শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

রবিউল করিম মৃদুল এর গল্প কুকুর কন্ডলী

আমি যে ভঙ্গিমায় মাটিতে গলা-বুক-পেট ঠেকিয়ে শুয়ে আছি, মানুষ তাকে বলে কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকা। আমি এখন কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছি। এভাবে পড়ে থাকার ইচ্ছা আমার নাই। তার পরও পড়ে আছি। কী করব? উঠার মত, উঠে চলার মত শক্তি নাই। উপায়ও নাই। গলায় লোহার শেকল! তিনদিন হলো পেটে কোনো দানাপানি নাই!

তিনদিন আগে আমাকে এখানে বেঁধে রেখে আজিমপুর গেছে দুলাল। আলালের ঘরের দুলাল না! ফকিন্নির ঘরের দুলাল! ভাদাইম্মা দুলাল! যাওয়ার আগে বলে গেল-

-তিনডা ঘন্টা সুমায় তুই এইহানে থাক। সন্দার আগেই আইসা পরুম!

আমি তার সাথে যাওয়ার বায়না ধরেছিলাম। সে আমাকে সঙ্গে নিল না। বলল - এইতো যাইমু আর আইমু! তুই গিয়া করবিডা কী? এইহানে আড়ামে শুইয়া থাক। আমি আইতাছি।

যাওয়ার আগে দুলাল আমার গলার শেকলটা লোহার লম্বা শিকের সাথে বেঁধে রেখে গেল। -যদি ভাইগা যাই! সেই ভয়ে? আরে ভাই, আমি ভাগতে যামু কোন দুঃখে? তর সাথে তো ভাইগাই আইছি!

মহাখালি কলেরা হাসপাতালের পেছনের দিকে এক বাসায় ছিলাম আমি। বাসায় না, বাসার সামনে। গলায় লম্বা শেকল বান্ধা থাকে সবসময়। খাইতে দিলে খাই, না দিলে না খাই। কাজ নাই কাম নাই! খালি পড়ে পড়ে ঝিমান!

যারা আমাকে বেঁধে রেখেছে তারা লোক খুব সুবিধার না! -আরে ভাই রাস্তার একটা প্রাণীরে ধইরা যখন বাইন্দা রাখছস, ঠিক মত খাওন দাওন দে! তা না! সারাদিন পুটকি শুকায়া রাহে! মনে মনে খুব বিরক্ত হই আমি। কিন্তু নিরুপায়! করার কিছু নাই! দাঁতে জোর থাকলেও লোহার শিকল কাটার মত জোর দাঁতে নাই!

সেদিন সন্ধ্যার আগে আগে! আমি চুপ মেরে বসে আছি বাসার সামনে। কোমড় উঁচু দেয়ালটা টপকে একটা ছেলে চলে আসলো আমার কাছে। গায়ে হাফশার্ট, পড়নে ফুলপ্যান্ট! এখানে ওখানে ছেঁড়া। ময়লা যথেষ্ট! ছেলেটি পা টিপে টিপে আমার কাছে এসে এদিক সেদিক দেখে বলল-

-কী রে লাল্টু? তরে বাইন্ধা রাখচে ক্যা?

আমি ঘাড় কাত করে বললাম- তার আমি কী জানি? মানুষের মন-মর্জি বোঝা বড় দায়। আছিলাম রাস্তা-পথে। খাইতাম, দাইতাম, ঘুইরা বেড়াইতাম! দ্যাহ, ধইরা বাইন্ধা রাখছে! মগের মুল্লক আর কী!

আমার কথা সে বুঝতে পারল কিনা জানি না। আমার গলায়-পিঠে হাত নেড়ে বলল-

-ভাগবি? ভাগবি আমার লগে?

আমি জিজ্ঞেস করলাম- কই যামু? সে আমার কথার কোনো উত্তর দিল না। মনে হয় বুঝতে পারে নাই! উত্তর দিবে কী।

শেকলটা যেখানে বাঁধা ছিল সেখান থেকে খুলে শেকল সুদ্ধ আমাকে কোলে করে পাঁচিল টপকালো সে। আমি তখনও তার নাম জানি না! পাঁচিল টপকে শেকল হাতে নিয়ে কষে দৌড় লাগালো আমিও দৌড়ালাম তার সাথে সাথে। এক দৌড়ে রেলগেট পার!

রেলগেট পার হয়ে খানিকটা ভেতরে চলে এসে সে বলল-

-ভিতর দিয়া গিয়া কাম নাই। এহন আর কে পাইব আমাগো। তার চেয়ে ল রেললাইন ধইরা হাঁটা দেই।

আমি মাথা নেড়ে সায় জানালাম।

মহাখালি থেকে রেললাইন ধরে হেঁটে তেজগাঁও স্টেশনে এসে লাইন পার হলাম। এই গলি সেই গলি করে একেবারে ফার্মগেট। আসার সময় একজন তাকে জিজ্ঞেস করল-

-কী রে দুলাইল্ল্যা? কুত্তা পাইলি কই?

আমি জানলাম, যার সাথে মহাখালি থেকে ভেগে এসেছি, তার নাম দুলাল।



আমি মানুষ না! কুকুর! কুত্তা! বেজন্মা কুত্তা! সব কুত্তাই বেজন্মা। পিতৃপরিচয়হীন! কুকুর সমাজে তো আর বিবাহ-টিবাবের বালাই নাই, বেজন্মা না হয়ে উপায়ও নাই!

কিন্তু কুকুর হয়েও কথা বলছি কিভাবে তাই ভেবে অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার কিছু নাই। আমি আজিব ধরণের কুকুর! কথা বলা কুকুর। যারা জীবনেও কথা বলা কুকুরের দেখা পাননি, তারা আমাকে দেখলে আশ্চর্য হবেন। আমি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারি। শুধু আমি না। সব কুকুরই সুন্দর করে কথা বলতে পারে। সে কথা সবাই বুঝতে পারে না এই যা। আমার কথাও কেউ বুঝতে পারে না। বুঝতে পারবে কিভাবে? অন্য কুকুরদের থেকে আমার কথা আলাদা না। সব কুকুরের কথাই এক। আমাদের কথা ঘেউ ঘেউ..চিঁ..চাঁ..ঘড়াৎ ঘড়াৎ..উঁউঁও.. উঁউঁও.. যখন যেমন ইমোশন, তেমনই কথা!

অবশ্য মানুষ আমাদের ভাষাকে কথা বলে দাম দেয় না। বলে কুকুরের ঘেউ ঘেউ! আরে ভাই কুকুর কী মানুষের ভাষায় কথা বলবে? কুকুর কথা বলবে কুকুরের ভাষায়। ভাষা মানে যদি ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যম হয়ে থাকে, তাহলে কুকুরদের ভাবের আদান প্রদানকে কেন ভাষা বলে স্বীকৃতি দেবে না? আমরাও কথা বলি, ভাবের আদান প্রদান করি, প্রেম নিবেদন করি, ভালোবাসা প্রকাশ করি,আদর সোহাগ করি, রাগ করলে মেজাজ খারাপ করে গালি দেই! মানুষ যত খারাপ ভাষায় গালি দেয়, আমরা তার থেকেও খারাপ ভাষা জানি! গালি দেই। চুপচাপ শুয়ে থাকা আমাদেরকে যখন কেউ অযথা লাথি মেরে চলে যায়, আমরা যেই গালি দেই, এমন গালি মানুষ জীবনেও শোনে নাই। মানুষ সেগুলো পাত্তা দেয় না। মানুষের জাতটাই শালা এমন! নিজেদের স্বার্থের বিপরীতে গেলে নিজেদের বানানো থিওরীও অস্বীকার করবে।

দুলাল আমাকে ফার্মগেটের ঠিক ওভারব্রীজটার নীচে ত্রিভূজ আকৃতির যে সড়কদ্বীপটা আছে, তার মাঝখানে বেঁধে রেখে গেছে আজ তিনদিন। ফেরার নাম গন্ধ নাই। তিনদিন হলো আমার খাওয়া দাওয়া নাই। গায়ে জোর শক্তি কিচ্ছু নাই। পড়ে আছি কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে! পেটে ক্ষুধার ডুগডুগি!

কিছুক্ষণ আগে একটা প্রাইভেট কার জ্যামে পড়ে আমার ঠিক পাশ বরাবর দাঁড়াল। গাড়ীর জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, এক মোটকা ভদ্রলোক বসে বসে আপেল চিবাচ্ছে। আমি কত অনুনয় বিনয় করলাম- ভাইজান আমারে একটু খাইতে দেন। বড় ক্ষিদা। আপনার জন্য দোয়া করব!

ব্যাটা কানেই তুলল না! আমার দিকে তাকিয়ে দেখলই না! জ্যাম ছেড়ে দিল! চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল! আমি নিরুপায় হয়ে কটমট করে গালি দিলাম- ওরে নরাধম! গরীবের রক্ত চুইষা বড় লোক হইছস! তুই তো আমার চাইতেও অধম!

শত শত গাড়ী আসে যায়, মানুষ যায় আসে, কেউ আমার দিকে তাকিয়েও দেখে না। আমি ক্ষুধায় কাতরাই। গলায় লোহার শেকল!-এক ভাদাইম্মা ছেড়া হুদাই বাইন্দা রাইখা ভাগছে!

তিন নাম্বার বাসের জানালার পাশে ছাগলা দাড়ি ওলা মোল্লা টাইপের এক লোক বসে বসে কলা খাচ্ছে। আমি করুণ চোখে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। বললাম- জনাব হুজুর! আফনে ইমানদার ব্যক্তি। আল্লাহর প্রিয় বান্দা! আমি অতি নিকৃষ্ট প্রাণী! কুত্তা! ক্ষুধার্ত! আমারে কিছু খাওয়ান। হাতের কলাডা ছুইড়া মারেন। একটা কিছু তো খাই।

ছাগলা দাড়িওলা মোল্লা লোকটা আমার দিকে তাকালো। এমন ভাব করল, যেন কুত্তা না, কুত্তার গু চোখে পড়ছে! চ্যাকচ্যাক করে কলা খেল। বাস ছেড়ে দিল। সে কলার খোসাটা পর্যন্ত ছুড়ে দিল না। রাগে গরগর করলাম আমি। কষে গালি দিলাম-ওরে বলদের বলদ! কুত্তা হইয়া জন্মানো অপরাধ না। আমি নিজে ইচ্ছায় কুত্তা হইয়া জন্মাই নাই। খোদা তালার খেয়াল! আমারে কুত্তা বানাইছে! মাইনষের ঘরে পয়দা হইলে তর চাইতে অন্তত ভালো মানুষ হইতাম!

-খোদা তালা বানাইছে একখান প্রাণী! তোরা নাম দিছস কুকুর। কুত্তা! নিকৃষ্ট প্রাণী বইলা হেলা করস! গালি দেস কুত্তা বইলা! ওরে অধমের দল! আমরা কুত্তা হইলেও তোগো মত নিমক হারাম না!

দুলাল আমাকে বেঁধে রেখে ভাগছে কথাটা পুরো সত্যি না। পেটের ক্ষুধায় উল্টা পাল্টা বলি! হুশ থাকে না। মানুষকে গালি দেই। ক্ষুধা বড় খারাপ জিনিস। ক্ষুধা হলে ভালো মন্দের বিচার বিবেচনা থাকে না। দুলাল আমাকে রেখে আজিম পুর গিয়ে তিনঘন্টার মধ্যে ফেরার কথা থাকলেও ফিরতে পারে নাই। যে কাজে গেছিল, তা করতে পারে নাই। ফিরতে চেয়েও পারে নাই। ভেবেছিল রাতটা থেকে ভোরবেলা এক দৌড়ে চলে আসবে ফার্মগেট। পারে নাই। রাতেই জ্বরে পড়ছে। তিনদিন ধরে পড়ে আছে জ্বরে। আজিমপুর গোরস্থানের দেয়াল ঘেষে পলিথিনের খুপড়ি একটা ঘরের পাশে পড়ে আছে দুলাল। জ্বরে কাতরাচ্ছে। আমার যেতে ইচ্ছে করছে তার কাছে। যে আমাকে মহাখালি থেকে চুরি করে ভাগছে, তার কাছে। যে দুলাল হোটেলের বাসী খাবার খেয়ে পলিথিনে করে আমার জন্য নিয়ে আসত, তার কাছে। ফার্মগেট ওভারব্রীজের নীচের ত্রিভূজ আকৃতির সড়কদ্বীপে রোজ রাতে যে আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমাত, সেই দুলাল আজ তিনদিন ধরে প্রচন্ড জ্বরে ছটফট করছে। আমি যেতে পারছি না তার কাছে। মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারছি না। দাঁড়াব কী! তিনদিন পেটে দানাপানি নাই!

এতকথা আমি জানলাম কিভাবে? পড়ে থাকলাম ফার্মগেটে, আজিম পুরের খবর জানলাম কিভাবে?

না, আমি ভবিষ্যত জানি না! গায়েবী কোনো মাধ্যমও জানা নাই। সামান্য কুত্তা আমি! সকাল বেলা একটা কাক এসে বসল মাথার ওপরে ডিসলাইনের তারে। আমি তাকে বললাম- ভাই, গরিবের একখান উপকার কর!

-কী উপকার?

-তিন দিন ধইরা দুলালের খবর নাই! অর খোজ বাইর কইরা দেও।

-আমি গনক ঠাউর নী?

-তুমি পক্ষী! উড়াল জান! আজিমপুর দূরের পথ না! একটু উপকার কর ভাই!

-হাসাইলা! আমি কাক! তুমি কইলা পক্ষী? কাক আবার পক্ষী হইল কবে? পক্ষী তো ময়না, টিয়া, ঘুঘু, শালিক, অতিথি পক্ষী!

-ভাই রে মানুষের ওপর অভিমান কইরা লাভ নাই। তুমি যে পক্ষী হেইডা মানুষেও জানে! স্বীকার করে না! তোমগো গলাডাই দেখল, কামডা দেখল না! ময়লা আবর্জনা না খাইলে শালারা গন্ধে ডুইবা মরত!

আমার কথা বুঝতে কাকের কোনো অসুবিধা হলো না। শুধু কাক না, কেবল মানুষ ছাড়া সকল প্রাণীই তাদের সবার ভাষা বুঝে। মানুষ বুঝে না। আসলে বুঝতেই চায় না। নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত তারা! অন্যদের দেখার সময় কোথায়!

ঘন্টা খানিক পর কাক ফিরে এসে খবর দিল দুলাল পড়ে আছে। আমার মনে হলো এখনই ছুটে যাই! উপায় নাই। যাওয়ার উপায় নাই। গায়ে জোর নাই। গলায় শেকল বাঁধা! পড়ে আছি কুন্ডলী পাকিয়ে। ফার্মগেট ওভারব্রীজের নীচে ত্রিভূজ সড়কদ্বীপের মাঝখানে মোটা খুঁটির গোড়া ঘেষে!

খালি আমি একা না। আরো অনেকে আছে। আমার সমগোত্রীয় না হলেও তারা আমারই মত! একসাথে থাকা-খাওয়া-ঘুম-ল্যাড়ানো! এই সড়কদ্বীপেই। এখানেই সবার সংসার। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে, এখানে সেখানে। এইটা সেইটা টোকায়। টাইম পাইলে এখানে এসে পড়ে পড়ে ল্যাড়ায়। গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকে। পলিথিনে ভরে ড্যান্ডিতে দম লাগায়! ঝিমায়। পড়ে থাকে কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে। বল্টু, তমিজ, হুদা, বানু, রেবেকা, মান্নু সবাই এখানে থাকে। দিন রাত সবসময় থাকে। মাঝে মাঝে এদিক সেদিক ঘুরে আসে।

আমি যেখানে পড়ে আছি, তার একটু দূরে পড়ে আছে রেবেকা। আমার মতই কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। রাত থেকে শরীরটা ভালো না তার। এমনিতেই সারাদিন ঘুমায়। তার কাজ রাত বারোটার পরে। আমাদের আর তাদের মধ্যে কোনো তফাৎ নাই। আমরা যা করি তিন রাস্তার মোড়ে, কোনো দেয়াল আব্রুর দরকার হয় না, রেবেকারও দরকার হয় না। এইখানেই গভীর রাতের পর, একটার পর একটা খদ্দের বিদায় করে। কাল পারে নাই। সন্ধ্যা থেকেই পেটে ব্যাথা। সারারাত কাউকে কাছে ভিড়তে দেয় নাই রেবেকা। আজ পেটে দানাপানি নাই। পড়ে আছে কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে।

বল্টু, মান্নু সকালে উঠে কোথায় যেন গেছে। তমিজ আর হুদা বসে বসে ঝিমাচ্ছে। আমি এই যে নানাভাবে তাদের বোঝাতে চাচ্ছি- ভাই রে! আমারে কিছু খাইতে দে! না পারলে আমার শেকলডা একটু খুইলা দে! কে শোনে কার কথা। আমার ডাক তাদের কানে পৌছায় না। ড্যান্ডির অতলে তলিয়ে আছে তারা!

দুলাল পড়ে আছে আজিমপুর গোরস্থানের পাশে। তিনদিন জ্বর। পেটে দানাপানি নাই। সে পড়ে আছে লম্বা টান হয়ে। কুন্ডলী পাকাতে পারছে না। লম্বা অবস্থা থেকে কুন্ডলী পাকাতে শক্তি লাগে। গা হাত পা নাড়াতে শক্তি লাগে। তার গায়ে সেই শক্তি নাই!

একটু আগে যে বললাম, মানুষ আমার কথা, আমাদের কথা, কুত্তার কথা বোঝে না, তা ভূল। সব মানুষ বোঝে না তা ঠিক। কিছু মানুষ বোঝে। সেই সব মানুষের সাথে আমাদের মিল বেশি, একসাথে পাশাপাশি থাকি, একই খাবার খাই, তারা বোঝে!

ড্যান্ডি খেয়ে পড়ে থাকা তমিজও বোঝে। আমার অনুনয় বিনয় শুনে তাইতো সে ঢুলু ঢুলু টকটকা লাল চোখে আমার পাশে এসে বলল-

-কী রে! হইছে কী তর? এত চিল্লাশ ক্যা? ক্ষিদা লাগছে? ড্যান্ডি খাবি? ড্যান্ডি? খাইয়া দেখ! ক্ষিদা মারবে ফুড়–ৎ!

কথা বলতে বলতে সে আমার গলার শেকল খুলে দিল। আমি কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালাম। ঠিকমত ধাপ ফেলতে পারছি না। পা টলছে। তারপর লাফ দিয়ে নামলাম রাস্তায়। উদ্দেশ্য আজিমপুর গোরস্থান!

হাঁটছি কাওরান বাজারের ফুটপাত ধরে। আজিমপুর পৌছাতে পারব কিনা কে জানে? তার আগেই যদি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। কিছু খাওয়া দরকার। বাস থেকে এক যাত্রী দয়াপরবশ হয়ে এক পলিথিন খাবার ফেলে দিল। খেয়েছিল বেশি করে। পেটে রাখতে পারে নাই। উগলে দিয়েছে। বাসে উঠতেই সব উগলে বের হয়েছে গলা দিয়ে। ভদ্রলোকের বদৌলতে পেটে দানাপানি পড়ল আমার।

হাঁটছি ফুটপাত ধরে। যাব আজিমপুর। গিয়ে কী লাভ হবে জানি না! কুত্তা হয়ে কুত্তা টাইপের একজনের কী কাজে লাগব জানি না! সে কুত্তা টাইপ না হয়ে জাত কুত্তা হলে ভালো হত। জাত কুত্তার কোনো ওষুধ-পত্র লাগে না। রোগ যত বড়ই হোকে এমনি সেড়ে যায়। সে অন্য জাতের! চলন- বলন, খাওয়া-দাওয়ায় কুত্তা! তার রোগ ওষুধ ছাড়া সাড়বে না! জানি না তার কী উপকারে লাগব! কাউকে যে ধরে বলব- ভাই রে! দুলাল মরতাছে। ওরে বাঁচা! ওরে হাঁসপাতালে নে! সেই উপায় নাই। ভাষা সমস্যা! তাও হাঁটছি আজিমপুর গোরস্থান অভিমূখে! গলার শেকলটা ফার্মগেট ওভারব্রীজের নীচের সড়কদ্বীপের লম্বা লোহার শিকের সাথে বাঁধা..! আমি হাঁটছি আজিমপুর গোরস্থান অভিমূখে..!


লেখক পরিচিতি
রবিউল করিম মৃদুল

জন্ম-২৯ ডিসেম্বর, ১৯৮৬
জন্ম স্থান: নাটোর জেলার বড়াইগ্রামে।
বর্তমান আবাস স্থল: মিরপুর-ঢাকা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতোকত্তর শেষে কর্মজীবন শুরুদৈনিক বনিক বার্তায় সাংবাদিক হিসেবে। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক।
যে শাখায় লেখা হয়: গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা।
প্রকাশিত গ্রন্থ : “হলুদ খাম ও বাদামী ঘাস ফড়িং” প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা’২০১৪।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন