শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

শিমুল মাহমুদের গল্প : বাড়ি ফেরার তাড়না অথবা একটি হারিয়ে যাওয়া গল্প


আদিখণ্ড


করতোয়া, ঘুমিয়ে থাকা নদীর নাম। পাখিদের ঘুমের মতো ঘুম থেকে জেগে উঠলে কেউ তাকে প্রশ্ন করবে না কয়েক গুচ্ছ ঘাস কেনই বা ক্রমাগত যৌবনপ্রাপ্ত হতে হতে অতঃপর শুকিয়ে মিশে যায় পথ অথবা প্রান্তরে। অথবা দিগন্তের ক্লান্ত দৃষ্টিতে সবুজের শূন্যতা ছড়ানো মর্মবাতাসে ক্লান্ত পাখির ডানায় সূর্যের উষ্ণতা কেনই বা লুকিয়ে থাকে। এইসব প্রাকৃত জটিলতার রহস্য আমাদের জানা না থাকলেও এই শীতে উষ্ণতা বিলোবার মতো কারো কাছে কোনো প্রশ্ন না রেখেই পাহাড় অথবা দিগন্তের দিকে আমাদের কাউকে না কাউকে চলে যেতে হয়। এরপর আমার পালা। হয়তো বা তখন, পানপাত্র পূর্ণ করে দেবে কেউ, অন্য কোনো মানুষের জন্য।

পলিহীন করতোয়ার বুকে শূন্য দুপুর শুয়ে থাকে। মহাকালের ঘামের মতো ক্লান্তি নেমে আসে; পড়ন্ত সূর্যের আভা। তারপর বালু, বালুঝর, বালুবেলার গল্প। এই গল্প শেষ হবার নয়। এইখানে জনস্রোত ছিল। ছিল নৌকাবাইচ, মন ভাসানের নাও, মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারি না।

অতঃপর আমাদের পালা। পলিহীন শূন্যতা। করতোয়া ঘুমায়; এই ঘোরলাগা বর্ষায়ও ওর ঘুম ভাঙে না। এইভাবে চিরহরিৎ দেশে আমরাও ঘুমিয়ে থাকি; ঘুমিয়ে থাকি আমাদের পিতামহের মতো; আমাদের করতোয়া নদীর মতো; আমাদের পুরোনো গন্ধে ভরপুর ভেঙে পড়া জীর্ণ নগরের সাথে আমরা ঘুমিয়ে থাকি।

ঘুমিয়ে থাকে মাঠভর্তি ফসল; হাটভর্তি মানুষ আর মানুষের শ্বেতপক্ষী ইচ্ছেরা সবাই। এবং আমরা একদা একদিন আমাদের করতোয়ার নামে আমাদের মাতামহীর কাহিনি শুনেছিলাম। শুনতে শুনতে বিভোর; কানে আঙুল ঢুকিয়ে বলেছিলাম ইউনুস নবির কথা; মাছের পেটে ইউনুস নবি জায়নামাজ বিছিয়ে যখন সেজদায় ছিলেন তখন আমরা তেজপাতা বেচতে ব্যস্ত; আমরা সবাই পান সুপারি সওদা করতে ব্যস্ত; লবণ আর কেরোসিন সওদা করতে ব্যস্ত; আর ব্যস্ত ছিলাম মিঠাই ম-া অথবা এক ছটাক চা পাতা কিনতে। আমরা তখনও জানতাম না সেই বুধবার হাটের দিন, আমরা হাটের সবাই শেষ নবির উম্মত; বরং আমরা সবাই হাটের দক্ষিণে কৃষ্ণকলি কবিরাজের পাকুর গাছের নিচে গোল হয়ে বৃত্তাকার ভিড় তৈরি করে একটা নির্দিষ্ট বৃত্তকে ঘিরে সম্মোহিত; সবাই ইসমাইল ফকিরের বয়ানে বিভোর। ইসমাইল ফকির ইউনুস নবির কেচ্ছা শেষ করে ফেরাউনের দুর্দান্ত প্রতাপের কথা বয়ান করতে গিয়ে সিনায় সিনায় কলিজায় কলিজায় কী এক জৌলুস দাপটে চোখ উজ্জ্বল চিকচিক; অতঃপর রহিমা বিবির বার্ধক্যজনিত রোগ-ব্যধির দাওয়াই দিতে সরব কৌশলে আমাদের ছাগল অথবা মুরগি বেচা টাকায় ভাগ বসায়; তখন আমাদের মাথায় ঝিম ধরে।

তখন বর্ষা মৌসুম। এক জোড়া না হলেও অন্তত একটি সোয়া সের ওজনের ইলিশের কানকোতে কলার ছিলা ঢুকিয়ে বা হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে সন্ধ্যার দিগন্তে মুন্সিবাড়ি বরাবর হাঁটা ধরা জরুরি। অথচ আমাদের কারো কারো তখন চা পানের তেষ্টা পেয়ে বসলে আমরা সাময়িকের জন্য হলেও বাড়ি ফেরার তাড়না থেকে মুক্তি পাই।

তখন বর্ষা মৌসুম। অথচ তখন পর্যন্ত আমি অথবা আমার দেহ বর্ষার মর্মকথা বুঝে উঠতে শিখিনি; অথচ তারপরও শুধু মন আনচান করা কী এক উথাল পাথাল নিশিডাকের তাড়নায়; অথচ তখন ভর দুপুর, ভর দুপুরে আমাকে নিশিডাক পেয়ে বসলে আমি আমাদের গাঁয়ের কুসুম কুসুম বৃষ্টিধোয়া ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাই মুন্সিদাদার উত্তরমুখি দোচালার লম্বা ছায়া পেছনে ফেলে আরও দূর ভরদুপুরের পেটের ভেতর দিয়ে বৃষ্টিমাখা লাল রেল স্টেশন বরাবর; ভয়ানক একা আর উঁচু রেল-সিগনাল বরাবর; একজোড়া সমান্তরাল রেলপাত বরাবর; যে রেলপাতের ওপর ঝকঝকে একখানা আকাশ বুকে আগলে রেখেছে চামেলি বুবুদের একঝাঁক জালালি কবুতর। আর তখন কবুতরের বুকে কম্পন; সবুজ বৃষ্টি আর বাতাসের কম্পন; সেই কম্পনের সুর বহুদূর থেকে ভেসে আসতে থাকলে আমার ভেতরে একটা একবিকেল অথবা একদুপর তাজা ঝাউরঙা ফুল গল্প শোনাতে থাকে। বহু বহু দূর থেকে, আমাদের মাতামহীদের গ্রাম থেকে ভেসে আসে ভালোবাসার গল্প; সেই গল্প শুনে আমার ভেতরের বালকশাবক কেবলি গুমড়ে ওঠে; সেই কান্নায় আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলে আমার সামনে ভেসে ওঠে আমাদের মফস্বলের সেই একশ বছরের পুরোনো লাল রেল স্টেশন।

রেলস্টেশনের অনেক গল্প থাকে। রেলস্টেশনের অনেক গল্প হারিয়েও যায়। যেমন হারিয়ে যায় লাল লোকাল ট্রেনের ফিরে যাওয়া গমগমে ধোঁয়াতোলা তালহীন শব্দের ভিড়ে নিজের মতো করে একটা তাল খুঁজে নেওয়া একরাশ গমগমে আওয়াজ। সেই ঝাঁকতোলা আওয়াজ জমাট বাঁধার পর ধীরে ধীরে ছিড়ে যেতে থাকে; ছিড়ে যেতে যেতে ক্রমশ হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে যায় রেলইঞ্জিনের নাক থেকে বের হয়ে আসা গমগমে ধোঁয়া। সেই গমগমে ধোঁয়ার মতো হারিয়ে যাওয়া জমাট বাঁধা শব্দ যেমন হারিয়ে যায়, তেমনি রেলস্টেশনের অনেক গল্পও হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া গল্পের সাথে সাথে গল্পের মানুষগুলোও হারিয়ে যায়। কেউ কেউ একেবারেই হারিয়ে যায়; আকাশ অথবা স্মৃতিতে কোথাও তাদের ছবি ফুটিয়ে তোলা যায় না। তখন আমাদের ভেতর কেউ কেউ আমরা ছবিবিহীন, অবয়বহীন; যেন বা কোনোকালে কোনোদিন আমাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না কোথাও; আমাদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না কোথাও; না কোনো লাল রেলস্টেশনে অথবা সারিয়াকান্দির বাজারে।

হারিয়ে যায় লাল রেলস্টেশনের জটাধর রুস্তম পাগল; মালারানি হিজরা অথবা সুরবালা নামের ফেরিওয়ালা। সুরবালার ছোট ছাওয়া অথবা বাহারি ফিতা চুমকি ক্লিপ আলতা ¯েœা অথবা জাফর কিসলু শফিক নামের বাদামওয়ালা ঝালমুড়িওয়ালা বারোভাজাওয়ালা আচারওয়ালা অথবা শীতের রাতের লাল রেলস্টেশনে ‘এই ডিম গরম’ অথবা ‘এই চা গরম’ সবাই ওরা প্লাটফর্মের মানুষ, স্টেশনের মানুষ, ওরা সারিয়াকান্দির হাটের মানুষগুলোর মতো ওদের অতীত বিক্রি করে দিয়ে সওদা সাজাবার মতো কোনো তাবিজ বিক্রেতা অথবা ফেরিওয়ালা কেউ নেই। নেই ছেলেবেলাপুর লাল রেলস্টেশন; লাল রোদের মতো লাল কৃষ্ণচুড়া। কৃষ্ণ অর্থ কালো। অথচ তাকে হতে হয়েছিল রক্তের মতো লাল। আগুনের মতো গিজগিজে তরল। আর সেই গিজগিজে লাল রঙের ভিড় ঠেলে লাল টিকিট ঘরের ঘুলঘুলিতে স্টেশন মাস্টারের মাথার ওপর চড়–ই পাখির ঠোঁটে ঘর বাঁধার স্বপ্নে শুকনো তৃণ; তৃণশলাকার কৃশকায় শরীর ঘেঁষে চড়–ইয়ের চঞ্চল পাখা; আর আমরা ছেলেবেলাপুর স্টেশনে আমাদের অতীত, আমরা রেলস্টেশনের পাথুরে প্লাটফর্মের কোনো এক ফেরিওয়ালার কাছে অথবা সারিয়াকান্দির হাটে ইসমাইল ফকিরের দাওয়াই বিক্রির ভিড়ে আমরা আমাদের সেইসব সামাজিক অতীতগুলো গুটিকয়েক খুচরো পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি।

ব্রিটিশ আমলের কোনো এক রেলস্টেশনে আমরা দাঁড়িয়ে। শতাব্দিজোড়া জেগে থাকা কোনো গাছ, মেঘ, পাখি অথবা লালু গোপাল, ইউসুফ মল্লিক অথবা রামকৃষ্ণের সাথে আমরা আমাদের কালো কয়লার ইঞ্জিনের দিকে তাকিয়ে থাকি অথবা দীর্ঘ ট্রেনের দীর্ঘ কালোধোঁয়া, হুইসেল-আওয়াজ, দীর্ঘটানাচিৎকার ছেঁড়া ছেঁড়া কালো ধোঁয়ায় জড়ানো ছেড়া-আকাশ অথবা বুকের ওপর কালো চুলের কালোবেণী নিয়ে হেসে ওঠা রাধাবল্লভ দিদির গল্প সহসা আমাদের ভেতর ভেসে উঠলে আমরা ক্রমাগত নস্টালজিয়ায় ডুবতে ডুবতে; অথচ শতাব্দিছড়ানো নস্টালজিয়া কীভাবে ভেসে ওঠে অথবা শুধুই মতিভ্রম? আমাদের মাথায় জীবকোষ বিভাজনে প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে গেলে এইভাবে বহু দৃশ্য ঘটনা অথবা গল্পের জগৎ পাড়ি দিতে হয়। তখন ক্রমাগত সভ্য হয়ে ওঠা জনগণ আমার দিকে অবজ্ঞা ছুড়ে দিয়ে আনন্দে উত্তেজিত হলে রাতমরা একগুচ্ছ তারকা মহাশূন্যতার মহারহস্যময় গ্রন্থি ছিন্ন করে মাটির পৃথিবীর দিকে ক্রমাগত ধাবিত হতে হতে অবশেষে আমাদের দিদিমাদের আত্মা শূন্যতার সংখ্যা গুনে গুনে ক্লান্ত। কবরঘরে এখনও কিছু হাড়গোড় আছে যারা মাটির সাথে মিশে যায় না; অথবা মৃত মানুষের হাড়হাড্ডি জোড়া দিয়ে গল্প তৈরি হতে থাকলে আমরা একশ বছরের পুরোনো রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আমাদের দাদিমাদের কিশোর চপল দেহের ভেতর লালকৃষ্ণচুড়ার লাল রক্ত ফুটে উঠতে দেখি। আর তখন পাড়াগাঁর কোনো এক ময়দানে কানাই ঘোষের নাতি বাঞ্ছারাম ঘোষ ছড়া কাটে।

পলাশ শিমুল দুই ভাই
পথে পাইল মরা গাই
এক ভাইয়ে কয় থুইয়া যাই
এক ভাইয়ে কয় লইয়া যাই।

সেই সময়, কাকচক্ষু জল, পুকুরের ঘাটলা; চামেলি বুবু বসে কাপড় কাচে। চামেলি বুবুর পিঠে রোদ চমকায়। চামেলি বুবুর পিঠে বিজলী চমকায়। চামেলি বুবুর পিঠে, নিচুশূন্যতার শামিয়ানায় একজোড়া শালিক ওড়াওড়ি করে। চামেলি বুবুর পিঠের শূন্যতায় একজোড়া চোখ ওড়াওড়ি করে। চামেলি বুবুর শরীর ঘিরে লালকৃষ্ণচুড়ার পাপড়ি এক ধরনের ঘূর্ণিলাল আগুন তৈরি করলে চামেলি বুবুর দেহে যেন বা প্রেম জেগে ওঠে; সেই প্রেম থেকে লাল আভা বিচ্ছুরিত হয়। চামেলি বুবু কাকপক্ষী জলে, পুকুরের নীলাভ জলে খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের মুখখানা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে; তার পর ঝকঝকে হাসিতে পুকুরের জল কাঁপিয়ে তুললে আমার সাত আত্মা ক্রমাগত আমার চেয়ে বয়সে বড় জলপরীর নিকটবর্তী হয়; লাল আলোর আভা আমার চোখের দৃষ্টিতে ক্রমাগত উজ্জীবিত হয়; আমি আমার প্রথম কৈশোরে আমার চেয়ে বয়সে এগিয়ে থাকা প্রেমের উথাল পাথাল শূন্যতায় প্রথম বারের মতো সমাহিত হই। আমি আমার চোখের গভীর থেকে, আমি আমার হৃৎপি-ের গভীর থেকে জলের অনাবিল গভীরতায় বিচ্ছুরিত চামেলি বুবুর প্রশান্ত-গভীর নারীশরীর প্রথম বারের মতো স্বপ্নগ্রস্থ রাজকুমারের মতো অবলেহন করতে থাকলে সহসা উপলব্ধি করি সেই বালক বয়সেও আমি খানিকটা বয়োপ্রাপ্ত হয়েছিলাম; তা না হলে এখনও কেন গভীর রাতের আলোকিত অন্ধকারে আমার স্ত্রীর শরীর ও মনে চামেলি বুবুর শরীরের ঘ্রাণ খুঁজে পাই। আমার সমগ্র সুখি সমৃদ্ধ সংসার চামেলি বুবু দখল করে রেখেছে এবং আমি প্রতি স্ত্রীসহবাসের পর মনে ও দেহে সাহস সঞ্চয় করি, চামেলি বুবুর কাহিনি আমার স্ত্রীকে খুব সততার সাথে শোনাবো এবং নানাবিধ প্রিপারেশন অথবা তালবাহানার ভেতর দিয়ে সেই গল্প আমার মাথার ভেতরে যখন হাড়হাড্ডি সমেত শুকিয়ে ওঠে তখন আমি রীতিমত একজন আধুনিক নাগরিক; যে নাগরিকের এখন অনেক টাকা এবং সম্পদ।


উত্তরখণ্ড

সেই থেকে রফিক সাহেবের চামেলি নামের গ্রামের যুবতীটিকে আর ভুলে থাকা সম্ভব না হলে তার স্ত্রী ক্রমাগত ক্লান্তিতে বুড়িয়ে যেতে থাকে। আর তখন রফিক সাহেব সহসা ফিরে যান তার কৈশোরে; যে কৈশোরে ভেসে থাকে এক ঝাঁক পুকুর আর পদ্মপাতা অথবা পদ্মপাতার ওপড় বসে থাকা ডাহুকশাবক। আর তখন পুকুরের ওপড়ে একঝাঁক অল্প বয়েসি পরীকুমারী নৃত্য করে, গান গায়; নৃত্য করে, গান গায় আর লালকৃষ্ণচুড়ার পাপড়িতে ভর করে সমস্ত পুকুর জুড়ে আগুনের লালিমা চুইয়ে স্বর্গীয় কণ্ঠের পাখিকুমারীদের গান বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে; বৃষ্টি হয়ে ঝড়তে থাকলে মায়াবী দুপুরটা ক্রমাগত লজ্জাবতি বিকেলের মতো থরথর কাঁপতে থাকে। আর তখন বিটিভি থেকে ভেসে আসে, ও আমার দেশের মাটি তোমার বুকে ঠেকাই মাথা।

রফিক সাহেবের ভেতর একটা সাদা বকপাখি পাখা ঝাপটায়। রফিক সাহেবের ভেতর ক্রমাগত ঘুমিয়ে থাকা করতোয়া নদীর হারিয়ে যাওয়া গতি আলোড়ন সৃষ্টি করলে রফিক সাহেব বুধবারের হাট থেকে রাত করে ফেরার একটা উত্তেজনা অথবা রফিক সাহেব আজ এই শেষ যৌবনে প্রতি দিবসের মত বাড়ি ফেরার তাড়না বোধ করেন। রফিক সাহেবের চোখের ভেতর একজন বালক, একজন ঘুমিয়ে থাকা তরুণ কেবলি মাদল বাজাতে থাকে। আর তখন চোখের গভীরে হাজার অযুত মাইল দূর থেকে, হাজার অযুত গভীরতায় ভেসে ওঠে পুকুরজলের আলোড়নে পরীরাজকন্যা যেন তাকে গভীর আবেশে জড়িয়ে ধরেছে; চামেলি বুবু ভীষণ মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরেছে; আর তখন রফিক সহসা যেন পুরুষ হয়ে উঠতে থাকলে চামেলি বুবু সহসা চমকে ওঠে; আর তখন নিকট আকাশের গভীরতায় আলোর বিচ্ছুরণ; একঝাক যৌবনপ্রাপ্ত পরী কেবলি উড়ে উড়ে ওদের গান শোনাতে থাকে; হিজল পাতারা নড়ে চড়ে ওঠে; বাঁশঝাড় থেকে একটা লক্ষ্মী প্যাঁচা ডেকে ওঠে আর একঝাঁক শালিক ক্রমাগত গাছ বদল করতে থাকলে সেই দুপুরে কেবলি খা খা রোদ্দুর; পুরো পুকুরঘাট খা খা করতে থাকলে ওরা লোক চক্ষুর অন্তরালে নিজেরাই নিজেদের কাছে ধরা পড়ে যায়। সেই গ্রামের কেউ এই গল্প জানে না; এমন কী এখনও কেউ জানে না তার পরের গল্প; কেউ জানে না ছেলাবেলাপুরের রেলস্টেশনের গল্প।


তারপর এই ঘোর নাগরিক জীবনের মধ্যক্ষণে দাঁড়িয়ে রফিক সাহেবের ক্রমাগত এক ধরনের বোধ, এক ধরনের ক্লান্তিজনিত খেদ অথবা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত নিস্পৃহতা জন্ম নিতে থাকলে সেই পাড়াগাঁয়ের রফিক নামের বালকটি বুঝে যায় সে তার শরীরের কাছে পরাজিত। রফিক সাহেব মননে ও মনন চেতনায় পরাজিত; তিনি এখন ক্লান্ত। অথচ তিনি আজ নাগরিক জীবনের ওপর তলায় বসে আছেন। রফিক সাহেব বসে আছেন জীবিত মানুষের কাঠগড়ায় এবং সাহেবটা এক্ষণে বুঝে যান, তিনি পরাজিত।


রফিক ক্লান্ত। এবং অবশেষে এতদিনে সে বুঝে যায় রমণীদেহটা তার জন্য একটা বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। অথচ তখনও রফিকের মস্তিষ্কের কোন এক গুপ্ত কুঠুরিতে ঘুমিয়ে থাকে চামেলি বুবুর দেহ; ধারালো হাসি; এক ঝাঁক টিয়েপাখি অথবা ঘোরলাগা হাটের ভিড়ে ঘুরে ঘুরে ক্লান্তচোখে বাড়ি ফেরার উত্তেজনা; যে বাড়ির তিনঘর পরে চামেলি বুবু ঘরকন্নায় ব্যস্ত।


শহর থেকে এক টুকরো চিঠি ভেসে আসলে চামেলি বুবু অপেক্ষায় থাকে রফিকের হাট থেকে ফিরে আসা অবধি; আর তখন রাত কেবলি শুরু হলে চামেলি বুবুর মাটির মেঝের ওপর কুপি বাতির কাঁপুনিতে এলোমেলো বাংলা বর্ণমালায় সাজানো মামুলি ঘরকন্নার কথার ভেতর লুকানো এক ধরনের কামঘোর শ্বাস; সেই গোপন শ্বাস-প্রশ্বাসের তাড়নায় যখন চামেলি বুবুর বুকজোড়ায় এক ধরনের শূন্যতা ধুকপুক করতে থাকে তখন রফিক কিছুটা ঘন হয়ে এলে চামেলি বুবু ওকে প্রশ্রয় দেয়; সেই প্রশ্রয়ের ভেতর খুব সাবধানে কামতাড়না ধীরে অতি ধীরে এগিয়ে আসতে থাকলে সহসা চামেলি বুবু ওকে কাছে টানে; আর তখন একটা রাতজাগা লক্ষ্মীপ্যাঁচা ডেকে উঠলে চামেলি বুবুর বাতজ্বরে বেঘোর শ্বশুরের গলা থেকে কাশির শব্দ ভেসে আসতে থাকে; অথচ সেই কাশির শব্দের ভেতর ওরা এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ করতে থাকলে ক্রমাগত কামপর্ব দীর্ঘ হতে থাকে। তখন শীত মৌসুম। চামেলি বুবুর স্বামীর লেখা চিঠির সর্বশেষ কথামালা কসিটানা কাগজের ওপর কেবলি ঝাপসা হতে থাকে; যেখানে লেখা ছিল বুধবার হাটের দিন সে বাড়ি ফিরবে; লাল বৌয়ের পা রাঙানোর জন্য সে আলতা আর পমেড কিনে রেখেছে; হাট থেকে নিয়ে আসবে লোকনদানা; গাই গরুটার জন্য লবণ আর মার জন্য নোনা ইলিশ। অথচ তখন চামেলি বুবু ভুলে যায় ওর স্বামী বসির মিয়ার পদশব্দ অথবা খয়েরি কলাপেড়ে শাড়ির কথা।


আর তখন, যখন এইসব ছবি তখনও রফিকের পিছু ছাড়তে চায় না; অথচ তখন প্রায় এক যুগ অতিবাহিত হলেও রফিকের গাঁয়ে ফেরা হয় না; অথবা যে চামেলি বুবু বয়সে কিছুটা বড় হলেও এক ধরনের ঘোর অথবা যে চামেলি বুবু জীবনে প্রথম বারের মত রফিকের কৌমার্য হরণ করলে এক ধরনের নেশা রফিককে ক্রমাগত গভীর থেকে গভীরতর কোনো চোরাস্রোতে টেনে নিতে থাকলে কোনোক্রমে হাইস্কুলের সীমানা অতিক্রম করে মহাবিদ্যালয়ের আকর্ষণ ঠিক তাকে বেঁধে রাখতে পারে না; রফিক প্রতি সপ্তাহে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, অথবা বাড়ি ফেরার তাড়নায় কেবলি অস্থিরতা পাখা ঝাঁপটাতে থাকলে রফিকের বাপ দাদা চৌদ্দগুষ্টির ভিটেমাটি একদিন ঠিকঠিক বুঝে যায় রফিকের অতিঘন বাড়ি ফেরার তাড়নার ভেতর লুকিয়ে আছে চামেলি নামের হাড়চঞ্চল রমণীটির মায়াযাদু তাবিজ। অথচ চামেলির স্বামী বসির মিয়া বুঝতে চায়নি কখনও কোনোদিন অথবা অন্য কোনো কারণ হয়তো বা ছিল; আর তখন গ্রামের ছেলে বুড়ো আইবুড়ো রমণীদের ভেতর তেজপাতা মশলার মতো উড়তে থাকে বসির মিয়ার মর্দামি বিষয়ক অক্ষমতার গল্প। তখন একদিন মিয়া বাড়ির ইজ্জত রক্ষার্থে কোন এক সন্ধ্যায় বিচার শালিসের আয়োজন করা হলে রফিকদের চৌদ্দগুষ্ঠির কেলেঙ্কারি বিষয়ক হাড়জ্বালানো বাতাস অনেকটা বালিয়াড়িতে রূপ নেয়; রফিকের বাড়ি ফেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আর তখন রফিক ক্রমাগত অস্থিরতার চূড়ান্তে; অবশেষে ক্রমাগত মলিন মিইয়ে যেতে থাকলে রফিক ক্রমাগত নিজের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এবং অতঃপর একদিন, দীর্ঘ কৈশোরের দীর্ঘ অভ্যাসের পরও বিয়ের রাতে রফিক স্ত্রী রাশেদার কাছে পরাজিত হয়। রফিক ক্রমাগত নিজের ভেতরে নিজে মিইয়ে যেতে থাকলে এক ধরনের ঘরবিমুখ নেশা তাকে পেয়ে বসে; আর সেই ঘরবিমুখ নেশা তাকে ক্রমাগত সমাজের অলিগলি, ওপরে ওঠার পথ বাতলে দিতে থাকলে একদা একদিন রফিকের বোধোদয় ঘটে, সে তার স্ত্রী রাশেদাকে ঠিক চিনে উঠতে পারছে না। এবং তার এখন আর ক্ষুধা লাগে না; না দেহে; না মগজে। সে এখন স্থবির; তার কোনো উত্তেজনা পায় না; না দেহে; না মগজে। মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে; অথচ কারণে অকারণে প্রতিশোধের যন্ত্রণায় শরীর ঘেমে ওঠে না।

রফিক সাহেবের হঠাৎই একদিন ঘুম থেকে জেগে মনে হয় স্ত্রী রাশেদাকে তার এতিম বাবার কাছে রেখে আসবে। এক অর্থে আমরাওতো এতিম; আমাদের না আছে পুত্র, না আছে কন্যা অথবা কোনো দায়ভার; আমাদের সম্পদ অথবা অর্থ সবকিছুই এতিম। রফিক সাহেব যখন এমন অসম্ভবরকম অর্থহীনতার মধ্য দিয়ে তার চিন্তাস্রোতকে ছেড়ে দিয়েছেন তখন ডায়বেটিসের রোগি রাশেদা ম্যামের কেবলি খিদে পেতে শুরু করেছে। বাটারটোস্ট অথবা কফি অথবা আইস-ক্রেকার্স; মিহিদানার মতো মিশ্রি মেশানো শরবৎ পিপাসা অথবা গরম মসল্লার ঝাঁঝালো গন্ধে মাথা ঝিম ঝিম আকর্ষণে খুব বেশি ঝাল মেশানো কুচানো মাটন অথবা মিল্ক মিক্সড ক্যাসপার সালাড, বিফ সিজলিং; অর্থাৎ রাশেদা ম্যামের জন্য এখন যে কোনো উপাদেয় খাদ্য হারাম। তিনি এখন চামড়ার নিচে ইনসুলিন গ্রহণ করবেন; তারপর ২০ মিনিট পর লাল আটার এক টুকরো রুটি এক বাটি সবজির সাথে গ্রহণ করবেন; যে সবজিতে তেল মশলার অনুপাত হাস্যকরভাবে নিম্নমাত্রায়।

রাশেদা ম্যামের বয়স সবেমাত্র ৩৬। দেহভর্তি ক্ষুধা; দেহভর্তি ইমেজ; দেহভর্তি প্রাবল্য, যৌনতার প্রাবল্য অথবা কখনো বা শীতলতার প্রাবল্য অথবা মীমাংসাযোগ্য নয় এমন এক প্রাবল্যতা দেহে নিয়ে রাশেদা ম্যাম যখন স্বপ্ন দেখছেন তখন তার দেহ ইনসুলিন প্রস্তুতে ব্যর্থ এবং এই ব্যর্থতার দায়ভার তিনি ঠিক কার ওপর চাপাবেন ঠিক করতে না পেরে স্বপ্ন থেকে উঠে রাশেদা ম্যাম ফ্রিজ থেকে এক কৌটা হলস্টন তুলে নিলেন। তেঁতো স্বাদের এই পানীয় তার পছন্দ না হলেও রফিক সাহেবের আবিবাহ আগ্রহে বিয়ারে অবসাদ-আগ্রহ জেগে উঠেছে। রাশেদা ম্যাম শূন্য উদরে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিচ্ছেন এবং এক মুহূর্তের কোটি ভাগের এক ভাগের ভেতর হয়তো বা শূন্য মগজে ভেসে উঠল বিগত রাতে রফিকের আগ্রহহীন অথবা উত্তেজনাবিহীন অথবা আক্রোশবিহীন শরীর ও মগজ। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী কামশীতলতায় আক্রান্ত হতে থাকলে এক সময় রফিক সাহেব স্ত্রী রাশেদাকে পরপর দুবার আঘাত করলেন।


ব্যবহারবিহীন লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ মাথার তলানীতে ভোতা আঘাত অথবা কম্পনের সৃষ্টি করলে পরিচিত তিনজন যুবক ক্ষুরধার চাপাতি হাতে এবং ওদের তিনজনের তিনখানা চাপাতি বিচিত্র রকমের পৃথক বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর; প্রতিটির অবয়বে শরীরের পশম উগ্র হয়ে ওঠা অথবা জানের কলিজা হিম হয়ে চাপাতি ধারীদের কাছে হাতজোড়ে জান ভিক্ষা চাওয়ার মতো অথবা নাটকে ক্লোজ শটে প্রতিটি চাপাতিকে আইবলের নিকটে এনে হাই রেজুলেশনে ভয়ানক পরিবেশ সৃষ্টি করলে অথবা স্বপ্নে প্রচ- ভীতসন্ত্রস্ত হলে যেমন বুক ধরফর পিপাসায় বাকরুদ্ধ প্রায় চিৎকারের কাছাকাছি পৌঁছেও গলায় কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় না এমন এক ধরনের বিপদজনক অবস্থায় অবশেষে ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নে আক্রমণমুখি যুবকদের কাছ থেকে যখন উদ্ধার পাওয়া গেল তখন রফিক সাহেব স্ত্রীকে বিছানায় ফেলে বেলকনিতে গিয়ে অর্থহীন বসে থাকলেন। আর তখন দক্ষিণের পাকা গলি থেকে মাদি কুত্তার কোকানি ভেসে আসতে থাকলে তা রফিক সাহেবের কাছে মানব-মানবীর শীৎকারতুল্য ইমেজে পাল্টে যেতে থাকে। রফিক সাহেব যেন বা কিছুটা মতিভ্রম হলেন অথবা ভয়ানক স্বপ্নের পর হয়তো বা শরীর কামস্বপ্নের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। উচ্চতা থেকে আরও ভয়ানক রকম বিপদজনক দূরত্বে এক জোড়া বাতি ভেসে যাচ্ছে; হয়তো বা পশ্চিমে ফিরে যাওয়া কোনো আকাশযান। রফিক সাহেবের ধূমপানের ইচ্ছা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়।

লোকটা শেষ পর্যন্ত জলকাদা হয়ে গেল। রাশেদা ম্যামের কাছে এক সময়ের উচ্ছৃঙ্খল অসভ্য রফিকের আকর্ষণ অবচেতনে টোকা দিতে থাকলে বিবাহপূর্ব যৌনজীবনের গন্ধ অনেকদিন পর দীর্ঘ দূরত্ব থেকে ভেসে আসতে থাকে। রাশেদা ম্যামের দিনের শুরুটাই শুরু হলো এক ধরনের মনখারাপ করা অস্থিরতা দিয়ে। ড্রাইভারকে স্নো কালারের এক্স করলা পার্ক করতে বলে রাশেদা ম্যাম সাড়ে সাত ফিট বাই সাড়ে এগার ফিট আয়তনের ওয়াশ রুমে প্রবেশ করলেন। বাথরুমটি ব্যবহারের সীমানা সীমিত; রফিক সাহেব এই নিশ্চিত নিরাপদ একান্ত ব্যক্তিগত নারীসুলভ বাথরুমে প্রবেশ করলে এক ধরনের নার্ভাসন্যাসের ভেতর পতিত হন এবং রাশেদা ম্যাম এতে বিরক্ত বোধ করলে রফিকের সমস্ত ফিলিং শূন্য হয়ে যায় এবং এ অবস্থায় একদা একদিন রফিকের মাথার তালুতে ঘাম দেখা দেয় এবং তিনি তখন এক ধরনের অর্থহীন আক্রমণের ইচ্ছায় রিতিমত কাঁপছিলেন। এ অবস্থায় রাশেদা ম্যামের ফুলে ওঠা বুকজোড়াকে ঠেলে সরিয়ে দিলে বাথরুমের সাইডওয়ালের দেহে মিশে থাকা বিশাল স্ফটিক মিররের ভেতরে রাশেদা ম্যামের নিরাভরণ শরীর অথবা মুখের অথবা মগজের কালো হয়ে ওঠা অবয়ব ভেসে উঠতে দেখা যায়। রফিক আহত রাশেদাকে অগ্রাহ্য করে বাথরুম পরিত্যাগ পূর্বক বেডরুমে স্থিত হবার চেষ্টা করলে তৎমুহূর্তে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটে; রফিক সাহেবের জন্য একখানা পৃথক বেডরুম প্রয়োজন।

রফিক সাহেবের কাছে রাশেদা ম্যামের দেহটা পুকুরে চাষ করা হাইব্রিড কাতলের শরীরের মতো স্যাঁতস্যাঁতে আর বরফমিশ্রিত বলে মনে হয় এবং একদা একদিন রফিক সাহেবের বোধোদয় ঘটে, যৌনতা অপেক্ষা সম্পদ অনেক বেশি মূল্যবান। অথচ তারপরও রফিক সাহেবের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা দীর্ঘ কৈশোরের সুবিশাল প্রান্তরে ফিরে যাওয়ার তাড়না রাতঘুমের আড়ালে অথবা মাথার গোপন কুঠুরিতে ঠক ঠক আওয়াজ তুলে তাকে জাগিয়ে দেয়; রফিক একদা একদিন অবচেতনেই অথবা একদা একদিন নয় দীর্ঘদিন গোপনে সংগোপনে তার ভেতরে এই সিদ্ধান্তটি বয়প্রাপ্ত হতে থাকে, তাকে একবার করতোয়ার তীরে ফিরে যেতে হবে। রফিক সাহেবের ভেতর বাপ দাদার ভিটেয় ফিরে যাবার তাড়না একসময় স্থির বিন্দুতে এসে স্থির হয়ে গেলে রফিক সাহেব ক্রমাগত নগরচিত্র থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে যেতে তখন একদিন নিজ কারখানার পথ পাল্টে গাড়ির গতি ধারাবাহিক দৃঢ়তায় উত্তরবঙ্গের দিকে ক্রমাগত এবং অবশেষে তখন একদিন প্রত্যাশিত হারানো তারুণ্যে, যে তারুণ্যের রক্তে লুকিয়ে আছে চামেলি বুবুর কামঘন সবুজ মাঠ আর অবারিত হাটফেরৎ পরিচিত সন্ধ্যা অথবা মুন্সিবাড়ি ছেড়ে তালুকদার বাড়ির পর খন্দকার বাড়ির আঙিনা; তার পর তিন ঘর পর এক ধরনের তাড়না; চামেলি বুবুর বাড়ি। রফিক সাহেব ক্রমাগত পিছে ফিরে যেতে থাকলে এক ধরনের অস্থিরতা তাকে ক্রমাগত যুবক বয়সের দিকে ঠেলে দিতে থাকে। তার পরও হঠাৎই রফিকের কাছে সবকিছু কেমন অচেনা বোধ হতে থাকলে অবশেষে নিজ গ্রামে রফিক মাত্র এক রাতের বেশি নিজেকে ধরে রাখতে পারে না এবং পরদিন প্রত্যূষে রফিক রাশেদার কাছে ফিরে যাবার তাড়নায় ক্রমাগত অস্থিরতা বোধ করতে থাকলে হঠাৎই নিজ কৈশোর, নিজ গ্রাম আর গ্রামের ছবি অথবা রক্তের সমস্ত সম্পর্কের ভেতর এক ধরনের অসম দূরত্ব ক্রমাগত বাধা হয়ে দাঁড়াতে থাকলে রফিক সাহেব নিজের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন।

অথচ সেই রাতে চামেলি তার চার কন্যার এক কন্যাকে নিয়ে রফিকের সামনে এসে দাঁড়ালে, রফিক সাহেব হয়তো বা কিছুটা অস্থিরতা অনুভব করেছিলেন। আর সেই অস্থিরতার ভেতর এক ধরনের কালো রঙের ঘৃণার কু-লি ফণা তুলে তাকিয়ে থাকলে রফিক সাহেবের কেবলি মনে হতে থাকলো, এই গ্রাম্য মূর্খ নোংরা পান-তামাকে দাঁতকালো বুড়ি একদা তার কুমার জীবনকে হরণ করেছিল। রফিক সাহেবের ভেতরটা কালো হতে হতে ক্রমাগত ভারি হতে থাকে। রফিক সাহেবের ভেতর থেকে মুহূর্তেই কিশোরবেলার চামেলি বুবুর পরিচিত ছবি উধাও হয়ে গেলে রফিক সাহেবের ভেতরটা ক্রমাগত চুপসে যেতে থাকে। এবং রফিক সাহেব সহসা গম্ভির হতে থাকলে রফিক সাহেবের চোখ বর্তমান চামেলির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।

সেই রাতের পরদিন ছিল বুধবার। সেই বুধবারের হাট রফিকের কাছে গতানুগতিক অথবা অর্থহীন অথবা বিব্রতকর মনে হলে অথবা পরিচিত শৈশোবকে হয়তো বা রফিক ভয় পেতে শুরু করলে অথবা শেকড়ে বাঁধা অজ¯্র মানুষের সাথে রফিক ঠিক নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারলে অথবা এক ধরনের ঘুমিয়ে থাকা অপরাধবোধের তাড়নায় রফিক ক্রমাগত মিইয়ে যেতে থাকলে, সেদিন সেই বুধবারের হাট পিছে ফেলে রফিক অনেকটা অর্থহীনভাবে নগরজীবন বরাবর ছুটে যেতে থাকে। এবং ড্রাইভিং অবস্থায় রফিক সাহেবের বোধোদয় ঘটে, তার কোন ঠিকানা নেই অথবা সারাদিন কাজ শেষে ফিরে যাওয়ার মত কোনো গৃহকোণ অথবা কোনো বাস্তভিটা, সারিয়াকান্দির হাট, মাঠপ্রান্তর, কামশৈশোব, ছেলেবেলাপুর, লালরেলস্টেশন; রাত করে হাট থেকে ফেরা অথবা এক পুকুর জল, শীতকাথার উষ্ণতা অথবা স্বাধীন দিগন্তে ইচ্ছেমত পাখিদের জনসভা আড্ডা; খইফোটা দুপুরের ঝকঝকে বর্ষণ অথবা আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে, এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয়, হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে; এই সমস্তকিছু; সবটুকুই সে হারিয়ে ফেলেছে।




লেখক পরিচিতি
শিমুল মাহমুদ


জন্ম ৩ মে ১৯৬৭। নাড়িমাটি যমুনাপারে, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর। বাংলাদেশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পৌরাণিক বিষয়াদি নিয়ে উচ্চতর গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেছেন পিএইচ-ডি. ডিগ্রি। কবি হিসেবে আবির্ভাব গত শতকের আশির দশকে। স্বৈরশাসনের দুঃসহকালে কবিতার সাথে তাঁর সখ্য; সমান্তরালে কথাসাহিত্যে রেখেছেন নির্মোহ ছাপ; অধ্যাপনা পেশার সাথে মিলিয়ে নেন সমসাময়িক পাঠ; ফলে সমালোচনাতেও সিদ্ধহস্ত। এখন থিতু রংপুরে; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের কাগজ ‘কারুজ’। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা পুরস্কার ২০০০’। সেইসাথে সাহিত্যকর্মের জন্য ২০১২ তে ‘বগুড়া লেখকচক্র’ এবং ২০১৫ তে পশ্চিমবঙ্গের ‘অচেনা যাত্রী ও দ্বৈপায়ন’ কর্তৃক সন্মাননা প্রাপ্ত হন।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন