শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মোমিনুল আজম এর গল্প--ইমরান আলীর দিনকাল


'আগেই বলেছিলাম তোমারে, ওরা কোনদিন আমাদের নিবে না, সাতচল্লিশে বাবার সাথে লাহোরে যেতে চেয়েছিলাম, আমাদের যেতে দেয়নি, বলেছে কাছাকাছি কোথাও থাকো, পরে দেখা যাবে। ঐ দেখা আর শেষ হয় নি। সৈয়দপুরের সেই বস্তিতে কাটিয়েছি বিশ বছর। সত্তুরের ইলেকশনের পর এসেছি ঢাকায়। যুদ্ধ শুরুর আগ তোমাদের বললাম- চলো এটাকেই আমাদের দেশ কইরা লই। তোমরা বললা না, আমাদের দেশ হইবো পাকিস্তান, পাক মাটির দেশ। পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে কতো লোকরে কতল করলা, কতো যুবতি মাইয়ারে সাপ্লাই দিলা ক্যাম্পে; লাভ কী হইলো - ওরা মউজ কইরা, যুদ্ধ যুদ্ধ খেইলা লেজ গুটাইয়া চইলা গেল পাক মাটির পাকিস্তানে, আর তুমি মিয়া পইড়া থাকলা ক্যাম্পে, সুইজারল্যান্ডের রাজধানীতে। কত তদ্বির করলা, বিদেশী মুরব্বিগো ধরলা, লাভ হইলো কিছু, হয় নাই। এখন তোমার কোন দেশ নাই, মাটি নাই। পাকিস্তানে তোমার নিজের ভাইরা আছে। তাদের দেখতেও যেতে পার না পাসপোর্ট নাই বইলা। বোঝ ঠেলা। পাক মাটি এখন তুমি ধুইয়া খাও।'

এতোগুলো কথা একসাথে বে হাঁপিয়ে ওঠে ইমরান আলী। শেষের দিকে শ্লেষার কারনে তার কথা গলায় আটকে যায়। পাশে রাখা চিলিমচিতে একদলা থুথু ফেলে সে আরো কিছু বলতে চায়, ঠোঁট দুটো কথার ভারে থরথর করে কাপতে থাকে কিন্তু হাঁপিয়ে ওঠার কারনে তা আর সম্ভব হয় না। চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে ক্লান্তি হজম করার চেষ্টা করে সে।

দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরের বারান্দা যার প্রস্থ আবার তিন ফুট, উপরের টিনের ছাপরা ছাদ বারান্দা পর্যন্ত চলে এসেছে। সেই বারান্দার এক কোনায় একটি চেয়ারে বসে ইমরান আলী তার সমস্ত ক্ষোভ ঝারছে তার পুরনো বন্ধু আয়াত শেখের উপর। তারা দু বন্ধু সাতচল্লিশের দেশ ভাগের সময় বিহারে থাকতে না পেরে সবকিছু ছেড়ে তাদের বাবার সাথে আশ্রয় নিয়েছিল সৈয়দপুরে। মানবেতর জীবন যাপন করে এখনও বেঁচে আছে দুজন। স্বাধীনতার পর একজন আশ্রয় পেয়েছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে আর ইমরান আলী আছে মিরপুরের বিহারী ক্যাম্পে। পুরনো দু বন্ধুর আর দেখা সাক্ষাৎ হয় না। আয়াত শেখ এখন আটকে পড়া বিহারীদের নেতা। তাদের সমস্যা নিয়ে মাঝে মাঝে দেন দরবার করে ক্ষমতাসীনদের সাথে। আজও এসেছে একই কারনে। সবেবরাতের রাতে পটকা ফুটানোকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীদের মাঝে গন্ডগোল, সে গন্ডগোলের রেশ ধরে বস্তিতে আগুন, সে আগুনে পুড়ে যায় একই পরিবারের সাতজন। একাজে জড়িত থাকায় নাম আসে স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতার। নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে সর্বোত্র। এ ক্ষোভ কমাতে স্থানীয় নেতার যে উদ্যোগ, তারই অংশ হিসেবে আসে আয়াত শেখ। মিটিং শেষে কি মনে করে দেখা করতে আসে পুরনো বন্ধুর সাথে।

ইমরান আলী অসুখের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে দশ ফুট বাই দশ ফুট এ ঘরের বারান্দায়। লম্বা গড়নের মুখের চামড়া ঝুলে পড়ে অসমতল আয়তকার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। চেয়ারের উপর পা তুলে হাটুর উপর যখন হাত দিয়ে বসে থাকে তখন বাহুর চামড়া ঝুলে থাকে, শরীরের ঘাম সে ঝুলে পড়া চামড়ার নীচে এসে বিন্দুর মতো জমে আছে। বারান্দার ছাদ এতো নীচে যে সিলিং ফ্যান লাগানোর কোন উপায় নেই। চেয়ারের নীচে ভাঁজ করে রাখা পাতলা তোষক, চাদর আর তেল চিটচিটে কাথা। রাতের বেলা চেয়ার সরিয়ে করতে হয় শোয়ার বিছানা। শারীরিক অসুস্থতার কারনে গত ছয মাস সে কোথাও বেরুতে পারে না। চলনশক্তিও হ্রাস পেয়েছে।

ইমরান আলী তার দুটো মেয়ে নিয়ে থাকে এই বিহারী ক্যাম্পে। মেঝো ছেলেটি বছর চারেক আগে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে। এতোটুকুন একটু ঘর আর বারান্দায় তারা থাকতো চারজন। তারও আগে পাঁচ জনের গাদাগাদির সংসার ছিল। দুহাজার দশ সালের অক্টোবরে দীর্ঘদিন অসুখে ভুগে মারা যায় ইমরান আলীর স্ত্রী। মা বেঁচে থাকার সময় থেকেই ছেলেটি উচ্ছন্নে যাওয়া শুরু করে। রাত বিরেতে ঘরে ফেরে, কোনদিন ফেরে না। ঘরে এসেই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন বিকেল পর্যন্ত ঘুমিয়ে আবার বেরিয়ে যায়। ছেলে যে নেশাগ্রস্থ এটা তারা বুঝতে পেরেছিল, বুঝানোর চেষ্টাও করেছিল, কোন লাভ হয় নি। ইমরান আলী বাড়িতে থাকলে রাগারাগি করতো, মারধরও করতো মাঝে মাঝে, একদিন লাঠি দিয়ে মারতে গিয়েছিল, সে লাঠি কেড়ে নিয়ে উল্টো মারতে গিয়েছিল তাকে। তারপর থেকে ইমরান আলী চুপচাপ, বুকে অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করে পড়ে থাকে বারান্দায়। 

এতোদিন সে নেশা করতো বাইরে, এখন সে নেশার সামগ্রী নিয়ে আসে ঘরে। মাঝরাতে লোকজন আসে ছেলের কাছে, ঘরের পাশেই কথা বলে তারা। ইমরান আলী নিঃস্তব্ধতার মাঝে কান খাড়া করে সে কথা শোনার চেষ্টা করে-

; জিনিস আছে?
; হ্যাঁ
; কতো?
; দশ টাকা করে।
; কমায়া নাও, বেশি নিমু।
; সাপ্লাই বন্ধ, কম নিতে পারমু না।
; আচ্ছা দাও, দশটা।

এরপর ছেলে এসে ঢোকে ঘরে, ঘরের কোনয় রাখা ট্রাঙ্ক খুলে আবার তা বন্ধ করে চলে যায়। ছেলের এসব কাজ দেখে ইমরান আলী চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। ছেলে মেয়েদের আয়ের উপর ভর করে তার সংসার চলে। ভালো মন্দ বিচার করার নৈতিক অধিকার সে হারিয়ে ফেলেছে। 

এর মাঝে একদিন বেলা শেষে অসময়ে ঘরে ফেরে ছেলে। বিছানাপত্র গোছগাছ করে, ইমরান আলীর আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। বারান্দার গ্রীলে সারের বস্তা কেটে লাগানো পর্দাটা ছেঁড়ে ফুঁড়ে গেছে; একটু বাতাসেই ঝাটবৃষ্টি এখন বারান্দায় ঢুকে পড়ে।, তা ঠিক করার চেষ্টা করে। এসব দেখে মনটা আনন্দে ভরে ওঠে ইমরান আলীর। সে ভাবে ছেলে হয়তো কথা বলতে চায় , হয়তো মাফ চাইবে তিনমাস আগের ঘটনার জন্য। এতোদিন কথা বলতে না পেরে তারও বুকটা শুন্যতায় ভরে আছে, খাঁ খাঁ করছে তার বুকের ভেতরটা। এসব ভাবনার মাঝেই চেয়ারের পেছন থেকে ইমরান আলীর কাধে হাত রাখে তার ছেলে। সে হাতের স্পর্শে বিদ্যুৎ খেলে যায় তার শরীরে। সারা শরীর চনমন করে ওঠে। ইমরান আলীর মনে হয় সে চলে গিয়েছে দশ বছর আগের জীবনে, এখনই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়াবে সে। ঘাড়ে হাত রেখেই ছেলে বলে-

'বাবা আমি আর এখানে থাকবো না, দম বন্ধ লাগে'। আর আমার ব্যবসাপাতিও এখান থেকে আর করা সম্ভব নয়।

এই বলে ঘরের কোনায় রাখা ট্রাঙ্ক মাথায় তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বৃদ্ধ বাবা বোনের কী হবে সে কথা একবারও জিঞ্জেস কর না। সন্ধার নেমে আসা গাঢ় অন্ধকারে ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কিছুক্ষন আগে তার রক্তের ভিতর যে উচ্ছাস তা আবার পারদের মতো নেমে স্থির হয়ে যায়।

মেয়ে দুটো ঘরেই ঝলমলে শাড়ীর পাড়ে জরীর কাজ করে। বেনারসি পল্লী থেকে কাপড় নিয়ে এসে কাজ করে দিয়ে আসে। এ থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে নিজের জীবন ঝলমলে করার প্রশ্নই আসে না বরং নিজের মুখমন্ডল ঝলমল করতেই তা শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় সংসার চলবে কার টাকায় তা ভেবে উদভ্রান্ত হয়ে যায় ইমরান আলী। জমানো কিছু টাকা আছে তা খরচ করলে বিপদ আপোদ অসুখ বিসুখে কার কাছে হাত পাতবে সে? 

ছোট মেয়ে শ্যামলী এখন বেনারসী পল্লীতে নতুন কাপড় আনতে যায়। কাজের কথা বলেই রাত করে ঘর ফেরে; যখন ফেরে তখন সাথে দুএকজন ছেলে ছোকড়া থাকে, যদিও তারা দুর থেকেই চলে যায় তবুও ইমান আলী তা বুঝতে পারে। সন্ধ্যার পর থেকে ইমান আলী কান খাড়া করে থাকে মেয়ে আসার পথে। রাত বাড়ার সাথে সাথে তার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অন্ধকারে চুরির শব্দ বা হালকা পায়ের শব্দ পেলেই ইমান আলী ডেকে বলে -'কে মা শ্যামলী, এতক্ষনে আসলি'। 

অপর পক্ষ থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে হতাশায় ভরে যায় তার মন। মাঝে মাঝে কেউ খোটা দিয়ে বলে-

'মেয়েরে পাঠিয়েছেন রাতের বাজারে, কাম শেষ করেই ফিরবে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই জ্যাঠা'। 

বড় মেয়ে আয়েশার ওপর অহেতুক রাগারাগি করে। 

'কতবার বলেছি কাপড় আনতে দুবোন মিলে যাবি, তা না, ওকে একাই পাঠাবে। ঘরের মাঝে থেকে সে বের হবে না, তোর তো শিকড় গজাবে এ ঘরের মধ্যে। ' 

আয়েশা এসব শুনে রাগ করে -

'বাবা তুমি চুপ করো তো, ওর যখন সময় হবে তখন ঠিকই আসবে। তুমি মিছে মিছি টেনশন করছো।'

শ্যামলী এখন আসার সময় বাজার করে নিয়ে আসে, ব্যাগ ভর্তি সে বাজার দেখে ইমরান আলীর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু তার মনে ভর করে গ্লানী। আগে এমন বাজার আসার পর যখন রান্না হতো তখন সে চুলোর পাড়ে বসে থাকতো, রান্নার পরে একসাথে খেয়ে ঘুমুতে যেত। এখন রান্না হওয়ার আগেই ইমরান আলী ঘুমিয়ে পড়ে। অনেক ডাকাডাকির পরও ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার ইচ্ছে হয় না। বিকল্প কোন ব্যবস্থা থাকলে সে হয়তো খেত না কিন্তু পরেরদিন সকালে মেয়েরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই ইমরান আলী খেয়ে নেয়। চুপচাপ খাবার প্লেটে নিয়ে সে মনে মনে বলে- হায়রে খাবার, তোর সাথে বিবেক অভিমান করে থাকতে পারে কিন্তু ক্ষুধার পেট তা পারে না।

ভাই চলে যাওয়ার পর আয়সা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে, কোথাও বের হয় না, প্রয়োজন ছাড়া মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না, উচ্ছাসে ভরা মেয়েটা ঘরের এক কোনায় সারাদিন ঝিম মেরে শুয়ে থাকে। দুই বোনের সখি সখি ভাব এখন নেই। অল্প কিছুদিন হলো তারা আলাদা ঘুমায়, একজন চকিতে অন্যজন মেঝেতে। গভীর রাতে দুজন চাপা স্বরে ঝগড়া করে। শ্যামলীকে এ জীবন ছেড়ে দিয়ে নতুন জীবন শুরু করার অনুরোধ করে। 'বাবার ঔষুধ কে আনবে, প্রতিদিনের খাবার কে জোটাবে'- শ্যামলী যখন এসব বিষয় তোলে তখন গভীর রাতের নিঃস্তব্ধতা দুজনকেই চেপে ধরে। এসব শুনে ঘরের বারান্দায় নির্ঘুম চোখে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকা ইমরান আলী তেল চিটচিটে বালিশে মুখ গুজে পড়ে থাকে। কান্নায় তার শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে কিন্তু চাপা বালিশের ভিতর দিয়ে সে কান্নার শব্দ বের হয় না। 

আয়াত শেখ ইমরান আলীর হাটুতে হাত রেখে বলে-

তোমার মনে অনেক ক্ষোভ আছে জানি, পয়সার অভাবে ভাবীর চিকিৎসা করাতে পারো নি, ছেলেটা উচ্ছন্নে গেছে তাও জানি। তারপরও বলি- তোমার ছেলেকে বোঝাও। জ্বলে বাস করে কুমিরের সাথে বিবাদ করে লাভ নেই। বরং পাশে থাকলে তোমাদের জীবনও তার আর্শিবাদে রঙ্গিন হয়ে উঠবে।

আয়াত শেখের এসব কথা শুনে ইমরান আলী তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আয়াত শেখ, তার ছোটবেলার বন্ধু,  তার বর্তমান অবস্থান সে আঁচ করতে পারে না, সে শুধু ভাবতে থাকে, তার নিজের -সুঁতো ছিঁড়ে যাওয়া ঘুড়ি সে এখন আটকাবে কি করে?





লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম


জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়
পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন