শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের গল্প : বেবিসিটার

মালবাজার বাসস্ট্যাণ্ডে কিরণ মোক্তানের সে‰ হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেল। বহুদিন পর দেখা। কম করে হলেও বছর দশেক তো হবেই। এতদিন বাদে কিরণকে দেখতে পেয়ে বিলক্ষণ অবাক হলাম আমি। চমকটা একটু থেতোলে আবার ভাল করে তাকালাম। সিমেন্টের লম্বা একফালি বেঞ্চে সার দিয়ে বসে রয়েছে বেশ কিছু মানুষ। হরেকরকম যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে আছে কিরণ। এক হাতে ছো–ট একটা কাপড়ের ব্যাগ। বাদামি সালোয়ার, তার ওপর ময়লা হয়ে যাওয়া নীল কার্ডিগান। অনেকটাই রোগা হয়েছে কিরণ। একমাথা কালো চুল ছিল, বেণী করে বাঁধত। এখন লালচে হয়ে যাওয়া ঘোড়ার ­লেজের মতো অযত্নের একগাছি চুল। গায়ের রং ভালোই পরিস্কার ছিল, এখন ময়লাটে হয়ে গেছে। বয়সের চাইতে বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে কিরণকে, সুখে থাকা মানুষের এমন চেহারা কখনও হয় না।


বাজারে নগদ টাকার জোগান কমানোর জন্য রিজার্ভ ব্যাংক রেপো রেট বাড়িয়েছে। ফলে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আমানতের ওপর সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে সব ব্যাংক। ওদলাবাড়িতে আমাদের ব্যাংকের একটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ব্রাঞ্চ আছে। চিফ ম্যানেজার নির্দেশ দিয়েছেন, রিজার্ভ ব্যাংকের এই সারকুলার সমেত অন্যন্য কিছু জরুরি কাগজপত্র সেখানে আজই পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের ব্রাঞ্চের ইনচার্জ যেহেতু আমি, আমার ঘাড়েই এসে পড়েছে এই দায়িত্ব।

ড্রাইভার জগদীশ গাড়িতে তেল ভরে আনতে গেছে। আমার ল্যাপটপ আর চামড়ার ফোল্ডারটার ভিতর অর্ডার-সারকুলারের হার্ড-কপি…গুলো … নিয়ে বেরিয়েছি। অফিস থেকে দু'পা হাঁটলেই বাসস্ট্যান্ড। একটা সিগারেট আমেজ করে ধরিয়েছিলাম। তখনই চোখ পড়েছে কিরণের দিকে। অন্যদিন এই জায়গাটা দুপুরের দিকে বেশ জমজমাট হয়ে থাকে। কিন্তু আজ বাসস্ট্যান্ড বেশ ফাঁকা। শুনলাম মালবাজার কলে­জে কী নিয়ে আজ নাকি ঝামেলা হয়েছিল দু'-দল ছাত্রের মধ্যে। একটু আগে পর্যন্ত অবরোধ ছিল কলেজের সামনে। গাড়িঘোড়া বিশেষ চলছে না আজ।

নাম ধরে ডাকতেই কিরণ তাকিয়েছে। মলিন মুখে মেচেতার ছোপ ছোপ দাগ। এতক্ষণ খেয়াল করি নি, এখন দেখতে পাচ্ছি কিরণের একটা চোখ পাথরের। যাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় শেষবার দেখেছি, সেই পরিচিত মানুষটাকে এমন দশায় দেখে শিরিশর করে উঠেছে আমার বুকের ভিতরটা। আমাকে স্বভাবতই এখানে প্রত্যাশা করে নি কিরণ। চোখ বড় বড় করে কিরণ বলল, দাদা, আপনি !

মৃদু হেসে বললাম, আমার পোস্টিং তো এখন এখানে। কিন্তু ... তোমার চোখে কী হল কিরণ?

একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, কিরণ দায়-সারাভাবে বলল। তারপর জানতে চাইল, আপনি কি মালবাজার ব্যাংকে বদলি হয়ে এসেছেন দাদা ?

--হ্যাঁ, জলপাই…ড়ি থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করছি। আমি সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে ফেলে দিতে দিতে বললাম, তুমি কেমন আছ কিরণ ?

--ভাল। বউদির শরীর কেমন আছে দাদা ? কোমরের ব্যথাটা এখনও হয় ?

--এ রোগ তো সারাজীবনের জন্য।

--আর প্রিমুলা ? কত বড় হল ও ?

--এখন সিক্সে পড়ছে। আমি হাসলাম, এখন ওকে দেখলে তুমি চিনতে পারবে না।

--কীভাবে সময় চলে যায় ! অন্যমনস্ক স্বরে কথাটা বলেই কিরণ আগ্রহী হয়েছে, প্রিমুলার কোনও ছবি আপনার মোবাইলে নেই ?

একটা স্টিল পিকচার মোবাইলের স্ক্রিনে এনে কিরণের চোখের সামনে ধরলাম। এর মধ্যে একটা পিকনিকে নিয়েছিলাম। এটা সেই বনভোজনের ছবি। লোপার কাঁধে মাথা দিয়ে হাসছে জিনস আর সাদা ফারের জ্যাকেটের রিনি। মায়ের মাথা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে মেয়ে।

কিরণ আমার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বল গলায় বলল, কত বড় হয়ে গেছে প্রিমুলা ! ওর সংগে‰ একটু কথা বলা যাবে না দাদা ?

বাঁ হাতের কবজির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উলটেছি, এখন তো ওর স্কুল চলছে। ছুটির পর ওদের স্কুলেরই এক টিচারের কাছে যাবে টিউশন নিতে। সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে।

কিরণ শুকনো মুখে বলল, প্রিমুলার আমাকে আর মনে নেই, তাই না দাদা ?

বেচারিকে মিথ্যে কথাটা বলতে খারাপ লাগল। আসলে রিনির ভাইরাল ফিভার হয়েছে তিনদিন হল। ডাক্তার দেখান হয়েছে, ওষুধ খাচ্ছে রিনি। সেজন্য মেয়েকে স্কুলে পাঠাচ্ছে না লোপা। ও নিজেও ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে আছে তিনদিন ধরে। কিছুক্ষণ আগে লোপার সে‰ কথা হয়েছিল। ক্লান্ত রিনি এখন ঘুমোচ্ছে। লোপা নিজে নো-ননসেন্স টাইপ মহিলা। অসুস্থ মেয়েকে এখন ঘুম থেকে ডেকে তুলে কিরণের সে‰ কথা বলতে বললে সে অসন্তুষ্ট হত নির্ঘাৎ। সেই ঝুঁকিটা নিতে সাহস হল না।

কিরণের স্মৃতি ছোট্ট– রিনির মস্তিস্কে গেঁথে থাকবার কথা নয়। লোপাও মনে রাখে নি কিরণকে। লোপাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কিরণ মোক্তানরা আমাদের বাড়িতে কাজে আসে, কিছুদিন থাকে, একদিন কাজ ছেড়ে চলে যায়। আবার নতুন লোক বহাল হয়। কিছুদিন বাদেই পুরনো জনের কথা বেমালুম ভুলে যাই আমরা। এটাই দস্তুর। অন্যদের কথা কী বলব, আমি নিজেও কি কিরণকে ভুলে যাই নি ?

কিরণের নিভে যাওয়া মুখটা দেখে খারাপ লাগল। ওকে খুশি করার জন্য বললাম, তোমার গল্প মাঝেমাঝেই আমাদের বাড়িতে হয়। তাছাড়া তোমার প্রিমুলার ছোটবেলার অনেক ফোটোতেই তো তুমি আছ। অ্যালবামে রয়ে গেছে সেই ছবি…গুলো।

কিরণ উজ্জ্বল মুখে বলল, সেই ছবি…গুলো এখনও আছে ? প্রিমুলা সেগু…লো দেখে ?

আমি ঘাড় কাত করলাম। কিরণ হাসল, আপনি তো জানেন দাদা, প্রিমুলা আমাকে ছাড়া কাউকে চিনত না। ও হাঁটতে শিখেছে, কথা বলতে শিখেছে আমার চোখের সামনে। ওর সে‰ আমার জনম জনমের রিস্তা। ওর কথা আমি কখনও ভুলব না !

পাহাড়ি রাস্তায় এক ধরনের বে…নি রংয়ের ফুল দেখা যায়। প্রিমুলা নামের এই ছোট ছোট ফুলগু…লো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে পথের ধারে। ভোরের শিশির ভিজা সেই ফুলের ওপর যখন প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়ে, তখন মনে হয় এই দৃশ্য দেখার জন্য হাজার মাইল পথ হেঁটে আসা যায়। সেই ফুলের নামে রিনির এই নাম দিয়েছিল কিরণ। আজ হঠাৎ এতদিন পর কিরণের মুখে প্রিমুলা নামটা শুনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। দশবছর পেছনে ফেলে আসা বিচ্ছিন্ন মুহুর্ত…লো সংলগ্ন অবস্থায় যেন আছড়ে পড়ল আমার দু'চোখে।




তখন লোপার ম্যাটারিনটি লিভ শেষের পথে। ওর মা দিনহাটা থেকে এসে আছে অফিস ছুটি নিয়ে। হন্যে হয়ে একজন বাচ্চা রাখার মাসি খুঁজছি আমি। সেই সময় আমার অফিস কলিগ সুকান্তর কাছ থেকে সন্ধান পাওয়া গেল একজন বেবিসিটারের।

সুকান্তই এক ছুটির সকালে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এল কিরণকে। মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের মুখ, ছোট ছোট চোখ, ভোঁতা নাক মেয়েটার। গায়ের রং একসময় হয়তো ফর্সা ছিল, অর্থের অভাব সেই বর্ণে দীনতার মলিন একটা প্রলেপ ফেলে দিয়েছে। তবে আর্থিক ক্লেশ তার মুখের হাসিটাকে শুষে নিতে পারে নি। লক্ষ করলাম কারণে অকারণে হাসে মেয়েটা। ভেবে পেলাম না, এই একরিত্ত মেয়েটা বেবিসিটারের কাজ করবে কীভাবে !

সুকান্ত অভয় দিল আমাকে। ওদলাবাড়ির একটা স্কুলে সুকান্তর বউ পড়ায়। জলপাইগু…ড়ি থেকেই যাতায়াত করে। সেই স্কুলের কাছেই কিরণদের বাড়ি। বাবা চা-বাগানে কাজ করত, দেদার হাঁড়িয়া খেত। লিভার পচে মারা গেছে কয়েক মাস আগে। ওর মা ওদলাবাড়ির একটা ভাতের হোটেলে রান্না করে সংসার চালায়। তখন কিরণ বড়জোর ­ষালো-সতেরো। পূর্ণিমা পিঠাপিঠি এক দিদি আছে, তার বিয়ে হয়ে গেছে। কিরণের একটা ছোট ভাই আছে। নাম সোনম।

সুকান্ত যখন কিরণের …কীর্তন করছিল মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি বললাম, কত টাকা করে নেবে ?

কিরণ কিছু বলার আগেই সুকান্ত বলেছিল, নার্সিং হোমের আয়াদের বাড়িতে রাখলে ওরা দিন হিসেবে চার্জ করে। এর তেমন ব্যাপার নেই। ভাল বাড়িতে সিকিওরড থাকবে, পেটে দানাপানি জুটবে মুফতে। ব্যস আর কি চাই ! ওকে মাস গেলে একটা কিছু ধরিয়ে দিস। ওর মায়ের সে‰ সেরকমই কথা হয়ে আছে।

লোপা স্পষ্ট করে কিরণকে শুনিয়ে দিল, তোমার থালা-বাসন আলাদা দিয়ে দেওয়া হবে, আমাদের…গুলো কিন্তু তুমি কখনও ব্যবহার করবে না। ঠিক আছে ?

কিরণ বাধ্য মেয়ের মতো ঢক করে ঘাড় নাড়ল।

লোপা কেটে কেটে বলল, তোমাকে সাবান কিনে দেওয়া হবে। প্রতিদিন গায়ে সাবান দেবে। উকুনমারা শ্যাম্পুও কিনে দেবে তোমার দাদা, প্রত্যেক রোববার করে মাথায় শ্যাম্পু দেবে। অপরিস্কার লোক আমি মোটেই পছন্দ করি না।

রিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে খেলছিল। কিরণ রিনির কান্ড দেখছিল হাসি হাসি মুখ করে। লোপার কথা কতটা বুঝল কে জানে, তবে আবারও সম্মতি জানাল ওর কথায়।

আমি খুঁতখুঁত করিছলাম, কিন্তু বাচ্চাকে তেল মাখান, ন্যাপি পালটানো, বাচ্চার ­নাংরা কাপড় কাচা, খাওয়ানো-টাওয়ানো এসব ও পারবে তো ?

না পারার কারণ নেই, লোপা একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিলেই দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। সুকান্ত অভয় দিল, তাছাড়া তোর কোর্টেই তো বল রইল। হায়ার করেছিস, না পোষালে ফায়ার করতে কতক্ষণ !

অগত্যা কিরণ ঢুকে পড়ল আমাদের বাড়িতে। সে নিজে নেপালি মেয়ে, তাও আবার অন্যরকম পরিবেশে বড় হয়েছে। তা সত্বে চটপট মেয়েটা নিজেকে আমাদের বাড়ির সঙ্গে‰ মানিয়ে নিল। রিনি তখন সারা দিন কিরণের কোলে কোলেই থাকত। রিনিকে খাওয়ানো দাওয়ানো থেকে শুরু করে তাকে সময়ে পটি করানো কিংবা প্র্যামে বসিয়ে সামনের খেলার মাঠটায় নিয়ে যাওয়া - সব কিরণ একা হাতে করত। লোপাকে ফিরেও তাকাতে হত না। রিনির দেখাশোনা ছাড়াও লোপাকে রান্নাবান্না আর ঘরকরনায় হাসিমুখে সাহায্য করত ও।

লোপার কোমরের ব্যথাটার বাড়াবাড়ি শুরু হল রিনি হবার পরপরই। স্কুল থেকে বাসজার্নি করে ফিরে বেচারি খুব পরিশ্রান্ত হয়ে থাকত। অগত্যা কিরণকেই সামলাতে হত রিনিকে। শুধু শোবার সময় রিনি শুত আমাদের সঙ্গে‰। এমনও হয়েছে অনেকবার, রাত্রিতে আচমকা কান্না শুরু করেছে রিনি। কিছুতেই কান্না বন্ধ করা যাচ্ছে না। খেলনা-টেলনা দেখিয়েও সুবিধে হচ্ছে না একটুও, ভ্যা ভ্যা করে কেঁদেই চলেছে মেয়ে। কোনও বাজে স্বপ্ন দেখেছে, নাকি পেটে ব্যথা করছে - কিছুই বুঝতে পারিছ না। এদিকে কান্নার শব্দে চোখ রগড়াতে রগড়াতে পাশের ঘর থেকে ছুটে চলে এসেছে কিরণ। রিনিকে কোলে নিয়ে চলে গেছে বারান্দায়। ঘুমপাড়ানি গান গাইতে গাইতে ফের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে রিনিকে। হাঁফ ছেড়েছে লোপা, স্বস্তির শ্বাস ফেলেছি আমিও।

কিরণের সঙ্গে‰ অবরে-সবরে দেখা করতে আসত তার দিদি-জামাইবাবু। কিরণের মুখশ্রী তাও চলনসই, কিন্তু তার দিদি পূর্ণিমার চেহারা একেবারেই বিশেষত্বহীন। জামাই ছোকরাটিও তথৈবচ। লাটা…ড়িতে একটা স'-মিলে কাজ করত, রোগাটে ছোটখাট গড়ন ছিল তার। তামাটে গায়ের রং, জোড়া ভুরু, খুদে খুদে পিঙ্গ‰লবর্ণের চোখ, খাড়া খাড়া কান, কদমছাঁট চুল আর ভোঁতা নাকের কিশোর লেপচার চেহারাটা আমার দিব্যি মনে আছে এখনও। মিনমিন করে কথা বলত আর পা-দুটো একটু টেনে টেনে হাঁটত। বছর তিনেক হল বিয়ে হয়েছিল পূর্ণিমা-কিশোরের। ওদের কোনও ছেলেপুলে ছিল না।

সেই পূর্ণিমা আর কিশোরই ছিল কিরণের সে‰ তার বাপের বাড়ির একমাত্র যোগসূত্র। কিরণের মা কিংবা ছোট ভাইটিকে আমরা চোখে দেখি নি কখনও। ছুটির দিন…গুলোতে সকালের দিকে মাঝেমধ্যে কিশোর-পূর্ণিমা আসত। দুপুরে আমাদের ওখানেই ভাত-টাত খেয়ে বিকেলের বাস ধরে ফিরে যেত। মাঝেমধ্যে ফোন করেও কিরণের ­খাঁজখবর নিত ওরা।

রিনিও দিন দিন কিরণের ন্যাওটা হয়ে পড়ছিল। আমাদের না হলেও তার চলে, তার সবসময়ের সে তখন কিরণদিদি। কী একটা গান গেয়ে কিরণ ঘুম পাড়াত রিনিকে। বোধ হয় ওই একটাই গান জানা ছিল কিরণের। ইনিয়ে বিনিয়ে করা সেই ঘুমপাড়ানি গানের সুরটা শুনতে পেলেই মুখ টিপে হেসে উঠতাম আমি আর লোপা।

এভাবেই কাটছিল দিন। তারপর এল সেই আষাঢ়ের সকালটা। সেদিন সকালবেলা মোষের পিঠের মতো কালো গভীর মেঘ এসে ঢেকে দিয়েছিল আকাশ। রিনির মন্তেসরি স্কুল সকালে। কিরণ রিনিকে তৈরি করছিল স্কুলের জন্য। তখনই বাইরের ঘরে বেসফোনটা বেজে উঠল শব্দ করে। ও-প্রান্তে কিশোর। কিশোর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, পূর্ণিমা গলায় দড়ি দিয়েছে কাল রাতে। কিরণকে আমি তখনই যেন মালবাজারের বাসে তুলে দিই। মালবাজার স্ট্যান্ড থেকে ওদের বাড়ির কেউ কিরণকে নামিয়ে নেবে।

কিরণকে একটু রেখেঢেকে পূর্ণিমার ব্যাপারটা বললেও হয়তো কিছু আন্দাজ করে নিয়েছিল ও। যে পোশাকে ছিল, সেই পোশাকেই উদভ্রান্তের মতো কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে পড়ল কিরণ। আমি ওকে বাসে তুলে দিয়ে কনডাকটার ছেলেটির হাতে ভাড়ার টাকা ধরিয়ে বুঝিয়ে বলে দিলাম সব। কেঁদে কেঁদে চোখ লাল, উলোঝুলো চুল, বাসের জানলায় সেই যে কিরণের মুখটা দেখেছিলাম সেটাই আমার ওকে শেষ দেখা। মাসখানেক বাদে একদিন কিশোর এসে কিরণের বাক্স-প্যাটরা সব নিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল কিরণ আর কাজ করবে না। ওর মা এখন মেয়েকে কাছছাড়া করতে রাজি নয়। আমরা যেন অন্য কাউকে খুঁজে নিই।




এতগু…লো বছর বাদে মালবাজার বাসস্ট্যান্ডে আমার মুখোমুখি যে কিরণ মোক্তান দাঁড়ান, তার সে‰ সেই হাসিমুখের প্রাণচঞ্চল কিশোরীর সামান্যই মিল। ফেলে আসা এক বর্ষার সকালে চলন্ত বাসের জানলায় কেঁদে আকুল কিরণের মুখটা ফিরে ফিরে আসছিল আমার স্মৃতিতে। কিরণের একটা চোখ এখন পাথরের। এমন মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। অস্বস্তি হয়। সেটা ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে সহজ গলায় বললাম, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ ? বাড়িতে ফিরবে বুঝি ?

ওদলাবাড়ি যাবার গাড়ি নেই অনেকক্ষণ হয়ে গেল, কিরণ উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, কখন যে বাস পাব কে জানে !

আমাদের কথার মধ্যেই জগদীশ এসে গেছে গাড়ি নিয়ে। আমি বললাম, আমি তো ওদলাবাড়ির দিকেই যাচ্ছি। চলো, তোমাকে পৌঁছে দিই।

জগদীশ সামনের দরজা খুলে দিয়েছে, কিরণ সামনের সিটেই বসল। আমি পেছনের সিটে বসেছি। জানলার কাচ তুলে দিয়েছি পুরো। মসৃণ ল্যাটাল রোড ধরে আমাদের অ্যামবাসাডার চলছে। কিরণ জানলার কাচটা আধখোলা করে রেখেছে। হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছে চুল।

কিরণের দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বললাম, তোমার খবর বল, বিয়ে করেছ ?

--শাদি হয়েছিল ... তবে এখন আর কিশোর আমাকে নেয় না, কিরণ একটু দ্বিধা জড়ানো গলায় বলল।

--কিশোর ! আমি একটু হকচকিয়ে নিয়ে বললাম, কোন কিশোর ?

--কিশোর লেপচার সঙ্গে‰ শাদি হয়েছিল আমার। দিদি মারা যাবার কয়েক মাস পর।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি কিরণের দিকে। পেছনের সিটে বসে ওর মুখটা পুরো দেখতে পাচ্ছি না। শুধু পাথরের ডানচোখটা নজরে আসছে এখান থেকে। সেদিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার দিদি আত্মহত্যা করেছিল কেন ? জানতে পেরেছিলে কিছু ?

কিরণ বলল, দিদি চা-বাগানে পাতা তোলার কাজ করত। সংসারে দেবার পরেও কিছু টাকা জমিয়েছিল অল্প অল্প করে। সেই টাকা ব্যাংক থেকে তুলে একটা মোটর সাইকেল কিনবে বলে জেদ ধরেছিল কিশোর।

--সেটা নিয়েই কি গন্ডগোল বেধেছিল দুজনের ?

--দিদি টাকা দিতে রাজি হয় নি। কিশোর সেদিন খুব নেশা করে এসেছিল। সেদিন রাত্রে শুনেছি ভীষণ ঝগড়া হয়েছিল দিদি আর কিশোরের। কিরণ একটু চুপ করে থেকে বলল, তখন কিশোর রাগের মাথায় গলা টিপে মেরে ফেলেছিল দিদিকে। কিরণ নিরুত্তাপ গলায় বলল, হয়তো মারার জন্য মারতে চায় নি। ঝগড়ার সময় নেশার ঘোরে অত বোঝে নি। কিন্তু যখন হুঁশ ফিরে এসেছিল, তখন দিদির গলায় দড়ি পরিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ঘরের ভিতর। তারপর চেঁচিয়ে লোক জড়ো করেছিল।

--তুমি সেটা জানলে কেমন করে ?

--আমাদের গ্রামের দু'চারজন চেনা লোকের মুখে শুনেছি। তারা মিথ্যে বলবে না। তাছাড়া দিদির মুখে আগেও অনেকবার শুনেছি কিশোর প্রায় রাতেই হাঁড়িয়া খেয়ে এসে ওকে মারধোর করত। আশেপাশের সবাই সেসব জানে।

--পুলিশকে জানাও নি ঘটনাটার কথা ?

--কিশোর সেয়ানা লোক, পুলিশকে টাকা দিয়ে রেখেছিল। পুলিশ কিছু বলে নি। এক আর্য়ুবেদিক ডাক্তারের কাছ থেকে সার্টিফিকেট লিখিয়ে নিয়ে এসেছিল কিশোর। দিল কা বিমারিতে দিদি মারা গেছে বলে লেখা ছিল সেই কাগুজে। কিশোরের বন্ধুরাও তাড়াহুড়ো করে পরদিন দুপুরের আগেই নদীর ধারে দিদির বডি পুড়িয়ে দিল। আমি যখন পরদিন সকালে বাড়িতে নিয়ে পৌঁছলাম তখন দিদিকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে ওরা।

--পূর্ণিমার পোস্টমর্টেম করান হয় নি ? আমি অবাক হয়ে বললাম, এ তো বেআইনি কাজ !

কিরণ ­ঠাঁট বেঁকিয়ে বলল, আইন-কানুন ওসব আপনাদের শহরের জিনিস। আমাদের ওখানে পঞ্চায়েত যেটা বলবে সেটাই আইন। পুলিশ সেটাই শুনবে। সেদিন আমি আর আমার মা সবাইকে পায়ে ধরে বলেছিলাম দিদির বডি না পোড়াবার জন্য। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনল না। কিশোরের বন্ধুরা বলল, আমরা বেশি চেঁচেমেচি করলে পুলিশ নাকি কিশোরের সঙ্গে সঙ্গে‰ আমাদেরকেও থানায় নিয়ে যাবে, ­জেল খাটাবে।

--বিনা দোষে ­জেল খাটাবে মানে ? মগের মুলুক নাকি !

কিরণ সামনের দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে। পেছনের ডানদিকের সিটে বসে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছি। সবুজ জ‰ল আর পাহাড় মিলেমিশে গেছে সেখানে। এই দুপুরেও সেই জ‰লের মাথায় কেমন একটা হালকা কুয়াশা জড়িয়ে আছে মিহি হয়ে। দূরের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমি তখন কিরণের গল্পের ভিতর ঢুকে পড়ছি একটু একটু করে। বললাম, তুমি আর জলপাই…ড়ি ফিরে গেলে না কেন ?

--কিরণ বলল, দিদির ক্রিয়াকর্ম হয়ে যাবার পর মা বাচ্চাদের মতো ­জেদ করে আমাকে আটকে দিল। ওদলাবাড়ির একটা হোটেলে রান্নার কাজ করত মা। আমাকে বলল, ওই টাকাতেই আমাদের দুজনের পেট চলে যাবে। আমার আর জলপাই…ড়ি যাবার দরকার নেই। অনেক করে বললাম, কিন্তু মা মানল না। ভয় পেল, একটা মেয়ে গেছে, আর একটার যদি কিছু হয়ে যায় !

একটা বড় লরি আমাদের ক্রস করল সশব্দে। বাঁদিক ­ঘেষে সশব্দে ব্রেক কষেছে জগদীশ। ঝাঁকিটা সামলে নিয়ে বললাম, পূর্ণিমা মারা যাবার পর কিশোর কি নিজে এসে তোমাকে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিল ?

জগদীশ আবার গতি বাড়াচ্ছে। কিরণ সামনের রাস্তার দিকে উদাস তাকিয়ে বলল, মালবাজারে মিত্তাল নামে একজন লোক আছে, চা-বাগানে ঠিকাদারি করে। পয়সাঅলা লোক। দিদি মারা যাবার পর মিত্তালের কর্মচারি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিল কিশোর। সকালে বেরিয়ে যেত সন্ধে হতে না হতেই ঘরে ফিরে আসত। গ্রামের সবাই মনে করল দিদির ঘটনা থেকে যে দুখ পেয়েছে, তা থেকেই বদলে গেছে কিশোর।

বহুদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা…গুলো মনের ভিতর অগোছালো অবস্থায় ছিল হয়তো। সে…গুলোকে সাজিয়ে নিতে নিতে কিরণ বলল, কয়েক মাস বাদে একদিন আমার কাছে এল কিশোর। বলল যা হবার তা হয়ে গেছে। ও আমাকে শাদি করতে চায়। ওর বন্ধুবান্ধবরাও আমার মায়ের কাছে এল। বাড়িতে পঞ্চায়েত প্রধান এল, এলাকার মাতব্বর লোকেরা এল। সবাই জোরজার করতে লাগল কিশোরকে বিয়ে করার জন্য। এসবের মধ্যে আমার মা-ও আচমকা মরে গেল। একদিন দুপুরবেলা বুকে ব্যথা করছে বলে শুয়ে পড়ল বিছানায়। আধঘন্টার মধ্যেই সব শেষ।

--কিন্তু তুমি কেমন করে রাজী হলে নিজের দিদির খুনিকে বিয়ে করতে ? তোমার ভয় করল না?

কিরণ বলল, মা মারা যাবার পর সবাই আমার কাছে এসে বলতে শুরু করল কিশোর বদলে গেছে পুরোপুরি। জুয়া খেলা ছেড়েছে, নেশাভাঙ করা ছেড়েছে, ভালো রোজগার করছে। কিশোর বলেছে ওকে বিয়ে করলে শুধু আমার নয়, আমার ভাইয়ের সব খরচও দেবে ও। বাপ-মা মরা মেয়ে আমি। টাকা নেই, পয়সা নেই, আমিই বা রাজী না হয়ে কী করব !

--কিন্তু তোমার একটা চোখ নষ্ট হল কী করে ?

--বিয়ের পর কিশোর এক-দেড় বছর ঠিক ছিল। এর মধ্যে মিত্তালের সঙ্গে‰ কী নিয়ে যেন ঝামেলা হল। ওই কাজটা গেল। তখন চালসায় একটা লাইন হোটেলে ম্যানেজারের কাজ পেল ও। ওখানে নিয়েই নতুন বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে কিশোর আবার আগের মতো হয়ে গেল। নেশাভাঙ করে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরত। এমনকী এক-একদিন ফিরতই না। এ নিয়ে আমি কিছু বললে আমার গায়ে হাতও তুলত ও।

--সেকি কথা ? পূর্ণিমার মতো তুমিও পড়ে পড়ে মার খেতে ?

--তখন আমার পেটে বাচ্চাটা সবে এসেছে। আমি ভিবেছিলাম কিশোর বাবা হলে আবার ভালো রাস্তায় ফিরে আসবে। কিরণ মলিন মুখে বলল, সেদিন আমার শরীরটা খুব খারাপ। সারাদিন অনেকবার বমি করেছি, তাই বিছানায় শুয়েছিলাম। জুয়াতে অনেক টাকা হেরে এসেছিল কিশোর। মদও নিলে এসেছিল গলা অবধে। এসে গালাগালি করতে করতেই আচমকা আমার পেটে লাথে মেরেছিল কিশোর। আমি হাত দিয়ে ওর পা আটকে দেওয়াতে ও রেগে গেল খুব। চুলের মুঠি ধরে আমাকে মাটিতে ফেলে অনেক…গুলো লাথি মারল কিশোর। একটা লাথি সোজা এসে পড়ল আমার মুখে। ওর বুড়ো আঙ্গুলটা ঢুকে গেল আমার ডান চোখে। গলগল করে রক্ত বের হল। সঙ্গে সঙ্গে‰অজ্ঞান হয়ে নিয়েছিলাম আমি।

কিরণ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর পাথরের চোখটার দিকে তাকিয়ে আমি কোনও রকমে বললাম, তারপর ?

--মাল হাসপাতালে আমাকে নিয়ে নিয়েছিল সবাই। সেখান থেকে নর্থবে‰ল মেডিক্যাল কলেজ। পেটের বাচ্চাটা বাঁচল, তবে আমার ডানচোখটা জন্মের মতো গেল।

--আর কিশোর ? আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তাকে ছেড়ে দিল সবাই ?

--সেই রাতেই কিশোর পালিয়ে গেল। মাঝে অনেক বছর খবর পাই নি। শুনেছি ও এখন নেপালের ধূলাবাড়িতে থাকে। ওখানে ওর থেকেও বয়সে বড় একজনকে বিয়ে করেছে। ওরা দুজন এখন নাকি নেপালের জিনিস ইন্ডিয়াতে চোরাপথে চালান করে।

কিরণের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি কী কর এখন ? তোমার পেট চলে কী করে ?

--ছোটমোট ব্যবসা করি, পেট চলে যায়, কিরণ বলল। ভাই সোনম এখন জোয়ান হয়ে গেছে। আমরা ভাইবোন একসঙ্গেই থাকি।

--আর তোমার বাচ্চা ?

--ওর নাম তেনজিং। সাত বছর বয়স হল। খুব দুষ্টু হয়েছে। কিরণ বলল, এতদূর এলেন, ওকে একবার দেখে যাবেন না?

--তোমার বাড়ি এখান থেকে কতদূর ?

--এই তো সামনেই। ডানদিকের কাঁচা রাস্তাটা দিয়ে যেতে হবে। কিরণ আবদার করল, চলুন না দাদা, বেশি সময় লাগবে না গাড়িতে।

গাড়ি ওদলাবাড়ি এসে পড়েছে প্রায়। আমাদের ব্রাঞ্চ অফিসের রাস্তায় না নিয়ে কিরণের বাড়ির রাস্তা ধরতে বললাম জগদীশকে। ঘড়ি দেখে নিয়েছি, কিরণকে বাড়ি পৌঁছে দিলেও অনেকটাই সময় হাতে থাকবে।

জগদীশ গম্ভীর মুখে স্টিয়ারিং ধরে আছে। পাকা রাস্তা ছেড়ে সরু কাঁচা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে গাড়ি। আমি কিরণের উদ্দেশে বললাম, ব্যবসার কথা বলছিলে, কীসের ব্যবসা করো তুমি ?

--ঝাড়ুগাছের ব্যবসা।

আমি অবাক চোখে তাকিয়েছি দেখে কিরণ হাসল, আমাদের বস্তির অনেকেই এই বিজনেস করে। শীতকালের সময়টায় সকালবেলা করে বেরিয়ে পড়ি আমরা। লাভা যাবার বাস ধরে রানিচেরা আর মিনগ্লাস চা-বাগানের রাস্তা ধরে চলে যাই গরুবাথান। সেই পাহাড় ভর্তি ঝাড়ুগাছ। দূর থেকে দেখলে মনে করবেন যেন মখমলের চাদর ঝোলান আছে পাহাড়ের গায়ে। একেবারে খাড়া সেই পাহাড়ি পথ দিয়ে কুকরি হাতে হেঁটে যাই। তারপর মাপমতো সেই ঝাড়ুগাছ কেটে নিয়ে আসি বাড়িতে। আমাদের বস্তিতে একজন পাইকার আছে। সে…গুলো কিনে নেয় সে।

--এমন ব্যবসাও হয় নাকি ? আমি অবাক গলায় বললাম।

কিরণ হাসছে, গরুবাথান ছাড়া এদিকের আলগাড়া, লোলেগাঁও কিংবা লাভাতেও এই ব্যবসা চলে। এক কেজি ঝাড়ুগাছ থেকে চার পাঁচটা ঝাড়ু হয়। আমি আর সোনম নিজেরা ঝাড়ু বানিয়ে পাইকারের কাছে বিক্রি করি। চালসা-ম‰লবাড়িতে বৃহস্পতিবার করে হাট বসে। আজ ওখানকার এক পাইকারের সে‰ কথা বলতে নিয়েছিলাম।

আমি বললাম, মাসে অনেক টাকা তুমি রোজগার করতে পারতে কাছাকাছি কোথাও বাচ্চা রাখার কাজ করলে। তোমার ঝাড়ুর ব্যবসা না হয় সোনম একাই সামলে নিত।

কিরণ জগদীশকে ইশারায় ডান-বাঁ দেখাচ্ছে। বলল, একটা বাড়িতে ঢুকেছিলাম। কিন্তু মন চাইল না, ছেড়ে দিলাম কাজটা।

--টাকা কম দিচ্ছিল বুঝি ?

ম্লানমুখ কিরণের, ছেলেটাকে সোনমের কাছে ফেলে রেখে সন্ধেবেলা যখন ঘরে ফিরতাম তখন তেনজিং খুব মন খারাপ করত। বলত, তুমি তোমার সব আদর কি ওই বাড়ির ছেলেটাকেই দিয়ে এসেছ ? ও কি আমার চাইতেও দেখতে সুন্দর? বলুন দাদা, এরপর আর বাচ্চা রাখার কাজ করা যায় ?

এসে পড়েছে কিরণের ডেরা। গাড়ি থামিয়েছে জগদীশ। একরাশ চেনা-অচেনা গাছগাছালির মধ্যে এটা একটা ছোটখাট মহল্লা। বেশির ভাগ বাড়িই মাটির। তবে দু'চারটে বাড়ি আছে, হয়তো একটু সম্পন্ন গৃহস্বামীর। সেসব বাড়িতে ইটের গাঁথনি, তবে পলেস্তারা পড়ে নি। বাড়িগু…লোর মাথার ওপর শ্যাওলা ধরা অ্যাসবেসটস কিংবা কালচে হয়ে যাওয়া টিনের চাল। গাড়ির শব্দ শুনে কয়েকজন উঁকিঝুঁকি দিয়ে গেল দূর থেকে।

কিরণের ঘরে এসে পৌঁছেছি। মাটির দাওয়া, মাথার ওপর শালপাতা দেওয়া চাল। দাওয়ার এক কোণে জলের কুঁজোর মুখে এনামেলের বাটি। উঠোনের ওপর দড়ির খাটিয়া। তার ওপর মাদুর পেতে বসে আঠারো-উনিশের একটি ছেলে বিড়ি ফুঁকছিল। আন্দাজ করলাম এ-ই হল সোনম। দিদিকে দেখে আড়াল হল সে। কিরণ নেপালিতে চেঁচিয়ে কিছু বলল অপসৃয়মান সোনমকে।

উঠোনের একদিকে শুকোতে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু ঝাড়ুগাছ। ছয়-সাত বছরের একটি শিশু বাতাবিলেবু দিয়ে ফুটবল খেলছিল নিকোনো উঠোনে। কিরণকে দেখে খেলা ছেড়ে দৌঁড়ে এল মা মা বলতে বলতে। তার গা ঘেষে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি। এ-ই কিরণের তেনজিং। মায়ের সঙ্গের অচেনা মানুষটিকে দেখে একটু অবাক হয়েছে সে।

আমার চোখ স্থির। খাড়া খাড়া কান, মিশে যাওয়া যুগল ভুরু, পি‰ল খুদে খুদে চোখ, তেনজিংয়ের মুখে কিশোর লেপচার হবহু আদল ! এমনকি পা টেনে টেনে হাঁটবার কায়দাটা পর্যন্ত এক। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল, জন্মদাতার ক্রোমোজম তার নির্ভুল অভিজ্ঞান এঁকে দিয়ে গেছে নিজের ঔরসজাত সন্তানের আকৃতিতে !

হাতের ব্যাগের ভিতর থেকে একটা ক্যাম্বিসের ক্রিকেট বল বের করে তেনজিংয়ের হাতে দিল কিরণ। তেনজিং বল পেয়ে বেজায় খুশি। হাত ঘুরিয়ে বল করতে শুরু করে দিয়েছে উঠোনে। একবার বল করছে তেনজিং, আবার উঠোনের ও মাথায় নিয়ে সেই বলটাকে কুড়িয়ে নিয়ে নতুন করে হাত ঘোরাতে শুরু করছে, ক্লান্তি নেই ছটফটে শিশুটির।

কিরণ আমার চমকে যাওয়াটা লক্ষ করেছে। খেলায় মশ…ল তেনজিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, যে আমার দিদিকে খুন করেছে, আমার একটা চোখ গেলে দিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য যে লোকটা দায়ী, সেই শয়তানের মুখটা ভুলতে চাইছিলাম। কিন্তু যত বড় হচ্ছে, তেনজিং ওর বাবার মতো দেখতে হচ্ছে। ওকে আদর করতে গেলেই আমার কিশোরের কথা মনে পড়ে যায়। তখন না পারি নিজের ছেলেটাকে একটু আদর করতে, না পারি দূরে ঠেলে ফেলে দিতে। কিরণ বড় একটা শ্বাস ফেলল, ওপরঅলা বড় কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে আমাকে !

সোনম একটা শালপাতায় গরম জিলিপি নিয়ে এসে হাজির। কিরণের জোরাজুরিতে দুটো জিলিপি তুলে নিতে হল। জগদীশও নিল জিলিপি। শীতের কমলা রঙা বিকেল তার নিজস্ব বর্ণ হারাচ্ছে একটু একটু করে। কনকনে হাওয়াটা তীব্র হচ্ছে ক্রমশ। দেরি করলে যে কজে আসা, সেই কাজটাই হবে না এরপর। অগত্যা গাড়ির দিকে এগোচ্ছি দ্রুত পায়ে। তেনজিংয়ের হাত ধরে কিরণ আমাদের পেছন পেছন এল।

গাড়িতে উঠবার সময় কিরণ ওর হাতের ব্যাগটা খুলে একটা চকোলেট বার বের করে আমার হাতে দিল, দাদা, এটা প্রিমুলার জন্য।

আমি অপ্রস্তুত গলায় বললাম, এটা তো তুমি তেনজিংয়ের জন্য এনেছিলে !

--তাতে কী হয়েছে, ওকে পরে কিনে দেব, কিরণ স্বচ্ছ করে হাসছে। মন পবিত্র না থাকলে এমন করে কেউ হাসতে পারে না।

কিরণের দিকে তাকিয়ে থাকলাম একটুক্ষণ। তারপর গভীর স্বরে বললাম, তোমার প্রিমুলাকে তুমি এখনও ভালোবাসো, তাই না ?

কিরণ ­ঠাঁট টিপে থাকল খানিক। তারপর কী ভেবে ছুট দিয়েছে ঘরের দিকে। একটু বাদে হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরেছে কিরণ। হাতে একটা বাদামি রংয়ের পুতুল। চোখ চিকচিক করছে, অদ্ভুত একটু হেসে কিরণ বলল, ভালো করে দেখুন তো দাদা, এই পুতুলটা চিনতে পারেন ?

একটা বার্বি ডল। তার মাথার চুল আবার উপড়ানো। ন্যাড়া মাথার পুতুলটার দু'চোখের মণির ওপর কেউ নেলপলিশের লাল রং বুলিয়ে দিয়েছে কাঁচা হাতে। ভারী অদ্ভুত দেখাচ্ছে পুতুলটাকে। বহতা নদীর টলটলে জলের ঘ্রাণের মতো স্মৃতিও কি কখনও কখনও ভেসে আসে একজন্মের দূরত্ব অতিক্রম করে ? চকিতে মনে পড়ে গেছে আমার, দাঁত গজাবার সময় এই বার্বিটাকেই তো প্রাণপনে কামড়াত রিনি ! আমি সবিস্ময়ে বললাম, এটা তো রিনির পুতুল ! তুমি কোথায় পেলে ?

কিরণ মিটিমিটি হাসছে, বউদি পুতুলটাকে ফেলে দিয়েছিল আবর্জনা ফেলার বাক্সে। আমি কুড়িয়ে আমার কাছে রেখে দিয়েছিলাম। কত ঝড় গেছে আমার ওপর দিয়ে, কিন্তু পুতুলটাকে আমি আঁকড়ে থেকেছি সবসময়। যখন যখন আমার প্রিমুলার কথা মনে হয়, আমি পুতুলটাকে দেখি। ওর সে‰ কাটানো সেই ভালো দিন…গুলোর কথা মনে পড়ে যায় আমার।

ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরিমচির কানে আসছে। একটু একটু করে হিম জমতে শুরু করেছে গাছের মাথায়। একটা জংলি পোকা ডেকে উঠল অদ্ভুত শব্দ করে। গলায় ঘন্টা বাঁধা মোষের দল ডুং ডুং শব্দ তুলে ফিরে আসছে নিজের নিজের আস্তানায়। ধূসর সন্ধে ঘনাচ্ছে এই পাহাড়ি সবুজ রংয়ের গ্রামে। সময় কমে আসছে, ওদলাবাড়ি ব্রাঞ্চ অফিস বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি কাগজ…গুলো আজ আর পৌঁছে দেওয়া যাবে না। কাল সকালে এতটা পথ উজিয়ে আসতে হবে আবার। চিফ ম্যানেজারকেই বা কী জবাব দেব ? অথচ হঠাৎ করে কেমন যেন …লিয়ে গেছে সব।

জগদীশ পেছনের দরজা খুলে দিয়েছে। তাকাচ্ছে আমার দিকে। সেদিকে খেয়াল নেই আমার। ফোন বের করে দেখে নিলাম টাওয়ার আছে কিনা। নিশ্চিন্ত হলাম, আছে। কিরণের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, প্রিমুলার সঙ্গে‰ কথা বলতে চাইছিলে না ? একটু দাঁড়াও। দেখি, লাইন পাই কিনা।

কিরণ আমাকে দেখছে। ওর কৌতুহলী চোখের সামনেই বাড়ির বেসফোনের নম্বরে ডায়াল করেছি।

লোপা নয়, রিনিই ফোন ধরল। রিনি ভিবেছিল ওর আর জ্বর এসেছে কিনা, ফেরার পথে ওর জন্য কিছু আনতে হবে কিনা এসব জানতে চাইব। কিন্তু মেয়েকে অবাক করে দিয়ে আমি বললাম, রিনি, শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা ? তোর জন্মের পর থেকে তিনবছর ধরে তোকে যে মেয়েটি দেখে রাখত, তোকে প্রিমুলা নামে ডাকত, মনে আছে তার কথা ? কী রে, মনে নেই?

রিনি চুপ করে আছে। পাশ থেকে লোপা চাপা স্বরে কী যেন বলছে। রিনি ফোনের কথামুখ হাত দিয়ে চেপে লোপাকে কিছু বলল। আমার পাগলামোতে অনভ্যস্ত মা-মেয়ে দুজনেই থ হয়ে গেছে বোধ হয়। সেদিকে আমার হুঁশ নেই। আমার ভিতর থেকে অধৈর্য গলায় অন্য একজন বলেই চলেছে, তুই যাকে কিরণদিদি বলে ডাকতিস, তাকে আজ পেয়ে গেছি হঠাৎ করে। তোকে বড্ড ভালোবাসে, তোর সঙ্গেই বারকথা বলছে বারবার, তোর সেই কিরণদিদির সঙ্গে‰ একবারটি কথা বলবি রিনি ? সোনা মা আমার, প্লিজ ?

৪টি মন্তব্য: