শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

চন্দন আনোয়ারের গল্প : স্কাইপ ও দুটি মৃত্যুমুখ

স্ত্রী শায়লার মৃত্যুর পরে ভয়ানক বিষণ্নতায় মজে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জজ হাসান। বুকের ব্যথায় ঘুম হয় না রাতে। মধ্যরাতের দিকে আকস্মিক কেঁদে ওঠে বিরহিনী কেউ। এই কান্নার শব্দ নিচের কোনো একটি রুম থেকে পরকীয়া প্রেমের প্রেমিকার মতো জড়োসড়ো হয়ে নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে জজ হাসানের বেডরুমে, কিছুক্ষণ বেডরুমে ঘোরাফেরা করে, তারপর কখন যে মগজে ঢুকে আচ্ছন্ন অসাড় করে ফেলে শরীর! মৃত্যু-ক্লান্ত চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে জজ হাসান আবিষ্কার করেন, মৃত্যুর চিহ্ন চোখ থেকে সংক্রমিত হয়ে ছড়িয়ে গেছে তার শরীরের সবখানে। চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য মৃত্যু ব্যাঙাচির মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। লোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় মৃত্যু। নিশ্বাসের গরম বাতাস মৃত্যুচিহ্নিত। এ সময় এক মধ্যরাতে ক্ষুধার্ত মূমুর্ষু একটি কুকুর-শাবক জজ হাসানের জানালার গ্রিলে চার হাত-পা প্যাঁচিয়ে মৃত্যুর আগে বাঁচার শেষ চেষ্টা করছিল।
বিষণ্নে নিমজ্জমান জজ হাসান ভাবলেন, মৃত্যুই বুঝি এভাবে জানালার গ্রিল জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে আছে। তিনি এগিয়ে গেলেই ধরে নেবে। মৃত্যুর দিকে অবজ্ঞার চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। কানাডার অধিবাসী একমাত্র মেয়েটির আর ভার্জিনিয়ার অধিবাসী দ্বিতীয় ছেলেটির মুখের ছবি ভেসে ওঠে। বড় ছেলেটি সপ্তাহখানেক আগেই কনসালটেন্সির ফাঁক গলিয়ে দশ মিনিটের জন্যে দেখে গেছে এবং শাসিয়ে গেছে, বাবা, শরীরের খুব অনিয়ম হচ্ছে! এই ছেলের মুখটা এখনো ঝাপসা হয়নি। গত বছর মার্চের এক শুক্রবারে বাবাকে উত্তরায় নিজের ফ্লাটে এক বিকেলের জন্যে নিয়েও গিয়েছিল। এতো তাড়তাড়ি ভুলে যাননি এসব। প্রয়াত স্ত্রী শায়লার কথা ভাববার দরকার নেই। সেখানেই যাচ্ছেন যখন। কানাডা-ভার্জিনিয়া-উত্তরা ঘুরে যখন ফিরছেন, তখনি একবার নাতি-নাতনিদের কথা ভাবলেন। আশ্চর্য, ওদের একজনেরও নাম-চেহারা স্মৃতিতে নেই। ঐ স্থানটি আগাছা জন্মানো পতিত জমির মতো ফাঁকা পড়ে আছে।

জজ হাসান ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছেন, আর শেষ ভাবনাটি ভাবছেন, সকালে কাজের মেয়েটি এসে যখন কলিংবেল টিপবে, সাড়াশব্দ না পেয়ে...। বিদ্যুতের যা অবস্থা, স্কাইপ যদি ওপেন না হয়, তবে তার মৃত্যুমুখ কানাডায় ভার্জিনিয়ায় পৌঁছবে কি করে? মেয়ে-ছেলে দুজনেই ভীষণ কষ্ট পাবে।

গ্রিলে হাত স্পর্শ করতেই ক্ষুধার্ত শাবকটি বড়শির টোপ গেলার মতো জজ হাসানের তর্জনি মুখে ঢুকিয়ে কুঁ কুঁ শব্দ করে মায়ের স্তন চোষার মতো চুষতে লাগলো। জজের মৃত্যু-আক্রান্ত শরীর কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। ভর্জিনিয়ার ছেলেটি এভাবেই আঙুল চুষতো। ওর নিজের ছোট ছোট আঙুল চুষে পোষাতো না বলে বাবা না হয় মা’র আঙুল চুষে লাল বানিয়ে ফেলতো। তখন তিনি ঘুম কামাই করে ছেলের মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকতেন। দুই বছর পর্যন্ত ছেলেটি বাবা-মার আঙুলকে খাদ্য মনে করেছিল। ছেলে অভ্যাস ছেড়ে দিলেও আঙুলের শিরশির অনুভব ছিল বহুবছর। এত বছর পরে আঙুলে ফের শিরশির অনুভব জেগে উঠলো। ক্ষুধার্ত ককুর-শাবকটি বরফের কাঠির মতো চিকন ছোট হাত-পা দিয়ে গ্রিল পিষে ফেলে জজ হাসানের বুকে লাফিয়ে পড়তে মরিয়া। ওর কচি শরীরেই বরং গ্রিল ঢুকে পড়ছে।

কিভাবে বাঁচানো যায় শাবকটিকে? জজ হাসান ভেবে কোনো পথ পাচ্ছেন না। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভেতরে আনা অসম্ভব। দো-তলা থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে কুড়িয়ে আনতে গেলে মৃত্যুর সম্ভাবনা। হঠাৎ শাবকটি নিজেই এই সংকটের সমাধান বের করে দিলো। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে ধপাস করে নিচে পড়ে গেলো।

জজ হাসান যখন শাবকটিকে কুড়িয়ে হাতে নিলেন, তখন তার কোনো ধরনের নড়াচড়া ছিলো না। জীবিত কি মৃত বোঝা যায়নি। রুমের মেঝেতে রাখতেই শাবকটি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অবশ্য শরীর কাঁপছে। ক্ষুধায়। জজ হাসানের রাগ হলো। এর সবটাই অভিনয়! বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে ইচ্ছে হলো। ওর প্রতি ন্যায়বিচার হবে কি না ভাবতে গিয়ে দমে গেলেন। ভাবলেন, গরিব ক্ষুধার্তের দেশের আমার স্কলার সন্তানেরা কানাডা ভার্জিনিয়ার জানালার শিক ধরে এভাবেই মুমূর্ষু চেহারা নিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে।

জজ হাসান ফ্রিজ থেকে মাছের তরকারি বাটিতে করে শাবকটির সামনে রাখলেন। বললেন, এই অভিনয় কে শেখালো তোকে? কদিনের জীবনে এই অভিনয় শিখে নিলি কি করে! মোবাইল বেজে ওঠে। মোবাইল কানে নিয়ে অভ্যস্তমতো ‘বাবা’ বললেন। ছেলেটির কন্ঠে ভীষণ আবেগ, বাবা, এভাবেই তুমি চলবে? রাতে ঘুমাবে না! আর কিছুই না, ছেলেমেয়েদের টেনশনে রাখার ষড়যন্ত্র! ছেলের কথার কঠিন জবাব জজ হাসানের কণ্ঠপর্যন্ত উঠে এসেছিল। কিন্তু থেমে গেলেন। ভার্জিনিয়া দিনের দুপুর, ছেলের শরীর জুড়ে ভার্জিনিয়ার ধনী রোদ, আর তার বাংলাদেশে এখানে রাতের দুপুর এবং তার ভেতর-বাইরে এখন আঁততায়ী অন্ধকার। ষড়যন্ত্র তো তারই করার কথা!

ছেলে ফোন রাখার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কানাডা থেকে মেয়েটি ফোন করবে। ছেলের মতো কন্ঠে আবেগ হবে। ঘুরেফিরে একটিই অনুরোধ করবে, বাবা, তোমার স্কাইপ খোলো। তোমার মুখটা দেখবো। জজ হাসান মেয়ের এই অনুরোধটি কিছুতেই রাখবেন না। তার স্ত্রীর মৃত্যুমুখ কানাডায় মেয়েকে, ভার্জিনিয়ায় ছেলেকে স্কাইপে দেখানো হয়েছিল। এরপরে আর স্কাইপ খোলেন না। শুধু হেসে এড়িয়ে যান, দেখবে দেখবে। একদিন তো দেখবেই।

খাদ্যপর্ব শেষ করে মনের সুখে লাফালাফিতে মেতে উঠলো ককুর-শাবকটি। কথা বলার ব্যস্ততার মধ্যে টের পাননি জজ হাসান। তিনি আবিষ্কার করেন, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে শাবকটি তার নিজের শরীর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এই ককুর-সন্তানটি আর কি কি করে তা দেখার কৌতূহল নিয়ে খাটের এক কোণে নিঃশব্দে বসে পড়েন। মনে মনে হাসেন আর বলেন, বাহ! তুই দেখছি ইংরেজের মতো চালাক। পেটের বাণিজ্য করতে এসে মসনদ দখল করে নিলি!

শাবকটি ড্রেসিং টেবিল থেকে লাফিয়ে নামলো। জজের দিকে একনজর তাকালো। তারপর ছোট্ট লেজটিকে নাড়িয়ে শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে রুম থেকে বের হলো। এবার জজ হাসান বসা থেকে উঠে শিকারি বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পিছনে পিছনে হাঁটেন। এক ইউনিটের দো-তলা বাড়ির আট রুম মিলিয়ে একা একজন মানুষ মাত্র। সব রুমেই দরজা-জানালা খোলা রাখেন আলো-বাতাস ঢোকার জন্যে। রাতে রুমে রুমে লাইট জ্বালিয়ে রাখেন। অন্ধকার, মৃত্যু আর একাকিত্বকে চিরকাল ভীষণ ভয় করে আসছেন। দুপুরে একজন কাজের মেয়ে আসে। ত্বড়িতবেগে ঘর ঝাড়া-মোছা, খাবার রেডি করে দুপুর থাকতেই বিদায় নেয়।

কুকুর-শাবকটি খুব সতর্কভাবে থাবা ফেলছে। এখন আর লাফাচ্ছে না। ডাইনিংয়ের একটি চেয়ারে একবার লাফিয়ে উঠেই নেমে গেলো। একে একে দ্বিতীয়তলার সবগুলি রুম ঘোরা হয়ে গেলে নিচে নামার জন্যে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলো। দরজার বাইরে দু’পা বাড়িয়ে কি ভেবে পেছনে ফিরলো। একবার হাই তোলে, ঘুম ঘুম চোখে জজের দিকে তাকিয়ে, সাবেক জায়গায় এসে হাত-পা গুটিয়ে বড় একটি রসগোল্লার মতো গোল হয়ে শুয়ে পড়ে। জজ হাসান খাটে হেলান দিয়ে শাবকটির এতক্ষণের কাজগুলির কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লেন, যখন চোখ খুললেন তখন সকাল সাড়ে নয়টা। তার চোখজুড়ে বিস্ময়। স্ত্রী শায়লার মৃত্যুর পরে এমন নিবিড় ঘুম হয় না। শাবকটিকে নিয়ে মেতে ছিলেন যে সময়, সেই সময়টায় বুকের ব্যথাটার কথা ভুলে ছিলেন। হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়া এ কারণেই। সঙ্গপ্রাপ্তির এই আনন্দ জজ হাসানের জীবনে নতুন এক আবিষ্কার। ঘুমমগ্ন কুকুর-শাবকটির দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকান। রাতের নিবিড় ঘুম সম্পূর্ণ ওর দান। হাই তুলে বিছানায় উঠে বসতে বসতে ওকে ডাকলেন, কি রে, ওঠ্।

শাবকটি চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করে দুনিয়া দেখে ফের ঘুমের দেশে চলে গেল। জজ হাসান ভাবেন, মেয়েটি ছিল লক্ষ্মী, একবার ডাকলেই বাবা বলে লাফিয়ে উঠতো। ছেলে দুটি ছিল অলস, ঘুমকাতুরে। সকালের নাস্তা থেকে স্কুলের ক্লাসে পৌঁছার পর্যন্ত ম্যারাথন ঘুম ঘুমাতো।

জজ হাসান সকালের নাস্তার জন্যে কয়েকটি বিস্কুট একটি বাটিতে নিয়ে খাটের উপরে বসেছেন মাত্র, আর তখনি শাবকটি ঘুমের মধ্যেই লাফ মারে। এক লাফে খাটের ওপরে। কোমরে ভর দিয়ে জজের মুখোমুখি বসে বিস্কুটগুলোর দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ে। একবার জর্জের দিকে, একবার বিস্কুটগুলোর দিকে তাকায় অভিমান ভরা ছোট ছোট চোখ দিয়ে। ওকে রেখে একা নাস্তার আয়োজনে এই অভিমান!

‘অধিকার!’ ‘অভিমান!!’ জজ হাসান হেসে ওঠে হাত বাড়াতেই শাবকটি লাফিয়ে তার কোলে ওঠে। ওর শরীরে বোঁটাকা গন্ধ। নাম্, নাম্, বলে কোল থেকে নামিয়ে দুই ঠ্যাং ধরে উঁচিয়ে বাথরুমের দিকে দৌড়ালেন, আগে তোকে গোসল করিয়ে নেই। সাবান-শ্যাম্পু মাখিয়ে শরীর ধুয়েমুছে ওকে যখন দাঁড় করালেন, দেখলেন চেহারার রঙ-ই পাল্টে গেছে। ময়লা হলুদ রঙের শরীর গাঢ় সোনালি রঙ ধারণ করেছে। জজ হাসান মিটমিট করে হাসেন, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে বলেন, ছেলে, দেখ্, তোর কি রূপ! ‘ছেলে’ শব্দটি মুখ দিয়ে বের হবার সাথে সাথে জজ হাসানের শরীরটা পুরনো আমলের রেল ইঞ্জিন স্টার্ট দেবার মতো কেঁপে উঠলো। বুকের ঘুমানো ব্যথাটা জেগে উঠলো মনে হয়। তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। গোটা পাঁচেক বিস্কুট রাখলেন রাতের বাটিতে। ‘এই আয়’ বলে তিনবার ডাকলেন। শাবকটির কোনো সাড়া নেই। আদুরে কণ্ঠে ডাকলেন, আয় বাবা! জ্বালাসনি। এবার এক লাফে খাবারের সামনে। এবার জজ হাসান বুঝে গেলেন, তার কাছে শাবকটি কি অধিকার দাবি করছে।

কলিং বেল বেজে উঠলে জজ হাসান চমকে উঠলেন। এখন উপায়? কোথায় লুকাবো? শাবকটিকে কোলো নিয়ে ছোটাছুটি করতে লাগলেন। লুকানোর মতো এক ইঞ্চি জায়গাও পেলেন না। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবে না মেয়েমানুষটি। চলে যেতে পারলেই খুশি। ধ্যাত্! কি পাগলামি করছি। লুকাবো কেনো? আমার ফ্লাটে আমি কি করি কে দেখবে? আর দেখলেই বা কি? বলে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েই বারান্দার গিয়ে চাবি ফেললেন। রুমের দরজা খুললেন শাবকটিকে কোলে নিয়েই।

বিস্ময়, বুয়া বিষয়টিকে গুরুত্বই দিলো না! একবার তাকালো বটে, কিন্তু আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার মধ্যে। জজ হাসান নিজে থেকেই বললেন, কিছু বললে না যে!

‘কি খালু?’ বুয়ার চোখে বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা।

এই যে কুকর কোলে নিয়ে আছি।

বস্তিতে কুকুরে-মানুষে মিশমিশালির জীবন বুয়ার। ওর কাছে কুকুর সন্তানের মতো। মানুষের সংসারেরই কেউ। তাই জজ হাসানের উৎকণ্ঠা ধরতে পারে না। বলে, হেরে পাইলেন কই? দেহেন, আপনের পুতের মতো কোলে চইড়া ক্যামন ড্যাব ড্যাব কইরা চাইয়া লইছে।

কাজটি কি ঠিক হচ্ছে? ভদ্রলোকের বাড়িতে কুকুর, কুকুরের সঙ্গে ভদ্রলোকের ওঠাবসা। জজ হাসান বললেন।

এবার বুয়া জজ হাসানের উৎকণ্ঠা কারণ ধরতে পারে। শাবকটিকে নিজের কোলে নিয়ে দুই গালে দুটি চুমো দিয়ে নাকে নাক ঘষে বলে, ওরে সোনা রে! তোর রাজ কপাল! ফেরত দিতে দিতে বলে, আপনি একলাই তো থাকেন। ক্যাডা আইবো দেখতে।

জজ হাসানের দ্বিধা কাটিয়ে দিলো বুয়া। এখন ওর একটা নাম দিতে হবে। তিন অক্ষরের নাম তার বিশেষ পছন্দের। তিন ছেলেমেয়ের ডাকনাম তিন অক্ষরের। ছোট ছেলের নাম সুমন, এর নাম সুজন হলে মিলে ভালো। ‘সুজন’ নামটিই ঠিক করে ফেলেন। শাবকটির মুখ উপরে তুলে চোখের দিকে চোখ করে নাম জানিয়ে দিলেন।

জজ হাসানের ব্যস্ততা ভীষণ বেড়ে গেলো। উল্টাপাল্টা অনেক কাজ করে তাকে সারাক্ষণ তটস্থ ও টেনশন রাখে সুজন। প্রাত্যহিক কাজকর্ম সব ওলটপালট করে ফেলে। চারটে চার রঙের ক্রিকেট বল ও আর কিছু খেলনা কিনে আনেন। খেলনা নিয়ে খেলার চেয়ে ক্রিকেট বল নিয়ে খেলাই বেশি পছন্দ সুজনের। একা একাই খেলে না। জজ হাসান বল ঠেলে পাঠান সুজনের দিকে, আর সুজন ঠেলে পাঠায় তার দিকে। ধীরে ধীরে গোলপোস্ট তৈরি হয়। দুজনেই প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে বল ঢোকাতে মরিয়া। জজ কোনো রকমের অনিয়ম করলে সুজন বলের উপরে দুই পা তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা ওর প্রতিবাদ। খেলতে খেলতে জজ হাসানের দুটি চোখই ঝাপসা হয়ে আসে। খেজুরের রস পড়ার মতো চোখ থেকে ফোটায় ফোটায় অশ্রু টপটপ করে নিচে পড়ে। ঝাপসা চোখে তখন আর সুজনকে খেলা করতে দেখেন না। তিনটি শিশুর তিন দু গুণে ছ-টি ছোট ছোট পা এলোমেলো ছোটাছুটি করে বল নিয়ে। চিৎকার করে। এ ওকে ধাক্কা মারে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিচার নিয়ে আসে বাবার কাছে। বাবার কাছে সুবিচার না পেলে রান্নাঘর থেকে মা-কে ডেকে আনে।

জজ হাসান ছ-মাস ধরে বুকের ব্যথার ওষুধ ছেড়ে দিয়েছেন। ডাক্তার বললেন, এখন ওষুধ ছাড়াই ভালো থাকবেন। মিষ্টি আর গরু-খাঁসির মাংস পরিমিত খাবেন, আর সবই পেটভরে জানভরে খাবেন। কারো জন্যে টেনশন করবেন না, মনভরে হাসবেন, বুকভরে শ্বাস নিবেন, নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন।

সুজন দিনমান ধরে এমন সব পাগলামি করে, খেলা করে, জজ হাসান হাসবেন আর কত! ড্রেসিং টেবিলের গ্লাসের সামনে গিয়ে লেজ দিয়ে চাবুক মারার মতো বারি মারে নিজের শরীরে। মেজাজ খুব চাঙা থাকলে দুই ট্যাঙের উপরে ভর দিয়ে সামনে দুই ঠ্যাং মানুষের হাতের মতো ঝুলিয়ে হাঁটে। যখন-তখন জজের উপরে রাগ-অভিমান তো আছেই। রেগে গেলে সোজা নিচে নেমে যায়। কোনো একটা রুমে চুপ করে বসে থাকে। আর অভিমান হলে ডাকলে সাড়া দেয় না। খেতে চায় না। গোসল করতে চায় না। আবার, জজ হাসান যদি রেগে যান, অভিমানবশত কাছে না ডাকেন, সুজন দক্ষ অভিনেতার মতো চোখেমুখে কি যে অসহায়ভাব ফুটিয়ে তোলে! তাকানো যায় না। বেশি বেশি শরীর ঘেষাঘেষি করে। চোখভর্তি মায়া নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জজ হাসানের দিকে।

সুজনের শরীর, হাত-পা খুব বাড়ন্ত। দুই বছরের মধ্যেই যুবক হয়ে ওঠে। এই দুই বছরের মধ্যে বড় ছেলে দু’বার বাবাকে দেখে গেছে। এই দুবারই কয়েক মিনিটের জন্যে সুজনকে নিচের একটি রুমে বন্দি থাকতে হয়েছিল। এছাড়া এই ফ্লাটের সর্বত্রই সুজনের রাজত্ব।

সুজনের আগের মতো আবেগ নেই। কিছু কিছু আচরণ খুব নিষ্ঠুর। খাবার-গোসল নিয়ে খুব জ্বালায়। জজ যদি একটা কিছু অনিয়ম করে প্রায় তেড়ে ওঠে। বিশেষ করে, রাতজাগা সুজন সহ্য করে না। রাত ১২টা বাজলেই লাফিয়ে চেঁচিয়ে চাপা গর্জন করে এমন সিনক্রিয়েট করে, জজ তখন তাড়িঘড়ি করে লাইট বন্ধ করে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়েন। শুয়ে পড়লেই শেষ নয়, ঘুমাতে হবে। খাবারের অনিয়ম বা ঔষধের অনিয়ম করলেই ধরে ফেলে।

বাবা নিয়িমিত ঘুমাচ্ছে, খাচ্ছে, টেনশন নেই। কানাডায় মেয়ে, ভার্জির্নিয়ায় ছেলে এখন টেনশন ফ্রি। রাত ১২টার মধ্যেই কল করে। খুশি মন নিয়ে বাবার সাথে গল্প করতে চায়। কিন্তু জজকে ১২টার মধ্যে ঘুমাতেই হবে। গল্প করার সময় কোথায়?

আরো এক বছর গেলো। শীত নামছে কেবল। জজ হাসান কম্বল মুড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। মধ্যরাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা টের পেলেন। ঘুম ভেঙে গেলো। তিন বছর পরে বুকের ব্যথাটা ফিরলো কেন! আতঙ্কগ্রস্ত জজ একটি গোঙানির শব্দ অথবা কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। এই শব্দ নিচে থেকে উঠে আসছে। মনে হচ্ছে মড়া সামনে নিয়ে চাপাকণ্ঠে কাঁদছে কেউ। কম্বল সরিয়ে অবাক হলেন জজ হাসান। মেঝেতে সুজন নেই। বুকের ব্যথা নিয়েই উপরের সবকটি রুমে সুজন সুজন বলে ডাকাডাকি করে সুজনের কোনো সাড়া পেলেন না। ওর বাথরুমের দরজাটি খোলা। এবার নিচতলায় নেমে এলেন। যে রুমে তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন, সেই রুমে চার-হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে সুজন কাঁদছে!

জজ হাসান সুজনের মুখ উপরে তুলে বলেন, কি রে, কি হলো? এমন মড়াকান্না জুড়ে দিলি যে! মা-বাবার কথা মনে পড়লো? কানাডায় মেয়েটা, ভাজির্নিয়ায় ছেলেটা কাঁদে আমার জন্যে। ওদের বাবার জন্যে। তোর মা-বাবার খবর পেলি? চল। এখনি নিয়ে যাবো তোকে? উনারা কোথায় আছেন, আমাকে নিয়ে চল। আমিও তো বাবা! উপরে চল। বলে জজ উঠে দাঁড়ালেন। সুজনের কোনো নড়াচড়া নেই। আগের মতোই কাঁদছে।

রাতের অবশিষ্টাংশ জজ হাসান বুকের ব্যথা নিয়ে জেগে ছিলেন। দুপুরের আগে পর্যন্ত একই ব্যথা নিয়ে অসহায়ের মতো কতবার যে উপর-নিচ করলেন, আর কতবার যে সুজনকে মিনতি জানালেন, কিন্তু ফল হয়নি। বুয়া আসার পরেই তার শরণাপন্ন হলেন, সুজন রাত থেকেই কাঁদছে। কি অসুখ হয়েছে তুমি একটু দেখবা? না মনের দুঃখে কাঁদছে।

বুয়া চমকে উঠল, হে খালু! কি বলেন? কুকুর কাঁদলে অমঙ্গল হয়। কুকুর কাঁদা ভালো কথা না?

জজ হাসানের বুকের উজানি ব্যথাটা এবার দ্বিগুণ হয়ে গেল। হু বলে কুকিয়ে ওঠে ধমকালেন বুয়াকে, বাজে কথা ছাড়ো। এসব কুসংস্কার। তোমার ছেলে-মেয়ে কয়জন?

চারজন।

স্বামীটা?

হদিস নাই।

আমার আর কিছুই নেই। ছোট্ট এই বাড়িটা ছাড়া। জজ ছিলাম। বেতনের টাকা দিয়ে ছোট ছেলে আর মেয়েটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং আর বড় ছেলেটাকে ডাক্তারি পড়িয়েছি। ওরা এখন সুখে আছে। বাড়িটা ওদের দরকার নেই। এখানে আসবেও না। আসলেও বিক্রি করে টাকা নিতে আসতে পারে। এখন সুজনকে নিয়েই চিন্তা। আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়? বলে জজ হাসান বুয়ার মুখের দিকে তাকালেন। খুব ভাল করে শেষ নিরীক্ষণ করে নিশ্চিত হলেন, মেয়েমানুষটির চোখে-মুখে চালাকি, চাতুরি, ধূর্তামির রেখাচিহ্ন নেই। এবার প্রস্তাব করলেন, তুমি একটা অনুরোধ রাখবে?

বুয়া কথার সাড়া দিলো, জ্বি খালু!

ধরো, এই বাড়িটা আমি সুজনের নামে লিখে দিয়ে গেলাম। পাওয়ার অব এটর্নি দিয়ে গেলাম তোমাকে। তুমি সুজনকে দেখাশোনা করবে, আর ছেলেমেয়ে নিয়ে এই বাসাতেই থাকবে। ইচ্ছে করলে নিচতলাটা ভাড়া দিতে পারবে। চারটা রুম আছে। ওই ভাড়ার টাকা দিয়ে তোমাদের চলে যাবে। এবার জজ হাসান থামলেন। অসহায়ভাবে তাকালেন বুয়ার দিকে। গলা কাটা পরেও একটা দুইটা রগ কাটা না পড়ায় মোরগ যেমন কোনো মতে মাথাটাকে উপরে তোলার চেষ্টা করে, তবু মাথা নিচে ঝুঁকে আসে, তেমনি জজ হাসানের পাকা চুলভর্তি মাথাটি নিচে ঝুলে আসছে। ঝুলে ঝুলেই বলছেন, তুমি রাখবেন না আমার অনুরোধ? সুজন আমাকে পিতৃসুখ দিয়েছে। ওর জন্যে জীবনে শেষ কটা দিন বেঁচে থাকার সত্যিকার আনন্দ কি জেনে গেলাম। ওকে বাড়িটা না দিয়ে গেলে নিমকহারামি হবে। তুমি আমার মেয়ের মতো। রাখবে না আমার অনুরোধটা? সুজন মারা গেলে বাড়িটা তোমার ছেলেমেয়েই পাবে। সেভাবেই লিখে দিয়ে যাবো।

বুয়া স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, খালু কি বলেন! আপনি মরবেন কেরে? দোয়া করি, আপনি মেলা বছর বাঁচেন। আল্লার কাছে দোয়া করি, আমার আয়ু নিয়া আপনে যেন মেলা দিন বাঁইচা থাকেন। গরিব মাইনসের বাঁচা আর মড়া এক কথা!

সমস্ত দিন গেল। সুজন কেঁদেই চলছে। জজ হাসান ভাবছেন, কোনো অবিচার কি করেছি ওর ওপরে? খাওয়া দাওয়া ছেড়ে এভাবে কাঁদতে থাকলে তো আজকে রাতটাই পার হবে না। সুজন খাচ্ছে না, জজ হাসান পানি আর শুকনো বিস্কুট ছাড়া কিছুই মুখে তুলেননি। বুয়ার রান্না করা খাবারের ঢাকনাটা পর্যন্ত খোলেননি।

দিনশেষে সন্ধ্যা নামতেই সব রুমে লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। তবু আলো ঠেলে অন্ধকার যেন রুমেই ঢুকছে। রাত নামতে নামতে জজ হাসানের ভিতরে অন্ধকারের ভয় মারাত্মক হয়ে উঠলো। অন্ধকার যেন হৃদপিণ্ডের চারদিকে কালো গেলাপ পরিয়ে তার নিশ্বাস একেবারে বন্ধ করে ফেলতে চাচ্ছে।

রাত দশটার দিকে সুজনের জন্যে বাটি ভরে ভাজা মাছ নিয়ে নিচে গেলেন জজ হাসান। তার চোখ দুটি ভিজে আসছে। সুজনের দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। শরীর মেঝেয় মিশে যাচ্ছে, পানি ঝরে ঝরে দুটি চোখ এখন গর্ত। সুজনের শরীরের হাত রেখে বললেন, সারাজীবন আমি মানুষের উপরে সুবিচার করে এসেছি, তোর উপরে অবিচার করবো না রে সুজন। এ কথা তুই ভুলেও ভাবিস না। তুই আমার জীবনের শেষদিনগুলিতে বাঁচার আনন্দ দিয়েছিস। তুই কেন কাঁদছিস একবার যদি বলতি। জজ হাসান এইকথাগুলোই বলতে পারেন সুজনকে। খাবারের জন্যে অনুরোধ করার সময় পাননি। মারাত্মক বুকের ব্যথায় চোখে আন্ধকার নেমে আসে। সুজনের সামনে বাটিটা রেখে উঠে গেলেন। নিচতলা থেকে দো-তলায় উঠার সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করতে যেন এক দশক পার হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল বাজার শব্দ কানে আসছে। কানাডা থেকে মেয়েটা কল করেছে, না আজকে ভার্জিনিয়া থেকে ছেলেটা আগে করেছে।


রুমে ঢুকেই জজ হাসান ভয়ানক এক মরণ-চিৎকার দিয়ে উঠলেন, শায়লা! তুমি? আমাকে নিতে এসেছো?

লেখক পরিচিতি
চন্দন আনোয়ার
গল্পকার, সঙ্কলক
সম্পাদক--গল্পকথা।

রাজশাহীতে থাকেন।
প্রকাশিত গল্পের বই--
পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর
প্রবন্ধ : উজানের চিন্তক--হাসান আজিজুল হক


২টি মন্তব্য:



  1. পড়লাম স্যার।ভালো লাগলো গল্পটি।স্ত্রীহারা জজ সাহেবের একাকিত্বের অসহায়ত্ব,ছেলে-মেয়ে থেকেও না থাকা,সুজনের আগমন সবকিছু মিলিয়ে
    অসাধারণ একটি গল্প...।সমাজ ও রাষ্ট্রের চরম বাস্তবতা ওঠে এসেছে গল্পটিতে।

    উত্তরমুছুন
  2. চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য মৃত্যু ব্যাঙাচির মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। এ রকম উপমা-ভর্তি গল্পটি ভালো লাগল খুব।

    উত্তরমুছুন