বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

বিনোদ ঘোষালের গল্প : তখন বিকেল

মাঝরাতে কলিং বেল।দু তিন বার অধৈর্য্যভাবে বেজে উঠতেই ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল প্রীতম।লাইট জ্বালিয়ে ঘুম চোখে দরজা খুলতেই বেজায় ঘাবড়াল।একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।চেনা। উলটো দিকের বাড়িতেই থাকেন।নাইটি পরা।চোখে মুখে ভয়।

-হ্যাঁ,বলুন?

-..আমি আসলে খুবই লজ্জিত মাঝরাতে আপনাকে এভাবে ডিস্টার্ব করার জন্য।আমি আপনাদের জাস্ট উলটো দিকের...।


-জানি।কী হয়েছে বলুন?

-আমার হাজব্যন্ডের টেমপারেচারটা খুব বেড়ে গেছে।কী করব বুঝতে পারছি না।এত রাত্রে ডক্টরই বা কোথায়...।আমি মানে..।থেমে গিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ালেন মহিলা।টেনশনে।

-আরে ভয়ের কিছু নেই,চলুন দেখছি।চোখ রগড়ে বলল প্রীতম।ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে মহিলার সঙ্গে রাস্তা ক্রস করল।

একতলা ছিমছাম বাড়ি। মাধবীলতায় ঢাকা গেটের ফলকে লেখা “দুইজন’।গ্রীলের গেট খুলে ঘরে ঢুকল দু’জন।ড্রয়িংরমে ডিভানে কম করে ষাঠের ওপর বয়সের একজন মানুষ গায়ে বালাপোশ ঢাকা দিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে।কপালে জলপট্টি।অল্প গোঁঙাচ্ছেন।প্রীতম অবাক হয়ে মহিলার দিয়ে তাকাতেই উনি বলে উঠলেন,আমার হাজব্যান্ড।কয়েকদিন ধরেই চলছিল জ্বরটা,আজ স্নান করতে বারন করেছিলাম।শোনেননি।

-কেন?

-উনি আমার কথা শোনেন না।মহিলার গলায় ক্লান্ত বিরক্তি।

-....আআহহহ...মঞ্জুউউউহহ....উহহ....,নিজের কপালের ওপর হাত রাখলেন ভদ্রলোক।

-বাড়িতে কোনও জ্বরের ওষুধ নেই?

-ছিল,উনি ফেলে দিয়েছেন।

-ফেলে দিয়েছেন!..কেন?প্রীতমের মুখ থেকে আপসেই বেড়িয়ে এল কথাটা।

-আমি জানি না। উনিই বলতে পারবেন।ঠান্ডা গলায় বললেন মহিলা।

ভদ্রলোকের হাতে হাত রাখল প্রীতম।প্রচন্ড গরম।মহিলা বললেন,একশ চার।

প্রীতম বলল,একটু ওয়েট করুন,আমি এক্ষুনি আসছি।বলে প্রায় দৌড়ে আবার রাস্তা ক্রস করে নিজের ঘরে এসে ড্রয়ার খুলে ঘেটে শেষ পর্যন্ত দুটো ক্যালপোল পেয়ে গেল।আবার ফিরে এল এই বাড়িতে।মহিলা জলপট্টি পাল্টাচ্ছিলেন।এই নিন,এখন একটা খাইয়ে দিন।

-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।মাঝরাতে এ ভাবে ডিস্টার্ব করলাম বলে দুঃখিত।

-না না ঠিক আছে।প্রবলেম তো যে কোনোও কারুর ই হতে পারে।আপনি ওষুধটা খাইয়ে দিন।দরকার পরলে নিঃসংকোচে ডাকবেন।

-থ্যাঙ্কয়ু..গুডনাইট।


###

প্রীতমের বাড়ি বর্ধমানে ।কমার্স গ্র্যাজুয়েট।সি.এস পড়ছে।ছাব্বিশ বছর বয়স।ডালহৌসিতে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে।।কলকাতায় মেসের পরিবেশ ভাল লাগেনি বলে কয়েক দিনের মধ্যেই মেস ছেড়ে দিয়ে এই মাসখানেক আগে উত্তরপাড়া স্টেশনের কাছে একটা বাড়ির একতলায় ভাড়া নেয় ও। বাড়িওলা ভদ্রলোক খুবই ভাল।রিটায়ার্ড স্কুল টিচার।স্টুডেন্ট শুনে প্রীতমকে নামমাত্র ভাড়ায় নিচের দুটো ঘর ছেড়ে দিয়েছেন।শান্ত নিরিবিলি পাড়া।পড়াশোনা ভালই হয়। প্রীতমের রোজ ক্লাশ থাকে দুপুর দুটো থেকে সন্ধ্যে ছটা পর্যন্ত।।এই বাড়িতে আসার পর দু’জন নামের বাড়িটার ওই মহিলাকে বেশ কয়েক দিন সকালে রিক্সায় করে বেরোতে দেখেছে।বেশ সুন্দরী।বয়েস আন্দাজ চল্লিশের আশেপাশে।চাবুক ফিগার।একবার চোখ ফেললে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকতে হয়।তবে ভদ্রলোককে কোনও দিন দেখেনি।কৌ্তুহল হয়েছিল।বাড়িওলার কাছে একদিন কথায় কথায় শুনেছে ওই ফ্যামিলিটা সবে বছরদেড়েক হয়েছে এই পাড়ায় এসেছে বাড়ি কিনে।পাড়ায় তেমন কারো সঙ্গে মেশে না।ব্যাস,এইটুকুই তথ্য জানা ছিল এতদিন।

কৌ্তুহলটা অপেক্ষা করতে করতে ঝিমিয়ে পড়েছিল।আজ রাত্রের পর থেকে আবার জেগে উঠেছে।



###



সকাল হতেই ওই বাড়িতে গেল প্রীতম।কলিংবেল দুইবার বাজানোর পরেই ওই মহিলা এলেন।

ওহ আপনি।আসুন।সারারাত জেগে থাকার ছাপ ওনার চোখেমুখে।ফর্সা মুখটায় ক্লান্তির প্রলেপ।নাইটির ওপর হাউজকোট চাপানো।ওনার সঙ্গে ঘরে ঢুকল ও।সেই প্রৌঢ় এখন দেওয়ালে হেলান দিয়ে ডিভানে পা ছড়িয়ে বসে আছেন।

-কেমন আছেন এখন?জিজ্ঞেস করল প্রীতম।

ভদ্রলোক উত্তর না দিয়ে সামান্য বিস্ময় নিয়ে শুধু তাকালেন প্রীতমের দিকে।মহিলা বললেন,এই ছেলেটিই তোমাকে কাল রাত্রে জ্বরের ওষুধ দিয়েছহিল।মল্লিক বাড়ির নিচে ভাড়া থাকে।

-অ।নমস্কার।হ্যাঁ ভাল আছি।বসুন।

-আমাকে আপনি বা নমস্কার কোনওটাই বলবেন না প্লিজ।ডিভানের উলটো দিকের সোফায় বসতে বসতে বলল প্রীতম।

-হুম তা ঠিক। তুমি আমার থেকে অনেকটাই ছোট।বলে গলার খানিকটা কফ ঝাড়লেন উনি।প্রীতম ভাবছিল এই লোকটার বয়স মহিলার থেকে বোধ হয় দু’গুন বেশি হবে। বিয়ে হল কী করে কে জানে!

-আপনি বসুন।আমি চা করে আনছি।

-আপনিও ‘আপনি’ বলছেন!এটা ঠিক না।বলে সামান্য হাসল প্রীতম।

মহিলা মুখে কিছু না বলে শুধু মুচকি হাসলেন। মিষ্টি হাসিটা।হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞেস করলেন,তুমি কি আর এক কাপ খাবে?

-না।

-একটু খেলে ভাল লাগবে।সর্দি রয়েছে তো।

-আহ বললাম ত খাব না।কেন বিরক্ত করছ?

মহিলা চলে গেলেন।বিরক্ত করার মতন কি বলেছিলেন উনি বুঝতে পারল না প্রীতম।ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকেই থাকল।

প্রীতম চুপ।বাড়ির গেটের সামনে দুবার রিক্সার প্যাঁক প্যাঁক।শুনে উনি আবার চটলেন।ওই ..ওই হারামজাদা এসে গেছে।।ওফ।যত্ত ছোট লোকদের আড্ডা এই বাড়িতে!

রিক্সাওলা কেন হারামজাদা হবে আর আড্ডাটাই বা কোথায় হল ধরতে পারল না প্রীতম।মহিলা পাশের ঘর থেকে হর্নের শব্দ শুনে বারান্দায় গিয়ে বললেন,আজ যাব না গনেশ।দাদাবাবুর শরীর ভাল নেই।

উনি ঘরে ফিরতে প্রীতম বলল,জেঠুকে একবার ডক্টর দেখিয়ে নিলে ভাল হত।

-বলেছিলাম।উনি যাবেন না।

-কী হবে গিয়ে?আর তো এমনিতেও বেশিদিন নেই আমি।

-এ হে ..এমন বলবেন না।আসলে রাতবিরেতে যদি আবার বাড়াবাড়ি হয় আবার...পর্যন্ত বলে থেমে গেল প্রীতম।বাকিটুকু ধরে নিলেন মহিলা।কেন আমি আছিতো সারা রাত ছুটোছুটির জন্য।বলে উনি আবার পাশের ঘরে চলে গেলেন। স্বামী-স্ত্রীর ঝামেলার মাঝখানে পড়ে প্রীতম কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।ভাবতে ভাবতে চা চলে এল।মহিলা সুন্দর কাপ ডিশে প্রীতমকে চা বিস্কিট দিয়ে নিজে চেয়ারে বসলেন।তারপর টুকটাক কথা।প্রীতম নিজের কথা বাড়ির কথা জানাল এবং জানল যে ভদ্রলোকের নাম অভ্র বিশ্বাস।রিটায়ার্ড ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিসট্রেট।ওনার ওয়াইফের নাম মঞ্জুশ্রী।একটা নাম করা ফার্মাসিটিকাল কোম্পানির কেমিষ্ট।এখানে আসার আগে থাকতেন।দমদমএ।কিন্তু পলিঊশনে ভদ্রলোকের ব্রিদিং ট্রাবল শুরু হওয়ায় ডক্টরের সাজেশনে এই বছর আগে এখানে বাড়ি কিনে চলে আসেন।একটি ই ছেলে।নাম ঋক।সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র।প্রীতমের থেকে বয়েসে খানিকটা ছোট।জার্মানিতে সেটেলড।

মহিলা বললেন,আচ্ছা আপনার চেনাশোনা কাছাকাছি কোনোও ভাল নার্সিংহোম জানা আছে?

-কেন বলুনতো?

-ওর হার্নিয়া অপারেশন করানো খুব দরকার।মাঝে মধ্যেই ব্যাথা ওঠে।কিন্তু ঊনি করাবেন না।

-হুম...।শ্রীরামপুরে সেবা নার্সিংহোমের নাম শুনেছেন?

-হ্যাঁ।শুনেছি ভাল।

-ওখানে আমার এক বন্ধু তিমির চক্রবর্তী জুনিয়র ডক্টর হিসেবে যুক্ত আছে।যদি বলেনতো ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি।বলব?

এবার ভদ্রলোক বললেন,না নাহ..ও সব কিছু দরকার নেই।আমি দিব্বি আছি।ফালতু এই বয়েসে কাটা ছেঁড়া...।আর কদ্দিন ই বা বাঁচবো..।

-ধেৎ..কী ই যে বলেন..!যে কদ্দিন ই থাকুন,সুস্থভাবে বাঁচাই তো ভাল,তাই না?

-হুম....।ঠিক আছে এই নিয়ে পরে কথা হবে,বলে উনি প্রসংগ এড়ালেন।প্রীতম ও আর কথা বাড়াল না।

-আমি এবার ঊঠি জেঠু।উঠে দাঁড়াল প্রীতম।

-হ্যাঁ,এস।

ওনার স্ত্রী প্রীতমের সঙ্গে বারান্দায় এলেন।গ্রীলের তালা খুলতে খুলতে বললেন,থ্যাঙ্কস এগেইন।

-এ বাবা থ্যাঙ্কসের কী আছে?পায়ে চটি গলিয়ে প্রীতম বলল।

-এই যে আমার হয়ে ওনাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করলে,সেই জন্য।একটু দেখ কেমন,যদি রাজি করাতে পার।আমার কথা তো শোনেন না।

-শিওর।আচ্ছা আসছি বৌদি।

-আরে সব্বোনাশ..!উনি জেঠু আর আমি বৌ্দি!উনি শুনলে আবার চটবেন।

-এই রে...তাহলে?

-হি হি ..না-না এমনিই বললাম।তোমার যা মন চায় তাই ডেকো।বলে উনি হাসলেন।‘বৌ্দি’ ডাকটায় যে উনি খুবই খুশি হয়েছেন,সেটা আড়াল করলেন না।




দুই

দিন দশ পনেরোর মধ্যেই প্রীতমের সঙ্গে বেশ ভাল জমে গেল ফ্যামিলিটার।দু’এক দিন পর পরেই ওই বাড়িতে নেমন্তন্ন।বৌ্দি রাঁধেও দারুন।অভ্র বিশ্বাসকে প্রথমে যতটা খিটখিটে ভেবেছিল ততটা নয়।বরং মুড ভাল থাকলে উনি বেশ মজাদার।বুক সেলফে যেসব দেশী বিদেশী সাহিত্যগুলো আছে তার বেশির ভাগ ই ওনার পড়া।অগাধ পড়াশুনো।স্মৃতিও তূখোর।এই আটষট্টি বছর বয়েসেও রোজ বিকেলে পাড়ার লাইব্রেরীতে যান।সন্ধ্যে পর্যন্ত পড়েন।টানটান চেহারা।একমাথা সাদা চুল।সঙ্গে মানানসই ব্যাক্তিত্ব।চাকরিসূত্রে বহু জায়গা ঘুরেছেন।সেইসব অভিজ্ঞতার গল্পও খুব সুন্দর গুছিয়ে বলতে পারেন।এমন কি প্রীতমের ওনাকে ‘জেঠু’ আর ওনার স্ত্রীকে ‘বৌ্দি’ ডাকাটাও মেনে নিয়েছেন দিব্বি।সবই ঠিক আছে,শুধু বৌ্দি সামনে আসলেই ওনার যত জড়তা, কখোনো কমবেশি খিটখিটে।এর কারনটা বুঝে পায়না প্রীতম।মাঝেমধ্যে অকারনেই ঝামেলা করে লোকটা।কী যে সুখ পায়!এই তো সেদিনই,সন্ধ্যেবেলা জেঠু আর ও মিলে গল্প করছিল,বৌ্দি অফিস থেকে ফিরে জেঠুকে স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন,ওষুধগুলো খেয়েছ?

-কেন?

-এমনই।খেয়েছ কি না জানতে চাইছি।

-কী শুনলে খুশী হবে বল?

বৌ্দি কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে রইলেন জেঠুর দিকে।তারপর আর কিছু না বলে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন।প্রীতম বুঝে গেল,বলল,জেঠু,আমি তাহলে উঠছি আজকে।

ভেতর থেকে বৌ্দি উত্তর দিলেন,চা বসাচ্ছি।খেয়ে যেও।

-না না আজ থাক।এই সবে অফিস থেকে এলেন।

-চুপ করে বস।যা বলছি।ওই ঘর থেকে উত্তর এল।

-আরে বস বস।তোমার বৌ্দি অফিস থেকেই এসেছে,সারা রাত্তির মেলট্রেন চালিয়ে তো আর আসেনি।অভ্র পিন মারলেন।অগত্যা বসতে হল।উনি কেন অকারন পিনটা মারলেন,সেটা বোঝার চেষ্টা করল প্রীতম।একটু পরেই বৌ্দি এলেন।হাতে চায়ের ট্রে টা টি টেবিলে রাখলেন।বৌ্দির মাথায় তোয়ালে জড়ানো।স্লিভলেস নাইটি পরা।তাকাতে কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল প্রীতমের।গোটা ঘরটা সাবানের মিষ্টি গন্ধে ভর্তি।তোমরা চা খাও।আমি মাথাটা মুছে আসছি।অভ্র কিছু বললেন না।প্রীতম মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ল।বৌ্দির হাতদুটো ধবধবে ফর্সা।চায়ের কাপে তাড়াতাড়ি চুমুক দিতে গিয়ে জিভ পুড়ে খাক।মুখ বিকৃ্ত করে ফেলল প্রীতম।বৌ্দি কী বুঝল কে জানে,ফিক করে হেসে ফেলে মৃদু গলায় বলল,আস্ত পাগল একটা।বলে চলে গেলেন।মাথায় ঝিম লাগল প্রীতমের।

জেঠু বেশ স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন,তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?

-চলছে।

-কলকাতার বাইরে চাকরি হলে কি চলে যাবে?

-হ্যাঁ।কোনও অসুবিধা নেই।

-হু..ম।তা ভাল।

এবার প্রীতম জিজ্ঞেস করল,আপনার ছেলে কেমন আছে?

-আছে,ভালই আছে।বহাল তবিয়তেই আছে।খানিক অবজ্ঞা ছিটিয়েই বললেন উনি।হয়তো একমাত্র ছেলের বিদেশে থাকার অভিমান।তোমার বৌদিই তার খবর বলতে পারবেন।বলে ঝোলানো গোঁফের তলায় ঠোঁট দুটো সামান্য ব্যাঁকালেন।সংসার বড় বিচিত্র,বুঝলে প্রীতম।এখন বুঝবে না।আমার মতন বয়েস হোক।চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে কথাটা বলে বিস্কুটটা তুলতে গেলেন উনি।বিস্কুটের ভিজে অংশটা টপাক করে খসে পড়ল চায়ের কাপে।হাতে ধরা শুকনো বাকিটা দিয়ে ওই টুকু তুলতে গিয়ে পুরোটাই খসে পড়ে ভাসতে থাকল।বিরক্তিতে বিড়বিড় করে কী সব বলে উনি কাপটা সরিয়ে রাখলেন।অসম্ভব হাসিটা কী ভাবে চাপবে বুঝতে পারছিল না প্রীতম।এই সময় বৌ্দি এসে বাঁচালেন।তোমার বন্ধু ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছ জেঠুর ব্যাপারে?

-ওহ..হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছি তো।আপনি আমাকে জেঠুর প্রেসক্রিপশন আর রিপোর্টগুলো দিয়ে দেবেন।ও দেখতে চেয়েছে।

-সব ফাইল করাই আছে।আজই নিয়ে যেও।

সাবানের সঙ্গে এখন একটা সুন্দর পাউডারের গন্ধ মিশেছে।তার সঙ্গে সব ছাপিয়ে আরও কেমন একটা অজানা গন্ধ।শরীর শরীর।একেবারে অন্যরকম।ভীষন মন কেমন করা!উফ..গন্ধটাকে এক কামড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।...নাহহ..।

-আমি যাই।

-একমিনিট দাঁড়াও।ফাইলটা নিয়ে যাও।

-হ্যাঁ দিন।আমি কালকেই কথা বলে নেব।



তিন

সকাল থেকে রাত্তির ,রাত্তির থেকে সকাল সারা দিন সারা রাত একটা অদ্ভুত ভালোলাগা জড়িয়ে থাকে প্রীতমকে।একটা অবশ ঘোর গোটা শরীর –মন জুড়ে।একটা ভীষন কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করে।কিন্তু সেইটা কী তা জানা নেই।দুইজন লেখা বাড়িটা সারাক্ষন নেশার মত টানে।ঘুম হয় না। গতকাল রাত্রেও এ পাশ ওপাশ।কোল বালিশের জায়গা বদল।ভোর রাতে স্বপ্ন।দু’চোখে,মনে,মাথায় একটি চেনা নারী শরীরের হাঁটাচলা,কথা বলা,..হাসি..।বড্ড কাছে মনে হয়,কিন্তু হাত বাড়াতে গেলেই এক আলোকবর্ষ।



###


পর দিন রবিবার সকাল সাড়ে দশটায় অভ্র বিশ্বাস গুম হয়ে ডিভানে বসে আছেন।সোফায় প্রীতম আর চেয়ারে বৌদি।

-কাল রাত্রে ঘুমাওনি না কি?বৌ্দি জিজ্ঞেস করল।

-এ্যাঁ..নন..না না ..ওই পড়ছিলাম,রাত হয়ে গেল।কোনোও মতে ম্যানেজ দিল প্রীতম।

-অত রাত কোরনা।শরীর খারাপ হবে।ভোর বেলা উঠে পড়বে।

-হুম..।আচ্ছা।

-এবার বল ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে?

-হ্যাঁ।ডাক্তার বললেন জেঠুর ইমিডিয়েট অপারেশন করানো দরকার।

-আরে না নাহ..ওই সব ঝামেলায় আমি নেই।ফালতু কাটাকুটি...যত্তসব।অভ্র প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন।

-কিন্তু জেঠু,না করালে পরে আপনারই প্রবলেম হবে।আর তেমন মেজর কিছু অপারেশন তো না।কয়েকদিন পরেই ছেড়ে দেয় বলল।ব্যাস ঝামেলা থেকে মুক্তি।

-আ...র মুক্তি..হু..হ..!..ঠিক আছে দেখছি,বসো। টয়লেট থেকে আসছি,বলে অভ্র উঠলেন।

প্রীতম বৌ্দির দিকে তাকাল।বৌ্দি দু’হাত পিছনে তুলে খোঁপা বাধছে।আজও স্লিভলেস নাইটি।কী বলতে গেছিল,ভুলে গেল প্রীতম।তাকিয়েই থাকল।

-কী..ই?ভুরু নাচিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল বৌ্দি।কি ব্যাপার?

-এ্যাঁ...ওহ হ্যাঁ..হ্যাঁ..বলছিলাম যে...।

থাক খুব হয়েছে আর বলে কাজ নেই।পাজি ছেলে একটা।

-পাজি..,আমি!...কেন?

-তুমি ই জানো..হি হি।

প্রীতম ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি প্রসংগ পাল্টাল।ওহ..হ্যাঁ,আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

-শিওর।পারমিশন নেওয়ার কী আছে?নড়েচড়ে বসলেন মঞ্জুশ্রী।

-আসলে ভাবছি দিন দুই কোথাও গিয়ে ঘুরে আসব।ভাল লাগছে না। শুধু অফিস আর বাড়ি।

-ও...তা কোথায় যাবে ভাবছ?

-সেইটাই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি।আপনারা তো অনেক জায়গায় ঘুরেছেন।কোনোও কাছাকাছি জায়গা সাজেস্ট করুন না।

-কে কে যাবে সঙ্গে?

-আমার তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই।

-তাই ই..আচ্ছা আচ্ছা।

-হুম।

-যদি আমি যাই?নেবে?বলে হাসলেন বৌদি।

-আপনি!বুকের ভেতর কী যেন ধড়াস করে পড়ার শব্দ হল

-কেন?নেবেনা বুঝি?

এবার কী বলবে ভেবে পেল না প্রীতম।জিভ টাগড়ায় আটকে গেছে।

-অত ভয় পেতে হবে না রে বাবা।আমি যাব না।খুশি?আর আমিতো বুড়ি হয়ে গেছি।আমাকে নেবেই বা কেন?বলে আড়মোড়া ভাঙলেন গোটা শরীর সিরসির করে ঊঠল প্রীতমের।ও-ও হেসে ঊত্তর দিল কে বলেছে আপনি বুড়ি?

-কেন,বুড়ি নই?

-একটুও না।

-কেন?আমাকে বুড়িদের মতন লাগে না দেখতে?সামান্য চিকচিকে হল মঞ্জুশ্রীর চোখ।

-মোটেই না।সেই জন্যই তো বৌ্দি বলি।

-যাহ..কী যে বল না!হি হি..।কিশোরীর মতন হেসে ঊঠলেন বৌ্দি।বস ম্যাগি খেয়ে যাও।

-না না আমি এবার উঠব।

-এই ছেলে তো খালি পালাই পালাই করে।চুপ করে বস।আমার সঙ্গে গল্প করতে কি খুব খারাপ লাগে?

-যাহ..কীই যে বলেন না!

-না কি তোমার মতন সুন্দর দেখতে নয় বলে...

-ধেৎ।।!লজ্জা পেল প্রীতম।ভেতরে গেঞ্জি ভিজে উঠছিল ঘামে।তারপর বলেই ফেলল,আপনি যা দেখতে!

-থাক আর মিথ্যেকথা বলতে হবে না।

-আরে সত্ত্যি বলছি।খু-ব সুন্দর।বলে ফেলেই সামান্য জিভ কেটে মাথা নিচু করে চুপ।জীবনে এই প্রথম কোনও মেয়েকে সরাসরি সুন্দর বলল প্রীতম। নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।

হি হি হি করে হেসে উঠল বৌ্দি শরীর উচ্ছল করে।তোমার গার্লফ্রেন্ডকে বোলো।ধরে পিটুনি দেবে তোমায়।

-আমার কোনোও গার্লফ্রেন্ডই নেই।

-এই একদম বাজে কথা বলবে না আমাকে।

- সত্যিই..।জোর দিয়ে বলল প্রীতম।কেউ নেই।

-সে কি..এমন হিরোর কেউ হিরোইন নেই?বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে।।..এই আমাকে মিথ্যে বলছ না তো?মহিলা কেমন যেন নিশ্চিন্ত হতে চাইছেন মনে হল প্রীতমের।

-কোনও কালেই ছিল না।

-আহারে..কেন?

-জানি না।।..আমার ভয় লাগে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে।।

-ভয়!..কিসের?এইতো দিব্বি আমার সঙ্গে গল্প করছ।

-আপনি কি আমার....পর্যন্ত বলেই ব্রেক কষতে গেল প্রীতম।কিন্তু তার আগেই ফাউল হয়ে গেছে।

হি হি হি....আবার কিশোরীর মতন হেসে উঠেলন বৌ্দি।তারপর বললেন,তুমি খুব সরল প্রীতম।এখনকার দিনে তোমার মতন ছেলে রেয়ার।তোমাকে যে পাবে সে সুখী হবে দেখ।

-জেঠু টয়লেট থেকে এলনা কেন এখনও?প্রীতম প্রসঙ্গ পাল্টাল।

-তোমার জেঠু আসলে পটি গেছেন।ওখানে ওনার কমকরে একঘন্টা লাগে।কন্সটিপেশন আছেতো।

-ও।তা’লে আমি এখন যাই।

-না খেয়েই?

-পরে খাব।

আচ্ছা ঠিক আছে।আর হ্যাঁ শোনো আমার একটা কথা রাখবে?

-কী?

-আমাকে এই ‘আপনি’বলা ছেড়ে ‘তুমি’ বলবে এবার থেকে।

-এই রে..জেঠুতো আমার থেকে অনে-ক বড়!

-আমি কি জেঠুর কথা বলেছি?আমার কথা বলছি।

-তার মানে জেঠুকে ‘আপনি’আর আপনাকে ‘তুমি’?কিন্তু যদি কখনও গুলিয়ে যায়?

-হি হি,বেশ মজা হবে।প্লিজ আমার এই কথাটা রেখ।বলতে বলতে হাতে চাবির গোছা নিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন বৌ্দি।প্রীতমের বুকের ঢিবঢিব মুহূর্তে ধুপধাপ হয়ে গেল।কী যেন একটা বলতে গিয়ে বিষম খেল।

-দেখ কান্ড, ছেলে শুকনো বিষম খাচ্ছে!জল খাও।প্রীতমের নাকে,মুখে,গোটা শরীর জুড়ে আবার সেই আনচান করা অজানা গন্ধটা।



#####


কোনোও মতে দুপুর টা বিছানায় গড়িয়ে সময় কাটিয়ে বিকেল নামতেই উঠে পড়ল প্রীতম।ওই বাড়ি যাবে।জেঠু এতক্ষনে নিশ্চই লাইব্রেরী চলে গেছে।বৌদি একা।চটপট গায়ে জামাপ্যান্ট গলিয়ে ডিও মেখে বেরোতে গিয়ে দেখল ওই বাড়ির সামনে রিক্সা দাঁড়িয়ে। মানে গনেশ এসেছে।কাজকম্ম কিছু করাচ্ছে বোধ হয় বৌ্দি।প্রীতমকে দেখলে নিশ্চই ওকে ছেড়ে দেবে।তারপর..?অনেক গভীরে কল্পনায় মুহূর্তে কিছু একটা ভেসে উঠতেই সামান্য কেঁপে উঠল প্রীতম।প্রায় ভাসতে ভাসতেই রাস্তা পাড় করে ওই বাড়ি পৌছাল।গ্রীলের গেটটায় আজ তালা দেওয়া নেই।বেখেয়াল?চটি খুলে বারান্দায় উঠতেই থমকে গেল প্রীতম।ঘরের জানলা দরজায় পর্দা ফেলা।ফ্যানের হাওয়ায় প্রীতম একঝলক দেখল বৌ্দি সোফাতে আয়েস করে বসে আছেন আর মেঝেতে গনেশ বসে সবজি কুটছে আর সামান্য নিচু গলায় কী যেন বলে যাচ্ছে।একটু শুনেই ভয়ংকর চমকে উঠল...একীহ..এ কী সব বলছে গনেশ..!নিজের বৌয়ের সঙ্গে বিছানায় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের পূঙ্খানুপূঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছে ও।আর বৌ্দি সেই সব কথা গোগ্রাসে গিলছে।পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল প্রীতম।নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না।পুরোটা শোনার পর হঠাত বৌ্দি বলল,তুমি কিন্তু এবারও আমাকে একই সিডি এনে দিয়েছো গনেশ।ব্যাপার কি?

-এই রে এবারেও একই সিডি হয়ে গেছে।দোকানদারটাকে এবার ঝাড় দিতে হবে।আসলে বুলু সিডি বোধহয় ওর কাছে আর নতুন নেই।সে জন্য।

-তো অন্য দোকান থেকে আনবে।দোকানের কি অভাব আছে?

ভীষন গা ঘুলোচ্ছিল প্রীতমের।বারান্দায় পা দুটো আটকে গেছিল।কোনোওমতে ঘষটে গ্রীলের গেটের সামনে এসে বেরোতে গিয়ে শব্দ হয়ে গেল।

-কে?ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল মঞ্জুশ্রী।

উত্তর দিল না প্রীতম।

মঞ্জুশ্রী বাইরে বেরিয়ে এসে প্রীতম কে দেখে সামান্য চমকালেন।পরক্ষনেই মেকাপ দিয়ে বলল,ওমা তুমি ।।কখন এলে?বোঝো কান্ড,আজ গেটে তালা দিতেই ভুলে গেছি।এস।

প্রীতম অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,পরে আসব।তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন করে হাঁটা লাগাল।ঘরে ঢোকার আগে মুখের ভেতর এতক্ষন ধরে জমে ওঠা থুতুর দলাটাকে থক করে ফেলল নর্দমায়।



চার

দুই দিনের মধ্যে অফিস কিংবা ইন্সটিটিউট কোথাও গেল না প্রীতম।শুধু নিজের ঘরের মধ্য সারাক্ষন।একটা তীব্র ঘৃণাবোধ, বিশ্বাস ভাঙা আর তার থেকেও বড় একটা কিছু গুড়োগুড়ো হয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা আর সহ্য হচ্ছিল না।এই পাড়া ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবছিল।মোবাইলে দু’একবার ফোন এসেছিল ওই মহিলার। তোলেনি প্রীতম।চেহারাটা চোখের সামনে ভাসলেই মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছিল।কবে যে ছাড়তে পারবে ..ভুলতে পারবে এই সব কিছু...।

আজ দুপুরে বিছানায় শুয়ে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল,হঠাৎ কলিংবেল।দু’তিন বার।উঠতে হল।দরজা খুলতে সামনে মঞ্জুশ্রী।‘তোমার জেঠুর পেইনটা আবার ভীষন বেড়েছে ।নীচু গলায় বললেন উনি।

-তো আমি কি করতে পারি বলুন?একেবারে কাঠ গলায় প্রশ্নটা করল প্রীতম।

এর উত্তর খুঁজে না পেয়ে অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকলেন মঞ্জুশ্রী।তারপর মাথা সামান্য নিচে ঝুকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন,...তুমি...!

-আমি ডক্টরের ফোন নাম্বার টা দিয়ে দিচ্ছি।দরকার হলে কথা বলে নেবেন,বলে ঘরের ভেতর ঢুকে মোবাইল থেকে তিমিরের নাম্বারটা নিয়ে কাগজে লিখে আবার দরজার সামনে এসে দেখল মঞ্জুশ্রী ধীর পায়ে রাস্তা পার করছেন।




########



বিকেল সাড়ে চারটের সময় তিমির এসে বলল,অপারেশন হয়ে গেছে।পেশেন্ট ঠিক আছে।মঞ্জুশ্রী করিডরে রাখা বেঞ্চে বসে ছিলেন আর প্রীতম খানিক দূরে দাঁড়িয়ে।এতক্ষনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও হয়নি দুজনে।তিমিরের কথা শুনে দু’জনেই ওর সামনে এল।মঞ্জুশ্রী বলল,থ্যাঙ্কস ডক্টর।

-ওয়েলকাম।এই প্রীতম একবার এ দিকে শোন।এক্সকিউজ মি ম্যাডাম।

-ওহ শিওর।

প্রীতমকে করিডরের শেষে নিয়ে গিয়ে তিমির জিজ্ঞেস করল,এই ফ্যামিলি তোর কেউ হয়?

-নাতো,তোকে আগেও বলেছি।আমি যেখানে থাকি তার উলটো দিকের বাড়িতে থাকে।নেবার আর কি।

-আচ্ছা।এরা কি হাজব্যান্ড ওয়াইফ?

-হ্যা।

-শিওর?

-তুই এজ ডিফারেন্স দেখে ডাউট করছিস তো?

-না। অন্য কারনে জিজ্ঞেস করছি।আচ্ছা,ভদ্রলোক নিশ্চই নিঃসন্তান?..তাইতো?

-ধুসস..একটা ছেলে আছে।এ্যাবরডে থাকে।তোর সব প্রেডিকশনই ভুল।

-তুই শিওর?

-কীই মুশকিল..!সব কথাতেই শিওর শিওর জিজ্ঞেস করছিস কেন?

-সাধে কী আর করছি রে ভাই।তুই কি জানিস এই ভদ্রলোক সম্ভবত ইম্পোটেন্ট।

-কীহ..কী যাতা বলছিস!তা ছাড়া এই বয়েসে তো সবাইই.....।

-আরে বাবা আমি এখনের কথা বলছি না।অপারেশনের সময় স্যারের সঙ্গে আমিও তো ছিলাম। স্যার ই দেখালেন পেশেন্টের প্রি-পিউজ ইন্ট্যাক্ট।

-সেটা আবার কী?

-পুরুষাঙ্গের সামনে যে পাতলা চামড়া থাকে,সেটা সাধারনত মাস্টারবেটিং কিংবা ইন্টারকোর্সের সময় ছিড়ে যায়,এই পেশেন্টের সেটা এখনও ইন্ট্যাক্ট আছে।জ়েনারেলি যাদের ইরেকশন হয়ই না,কিংবা পারশিয়াল ইম্পোটেন্সি থাকে তাদেরই এমন টা হয়, বুঝেছিস।

প্রীতম কোনও উত্তর না দিয়ে শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থাকল তিমিরের দিকে।

-কী রে?কী ভাবছিস?

-উঁহহ...না...মানে ,তাহলে ওদের ছেলেটা ? বেখেয়ালে বোকার মত প্রশ্নটা করেই ফেলল।

-সে তোর সুন্দরী বৌ্দি ই জানে।হা হা ...যাক গে শোন এখন চলি।পরে কথা হবে।চলে গেল তিমির।প্রীতম চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষন।প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর।কেন যে তখন ওই মহিলাকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরেও আবার ওই বুড়োটার কথা মনে করে তিমিরকে ফোন করেছিল।তিমির বলেছিল এক্ষনি নার্সিংহোমে নিয়ে আসতে।এ্যাম্বুলেন্সের ব্যাবস্থাও করেছিল প্রীতম। নার্সিংহোমে সিনিয়র ডক্টর দেখেই বলেছিলেন ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে।কেন যে আবার এই ফ্যামিলিটার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে গেল? শা..হ! ঘেন্না লাগছে ওই মেয়েছেলেটার কাছে যেতে।দাঁড়িয়েই থাকল ও।অনেকক্ষন পর মঞ্জুশ্রী ই এসে দাঁড়াল পাশে।

-কী হয়েছে প্রীতম?

প্রীতম উত্তর দিল না।অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল। বিকেল নামছে।

-প্লিজ বলবে? এনিথিং রং? তোমার জেঠু ঠিক আছে তো?

-আপনার হাজব্যান্ড ঠিক আছে।দয়া করে আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না আর।...প্লি....জ!

-এ ভাবে বলছ কেন?

-কী ভাবে বললে আপনার বুঝতে সুবিধা হয় বলুন?

-প্রীতম তুমি নিশ্চই কিছু হাইড করছ আমার কাছে।

-আমি?হাইড করছি?..আপনার কাছে?মাপ করবেন।আপনার মতন মিত্থ্যে বলার স্বভাব আমার নেই।

আমি তোমার কাছে কী মিথ্যে বলেছি?

-ছাড়ুন এইসব কথা আলোচনা করতে আমার রুচিতে বাধছে।

-না বল তুমি।বলতেই হবে।প্রীতমের হাতটা আলতো করে ধরলেন মঞ্জুশ্রী।

হাতটা ছাড়িয়ে নিল প্রীতম।

-আমি জানি তুমি সেদিন শুনেছ।আমাকে খারাপ ও ভাবছ খুব।ভাব।চীরকাল আমাকে সবাই তাই ই ভেবেছে।কিন্তু আমার ও যে কিছু বলার আছে সেটা...

-প্লিজ,আপনাদের পারসোনাল লাইফে আমার কোনোও ইন্টারেস্ট নেই।তবে একটা কথা জানাতে চাই।

-বল।মৃদুস্বরে বললেন মঞ্জুশ্রী।

-আপনাদের একমাত্র ছেলেতো বিদেশে থাকে।অথচ আপনার হাজব্যান্ড ইম্পোটেন্ট।কী মজার কান্ড বলুন।মুখ বিকৃ্ত করে নিঃশব্দে হেসে শব্দ গুলো কেটে কেটে বলল প্রীতম।সারা শরীর চিড়বিড় করে জ্বলছে।

আর কিছু বললেন না মঞ্জুশ্রী।কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে সামনে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়লেন।

চলে যাচ্ছিল প্রীতম,পিছন থেকে মঞ্জুশ্রী ভাঙা গলায় বললেন,আমাকে একটু জল খাওয়াতে পার?.. প্লিজ!


########


লাউঞ্জে পাশাপাশি বসে দু’জনে।প্রীতম শুধু শুনছে। -‘আমার বাড়ি ছিল বালুরঘাটে।বাবা ছিলেন মেরিন ইঞ্জিনীয়র। মা লেকচারার।আমি ই এক মেয়ে।বাবা বেশিরভাগ সময়েই বাইরে বাইরে থাকত।গার্জেন বলতে শুধু মা।আমাদের পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল।ওরা বিভিন্ন সোস্যালওয়ার্ক করত।আমি অ্যাকটিভ মেম্বার ছিলাম। অভ্র বিশ্বাস তখন ওখানকার এস ডি ও।সরকারি পারমিশন বা অন্যান্য কাজে মাঝেমধ্যেই ওনার কাছে যেতে হত।আমি ই যেতাম বেশিরভাগ সময়।দারুন পারসোনালিটি,হ্যান্ডসাম লুকিং,আর সব থেকে বড় ওনার একটা সুন্দর মন ছিল।যাতায়াত করতে করতে শুধু কাজ ছাড়া একটা বন্ধুত্বের সম্পর্কও তৈ্রি হয়ে গেছিল দু’জনের মধ্যে। সাহিত্য,রাজনীতি,আমার পড়াশোনা.. অনেক বিষয় নিয়ে গল্প হত।বেশ কয়েকবার আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন উনি।আমি মাঝেমধ্যেই ওনাকে জিজ্ঞেস করতাম,বিয়ে করবেন কবে?উনি ঠাট্টা মস্করা করে এড়িয়ে যেতেন।কখনোও বলতেন ,তোমার মতন একটা সুন্দরী পাত্রী পেলেই করে ফেলব।কিন্তু আসল কারনটা অজানাই থেকে যেত।তবে আমার যে একজন স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে সেটা উনি জানতেন।আমি ই বলেছিলাম তাকে।তূনীর নাম ছিল তার।সে বলত আমাকে ছাড়া বাঁচবে না।..এই পর্যন্ত বলে মঞ্জুশ্রী একটু থেকে খুব সামান্য হাসলেন নিজের মনে।তারপর আবার বললেন,তারপর সে যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল,আমি তখন তিন মাসের প্রেগন্যান্ট।কাকে জানাব ?মা-বাবাকে বললে আমায় যে কী করবে ভগবান জানেন,কিংবা হয়ত তার নিজেরাই এই শক সহ্য করতে না পেরে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলবেন।সেই ভয়ে তাদেরও বলতে পারছি না।বন্ধুবান্ধবদের কাছে জানাতে লজ্জা করছে।যদি খবরটা সবাই জেনে যায়।ফ্যামিলির মান ইজ্জত সব যাবে।আর কোনও উপায় না দেখে সোজা চলে গেলাম ওনার কাছে। সব বললাম।উনি চুপ করে শুনলেন,তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,তুমি কী করবে ঠিক করেছ?বললাম জানি না।উনি বললেন,এ্যাবরশন হয়ত এই সময় ফেটাল হতে পারে।

সত্যি বলতে এই এত কিছুর পরেও এ্যাবরশনে আমারও ভেতর থেকে একটা তীব্র না ছিল।যুক্তি তে নয়,হয়ত..হয়ত প্রথম মাতৃত্বের রোমাঞ্চ..কিংবা একটা প্রতিবাদ...কিছু একটা হবে।আমিও চাইনি।উনি আচমকা বললেন,আমাকে বিয়ে করবে?আমি কী বলব ভেবে পেলাম না।উনি বললেন,জানি এইটা এ্যাবসার্ড ব্যাপার।কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কোনোও সল্যুশন এক্ষুনি মাথায় আসছে না।তুমি ভাব।সময় নিয়ে ভাব।আমি আর ভাবিনি।ভাবতে চাই নি,পারিও নি।বিয়ে হয়ে গেল আমাদের গোপনে।।উনি তখন ফর্টি টু আর আমি সেভেন্টিন প্লাস।লিগাল ম্যাটার টা উনিই সামলেছিলেন।বাড়িতে একটা চিঠি লিখে রেখে পালালাম।তবে ওনার সঙ্গে বিয়ের কথাটা লিখিনি। বারন করেছিলেন কারন ট্রান্সফার না হওয়া পর্যন্ত ওনাকে বালুরঘাটেই থাকতে হত।অফিসে দীর্ঘ ছুটি নিয়ে আমাকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতায় এক বন্ধুর বাড়িতে।সেই চুটির মধ্যে কি ভাবে জানি না নিজের ট্রান্সফারও করিয়ে নিলেন সিঊরি তে।সেই বছরই নভেম্বরে বুবাই হল।এই পর্যন্ত বলে আবার থামলেন বৌদি।।প্রীতম স্থির হয়ে বসে শুনে যাচ্ছে।চোখের পাতাও পড়ছে বিলম্বে।.......বিশ্বাস কর প্রীতম,ওই একটা বছর ..জীবনের ওই একটা বছর আমার কাছে সবথেকে সুখের ছিল।কী যে খেয়াল রাখতেন আমাদের দু’জনের।আমার সব দুঃখ ধুয়ে গেছিল।ভেবেছিলাম বয়েসের পার্থক্য থাকুক গিয়ে।এমন মানুষ পাওয়া সত্যি ভাগ্যের।কিন্তু বছর দেড়েক যাওয়ার পর আমার শরীর যখন ওকে চাইতে শুরু করল,কিছুতেই সাড়া পেতাম না।আমি ভাবতাম ওনার সংকোচ,কিন্তু তারপর একদিন...একদিন জেনেই গেলাম যা আজ তুমি জানলে।দু’জনেই কিছুক্ষন চুপ।দীর্ঘ উপন্যাসের একটা অধ্যায় শেষ হওয়ার পর পৃষ্ঠা ওল্টানোর সময় টুকু যেন।

ওনাকে বললাম, আপনিও এইভাবে ঠকালেন আমাকে!উনি অস্বীকার করলেন।বললেন,ভালবাসা মানে কি শুধুই শরীর?এমনি বন্ধুর মত কি ভাবা যায় না ? কিন্তু এইসব কথাতো আদতে নিজের অক্ষমতাকে ঢাকার চেষ্টা।ভেবেছিলাম আবার চলে যাব,কিংবা শেষ করে দেব নিজেকে।পারলাম না,ছেলেটার জন্য।ওর তো কোনও দোষ নেই।কী সরল বিশ্বাস বাবা-মার ওপর।থেকেই গেলাম।সবকিছু প্রানপন ভুলতে চেয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করলাম নতুন করে।মাস্টার্স পাশও করে গেলাম ভালমত।চাকরি পেলাম।আর এই ফাঁকে বুবাইটাও কখন বড় হতে হতে এক সময় বিদেশেও চলে গেল।।.কখন যে এত বড় হয়ে গেল,টেরই পাইনি।..হয়তো আর আসবেও না কোনও দিন।আমিও চাইনা আসুক।যে বিশ্বাস নিয়ে আছে তাই নিয়েই থাকুক।।...আবার কয়েক মুহূর্তের নিরবতা।।..আমি শুধু সারাটা জীবন ভালবাসা মুছতে ..মুছতে...,টেনে টেনে শব্দগুলো বলতে গিয়ে বৌ্দির চিবুক কেপে উঠল থিরথির করে।প্রীতম তাকিয়ে ছিল অপলক।পড়ে আসা বিকেলের আলোতে প্রীতম দেখল বৌ্দির দু’চোখ থেকে ,হয়ত বহুকাল পর,গড়িয়ে আসা দু’ফোটা জলবিন্দু চিবুকের কানায় টলটল করছে।প্রীতমের হঠাৎ ভীষন ইচ্ছে হল ওই বিন্দু দুটো নিজের আঙুলে তুলে নিতে!

                                         লেখক পরিচিতি
বিনোদ ঘোষাল 

জন্ম- ১৯৭৬ সাল, কোন্নগরের হুগলি জেলায়
প্রথম প্রকাশিত গল্প- ২০০৩ সাল দেশ পত্রিকায়
পেশা- সাংবাদিকতা

প্রকাশিত বই- ডানাওলা মানুষ(গল্পগ্রন্থ)- পরশপাথর ,মাঝরাস্তায় কয়েকজন(উপন্যাস)- পত্রভারতী , যেদিন ভেসে গেছে(উপন্যাস)-দীপ প্রক|শন , বৃষ্টি পড়ার আগে(উপন্যাস)- আনন্দ , নতুন গল্প ২৫(গল্পগ্রন্থ)- অভিযান পাবলিশার্স

পুরস্কার- সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার ২০১১ , পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার-২০১৪
অসম প্রকাশন পরিষদ বিশেষ সম্মান-২০১৩

1 টি মন্তব্য:

  1. বিনোদ ঘোষালের গল্প বিনোদনের জন্য নয়। ভাবার জন্য।

    উত্তরমুছুন