঁচ-ছ বছরের পুরানো। তবু, সেক্ষেত্রে তোমার সম্বন্ধেও ভাবার অবকাশ আছে। কি বল?’

- অনেক রাগ আছে জমে আছে তোমার, বুঝতেই পারছি।

- সে তো সবারই থাকে। আমারও ছিল। এখনো আছে।

- এখনো? এতদিন পরে?

- শিল্পীদের তো সেটাই তো মূলধন। স্টার্টিং ক্যাপিটাল। গাড়ির ইঞ্জিনে ফুয়েল জেট যেমন নিয়ন্ত্রিত ভাবে তেলকে ইঞ্জিনে পৌঁছে দেয়, ঠিক তেমনি। আমরা জীবন থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে যত রাগ, যন্ত্রণা, দুঃখ এসব জোগাড় করি, সেগুলো ধীরে ধীরে সযত্নে ব্যবহার করি। আর তোমরা যারা আমাদের বাহবা দাও তারা সেসবই বাজির বারুদের মত একটা পুঁটলি করে পকেটে রাখো। একদিন ইচ্ছে হলো, দিয়ে দিলাম তুবড়ির সলতেয় আগুন। একটা দুম্। কয়েক মুহূর্তের আলো আর শব্দ। সব শেষ।

- বাঃ, বেশ গুছিয়ে কথা বলতে শিখেছো তো।

- বলো, আঁতেল হয়েছো। বললেও চলে যেতে বলবো না। সে ভয় নেই।

- সেটা জানি, সেটা বলতে পারলে, আই-হোল দিয়ে দেখার পরে দরজা না খুললেও পারতে।

- তাই? হুমম্ – নিলাদ্রীর ভ্রূ কুঞ্চিত হলো। দড়াম্ করে উল্টোদিকে ঘুরে সোজাসুজি অর্পিতার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘এবার বল তো, আমার কাছে কেন?’ অর্পিতাকে দৃষ্টি ঘোরানোর সুযোগই দিল না সে।

- বসতেও বলবে না? এক কাপ চা ও দেবে না? – অর্পিতা প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইল।

- তোমার সাথে তো আমার ভদ্রতা করার সম্পর্ক নয়, পরিষ্কার নিভাঁজ চাদর সোফাতে পাতা আছে, যতক্ষণ চাও বসতে পারো। - খোঁচাটা বুঝতে পারল অর্পিতা, তার আজন্ম অহেতুক খুঁতখুঁতেমিকে ভালই করেই জানে নিলাদ্রী।

টেবিলের উপর রাখা কাঁচের জগ থেকে জল সরাসরি গলায় ঢেলে দিলো। উঃ, গলাটা একেবারে শুকিয়ে কাঠ। যত না বাসস্ট্যান্ড থেকে হেঁটে আসার ধকলে, তার থেকেও বেশী প্রথম কথাটা, প্রথম দেখাটা, প্রথম উত্তরটা কিভাবে আসবে-যাবে সেটাই ভাবতেই বেশ টেনশন হচ্ছিল। এতদিন পরে, যতই প্রথম প্রেম হোক না কেন কিন্তু সেই প্রেম থেকে বেরিয়েও তো সেই এসেছিল প্রথমে।

নিলাদ্রীও অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেও আড়চোখে দেখতে ভুললো না সেই আগের মতোই জল খাওয়ার সময় অর্পিতার ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল উপত্যকার দিকে গড়িয়ে গেল মসৃণভাবে। কলেজের ক্যান্টিনেও সে নোংরা, ছোপধরা গ্লাসগুলোকে এড়াতে বোতল থেকে সরাসরি জল খেতে গিয়ে এমনই করতো। এভাবে দেখাটা ঠিক না বেঠিক জানে না। লক্ষ্য করল এখনো কি রঙ, কি ঔজ্জ্বল্য। কি করে থাকে এই বয়সে। এতদিনের বিয়ে, ছেলেপুলে। যাক, এসব ভেবে তার আর লাভ কি।

- আর চা – অর্পিতাই নৈঃশব্দ্য ভাঙ্গলো।

- দিতে পারি, মেশিনের চা, পছন্দ হবে না।

- চা হলেই হবে, সব পছন্দ ভালো হবে বা সব ভালোগুলো পছন্দ হবে তার কি মানে আছে – ভেজা গলায় টুক করে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলল, শব্দ হোল না।

- বাবাঃ, দারুণ কথা বলছো তো, অবশ্য সে তো আর আজকের ব্যাপার নয়। পেটে থাকতে তোমার মা খুব ন্যুডলস খেয়েছিলেন মনে হয়...পেঁচালো কথা ছাড়া আর কিছু বেরোয় না। 

- ঘরগুলো ঘুরে দেখব – শব্দ তিনটে ছুঁড়ে দিল। জিগ্যেস করাও নয়, অনুমতি নেওয়া তো নয়ই।

- যা ইচ্ছে করতে পারো, আগে ও করেছো, আমি কি বাধা দিয়েছি কখনো?

- এদিক ওদিক ছড়ানো-ছেটানো বান্ধবীদের ছবিগুলো সরিয়ে রাখবে না?

- বান্ধবীরা নিজেরাই আসে। আমি কাউকে নিজে থেকে নিয়ে আসি না। তাই তাদের একটাও ছবি নেই – বলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো

- ইসস্, একটাও ছবি নেই? আমি তো ভাবলাম কত বান্ধবীর ছবি দেখব আর দেখব কে আমার থেকে বেশী সুন্দরী।

নিলাদ্রী দরজার মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়ালো। বলল, ‘সে গুড়ে বালি, তোমারও কোন ছবি এখানে খুঁজে পাবেনা’। বলেই সে ভেতরে ঢুকে গেল।

অর্পিতা কি সেটা একবারও ভাবে নি? আশাহত হলো? সে কি আশা করেছিলো যে কোন এক ড্রয়ারের পেছনে অথবা পুরোনো বইয়ের ভেতরের পাতায় একদম হলুদ হয়ে যাওয়া সেই শান্তিনিকেতনে তোলা গ্রুপ ফটোটা নিশ্চয় থাকবে। তাহলে কি কোথাও তার কোন ছবি নিলাদ্রীর কাছে নেই? স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট? ঘোলাটে বা ধোঁয়াটে? কোথাও কোন ছবি? তাহলে এসে কি লাভ হলো।

ওয়ার্করুমটাও বেশ বড়, আসবাবপত্র কিছু নেই। চারিদিকে কাগজ, তুলি, রঙ, ইজেল সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এরকমই হয় শুনেছে। নতুনত্ব কিছু নেই। বড্ড অগোছালো। শিল্পী মাত্রেই হয় হয়তো। কিন্তু নিলাদ্রী ভেতরে ভেতরে অসম্ভব রকমের গোছালো মানুষ। বিশেষকরে চিন্তাভাবনায় সে অসাধারণ সুশৃঙ্খল। টুকরো টুকরো বিক্ষিপ্ত কিন্তু ক্ষণস্থায়ী সদ্য-নতুন চিন্তা-ভাবনার সূত্রগুলোকে কি অকল্পনীয় সুন্দর রূপ দেয় সেটা যে সলতে পাকানোর সময় থেকে দেখেনি সে প্রদীপ জ্বলার পরে তার শিখা দেখে কিছুই আন্দাজ করতে পারবে না। 

সে দেখেছে, সে জানতো, সে অনুভব করেছে। গভীরভাবে করেছে। এখনো কি করে?

অবশ্যই করে। নইলে কলেজে এত সুপুরুষ আর স্মার্ট ছেলে থাকতে কেন নিলাদ্রীকেই তার চোখে পড়ল। বলা ভালো, নিলাদ্রির চোখেই তার চোখ পড়ল। সেই চোখ, সেই সুন্দর গভীর চোখ। উজ্জ্বল, নরম কিন্তু আগুন আছে। কবিরা শুধু মেয়েদের চোখই দেখে, কোন কোন পুরুষের চোখের সামনে দাঁড়ালে যে সারা শরীরে সুনামি আসে সেটা অর্পিতা খুব গভীর ভাবে বোঝে। যেন মনে হয় কে যেন একজন একটা মোমবাতির নরম আলো নিয়ে হৃদয়ের খনিমুখ থেকে একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে তাকে আলোকিত করতে করতে নেমে যাচ্ছে অতল গভীরে। উন্মোচিত হচ্ছে যত অজানা সম্পদ। তার নিজের হৃদয়, তাও কি সে সবকিছু জানতো নিলাদ্রী তার জীবনে না এলে?

এত গভীরভাবে চেয়েও তাকে গ্রহণ করতে পারে নি। 

- এই যে চা রইল এই টেবিলে – কখন যে নিলাদ্রী এই ঘরে ঢুকেছে অর্পিতা খেয়াল করেনি। 

- বাঃ, বেশ একটা সুগন্ধ উঠছে তো, মেশিনের চায়ের এত সুবাস?

- না, দার্জিলিং, নিজের হাতে করলাম।

- তাই? তলানিতে দরদ একটু পড়েছিলো না কি? – অর্পিতা ভ্রূকুটি হানল।

- দরদ কিংবা দর্দ সেটা তুমি কি বুঝবে। ওই যে বললাম, আমরা সব কঞ্জুসের মতো খরচ করি। কিন্তু আর মনে হয় বেশী নেই। কিছু নতুন দুঃখ জোগাড় করতে হবে এবার।

- সে তো দেখতেই পারছি, নতুন কাজে হাত দিয়েছো। মাটি কবে থেকে মিডিয়াম হলো-

- কিছুদিন আগে থেকে। তুলি, রঙ একঘেয়ে লাগছিলো। তাই ভাবলাম হাতগুলো একটু নোংরা করে দেখি।

অর্পিতা ভাবল, তোমার হাত কোনদিন নোংরা হবে না নিলাদ্রী। যেসময়ে আজকের ছেলেরা দু’কাপ কফি শেষ করার আগে বিছানার দিকে হাত বাড়ায়, সে তুমি আমার হাতদুটো ধরা ছাড়া কখনো অন্যায় স্পর্শ করো নি।

- ছাড়ো ওসব মাটির কথা, চায়ে চুমুক দিতে দিতেই বল, আসার কারণ কি? আর তারও আগে বল আমি যে এখানে আস্তানা গেড়েছি সেটা জানলে কি করে – অর্পিতার ভাবনার জাল ছিন্ন হলো।

- বিখ্যাত মানুষের খবর জানতে হয় না, কাগজে বেরোয়।

- তাই? আর কি বেরোয়? ওই তিন নম্বর পাতায়?

- অনেককিছু। কখন প্যাস্টেল থেকে জল হলো। তেলের পোঁচের টান লম্বা হচ্ছে কখন। সবই। কিন্তু সেবারে তো মাটির কোন কাজ কিছু নন্দনে দেখলাম না।

- সেকি, তুমি? তুমি ছবিও দেখতে যাও? বরের সেবা করার পরে এত সময় পাও কোথায়?

- শোন, এ-গ্রেড অফিসারের বৌ-দের এতো কাজ থাকে না, বুঝলে? আর ঐসব অফিসারদের চারপাশে এত লোকজন সেবা করার জন্য ঘুরঘুর করে যে, সারাক্ষণ অফিসারদের হাতে তেল লেগে থাকে। আর তুমি তো ভালই জানো, আমার একেই তেল চুকচুকে মুখ, তেলা হাতের ছোঁয়া আর বেশী ভাল লাগে না।

- কাব্য ও শিখেছ দেখছি।

- কেন ? ওগুলোতে বুঝি শুধু তোমাদেরই রাজত্ব?

- ছাড়ো, আসল কথায় এসো। দশটা বাজতে গেল, আবার কেউ এসে পড়বে।

- কে? কত নম্বর?

- দু’জন আসবার কথা, আর্ট কলেজের। আসতেও পারে, নাও আসতে পারে। কিন্তু, এসে পড়লে কথা হবে না। আল-ফাল গল্প হবে আর মাল খাবে সব বসে বসে।

- তাহলে অন্যদিন হবে, তাড়াহুড়ো নেই তো কিছু।

- না, না, যা বলার আজই বলো। ব্যাপারটা যে খুব হাল্কা নয় সেটা আন্দাজ করা খুব কঠিন নয়। যে মেয়ে নিজের থেকে একটা সম্পর্ককে গলা টিপে মেরে দিয়ে চলে যেতে পারে, সে খুব জোরালো কারণ না থাকলে সাত বছর পরে? শুধু দেখা করতে? আত্মসম্মানে লাগবে না?

খোঁচাটা আবার ঠিক জায়গাতেই দিয়েছে। টুপ্‌ টুপ্‌ করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। জ্বালাও আছে। কিন্তু এসব জেনেও, এসব ভেবেও সে এসেছে। দিগন্তবিস্তৃত শূন্যতা আর দিনের পর দিন একাকীত্বের যন্ত্রণার থেকে এটুকু অপমান সহ্য হয়তো করা যায়। করতেই হবে। সে নিজেকে অনেকদিন ধরে প্রস্তুত করেছে। একেলা, একাকী, একাগ্রে, একান্তে। আর অপমানই বলব কেন! সে যে নিলাদ্রীকে অপমান করেছিল। দু’জনের পারস্পরিক ভালবাসাকে অপমান করেছিল। এই সাত বছরে সে তো সুদে-মূলে দ্বিগুণ হবেই।

- ঠিক আছে, চলো, ঐ ঘরটাতে বসা যাক।

- কতক্ষণ লাগবে? ঠাণ্ডা পানীয়তে হবে না হার্ড চলবে? তোমার আবার চলে না ওসব।

- বললাম না, এ-গ্রেড অফিসারের বৌ-দের সব চলে। সব চলতে হয়, চালাতেও হয়।

- গুড, ভেরী-গুড, চলো, তাহলে একযাত্রায় আবার পৃথক ফল কেন?

স্কচের বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে নিলাদ্রী বলল, শুরু করো। সূচীপত্র, ভণিতা, ভূমিকা সব বাদ দিয়ে সোজা গল্পে এসো। শুরুটা কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে না পারলে স্কচে এক চুমুক মেরে শুরু করো। দেখবে, গল-গল করে বমির মতো সব দুদ্দাড় বেরিয়ে আসছে।

- তাই? ভাবছি- 

- ঠিক আছে, আমি হেল্প করছি, তুমি তার মধ্যে দু’পাত্তর ঢুকু-ঢুকু করে মেরে দাও। দেখবে ফুরফুরে লাগছে। তা বরের সাথে বনিবনা হচ্ছে না?

- ধূর। এই বয়সে, এতদিন বিয়ে হবার পরে বনিবনা আবার কিসের? 

- ওঃ, তাই বলো।

- তাল গাছের ঝাড় দেখেছ। যখন ছোট থাকে, ঘেঁষাঘেঁষি করে বড় হয়। আর পাতাগুলো যখন আর সব সবুজ থাকে না তখন পাশাপাশি দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থেকেও লম্বা দু’টো তালগাছদের দু’জন দু’জনকে কখনো ছুঁতে দেখেছো?

- ওঃ হরি, অভিমান? চল্লিশ পেরিয়ে মধ্যবয়সী সমস্যা?

- না।

- তবে? বরের প্রোমোশন আটকে আছে? ছবির আঁকার দৌলতে আমার অবশ্য ওরকম তেল চুকচুকে পেট মোটা, টাকওলা কিছু উপর দিকের লোকজনের সাথে চেনাশোনা আছে। কিন্তু মুস্কিল কি আমার তো কোন চাকরিই নেই।

- না, সেসব নয়।

- একি, গ্লাসের অর্ধেকও তো খালি হয়নি। ঠিক আছে, তোমার কথা তো শুনবই। একটা ব্যাপার আমার কাছে আজও খটকা আছে।

- আমি কেন তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম। তাইতো?

- বাবাঃ, জ্ঞান তো দেখছি টনটনে আছে।

- সেদিন ও ছিলো। জ্ঞান আমার চিরদিনই একটু বেশী টনটনে। আজ যেমন এমনি আসিনি, সেদিনও তেমনি এমনিই চলে যাইনি। অনেকদিন ধরে অনেক ভেবেছিলাম। কারণ সেটাতেও আজকের মতোই মরণ-বাঁচনের প্রশ্ন ছিলো যে। 

- সেকি?

- শুনবে? ধাক্কা লাগবে না তো?

- আবার কি ধাক্কা লাগবে। এতদিন পরে? বরং এখন হয়তো অনেকটা নির্লিপ্ত ভাবে শুনতে পারব।

- তোমাকে আমি ছেড়ে গেছিলাম, তোমার জন্য নয়। তোমার কোন দোষের জন্য নয়। বরং সে সময়ে যত ছেলে আমাকে প্রপোজ করেছিলো তারা কেউই তোমার থেকে উঁচুদরের ছিল না। না দেখতে শুনতে, শিক্ষাদীক্ষায়, বুদ্ধিতে বা সৃষ্টিশীলতায়। এরকম কাউকে কোন মেয়ে না চায়! আর তুমি তো আমাকে কোনভাবে কোনদিন অসম্মানও করো নি। কোনভাবেই না। কিন্তু... – অর্পিতার গলার স্বর বুজে এলো কান্নায়। নিলাদ্রির অলক্ষ্যে চশমার ফাঁক গলে একফোঁটা জল চোখ থেকে হাতে ধরা গ্লাসের পানীয়তে মিশে গেল নিমেষে।

- তুমি কাঁদছো? নিলাদ্রীর কাঠিন্যও যেন একটু নরম হলো। আবার বলল, ‘তুমি কাঁদছো? তুমি?’

- নীল, আমাকে আজ একটু কাঁদতে দাও, প্লিজ...

ঘরে এখন এই মধ্যদুপুরে হটাৎ করে যেন মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা। নিলাদ্রীর কিছু বলার নেই এখন। শুধু সেই সেদিন পড়ন্ত বিকেলে হাওড়া স্টেশনের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে সে দেখেছিলো অর্পিতা চলমান ব্যান্ডেল লোকালের কামরায় অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর চারদিকে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার।

- সেদিন কিন্তু তুমি একবারও ফিরে তাকালে না, ট্রেনে ওঠার পরেও না।

- ইচ্ছে ক রেই তাকাই নি, তাকালে আমার আর ফিরে যাওয়া হতো না।

- কেন? আমাদের তো কোন সমস্যা ছিল না। আমি তখন বিবিএ-র থার্ড ইয়ারে। চাকরি যে পাবোই সে তুমি জানতে। হ্যাঁ, তুমি অবশ্য পয়সাওলা ঘরের মেয়ে ছিলে। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা তো কোনো বড়লোকের মেয়ের সাথে গরীবের ছেলের গল্প ছিলনা। 

- তা ছিল না, কিন্তু একটা ছিল।

- সেটা বিরাট কিছু ছিলনা, আঁকতাম ঠিকই। হয়তো আঁকা বন্ধ রেখে চাকরি করতাম। সে তো আমাদের দেশে কতলোকই করে।

অর্পিতা একটুখানি চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সজল চোখে নিলাদ্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নীল, সেটাই আমার কাছে বড় ছিলো। আমি জানতাম, খুব জোরের সাথে জানতাম যে তুমি একবার চাকরিতে ঢুকে পড়লে তুমি আর আঁকবে না। তুমি জেদি। নতুন জীবনের টানে তুমি টাকার পেছনে ছুটবে, ছুটতেই হবে। ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হবে। ছবি তোমার হারিয়ে যাবে। আর তার সাথে সাথে ম্নান হতে থাকবে আমাদের ভালোবাসা। হারিয়ে যাবে সবকিছু যা আমরা একসাথে অনুভব করেছিলাম। আর তোমার জীবন থেকে ছবি হারিয়ে গেলে, তোমার সৃষ্টি হারিয়ে গেলে আমিও আর তোমার থাকতাম না। আলমারিতে রাখা দামি শাড়ির মতো ন্যাপথলিন দিয়ে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে। ছুঁয়েও দেখতে না কখনো।

আবার বেল বাজলো। উঃ, এমন কর্কশভাবে বাজাচ্ছে কেন? 

দরজা খুলতেই পরিচিত চেহারা। সুনন্দা। উদ্বিগ্ন মুখ। কি হয়েছে। অনিল কোথায়?

- সে আর বোলো না, মেইন রোড থেকে বেরিয়েই তোমাদের গলিতে ঢোকার মুখে উল্টোদিক থেকে আসা একটা বাইকের সাথে ধাক্কা। 

- সেকি?

- বিশেষ কিছু হয়নি। গলির মুখ বলে দু’জনেই আস্তে চালাচ্ছিলো। 

- অনিলের বেশী লাগেনি তো

- না, বেশী লাগেনি। হাতে আর পায়ে একটু ছড়ে গেছে। 

- সে কোথায়, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে?

- সেরকম কিছু নয়। অনি বলল, তুমি ওর বাইকটা নিয়ে তোমার এই হাউজিং-এ রেখে দাও। আমি ওকে কাছের কোন হাসপাতালে বা একটা বড় ওষুধের দোকানে নিয়ে গিয়ে ড্রেসিং করিয়ে আনছি।

- ওকে, ঠিক আছে। এক মিনিট দাঁড়াও- 

- খোলা দরজা দিয়ে অর্পিতা সবই শুনতে পেল, কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে এলো না। পাজামার উপর প্যান্টটা পরেই নিলাদ্রী বেরিয়ে এলো। দরজার কাছে এসে বলল, ‘আমি আধঘন্টার মধ্যে ফিরে আসছি। দরজাটা একটু লাগিয়ে দাও। যদিও কেউ আসবে না, তবু এলে একটু বসতে বোলো।’

ওরা দু’জনে বেরিয়ে যাবার সময় অর্পিতা শুনতে পেল, মেয়েটি কে জিগ্যেস করায় নিলাদ্রি বলল, ‘অর্পিতা, আমার সাথে কলেজে পড়ত’

- ওঃ, সেই অর্পিতা। দ্য ওল্ড ফ্লেম? – সিঁড়িতে ওদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই অর্পিতা দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।

বারান্দাটা চওড়া না হলেও বেশ লম্বা। সেখান থেকে দেখা যায় সামনে একটা খেলার মাঠ। বেশ ভালো লাগল। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতেই ভাবনাটা ফিরে এলো। আর একবার রিহার্সাল দেবে? দুপুরের একা ঘরে এরকমভাবে কাল্পনিক নিলাদ্রীকে নিজের সামনে খাড়া করে কতবার সে একই কথোপকথন কতবার চালিয়েছে। বলল –

- নীল...

- বল। কি বলতে চাও

- তুমি কি ভাব, আমি কেমন আছি? আমি কি সুখে আছি।

- লোকে যেমন সুখে থাকে। স্বামী, পুত্র-কন্যা, ছোট পরিবার। আর্থিকভাবে সচ্ছল। বছরে একবার-দু’বার বেড়াতে যাওয়া। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বাড়িতে এলে সুখের রঙিন দেওয়ালটাই শুধু দেখতে পায়। দিনের পর দিন। 

- আমার সবই আছে নীল। হয়ত একটু বেশীই আছে। কিন্তু কিছুই যে নেই...

- আমার কাছে কি চাও?

- সন্তান।

- হোয়াট? কি বলছো আবোল-তাবোল।

- যা বলছি শোন। মন দিয়ে শোন। আমার এখনো কোন ছেলেপুলে হয়নি। হবেও না।

- কেন? তিনি কি অক্ষম? সব পুরুষই কোথাও না কোথাও ব্যর্থ। সফল পুরুষ বলে কোন জীব হয় না।

- না, সেরকম নয়

- তো? টেস্ট টিউব বেবি তো কোন ব্যাপারই নয় আজকাল।

- জানি, অনেক চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু ওর স্পার্ম কাউন্ট কম। এত কম যে ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে।

- কেন? খুব মদ খায়? নেশা করে? কোলের উপর ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করে।

- তুমি থামবে?

- সেক্ষেত্রে, তোমাকে ডোনারের সাহায্য নিতে হবে।

- সে জন্যই তোমার কাছে এসেছি, তুমি পারো না ডোনেট করতে? 

- আমি? আমিই কেন? 

- এরমধ্যে তো কোন লজ্জা নেই নীল। আজকাল তো কত লোক দান করে, বিবাহিত লোকেরাও করে।

- সে তো করেই। স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে তারা সবকিছু টেস্ট করিয়ে নেয়। শুধু পরিচয় গোপন রাখে।

- সেটাই তো আমি চাইনা নীল। যে পুরুষটিকে আমি কোন দিন দেখিনি, জানিনা সে কেমন। তার চেয়ে তুমি তো আমার অনেক কাছের।

- অনেক কাছের? তাই না?

- জানি তুমি একথা বলবে। তুমি যতই অপমান করো সহ্য করবো কিন্তু এটাতো আমাদের মানতেই হবে যে আমরা একদিন পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসে কাছে এসেছিলাম।

- আমি তোমাকে কোনদিন অপমান করিনি। তুমি যেদিন আমাকে ছেড়ে ওরকম ভাবে চলে গিয়েছিলে তারপরেও না। তোমাকে অপমান করলে আমার নিজের ভালবাসাকে অপমান করা হয়। সেটা তো জানো!

- তাহলে তোমার কিসে আপত্তি? আমি জানব তুমিই সেই পুরুষ। সেই সুপুরুষ, যে সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত, শিল্পী। আর তার থেকেও সবচেয়ে বড়, সে হবে আমাদের ভালোবাসার সন্তান, আমাদের দু’জনের প্রথম ভালবাসার প্রথম সন্তান। আমি তো আর কিছু চাইনা নীল। আমাকে এটুকু দিতে পারনা...নীল, নীল আমাকে এ-টুকু দিতে পারনা।

অর্পিতা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। দেখল সে চেয়ারেই বসে আছে। মাথার দু’পাশের রগদু’টো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা। নতুন কিছু নয়। যখনই কোনকিছু এরকমভাবে চিন্তা করে তখনই আজকাল এই যন্ত্রণাটা ফিরে ফিরে আসে। আর থাকা যাচ্ছে না। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দিলো ভালো করে। মাথাটা তুলে সামনে তাকাতেই আয়নার সামনে যেন ধরা পড়ে গেল অর্পিতা। চমকে উঠল প্রতিবিম্বিত অর্পিতার দিকে তাকিয়ে। সেই প্রতিবিম্বিত অর্পিতা বলে উঠল, ‘তুমি কি করে জানলে নিলাদ্রী রাজি হবে তোমার প্রস্তাবে?’

- হবেই, হতেই হবে, এছাড়া আমি বাঁচব কি করে।

- তোমার স্বামী যদি মত না দেয়?

- সে মত দিয়েছে।

- কিন্তু সে তো মত দিয়েছে স্পার্ম-সেন্টার থেকে নেবার জন্য। সেখানে তো ডোনারের পরিচয় গোপন রাখার কথা। এখানে তো তা হচ্ছে না। যখন সে জানবে যে তোমার প্রেমিক দান করেছে আর তখন সে যদি আগত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে?

- আমি ডিভোর্স নেব, সন্তানের উপর তার মায়ের অধিকার প্রথমে।

- কিন্তু, আর একটা কথা ভুলে যাচ্ছো অর্পিতা...

- কি কথা?

- তুমি সবাইকে অস্বীকার করতে পারো, কিন্তু নীল যদি কোনদিন সেই সন্তানের দাবিদার হয়? একক দাবিদার... 

- না-আ-আ-আ-আ... এ হতে পারে না, হতে পারে না - অর্পিতা প্রচন্ড আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল। বেসিনের উপর রাখা শ্যাম্পুর বোতলটা দিয়ে আয়নার ওপারের অর্পিতাকে বারংবার আঘাত করতে করতে সে মেঝেতে কাটা কলাগাছের প্রাণহীন শবের মতো বসে পড়ল। রক্তশূন্য মুখে তার সমস্ত চেতনার মতোই আয়নার প্রতিবিম্বিত অর্পিতা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ার মাঝে অমোঘ দৈববানীর মতো সে শুনতে পেল, ‘অর্পিতা এটাই হবে। এটাই হবে অর্পিতা। তুমি তোমার ভালবাসা আর সন্তান দু’টোই হারাবে। একূল-ওকূল দুকূলই যাবে তোমার’।


ঠিক কতক্ষণ সে অচেতন ছিল জানে না। প্রচন্ড ঝড়ে আদ্যন্ত বিধ্বস্ত অর্পিতা ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এসে দেখল নীল তখনও বাড়িতে ফেরেনি। সে দরজার বাইরে বেরিয়ে এসে আস্তে করে ছিটকিনিটা টেনে দিয়ে সিঁড়ির প্রথমধাপে পা রাখল।


     

Displaying Sanjoy_pp.jpg


লেখক পরিচিতি : 
জন্ম সাল                                             ১৯৬৯
জন্মস্থান                                             চিত্তরঞ্জন, বর্ধমান
বর্তমান আবাসস্থল                               কলকাতা
পেশা                                                 তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কর্মরত


৫টি মন্তব্য: