শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মুনিয়া মাহমুদের গল্প : একটি সুগন্ধী সাবান

আমি ডিভোর্স চাই। বিরক্ত মুখে টাইয়ের নট্ খুলতে খুলতে বলল সাজ্জাদ ।

বিছানার সাদা বেড কভারটা পায়ের দিকে সরাচ্ছিল মুনিরা। দুধ সাদা ধবধবে বিছানা। বালিশের কভার চারটা ধবধবে সাদা। মুনিরা ভ্রু কুঁচকে সাজ্জাদের দিকে একটু হালকা দৃষ্টি ফেলল। এরপর সাজ্জাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর দু-কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বলল, কী হয়েছে তোমার? অফিসের কোনো ঝামেলা?

একথা শোনার সাথে সাথেই গলা চড়ে গেল সাজ্জাদের । বউ তো না, যেন একটা সাবানকে বিয়ে করেছি আমি। তিন-তিনটা কাজের লোক। সারাদিন কাজ করছে তারপরেও তুমি আছো সর্বক্ষণ ওদের পেছনে পেছনে। এটা কী একটা বাসা? নাকি হোটেল? প্রতিদিন বাসার একই দৃশ্য। ঝকঝকে তকতকে। ঘরের চেয়ার টেবিলের মতো তোমার চেহারাও পালিশ করা। তোমার এই মার্বেল-পাথর মার্কা চেহারা দেখতে দেখতে আমি সত্যি সত্যি একদিন পাগল হয়ে যাব। একটানে কথাগুলো বলে হাঁপাচ্ছে সাজ্জাদ।

মুনিরা মুখটা একটু হা করে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাঁর স্বামীকে দেখছে আর ভাবছে, এই একই কথা আর কত বছর ধরে শুনবে সে। তবে তার এসব সহ্য ক্ষমতা অসীম। সাজ্জাদ হাজারো নোংরা কথা বললেও সে পাত্তা দেয় না । ঘুমানোর আগ পযর্ন্ত সাজ্জাদ বকবক করবে । এটা ওর পুরনো অভ্যাস । মাসে দু-তিনবার ওর এই অভ্যাসটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মৃগী রুগীর খিঁচুনির মতো। বিশেষ করে যখন অফিসে কোনো গন্ডগোল হয়, সেদিন বাসায় এসে এসব শুরু করে। পরে সব ভুলে যায়।

অতি দ্রুত কাপড় বদলে সাজ্জাদ বিছানায় ধপ করে বসলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বকবকানি শুরু করলো। তোমাকে দেখলে মনে হয় তুমি সবসময় বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। সকাল বেলায় ঘুম ভেঙেই দেখি তোমার খোঁপা করা পরিপাটি চুল । সজীব ফ্রেস মুখ। ১০ বছর ধরে তোমাকে একই রুপে দেখছি। কখনো আলুথালু অবস্থায় তোমাকে দেখার সোভাগ্য হয়নি আমার। বাচ্চাদেরকেও তুমি মেশিন বানিয়ে রেখেছো। তোমার অনুমতি ছাড়া ওরা হাসতেও পারে না।

তোমার কথা কী শেষ? এ ব্যাপারটা নিয়ে আমরা কালকে সকালে আলাপ করি? মুনিরা ঠান্ডা গলায় বললো।

না, তোমাকে শুনতেই হবে। আমি চলে যাবো যেখানে আমার খুশি। তোমার মতো লাক্স সাবানের সাথে থাকতে থাকতে আমার দম আটকে আসছে। সাজ্জাদ বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

চলো এখন খেতে চলো । মুনিরা সাজ্জাদের হাত ধরে টেনে উঠিয়ে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসলো। ডাইনিং টেবিল খুবই সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। বাচ্চারা সন্ধ্যার একটু পরেই খেয়ে নিয়েছে। এখন শুধুমাত্র ওরা খাবে বলে ওদের দুজনের প্লেট গ্লাস টেবিলে সাজানো আছে । ভাত-তরকারীও সুন্দর করে ডিস ও বাটিতে বাড়া আছে। টেবিলের মাঝবরাবর হীরের মতো ঝকঝকে কৃষ্টালের ফুলদানীতে বাগান থেকে তোলা ১০-১২টা সাদা লাল গোলাপ পাঁপড়ি মেলে আছে।

টেবিলের দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ বলল, আজকে কি কোনো মিনিস্টারের দাওয়াত আছে বাসায়? তারপর সে টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা আংগুল দিয়ে টোকা দিয়ে ফেলে দিল। পুরো টেবিল পানিময়। মুনিরা শান্ত মুখে ন্যাপকিন দিয়ে পানি চাপা দিল। তারপর প্লেটে ভাত বাড়লো। সাজ্জাদ কিছু ভাত টেবিলে ছড়ালো। মুনিরা না দেখার ভান করে সাজ্জাদের প্লেটে তরকারী বেড়ে দিল। নিজেও প্লেটে নিল। তারপর একটু রুক্ষ গলায় বললো, খাও খাও খাও আর তেজ দেখিয়ো না। আমি অনেক অনেক ক্লান্ত।

কিন্তু তোমার চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি এখুনি বিউটি পার্লার থেকে এসেছো । আজ কোন ছবির শুটিং ছিল তোমার? সাজ্জাদ মুখ ভেংচিয়ে বলল।

ওহ, হরিবল.. মুনিরা দাঁতে দাঁত চেপে অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলো। ওর ইচ্ছা হচ্ছে পুরো এক জগ পানি সাজ্জাদের মাথায় ঢালতে। অফিসে সে বড় সাহেব। সেখানে কর্মচারীদের সাথে মিনমিন করে কথা বলে। কাউকে একটুও কড়া কথা বলতে পারে না। অথচ বাসায় ঢোকার সাথে সাথে সিংহ বনে যায়। অফিসের সব রাগ তখন মুনিরার উপর ঝাড়ে। বিয়ের পর থেকেই এসব দেখে আসছে মুনিরা তাই এখন তার রাগ হলেও সে নিজেকে সংযত করে রাখতে পারে।

কাল থেকে আমি এই টেবিলে বসে খাবো না। বেডরুমে খাবো। কার্পেটের ওপর খবরের কাগজ বিছিয়ে দিবে। টিভি দেখতে দেখতে খাবো। আরাম করে নীচে বসে খাবো। আর তোমাকে যদি দেখি জিনিষপত্র মোছামুছি করছো, সব ডেকোরেশন পিস আছাড় দিয়ে দিয়ে ভাঙবো । আর তোমার চুল কাল থেকে আমি খোলা দেখতে চাই। না, এখন থেকেই--বলে উঠে দাঁড়িয়ে মুনিরার খোঁপাটা টান দিয়ে খুলে দিল।

এবং এর সাথে সাথেই সাজ্জাদের মেজাজের সুউচ্চ গ্রাফ লাইনটা নীচের দিকে নেমে গেল। সে চুপচাপ খাচ্ছে। প্রতি রাতের মতো ওদের খাওয়া দাওয়া শেষ হলে ওষুধের ছোট ট্রে হাতে ১০ বছরের কাজের মেয়ে খুকি সামনে এসে দাঁড়ায়।

আব্বা, ওষুধ নেন। ভয়ে ভয়ে বললো সে কারণ দূর থেকে সাজ্জাদের চড়া মেজাজের আঁচ পেয়েছে ।

খুকির দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ বলল, একেও কী বিউটি পার্লারে নিয়ে গিয়েছিলে?

খুকির চোখে কাজল টানা ও মাথার চুল ছোট ছোট রঙ-বেরঙের কী¬প দিয়ে আটকানো । মুনিরা খুব আদর করে খুকিকে। ও যা শখ করে কিনে দেয়। মুনিরা না ঘুমানো পর্যন্ত সে ঘুমাতে যায় না । অনেক বকা দিয়েও কাজ হয়নি । সাজ্জাদও অবশ্য ওকে বেশ আদর করে ।

তোকে যদি কালকে থেকে দেখি এতো রাত অবধি জেগে আছিস, একেবারে ন্যাড়া করে দিবো। তখন অতো রঙিন রঙিন ক্লিপ আর মাথায় লাগাতে হবে না। ধমকে উঠলো সাজ্জাদ। খুকি ভয়ে দৌড় দিল।

সাজ্জাদের ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার ও হাই কোলেস্টেরোল আছে। অনেক ওষুধ খেতে হয় তাকে। ঘুমের ওষুধও খায়। আজ ওর মেজাজ টঙে। তাই মুনিরা ওষুধগুলো কৌটা থেকে বের করে দিল। ঘুমের ওষুধটাও দিল সাজ্জাদের হাতে।

সাজ্জাদ বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ করেই ঘরের পরিবেশটা নিঝুম হয়ে গেল। মুনিরার দিকের সাইড টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। ঘরের ভেতর হালকা নরম আলো ছড়িয়ে রয়েছে। মুনিরার ঘুম আসছে না। অন্তহীন সময়ের একাকিত্বের জালে সে যেন বন্দী হয়ে আছে। এ জাল অনেক শক্ত জাল যা ভেদ করার শক্তি তার নাই। পাশ থেকে গভীর নিঃশ্বাসের আওয়াজ। মুনিরা প্রায় প্রতি রাতে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বই পড়ে। বই পড়তে পড়তে তার ঘুম এসে যায়।

আজকের রাতটা অন্যরকম মনে হচ্ছে। তার এখন বই পড়তে ইচ্ছা করছে না। কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। নিজেকে বড়ই একা লাগছে। প্রতিদিন সকাল হয় আর রাত হয়। সবকিছুই কেমন একঘেয়ে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। চাঁদও পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। সে নিজেও এই সংসারকে আবর্তন করে দিন রাত ঘুরছে। ওর ঘুরা আর পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে ঘোরার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? না, কোনো পার্থক্যই মুনিরা দেখছে না। ওরাও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে আর সেও ঘুরতে ঘুরতে মৃত্যু নামক অতল গহবরে পতিত হবে।

তবে সাজ্জাদের আজকের এই ব্যবহার মোটেও নতুন নয়। বিয়ের একবছর পর থেকেই শুরু হয়েছে। মুনিরার অসম্ভব পরিপাটি ঝকঝকে সংসার সাজ্জাদের বন্ধুরাও সহ্য করতে পারে না। তারা মুনিরাকে আড়ালে আবডালে ‘লাক্স সাবান’ বলে ডাকে। ওদের সাজ্জাদের সংগে দেখা হলেই বলে, এই তোর লাক্স সুন্দরী কেমন আছে। সবসময় না হলেও সাজ্জাদ মাঝে মাঝে ভীষণ ক্ষেপে যায়। বলে, তোরা তো গুয়ে-মুতে থাকিস, একারণে আমার বাসা দেখলে তোদের শরীর জ্বলে যায়। একথা শুনে ওর বন্ধুরা আরো উচ্চস্বরে হা-হা করে হাসে।

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর সাজ্জাদ একেবারে অন্য মানুষ। গত রাতের কথা কিছুই বলে না। মুনিরার সাথে অস্বাভাবিক খারাপ ব্যবহারের কথা একেবারেই ভুলে যায়। মুনিরাও স্বাভাবিক ব্যবহার করে। তবে ও ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট পায়। সাজ্জাদ অফিসে ও ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার পর বেডরুম বন্ধ করে ইচ্ছামতো চোখের পানি ঝরায়। তখন চারদিক থেকে দু:খ এসে এসে হানা দেয় ওর বিষণœ মনে। মৃত বাবা-মার জন্য ওর মন হাহাকার করে। নিজের চরম একাকিত্বের জন্য তখন ইচ্ছা হয় বাইরে বেরিয়ে পড়তে। তবে আধা ঘন্টার বেশী মুনিরা বেডরুম থাকতে পারে না। খুকি এসে দরজা নক করে। বলে, আম্মা চা আনি। তখন এই মেয়েকেই তার আত্মার একটা অংশ বলে মনে হয়।

মুনিরা ওর সংসারটাকে খুবই গুছিয়ে রাখে। ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরে সব কাজ করে সে। কোনো কাজ সে ফেলে রাখে না। রান্না-বান্না সে নিজ-হাতে করে । স্বামী ও বাচ্চাদের খাওয়ানো, ওদের টিফিন তৈরী, লেখাপড়া, গানের স্কুল, আর্টস্কুল, কোচিং, ওদের নিয়ে পার্কে হাঁটতে যাওয়া, নিজের ব্যায়াম, বাজার, মেহমানদারী-- সব কিছু একহাতে সামলায় সে। সাজ্জাদকে সে সংসারের ব্যাপারে কখনো বিরক্ত করে না। সে তার অফিস নিয়েই ব্যস্ত । মুনিরার ঝকঝকে রান্নাঘর দেখলে মনে হবে না যে এখানে কোনো রান্না হয়। আয়নার মতো পরিষ্কার চারদিক । কাজের মেয়েরাও ওর আদেশের বাইরে এক পাও নড়ে না । ওরাও দুপুরের পর গোসল সেরে খাওয়া-দাওয়া করে হাতে-পায়ে তেল মেখে চুল শুকিয়ে বেনী করে । তারপর ওরা হয় ঘুমায়, তা-নাহলে টিভি দেখে বসে বসে। আর মুনিরা তখন বিছানায় গড়িয়ে বই পড়ে।

বিয়ের আগে মুনিরা সাজ্জাদের অফিসে কাজ করতো। সে সবসময় কথা-বার্তায় ধীর-স্থির, শান্ত স্বভাবের জন্য অফিসের সব ব্যাচেলারই তাকে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব ছিল। পারিবারিক প্রয়োজনে ওকে চাকরী করতে হয়েছে । তাই চাকরী ছাড়া বিয়ের কথা ভাবতো না সে। ওর বস ছিল সাজ্জাদ । মুনিরা প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলতো না সাজ্জাদের সাথে। তবে সাজ্জাদ মুনিরার কাজের ও পরিচ্ছন্নতার খুবই প্রশংসা করতো। যেখানে অন্য সবার টেবিলে চা-য়ের কাপ সারাদিন পড়ে থাকতো, মুনিরা চা খেয়ে সংগে সংগে কাপ কিচেনে রেখে আসতো । মুনিরা তার টেবিল, কম্পিউটার সহ যাবতীয় জিনিষ নিজেই পরিষ্কার করতো । চাকরীর প্রথমদিনই সে দেখে তাদের পিওন একটা ময়লা ভেজা কাপড় দিয়ে সবার টেবিল ক্লিন করছে । তখনই সে তাকে বলে দিয়েছে সে যেন ওর টেবিলে হাত না লাগায়। সাজ্জাদ অফিসের যেকোনো মিটিংএ মুনিরার ডেস্কের কথা বলতো। বলতো, এতো পরিষ্কার পরিপাটি ডেস্ক অফিসের কারো নেই । ‘সী ইজ এন এক্সাম্পল’ প্রায়ই বলতো সে।

সাজ্জাদের বেশভূষা মুনিরা একদম পছন্দ করতো না। অসহ্য লাগতো তার। সে প্রায়ই দেখতো সাজ্জাদ একই শার্ট পরে সপ্তাহ পার করে দিচ্ছে। হাই লেভেল মিটিং থাকলেও একই বেশভূষা সাজ্জাদের। মাথার চুলও এলোমেলো। মুনিরার ভীষণ অস্বস্তি হতো সাজ্জাদকে দেখলে তাই সে পারতপক্ষে সাজ্জাদের দিকে তাকাতো না। ছুটির দিনে সে তার ভাইবোনদের কাপড়-চোপড় আয়রন করে দিত। ঘর ক্লিন করতো। সবাইকে তাড়া দিয়ে গোসল করতে পাঠাতো। ছোটবোন শিলু প্রায়ই বলতো, আপু তোমার ওভারটাইম নাই কেন? ছুটির দিনে অফিস করো না কেন?

একদিন সকালে অফিসে মুনিরার খুবই অস্থির লাগছে কারণ গত তিন দিন ধরে সাজ্জাদ অফিসে আসছে একটা হালকা নীল শার্ট পরে যার ওপরের দিকের একটা বোতাম নাই। মনে হয় ছিঁড়ে গেছে। শার্টের অন্য বোতামগুলোর রঙ গাঢ় নীল । সাজ্জাদের রুমে গেলেই শার্টের ওই খালি জায়গাটার ওপর চোখ স্থির হয়ে যায়। আজ যদি একই শার্ট পরে আসে তাহলে সে তাকাবেই না। তাকালে কি হবে সে নিজেই জানে না কারণ তখন ওর খুব অস্থির লাগবে।

প্রতিদিন মুনিরার ডেস্কের সামনে দিয়ে সাজ্জাদ ওর রুমে ঢুকে। মুনিরা এক ঝলক দেখলো আজো সেই একই শার্ট। একটু পরে সাজ্জাদের রুম থেকে মুনিরার ডাক আসলো । মুনিরা ওর হ্যান্ডব্যাগ থেকে সোইং কিটটা বের করলো । মুনিরার হ্যান্ডব্যাগে সবসময় ছোট্ট একটা সোইং কিট থাকে। সেই ছোট বাক্সে সুঁই-সূতো, বোতাম, ছোট কাঁচি, স্যাফটিপিন, সব আছে। কারণ এগুলো হঠাত করে জরুরী কাজে লাগে।



মুনিরা সাজ্জাদের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নব ঘুরিয়ে লক করে দিল। সাজ্জাদ ফাইল দেখছিল। দরজা বন্ধের শব্দ পেয়েই মুখ তুলে তাকাল সে। মুখটা একটু হা হয়ে গেছে ওর। এক দৃষ্টিতে অবাক হয়ে সে মুনিরাকে দেখছে । টেবিল ছাড়িয়ে মুনিরা সোজা সাজ্জাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

আপনার শার্টটা খুলুন। সাজ্জাদের চোখে চোখ রেখে ধমকের সুরে বলল মুনিরা।

এক্সকিউজ মি, বলে একটু ভড়কে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সাজ্জাদ তার বুকে হাত রাখল। পরক্ষণেই মুনিরার হাতে ধরা সোইং কিটের দিকে চোখ আটকে গেল সাজ্জাদের।

কী হলো, শার্ট খুলছেন না কেন? গত তিনদিন ধরে আমি পেরেশান আপনার এই বোতাম ছাড়া শার্ট দেখতে দেখতে। খুলুন। এক্ষুনি খুলুন বলছি।

সাজ্জাদ কিছুটা ভড়কে চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে শার্টটা খুলে ওর হাতে দিল। মুনিরা শার্ট হাতে নিয়ে সোফায় বসে খুব দ্রুত বোতাম লাগানো শুরু করল। সাজ্জাদ তাঁর রিভলভিং চেয়ার জানালার দিকে ঘুরিয়ে একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো। বোতাম লাগানো শেষ হতেই মুনিরা শার্টটা সাজ্জাদের টেবিলে রেখে কিছু না বলে ধীর পায়ে রুম থেকে বের হলো।

রুম বন্ধ করে ওরা কি করেছে এই নিয়ে পুরো অফিস জুড়ে কানাঘুষা শুরু হলো। এরপর থেকে সাজ্জাদের অন্য রূপ। সুযোগ পেলেই মনিরার দিকে নরম চোখে তাকায়। অন্য রকম ভাবসাব। মুনিরা প্রাণপনে চেষ্টা করছে স্বাভাবিক থাকতে। অফিসের সবাই তার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। একসময় মনে হলো চাকরিটা তাকে ছাড়তে হবে। শেষপর্যন্ত ছাড়তেই হলো চাকরিটা। তবে সাজ্জাদের ঘরণী হয়ে।


মুনিরার চোখে রাজ্যের ঘুম জড়িয়ে আসছে । লম্বা একটা হাই তুললো সে। ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়ে তার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো ছোট্ট সেই নীল বোতাম। সব অশান্তির মূলে ছোট্ট সেই নীল বোতাম। সব ভালোবাসার মূলে ছোট্ট সেই নীল বোতাম। একসময় মুনিরার চোখের সামনে হাজারো হাজারো নীল বোতাম ছুটাছুটি করতে লাগলো। নীল আলো ঠিক্রে বেরোচ্ছে বোতামগুলো থেকে। নীল আলোর ছঁটায় চারপাশ ঝিকমিক করতে লাগলো। আর সেই নীল আলোর রাজ্যে মুনিরা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল।

 

লেখক পরিচিতি
মুনিয়া মাহমুদ
নিউ ইয়র্কে থাকেন
গল্পকার, প্রবন্ধকার। 

২টি মন্তব্য:

  1. কার সমস্যা? খটকা আছে। মুনিরা না সাজ্জাদের? না কি দু”জনেরই। এতো পরিপাটি থাকা্ আবার তা সহ্য করতে না পারা। যাহোক, ভাল লেগেছে।

    উত্তরমুছুন
  2. অন্যরকম। বেশ লাগলো।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন