শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

বিনোদ ঘোষালের গল্প : জাতক কাহিনী

বাচ্চাকে দেখে যান,একজন নার্স সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল,সিগারেট ধরা হাতটা সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল অনুপমের।

সদ্য জ্বালানো সিগারেটটা ফেলে দিতে গিয়েও মনে পড়ল সবে মাত্র একটা টান দেওয়া হয়েছে।পাঁচিলে আগুনটা ঘসে নিভিয়ে আধপোড়া সিগারেটটা পকেটে ঢুকিয়ে তিন লাফে নার্সিংহোমের ফার্স্টফ্লোরে উঠল।করিডরে একটা খাঁচার মত ছোট্ট লোহার বেডে পালক ছাড়ানো মুরগি রঙের ফুট খানেক লম্বা একটা প্রানী শুয়ে।প্রানীটার নাভির থেকে সাদা প্যাঁচানো প্যাঁচানো একটা আট নয় ইঞ্চি লম্বা নল বেরিয়ে রয়েছে,যার মুখটা ক্লিপ দিয়ে আঁটা।অনুপম বুঝল ওটাই নাড়ি।চোখ পড়ল বাচ্চাটার লিঙ্গের দিকে।পুংলিঙ্গ।সে আনন্দটুকুর সময় পেল না ও।কয়েকজন ডাক্তার মিলে গম্ভীর মুখে বাচ্চাটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।শিশুটার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো।ডাক্তারগুলোর পরনে সবুজ গাউন।মুখের মাস্কও খোলে নি কেউ।অনুপম আন্দাজ করল,কিছু একটা গড়বড় হয়েছে নিশ্চই।বুক কেঁপে উঠল ওর।


-কী হয়েছে?

-এদিকে আসুন,বছরষাঠ বয়েসের চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডাঃ দাশ অনুপম কে অন্য দিকে ডেকে নিয়ে গেলেন।বললেন,দেখুন ব্যাপার হচ্ছে আপনার বেবি থারটি সিক্স উইকসে হয়েছে,মানে প্রায় বর্ডার লাইনে।কিছুটা প্রিম্যাচিওরড।ব্রিদিং ট্রাবল হচ্ছে।কাঁদতে পারছে না।ডিস্ট্রেসড।আমরা বেবিকে আরও কিছুক্ষন অক্সিজেন চালিয়ে দেখব,যদি নরমাল স্টেট এ এসে যায় তো ভালো,আদারওয়াইজ ইম্প্রুভ না করলে ওকে কলকাতার কোনও ওয়েল ইক্যৃইপড নার্সিংহোমে ট্রান্সফার করতে হবে।বলে ডাক্তার একটু চুপ থেকে বললেন,নার্ভাস হবেন না।ক্রিটিকাল কোনও কেস নয়,সিজারিয়ান বেবিদের অনেক সময় এমনটা হয়ে থাকে।

-অনেকের মধ্যে আমিই কেন? এইতো গতকাল আমার বন্ধু বিশ্বজিতের ওয়াইফের এই নার্সিংহোমেই সিজার হয়ে ছেলে হয়েছে,কই ওর তো কোনও প্রবলেম হয় নি। বিশ্বজিতের তো অনেক টাকাও আছে তবু কিছু হল না,সব ঝামেলা কেন বার বার আমার সঙ্গেই ......চিৎকার করে কথাগুলো বলতে গিয়ে অনুপম বুঝল ওর গলা দিয়ে শুধু ঘড়ঘড় শব্দ বের হছে। -আমার স্ত্রী কেমন আছেন?

-শি ইজ কোয়াইট ও.কে।লেট আস ওয়েট ফর দ্য বেবি,বলে ডাঃ দাশ চলে গেলেন।উত্তরপাড়ায় এই নার্সিং হোমটা ওনারই।ছোট নার্সিংহোম।মেটারনিটি কেসই বেশি।তার থেকেও বেশি হয় অ্যবরশন।বাইরে গ্লোসাইনে লেখা আছে, নো এমারজেন্সি।অনুপম ধীরে ধীরে হেঁটে এসে সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকল চুপচাপ। অক্সিজেন মাস্কে মুখ ঢেকে থাকা ,নিজের সদ্য জন্মানো শিশুর দিকে তাকিয়ে এই মূহুর্তের অনুভূতিটা বুঝতে চেষ্টা করল।সম্পুর্ন নতুন এক জনের জন্য একেবারে নতুন একটা অনুভূতি?......পিতৃত্ব?...না...হ বোধহয়।অনুপমের স্ত্রী সুলগ্নার সিজার করেছেন যে লেডি ডাক্তার,তিনি বাচ্চাটার পা দুটো আলতো করে তুলে ছেড়ে দিলেন।পা দুটো একটু গুটিয়ে নিল গোলাপী রঙের এইটুকু শরীরটা।

-মঞ্জু তুমি এখানটায় বসে মাস্কটা ধরে থাক।বলে ডাক্তাররা সব চলে গেলেন প রে র ডেলিভারির প্রস্তুতি নিতে। মঞ্জু নামের সবুজ পাড় সাদা শাড়ি পরা মেয়েটা অনুপমের ছেলের মুখে অক্সিজেন মাস্ক ধরে বসে রইল।অভিব্যক্তিহীন মুখ।অনুপম মনে মনে হিসাব করছিল,ওর সঙ্গে এখন ক্যাশ কুড়ি হাজার রয়েছে।কলকাতায় যদি শিফট করতেই হয় তাহলে মোটামুটি কত খরচ

হতে পারে?.........ইস......স.. সুলগ্নার কাছ থেকে কিছু ক্যাশ নিয়ে রেখে দিলে হত।এখন কোথেকে জোগার হবে? অফিসে ফোন করে যদি কিছু ক্যাশলোন পাওয়া যায়। দেখা যাক।

-আপনি নিচে গিয়ে বসুন দাদা, ডাক্তারবাবু ডেকে নেবেন,মঞ্জু বলল।

অনুপম কোনও উত্তর দিল না।নিচে নেমে এল আবার।রিসেপশনে শশুরমশাই থম মেরে বসে আছেন।হাই প্রেশারের রুগী।টেনশনমুক্ত থাকার জন্য দুবেলা প্রানায়াম করেন।এখন চোখ বুজে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বেঞ্চে বসে আছেন।আজ সকাল সাতটার সময় সুলগ্নাকে ভর্তি করার সময় অনুপমের সঙ্গে উনি এসেছিলেন।শাশুড়ি বাড়িতে গত দুই দিন ধরে বিছানায়।অনুপমের বাবা-মা কেউ ই ওর সঙ্গে উত্তরপাড়ায় ফ্ল্যাটে থাকেন না। দেশের বাড়িতে,তারকেশরে।

-বাবা আপনি চিন্তা করবেন না,সে রকম ভয়ের কিছু নেই,অনুপম বলল।

-আ....র আমার মেয়েটার কপালটাই....পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন উনি।অনুপমের মত প্রাইভেট ফার্মের ছাপোষা অফিস স্টাফের সঙ্গে প্রেমে খাবি খেয়ে,তার বরাবর ঝকঝকে রেজাল্টঅলা সুন্দরী মেয়ে বাপ-মার অনিচ্ছায় বিয়ে করেছে,সেই শোকটাই বোধহয় চার বছর পর আবার উথলে উঠল ভদ্রলোকের।

যদি কলকাতায় শিফট করতেই হয়,তাহলে কী ভাবে কী অ্যারেঞ্জ করবে ভেবে পাচ্ছিল না অনুপম।সঙ্গে কেউ নেই এখন।আসলে এমনটা ঘটতে পারে আন্দাজ থাকলে বন্ধুবান্ধব দু’চার জনকে বলে রাখতে পারতো আগে থেকে। কিন্তু এখন তো সব অফিস চলে গেছে।প্রায় দুপুর দুটো,কাকে ডাকবে?কেই বা আসবে?কখন ই বা পৌছাবে? ভাবতে ভাবতে আবার নার্সিং হোমের বাইরে এসে পকেট থেকে পোড়া ভাঁজ খাওয়া সিগারেটটা বার করে ধরাল।দু টান দিয়েই ফেলে দিল।সকাল থেকে কিচ্ছু খাওয়া হয়নি।তার ওপর এই টেনশনে গা গুলোচ্ছে।ধু.....সস.. ভাল্লাগে মাইরি!কোথায় ভেবেছিল আজ বাবা হয়ে যাবার পর রাত্রে চুটিয়ে মাল খেয়ে লাট হয়ে থাকবে।একটা স্মানঅফের পাঁইট গতকাল রাত্রেই কিনে সুলগ্নাকে লুকিয়ে ফ্রীজের পিছনে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল।সব প্রোগ্রাম ভোগে।অনুপম আবার দোতলায় উঠল।

-আপনাকে ডাক্তারবাবু খুঁজছেন,কোথায় গেছিলেন?

-এই তো সামনেই...কোথায় ডাক্তারবাবু?

-ওই যে সোজা ঘরটায় চলে যান।

অনুপম ঘরটার দিকে যাবার সময় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকাল।মঞ্জুকে জিজ্ঞেস করল,একটু ঠিক হয়েছে?

-নাহ্,একইরকম।

ডাঃ দাশ নিজের চেম্বারে বসে কী সব লিখছিলেন।অনুপমকে দেখে বললেন,হ্যাঁ বসুন।

বসল অনুপম।ভিতর টা খুব ছটফট করছে।

-দেখুন আমরা তো প্রায় এক ঘন্টার মত এখানে দেখলাম,বাট বেবির কোনও ইম্প্রভমেন্ট নেই।আপনি ইমিডিয়েট কলকাতার কোনোও ওয়েলইক্যুইপড নার্সিংহোমে শিফট করুন।আমরা অ্যাম্বুলেন্স বলে দিয়েছি।চলে আসবে।

-কোথায় নিয়ে যেতে সাজেস্ট করেন আপ্নি?গলা খাঁকরে জিজ্ঞেস করল অনুপম।

-বেহালায় যে স্মাইল নার্সিংহোম আছে,ওখানকার পেডিকারডিওলজিস্ট ডা.সোম আমার বিশেষ বন্ধু।ভাল ডাক্তার।আর ওখানে ব্যাবস্থাও খুব ভাল।তবে বুঝতেই পারছেন,বেশ এক্সপেন্সিভ।এবার আপনি যদি পারমিট করেন তো আমার মনে হয়...

-আপনি প্লিজ সোমের সঙ্গে কথা বলুন,আমি অখানেই নিয়ে যাচ্ছি।কিছু না ভেবেই অনুপম বলে দিল।

-ওক্কে..এ,আচ্ছা আপনার সংগে যাওয়ার মতন আর কে আছেন?

-কেউই তো নেই।মানে শশুরমশাই আছেন।বয়স্ক,প্রেশারের রুগী।

-না-না,কোনও মহিলা নেই?বেবিকে ধরবে কে?

-নাহ..আপনার এখানে কাউকে পাব?নার্স বা আয়া?অসহায় বোধ করল অনুপম।

-হূম..ম,বুঝেছি,ঠিক আছে দেখছি কী করা যায়।

অনুপম উঠে দাড়াল।অফিসে একবার ফোন করা দরকার।ম্যানেজার গোয়েঙ্কাজীকে বলে যদি অন্তত হাজার পঞ্চাশেক ওর স্যালারি অ্যাকাউন্টে অ্যাডভান্স হিসেবে জমা করানো যায়,এ টি এম থেকে তুলে নেওয়া যাবে।কিন্তু অতো টাকা কি স্যাংশন করবেন এম ডি? গোয়েঙ্কাজীকে ফোন লাগাল।নাম্বার বিজি।একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল নার্সিংহোমের সামনে।অন্য একজন আয়া এসে জানাল,ডাক্তারবাবু আপনাকে ডাকছেন।শুনে আবার ডাক্তারের কাছে গেল।

-হ্যাঁ শুনুন, আমি মঞ্জুকে বেবির সঙ্গে দিচ্ছি।অনুপম কে দেখে বললেন ডা.দাশ।আর সোমের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি।এতে কেস হিস্ট্রিটা লেখা আছে।বলে একটা হিজিবিজি লেখা কাগজ অনুপমের দিকে বাড়ালেন।কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে অনুপম দেখল মঞ্জু উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত পিছনে তুলে টাইট করে খোঁপা বাঁধছে।সবুজ ব্লাউজটার বগলের কাছদুটো গোল হয়ে ভিজে।ভারী বুকদুটো টান খেয়ে আরও ঊঁচিয়ে উঠেছে।এক মুহূর্তের জন্য অনেকদিন পর গোটা শরীর সিরসিরিয়ে উঠল অনুপমের।একজন বয়স্কা আয়া এখন বাচ্চার মুখে মাস্ক ধরে বসে আছে।

-আমার স্ত্রীকে একবার দেখতে পারি?ডা.দাশকে বলল অনুপম

-ওহ..শিওর,এই মঞ্জু ওনাকে একবার বেড ফোর এ নিয়ে যাও।

-আসুন।করিডোর দিয়ে সোজা দশ পা হেটে একটা রুমে ঢুকে মঞ্জু বলল,এই যে,আপনি পেশেন্ট দেখুন আমি বেবিকে রেডি করছি গিয়ে।বলে অনুপমের প্রায় গা ঘেঁসে বের হল মেয়েটা।আর একটু হলেই বুকের ঘসা লাগতো!মেয়েলি ঘামের গন্ধ লাগল নাকে।সুলগ্না সবুজ গাউন পরে শুয়ে আছে।চোখ বোজা।স্যালাইন চলছে।এই ক’মাসের ঢাঁউস পেটটা আচমকা চুপ্সে যাওয়াতে অন্যরকম দেখতে লাগছে ওকে।সুলগ্নার কপালে হাত রেখে কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল অনুপম।

-দাদা আসুন হয়ে গেছে।আজ় আজ সকালে বাড়ি থেকে আনা পরিস্কার,কাচা, সুলগ্নার প্রিয় নীল রঙের বেডশিট টা দিয়ে অনুপমের ছেলেকে রোল করে পেঁচিয়ে বুকের কাছে ধরে বলল মঞ্জু।নিচে নামল দুজন।অ্যাম্বুলেন্সে ঢুকে মুখোমুখি বসল।ডা.দাশ গাড়ির ভেতর ঢুকে অক্সিজেন চালিয়ে মঞ্জুকে নির্দেশ দিয়ে নেমে গেলেন।অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট নিল।অনুপম পিছনে তাকিয়ে দেখল,শশুরমশাই দুইহাত জড়ো করে কপালে ঠেকাচ্ছেন।ট্যাঁওট্যাঁও শব্দে ছুটতে শুরু করল গাড়ি।রাস্তার লোক আগ্রহে তাকাচ্ছে।কেউ কেউ চেনা।অনুপম অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল এতদিনের মিলে আসা হিসেবটা আচমকা গড়মিল হয়ে যাওয়াতে। যে বছর সুলগ্না ক্যাগ এ চান্স পেল সেই বছরই সঙ্গীতাকে বরাবরের জন্য “না” করে দিয়েছিল ও।যদিও সঙ্গীতার ফিগারটা ছিল একঘর । সে তুলনায় সুলগ্না দিল্লী বহুত দূর।বিয়ের বছরখানেক পর থেকেই ইস্যু নেওয়ার জন্য বায়না শুরু করেছিল সুলগ্না।কিন্তু অনুপম চায়নি।বাচ্চাকাচ্চার হাজার ঝামেলা।তাছাড়া এর মধ্যেই বাবাটাবা হয়ে গেলে একটা বুড়োটে ভাব চলে আসতে পারে।মেয়েরা হয়তো আর তেমন পাত্তাই দেবে না।এইসব সিরিয়াস প্রবলেমগুলো সুলগ্নাকে বোঝানো যাবে না বলেই দু’বার অ্যাবরশনও করিয়েছিল ওকে। তারপর থেকেই সুলগ্নার ওই রোগটা শুরু হল।রোগ মানে উদ্ভট সব স্বপ্ন।প্রথম দিকে খুব একটা পাত্তা দিত না অনুপম।স্বপ্নগুলো শুনে হেসে উড়িয়ে দিত । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যপারটা রেগুলার প্র্যাকটিশের মতোন হয়ে দাড়াতে সুলগ্নাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।সুলগ্নার দেখা স্বপ্নগুলোর মধ্যে দু একটা এখনও মনে আছে।যেমন ওই স্বপ্নটা,কতগুলো অস্বাভাবিক বড়মাথাওলা লিলিপূট মানুষ,যারা দলবেঁধে একটা বাড়ির দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে।বাড়িটার উঠোনের মাঝখানে সুলগ্না দাঁড়িয়ে।ওই প্রাণীগুলো সুলগ্নার কাছে আসতে চাইছে,কিন্তু চারদিকে থইথই জল বলে কাছে আসতে পারছে না।কীই পিক্যুলিয়ার..!

ডাক্তার পুরো কেস টা শুনে সুলগ্নাকে কাউন্সেলিংএর বদলে অনুপমকেই হাল্কা করে রগড়ে দিয়েছিলেন।বলেছিলেন,অনেকদিন তো হল,আর কতদিন ঝাড়া হাত-পা থাকবেন?এবার বাবাটাবা হয়ে যান।দেখবেন সব দায়িত্বের একটা সুন্দর দিকও আছে।ইস্যু নেওয়ার সুন্দর দিক কী হতে পারে ভাবতে চায় নি অনুপম,তবে সরকারি চাকুরে,নিশ্চিন্ত জীবনের গ্যারান্টিদানকারী বউ এর জন্য স্যাক্রিফাইস টা যে এবার করতেই হবে,সেটা বুঝে গেছিল ও।যার রেজাল্ট বেরল আজকে,অনুপম কে ভীষন চিন্তিত করে।



আজ গরমটা খুব।গাড়ির মধ্যে বাচ্চাটার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।মঞ্জু অক্সিজেনের নলটার একপ্রান্ত ছেলেটার এইটুকু পুঁচকি নাকের সামনে ধরে বুকে ঠেসে রেখেছে ওকে।এক মুহুর্তের জন্য খুব কষ্ট হল বাচ্চাটার জন্য।“বাচবে তো?”...শব্দটা মনে আসতেই বুকে ঝিলিক দিল।

-ও ঠিক আছে তো?একটুও শব্দ করছে না তো আর..?

-হ্যা ঠিক আছে,অল্প হেসে মঞ্জু উত্তর দিল।আপনি অত চিন্তা করবেন না।ভগবান আছেন,সব ঠিক হয়ে যাবে।আমার ছোট ছেলেটা হওয়ার সময়ও বুকে জল ঢুকে এমনটা হয়েছিল।

অনুপম বলল,ও আচ্ছা...

#############################


প্রায় একঘন্টা অসহ্য রাস্তা পার করে বেহালায় প্রাসাদের মত বিশাল নার্সিংহোমটায় ঢুকল অ্যাম্বুলেন্স।এমারজেন্সিতে নামধাম লিখে লিফটে করে সোজা পাঁচতলায় এন আই সি ইউ তে। মঞ্জুর থেকে প্রথমবার বাচ্চাটাকে কোলে নিল অনুপম।অদ্ভুত একটা অচেনা অনুভূতি ছড়াল গোটা শরীরে।এই প্রাণটা আমার দেওয়া!.....সম্পূর্ণ আমার..!মুখ নামিয়ে বাচ্চাটার কপালে নাক ঠেকাল।কেমন একটা গন্ধ।চোখ বুজল অনুপম।

-এক্সকিউজ মি,একজন সুন্দরী নার্স এসে অনুপমের কাছ থেকে বাচ্চাটাকে নিতে যাবে,তক্ষুনি ভীষন অবাক করে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ খুলে অনুপমের চোখে চোখ রাখল ওর ছেলে।রেখেই আবার চোখ চিপে বন্ধ করে ফেলল।নার্সের কোলে দিতে গিয়ে অনুপম জিজ্ঞেস করল,ও কি এখন দেখতে পায়? কোনও উত্তর না দিয়ে একবার শুধু মেক্যানিকাল হাসল নার্স টা।তারপর প্যাঁচানো চাদরটা ছাড়িয়ে মঞ্জুর হাতে দিয়ে বাচ্চা কোলে ভিতরে চলে গেল। এন আই সি ইউ টা অস্বাভাবিক নিঃশব্দ।বাইরে থেকে কাচের ঘরটার ভেতরে চোখ রাখল অনুপম।ওর ছেলেকে বিশেষ এক রকমের বেডে শোওয়ানো হয়েছে।মুখে অক্সিজেন মাস্ক।একজন ডাক্তার গভীর মনযোগ দিয়ে বাচ্চাটাকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করছেন।সঙ্গে দুইজন নার্স।মস্ত ঘরটা।পাঁচ ছয়খানা বেড।প্রত্যেকটাতেই একটা করে অনুপমের ছেলের সাইজের বাচ্চা শুয়ে আছে।কারো পায়ের পাতায় নল ব্যান্ডেজ দিয়ে বাধা,কারো হাতে স্যালাইন,কারো বা চোখদুটো তূলো ব্য্যান্ডজে মোড়া আর শরীরে বেগুনী আলো দিয়ে রাখা রয়েছে।কাউকে আবার পুরোটাই কাচের বাক্সে ঢাকা।এরা প্রত্যেকে একা।হঠাৎ তীক্ষন কান্নার শব্দ হল কাচের দেয়াল ভেদ করে।একটা বেডের দিকে ছুটে গেল নার্স।অনুপমের বুকের ভেতরে অসম্ভব ঢিবঢিব করছে।অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল।খানিকবাদে ডাক্তারবাবু বাইরে এলেন।অনুপমকে বললেন,আমি অপুর্ব সোম।

-ও আচ্ছা নমস্কার।অনুপম হাতজোড় করল।প্রত্যুত্তরে উনিও ডানহাতটা সামান্য বুকের কাছে তুলেই নামিয়ে নিয়ে বললেন,ডিস্ট্রেসড বেবি।তবে ভয়ের কিছু নেই।ফেটাল কোনোও কেস নয়।ভয় নেই।ঠিক হয়ে যাবে।

-কদ্দিন রাখতে হবে স্যার?

-এখন তো বেবি পার আওয়ার দশ লিটার অক্সিজেন টানছে।ওটা যখন জিরো হবে,তারপর বেবি কে ফিড করিয়ে ডিসচার্য করব।

-আচ্ছা স্যার।আর ইয়ে...বলছিলাম কি যে রাত্তিরে কি থাকতে হবে আমাকে?

-না না সে রকম কোনোও প্রয়োজন নেই।আপনার কনট্যাক্ট নাম্বারতো দিয়ে রেখেছেন,রিসেপশনে।নিশ্চিন্তে বাড়ি যান।আমরা তো আছি।বলে একটা মৃদু প্রফেশন্যাল হাসি দিয়ে চলে গেলেন সোম।

যা....ক। টেনশনের তাহলে সত্যিই কিছু নেই.ই।মাথাটা হালকা হল অনুপমের।মঞ্জুর দিকে তাকাল।বাচ্চাটাকে যে চাদরটা জড়িয়ে আনা হয়েছিল,সেটাকে মেয়েটা এখনও আঁকড়ে রেখেছে বুকে।কত বয়স হতে পারে মঞ্জুর?পঁচিশ ছাব্বিশ খুব জোর।মুটিয়ে যাবার ঠিক আগের মুহুর্তে থেমে গেছে।এইরকম ফিগার সাঙ্ঘাতিক প্রিয় অনুপমের।সুলুগ্না এর থেকে অনেক বেশী মোটা।সবই আছে,কিন্তু কেমন যেন...আসল ইয়ে ব্যাপার টাই নেই।মঞ্জুর শ্যামলা রং।ঘন কাল চকচকে চুল টান করে বাঁধা।সিঁথিতে সিঁদূর।হাতে কব্জিতে একটাই লাল পলা।গলায় রুপোর চেন।পেটের দুপাশে হালকা চর্বির ঢেউ।

-ভয় নেই দাদা।ডাক্তারবাবু বললেনতো সব ঠিক হয়ে যাবে।একটা নিশ্চিন্তিমাখা হাসি দিয়ে দলা পাকানো চাদরটা আরও একটু বুকে চেপে ধরে বলল মঞ্জু।

অনুপম বলল,দেখি কপালে কী লেখা আছে।চল কিছু খেয়ে নিই এবার।খুব ক্ষিদে পেয়েছে।

-আমি কিন্তু কিছু খাব না।আসলে আমার খুব দেরি হয়ে গেল আজ।

-তাই-ই?কটা পর্যন্ত দিউটি তোমার?

-আমার তো কাল নাইট ছিল।রাত আটটা থেকে সকাল আটটা।আজ আমার রিলিভার আসতে দেরী করেছিল,তারপর আপনার বাচ্চার জন্য...

-এহ্‌হে তারমানে আজ আমার জন্যই লেট হয়ে গেল তোমার।ভেরি স্যরি!

-না- না এমা..ছি ছি।অ্যাক্সিডেন্ট তো হতেই পারে।কার হাত আছে বলুন?বাচ্চাটা তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে উঠুক।বেচারা জন্মেই মা-কে ছেড়ে থাকল।

-হ্যাঁ দেখি কবে ঠিক হয়..।কিন্তু আমি একা একা খাব সেটাতো দেখতে ভাল লাগে না।অল্প কিছু হলেও খাও।

উত্তর দেওয়ার আগেই মঞ্জুর কাঁধে ঝোলানো সস্তার সাইড ব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইল বেজে উঠল।চাইনিজ সেট।কানে দিয়ে হাসিহাসি মুখে সুর করে বলল,হ্যাঁ..বল.ও..এত্তদিন পরে মনে পড়ল মঞ্জুকে..!যাক....সত্যি..ই..ই...

হ্যাঁ..এ..গো,আচ্ছা..আ.. আমি ভুলে গেছি!মোটেও নয়...হুমম..হি হি হি..আবার বাজে কথা..কানে ফোন রেখে খিল্লি খেতে খেতে মঞ্জু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে শুরু করল ধীরে ধীরে।পিছনে অনুপম।পিত্তিটা অল্প জ্বলছিল ফোনটা এই সময় আসার জন্য।...এই ই এখন না রাখছি,পরে কথা হবে।।হুমম..টা টা..।ফোনটা রেখে দেওয়ার পরেও হাসিটা সস্তার ক্যাটক্যাটে রঙের লিপস্টিকের মত ছড়িয়ে থাকল দুই ঠোট জুড়ে।মেয়েটা ঠিক কোন ক্যাটাগরির ধরা যাচ্ছে না।

চলুন তাহলে,কিন্তু অল্প একটু খাব।

-চল।

ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আগে দশ হাজার জমা করে দিল অনুপম।কপালে কত লেখা আছে কে জানে? এক দিনের বেবির কোনোও নাম নেই। রিসিড দেওয়া হল বেবি অফ সুলগ্না রায় নামে।গ্রাউন্ড ফ্লোরে হসপিটাল ক্যান্টিনে গিয়ে দুটো মিলের অর্ডার দিল ও।ঝকঝকে ক্যান্টিন।দাম গুলো আরও চকচকে।প্রায় সাত আট মাস ধরে পুরোপুরি অযৌনজীবন যাপনের পর আজ মঞ্জুর শরীরটায় হোয়াইটওয়াশ করার মত চোখ বোলাতে বোলাতে ভীষন ভাবে জেগে উঠছিল।সত্যিকথা বলতে সুলগ্নার ওপর ওই ইচ্ছেটাও আর বছর দেড়েক ধরে আসত না ওর।খানিকটা দায়সারা খুশীকরা মনোভাব নিয়েই মাঝেমধ্যে রাত্রে ফিল্ডে নামতে হত ওকে।কেসটা যতক্ষন চলতে থাকতো,আনন্দের থেকে পরিশ্রমবোধটাই হত বেশি।কিন্তু কিছু করার নেই।অনুপমের কোম্পানিতে চাকরির কোনও ভরসা নেই।মঞ্জুর ভরাট তেলতেলে কাঁধটার দিকে তাকিয়ে চিকেনের নরম পিসে কামড় দিল ও।বেশ খেতে।ক্ষিদেটাও পেয়েছে ভালই।মঞ্জুও খাচ্ছে হাপুস হুপুস।এই সব ভাল খাবার তো তেমন জোটে না।অনুপম হালকা করে এবার টোপটা ছাড়ল।

-তোমার বাড়ি কোথায় মঞ্জু?

-আদিসপ্তগ্রাম।

-এ্যআহ্‌ ...সে কী..এত্তদূর!রোজ যাতায়াত কর?

-হুঁ,বলে হাসল মেয়েটা।

-বাব্বাহ্‌...!আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

-হ্যা,করুন না।

-এখানে মাসে কত মাইনে পাও?

-আমি তো টেম্পো্রারি।রোজ কাজ থাকে না।ডেইলি সত্তর টাকা।

-মাত্র সত্তর!চলে ওতে?

-চলে কী আর?কিন্তু কী করব বলুন,সংসার আছে,দুটো ছেলে।ওদের মানুষতো করতে হবে।আমার বর তো আসতেই দিতে চায় না। আমি ই আসি জোর করে।উপায় কী?

-তোমার দুটো ছেলে?

-হ্যা।বড়টা চার বছর আর ছোটটা এই দেড় এ পা দিল।ক’দিন ধরে বরের খুব লুজ্ মোশন হচ্ছে বলে বেরোতে পারছে না।

-হুম..।গা-টা ঘুলিয়ে উঠল ঘেন্নায়।কী করে তোমার হাজব্যান্ড?প্রস্নটা করেই অনুপমের মনে হল হাজব্যান্ড শব্দটা একটু ভারি হয়ে গেল।

-ওতো রাজমিস্তিরির হেল্পারি করে।

-আচ্ছা..তো দেখ তোমাকে যেটা বলছিলাম,তুমি একটা কাজ করতে পার।আমার বাড়িতে সবসময়ের একজন আয়াতো লাগবেই বাচ্চার জন্য।।তুমি যদি কাজটা কর তো ভাল হয়।আমি তোমাকে নার্সিং হোমের থেকে বেশিই দেব,প্লাস আমার বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করবে।সপ্তায় একদিন ছুটিও পাবে।

মঞ্জু জলের গ্লাস তুলে চুমুক দিয়ে বলল,দেখি আমার বরকে বলে।

মাথাটা একটু গরম হল অনুপমের।মুখে বলল,বেশ,কথা বলে জানিও।



############################



সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ ট্যাক্সিতে উঠে এবার খুব ক্যাজুয়ালি মঞ্জুর গা ঘেসে বসল অনুপম।মেয়েটা সরল না। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছে শাড়ির আঁচলের ফাঁক দিয়ে তলতলে,সামান্য স্ফিত পেটটা দেখা যাচ্ছে।অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অনুপম ভাবল উফফ্ আজ সারাদিন যা টেনশন গেল।যাক এখন সবকিছু আউট অফ ডেঞ্জার।যা যা কর্তব্য সব পুরোটা করা হয়েছে।সুলগ্না যে নার্সিং হোমে ভর্তি,সেখানের ভিজিটিং আওয়ার পৌঁছাতে পৌঁছাতে শেষ হয়ে যাবে।সুতরাং আজ আর ওখানে গিয়ে কাজ নেই।

-মঞ্জু আজতো তোমার খুব লেট হয়ে গেল।বাড়ি ফিরবে কী করে?

-সেটাই তো ভাবছি।দেখি কী করি।ও-ও চিন্তা করবে খুব।বাড়ির মোবাইলটাও ক’দিন হল খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে।

-চিন্তা করবে কেন?এমনটা তোমার নিশ্চই মাঝেমধ্যেই হয়ে থাকে?

-হুমম...তা হয়,বলেই হঠাৎ মনে পড়ার মত করে মঞ্জু বলে উঠল,আচ্ছা দাদা আপনি কিন্তু বউদিকে গিয়ে বলবেন বাচ্চা খুব ভাল আছে।আর কোনোও কষ্ট নেই।।...খারাপ লাগছে বউদির জন্য।বাচ্চাটার মুখ কবে দেখবে কে জানে?

-হুম..ম,সে আমি বুঝিয়ে দেব।

-আসলে মায়ের মন তো।আমারই খারাপ লাগছে এত।বাচ্চাটা এখানে একা একা কদ্দিন পড়ে থাকবে কে জানে?

কিছুক্ষন চুপ থাকল অনুপম।মঞ্জুর কথায় এই প্রথম নিজের ছেলের জন্য একদলা কষ্ট গলার কাছে ঠেলে উঠল।ঢোঁক গিলল ও।দলাটা নামল খানিকটা।

-মঞ্জু তুমি এক কাজ করতে পার।আজকের রাত্তিরটা তুমি আমার বাড়িতে থেকে যেতে পার।

ট্যাক্সি ব্রেক কষল।সামনে জ্যাম।

মঞ্জু হেসে বলল,না না দরকার নেই।আমি নার্সিং হোমেই থেকে যাব।আজ বরং নাইট করে নিয়ে কাল ছুটি নিয়ে নেব ভাবছি।শরীরটাও ভাল নেই আজ।

-এহ্ হে তাহলে ডিউটি করবে কেন শরীর খারাপ নিয়ে?আমাদের বাড়িতে দুটো বেডরুম আছে।একটায় শুয়ে পড়বে।আজ তো তোমারও খুব চাপ গেল আমার ছেলের জন্য।

-এ মা ছি ছি কীই যে বলেন,ওই টুকু শিশু,ওর কী দোষ বলুন!কত কষ্ট পাচ্ছে...আহা..

-হুম..ম,তবু তুমি আমার জন্য এতটা করলে,আমাকেও কিছু করার সুযোগ দাও।নইলে ঋন থেকে যাবে যে।বলে দাঁত বার করল অনুপম।

-কিন্তু আমি আপনার বাড়িতে গেলে আপনার খাটুনি আরও বেড়ে যাবে।

-না-ন-নাহ,খাটনির কী আছে?দোকান থেকে রাত্রের খাবার কিনে নেব।

ফ্রীজের পিছনে রাখা পাইটের বোতলটার কথা মনে পড়ল ওর।

-আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?

-বাড়িতে....ওই তো ..মা ..আমার মা আছে।

-আমি হঠাৎ করে গেলে উনি কিছু মনে করবেন না?

-ধুস..স,মা সেই রকম মানুষ ই না।তাছাড়া বয়স্ক।চোখে কম দেখেন,বলেই ভাবল একটু বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে।উৎসাহে ভেতরটা ফুটছে।

মঞ্জু ঠোট টিপে হেসে বলল,বেশ চলুন তাহলে,আমিও একদিন একটু আরামে ঘুমুই।বলেই আবার লেজ জুড়ল,আমার বরকে কাল কী বলব ভাবছি।

-আরে বলে দিও যে আরজেন্ট ডিউটি পড়ে গেছিল।

-....তাই বলব আর কি।

অনুপম আন্দাজ করল এই মেয়ে তৈরী জিনিস।এতদিন পর ঠিকঠাক জায়গাতেই জাল ফেলেছে বুঝে প্যান্টে নিজের ঘেমে ওঠা হাতের তালু মুছল।



###########################



বেহালার স্মাইল নার্সিংহোম থেকে উত্তরপাড়ায় অনুপমের ফ্ল্যাট পর্যন্ত টানা মিটার ট্যাক্সি নিল সাড়ে চারশ টাকা।তা নিক গিয়ে,একদিনের ব্যাপার।থার্ডফ্লোরে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকতেই মঞ্জুর প্রথম প্রশ্ন,আপনার মা?

-...তাই তো দেখছি,...কোথায় গেল বলতো?বলে ঠোঁট টিপে হাসল অনুপম।

-উনি আছেন তো আদৌ?না কি আমাকে ঢপ দিয়েছেন?বলে পাল্টা একই স্টাইলে হাসল মঞ্জু।

অনুপম বলল,দেখা যাক।

ড্রইংরুম পেরিয়ে মঞ্জু নিজেই গড়গড় করে ঢুকে গেল বেডরুমে।অনুপম পিছনে গিয়ে লাইট জ্বালাল।মঞ্জু বলল,যদ্দিন আঁতুর না ওঠে,এই ঘরটাই বউদির পক্ষে ভাল হবে বাচ্চা নিয়ে থাকার জন্য।বুঝলেন দাদা?

-বুঝলাম,এবার তুমি বল কী খাবে রাত্রে?

-যা খুশি।আপনি যা খাওয়াবেন।

-বেশ, আমাদের পাড়ার দোকানটায় খুব ভাল রুমালি রুটি আর চিকেন করে।চলবে?

-হ্যাঁ হ্যাঁ কোনোও অসুবিধা নেই।।...ওহ,আর একটা কথা...

-বল।

-বাচ্চার জন্য কিন্তু অনেক কাঁথা লাগবে।বাড়িতে পুরনো শাড়ি ধুতি থাকলে..

-ঠিক আছে ও সব পরে দেখা যাবে,অধৈর্য হয়ে বলল অনুপম,তুমি টয়লেটে...ইয়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও,আমি খাবারের অর্ডার দিচ্ছি,বলে অনুপম ভাবল,মালের বোতল টা এখনই বার করবে কি না।মেয়েটা মাল খায় নিশ্চই।হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই খায়।এ পাক্কা লাইনের মেয়ে আছে,নইলে কি আর এমনই এমনই অচেনা একটা লোকের বাড়িতে চলে আসে রাত্রে?

অনেক মাস পর,....না না অনেক বছর পর আসন্ন সুখের লোভে শরীর থিরথির করে কাঁপছিল অনুপমের।হাত পায়ের চেটো ঘেমে উঠছিল।

-তা’লে আমি একটু গা টা ধুয়ে আসি,বলে দু’হাত পিছনে তুলে অনুপমকে সাংঘাতিক উত্তেজিত করে মেয়ে টা আড়মোড়া ভাঙল।তারপর টয়লেটের দিকে পা বাড়াতেই আবার ওর সাইডব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইল বেজে উঠল।

-ধ্যাস..শাহহ,বিরক্তিটা মুখ থেকে বেরিয়েই গেল অনুপমের।আব্বার কে?

মঞ্জু ব্যাগ থেকে ফোন তুলে স্বাভাবিক গলায় বলল,হ্যালো....ওহহ হ্যাঁ,তুই..ই!কোত্থেকে ফোন করছিস?..ও আচ্ছা বল...সে কী রে!থার্মোমিটার দিয়েছিস?..এ্যা..হ..এত্ত..ও!ঠাকুমাকে বল,মাথায় জলপট্টি দিতে..ওহ আচ্ছা দিচ্ছে..।না না ঠিক আছে...আমাকে আগে জানাবি তো...হ্যাঁ হ্যাঁ ঠাকুমা কে বল চিন্তা না করতে,আর ওই সাদা ট্যাবলেটটা গোটা একটা খাইয়ে দিতে।আমি আসছি..হ্যাঁ বললাম তো আসছি।বলিস একটু রাত হবে পৌঁছতে।এখনোও বেরতে পারি নি।।..এই বেরচ্ছি...হুম..ম রাখলাম।ফোনটা কেটে দিয়ে মঞ্জু খুব সামান্য হেসে বলল,আরামে ঘুমুনো আমার কপালে নেই দাদা।ভাবলাম একদিন একটু... ...আমাকে এখন বাড়ি ফিরতে হবে।

-কারনটা জানতে পারি?চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল অনুপম।

-বরের শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে।তুমুল জ্বর।ভাবুন সারাদিনে আমাকে কেউ কিচ্ছু জানায় নি।বড় ছেলেটা এখন ফোন করে বলছে,বাবা জ্বরে বেহুঁশ।কেমন লাগে শুনতে!কি চিন্তা হয় বলুন দেখি!এত রাত্তিরে...আমি চললাম দাদা।বউদি ছেলে নিয়ে ফিরুক তারপর একদিন আসবখন।

কোনোও উত্তর দিল না অনুপম।নিজেকে গুছিয়ে ক্যালাতে ইচ্ছে করছে।

-আসি,বলে সাইডব্যাগ কাধে নিয়ে আর প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মঞ্জু।অটোলক হয়ে গেল দরজা।ঘরের মাঝখানে কিছুক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অনুপম।দাঁতে দাঁত ঘসার জন্য মুখের ভেতর কট কট শব্দ হচ্ছে।মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে ভেবে না পেয়ে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।রাগে মাথার ভেতর ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে।নিচে তাকিয়ে দেখল,মঞ্জু হাঁটতে হাঁটতে ফ্ল্যাট কম্পাউন্ডের গেট পর্যন্ত পৌঁছেও হঠাৎ আবার পিছন ঘুরে ফিরে আসছে।।..আ..আ.হ।আসবে না মানে!এইসব মেয়েদের খুব ভাল করে চেনা আছে।শধু ভাও বাড়ানোর জন্য এইসব নৌটঙ্কি। বেশতো অনপুমও ওকে খুশি করে দেবে।একটা লাল পাত্তিই কাফি এর জন্য। মেয়েটা এসে ফিক করে হেসে বলবে,ফিরেই এলাম আপনার জন্য,কিংবা অন্য কোনও অজুহাত।অনুপম সাঁ করে ব্যালকনি ছেড়ে ড্রইংরুমে এসে দাড়াল।বুকের ভেতর হাতুরি পিটছে।অসহ্য দু-তিন মিনিট।টিং টং করে বেল বাজল।দরজা খুলতেই মঞ্জু।ক্লান্ত হাসি মুখ।বলল,আবার ফিরতে হল আমায়।

-হ্যাঁ হ্যাঁ জানি। ভেতরে এস। ঠোঁট বেঁকিয়ে সামা্ন্য মুচকি হেসে বলল অনুপম।


-না ভেতরে আর যাব না।আসলে খেয়ালই ছিল না,আপনার এটা নিয়েই চলে যাচ্ছিলাম,যদি কাল ডিউটি না আসি তবে বাড়িতেই পড়ে থাকবে।বলে হাতে ঝোলানো প্লাস্টিকটার ভেতর থেকে সকালের সেই দলা পাকানো বেডশিটটাকে বার করে অকারন যত্নে,আদরে সামনে তুলে ধরল আর ঠিক তখনই অনুপম কিছু না বুঝেই পরম সাবধানে দুহাতে আলতোভাবে বুকের সামনে জড়িয়ে ধরল চাদরটা ঠিক যেন...



লেখক পরিচিতি
বিনোদ ঘোষাল 

জন্ম- ১৯৭৬ সাল, কোন্নগরের হুগলি জেলায় , প্রথম প্রকাশিত গল্প- ২০০৩ সাল দেশ পত্রিকায়
পেশা- সাংবাদিকতা , প্রকাশিত বই- ডানাওলা মানুষ(গল্পগ্রন্থ)- পরশপাথর, মাঝরাস্তায় কয়েকজন(উপন্যাস)- পত্রভারতী
যেদিন ভেসে গেছে(উপন্যাস)-দীপ প্রক|শন , বৃষ্টি পড়ার আগে(উপন্যাস)- আনন্দ , নতুন গল্প ২৫(গল্পগ্রন্থ)- অভিযান পাবলিশার্স

পুরস্কার- সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার ২০১১ , পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার-২০১৪
অসম প্রকাশন পরিষদ বিশেষ সম্মান-২০১৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন