শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

জয়দীপ দে'র গল্প : কাগজের কফিন

কাজ ওই একটাই। সারাদিন বুকের ভেতরে কথার ওল পাকানো।তার ধারণা,পুরো জগৎ-সংসার তার বিপক্ষে চলে গেছে। কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলেছে সবাই। মুখের ওপর যে যার দরজা ভিজিয়ে দিয়েছে। এখন তার দিকে ফিরে তাকানোর ফুসরৎ নেই কারো।তারও যে কিছু বলার থাকতে পারে, তা কারো মাথায় নেই।মাথায় থাকলেও শোনার আগ্রহ নেই। ভাব খানা এমন, পাপিষ্ঠা আর বলবে কি-।পুরো পৃথিবী তাকে এক ঘরে করে দিয়েছে। তার কিছুই যেন এই পৃথিবী গ্রহণ করতে রাজি নয়। এমনকি কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা ধ্বনি-স্বর পর্যন্ত। মাঝে মাঝে পাগলের মতো চিৎকার করে। কখনো কাজের ঠিকে ঝি-টাকে লক্ষ্য করে, কখনো আবার অলক্ষই লক্ষ্য।
একটা শব্দও জানালার শার্সি গলে বাইরে যেতে পারে না। খোয়াড়ের পশুর মতো দেয়ালে দেয়ালে ঘ্যোঁৎ ঘ্যাঁৎ করে দ্বিগুণ আক্রোশেফিরে আসে তার কানে। শব্দগুলো তখন ভৌতিক শোনায়। ভয়ে তখন সে দু কান চেপে ধরে। নিজে নিজের কাছেই পরাজয় মেনে নেয়। বিনা বিচারে এই শাস্তি দেয়ার প্রতিকার চায় সে মনে মনে।কিন্তু আরেক মন বলে উঠে, ঠিকই তো আছে, যার স্বামী বউয়ের ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে ঝুলে পড়ে তার আবার বিচার কি? আজ থেকে শ খানেক বছর আগে হলে লোকে হয়ত তোকে নিয়ে ভালো করে মহুয়ার মদ খাইয়ে স্বামীর চিতায় নিয়ে চড়াতো। তিন প্রজন্ম আগে তো রাহেলারা হিন্দুই ছিল। তার প্রপিতামহের নাম দলিল দস্তাবেজে নিরঞ্জন সূত্রধর লেখা আছে। এখনো গ্রামের বাড়িতে চালার ঘরে বড়ো বড়ো কাঁসার ডেচকি আছে।

ডোর বেলের আওয়াজ হলেই সারাদিনের পাকানো কথার বলগুলো আনন্দে লাফালাফি শুরু করে বুকের ভেতরে। ইচ্ছে করে একটা পাখির মতো উড়ে গিয়ে দরজা খুলতে। কিন্তু পরক্ষণেই তার শ্রেণিচেতনা টন টন করে ওঠে। লাফিয়ে ওঠার চেয়ে সুন্দর করে চেয়ারে বসার প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। এক হাতে আলগোছে ওড়নাটা টেনে নিয়ে বুকে জড়ায়। বাইরে যেমন নিজেকে সাজায় তেমনি ভেতরেও। ও বাড়ির কেউ এলে বুনো আবেগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়া যাবে না। ওটা প্রকারন্তরে দুর্বলতা হিসেবেই গণ্য হবে। হয় করুণা দেখাবে নইলে বিজয়ীর হাসি হেসে ঠোঁট মুছে চলে যাবে। এর কোনটাই রাহেলার পছন্দ নয়। রাহেলা নিজের অবস্থান ক্লিয়ার করতে চায়। এর বেশি কিছু নয়। সে চায় না কেউ তার অশক্ত জীবনের ঠেঁশান হয়ে দাঁড়াক কিংবা নিঃসঙ্গ ভুবনের ছায়াসঙ্গী হউক। সে চায় পুরো পৃথিবীর নিস্পৃহতাকে ভেঙেচুরে দিতে। সবাই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাকতার দিকে; ক্ষণিকের তরে স্তব্ধ হয়ে বলুক, ও তাই।

উপর্যুপরি তিন চারটা আওয়াজের পর অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে রাহেলা। কাজের বুয়াটার ভেতরে একটা অগ্রাহ্যের ভাব দিন দিন দানা বাধছে। শুনেও না শোনা, দেখেও না দেখা। বুয়া বুঝে গেছে তাকে আর ছাড়ানো সম্ভব নয়। এই মড়া বাড়িতে কেউ এসে আর কাজ করবে না। রাহেলা বুয়ার নাম ধরে ডাকে। বুয়া মালগাড়ির মতো ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসে। রাহেলার অস্থিরতার ভুটভুটানি বাড়তে থাকে। তাকে তাড়া দেয় ছুটে যেতে। রাহেলা নিজেকে নিজে গ্যাস বেলুনের মতো আকড়ে ধরে বসে থাকে। মনে মনে ভাবে, ও বাড়ির লোক নাও হতে পারে। সেই কবে থেকে সে ডোরবেলের প্রতীক্ষায় কাঠ হয়ে আছে। আওয়াজ পেলেই অস্থির হয়ে ওঠে, এই বুঝি ও বাড়ির কেউ এলো। কই কেউ তো আসে না। বুয়া গিয়ে দরজা খুললে দেখা যায় হয় ভিক্ষুক, হকার নয়ত জরিপের মেয়েরা। বেইমানের রক্ত, এই বলে রাহেলা তার প্রতীক্ষার সাময়িক যবনিকা টানেন। কিছুক্ষণ অতীতচারিতায় মগ্ন হোন। কি না করেছে সে সংসারের জন্য। হ্যাঁ, একসময় সে যখন পেরে উঠতে পারছিল না, দেখছিল সব দিকে অন্ধকার, তখনই সে বাধ্য হয়ে পিঠ টান দিয়েছে। তারই তো সুফল আজকের স্বচ্ছলতা। কী সুন্দর লেকের কোল ঘেঁষে একটা কর্নার প্লট। ব্যাংকে মোটা অংকের এফডিআর। এ দিয়ে কয়েক প্রজন্ম আরামছে শুয়ে বসে খেতে পারবে। কিন্তু প্রজন্ম আর পেলো কই। ছয়ত্রিশ বছর বন্ধ্যার অপবাদ মাথায় নিয়ে এখন হন্তারকের-। জীবন কতভাবে যে একজন মানুষকে বিপর্যস্ত করতে পারে তারই নমুনা রাহেলা। একজীবনে যেসব উপাদানের পেছনে ধাওয়া করে মানুষ তার সমস্ত সত্তাটাকে খইয়ে ফেলে তার সবই পেয়েছিল রাহেলা আর তার হাজব্যান্ড। সরকারের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পদে আসীন হওয়া চাট্টি খানি কথা নয়। রাহেলাও তার ব্যাংকের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা। পর্বতের একেবারে চূড়ায় আরোহন করে রাহেলা আজ নিজেই স্তম্ভিত। এই আরোহনের অর্থ কী, যে বিজয় কেতন শৈলচূড়ার হিমশীতল বক্ষে গেঁথে দেয়ার কথা ছিল তা তো সে অজান্তেই ফেলে এসেছে মাটির পৃথিবীতে।

২.

দরজাটা খুলতেই রাহিমার বুকটা হিংসায় মোচড় দিয়ে উঠল। বিড় বিড় করে বলল, ‘মাগীর ভাইগ্য দেখো।‘ ঘরভর্তি দামী আসবাব। ঝালড় লাগানো পর্দা। ঝকঝকে সিনথেটিক কার্পেট। দেয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা জুড়ে ল্যাপ্টে থাকা টিভি।এতো কিছুর মালিক এক বন্ধ্যা নারী। কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না রাহিমা। রহিমার ৬ সন্তান। মেয়ে দুটোকে সময় থাকতে সুপাত্রের হাতে গছিয়ে দিয়েছে। এখন চার পুত্র নিয়ে তার সংসার। বড়োটা গদিতে বসে। তাকে নিয়ে কোন চিন্তা নেই। তার আয়তেই সংসারের চাকা ঘুরছে। মেঝোটা ঠিক কোথায় আছে কেউ জানে না। দু’চাট্টা মামলার চক্করে পড়ে এলাকা ছাড়া। সেজোটা তিন বারে বিএ পাস করে চাকরির ধান্ধায় আছে। প্রাইমারির রিটেনে টিকেছে। এখন ভাইভার ঘাট পেরুবার পথ করতেঢাকায় আসা। এমপি সাহেব বলছে ‘চিন্তা কইরেন না খালা’। তারপরো তার মনে উৎকণ্ঠার চোরাকাটাটা ক্ষণে ক্ষণে ঘাই মারে। তখনই রাহেলার কথা তার মনে পড়ল। এতো বড়ো অফিসারের বউ। নিশ্চই তার অনেক জানাশুনা আছে। ভাগ্যিস রাহেলার স্বামী বেঁচে নেই। হতে পারে তার আপন খালার পেটের ভাই। কিন্তু বেঁচে থাকলে এই বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখার সাহস হত না তার। হয়ত গেট থেকেই দারোয়ান বিদেয় করে দিত। আর যদি ভাইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েই যেত পাঁচ শত টাকার একটা নোট দিয়েমিসকিন খেদাত। তার ভাইয়ের অপমৃত্যুর কারণে রাহেলা অনেকটাই মজে গেছে।শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আগে যে খুব একটা ছিল বলা মুশকিল। কাল-ভদ্রে ভাই বোনদের খোঁজ নিতেন রাহেলার হাজব্যান্ড। সেই সূত্রে তারাও ঈদ নববর্ষে নতুন পোশাকে ঘুরে যেত একবার। তবে সেই সম্পর্কের মিষ্টি বাতাস রহিমা পর্যন্ত বিস্তৃত হতো না। নেহাত মায়ের পেটের ভাই বোন ছাড়া অন্যদের প্রতি তেমন উৎসাহ ছিলেন না রাহেলার হাজব্যান্ডের। এই শূন্যতার নিম্নচাপকে ভর করে খর বায়ুর মতো ছুটে এসেছে রাহিমা। আপাত তার চাওয়া সেজো পুত্রের একটা চাকরি। কিন্তু এটা একটা ছলমাত্র। এই সুযোগে চল্লিশ চোরের গুহায় ঢুকে পড়ো; তার পর সুযোগ মতো যা পারো হাতিয়ে নাও।

রাক্ষসীর রুপ যেনো ফুটতাছে। তেত্রিশ বছর পর রাহেলাকে দেখে রহিমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এই। কিন্তু সব কিছু ভালোমানুষি হাসির আভরণে ঢেকে গেলো। কত কালের স্বজনের মতো ছুটে গেলো ‘ভাবী গো কেমন আছেন’ বলে জড়িয়ে ধরতে।

কিন্তু রাহেলা খুব সচেতনভাবে আলিঙ্গন এড়াতে দু হাত ধরে ফেলল রহিমার, বিধাবা মানুষের আর থাকা।

রহিমা রাহেলার এই পিছলে যাওয়া সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করল। ধরা না দেয়ার মতো করে বলল, কি যে কন না ভাবী।

- তা তোমরা কেমন আছো?

উত্তর করার সময় নেই রহিমার। শোকেস ভর্তি তৈজস্বপত্র দেখে সে আত্মহারা। আরো দূরে এ্যাকুরিয়ামে সোনালী মাছের পাখনা নাড়ানোর প্রদর্শনী। ‘ইশ কার লাইগ্যা এতো কিছু রাইখ্যা গেলো ভাইজান’, রহিমার মনে আফসোসের তুষ ধিক ধিক করে।তখনি সেই জ্বালুনিতে হাপরের বায়ু দিতে কাজের বুয়টা ধুমধাম জানালা লাগিয়ে দিয়ে এসি ছেড়ে দেয়। ‘এই বাজা বেটি কি করব এতো কিছু দিয়া-‘, স্বগতে সংলাপ বুনে রাহিমা।



৩.

রহিমাকে দেখে ত্রিভূবন জয়ের আনন্দ পেয়ে বসল তাকে। রহিমা যদিও তার আপন ননদ নয়। ওর হাজব্যান্ডের খালার ঘরের বোন। কোন একটা অনুষ্ঠান হলেই রাজহংসীর মতো এক সারি সন্তান নিয়ে প্যাক প্যাক করে চলে আসত রাহেলার শ্বশুর বাড়িতে। সাথে থাকত সদা ভীত পলায়নপর এক পুরুষ। তার বর। সারাদিন লোকটার কোন অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত না। রাত হলে কাশির আওয়াজে বাড়ির কুকুরগুলো পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমুতে পারত না। এই রহিমাকে রাহেলার শাশুড়ি বিশেষ গুরুত্ব দিত। যতদিন সে বাড়িতে থাকত তার শাশুড়ির ছায়া পড়ত না মাটিতে। কারণ রহিমাই তখন তার শাশুড়ির ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াতো বাড়িময়। গোয়ালের গরুর দুধ চুরি থেকে শুরু করে রাহেলা হাজবেন্ডের লুকিয়ে আনা শাড়ির খবর সে আয়ন বায়ুর মতো বয়ে নিয়ে যেত শাশুড়ির কর্ণকুহরে। তারপর নিম্নচাপ খর বায়ু। ঘুর্ণিঝড়। প্রতিটি পর্বে সে তার নিজের সাধ্যমত ভূমিকা রাখার চেষ্টা করত। তাই তাকে পেলে রাহেলার শাশুড়ি রণমূর্তি রূপ ধারণ করত।

সেই রাজহংসী রহিমা আজ একটা মাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে এসেছে রাহেলার ফ্ল্যাটে। ছেলেটা বয়সের তুলনায় অসম্ভব রোগা। হয়ত বাবার মতো তারও শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। শার্ট প্যান্ট ইন করে যথাসম্ভব পরিপাটি। কিন্তু পায়ে সস্তা চপ্পলটা তার সকল প্রচেষ্টাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ছেলেটাকে দেখে রাহেলার মায়াই হলো। শুধু ছেলেটা- মাকে দেখেও। কি রাহেলা কি হয়ে গেছে। বয়স তার মুখের প্রতিটি ভাঁজে পরাজয়ের স্বাক্ষর রেখে গেছে। এই রহিমার সামনে বিগত দিনের হিসেবের খেরোখাতা খুলে বসা অর্থহীন। রাহিমার জন্য মনটা আর্দ্র হয়ে উঠল রাহেলার।

সেদিন যদি সাহস করে স্বামীকে নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে না আসত তার অবস্থা হয়ত রহিমার কাছাকাছিই হয়ত। না না সেটা কি করে হয়। নিজেকে নিজে শুধরে নেয় রাহেলা। তার স্বামী এতো বড়ো চাকুরে ছিল। তাদের এলাকার ভাষায়, হাতি ল্যাটলেও (বসলেও) গাধার চেয়েও উচু। তবে এটা ঠিক. আজ যে ঐশ্বর্য্য ও প্রতিষ্ঠা তাকে ঘিরে রেখেছে তা হয়ত থাকত না যেমন, এই একাকিত্বও তেমনি তার নাগাল পেত না। ‘কি ভাবছি এসব’, রাহেলা তার ভাবনার গতিপ্রবাহ দেখে সে নিজেই বিস্মিত হয়। ওই রাবনের চিতার চেয়ে এই একাকিত্ব ঢের মনোরম। তার জীবনের সবচেয়ে করোজ্জ্বল সময়গুলোই তার কেটে গেছে শ্বশুর বাড়ির স্যাতস্যাতে ঘরগুলোতে। ফজরের আজান দেয়ার পর পর উঠে পড়তে হত। ধোয়া পুছা রান্না বান্না সব সেরে ৮ টার ভেতরে রওনা দিতে হত কলেজের পথে। সবার খাবার সাজানো থাকত টেবিলে; শুধু তারটা বাদে। রান্না করতে করতে এক টুকরো রুটি কখনো মুখে পুরেছে, কখনো বা তাও হয় নি, তা-ই নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে বাসা থেকে। কই কেউ তো খোঁজটাও নিত না। অথচ তার বাবা ম্যাজিস্ট্রেট পাত্র দেখে আহ্লাদে আট খানা হয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়েছিল। সেই ম্যাজিস্ট্রেট পয়সা খরচের ভয়ে দুই মাসে একবার আসত বাড়িতে। কখনো আরো দীর্ঘ বিরতিতে। কি পেয়েছে সে তার শ্বশুরবাড়ির তিন বছর সময়কালে? বরং সিরিঞ্জ দিয়ে রক্তচোষার মতো তার সর্বসত্তা বিলীন করে নিয়ে যাচ্ছিল বাড়ির সকলে। অনার্স ফাইনালটা দেয়ার পর সে চাপ দিতে শুরু করে তার হাজব্যান্ডকে। সাময়িক মন মালিন্যতার শেষে আসে সেই মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। চাঁদপুরে মেঘনার পাড়ে ছোট্ট একটা কোয়ার্টারে শুরু হয় তাদের টুনাটুনির সংসার। এর মধ্যে হয়ে গেলো তার কৃষি ব্যাংকের চাকরি। জীবনের পালে গতির দমকা হওয়া এসে লাগতে লাগল। তার পর শুধু এগিয়ে যাওয়া। একসময় রাহেলার হাজব্যান্ডও রিয়েলাইজ করল মাটি কামড়ে পেছন পড়ে থাকার কোন মানে নেই। ততদিনে শাশুড়িও গত হয়েছেন। ফলে সকল সম্পর্কের জাল তারা গুটিয়ে নিতে থাকে ধীরে ধীরে।

রাহিমাকে হাত ধরে টেনে বসায় রাহেলা।

- তা ইসমাইল মিয়া কেমন আছে?

রহিমা কথাটা কানে যেতে চমকে ওঠে। রাহেলা আগে তো তার স্বামীকে ইসমাইল ভাই ডাকত, এখন মিয়া! মাগীর ফুটানি কমেনি। তার পর বিনয়াবত ভাব করে বলে, আর কইয়েন না ভাবি, বিছনার লগে ল্যাইটা গেছে গো। বড়ো কষ্ট পাইতাছে মানুষটা। দুই দিন পর মওলানা আইনা তওবা পড়াই, কিন্তু কিয়ের কি-

- তোমার পোলাপাইন কে কি করতেছে?

সংক্ষেপে তার সন্তানদের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে রাহিমা। শেষাংশে সেজো পুত্রের চাকরির তদ্বিরের প্রসঙ্গটি পেশ করে।

রাহেলা মনে মনে হাসে, তার ধারণাই সঠিক। কোন ধান্ধা না থাকলে কেবল সহানুভূতি জানানোর জন্য ৮ ঘন্টার ট্রেন জার্নি করে এদের আসার কথা নয়। কি সামান্য এদের চাওয়া? এরা তো ভালো করে চাইতেও জানেন না। সামান্য একটা প্রাইমারি স্কুলের চাকরির জন্য তার কাছে আসার মানে কি? ছেলেটা যেহেতু ডিগ্রি পাস, চাইলে তো সে ব্যাংকেই একটা ছোটখাটো চাকরিনিয়ে দিতে পারে। যা দিয়ে স্কুলের চাকরি থেকে কয়েকগুণ বেশি পয়সা কামাতে পারবে।

- ভাবী সারা জীবনে কখনো আপনার কাছে কিছু চাই না...

- আচ্ছা ঠিকাছে রহিমা, ওর দায়িত্ব আমি নিলাম।

আশ্বস্ত এক মায়ের উজ্জ্বল মুখ দেখে রাহেলার ভালো লাগে। এভাবে কাটাকুটি খেলেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে এতো সস্তায় সে একটা ঘুঁটি জিতে নিবে ভাবতেও পারেনি।



৪.

ট্রলি ভর্তি খাবার এলো। চিকেন ফ্রাই, পুডিন, মোরববা, ফল, পানীয়, বিস্কিট। আনন্দে রহিমার চোখের কোণ চক চক করে ওঠে। মনে মনে ভাবে, রাতের খাবারের আমন্ত্রণও নিশ্চই পাওয়া যাবে।

- ভাবী এতো বড়ো বাসায় একলা থাকতে আপনার ডর লাগে না।

- ডর লাগে না তবে বড়ো একা লাগে।

রহিমা মনে মনে বলে, একাই তো থাকতে চাইছিলা, এহন ঠ্যালা সামলাও।

- ঢাকায় আসলে তোমরা এখন থেইক্যা এইখানে উইঠ্যো, কেমন-

- জে ভাবি। তা ভাবি ভাইজানের পয়সা কড়ির কি করবেন ভাবছেন কিছু। তিনি তো আর-

- হ্যারে রহিমা, তোমার ভাইর ইচ্ছা ছিল মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার। আমি ভাবছি তার ফিক্সডের টাকা দিয়ে একটা ট্রাস্ট খুলব। গরিব বাচ্চা কাচ্চাদের...

রহিমা মনে মনে বলে, আপন আত্মীয় স্বজনের জন্য কিছু করবেন না, করবেন গিয়া মানুষের জন্য, যত সব ভাওতাবাজি। চাইলে তো নুরু ভাইরে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারো। বেচারার দুইটা কিডনিই নষ্ট হইয়া গেছে। থাউক তুমার জামাইর টাকা তুমি যা ইচ্ছা তাই করো, আমার কি? এখন এসব নিয়া কতা বলতে গেলে পোলাটার চাকরিটা ফসকাইয়া যাইতে পারে, থাক।

রহিমা যখন চিন্তার পুকুর থেকে ডুব মেরে উঠে আসে তখন দেখে তার চোখের সামনে তার মৃত ভাইয়ের সারি সারি হাস্যোজ্জ্বল।

এই দেখো, তোমার ভাই যখন ডিসি ছিল... রাহেলা ফ্যামিলি এলবামের পাতাগুলো উল্টিয়ে রহিমাকে দেখায়। রহিমা যত না জ্বালায় পোড়ে তার চেয়ে অধিক জ্বলে তার সেজো ছেলে। এতো বড়ো একটা মানুষ তার মামা ছিল, কিন্তু সে কখনো তাকে সামনাসামনি দেখতে পারলো না। আফসোস। সব নষ্টের গোড়া তার মার বাচালতা। একটু সবার সঙ্গে ম্যানেজ করে চললে এই মামার থেকে কতই না সুযোগ সুবিধা নেয়া যেত, একবার ভেবেছো? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে মৃত মামার হতভাগ্য ভাগনে।

- এই ছবিটা তোমার ভাই যখন ফিশারিজ মিনিস্ট্রিতে ছিল -। নরওয়েতে গেছিল।

- মামী এইটা তো প্যারিসের ছবি। আইফেল টাওয়ার।

- হুম। তোমার মামা তখন কালচারাল মিনিস্ট্রির জেএস।

রহিমার ছেলে প্রয়াত মামার ছবি দেখে আর অবাক হয়। কি এক চাকরি করত তারা মামা- সকল বিষয়ে ছিলেন প-িত। সব মন্ত্রণালয়ে সব বিষয়ে সরকারকে মন্ত্রণা দিত। এর বিনিময়ে সরকার খুশি হয়ে তাকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে বেরাতো। কী মহিমাময় চাকরি! মামী তার আগ্রহ দেখে ওয়ারড্রব থেকে ডাউস ডাউস একেকটা এলবাম বের করে। মামী একা টেনে বের করতে পারে না। রহিমার ছেলে তাকে সাহায্য করে। রাহেলার কা- কারখানা দেখে রাহিমার ভেতরটা জ্বলে জ্বলে উঠে। যেন কেউ কার্বলিক এসিড দিয়ে তার বুকে যন্ত্রণার উল্কি ফুটাচ্ছে। এলবাম নয় যেন একেকটা ভারী ভারী কাগজের কফিন নামাচ্ছে রাহেলা। যেখানে তার মৃতভাইয়ের খ- খ- জীবন পোরা আছে। রহিমার মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তার ভাইকে এভাবে ঢং করে পুষে রাখার মানে কি? যখন বেঁচে থাকতে মানুষটা এক রত্তি শান্তি দিলে না, বাধ্য হলো সুইসাইডের পথ বেছে নিতে। সে তার বিরক্তি আর চেপে রাখতে পারে না। কখন যেন অবচেতনেই বলে ওঠে,‘মানুষটারে যহন বাচাইতে পারলা না এহনকফিন টাইন্যা কি অইব।’

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪


লেখক পরিচিতি
জয়দীপ দে
প্রভাষকস
সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়
চকবাজার, চট্টগ্রাম
গল্পকার, শিল্পী


সেল: ০১৭২ ৭৭৭৭৯৪৪

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন