শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

সেলিনা হোসেন এর গল্প ফিরে দেখা

বিথীর সঙ্গে আশফাকের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে৷ দুজনের বাবা-মার আয়োজনে বিয়ে৷ তারিখ ঠিক হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি৷ এখনো মাসখানের সময় সামনে৷ আশফাকের ইচ্ছেয় বীথি একবার ওর সঙ্গে দেখা করেছে৷ আশফাক টেলিফোনে বলেছিলো, দুজনে একসঙ্গে থাকতে পারবো কিনা এটুকু তো দেখে নিতে হয় আমাদের, তাই না? আসবে?


বীথি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, স্মার্ট মেয়ে৷ সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলো, হ্যাঁ, ঠিক৷ বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আগে বোঝাপড়াটা হয়ে যাক৷ আমি চাই না বিয়ের ফুটবলটা গোলে ঢুকে পড়ুক৷ ওটা মাঠে গড়ালেই ভালো৷


সেবার দুজনের বলধা গার্ডেনে দেখা হয়েছিলো৷ মধ্য দুপুরে৷ চারদিকে বায়ান্নোর ঝাঁঝালো রোদ৷ ওরা বাগানের মধ্যের পুকুরের সিঁড়িতে বসেছিলো৷ জলে অজস্র পদ্ম৷ নানারকম রঙ৷ এখানে বসার আগে ওরা বাঁধানো চৌবাচ্চায় আমাজান লিলি দেখে এসেছে৷ দুজনেরই পছন্দের জায়গা৷ দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের জন্য ওরা আবার বলধা গার্ডেনে আসে৷ দু’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন দ্বিতীয়বারের মতো ঘোষণা করেছে যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা৷ ঢাকা ভীষণ গরম৷ উনুনের কড়াইয়ে গরম বালুতে খই ফোটার মতো ফুটছে৷ আশফাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরিয়েছে৷ মেধাবী ছাত্র৷ বৃত্তি নিয়ে বিলেতে পিএইচডি করতে যাবে৷ সবকিছু ঠিকঠাক৷ রাজনীতি নিয়ে ও তেমন মাথা ঘামায় না৷ নিজের ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত৷ গণ পরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিতর্ক নিয়ে ওর গভীর কোনো ভাবনা নেই৷ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হোক এটা চায় —এর বেশি কিছু নয়৷ কিন্তু বায়ান্নোর এমন কঠিন সময়ে ও ঘর-বাঁধার স্বপ্নে ভীষণ ব্যাকুল৷


বীথি অন্যরকম মেয়ে৷ ও মনে করে এই সময়টাকে ওর সফল করতে হবে৷ এ সময়টায় হেরে গেলে হারিয়ে যাবে ওর জীবনের অনেকটা — শুধু ওর নয়, ওর ছেলেমেয়েরাও হারাবে পাঁজরের হাড়৷ দেখবে শরীরের একটা কিছু নেই — মিসিং লিঙ্ক৷

সেদিন ও আশফাককে বলে, সকাল থেকেই জিনিস হারাচ্ছি আমি৷ মিটিংয়ে আমার কালো কলমটা, মিছিলে হঠাত্ করে হাত থেকে রুমালটা পড়ে গেলো৷ তুলবার মতো অবস্থাই ছিলো না৷ শুধু এক নজরে দেখলাম কিছু নিভর্ীক তরুণের পদতলে ওটা ধুলোয় ধূসরিত৷ আর এখন নিজেকে হারাতে এলাম৷

—ও, এখনো হারাও নি?
—উঁহু৷

—আর আমি ভাবছিলাম তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যাবার কথা৷ মহাবলেশ্বরের পাহাড়ের ওপর একটা চমৎকার দিঘি আছে৷ ওই জলাধারে পা ডুবিয়ে বসে সন্ধ্যা নামা দেখবো৷ আস্তে আস্তে অন্ধকারে হারিয়ে যাবো দুজনে৷


—তখনো কি আমাদের পা পানিতে ভেজানো থাকবে?

—থাকবে৷
—তারপর?

—কিংবা পানের বরজের ভেতরে মাচার নিচে দুজনে বসে থাকবো৷ ভর দুপুর বেলা৷ তাকিয়ে দেখবো কেমন করে মাচার তলে রোদ সবুজ হয়ে যাচ্ছে৷ সবুজ রোদে সবুজ বাতাসে হারিয়ে যাবো দুজনে৷


বীথির প্রশ্ন, কেমন করে হারাবো? যেমন করে আমার কন্ঠস্বর আরও শত কন্ঠস্বরে হারিয়ে যায় মিছিলে? যেমন করে আমার চেতনা আরও শত চেতনায় হারিয়ে জন্ম দেয় একটি পরিপূর্ণ চেতনার? যেমন করে হঠাৎ চেনামুখ হারিয়ে যায় অনেক দূরে......

আশফাক বাম হাতের তালু দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে৷ বলে, উঁহু আমাদের মাঝে কোনো কিছুকে আসতে দিও না প্লিজ৷ শুধু তুমি আর আমি৷

—আমার মিছিল?
—উঁহু৷

—আমার চেতনা?
—উঁহু৷

—আমার স্বপ্ন?
—আমি কি তোমার স্বপ্ন নই?

—তুমি আমার স্বপ্ন-সেতুর এক প্রান্ত৷ অপর প্রান্তে আছে আমার আর এক স্বপ্ন৷ দুই স্বপ্নের মাঝামাঝি আমি সেতু গড়বো৷ তল দিয়ে বয়ে যাবে আঁকাবাঁকা নদী৷ নদীতে পালতোলা নৌকা৷ নৌকায় থাকবে পেশল মাঝিরা৷ যারা প্রয়োজনে গর্জে উঠবে৷


আশফাক বিস্ময়ে চেঁচিয়ে ওঠে, বীথি?


—চমকাচ্ছো কেন?


—তুমি কি অন্যরকম কথা বলছো না?


—বলবোই তো৷ আমি তো এই সময়টাকে দেখতে পাই৷ আমি বলতে পারবো কি ঘটবে আর কদিন পরে৷ তুমি কি এই সময়কে দেখতে পাও না?


—সময়?
—হ্যাঁ সময়৷ কঠিন সময় আমাদের সামনে৷


বীথির চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিছিলে গুলির পরে গণ পরিষদের বিতর্ক৷ ক্রুদ্ধস্বরে মওলানা তর্কবাগীশ বলছেন, জনাব স্পিকার সাহেব যখন দেশের ছাত্ররা, যারা আমাদের ভাবি আশাভরসাস্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে জীবনলীলা সাঙ্গ করছে, সেই সময় আমরা এখানে বলে সভা করতে চাই না৷ প্রথমে এনকোয়ারি, তারপর হাউস চলবে৷


তর্কবাগীশ শেষ করার পরপরই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “Mr. Speaker, sir, a serious situation has arisen in the country . . . the police rushed into the hospital premises and, sir, to our surprise, to our shame and sorrow, began to assault the peaceful boys. They not only assaulted the students and wounded them, but some of the boys were killed.”


এসবের মাঝে বীথি অস্ফুট আর্তনাদে মাথাটা চেপে ধরে৷


—কি হলো বীথি?


—গুলি৷


—তোমার যে কি হয়েছে বুঝি না৷ তোমার মতো এমন আগামী সময় আমি দেখতে পাই না৷


বীথি হেসে ওঠে৷ আশফাকের কানে সে হাসি ঠিক হাসির মতো মনে হয় না৷


—চলো, বাড়ি চলো৷


আশফাক আহত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে৷


বীথি যখন বাড়ির গেটে এসে নামে তখন শুনতে পায় যুথি গান গাইছে৷ ও স্কুলে পড়ে৷ গলা ভারি মিষ্টি৷ ওস্তাদজী ওকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী৷ ও হয়তো একদিন বড়ো শিল্পী হবে৷ বীথি গেটে ঢোকার আগেই ওর পুলিশ অফিসার বাবার জিপ এসে থামে ওর পেছনে৷ তোয়াব সাহেব জিপ থেকে নেমেইে ওর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকান৷


—এখানে দাঁড়িয়ে আছিস যে?


—ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরলাম আব্বা৷


—সময়টা খুব খারাপ৷ এখন বাইরে বেশি বেরুতে হবে না৷ ঘরে আয়৷


তোয়াব সাহেব গটগট করে হেঁটে যান৷ পুলিশের বুট শব্দ তোলে৷ বীথি বুটের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ নিজেকেই বলে, সময়টা খারাপ বলে সময় থেকে দূরে থাকতে হবে? না, আমি এই সময়ের মেয়ে৷ এই সময়কে নিজের ভেতর পুরে নেবো৷ তখন ওর মনে হয় যুথির গান প্রবল হয়ে চারদিকে ছুটে যাচ্ছে৷ ও ধীরপায়ে বাড়িতে ঢোকে৷


তোয়াব সাহেব এতোক্ষণে পুলিশি পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়েছেন৷ তার স্ত্রী জাহানারা৷ খানিকটা বোকা-সোকা সরল মহিলা৷ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ স্ত্রীর কাছে থেকে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিতে দিতে যুথির গান শুনে কান খাড়া করেন তোয়াব সাহেব৷ খুশি হয়ে মাথা নাড়েন৷ বলেন, মেয়েটির গলা খুব মিষ্টি৷ সুন্দর গায়৷ এসব গুণটুন থাকলে ভালো বিয়ে হবে৷ এজন্যই আমি মেয়েদের গান শেখাচ্ছি৷


জাহানারা মৃদু আপত্তি করে, কি যে বলো না৷ এমনও তো হতে পারে যে মেয়েটি একদিন বিখ্যাত শিল্পী হবে৷


—উঁহু, কখনোই এসব ভেবো না৷ তোমাকে এতো মর্ডান হতে হবে না বলে দিলাম৷ গান শেখানোর ব্যাপারে মেয়েদের ভালো বিয়ে ছাড়া আমার আর কোনো মহত্ উদ্দেশ্য নেই৷


জাহানারা বিষণ্ন মুখে তাকিয়ে থাকে৷ তার কষ্ট হয়৷ এক রকম মরিয়া হয়ে বলে, তুমি এমন করে ভাবতে পারো চিন্তা করলে আমার কষ্ট হয়৷


—কষ্ট হয়!


তোয়াব সাহেব দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলেন, যতসব ন্যাকামি৷ এসব আমি একদম পছন্দ করি না৷ তুমি যদি এভাবে মেয়েদের লাই দাও ভালো হবে না বলে দিলাম৷


জাহানারা কথা না বাড়িয়ে সরে যায়৷ ও জানে এ লোকের সঙ্গে এভাবেই সংসার করে এসেছে —আগামী দিনগুলোও করবে৷ ওর কষ্ট বোঝার কেউ নেই৷


পরদিন সকাল দশটায় মধুর ক্যান্টিনে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেলো বীথির৷ সকাল থেকেই অকারণে মায়ের জন্য মনটা কেমন করছিলো৷ ঠিক কাউকে বোঝাতে পারবে না৷ নিজেই নিজেকে বলে, এ হলো অবোধ্য অনুভূতি৷ আসলে মাকে দেখেই তো খাঁচা ভাঙতে শিখেছি৷ ওকে ক্যান্টিনে ঢুকতে দেখেই হইহই করে ওঠে ছেলেমেয়েরা৷ ওর সম্পর্কে সবার মনেই খানিকটা দ্বিধা আছে৷ ভাবে, ওর বাবা হয়তো টের পেয়ে গেলে ওকে বাড়িতে আটকে রাখবে৷ আন্দোলনে মিছিলে আসতে পারবেন না ও ৷ কিন্তু এ পর্যন্ত বীথি কোনো কিছুই মিস করে নি৷


ওদের সভা শুরু হয়ে যায়৷ গমগম করে ওঠে গাজীর কন্ঠ, বন্ধুরা তোমারা সবাই জানো আজ কেন আমরা এখানে সমবেত হয়েছি৷ কারণ আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বর্তমান সরকার৷ ১৯৪৮ সালে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পর চার বছর কেটে গেছে৷ এতোদিন ধরে ভাষার দাবিকে সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে৷ সেদিন ছাত্রমাজ যখন এক হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো, সরকারের বর্বর দমননীতি তাদের ওপর নেমে এসেছিলো, কিন্তু ছাত্রসমাজ দমননীতি ভয় পায়নি৷ আন্দোলনের মুখে বিশ্বাসঘাতক নাজিমুদ্দীন সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ তিনি সেদিন পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে স্বীকার করে নিয়ে প্রস্তাব পাস করেছিলেন৷ শুধু তাই নয়, গণ পরিষদের কাছে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করেছিলেন৷ একই সঙ্গে সে সময়ে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন৷ যেসব ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিলো তাদের ওপর থেকে সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হয়েছিলো৷ এভাবেই সেদিন ছাত্রসমাজকে শান্ত করা হয়েছিলো৷ এখন আবার পল্টন ময়দানের সভায় তারা নির্লজ্জের মতো বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা৷


গাজী এটুকু বলার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা একযোগে চিত্কার করে ওঠে, মানি না৷ মানবো না৷ স্লোগান ওঠে : রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই৷ বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই৷


এতোকিছুর ভেতরে বীথি তলিয়ে যেতে থাকে৷ দেখতে পায় ক্রিস্টাল কেভের মতো বৃষ্টির ফোঁটা ওর ভেতরে পাথর হয়ে জমে যাচ্ছে৷ এক অদৃশ্য গণ পরিষদের সভা ওর মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে৷ স্পিকার কিছুতেই থামাতে পারছেন না পরিষদ সদস্য মওলানা তর্কবাগীশকে৷ তিনি ক্রুদ্ধস্বরে দুর্বিনীত ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছেন, আপনার order বুঝি না, আপনার order মানবো না৷ The Leader of the House প্রথমে গিয়ে দেখে এসে বিবৃতি দিবেন, তারপর Assembly বসবে৷


স্পিকার — order, order, you have no right to disobey the chair. Please take your seat.


তর্কবাগীশ — Leader of the House আগে গিয়ে দেখে এসে বিবৃতি দিবেন, তারপর House-এর কাজ চলবে৷


স্পিকার — Order, order. Do you mean to say that you will not allow anybody else to speak? You are obstructing the proceedings of the house.


তর্কবাগীশ — Leader of the House গিয়ে Enquiry করে আসুন, তারপর House বসেব, তার পূর্বে নয়৷


স্পিকার — Order, order, Mr. Tarkabagish, I am very sorry. I may be compelled to take action under rule 16(2) of the East Bengal Legislative Assembly Procedure Rules, if you do not obey the chair.


তর্কবাগীশ —যেকোনো Action নিতে পারেন৷ আমাদের দাবি Leader of the House গিয়ে দেখে এসে আগে বলুন পরিস্থিতি কি?


স্পিকার — Order, Order, বলতে বলতে হাতুড়ি পেটায়৷ দৃশ্যটি বীথির মাথার মধ্যে স্থির হয়ে গেলে ও অস্ফুট আর্তনাদ করে ভয়ার্ত চোখে সবার দিকে তাকায়৷ ছেলেমেয়েরা অনুভব করে বীথি তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ওর দৃষ্টি শূন্য৷ মিলি ওকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে, বীথি কি হয়েছে?


—আমি এই সময়টা দেখতে পাচ্ছি৷


মেয়েরা হেসে ওঠে৷ গাজী গম্ভীর হয়ে বলে, হাসবেন না৷ বীথির ষষ্ট ইন্দ্রিয় কাজ করছে৷


—ঠিক বলেছেন গাজী ভাই৷ আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে আগুন৷


—বোগাস৷ নাহার বিরক্তি প্রকাশ করে৷ বলে, আসলে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে তো এই জন্যই ও এমন দিশাহারা হয়ে গেছে৷


—ভালোই হয়েছে৷ ভাষা আন্দোলন আর বিয়ে দুটোই বীথির জীবনে এক হয়ে গেলো৷


বীথির শূন্য দৃষ্টি জ্বলে ওঠে৷ প্রত্যেকের চোখে চোখ রেখে বলতে থাকে, ঠিক বলেছিস৷ একই হয়ে গেছে৷ দুটোই আমার জীবন৷ একটা থেকে অন্যটা আলাদা নয়৷ আমার পারিবারিক জীবনকে সুন্দর রাখার জন্য আমি ভাষা আন্দোলনকে সফল করতে চাই৷ আমি তো দেখতে চাই না যে আমার চোখের সামনে আমার বর্ণমালা পুড়ছে৷ আমি তো দেখতেই চাই না যে আমার ছেলেমেয়েদের উর্দু শিখতে হচ্ছে৷ আমি আমার গান গাইতে ভুলে যাবো৷ না, এমন দিন আমি আমার জীবনে আসতে দেবো না৷


গাজী বক্তৃতার ঢঙে বলে, ঠিকই বলছে বীথি৷ এখন আমাদের সামনে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই৷ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হবে৷


সভা শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে ও দেখতে পায় ওর রিকশার পাশ দিয়ে চলে গেলো পুলিশের গাড়ি৷ ওর বাবা গাড়িতে৷ হাতে ওয়্যারলেস সেট৷ কার সঙ্গে কথা বলছে আব্বা? ও মুখটা ফিরিয়ে নেয়৷ মাথার ভেতরে বলধা গার্ডেনের সোনালি বাঁশঝাড়ের হাজার শালিক কিচিরমিচির করতে থাকে৷ বাড়ি ফিরলে আশফাকের ফোন পায়৷ যুথি এসে বলে, বুবু, দুলাভাই ফোন করেছে৷


—ধুৎ, গাধা কোথাকার৷ এখনো তো তোর দুলাভাই হয়নি৷


—হয় নি তো কি হয়েছে৷ হবে তো৷ সবই তো ঠিক৷ যাও ফোন ধরো৷


ফোন ধরলে আশফাকের সেই পুরনো কথা, তোমার সঙ্গে আমার একটু দেখা হয় না বীথি?


—দেখা তো হয়েছে৷
—আরো চাই৷
—কোথায় দেখা হবে?


—সুন্দর একটি জায়গা খুঁজে বের করবো৷
—কবে?
—কাল৷
—কাল?


—কেন তোমার কোনো কাজ আছে?
—হ্যাঁ, ভীষণ জরুরি কাজ আছে৷


—ভীষণ জরুরি? এখন আমার চেয়েও জরুরি কাজ তোমার থাকতে পারে?


—ইয়ে মানে, সময়টাই তো কাজের সময়৷ এ সময়ের একটি মুহূর্ত কিছুতেই মিস করা যাবে না৷


—কাজটা কখন শেষ হবে?
—আমি জানি না৷


—তবু তুমি আমাকে একটু সময় দাও, আমি অপেক্ষা করবো৷
—অপেক্ষা?


—হ্যাঁ, বীথি অপেক্ষা৷ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো৷ তুমি যতক্ষণ না আসো এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো৷


বীথি রাজি হয়৷ কিন্তু এতোক্ষণে মাথার ভেতরে মৌমাছি হুল ফোঁটাতে শুরু করেছে : বিশ্বাসঘাতক নাজিমুদ্দীন নিপাত যাও৷ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই৷ বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই৷ ওর মনে হয় ও বিয়ে নামক সোনার হরিণ ছুঁতে চায়৷ ও একই সঙ্গে মিছিলের মানুষ হতে চায়৷ দুয়ের ভেতর সেতু গড়েই ও পূর্ণতার দিকে এগোবে৷ পূর্ণতা ছাড়া যে কোনো মানুষের জীবনই সেতুভাঙা জীবন৷


সেদিন বিকেল৷ তোয়াব পরিবারের সবাই চায়ের টেবিলে৷ অনেকদিন পর তোয়াব সাহেব খুব রিল্যাক্স মুডে আছেন৷ চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলেন, তোমার কেনাকাটা শেষ করেছো তো বীথির মা? আর তো তেমন সময় নেই৷


—এসব নিয়ে তুমি ভেবো না৷ গয়না তো আমি নিজে নিজেই করে রেখেছি৷ বেনারসিটা বীথিকে নিয়েই কিনতে চাই৷ ও পরবে শাড়িটা ওর পছন্দেই হবে৷


—তা ঠিক বলেছো৷ কালকেই কিনে ফেলো৷ বিকেলে আমি অফিসে থাকবো৷ তোমাকে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো৷ বীথিকে নিয়ে চলে যাবে৷


জাহানারা খুশি হয়ে বীথিকে বলে, ঠিক আছে তো বীথি? ও চুপ করে থাকে৷ কলাটা দু’হাতে নাড়াচাড়া করে৷ তোয়াব সাহেব ভুরু কুঁচকে বলেন, তুই অমন গম্ভীর হয়ে বসে আছিস কেন বীথি?


—আমার একটা কথা ছিলো আব্বা৷


—কথা? কিসের কথা?


—বিয়ের তারিখটা পিছিয়ে দিন আব্বা৷


তোয়াব সাহেব ধমক দিয়ে ওঠেন, কি বললি?


বীথি খুব বিনীত ভঙ্গিতেই বলে, ওই দিন রাষ্ট্রভাষা দিবস৷ সারা দেশে হরতাল ডাকা হয়েছে৷


তোয়াব সাহেব কঠিন কন্ঠে বলেন, আমি জানি৷ কিন্তু তাতে তোর কি? বল তোর কি? ওইসব নোংরা রাজনীতির কথা আমার ঘরে চলবে না৷


বীথি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলে, নিজের মায়ের ভাষার দাবি নোংরা রাজনীতি? মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে বলে গিয়েছিলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা- তাহলে আপনি কি সেটাই মানেন আব্বা?


তোয়াব সাহেব রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন, চুপ করো৷ বাড়াবাড়ি আমি পছন্দ করি না৷


জাহানারা হতবাক৷ সেও স্বামীর পিছুপিছু চলে যায়৷ যুথি এসে বীথির সামনে দাঁড়ালে ও ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে৷


একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস উপলক্ষে ধর্মঘটের দাবি জোরদার হয়ে উঠেছে৷ প্রতিদিনই সভা থাকে৷ ছেলেমেয়েরা কালো ব্যাচ ধারণ করেছে৷ বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলছে মেয়েরা৷ আন্দোলনের খরচ দিচ্ছে বাড়ির গৃহিণীরা৷ কারো মুখে আপত্তি নেই৷ যে যতটুকু পারছে সেটুকুই প্রাণের টান৷ এর মধ্যে একদিন আশফাকের সঙ্গে প্রোগ্রাম করতে হলো বীথির৷


আশফাক ওর দিকে তাকালে কোনো সাধারণ মেয়েকে দেখতে পায় না৷ কোথায় যেন একটুখানি আলগা কিছু জড়িয়ে আছে ওকে৷ সেটুকু নিয়েই ও অন্যরকম৷ তাই মুগ্ধ হয়ে বলে, তুমি একটা অদ্ভুত মেয়ে বীথি৷


—হ্যাঁ, এই অদ্ভুত মেয়েটাকেই তো তুমি স্বপ্ন দেখাচ্ছো৷


—অবশ্যই নীড়ের স্বপ্ন৷ আমাদের সংসার, আমাদের জীবন৷ আমাদের উঠোনে গাছ থেকে নেমে আসছে কাঠবিড়ালি৷ বলো, কি নাম রাখবো তার?


—সুন্দর একটি ছোট্ট বাংলা নাম৷


—আমার আব্বা-আম্মা ছোট্ট নামে রাজি হবে না৷ লম্বা দেখে নাম রাখবে৷


—কেমন, বলো দেখি?


—যেমন ধরো এই আমার নাম —আশেকে রসুল আশফাক মাহমুদ বিন তৌফিক ইমাম৷


বীথি খিলখিল করে হেসে ওঠে৷ আশফাক নিজেও হাসতে হাসেত বলে, আর যদি কাঠবিড়ালিটা মেয়ে হয় তাহলে রাখবে মোসাম্মৎ আফরোজা জাহান বিনতে উম্মে কুলসুম৷






—উঁহু, তা হবে না৷ সময়টাকে যেমন আমি আমার পক্ষে রাখার জন্য লড়ছি, তেমনি এইসব ছোট ছোট বিষয়গুলোকেও আমার পক্ষে আনবো আমি৷


আশফাক আহত কন্ঠে বলে, বীথি, বিয়ের আগেই কি লড়াই?


—না মোটেই না৷ সুন্দর করে সেতু গড়া আমার লক্ষ্য৷ সেটা যেন আমাদের জীবনের পক্ষে হয়৷


—পারবে?


—অবশ্যই পারবো৷ তবে তোমাকে ছাড়া নয়৷ তোমাকে নিয়েই৷ কথা দাও যা কিছু তোমার আমার সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার শর্ত তার বিরোধিতা করবে না৷


আশফাক নিজের মুঠিতে বীথির হাত তুলে নেয়৷


দু’দিন পর তোয়াব সাহেব উত্তেজিত হয়ে ঘরে ফেরেন৷ বলেন, একটা ঝামেলা বেধে গেছে৷


বীথি ব্যাপারটা বুঝে গেছে৷ জাহানারা উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, কি হয়েছে?


—কি আবার হবে! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তো দেশ উদ্ধার করে ফেলেছে৷ ২১ তারিখ পূর্ববঙ্গ সরকারের বাজেট অধিবেশন৷ আর ওই দিনই ছাত্ররা ধর্মঘট ডাকলো৷ সরকার ২০ তারিখ রাত থেকে এক মাসের জন্য ঢাকা জেলায় ধর্মঘট, সভা, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷


জাহানারা প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, এখন বীথির বিয়ের কি হবে?


—কি হবে মানে? বিয়ে হবেই৷ এর কোনো নড়চড় নেই৷


বীথির শক্ত করে রাখা মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তোয়াব সাহেব বাথরুমে ঢোকে৷


দুদিন পর বেশ রাতে বীথির কাছে ফোন করে গাজী৷ পরিস্কার কন্ঠ : বীথি, আমারা ঠিক করেছি আগামীকাল ১৪৪ ধারা ভাঙবো৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে দশজন দশজন করে একটু পরপর মিছিল নিয়ে বের হবো৷ মেয়েদেরও একটি মিছিল বের হবে৷ আমি জানি কাল সকালে আপনার গায়ে হলুদ৷ তবু বলছি আসবেন৷


রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারে না বীথি৷ বিছানায় শুয়েই শুনতে পায় বাবার পুলিশের গাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো৷ বালিশের নিচ থেকে হাতঘড়ি বের করে দেখে৷ সাড়ে ছয়টা বাজে৷


বেলা বাড়ে৷ গায়ে হলুদের তোড়জোড় চলছে৷ উঠোনে মহিলারা গোল হয়ে বসেছে৷ এক পাটায় মেহেদি বাটা হচ্ছে, অন্য পাটায় কাঁচা হলুদ৷ বড়ো আকারের একটি রুই মাছও কাটছে একজন৷ সবজি-আনাজ টাল করে রাখা হয়েছে একপাশে৷ উঠোনে বড়ো চুলো করা হয়েছে৷ শুকনো কাঠ জ্বলছে দাউদাউ৷ বীথি বারান্দায় এসে দাঁড়ায়৷ এক নজর দেখে৷ মনে হয় বর্ণমালা পুড়ছে৷ মেহেদির পাতা নয় শিলের নিচে পিষ্ট হচ্ছে একটি ‘ম’ কিংবা ‘অ’৷ বটিতে কাটা হচ্ছে একটি ‘ক’৷ টুকরো টুকরো হচ্ছে বর্ণমালা৷


ওই দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে জমা হতে শুরু করেছে ছেলেমেয়েরা৷ মেয়েরা উদ্বিগ্ন৷ ঘড়ি দেখছে৷ বীথিকে ছাড়াই কি ওদের মিছিল নিয়ে বেরুতে হবে?


বীথি দৌড়ে ঘরে আসে৷ আলমারি খুলে একটি চিকন পাড়ের শাড়ি বের করে৷ বেণি খুলে চুল আঁচড়ে নেয়৷ শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে৷


কাট্-টু


বীথি দ্রুতবেগে হাঁটছে৷ উল্টো দিক থেকে আশফাক এসে সামনে দাঁড়ায়


—বীথি তুমি এখানে?


—এখানেই তো আমার থাকার কথা৷


—আজ গায়ে হলুদ৷ বিকেলে বিয়ে৷ কিন্তু আমি জানতাম তুমি এমনটিই করবে৷


বীথি হেসে বলে, তুমি অপেক্ষা করো৷ আমি আসছি৷


কাট্-টু


বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বলে, ওই যে বীথি আসছে৷ ও মেয়েদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়৷ সবাই মিলে স্লোগান দেয়৷ মিছিল বের হওয়ার জন্য তৈরি৷


কাট্-টু


দূরে পুলিশের গাড়ি এসে থামে৷ গাড়ি থেকে নামে তোয়াব সাহেব৷ স্লোগান দিতে দিতে মেয়েদের মিছিল এগিয়ে আসে৷ মিছিলের সামনে বীথিকে দেখে বিস্ময়ে থ হয়ে যান তোয়াব সাহেব৷ বীথিও বাবাকে দেখে৷ মুখ ঘুরিয়ে নেয়৷ সামনে এগিয়ে যায়৷


কাট্-টু


বন্দুক উঁচিয়ে পজিশন নিয়ে বসে আছে পুলিশ৷


কাট্-টু


ছেলেদের মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে৷ বিশাল একটা হাঁ করে স্লোগান দেবার সময়ে বীথির মনে হয় গণ পরিষদের স্পিকারের হাতুড়িটা ওর মুখের ভেতরে পড়ছে৷ ওর মুখ ভরে যাচ্ছে থুতুতে৷ সেই থুতুতে মিশে যাচ্ছে স্পিকারের অর্ডার, অর্ডার ধ্বনি৷


বন্দুক তাক্ করে রাখা পুলিশের দিকে এগিয়ে যাওয়া মিছিলের নেপথ্যে প্রচণ্ড গর্জনে প্রকম্পিত হচ্ছে মাওলানা তর্কবাগীশের কন্ঠ : যখন দেশের ছাত্ররা, যারা আমাদের ভাবী আশাভরসাস্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে জীবনলীলা সাঙ্গ করছে, সেই সময়ে আমরা এখানে বসে সভা করতে চাই না৷ প্রথমে Enquiry তারপর House চলবে৷


কাট্-টু


সেই অদৃশ্য কন্ঠ শোনার সঙ্গে সঙ্গে বীথির মনে হয় কোথায় কে যেন কাঁদছে৷


মুখের ভেতরে গাল ভরা থুতু রক্তের মতো লাগছে৷ মুহূর্তে মাথাটা টলে ওঠে ওর৷ মিলির হাতটা চেপে ধরে বলে, মিলি স্যান্ডেলের ফিতেটা ছিঁড়ে গেলো৷


মিলি সহজ গলায় বলে, তাতে কি হয়েছে৷ হাঁটতে অসুবিধা হলে খালি পায় হাঁট৷ স্যান্ডেল ফেলে দে৷


কাট্-টু


পরক্ষণে মনে হয় কারো কন্ঠ নয়৷ সময় ওর সঙ্গে কথা বলছে৷


কাট্-টু


ও ডানদিকে তাকায়৷ গতকাল রাত্রেই আমগাছটার কাণ্ডে বড়ো একটা পোস্টার সাঁটা হয়েছে —বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই৷ ওর মনে হয় চারদিকে আর কোনো দৃশ্য নেই, শুধু সময়ের বিশাল ক্যানভাসে পোস্টারটা বিমূর্ত শিল্পকর্ম৷ রক্ত ছাড়া ওটাকে কোনো রঙে চিত্রিত করা যায় না৷




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন