শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ এর গল্প- দৌড় অথবা একটি গল্পের শুরু


একদিন অমিতাভ আমাকে বলে তুমি একটা গল্প লেখ। আমি আংশিক তন্দ্রাচ্ছন্ন। দুপুর একটার মতো বাজে। কর্মের পরিধি ক্রমশ কমে আসছে। সতরাং অমিতাভের উপস্থিতি ভালো লাগে। অমিতাভের আসল নাম অমিত হোসেন। আমি মজা করে ডাকি অমিতাভ। অমিতাভ আমার পরিচিত। কিন্তু বন্ধুর মতো নয়। অথচ মাঝে মাঝে আমার ছোট বেলার মৃত বন্ধুর মতো আচরণ করে। তখন আমার জলপ্রবণতা বাড়ে। জলের ভেতর সাদা সাদা রূপচাঁদা মাছ, এরকম মৎসসময় চারিদিকে আসে। অমিতাভ বলে ’কবিতা লেইখা আর কি অইবো। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ বহুত কবিতা লেখছে। আর কবিতার দরকার নাই।’ আমি তখন আংশিক তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেও অমিতাভকে অপরিচিত লাগে না। কিন্তু ওর ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলি আমি প্রথমে ধরতে পারি না। তখন শীতকাল। বাজারে পাঁচরঙা মাছ, সবুজ তরকারি। আমার খুব নেমে যেতে ইচ্ছে করে। বাজারে বাজারে কি অপরূপ সৃষ্টিসভ্যতা! কিন্তু আমার চেহারা মাছওয়ালার না-পছন্দ। বলে অন্যদিকে যান। তাদের ভাষা বুঝতেও আমার অসুবিধা হয়। আমি কি বাঙালি। অন্তর কেঁপে উঠে। অমিতাভ আবার বলে ’গল্প লেখলে বেশীদিন লাগবো না নাম করতে। পয়সাও পাইবা মিয়া। দেখোনা হুমায়ুন, মিলন, সাবের কি করতাছে। কি নাম ডাক তাদের। পত্রিকার সম্পাদক বই প্রকাশক সবাই ওদের লেখা কি যত্ন কইরা ছাপে।’ আমার তন্দ্রা এখনো কাটেনি। অমিতাভের কথা কানে ভালো করে ঢুকছে না। তবু বুঝতে পারলাম আমার প্রচুর শীত করছে। কারণ বাইরে অনেক বাতাস। একটু পানি খেয়ে অমিতাভের দিকে তাকাই। অমিতাভ কি বাঙালি। বাংলা ভাষায় কথা বলছে। আমি আবার পানি খাই। ধীরে ধীরে টেবিলের কাঁচ পরিস্কার হয়। অমিতাভ যে একটু ন্যাংটা আমি দেখতে পাই। বললাম কি ব্যাপার তোমার এমন অবস্থা কেন। কাপড় কোথায়। অমিতাভ বলে ‘ধ্যাত মিঞা। পাগলামি করতাছো কেন। এইসব না কইরা একটা গল্প লেখো।‘ আমি তখন বেশ বুঝতে পারি কোথাও পাখির শব্দ হচ্ছে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ছে, কোথাও রক্তপাত হচ্ছে। আমার বয়স উঠছে কারণ পৃথিবী ঘুরছে। এক সময় অমিতাভ চলে যায়। দরোজা পেরিয়ে একটা বড়সরো পোকা বের হয়ে গেলো। আমি ডাকি অমিতাভ অমিতাভ। আসো। কিন্তু মনে হলো শব্দটা অমিতাভের পরিচিত নয়। আমার দিকে সে তাকালো না। আমি তখন জানালার কাছে এসে দাঁড়ালাম। কুকুর ঘুমায়, গাড়ি চলছে, মানুষ শব্দ করছে। একসময় একটি প্লেন আকাশে উড়লো। পৃথিবী সূর্য থেকে দূরে চলে যেতেই আমার বিষণ্নতা বাড়লো। অমিতাভ যে শব্দটি বারবার উচ্চারণ করলো -সেটি আমাকে ধরলো। আমি বলি কিসের গল্প লিখবো আমি। গল্পতো কাহিনী লাগে। ঘটনা লাগে। জীবন থেকে ঘটনা লাগে। তারপর বসে বসে লিখার ধৈর্য লাগে। হুমায়ুনের গল্পে কি সুন্দর কাহিনী আছে। ও হিমু নামের চরিত্র করে। হিমু হলুদ জামাকাপড় পড়ে রাত্রে ঘুরে বেড়ায়। মিলন কি নিখুঁত গহীন প্রেমকাহিনী লেখে। মানবমানবীর প্রেমভালোবাসার সম্পর্কের কথা। আর সাবেরতো রেলস্টেশনের গল্প বলে মানুষের মাথা খারাপ করে দিয়েছে। বুদ্ধিজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন সেটা পড়ে বিস্মিত, অভিভূত। বিবৃতি লিখছে। আমি এগুলো কীভাবে লিখি। তন্দ্রা কাটলেও মাথা খুলে না। শরীরটাও কেমন মাটির মতো স্থির হয়ে আছে। ধাক্কা দিলেই বালির মতো ভেঙ্গে গুঁড়ো।

তখন সন্ধ্যা শুরু হয়ে গেছে। আমার ভাষা বাঙালিদের ভাষা হয়ে উঠেছে। এক সময় দৌড় দিয়ে পুকুর তলায় যাই। শান বাঁধানো ঘাট। পরিত্যক্ত পরিস্কার জল। টলটল করছে। মাঝখানে লালপদ্ম। কবিতা লেখার কথা মনে পড়ে। কিন্তু আমাকে তো গল্প লেখার কথা। ঢিল মারি লালপদ্মের মাথায়। লাগে না। লালপদ্ম আরো লাল হয়। জলের কম্পন আরো বাড়ে। এক সময় অমিতাভ আবার আসে। আমাকে নির্জন পুকুর ঘাটে একা বসে থাকতে দেখে অবাক হয়। মিয়া ভূতে পাইছে নাকি? এখানে কি করো। যাও গল্পো লেখো। তখন শীতকাল শেষ কারণ এক সময় দেখি আমার পড়নে কিছুই নেই। ঘাম ঝরছে। ঘামাচি কাঁটা দিচ্ছে। সামনে পুকুরটাও নেই। পুকুরটা ভরাট হয়ে গেছে। অনেকগুলো লোক ফ্লাট বাড়ি তুলছে। জমির একপাশে লেখা- অমিতাভ হোসেন। আমার মনে পড়ে দু’দিন ধরে আমি ঘরে যাই না। সূর্য যে দিকে উঠে সে দিকে আমার ঘর। আমি হাঁটতে থাকি। কিন্তু অমিতাভের প্রসংগটা মাথা থেকে যায় না। তখন ভাবি একটা গল্প লেখা দরকার। কতো লোকজন তো কতো মজার মজার কাহিনী লেখে। একবার চিন্তা করি গল্প লেখকদের কাছে যাই। একবার গেলাম হুমায়ুন স্যারের বাসায়। বাসার সামনে লেখা - বই লেখার কাজ চলছে - দেখা করা নিষেধ। গেলাম মিলন ভাইয়ের বাসায়। উপর থেকে একটি সুন্দর মতো মেয়ে নেমে আসলো। আমি বললাম 'মিলন ভাইয়ের সাথে একটু দেখা করতে চাই।' 'কেন দেখা করবেন।' 'গল্প লেখা শিখবো।' মেয়েটা দাঁত ব্রাশ করতে লাগলো ’উনি ঘুমোচ্ছেন।’ এবার ভরসা সাবের ভাই। কোথায় পাই তাকে। হাঁটতে হাঁটতে আমি ক্লান্ত। গ্রীষ্মকাল এখনো আছে। গাছগাছালিতে কোনো বাতাস নাই। একবার মনে পড়লো এক পত্রিকায় সাবেরের একটা ঠিকানা দেখেছিলাম। তখনই সেদিকে গেলাম। ‘সাবের ভাই সাবের ভাই একটা গল্প দেন।‘ ভেতর থেকে উত্তর আসে 'তিনি মহাব্যস্ত। অবষাদ আর আড়মোরার গল্প লিখছে। অনেক বড় গল্প। লোকজন কাহিনী উপকাহিনী দিয়ে ঠাসা ঠাসা। দেখা করতে পারবেন না। আপনি আর একদিন আসেন।' আমার আর ধৈর্য থাকে না। কিন্তু গল্প লেখার চাপটা ঘনীভূত হতে থাকে। এদিকে আমার ত্রিশ বছর পার হয়ে দু’দিন। অর্থাৎ পৃথিবী ঘুরছে। আমার ঘরের কথা মনে হলো। বাড়ির গলি ধরতেই দেখি দুটো পুলিশ এগিয়ে আসছে আমার দিকে। প্রথমে কেয়ার করলাম না। কিন্তু পুলিশ একসময় আমার সামনে সত্যি সত্যি দাঁড়ায়। 'এতো রাতে রাস্তায় কিরে?' ' কিছু না' বললাম। এমনিতে হাঁটছি। পুলিশ একজন বলে 'দালাল হয়তো। ধইরা নিয়া যাই।' আর একজন বলে ’ধইরা কোনো কাম হবে না, কালই ছাড়া পাইয়া যাইবো। মাঝখানে আমাদের অনেক কষ্ট।’ প্রথম পুলিশ আবার বলে ’কিন্তু ওর পড়নেতো কোনো সুতা নাই। পাগল।’ আমি বিষয়টা বুঝে উঠতে পারলাম না। লজ্জা পেয়ে বলি কাপড়তো আমার ঠিকই আছে। আপনারা নিজেদেরকে আয়না দেখেন না! শেষের বাক্যটা বোধ হয় ওরা বুঝেনি। বাঙালি কিনা সন্দেহ হলো। যাক বাঁচা গেলো -ভাবলাম। অবশেষে ঘরে ফিরি। ভাষা কি কম শক্তিশালি! এক সময় সূর্য উঠলো। গাছপালা দেখলাম না যে পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠার গল্প বলবো। আমার কাছে দুটি বাচ্চা দৌড় দিয়ে আসে। বলে ’বাপটা বাপটা আমাদের জামা কই।’ আমি নির্বাক। ওরা আবার বলে ’বাপটা বামাদের চুলা জ্বলেনা আগুন নাই। বাপটা ও বাপটা ভাত কই।’ ভেতর থেকে ওদের মা এলো। রেগে আছে কিনা বোঝা গেলো না। সারাদিন মাস্টারি করে বেচারা শরীরটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। বাচ্চা দুটি এক সময় আমার মাথায় এক কলস পানি ঢেলে দিয়ে বলে ’বাপটা তুমি গোসল করো তোমার গায়ে পচা গন্ধ।’ পানির স্পর্শ পেয়ে আমার কি অবস্থা। যেনো ছাদে ঘুড়ি উড়াচ্ছি। আমার সহোদর চিৎকার করছে ভাই ভাই বাগাট্টা। ভাই ভাই একেবারে ছাপ্পা, ময়দান ছাপ।

একদিন সকাল হলে অমিতাভ আর আসে না। আমি ভাবলাম সে আমার ছোট বেলার বন্ধুর মতো মৃত। কিন্তু গল্প লেখার যে আওয়াজ দিয়ে গেছে সেটা এখন তুষের আগুনের মতো জ্বলছে। আমি গল্প লিখি কী করে। এ বাংলায় নামীদামী লেখকদের নাগাল তো আর পেলাম না। এখন আমার ঐ বাংলায় যাওয়া প্রয়োজন। দাও সুনীল একটা গল্প দাও, দাও বাশার একটা গল্প দাও। ’লুপ্ত পুজাবিধি’ এরকম কিছু নাহোক অন্যরকম অন্যকিছু। এক সময়ে সীমান্তের কাঁটাতারের খোঁচা লাগে।আমি মাটিতে পড়ে যাই। এক দঙ্গল মারমুখি লোক চিৎকার করে ওঠে ’ম্লেচ্ছ, যবন যবন। গল্প চায়, কাহিনী চায়। যাও ভাগ, নিজদেশে যাও।’ তখন অফিসে কারেন্ট চলে যায়। ফ্যানের বাতাস লাগে না। জানালাটা এমনভাবে লাগানো যে কখনো খোলা যায় না। কারিগর জাতীয় লোকজনদেরকে কয়েকবার বলেছিলাম। কিন্তু ওরা আসে না। বলে ‘কথা বুঝিনা স্যার কাগজে লিখে জানান।‘ আমি কাগজে লিখি- জানালা খোলার ব্যবস্থা করে বাধিত করবেন।‘ কাগজে ক্রমশ লিখে চলি এভাবে ত্রিশ বছর পার। এক সময় মনে পড়ে একটা ফাইল পাঠিয়েছি অনেকদিন হলো। আসে না কেন। পিয়নটাকে বললাম ফাইলটা কোথায়। সে বলে ’উপরে উঠছে স্যার।’ দিন যায় রাত যায় গ্রীস্ম বর্ষা শীত বসন্ত। আমার ত্রিশ বছর পার হয়ে যায়। ফাইল আর আসে না। একটা গ্রাম ক্রমশ অন্ধকারে যায়। মানুষগুলো অপেক্ষা করতে করতে হাত পা হারিয়ে ফেলে। রেলগাড়ি ঝমঝম। আকাশ পাতাল থমথম। রেলের নিচে একটা আধুলি দিলে কি হয় জানো। জানি, জানিনা। কারণ ট্রেন আমি কোনোদিন দেখি নাই। একদিন মাটি ফুঁড়ে একটি ফাইল জাগে। পিয়নটা হাসতে হাসতে বলে ’স্যার স্যার আসছে।’ আমি খুশিতে আটখানা। দেখি তো কি লেখা। এক পাতা দুই পাতা উল্টাই। তৃতীয় পাতায় লেখা ’দৌড়াও।’ কেন দৌড়াবো। চোখে ভাসতে থাকে ’দৌড়াও।’ আমি কি দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুত। আমারতো বয়স ত্রিশ। এমন সময়ে মনে পড়লো একবার লেখা ছিলো ’হাঁটো।’ আমি তখন অসুস্থ হাঁটতে পারিনি। পরে কিযে অবস্থা! আমার কাছে প্রিন্টেড কাগজ আসতেই থাকে। আমাকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পাঠায়। এক টেবিল থেকে আর টেবিলে। এক সময় পানি খেতে চাই। কানে আবার মৃদু শব্দ হয়। ’দৌড়াও।’ আমি সত্যি সত্যি দৌড়াতে শুরু করলাম। তখন গ্রীষ্ম শেষে শীত এসে পড়েছে। বুঝলাম ফুটপাতে গরম কাপড়। আমি রাস্তাঘাট বনবাদাড় এসবের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ দৌড়ালাম। একদিন দুপুরে দৌড়াতে দৌড়াতে একটি রাস্তার সামনে আসি। চৌরাস্তার মতো মনে হলো। আমারতো একটা দিকে যেতেই হবে। রাস্তার সামনে একটা সাইনবোর্ড। ’রাস্তা বন্ধ উন্নয়ন কাজ চলিতেছে।’ আমি অবাক হলাম। রাস্তা বন্ধ থাকলে আবার উন্নয়ন কাজ কিভাবে হয়। উন্নয়ন তো গোল ও গতিময়। আমি ভাবলাম আমি মনে হয় ভাষাটা ধরতে পারছি না। যারা কাজ করছে তারা আমার দিকে তাকালো না। চারিদিকে রিক্সা, গাড়ি মানুষ আর মানুষ। সব থেমে থাকে এক সময়। আমি দৌড়াই কিভাবে। হঠাৎ মানুষের ভিড় থেকে কে যেন আমাকে ডাকে। ’নুশা নুশা।’ আমি বুঝতে পারি না। কে ডাকে চারিদিকে তাকাই। ’গল্পটা কোথায়।’ আরে এতো দেখি অমিতাভ। বেশ মোটাসোটা হয়ে গেছে। মুখটা চিক চিক করছে। ’কই যাও মিঞা। তোমারে অনেকদিন ধইরা খুঁজতাছি। তোমার অফিসে গেছিলাম। তোমাকে পাই নাই।’ আমি কিছু বলি না। ফাইলে লেখা নির্দেশের কথাও বলি না। একসময় ভিড় হালকা হলে অমিতাভ কোথায় হারিয়ে যায় আবার। দিন ফুরিয়ে রাত আসে। আমার অবস্থান থেকে বাড়ির দূরত্ব কতো হবে? সূর্যের কাছাকাছি? হঠাৎ আমার ঘুম পায়। সারদিন দৌড়ে আমি ক্লান্ত। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমোতে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একটা স্বপ্ন আসে। দেখি একটি শক্ত চোয়ালের লোক আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে গাঢ় কালো চশমা। কাছে যাই। চেনা চেনা লাগে। অমন মুখ কোথায় যেনো দেখেছি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো। আরো কাছে যাই। আগুন উপরে উঠছে। আলোতে সবখানি মুখ ভেসে উঠলো। না সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী না, উনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আমি খুশি হই। বলি 'স্লেলামালাইকুম স্যার।’ চোখ বন্ধ ছিলো। আমার কথা শুনে তাকালো। মনে হলো একটু বিরক্ত হয়েছে। আমি আগুনের কাছাকাছি যেতেই বলে 'জানি কেন আইছস। গল্প লিখবি।’ আমি কিছুটা নার্ভাস। এতোবড় লেখক। কি বলি। সাহস করে বলি ’জি। নিয়মটা যদি একটু শিখিয়ে দিতেন।‘ আমার কথা শুনে উনি প্রথমে আকাশের দিকে পরে আগুনের দিকে বার কয়েক দৃষ্টি দিলেন। একসময় দুটো হাত আগুনে পেতে দিলেন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আমি বলি 'স্যার স্যার পুড়ে যাবে।' কিন্তু আর্শ্চয্য কোনো হাতই পুড়লো না। আমার দিকে মুচকি হাসি দিয়ে উধাও। আমি ডাকি স্যার স্যার কিন্তু স্যারের মুখটি আর চোখে পড়ে না। এতে আমার মন ভার হয়ে এলো। কী করি। এদিকে খবর আসে অ্যাটম বোমা ফাটার আকাশ বাতাস মানুষজন গরম হয়ে যায়। অফিস আদালত বাড়িঘরে এ নিয়ে বেশ আলোচনা উঠে। ভারত পাকিস্তান অ্যাটম বোমা ফাটাইছে। প্রথমে ভারত পরে পাকিস্তান। আমার সামনে কটি লোক বলে ’নওয়াজ হইলো বাপের বেটা। হিন্দুরা পারলে মুসলমানেরা পারবো না কেন।’ আমি প্রথমে এদের ব্যবহৃত ভাষা বুঝি না। আবার ভাষাগত সমস্যা আমাকে পেয়ে যায়। আমি পরখ করে দেখলাম লোকগুলো বাঙালি কিনা। না ঠিকই আছে। তামাটে, মাঝারি সাইজের, বোকাচালাক চেহারা। বাঙালিইতো। আমি বলি আমিওতো। কিন্তু ভাষাটা বুঝতে আমার অসুবিধা কেন। আমার মনে পড়ে একদিন নবাব সিরাজদৌল্লাহ ইংরেজদের শায়েস্তা করার জন্য ফন্দি করলো। কিন্তু কিছু নিজদোষে কিছু অন্যের দোষে পারলো না। এতে শেষে আমাদের কিছু যায় আসলো না অবশ্য। ইতিহাস কোথাও কি আগে থেকে লেখা আছে। সিরাজ তো আর বাঙালি ছিলো না। তাহলে মনে হয় আনোয়ার হোসেনের সব দোষ। বাঙালির হৃদয় ধরে টান দিয়েছে। কিন্তু জমিনে সবুজ আসে না। আমার কোটি ভাইবোন অনাহারে মরে। একদিন ইংরেজ আসলেও লাথ্থি গুতা খাই। কিছুই হয় না। হঠাৎ এই যে দার্শনিকতা -তার ভিত্তিটা আমি পাই না। হঠাৎ করে ঐযে একসময় দেখেছিলাম ’দৌড়াও ’ ঐ শব্দটা এখন মনে পড়ে। তখন এক কাপ গরম চা খাই। হুমায়ুন আহমেদের গল্পের নায়কদের মতো রাস্তার টেবিলে বসে হালকাভাবে প্রথমে চা খাই। কিন্ত ধীরে ধীরে টের পাই আমি ওদের কারো মতো নই। আমি একটা কাজ পেয়েছি। সেটি শেষ করতে হবে। হঠাৎ মনে পড়লো কাল অমিতাভ আবার আসবে। গল্প লেখার অনুরোধ করবে। আমার বিরক্ত লাগে। গল্প লেখা কি কঠিন কাজ। পরিবার লাগে, সমাজ লাগে প্রকৃতি লাগে। অবসাদ আর আড়মোড়া লাগে। আরো লাগে প্রেম ভালোবাসা। কি কঠিনরে বাবা। ওগুলোতো আমি পারবো না। জোড়া দিতে পারবো না। আরো লাগে জমাজমি। আছে শওকত আলী। সুশান্ত মজুমদার। জমাজমি গ্রাম জনপদ মাতবর নেতা আম জনতা মাঠ ময়দান মাইক ভাষণ মুরিভাজা চানাচুর। ওরা সবাইকে গল্পে আনা হয়েছে কিরকম অনায়াসে। আমি ওগুলো বলতে পারবো না। বানানোটা বড় কঠিন কাজ। এদিকে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা গিয়ে আবারো গ্রীষ্ম । লোকজনের চলাচলের ভাটা পড়ে। কিন্তু আমি একদিন লক্ষ্য করি চারদিকে মিটিং মিছিল জনসভা পথসভা। জলে স্থলে মাটির ভেতরে বাহিরে লোকজন গিজ গিজ করে। আবার আমার ভাষা বিভ্রান্তি ঘটে আমি প্রথমে বুঝি না ওরা ওসব কি বলে। জলে যে মিটিংটা তাতে নৌকা লাগে না। পানির উপরে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি কাছা মেরে দুটি লোক অবিরাম কথা বলে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে শিশু নান্টু মাছ ধরে। কিন্তু ভাষা বিনিময়ে মাছ অনেক দূরে থাকে। স্থলের মিটিং বড়। জনসভা বলা যায় ভালো করে। রাস্তার মাঝখানে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে জনসভার আয়োজন। পাঁচ বা দশ হাজার লোক হবে। শিশু নান্টু থেকে বড়ো দুলাল চন্দ সরকার পর্যন্ত থাকে। আমি মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখি না। গাড়িওয়ালা বলে ’যাই ঘুরে যাই।’ ঠেলা গাড়িতে মরা মানুষের মতো একটা লোক। ঘুরতে পারে না। সামনে জনসভা। রাস্তা বন্ধ। উন্নয়নমূলক কথা চলিতেছে। আমি দৌড়াবো! কিন্তু স্টেজ গরম। প্রথম লোকটা চিৎকার চিৎকার করে। গলা ফুলে কলা গাছ। আমি ভাষা বিষয়ে এখানে সবচেয়ে বেশি ধন্দে পড়ি। কারণ ভাষাকে এখানে আমার কাছে অনেক কার্যকর আর শক্তিশালি মনে হয়েছে। প্রথম লোকটা সুযোগ চায়। আমি আমার ভাষা ব্যবহার থেকে আন্দাজ করি উনি এখনই...। লোকজন চিৎকার করে লাফালাফি করে। এদিকে ঠেলা গাড়িতে থাকা প্রায়(মৃত) লোকটার কি হবে। কানে ভেসে আসলো ইতিহাস সাক্ষী। দরিদ্র আর দরিদ্র থাকবে না। আমি হতবাক। একশ বছর আগে আমি এমনই কথা শুনেছিলাম। তখন আমি কার শরীরে, আমার মার বা অন্য কোথাও। আমার বাবা মাঠে যায়। ছেড়া লুঙ্গি, গেঞ্জি। মা বলে ফ্যান তো পাইলাম না। বাচ্চা তো কান্দে। প্রায় অন্ধ হয়া গেছে। বুকের কলিজা খুলে দেখালো। মা ফ্যান কোথায় পাবে। অবশেষে আমি এভাবে। শতো বছর ধরে জনসভার ভাষার কোনো পরিবর্তন নাই। দ্বিতীয় লোক উঠে দাঁড়ায়। তীব্র বল মুখে আর শরীরে। যেনো বনভূমি শেষ করে এগিয়ে আসছে এক গণ্ডার। তখন পাশাপাশি বসে থাকা আরো শ পাঁচেক লোক। জাহানারা ইমাম একদিন ফাঁসির প্রস্তাব দেন। ওরা এখন ভাগাড়ের পাখি। রক্ত আর মাংস খেয়ে কতো বলশালি। আমার বমি বমি ভাব আসে। চারিদিকে মানুষগুলো হঠাৎ এরকম হলো। নিয়ন লাইটের আলোতে মুখগুলো দেখা গেলো একই রকমের। যেমন ছিলো সিরাজের সময়ে, ইংরেজদের সময়ে পাকিস্তানীদের ১৯৭১ সনে। এমন করে আমার দিন গেলো রাত গেলো। আমার গল্প লেখা হয় না।

আমি গল্প লিখি কী করে। পড়েছি ’দৌড়াও।’ দৌড়াচ্ছি। রাত হয়ে পড়লে একটু ঘামছি। একদিন হঠাৎ বাড়ির কথা মনে পড়লো। বাচ্চাগুলোতো আমি। এখন বাড়িটা সূর্যের কাছাকাছি নয়। দুই কদম পা চালালে হদিস পাওয়া যাবে। বাড়িতে ঢুকলে প্রথম বাচ্চাটা কোলে ওঠে। মৃদু ভাষায় কথা বলে। আমার কোনো অসুবিধা হয় না। বলে ’মা মা আর আসবে না।’ কে বলেছে মা আর আসবে না। ’নানু বলছে। নানু আসিছল। দুপুরে। করিম চাচ্চু ও’ । করিমের কথা উঠলে আমার মনে পড়ে ওর সাথে তাহমিনার একটা সর্ম্পক ছিলো। ঠিকাদারি করে। পয়সা আছে মেলা। আমি বাচ্চাটিকে ঘুমোতে বলি। সারাদিন দৌড়াতে দৌড়াতে আমিও ক্লান্ত। ঘুমে চোখ ভারি হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে যাবার পর আমি দিগম্বর। আদিকালের উপস্থিতি। এক সময় আমার সামনে হাজির হয় বেটে মতো একটা মোটা লোক। আমি বলি ’স্যার আপনি।’ এতে লোকটা অবাক হয় না। অফিসে কাজ করার সময় লোকটাকে দেখেছি সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলে। সুগন্ধীমাখানো পান খায়। আমাকে স্নেহ করে। বলে ’তুমি আমার বেটার মতো।’ আমি বলি ’স্যার এখানে কেন?’ স্যার তখন অন্য লোক। মুখটা রক্তমাখা। বলে ’কি মিয়া খালি উন্নয়ন চাও? প্রকল্প তৈরির আদেশ কামনা করো। পোদে বাঁশ ঢুকাইয়া লটকাইয়া দিমু। তোমারে না বলছিলাম দৌড়াও। তো এখানে আসলা কেন?’ আমি বলি ’বাড়িতে অনেকদিন ধরে আসি না। বউ বাচ্চাদের দেখি না।‘ আমার কথা শুনে লোকটা হো হো করে হেসে উঠে। ’বাড়ি। এটাতো তোমার বাড়ি না। এটা হইল একটা কবরস্থান। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল মাঠ যেমন একদিন কবরস্থান হইছিল তেমন আর কি।’ এক সময় আমার সামনে আরো দু চারজন লোক আসে। স্যার বলে ’অই হালারা ধইরা হুতাইয়া ফালা। দেখলাম মাথায় টুপি, মুখে অল্প দাড়িওয়ালা লোকগুলো যাদের আমি দুপুর বেলায় ঐ বড় জনসভায় দেখেছিলাম। ওরা বলে ’তোমাকে দৌড়াইতে বলা হইছিলো। তুমি দৌড়াও নাই। সুযোগ একবারই দেওয়া হয়। আমরা সব খবর নিছি। তুমি আমাদের দুশমন, আমাদের আদর্শের দুশমন। আমাদের দেখে জননীর কথা মনে হইতেছিল না? তো মিয়া জনসভা ছাইড়া আইলা কেন? আমাদের সাথে থাকলেই হইতো।’ আমি একটু উঠতে চাই। কিন্তু উঠে বসার আগে ওরা আমাকে একরকম চ্যাংদোলা করে হাঁটতে থাকে। আমি হঠাৎ করে অমিতাভের কথা ভাবি। এই আগত মৃত্যুকাহিনী নিয়ে তো এখন একটা গল্প লেখা যায়। গল্পটা ছাপলে হয়ত আমার নাম হবে, কিছু টাকা পয়সা হয়ত পাওয়া যাবে। কিন্তু অমিতাভকে কোথাও দেখা যায় না। অন্ধকারে স্যারের মতো লোকটার সদা ব্রাশ করা দাঁত কেমন করে ঝিলিক মেরে উঠলো। সেখানে এখন পান চিবানোর কোনো চিহ্ন নাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন