বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

শামিম আহমেদের নভেলেট : সাত জমিন




খেল সমঝা হৈ কহীঁ ছোড় না ন দে, ভুল না জাএ
কাশ!যূঁ ভী হো, কি বিন মেরে সতাএ ন বনে


“রবার্ট অ্যাশবিকেচেনো নানি?” রুনা কামরুন্নেসাকে জিজ্ঞাসা করে।

নানি উত্তর দেন, “না বুবু, আমি কি তোমাদের মতো অত ইংরেজি পড়েছি! আমাদের সময়ে ওই সব ইলমের চর্চা নাজায়েজ ছিল। তা ওই অ্যাশবি না কি যেন বলছ, সে কে বুবু?”


“বলছি। তার আগে বলো তো, নানা তো ইংরেজি শিখেছিলেন, না কি! তা হলে এই শিক্ষাকে নাজায়েজ বলছ কেন। তুমি বোকো হারামের কথা শুনেছ?’’ রুনা নানিকে আবার প্রশ্ন করে বসে।

নানি বলেন, “তোমার এই এক দোষ বুবু। একটা কথার মীমাংসা না করে অন্য কথায় ঢুকে যাও। অ্যাশবির কথা বলো আগে।’’

“রবার্ট অ্যাশবি হলিউডের অভিনেতা। “জিন্নাহ” নামের একটা ফিল্ম হয়েছিল, তাতে জওহরলালের পার্ট করেছেন। সেটা কথা নয়, তুমি যে এত পার্টিশনের গল্প করো, বলো সুহরাবর্দি আর তাঁর দ্বিতীয় বিবির কথা। কী যেন নাম ভদ্রমহিলার?’’

“নুরজাহান বেগম। অবশ্য সেটা মুসলমান হওয়ার পরে। তার আগে তিনি ছিলেন ভেরা আলেক্সা্ড্রোনভনা টিসেনকো কাল্ডার।’’

“তাঁদের তো একটা ছেলে ছিল, তাই না?’’

“হ্যাঁ। দাঁড়াও, নামটা মনে করতে দাও বুবু।’’

“রশিদ। রশিদ সুহরাবর্দি। সেই ছেলেই এখন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রবার্ট অ্যাশবি।’’

“বলো কি বুবু? আমি তো তাঁর অনেক খোঁজ করেছি। কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। শুনেছিলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু দিন পরে সুহরাবর্দির সঙ্গে তাঁর বিবি ভেরার তালাক হয়ে যায়। তার পর ভেরা চলে যান আমেরিকা। ওই বিবির আগের পক্ষের একটা ছেলে ছিল। তাঁর কোনও খবর বলতে পারো বুবু?’’

“তোমার কাছ থেকেই শুনেছিলাম। তাকেও তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, পাইনি। সেই ছেলের নাম ওলেগ। চেখভের প্রাক্তন বউ ওলগা নিপার নাকি ওই নাম রেখেছিলেন! তোমার কাছ থেকেই শোনা।’’

“হ্যাঁ। মস্কো আর্ট থিয়েটারে ভেরা যখন অভিনয় করতেন, তখন সেখানে ডিরেক্টর ছিলেন সুহরাবর্দির বড় ভাই হাসান সুহরাবর্দি। আর ওলগা নিপার ছিলেন অভিনেত্রী-পরিচালক। রশিদ মায়ের কাছ থেকে অভিনয়ের রক্তটা পেয়েছি দেখছি।’’

“আচ্ছা নানি, ভেরার সঙ্গে ডিভোর্সের পর সুহরাবর্দি পাকিস্তা্নেই রয়ে গেলেন?”

“কোথায় আর যাবে বলো! উনি তো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হলেন, সেটা নিশ্চয় জানো তুমি?”

“না।’’

“সে কি? ভারি মজার ব্যাপার ছিল সেটা! ওই একই সময়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা।’’

“বলো বলো, এত গল্প তুমি মাথায় রাখো কী করে। বয়স তো অনেক হল বুড়ি! বলো, ডিসটার্ব করব না।’’

“গল্প নয় রে বুবু, এ তো সব সত্যি।’’

“বলো। ইস্কান্দার মির্জার কথা বলছিলে।’’

“উনি পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল অব্দি এই আর্মি অফিসার ক্ষমতায় ছিলেন।‘’’

“তোমার মেমরি কার্ড তো এখনও বেশ সচল দেখছি। কিন্তু নানি, ওকে তুমি ফার্স্ট প্রেসিডেন্ট বলছ, অথচ সাল বলছ ১৯৫৬, পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে তো ১৯৪৭-এ। মনে হয় তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে!’’

“না রে বুবু। তার আগে দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন কুইন অব পাকিস্তান। কিছুই ভুল হচ্ছে না আমার। তুমি শুধু কথার মোড় ঘুরিয়ে দাও। আসল কথা হল, এই যে ইস্কান্দার মির্জা প্রেসিডেন্ট আর সুহরাবর্দি প্রধানমন্ত্রী একই সময়ে, এর মজাটা তুমি টের পাও, বুবু?’’

“না। ইস্কান্দার মির্জা তো আর্মি অফিসার বললে!’’

“মেজর জেনারেল সাহেবজাদা সৈয়দ ইস্কান্দার আলি মির্জা হলেন মির জাফর আলির বংশধর। তিনি মুর্শিদাবাদের লোক। সুহরাবর্দি কোথাকার মানুষ বলো তো হে?’’

“কলকাতার?’’

“না। মেদিনীপুরের। তার মানে ভাবো, যে দু জন লোক পাকিস্তান শাসন করছে, তাদের একজন মুর্শিদাবাদের নবাব বাড়ির ছেলে, অন্যজন মেদিনীপুরের এক বাঙালিপরিবারের। অবশ্য তুমি যদি তাঁদের পূর্বপুরুষের বাসস্থান খুঁজতে চাও, সেটা অন্য ব্যাপার। একজনের পারস্য, অন্যজনের ইরাক।’’

“বাহ, এটা তো দারুণ ব্যাপার নানি! তবে শুনেছি, স্বাধীনতার পরে পরেই ভারত-পাকিস্তান একটা যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধের ব্যাপারে ইস্কান্দার মির্জার নাকি দারুণ একটা ভূমিকা ছিল।’’

“১৯৪৭ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধের গল্প বলব তোমাকে। তার আগে, তুমি ৪৭-এর আগের কয়েকটা ঘটনা একটু ঝালিয়ে নাও।’’

“বলো। ঝালানোর সঙ্গে সঙ্গে তোমার সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী সইয়ের কথাও বোলো একটু।’’

“হ্যাঁ রে বুবু, বলব। তবে তোমার মরহুম নানার কথা না বললে যে এই কাহিনির শুরুই হবে না।’’

“জর্মান মিঞার গল্প! সাত আসমান! হ্যাঁ হ্যাঁ। দেরি কোরো না।’’

“গল্পের তোড় এলে আমি তোমার কথা শুনব না বুবু। তাতে কিছু মনে করো না তুমি।’’

“আমি কিছুই বলব না। বলো।’’

“জর্মান মিঞার ছিল স্বপ্ন দেখার ব্যারাম। তাঁর স্বপ্নগুলো খুব অদ্ভুত ছিল। তবে তোমার মা জন্মানোর আগে তিনি যে স্বপ্নটা দেখেছিলেন, সেই খোয়াব তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনও দিন।তবে সেটাকে খোয়াব বলা যাবে কিনা সে একটা ধন্দের ব্যাপার। তখন ভারত স্বাধীন হয়নি। খরা আর মণ্বন্তর চলছে দেশে। তোমার মা জন্মাবে, আমার প্রসব-বেদনা উঠেছে। সেটা ভোর বেলা। আমাকে আঁতুড় ঘরে ঢোকানো হয়েছে। এ দিকে জর্মান মিঞার পায়খানার বেগ উঠেছে। তিনি বাড়ির বাইরে পুরুষদের পায়খানা ঘরে যেতে গিয়ে দেখেন একজন মানুষ, যার হাতের কনুই পায়ের গোড়ালি সব উলটো দিকে। সে তোমার নানার দিকে তেড়ে আসছে, কিন্তু আসলে সে পিছু হাঁটছে। এই ঘটনায় তোমার নানা অচৈতন্য হয়ে পড়েন। তোমার মেজ নানা, মানে আমার মেজ ভাসুর ছিলেন বাড়ির কর্তা। মৌলানা এলেন, কত কী করা হল, কিন্তু খোয়াব দেখার ব্যারাম থেকে রেহাই পেলেন না জর্মান মিঞা। এ দিকে তোমার মা জহুরা জন্মেছে, তার বয়স যখন চার, তখন তোমার কংগ্রেসি নানা স্বপ্নের চক্করে পড়ে মুসলিম লিগের সমর্থক হয়ে পড়লেন। তার পর মেজ নানার চাপে পড়ে চলে এলেন সালারে। সেটা মুর্শিদাবাদ জেলা। দেশ ভাগ হলে এই জেলা নাকি পাকিস্তানে পড়বে, সেই আশায় আমরা কিছু বাড়িঘর-জমিজিরেত কিনে ফেলি সেখানে। আমার অবশ্য মত ছিল না। কিন্তু জানোই তো, তোমার নানার কোনও কাজে আমি কোনও দিন বাধা দিই নি। সালারে এসে জুলফিকার মিঞা, বদরেদ্দোজারা তোমার নানার কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন। তবে আর একটা নতুন উৎপাত এসে হাজির হল। তোমার নানার স্বপ্নে নিয়মিত হানা দিতে লাগলেন জিনের বাদশা জুল জেনাহেন। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে যাতে না ঢোকে, এমনকি দেশভাগের বিরোধিতা করতে মাঠে নামলেন অনেকে। ইস্কান্দার মির্জার বাড়ির লোকও সেখানে ছিলেন। তখন নবাব ছিলেন ওয়াসেফ আলি মির্জা। তিনি কংগ্রেস, আর তাঁর ছেলে কাজেম আলি মির্জা মুসলিম লিগের লোক। জান কবুল করে সবাই আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। ভোট হল বাংলাদেশে। সেই নির্বাচনে কেউ মেজরিটি পেল না। তবে মুসলিম লিগ এক নম্বরে আর কংগ্রেস দু নম্বরে। সামান্য একটা আশা দেখা দিল, কংগ্রেসের সঙ্গে লিগের একটা বোঝাপাড়া হবে। তখন বাংলায় কংগ্রেসের সভাপতি ত্যাঁওটা রাজবাড়ির ছেলে কিরণশঙ্কর রায়। তাঁর সঙ্গে মিটিঙে বসলেন সুহরাবর্দির বিবি ভেরা ওরফে বেগম নুরজাহান। কয়েক দিন আগে নাখোদা মসজিদে মুসলমান হয়েছেন এই রুশ নটী। দাবি দাওয়া নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে ঐকমত্য হল না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য নিয়ে লিগ সরকার গড়ল। প্রধানমন্ত্রী হলেন হোসেন সুহরাবর্দি। কয়েকদিন পরেই এল সেই কালো দিন। সেটা ছিল ২৭শে রমজান, ১৪ অগস্ট, ১৯৪৬। হিন্দু মহাসভা আর কংগ্রেসের মুসলমান বিরোধিতার জন্য লিগ ওই দিন কলকাতায় হরতালের ডাক দিল। সুহরাবর্দি অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ, তিনি ওই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে দিলেন। তার পর তো সব ইতিহাস। সব লোকেই জানে সেই কালো দিনটির কথা। এ সব হয়তো কিছুই হত না যদি ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের নিয়ে মধ্যবর্তী সরকার গঠন করে ফেলত। পরে যখন মধ্যবর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হল, তখন মুসলমান প্রতিনিধি হিসেবে যাদের রাখা হল তারা কেউ লিগের লোক নয়, কংগ্রেসের পছন্দ-করা লোকজন। তার ঠিক এক বছর পরে দেশ স্বাধীন হল, ভারতবর্ষ দু টুকরো হল।’’

রুনা বলে ওঠে, “নানি, একটা কথা বলি?’’

“হ্যাঁ, বলো বুবু।’’

“১৪ অগস্ট ১৯৪৬ সালের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে-র জন্য সবাই তো সুহরাবর্দিকে দায়ি করে। তিনিই নাকি এই দাঙ্গার নায়ক!!’’

“দাঙ্গার জন্য এক পক্ষ অন্য পক্ষকে যে দোষারোপ করবে, এটাই স্বাভাবিক। শোনো বুবু, হোসেন শহিদ সুহরাবর্দি এক সময় কংগ্রেস করতেন। ১৯২৬ সালের গ্রীষ্মকালে কলকাতায় বিরাট দাঙ্গা হয়। সুহরাবর্দি সেই দাঙ্গার জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে দল ছাড়েন। ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় সুহরাবর্দির আব্বা জাহিদ সাহেব রোগশয্যায়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। সেখানে মেয়েরা কোরান তেলাওয়াত করছে। যে কোনও সময় তিনি মারা যেতে পারেন। এমন অবস্থায় কোন পুত্র দাঙ্গার নেতৃত্ব দেবে বলো! অন্য দিকে শিখরা হিন্দুদের পক্ষে লড়ছে। গোপাল পাঁঠা, যুগল ঘোষের বাহিনী কলকাতায় ঘাঁটি গাড়া আমেরিকান সৈন্যদের কাছে অস্ত্র কিনে মানুষ মারছে। দাঙ্গা শুরুর চার দিন আগে ব্রিগেডিয়ার ম্যাকিনলে সৈন্যদের হুকুম দিয়েছিলেন, ১৪ অগস্ট কেউ যেন সেনা ছাউনি থেকে না বের হয়।’’

রুনা প্রশ্ন করে, “তোমরা তো তখন মুর্শিদাবাদের সালারে, সেখানে মারামারি হয়নি?’’

“না, তবে অবস্থা খুব থমথমে ছিল। একটা বছর ভয়ঙ্কর আতঙ্কে কেটেছে। কলকাতার পাশের শহর হাওড়াতে খুনজখম হয়েছিল। তবে হপ্তাখানেক পরে নোয়াখালিতে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়, কত মানুষ যে খুন হয়েছিলেন, সে কথা লেখাজোখা নেই। এ সব কথা জানো নিশ্চয়। লালমোহন সেন নামের এক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে খুন করা হয়। লীলা রায় প্রায় হাজার দুয়েক মানুষকে দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করেন। গান্ধিজির দ্বারস্থ হন সুহরাবর্দি। এটাই ইতিহাসের পরিহাস!’’

রুনা বলে ওঠে, “কেন? পরিহাস কেন?’’

“যে সুহরাবর্দি ১৯২৬ সালের দাঙ্গার জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে দল ছাড়েন, তাঁকেই আবার ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে হয়, একে তুমি কী বলবে, বলো?’’

“বোকো হারাম।’’ রুনা উত্তর দেয়।

নানি জিজ্ঞাসা করেন, “ সে আবার কী?’’

“রবার্ট অ্যাশবিকে চেনো কিনা, এই কথা বলাতে তুমি বলেছিলে যে ইংরেজি জানো না, তোমাদের সময়ে নাকি ওই সব পাশ্চাত্য শিক্ষা নাজায়েজ ছিল। সে কথা যদিও ভুল, কারণ তোমার ওই সুহরাবর্দিরা তো ইংরেজি না শিখলে কিছুই করতে পারতেন না। আশরাফ পরিবারের মেয়েরাও পাশ্চাত্য শিক্ষা করেছে। যত কিছু বাধা ছিল মধ্যবিত্তদের জন্য। গরিবদের কথা বাদ দাও, সব শিক্ষাই তাদের জন্য হারাম ছিল। এই যে ‘পাশ্চাত্য শিক্ষা আসলে পাপ’, এই কথাকেই “বোকো হারাম” বলে।’’

নানি বলেন, “সেসব দিনের কথা বাদ দাও। আমি শিখিনি, তোমার মাও হয়তো ইংরেজি শিক্ষা সে ভাবে নিতে পারেনি, কিন্তু তোমরা তো গ্রহণ করেছ। সেটা অন্য যুগ ছিল বুবু। আজ পৃথিবীতে কেউ কোনও শিক্ষাকে হারাম বলতে পারবে না!’’

“তুমি সেই তিমিরেই পড়ে আছো নানি। বোকো হারাম এখনও চলছে সগৌরবে।’’

“কী রকম?’’

রুনা বলতে থাকে,“বোকো হারাম হল নাইজেরিয়ার একটি উগ্রপন্থী সংগঠন। তারা ইসলামের বিরোধী যে কোনও জিনিসকে পাপ বলে মনে করে। তাদের মূল লক্ষ্য হল, খ্রিস্টান এবং তাদের সমালোচক মুসলমানরা। এদের কথা জানা গেল, তার কারণ কয়েক দিন আগে এই সংগঠনের লোকজনেরা নাইজেরিয়ার একটি স্কুল থেকে ২৭০ জন মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, কেননা ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমী শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে।’’

নানি আঁতকে ওঠেন, “সে কি! এমন ঘটনা এই সময়ে ঘটতে পারে না কি! আমি বিশ্বাস করি না। নিশ্চয় এর পেছনে অন্য কোনও চক্র আছে।’’

রুনা বলে, “সে আমি জানি না! তবে এই মেয়েদের অপহরণের ঘটনা যে ঘটেছে, তার প্রমাণ আমি তোমাকে দিতে পারি।’’





শম্অ বুঝতী হৈ, তো উসমেঁ সে ধুআঁ উঠতা হৈ
শোলঃ-এ-ইশক সিযহপোশ হুআ মেরে বাদ


টাঙ্গাইলের অতুল গুপ্ত সব শেষ করে দিলেন। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির প্যাসেজ হিসেবে মালদা জেলা ভারতের দরকার। হুগলি নদীকে বাঁচাতে প্রয়োজন মুর্শিদাবাদ আর নদীয়া। কংগ্রেস মাউন্টব্যাটেনকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে। ও দিকে মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে স্যার র‍্যাডক্লিফের গভীর দোস্তি। এই র‍্যাডক্লিফ ভাগ-বাঁটোয়ারার যে সব নিয়ম বের করেছেন তাতে মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে থাকে কিনা চিন্তার বিষয়।

১৪ অগস্ট ভারতের একটি অংশ স্বাধীন হল, যার নাম পাকিস্তান। রুনার নানি কামরুন্নেসা তখন স্বামীর সঙ্গে মুর্শিদাবাদের সালারে বাস করেন। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে লাগল। অনেকে খুশিতে ফেটে পড়লেন। যাক! অতুল গুপ্ত কিংবা কংগ্রেস, কারও প্রচেষ্টা কার্যকর হয়নি। একটা সময় বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের লোকে নাকি মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারির কদর বুঝবে না। এখন যে তার চূড়ায় পাকিস্তানের চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ পতাকা পতপত করে উড়ছে! নবাব ওয়াসেফ আলি মির্জা যে কোন চক্করে পড়ে দেশভাগের বিরোধিতা করছিলেন, কে জানে!

কামরুন্নেসা হাজার দুয়ারির কথা ভাবতে লাগলেন। এ দেশের সাত আশ্চর্যের অন্যতম হল এই প্রাসাদ। নিজামত কেল্লা ভেঙে এই বড় কোঠি তৈরি হয় নবাব হুমায়ুন জাহ-র আমলে। এই নবাব যখন ছোট ছিলেন, তখন তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন সালারের মুফতি মহম্মদ মোয়েজ। শোনা যায়, এই মোয়েজ সাহেবের প্রেরণায় নাকি নবাব হুমায়ুন জাহ হাজার দুয়ারি বানান। তবে ইংরেজের হাতে যেহেতু সব ক্ষমতার চাবিকাঠি, তাই মোয়েজ সাহেব লাটসাহেব উইলিয়ম ক্যাভেন্ডিশকে রাজি করান। এই প্রাসাদের হাজারটা দরজা হলেও তার মধ্যে ন শো দরজা মেকি। ১১৪টা ঘর আছে হাজার দুয়ারিতে।

হাজার দুয়ারি থেকে নেমেই সামনে নিজামত ইমামবাড়া। হাজার দুয়ারির অনেক পরে এই সৌধ বানানো হয়। কামরুন্নেসা শুনেছেন, আগে নাকি কাঠের ইমামবাড়া ছিল, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা সেই ইমামবাড়া বানিয়েছিলেন। আগুন লেগে তা পুড়ে গেলে নবাব ফেরাদুন জাহ সেই সময়ে ছ লাখ টাকা খরচ করে নতুন ইমামবাড়া তৈরি করান। এটিই নাকি ভারতের সবচেয়ে বড় ইমামবাড়া। এই সব আর ভারতে থাকল না। তবে নতুন যে রাষ্ট্র হল, সে তো ভারতেরই একটি অংশ, যদিও তার নাম পাকিস্তান। তা হলে কি এখন বলতে হবে, ভারতের সাত আশ্চর্যের একটি চলে গেল পাকিস্তানে! আর সবচেয়ে বড় ইমামবাড়াও পাকিস্তানের দখলে।

কিন্তু কামরুন্নেসার মন বলছে, মুর্শিদাবাদ-মালদা কোনও ভাবেই পাকিস্তানে পড়ার কথা নয়, অথচ পতাকা উড়ল, পাকিস্তান ঘোষণা হল। তবে কি হুগলি নদীতে বাঁধ নির্মাণ করার ব্যাপারে পিছিয়ে গেলেন অতুল গুপ্তরা!এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। সইরা সালারে এসে যে সব কথা শুনিয়ে গিয়েছিল, তাতে কামরুন্নেসার আর স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। প্রতি বারই সই আসত টাকা-পয়সা নিতে। তার আগে সইয়ের সঙ্গে অনেক গোপন কাজে অংশ নিয়েছিলেন কামরুন্নেসা। সে সব আঁচ করে তাঁর বাপ-ভাইয়েরা বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ের পরে তাঁকে নিজেদের বাড়িতে আর কোনও দিন নিয়ে যায়নি আব্বা কিংবা ভাইয়েরা। তা নিয়ে আজ আর কোনও খেদ নেই কামরুন্নেসার। পাকিস্তান ঘোষণা হওয়ার দিন দশেক আগে এসেছিল সই। এ বার তার নাম বলাটা জরুরি। এত দিন তিনি তার নামটা গোপন রেখেছিলেন।

সইয়ের নাম উনসারা বানু। গাইবাঙ্গার দৌলত-উন-নিসা অসহযোগ আন্দোলনে মহিলা সমিতি গঠন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য তিনি গ্রামে গ্রামে প্রচার চালিয়ে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলেন। সই সেই আন্দোলনে যোগ দেন। কামরুন্নেসাও উনসারার বানুর সঙ্গে আন্দোলনে নামেন। কিন্তু কামরুন্নেসার আব্বা-ভাইয়েরা এতে মোটেও খুশি ছিলেন না। উনসারা বানুকে তার বাপ-ভাইয়েরা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আর কামরুন্নেসার বিয়ে ঠিক হয়। তবু সইয়ের আসা-যাওয়া কমে না। সে নিয়মিত কামরুন্নেসার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে। নানা আপদে-বিপদে এবং অর্থসাহায্যের আশায় সে কামরুন্নেসার শ্বশুরবাড়িতে আসতে শুরু করে। শেষ বার এসেছিল, পাকিস্তান ঘোষণা হওয়ার দিন দশেক আগে। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল এই স্বাধীনতা তারা মানে না। কেন?

মহাকবি ইকবালও বলে গিয়েছিলেন, পাকিস্তান স্বতন্ত্র কোনও রাষ্ট্র হোক, তা তিনি চান না। বরং এটি একটি রাজ্য হোক যার স্বাতন্ত্র্য থাকবে। দেওবন্দের আহমেদ হাসান মাদানিও একটা ফর্মুলা দিয়েছিলেন, কেউ তা মানেনি। মানলে আজ আর দেশভাগ হত না।কামরুন্নেসার স্বামী জর্মান মিঞা একটা সময় বীরভূম থেকে মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় অনেকের মতো তার প্রাণেও আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু সেই আনন্দ মাত্র চার দিন স্থায়ী হয়। র‍্যাডক্লিফ মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদিয়া ইত্যাদি জেলা ভারতে ঢুকে যায়। আশাভঙ্গ হয় অনেকের। জর্মান মিঞা তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবার বীরভূমের দিকে পাড়ি জমান। কামরুন্নেসার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু স্বামীর মুখের উপর তিনি কোনও কথা বলেননি কোনও দিন। ফলে তাঁকেও ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এক মত হতে হল। তখন কামরুন্নেসার দুটি কন্যাসন্তান। তার এক ভাইপো খোকা ওরফে খাইরুল ইসলামও তাঁর কাছেই থাকে।

আবার বীরভূমের পথে পা বাড়ালেন তাঁরা। জর্মান মিঞার খোয়াব দেখার ব্যারাম। তা ছাড়া, বছর খানেক আগে যখন তিনি গ্রাম ছেড়ে আসেন, তখন কোথাও একটি মৃতদেহদেখেছিলেন তিনি। তার পর দাঙ্গা শুরু হয় কলকাতায়। মৃতদেহটি তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনও দিন। শোনা যায়, সেই মৃতদেহ নাকি স্বপ্নেও জর্মান মিঞাকে তাড়া করে বেড়ায়। তার উপরে রয়েছে খোকা। সে সব সময় বলে, “রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।’’ এ সব শুনে শুনে কামরুন্নেসার শরীর-মন অবশ হতে থাকে। তিনি মোষের গাড়ির ভিতরে গা এলিয়ে দেন। এক অদ্ভুত লোক তাঁদের গাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কামরুন্নেসা কোথায় যাচ্ছেন, তা তিনি জানেন না। এই কি তার স্বদেশ! তাঁর মনে পড়ে যায়, অযোধ্যার বেগম হজরত মহলের কথা। ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য তিনি জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকতেন। মিস্টার নিল এবং ক্যাপ্টেন চিপকে হত্যা করেন তিনি। রানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তাঁর চিঠির আদানপ্রদান হত। তাঁর একটাই কথা ছিল, আমাদের দেশ আমাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না কেন! আজিজুন বাঈকে ফাঁসিতে লটকানো হয়। এই সব বীরাঙ্গনাদের জীবনের বিনিময়ে, ত্যাগের বদলে আজ এই স্বাধীনতা পেতে কামরুন্নেসার একটুও ভাল লাগছে না।

বীরভূমের দিকে গাড়ি চলছে। খোকা বলছে, “ফুফুজান, সালার জায়গা তো খারাপ ছিল না, তবে আমরা চলে যাচ্ছি কেন! সালারের মতো কাবাব-রুটি ফুফাজানের গাঁয়ে পাওয়া যাবে না, আমি তা হলে কী খাব? তবে রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।’’

গাড়োয়ানের পেছনে বসে জর্মান মিঞা তাকে চুপ করতে বলেন। তার পর কামরুন্নেসার উদ্দেশ্য বলেন, “জানো বিবিজান, ঝিনাভাই কী বলেছে?’’

“কী বলেছে?’’ কামরুন্নেসা প্রশ্ন করেন।

“বলেছে মেজরিটি মুসলমানের স্বার্থে তারা অল্প কিছু মুসলমানের শহিদ হওয়াকে মেনে নেবেন। তা হলে আমাদের কী হবে? পাকিস্তানে তো যেতে পারলাম না। এখন হিন্দুস্থানে আমাদের জান-মান-মালের নিরাপত্তা কি পাওয়া যাবে?’’

কামরুন্নেসা জবাব দেন, “মহম্মদ আলি ঝিনাভাইও তো পাকিস্তান চাননি! তিনি এমন কথা বলতেই পারেন না।’’

“সত্যিই চাননি বিবিজান। আমি জানি।’’

“কেউই তো পাকিস্তান চায়নি, কিন্তু দেশটা তৈরি হয়ে গেল মিঞা। এটাই আশ্চর্যের।’’

জর্মান মিঞা জিজ্ঞাসা করেন, “আচ্ছা বিবিজান, মদানি সাহেব কী বলেছিলেন যেন?’’

“সে সব কথা এখন আর শুনে কী হবে মিঞা!’’

“তবু শুনি, বলো।’’

“১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ভারতের সঙ্গে ইংলন্ডের কিছু কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে টু নেশন থিয়োরি নিয়ে। সেই সময় মদানি সাহেব কিছু পরামর্শ দেন, যাকে মদানি-ফর্মুলা বলা হয়। পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া সেখানে পার্সোনাল ল নিয়ে কিছু সুপারিশ ছিল। মদানি চেয়েছিলেন, ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা ফেডারেল হোক। পঞ্জাব ও বাংলায় কোনও সম্প্রদায়ের জন্য আসন সংরক্ষণ করা চলবে না। সমসংখ্যক মুসলমান ও অমুসলমান জজ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যাবতীয় বিরোধের নিষ্পত্তি করবে। এ সব মেনে নিলে ভারত দু টুকরো হত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হল? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর গভর্নর এসেরি সাহেব মদানিকে গ্রেপ্তার করার অজুহাত খুঁজলেন। তার পর গভীর রাতে তাঁকে অ্যারেস্ট করে নৈনিতালের জেলে পোরা হল। এটার পেছনে শুধু ইংরেজ ছিল ভাবলে ভুল হবে।’’

জর্মান মিঞা বলেন, “দেওবন্দের লোকেরা পাকিস্তান-প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আমাদের বারোটা বাজালেন। এরা যদি কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ না দিয়ে লিগের হাত শক্ত করতেন, তা হলে হয়তো পাকিস্তানের পাঞ্জা শক্ত হত। ভারত নাকি আল্লাহ-র পছন্দের আর অনুগ্রহের দেশ, তাকে টুকরো করা না-ফরমানি, এই সব কথা কি তাঁরা প্রচার করেননি? সালারে শাহ রুস্তমের মাজারে গিয়ে আমি তো এই সব কথা শুনে এসেছি। লিগের তরফে কি আলেম লোক নেই, সত্যি হলে তাঁরা কি এই সব মেনে নিতেন না? যত্ত সব আজগুবি কথা, বুঝলে বিবিজান, কংগ্রেসের প্রচার এ সব। আর মদানি সাহেব তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।’’

“কথা যে মিথ্যা নয়, তা আপনিও জানেন মিঞা। কারণ, আপনি যদি মুসলমান হন তা হলে আপনাকে মানতে হবে যে হজরত আদম আমাদের পূর্বপুরুষ। এই নবি ছিলেন প্রথম মানুষ। তাঁকে পয়দা করারও আগে আল্লাহতালা একটা জিনিস বানিয়েছিলেন, সেটা হল নুর-ই-মহম্মদি—মহম্মদের নুর। এই নুর প্রথম দেওয়া হয় হজরত আদমকে। পয়দা করার পরে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল ভারতের সেরেন দ্বীপে। তা হলে নুর-ই-মহম্মদি প্রথম ভারতে আসে, অন্য সব দেশের আগে। এ কথা আপনাকে তো স্বীকার করতেই হবে।’’

কামরুন্নেসার কথা শুনে জর্মান মিঞা একটু থতমত খান। তার পর বুঝতে পারেন, তিনি কোথাও একটা ভুল করেছেন। কিন্তু সেরেন দ্বীপ জায়গাটা কোথায়? এই প্রশ্ন তাঁর মনে এল। কামরুন্নেসাকে জিজ্ঞাসা করবেন, কিন্তু দেখা গেল, গাড়ির ভিতরে খোকা জর্মান মিঞার প্রথম কন্যা জহুরার উপর খুব চোটপাট করছে। কামরুন্নেসা তাদের ঝগড়া থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

জর্মান মিঞা ভাবতে থাকেন, প্রথম অওরত হবা বিবিকে পয়দা করে পাঠানো হয়েছিল জেড্ডায়। সেরেন দ্বীপ, মানে হিন্দুস্থান থেকে হাঁটতে হাঁটতে মক্কার কাছে আমাদের আদি বাপ-মায়ের মোলাকাত। তার পর আবার ভারতে ফিরে আসা। সেই সময় তো কোনও গাড়ি-ঘোড়া ছিল না, তা হলে অতটা রাস্তা হজরত আদম হেঁটে গেলেন কী প্রকারে!

সুমাই গাড়ি চালাচ্ছে ভয়ঙ্কর গতিতে। মোষ দুটো উল্কার মতো ছুটে চলেছে। গাড়ির নীচে বাঁধা লন্ঠনটা এত জোরে নড়ছে যেন ভেঙ্গে না যায়! সকাল হতে এখনও অনেক বাকি। কামরুন্নেসার ভাইপো খোকাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না তাঁরা। এই ছেলেটির ভিতরে মনে হয় কোনও জিন বাস করে। নইলে ও রায়টের খবর পায় কী করে! গাড়ির ভিতরে কোনও আওয়াজ পাওয়া যায় না। এ দিকে তারা গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সুমাই এক অলৌকিক তত্ত্ব খাড়া করে নেমে গেল গাড়ি থেকে। সে নাকি জীবিত মানুষ নয়। গাড়োয়ান, যে এতটা পথ তাঁদের নিয়ে এল, সেই যদি মৃত মানুষ হয়, তা হলে দেশের চালক-নেতারা যে কী, তা জর্মান মিঞা আঁচ করার ফুসরত পান না। কারণ, তাঁকেই ওই গাড়ি-চালানোর ভার নিতে হয়েছে।

কোনও ক্রমে বাড়ি আসার পর দেখেন, কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। জর্মান মিঞা চীৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে তুললেন। তাঁদের এই ফিরে আসাকে কেউ তেমন ভাল-চোখে দেখলেন না। জর্মান মিঞার মেজ ভাই, যিনি এ বাড়ির কর্তা; তিনিও না। ভাবিজান তো নয়ই। তাঁর বড় ভাই ঢাকাতে থাকেন, এখন তিনি পাকিস্তানের বাসিন্দা। মেজ ভাই হয়তো ভেবেছিলেন, ছোটও থাকবে পাকিস্তানের মুর্শিদাবাদে। কিন্তু কী করা যাবে! মুর্শিদাবাদ যেমন ভারতে ফিরে এল, তেমনি জর্মান মিঞাও নিজের বাড়ি বীরভূমের গ্রামে ফিরলেন। জর্মান মিঞার মা, যিনি দীর্ঘ দিন রোগশয্যায় ছিলেন, তিনিই একমাত্র খুশি হলেন। জর্মান মিঞা স্ত্রী-কন্যা আর খোকাকে নিয়ে তাঁদের একটি ঘরে বসলেন।





কতরে মেঁ দজলঃ দিখাঈ ন দে, ঔর জুজব মেঁ কুল
খেল লড়কোঁ কা হুআ, দীদঃ-এ-বীনা ন হুআ

নিজের বাড়িতে পুনরায় থিতু হয়ে বসতে না বসতেই আবার নতুন করে দাঙ্গা-হাঙ্গামার খবর ভেসে এল। খোকা সব সময়ে বলেই যাচ্ছে, রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। কিন্তু এ বার রায়ট নয়, ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই শরিকের ঝগড়া মারামারিতে পৌঁছল। জর্মান মিঞা ফিরে আসাতে রুনার মেজ নানা খুশি হননি মোটেই, কিন্তু নানাদের মা যে ভাবে সেই বিবাদকে নিজের হাতে আটকে দিয়েছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেটা করার মতো কেউ ছিল না। যদিও ভারতে বসেছিলেন মাউন্টব্যাটেন, আর ও দিকে দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন কুইন অব পাকিস্তান। কেউ সে রকম গা করেনি। ফলে রে রে করে ঢুকে পড়ল একদল হানাদার।

ভারতবর্ষ যখন ভাগ হল তখন ৫৬২ জন দেশীয় রাজা, মহারাজা, নবাব, নিজাম এ দেশে ছিলেন। তাঁদের রাজ্য পাকিস্তানে যাবে না ভারতে থাকবে তা নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। ওই সব রাজা-বাদশাদের ইংরেজরা নিয়ন্ত্রণ করলেও তাঁরা স্বাধীন ছিলেন। তাঁদের বলা হয়েছিল, ইচ্ছে করলে ভারত বা পাকিস্তান যে কোনও রাষ্ট্রে তাঁরা যোগ দিতে পারেন, আবার স্বাধীন থাকার পরিকল্পনা থাকলে তাও বাস্তবায়িত করতে পারেন তাঁরা। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তা সম্ভব হয় না।

জর্মান মিঞাকে তাঁর মা বললেন, “দেখো বাবা, হায়দরাবাদের নিজাম যদি ভাবেন, তিনি পাকিস্তানে যোগ দেবেন, সেটা কী করে সম্ভব হবে!’’ জর্মান মিঞা ভাবলেন, সত্যিই তো! হায়দরাবাদের চারদিকে ভারতের সীমানা, পাকিস্তানে তিনি ঢুকবেন কী প্রকারে! নিজামের মনের বাসনা ছিল, তিনি পাকিস্তানে যোগ দেন, কিন্তু এমন বাস্তব সমস্যার কথা ভেবে তিনি পিছিয়ে যান এবং স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। জর্মান মিঞা তাঁর মাকে বলেন, “তা হলে কী হবে মা, এই রাজা-বাদশারা কী করবেন?’’

মা বললেন, তিনি জানেন না, কীভাবে এমন সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। কামরুন্নেসা জানালেন, “যাদের সীমানার সমস্যা নেই তারা অনায়াসে ভারত কিংবা পাকিস্তানে যোগ দেবে। এমন অবস্থায় যারা সেটা করবে না, স্বাধীন থাকতে চাইবে, তারা যে কত দিন তাদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে, তা বলা মুশকিল। কারণ, যদি কেউ আমাদের বাড়ির চার পাশ সবটা ঘিরে নেয়, আমরা কি পারব নিজেদের অধিকার এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে!’’

কয়েক দিন আগে মৌলানা সাহেব বলে গিয়েছেন, তিনি নাকি জানেন যে জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চান। কিন্তু তাঁর অবস্থাও হায়দরাবাদের নিজামের মতো।

কাশ্মীরের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। সেখানকার বেশির ভাগ লোক মুসলমান হলে কী হবে, তাদের রাজা হলেন হরি সিং। রাজপুত এই হিন্দু রাজা অবশ্য চারটে বিয়ে করেছেন। কাশ্মীর রাজ্যের মানুষ চেয়েছেন, তাঁরা পাকিস্তানে যোগ দেবেন। হরি সিং পাকিস্তানের সঙ্গে একটা চুক্তি করেন। সেই চুক্তি অবশ্য স্থিতাবস্থা মেনে চলার, যাতে তিনি স্বাধীন থাকতে পারেন। এ দিকে রাজা ভারতের সঙ্গে একই চুক্তিকরতে চাইলে ভারত তাতে রাজি হয় না।

মৌলানা এক দিন খুব সকালে এসে জর্মান মিঞাকে বলে গেলেন, হরি সিং নাকি ভারতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। জর্মান মিঞা তাঁর স্ত্রী কামরুন্নেসাকে সে কথা বলতেই বিবিসাহেবা বলে উঠলেন, “এটা কী করে করতে পারেন হরি সিং? যে রাজ্যের চার ভাগের তিন ভাগ লোক চাইছে না ভারতে যোগ দিতে, সেখানে রাজার এমন সিদ্ধান্ত ওই রাজ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তা ছাড়া পাকিস্তান কি ছাড়বে ভেবেছেন মিঞা! ওরাও সেই আগুনে ঘি ঢালবে। মাঝখান থেকে বেচারা কাশ্মীরিরা পড়বেন মহা ফাঁপরে।’’

দেশভাগ হওয়ার পরে ঠিক তাই হল। জর্মান মিঞার সঙ্গে তাঁর মেজ ভাইয়ের সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলাটা তাঁদের মা মেটাতে সক্ষম হলেও কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধটা এড়ানো গেল না। জর্মান মিঞা তাঁর ভাগের সব জমি পেলেন বটে, বাড়িতেও তিনি তাঁর বাস করার জায়গায় এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়লেন না। কিন্তু কাশ্মীরের উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাখতুন উপজাতিরা, পশ্চিম দিকের বিদ্রোহীরা জেগে উঠলেন। যেন এত দিন তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। তার উপর তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন দীরের অধিবাসীরা। এমনকি রাজা হরি সিং-এর সেনাবাহিনীর একটা অংশ পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার জন্য ফুঁসে উঠল। পাকিস্তান তাদের প্রকাশ্যে মদত দেওয়া শুরু করল। বিদ্রোহীরা বুঝে গেলেন যে রাজা হরি সিং ভারতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তীব্র আন্দোলন শুরু হয়ে গেল পাহাড়ে। রাজা এই বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনী নামালেন। সৈন্যবাহিনী আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালাতে লাগল।

পাকিস্তানের সমর্থকরা বলতে লাগল, হেসে হেসে পাকিস্তান পেয়েছি, এবার লড়াই করে হিন্দুস্থান দখল করব। তাদের কাছে কাশ্মীর দখল ছিল ভারত দখল করার সমান। এমন অবস্থা দেখে সবাই রীতিমতো উদ্বিগ্ন। যুদ্ধে তখনও ভারত মাঠে নামেনি।

মেজ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ আস্তে আস্তে গলতে শুরু করেছে। বড় ভাই যে আর পাকিস্তানের ঢাকা থেকে ফিরবেন না, তা দু ভাই জেনে গিয়েছেন। মেজ প্রথমে ভেবেছিলেন, ছোটও ওই এক রাস্তায় হাঁটবে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস। মায়ের মধ্যস্ততায় জমি-সম্পত্তি নিয়ে মিটমাট হলেও জর্মান মিঞা ভেবেছিলেন, মেজ ভাইয়ের সঙ্গে বোধ হয় আর সেই উষ্ণ সম্পর্ক ফেরত পাবেন না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তাঁদের দু ভাইয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।বড় ভাইয়ের সম্পত্তিও তাঁরা দু জনে ভাগ করে নিয়েছেন।

এ দিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তিক্ততা এ বার যুদ্ধের আকার নিল।পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মির্জা গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্নাহকে পরামর্শ দিলেন, কাশ্মীরে সেনা নামিয়ে দিতে। যে লোকটা কয়েক দিন আগে এ দেশের মুর্শিদাবাদের নাগরিক ছিলেন, তিনিই কাশ্মীরে সেনা নামানোর পরিকল্পনা নিলেন? এই জন্য মীর জাফর আলির বংশধরদের বিশ্বাস করতে নেই। জর্মান মিঞার মেজ ভাই আনোয়ার মিঞা এমন কথা বলাতে তাঁর মা তাঁকে বলেন, “শোন বাবা, মীর জাফর খারাপ লোক ছিলেন না, তাঁর নামে এমন খারাপ কথা উচ্চারণ করিস না। আর এই যে ইস্কান্দার মির্জা, এ মানুষ মীর জাফরের বংশধর শুধু নন, ইনি ভারতের সেনা বাহিনীতে বড় পদে চাকরিও করেছেন, আর সেই কাজে কখনো ফাঁকি মারেননি। আর তুই যে ধরেই নিচ্ছিস, কাশ্মীর ভারতের রাজ্য। তা তো নয় রে বাপ। তারা এখনও স্বাধীন। সে দেশের জনগণ চাইছে পাকিস্তানে যোগ দিতে, আর রাজার ইচ্ছে ভারতে যোগ দেওয়া।’’

কামরুন্নেসা তাঁর শ্বাশুড়িকে বলেন, “আম্মা, আমার মনে হয়, রাজা হরি সিং স্বাধীন থাকতে চান। কিন্তু দুই দিকে দুই যমদূত ষাঁড়ের মতো তার দিকে যে ভাবে এগিয়ে আসছে তাতে তিনি ভয়ে কাপড়ে-চোপড়ে না করে ফেলেন!’’

জর্মান মিঞা বলেন, “দুটো ষাঁড় নয় বিবিজান, তিনটে। আর এক দিক থেকে মিটিমিটি এগিয়ে আসছে চীন।’’

মহম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর প্রধানজেনারেল গ্রেসিকে কাশ্মীরে সেনা পাঠাতে আদেশ দিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান জিন্নাহ-র কথায় কর্ণপাত করলেন না। একটা দেশের শুরুতেই যদি সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপ্রধানের কথা অমান্য করে, তা হলে সেই দেশের ভবিষ্যত যে কী হবে, তা খোদায় মালুম। কাশ্মীরেরবিদ্রোহীরা মোজাফফরপুর, ডোমেল দখল করে নিল। এমনকি তারা পুঞ্চে পৌঁছে গিয়ে রাজা হরি সিং-এর সৈন্যবাহিনীকে ঘিরে ফেলল।

রাজা পড়লেন মহা ফাঁপরে। তিনি এখন কী করবেন! রাজ্যের মান বাঁচাতে তিনি ভারতের সাহায্য চাইলেন। কিন্তু ভারত তাঁকে কীভাবে সাহায্য করবে! ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন এ বার খেলার অন্য চাল দিলেন।

“তা আবার দেবেন না! মাউন্টব্যাটেন তো কংগ্রেসের হাতের পুতুল। তিনি যে ভাবে শুরু থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সৎ মায়ের মতো ব্যবহার করে যাচ্ছেন, তা কহতব্য নয়! আরে বাবা, এ তো পাকিস্তানের বিষয়ই নয়। কাশ্মীরের চার ভাগের তিন ভাগ লোক তো চাইছে তারা পাকিস্তানে যোগ দেবে। হরি সিং আর মাউন্টব্যাটেন তাদের স্বাধীনতায় এ ভাবে নাক গলাচ্ছে কেন?’’ জর্মান মিঞার এমন প্রশ্নে হেসে ওঠেন কামরুন্নেসা। বললেন, “রাগেন কেন মিঞা! কী হয়েছে? মাউন্টব্যাটেন সাহেব কী বলেছে হরি সিং-কে?’’

“বড় লাট বলেছে, যদি হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করতে রাজি হয়, তবেই এই বিপদের দিনে ভারত তাঁর পাশে দাঁড়াবে, তাঁকে মসিবত থেকে উদ্ধার করবে।’’

জর্মান মিঞার বিবি বলেন, “এ ছাড়া মান বাঁচানোর মতো আর কোনও রাস্তা হরি সিং-জির ছিল না মিঞা।’’

“পাকিস্তান কাশ্মীরের ভারতভূক্তির এই চুক্তি মানেনি। একা রাজার কথাকে তারা মেনে নিতে নারাজ। রাজ্যের লোকদের কথা মানতে হবে কারণ ওই রাজা নামেই স্বাধীন, আসলে তিনি ইংরেজের তাঁবেদার। এ দিকে বিমানে করে শ্রীনগরে সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছে ভারত। কাশ্মীর জুড়ে ভারতীয় সেনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। এক দিকে কাশ্মীরের বিদ্রোহীরা, তাদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তান; অন্যদিকে ভারতীয় সেনার সঙ্গে রাজা হরি সিং-এর ছোট্ট সেনাদল। যুদ্ধ চলছে।’’জর্মান মিঞার এই কথা শুনে তাঁর মা বলেন, “একটা দেশ পরাধীন ছিল। স্বাধীনতা নিয়ে মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা করে যা হোক একটা কিছু পেল, তার উপর দেশটা ভাগ হল। এখনও শান্তি নেই, তারা যুদ্ধে মেতে উঠল। কী দরকার ছিল বাপু স্বাধীনতা নিয়ে, সেই যখন ইংরেজের গোলামিই করবি!’’

আনোয়ার মিঞা বলেন, “আর ও দিকে বাদশা খান কী বলেছেন জানো?’’

জর্মান মিঞা বললেন, “না, অত সব খবর আজকাল আর মাথায় থাকে না ভাইজান। বলেন, গফফর খান কী বলেছেন?’’

“এই একটা লোককে কিছুতেই ওরা মুসলিম লিগে ঢোকাতে পারেনি। তাঁর খুদায়ি খিদমতকারের সংখ্যা এখন লাখ ছাড়িয়েছে। এই পাঠান সর্দার পাকিস্তানে গিয়ে পাখতুনদের অধিকার রক্ষার জন্য এখনও লড়াই করে চলেছেন। কিন্তু তিনি খুব হতাশ। বাপুজি নাকি তাঁকে বলেছিলেন, পাখতুনদের এই লড়াইয়ে ভারত তাঁদের পাশে থাকবে। কিন্তু ভারত কোনও ভাবেই তাঁদের সাহায্য করছে না। পাকিস্তান সরকার যে কোনও ছলছুতোয় তাঁকে জেলে পুরতে উদ্যোগী হয়েছে। এ সব ব্যাপার অবশ্য তাঁকে তাঁর পথ থেকে একটুও বিচ্যূত করতে পারেনি।’’

আনোয়ার মিঞার জবাব শুনে জর্মান হোসেন বলেন, “এ আর নতুন কথা কী ভাইজান! দেওবন্দের লোকজনেরা বলেছিল, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটা যে তৈরি হচ্ছে, তা কি একটা সুস্থ রাষ্ট্র হতে পারবে? না, বিলাত আর রাশিয়ার পলিটিক্সের কারখানা হবে! এই দেশের লোকেরা নাকি খেতে পাবে না কারণ তাদের ইকনমিটা তৈরি হবে কী প্রকারে!! সারা দেশ জুড়ে আন্দোলন হবে। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামা করবে আর ধর্মস্থানকেও তারা রেহাই দেবে না।’’

আনোয়ার মিঞা বলেন, “সেই জন্যই তো বাদশা খান বলেছেন, গান্ধীজি আমাদের নেকড়ের মুখে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছেন।’’




সফীনঃ জবকি কিনারে প’ আ লগা গালিব
খুদা সে ক্যা সিতম-ও-জৌর-নাখুদা কহিএ



জর্মান মিঞা যখন বীরভূম ছেড়ে চলে যান, তখন রাস্তায় একটি মৃতদেহ দেখেছিলেন, তার মুখ বা অবয়ব কোনও কিছু ঠাহর করার আগে মোষের গাড়ি আনোয়ার মিঞার কথামতো সালারের দিকে চলতে থাকে। তিনি জানতেও পারেন না সেই মৃতদেহটির দাফন ঠিকঠাক হল কিনা, বা সেই মৃতদেহটি ঠিক কার ছিল!কামরুন্নেসা জর্মান মিঞাকে বলেন, মেজ ভাইকে জিজ্ঞাসা করতে। কিন্তু জর্মান মিঞা আজও সাহস করে উঠতে পারেন না। এক বার তাঁর মাকেও বললেন মেজ ভাইয়ের কাছে জেনে নিতে ওই রহস্যময়ী নারী কে ছিল! মাও তেমন গা করলেন না। কেন এই লুকোচুরি খেলা!

তবে জর্মান মিঞার মনে হয়, স্বাধীনতা লাভের ঠিক এক বছর আগে যখন তিনি বীরভূম ছেড়ে মুর্শিদাবাদে পাড়ি দেন এই আশায় যে মুর্শিদাবাদ পাকিস্তান হবে, হলও তাই, কিন্তু চার দিনের বেশি স্থায়ী হল না; তবে কি ওই মৃতদেহটি কোনও মানুষের নয়! ওটা কি মাদার ইণ্ডিয়া! যে স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই মরে গিয়েছিল। এমন কথা বললে লোকে তাকে পাগল কিংবা দেশদ্রোহী ঠাওরাবে। তাই তিনি চুপচাপ আছেন। কিন্তু কতদিনই বা নীরব থাকবেন!

কামরুন্নেসা বলেন, “মিঞা, এই ভাবে আপনি এক সময় জিনের বাদশার কবলে পড়েছিলেন। জুল জেনাহেন, জিনের বাদশা আপনার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। বেড়ালের মতো প্রাণীর রূপ ধরে তিনি আসতেন, নানা প্রলোভন দেখাতেন আপনাকে! আপনার মনে নেই? এতে করে আপনার শরীর-মন বেতাল হয়ে যেত। এই মৃতদেহটি নিয়েও বেশি ভাববেন না। কী থেকে যে কী হয় তা কে বলতে পারে। আপনি আল্লাহ-রসুলের নাম করুন, আর দেশের যা যা হয়েছে তা মেনে নিন।’’

জর্মান মিঞা একটু রুষ্ট হন। তিনি বুঝে উঠতে পারেন না এখানে আল্লাহ-রসুলের নাম নিয়ে কী হবে! ধর্মের ব্যাপারটা তিনি আর দেশের রাজনীতিতে জড়াতে চান না। এক ঝিনাভাই যে ভাবে তাঁদের ডুবিয়ে দিয়ে চলে গেলেন এবং পাকিস্তান তৈরি হতে না হতে ভারতের সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়লেন, তাতে আর কোনও কিছুর উপর ভরসা করতে মন চায় না। তিনি কলের গান চালিয়ে দিলেন। মুকেশের গান বাজতে লাগল মৃদুস্বরেঃ

দিল জ্বলতা হ্যায় য়ো জ্বলনে দে
আঁসু নয়া বাহা পার ইয়াদানা করকে
তু পর্দানশীঁ কা আশিক হ্যায়
তু নামে বাফা বরবাঁদ নয়া কর
দিল জ্বলতা হ্যায় য়ো জ্বলনে দে
মাসুম নজর সে তির চলা
বিসমিলকো বিসমিল অউর বানা
আব সর্ম-হায়াকে পর্দে মে
তু চুপচুপকে........................

কামরুন্নেসা জর্মান মিঞাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আবার কার মহব্বতে পড়লেন জনাব?’’

জর্মান মিঞা লজ্জা পান। তিনি বলেন, “গান মানেই কি মহব্বতে পড়তে হবে! অবশ্য তুমি ঠিক কথাই বলেছ বিবিজান। গান তো নিজেই মহব্বত। এই গানের প্রেমে যে পড়েছে, তার আর কোন মহব্বতেরই বা দরকার আছে!!’’

কামরুন্নেসা বলেন, “আমি তো হিন্দি জানি না, তাই এই গানের মর্ম বুঝতে পারি না। তবে আমি জানি, যখন আমি পোয়াতী ছিলাম সালারে, তখন আপনি আপনার ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে দিয়ে পুকুরের অন্য পারের ঘাটে একটি পর্দানশীন আওরতকে দেখতেন আর কলে বাজতো ঠিক এই গানটাই। আপনার মনে নেই মিঞা?’’

“মনে আবার থাকবে না! তবে জেনে রাখো বিবিজান, আমি কিন্তু তোমার মহব্বতেই লবেজান। পুকুরপাড়ের কোনও আওরত আমাকে টানতে পারবে না কোনও দিন!’’

কামরুন্নেসা কথার মোড় ঘোরাতে উদ্যোগী হয়ে এমন এক কথার মধ্যে ঢুকে যান, যে কথাটা ভাবতে একটু আগে তিনি বারণ করেছিলেন জর্মান মিঞাকে। তিনি বলে ওঠেন, “ওই যে মৃতদেহের কথা বলছিলেন না, ওই মৃতদেহটি কি আজও আপনার খোয়াবের মধ্যে বাড়তে থাকে?’’

“পুকুরপাড়ের ওই পর্দানসীন আওরত আর স্বাধীনতার এক বছর আগে ইণ্ডিয়ার বীরভূমে ফেলে যাওয়া মৃতদেহটির অনেক মিল বিবিজান। আমার মাঝেমধ্যে বড় ভয় হয় এটা ভেবে যে ওই নারী, তাকে তোমরা মাদার ইণ্ডিয়া বা অন্য যে কোনও নামে ডাকো না কেন, সে কেন শুধু আমার কাছেই ওই মৃতদেহ হিসাবে ধরা পড়ল, তা বুঝে উঠতে পারি না! আর যদি সে মৃতই হয় তা হলে কেন মরে গিয়ে এ ভাবে রোজ ঘুমের ভিতরে, আমার যাপনে এবং প্রতিটি মুহূর্তে আমার পিছু ছাড়ে না! আমি কিছুতেই এ সবের মর্ম বুঝে উঠতে পারি না। যাক গে, তুমি আমাকে এ সব নিয়ে আর প্রশ্ন করো না। আমার অবসন্ন লাগে।’’

কামরুন্নেসা চুপ করে যান। তাঁর মনে পড়ে যায় সই উনসারা বানুর কথা। সে এখন কোথায়? শোনা গিয়েছিল সে পাকিস্তানের রাজশাহী বা খুলনা কোথাও একটা চলে যাবে। কিন্তু এ ভাবে সে একা বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে কীই বা করবে! কামরুন্নেসার মন খারাপ হয়ে যায়। তিনি তাঁর শ্বাশুড়ির কাছে এসে বসেন। জিজ্ঞাসা করেন, “আম্মা, আমি কি কোনও অন্যায় করেছিলাম?’’

“কোন অন্যায়ের কথা বলছ বৌবিবি?’’

“ওই যে একটা সময়ে উনসারা বানুদের সঙ্গে দেশের কাজে নেমেছিলাম! যার জন্য বাপ-ভাইয়েরা আমাকে বাড়ি থেকে এক রকম খেদিয়েই দিয়েছেন। বিয়ের পর তো তাঁরা কোনও যোগাযোগই রাখেননি! নেহাত আপনাদের ঘরে এসে পড়েছি, তাই কেউ কিছু বলেনি, অন্য শ্বশুরবাড়ি হলে খোঁটা আর গঞ্জনায় আমাকে আত্মহত্যা করতে হত!’’

কামরুন্নেসার শ্বাশুড়ি বলেন, “আওরত বলে কি তুমি মানুষ নও মা! কোনও অন্যায় তুমি করোনি! তুমি কি বদরুন্নেসার নাম শুনেছ? সে পাঁচ সন্তানের মা হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে বহু বছর জেল খেটেছে। নুরুন্নেসা গুপ্তচরের কাজ করতেন। টিপু সুলতানের বংশধর এই মহিলা ফ্রান্স থেকে জর্মানি যাওয়ার পথে ধরা পড়ে যান। তাঁকে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়, তার পর তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে জন্তু-জানোয়ারদের খাইয়ে দেওয়া হয়। তুমি কোনও অন্যায় করোনি মা। যাও, রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ো।’’

সে রাতে ঘুম আসতে চাইছিল না কামরুন্নেসার। তাঁর দুই মেয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। পাশের ঘরে খোকার সঙ্গে জর্মান মিঞা শুয়ে আছেন। তাঁর নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সেই নাক ডাকার আওয়াজ এক সময় অদ্ভুত এক নীরবতা তৈরি করল।

ভোরের দিকে তন্দ্রা মতো এল কামরুন্নেসার। আর সেই স্বপ্নের মধ্যে তিনি জর্মান মিঞার জিনের বাদশাকে দেখতে পেলেন। ফর্সা-ধোপদুরস্ত সেই জীব যেন তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে। তাকে তো মানুষের মতোই লাগছে। তবে কেন জর্মান মিঞা তাকে বেড়ালের রূপে দেখতেন! কামরুন্নেসা জানেন, জিনেরা ধূমহীন আগুনের পয়দা। তারা যে কোনও সময় যে কোনও রূপ ধারণ করতে পারে। সেই জিনের বাদশা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলছেঃ

“আমি জুল, জিনকা বাদশা। আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “আর্জি? আমার কাছে আপনার আর্জি থাকবে কেন? জর্মান মিঞা পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে, তেনার কাছে যান।’’

জিনের বাদশা বলে, “নাহ! মিঞার কাছে গিয়ে লাভ নাই। বড় দুবলা মানুষ। কোনও সাহস বা তাকত নাই তেনার। আপনার কাছেই আর্জি জানাতে হবে।’’

“বলুন! তবে আপনার আর্জি যে মঞ্জুর হবে, এমন কথা কিন্তু আপনাকে দিতে পারছি না।’’

“ভেবে দেখবেন বৌবিবিজান। রাজা হরি সিং আমার বেটা জালবেবুলকো মার ডালা। আমার নাম জুল জেনাহেন আছে। মেরা ও বেটা বহুত পেয়ারা থা, আউর বহুত বদমাশ ভি। উসকো এক লড়কা আছে, ওই আপনাদের খোকা কি তারা! উসকো আপ রাখলে, এহি মেরা খোয়াইশ হ্যায়।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “হরি সিং-এর কাছে আপনার বেটা কি করতে গিয়েছিল? সেখানে তো এখন ঘোরতর যুদ্ধ। আপনারও বলিহারি, নিজে না গিয়ে ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ছি ছি! জিনের বাদশা হয়ে আপনি এই কাজ করতে পারলেন?’’

জুল জেনাহেন এই অপমান সহ্য করতে না পেরে কিনা কে জানে, সে কামরুন্নেসার স্বপ্নের জগৎ থেকে বিদায় নিল। কিন্তু কামরুন্নেসা স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তাঁর পরনের একটা শাড়ি বাক্স থেকে বেরিয়ে হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। এই সেই শাড়ি, যেটা তিনি দ্বিতীয় কন্যা শান্তির জন্মানোর আগে পেয়েছিলেন জর্মান মিঞার সালারের দোস্ত জুলফিকার মিঞার কাছ থেকে। তুর্কি জুলফিকার আলির দেওয়া শাড়িটা ছিল খাঁটি রেশমের।

একদা যাদের লালা থেকে এই রেশম তৈরি হয়েছিল, সেই রেশম থেকে গুটিপোকারা বেরিয়ে আসছে ক্রমে ক্রমে। তাদের লালা কিংবা বমি থেকে এক সময় যে কাপড় বানানো হয়েছিল তা যেন একটা প্রকাণ্ড বড় জাল। এমন জালের ভিতর থেকে চরাচরের যা কিছু দেখা যায়, সবই যেন খণ্ড খণ্ড, কিন্তু বিশ্বচরাচর তো অখণ্ডই।

কামরুন্নেসার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি উঠে পানি খান। এই ভাবে তাঁদের স্বপ্নেরা ভেঙেচুরে যায় অথবা জালের ফুটোর মতো নানা ভাগে ভাগ হয়ে যায়। কামরুন্নেসার মনে হয়, এই যে চরাচর আল্লাহতালার বানানো, তাকে কি এই ভাবে ভেঙ্গে নিজেদের সুবিধামতো হিসস্যা বের করে নেওয়া যায়! এই জমিনকে যদি সাত টুকরো করা হয় তা হলে কি সত্যিই জমিন ভাগ হয়ে যাবে, এক এবং অখণ্ড থাকবে না! কামরুন্নেসা জানেন, আরবিতে “সাত” সংখ্যাটি আসলে ঠিক সাতকে বোঝায় না, তার মানে অনেক-অনেক-বহু। যেমন আল্লাহতালা সাত দিনে এই দুনিয়া পয়দা করেছিলেন, সাতটা আসমান আছে, তেমনি জমিনও আছে সাত-সাতখানা। আর সেই সব জমিনকে মানুষ টুকরো-টুকরো করে শেষ করে দিচ্ছে। একেই বলে খোদার উপর খোদাকারি।

জর্মান মিঞাকে ঘুম থেকে তোলেন কামরুন্নেসা। তার পর তাঁকে স্বপ্নবৃত্তান্তের কথা সবিস্তারে বলেন। মিঞা প্রথমে খুব ঘাবড়ে যান, তার পর বলেন, “সে কি বিবিজান, আমার এই বদ নসিবের বদ খোয়াব তোমার ঘাড়ে পড়ল কী করে? আর এখন তো দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। কোনও ঝামেলা নেই, আজাদি এসেছে দেশে, মানুষ তো আর খালি পেটে থাকবে না; দেশের কোনও লোক মূর্খও থাকবে না। এমতাবস্থায় তুমি যদি জিনের বাদশাকে স্বপ্ন দেখো, লোকে হাসবে; বলবে, এমন শিক্ষিত মানুষরা যদি আজেবাজে খোয়াব দেখে, তা হলে গরিব-অশিক্ষিত মানুষরা কোথায় দাঁড়াবে!’’

কামরুন্নেসা বলেন, “জিনের বাদশাআমাকে কী বলেছে জানেন! বলেছে যে রাজা হরি সিং নাকি ওর এক বেটাকে মেরে ফেলেছে। সেই বেটার এক ছেলে আছে, তাকে আমাদের কাছে পাঠাতে চায়।’’

“সব তার বুজরুকি। আমাকেও বলেছিল, তার এক বেটাকে সোলেমান রাজা মেরে ফেলেছে। সেই ছেলের এক মেয়ে লুসিফাকে শাদি করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন তুমি আমার কাছে ছিলে না, আমি ছিলাম মুর্শিদাবাদের সালারে। সেই ভয়ে আমি তোমাকে সালারে আনিয়ে নিলাম, তখন ওই জিনের বাদশা কুপ্রস্তাব বাদ দিয়ে অন্য কথা বলতে শুরু করল। অবশ্য আমি এখন তাকে আর ভয় পাই না। তুমিও পাত্তা দিও না বিবিজান।’’

“সে না হয় দেবো না। কিন্তু আমার ভয় হয়। জিনের বাদশার নাতি আবার আমার ভাইপো খোকার উপর ভর করবে না তো! খোকা এমনিতেই একটু খ্যাপা গোছের, তার উপর......’’

জর্মান মিঞা কামরুন্নেসাকে কথা শেষ করতে দেন না। বলেন, “খোকা পাগল নয়, ওর কাছে গায়েবি খবর আসে। নইলে ও কী করে বলে যে রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না!’’

কামরুন্নেসা জানান, “আমার মনে হয়, খোকার উপর জিনে ভর করেছে। ওকে ভাল কোনও মৌলানা বা মৌলবি দিয়ে ঝাড়াতে হবে। আপনার বন্ধু এক মৌলানা আছেন না, পাশের গ্রাম শাদিনগরে যিনি থাকেন, তাঁকে এক দিন ডাকুন না!’’

“ওকে দিয়ে হবে না। ও ব্যাটা পাকিস্তানের সাপোর্টার।’’

“সে তো আপনিও। নাকি আবার মত বদলালেন?’’

জর্মান মিঞার জবাব দেওয়ার আগেই খোকা ঢুকে পড়ে তাঁদের কথার মধ্যে। সে বলে ওঠে, “ফুফাজান, আকাশে খুব মেঘ করেছে। ঝড় উঠবে, আর সেই ঝড়ে বহু লোক মারা যাবে। তবে রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।’’

জর্মান মিঞা এবং কামরুন্নেসা দু জনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন, কোথাও কোনও মেঘের ছিঁটেফোটা নেই, পরিষ্কার আকাশ।





সবজ-ও-গুল কহাঁ সে আএ হৈঁ
অবর ক্যা চীজ হৈ হবা ক্যা হৈ

স্বাধীনতা লাভের প্রায় চার বছর হয়ে গেল। কামরুন্নেসা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, এটিও কন্যা। তার নাম রাখা হল লায়লি নিহার।

এ দিকে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে দিয়েছে, উর্দুই হবে সে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অথচ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাভাষী। বাঙালিরা বাংলা ভাষার সম মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেন।

কিন্তু কয়েক জন মানুষ আন্দোলন করলেই তো আর সব ঠিক হয়ে যায় না। বাঙালিরা ক্ষুব্ধ হলেও সরকার বাহাদুর গা করল না। পুর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের বাস, সেখানকার গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন জানালেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই থাকবে। এই কথা শোনার পরে বাঙালিরা যারপরনাই খেপে গেল। তারা মিটিং মিছিল শুরু করল, জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। সরকারও চুপচাপ বসে থাকল না, তারা সব রকম মিটিং মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। ১৪৪ ধারা বলবৎ হল দেশে, মানে পুর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু সব কিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পথে নামল। পুলিশও বসে রইল না।

শুরু হল নির্যাতন।জর্মান মিঞা আর বাড়িতে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, এই সময়। এখনই তাঁরপূর্ব পাকিস্তানে যাওয়া দরকার। সেখানে তো বড় ভাই লুকমান হোসেন আছেন। তাঁর কাছেই থাকবেন। কিন্তু যাবেন কী প্রকারে! এই অস্থির সময়ে তাঁকে যেতে বারণ করলেন কামরুন্নেসা। জর্মান মিঞার মাও রাজি নন ছেলে পূর্ব পাকিস্তানে যাক। যাওয়ার খুব সহজ রাস্তা ছিল মুর্শিদাবাদের লালগোলা থেকে গোদাগাড়ি ঘাটে চলে যাওয়া, তার পর রাজশাহী থেকে ঢাকা। কিন্তু এই ডামাডোলের বাজারে সে বড় বন্ধুর পথ!

এ দিকে খবর আসতে দেরি হল না। কামরুন্নেসা খুব কাতর হয়ে পড়লেন। একটা দেশ, যার বেশির ভাগ নাগরিক বাংলাভাষী, সেখানকার রাষ্ট্রভাষা উর্দু হয় কী প্রকারে! আর বাংলাকে সেখানে কোনও মর্যাদাই দেওয়া হবে না, এ আবার কেমন কথা!

কামরুন্নেসা শুনতে পেলেন, ঢাকাতে ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বেরিয়েছিল। বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেকে।তিনি জর্মান মিঞাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “শুনেছি বরকত নাকি আমাদের সালারের লোক?’’

জর্মান মিঞা বলেন, “হ্যাঁ। তবে ঠিক সালারে নয়; কাছেই বাবলা বলে একটা গ্রাম আছে, সেখানকার ছেলে সে। শামসুদ্দিন মিঞার পুত্র। ওদের বাড়ি থেকে কলকাতার এক সময়ের মেয়র বদরেদ্দোজার বাসাও কাছেই।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “হঠাৎ এত ক্ষেপে গেল কেন জনতা? জানে তো সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করলে তার ফল ভাল হয় না। সে স্বাধীন দেশের সরকার হোক বা ইংরেজ গভর্নমেন্ট। ধীরে ধীরে সব কিছু করা ভাল ছিল না কি!’’

“তুমি কি মনে করছ, হঠাৎ একদিন বাংলাভাষার জন্য লোকজনের দরদ উথলে পড়েছে! তা নয়। শোনো!

১৯৪৮ সাল থেকে এই লড়াই চলছে। ও দিকে কাশ্মীর আর এ দিকে পুর্ব পাকিস্তান! বাংলা ভাষা সরকারি কাজে ব্যবহার হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ চলছিল। ধর্মঘটও হয়। আন্দোলনকারীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে উত্তাল ছিল। শওকত আলি, আহাদ সাহেব, শেখ মুজিবুর গ্রেফতার হন। মহম্মদ তোয়াহা পুলিশের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেন। মিছিল এগিয়ে চলে পুর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসার দিকে। হাইকোর্টের সামনে পুলিশ সেই মিছিল আটকে দেয়। শেরে বাংলা ফজলুল হক পুলিশের হামলায় আহত হন। শেষ পর্যন্ত নাজিমুদ্দিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তাদের দু একটা ছোটখাটো দাবি মানলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। এই ঘটনার হপ্তা খানেক পরে জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। তিনি আন্দোলন ভাঙার জন্য অন্য তাস খেললেন। রেসকোর্স ময়দানে তিনি জোর গলায় বললেন, “এই আন্দোলন আসলে মুসলমান কওমের মধ্যে ভাঙন ধরানোর ষড়যন্ত্র। উর্দুই মুসলমানের ভাষা, যারা এর বিরোধিতা করবে তারা পাকিস্তানের শত্রু, দেশদ্রোহী।’’ কার্জন হলেও তিনি একই কথা বলেন। নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ছাত্রনেতা ও সাধারণ মানুষের যে চুক্তি হয়েছিল, তা জিন্নাহ বাতিল করে দেন। তার কয়েক দিন পর জিন্নাহ মারা যান। খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহ-র জায়গায় বসেন।

এর পর আসরে নামেন মাউলানা আকরম খাঁ। তাঁকে সভাপতি করে বাংলা ভাষা কমিটি তৈরি হয়। সেখানে ভাষা নিয়ে যে সংঘাত চলছে তার মীমাংসার একটা পথ দেখানো হয়।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “সেটা কত দিন আগের ঘটনা?’’

“এখন থেকে বছর দুয়েক আগে। তবে জিন্নাহ-র মারা যাওয়া হল প্রায় বছর চারেক। নাজিমুদ্দিনও জিন্নাহ-র মতোই উর্দুর পক্ষে এক বগগা হয়ে রইলেন। আসলে এরা তো কেউ বাঙালি ছিল না। ফলে বাংলার মর্ম কী আর বুঝবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে অন্য ভাষাকে চাপিয়ে দিলে মানুষ নেবে কেন!মাস খানেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা কমিটি তৈরি হয়। সেখানে আরবি অক্ষরে বাংলা লেখার কঠোর নিন্দা করা হয়। পরিকল্পনা হয়, বাংলা ভাষার জন্য মিছিল, হরতাল সভা সমাবেশ চলবে। আর ও দিকে সরকার পুর্ব পাকিস্তানে সব রকম জমায়েত নিষিদ্ধ করে। সেই সরকারি নিষেধ ভাঙ্গার ফলে আজ এই গুলি চালনা, হত্যালীলা, এতগুলো লোকের মৃত্যু!!!’’

জর্মান মিঞাকে তাঁর মা ডাকেন। বলেন, “বাবা, এই মৃত্যুকে সামান্য ঘটনা হিসাবে দেখো নয়া। ওরা কবে মারা গিয়েছেন?’’

“২১ তারিখ, ফেব্রুয়ারি মাসের।’’

“সে মাসের আজ কত তারিখ হল?’’

“ জি, ২৪ তারিখ, আম্মা।’’

“আনোয়ারকে বলো, কাল ওদের চাহরম। এই গ্রামের কয়েক জন গরিব-মিসকিনদের বাড়িতে যেন ভাত পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আর মৌলবি সাহেবকে যেন খবর দেওয়া হয়। তিনি কোরান তেলাওয়াত করবেন।’’

জর্মান মিঞা সেই মোতাবেক আনোয়ার মিঞাকে খবর দেন। মেজ ভাবির উপর দায়িত্ব পড়ল সেই ভাত তরকারির ব্যবস্থা করার। কাজের লোক অবশ্য আছে। জর্মান মিঞা মেজ ভাইকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি তো সালার এলাকার অনেক লোককে চেনেন। তা এই বরকতকে চিনতেন? আমি ওর আব্বার নাম শুনেছি। খুব ভাল লোক ছিলেন।’’

আনোয়ার মিঞা বলেন, “হ্যাঁ, আবাইয়ের আব্বাকে আমি চিনি।’’

“আবাই আবার কে?’’

“বরকতের ডাক নাম। আমি ওদের বাড়িতেও গিয়েছি। সালারের জুলফিকার মিঞার সঙ্গে যখন গুড়ের ব্যবসা করতাম তখন বাবলা গ্রামে গিয়েছি বেশ কয়েক বার। আবাই তখন তালিবপুর স্কুল থেকে বোধ হয় ম্যাট্রিক পাশ করেছে। তার পর শুনেছিলাম বহরমপুরে ভর্তি হয়। সেখান থেকে ঢাকা। পাকিস্তান হওয়ার পরে অনেকেই তো তখন চলে গেল। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে ঢুকেও ঢুকল না, এইটা তো সকলে মানতে পারেনি। মামা মালেক সাহেবের ঢাকার বাড়িতে থাকত সে আর পড়ত ঢাকা ভার্সিটিতে। তার পর কি যে কপালের ফের! গুলি খেয়ে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি আছে। আবাই সেই রাতেই মারা গিয়েছে। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। কাল তার চাহরম। চলো, আমরা সকলে মিলে তার মাগফিরাতের জন্য দোওয়া মাঙ্গি।’’

জর্মান মিঞা উঠে পড়েন। চলে যেতে যেতে বলেন, “সেই মাদার ইণ্ডিয়া নাকিসের যেন এক মৃতদেহ দেখেছিলাম ভাইজান, সেই দেহ তো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বাড়ছে কাশ্মীরে, এখন পুর্ব পাকিস্তানে। ওই লাশের কি কোনও দিন দাফন হবে না ভাইজান?’’

আনোয়ার মিঞার জবাব শুনতে পান না জর্মান মিঞা। তিনি কামরুন্নেসার ঘরের দিকে পা বাড়ান।




লাজিম নহীঁ কি খিজর কী হম পৈরবী করেঁ
জানা কি ইক বুজুর্গ হমে হমসফর মিলে

জর্মান মিঞার এক মামা কলকাতায় থাকেন, একটি কলেজে ইতিহাস পড়ান। তিনি কামরুন্নেসাকে খুব স্নেহ করেন। মাঝেমধ্যে নিজের গ্রাম উজ্জ্বলপুরে আসেন। আর সেখানে এলে জর্মান মিঞাদের বাড়ি আসতে ভোলেন না। দু তিন দিন থাকেন। খুব জমাটি মানুষ। একবার ভেবেছিলেন, ঢাকায় চলে যাবেন। কারণ, ৪৬-এর কলকাতার দাঙ্গা তাঁকে খুব পীড়া দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরেও দাঙ্গা হয়েছে। বছর দুয়েক আগে, ৫০ সালেও একটি ছোটখাটো দাঙ্গা হয়ে যায়। তবে সেটা কলকাতায় হয়েছিল কম, আর তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে পুর্ব পাকিস্তানে। শোনা গেল, শের-এ-বাংলা ফজলুল হকের এক আত্মীয়কে হিন্দুরা মেরে কচুকাটা করে ফেলেছে। সেটা গুজব না সত্যি কথা কেউ জানে না, তাকে ভিত্তি করে দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তখন জর্মান মিঞার মামা ভাবেন, পুর্ব পাকিস্তানে না গিয়ে তিনি ঠিকই করেছেন। দাঙ্গার ব্যাপারে কেউ কম যায় না। যেখানে যে মাইনরিটি সেখানেই তার বিপদ। আর সেই সব বিপদেরা যে কোথায় কখন ঘাপটি মেরে থাকে কেউ জানে না। মানুষের মনের হিংস্র বাঘ জেগে উঠলে সে নরমাংসের জন্য ছটফট করে। মামাকে কামরুন্নেসা জিজ্ঞাসা করেন, “আপনার কলকাতায় থাকতে ভয় করে না?’’

মামা বলেন, “কোথায় ভয় নেই মা? এমন কোন জায়গা দেখাতে পারো যেখানে মানুষ ভয়শূন্য? সেই আদ্দিকাল থেকে খুনজখম চলছে তো চলছেই। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু সে নিজেই। মনে নেই, হজরত আদমের দুই ছেলে হাবিল আর কাবিলের দাঙ্গা। ভাই ভাইকে খুন করে লাশ পুঁতে দিল। সেই রক্ত তো আমাদের সকলের শরীরে বয়ছে। মানুষই শয়তান, আবার তার ভিতরে ভালবাসাও লুকিয়ে থাকে। আসল কথাটা হল, তুমি কোন শক্তিকে জাগাবে!’’

কামরুন্নেসা বোধ হয় একাগ্র মনে এ সব কথা শুনছিলেন না। তাই তিনি মামাকে বলে বসেন, “আচ্ছা, পূর্ব পাকিস্তান তো আসলে পূর্ব বাংলা, আর আমাদেরটা পশ্চিমবঙ্গ। এই দুই বাংলা শুধু আলাদা নয়, এখন তারা ভিন্ন দেশের প্রদেশ! আমরা কি এক হতে পারি না? ধর্মের ভিত্তিতে যদি দেশ ভাগ হয়, খুনজখম হয়, তা হলে ভাষার ভিত্তিতে কেন দুটো দেশ এক হবে না, তাতে বাধা কী? মিলনে তো বাধা থাকার কথা নয়!’’

মামা হাসেন। বলেন, “মিলনেই তো সব চেয়ে বেশি বাধা মা! আর এ সব কথা বললে তোমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে। তবে স্বাধীনতার আগে যে এমন চেষ্টা হয়নি, তা নয়। সুহররাবর্দি সাহেব তো দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হিন্দুস্থান পাকিস্তান ভাগ হলে তাঁর এক পা থাকবে ভারতে আর অন্য পা পাকিস্তানে। গোপনে তিনি স্বাধীন বাংলা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শরৎ বোস, অখিল দত্ত, কিরণ রায়রাও নাকি সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস, লিগ কেউই তো রাজি হয়নি। রাজি হলে তিনটে দেশ হত।’’

“তা হলে খারাবিটা কী হত? আজ পুর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিমের যে সম্পর্ক, তা তো বিভেদেরই। আজ না হোক কাল পাকিস্তান ভাঙবে। কাশ্মীর নিয়েও কোনও মীমাংসা আজকালের মধ্যে হবে বলে আপনি মনে করেন?’’

মামা জানান, “তুমি ঠিক কথায় বলছ মা। কিন্তু রাজনীতিবিদদের তো সাধারণ বুদ্ধি নিয়ে চলা নিষেধ। খুনজখম, রক্তপাতে তাদের আর কি যায় আসে! মরবে তো সাধারণ পাবলিক। সুতরাং চিন্তা কোরো না। সব কিছুকে চোখ বুজে মেনে নিতে শেখো।’’

“দুই বাংলা কি কোনও দিন এক হবে না মামা?’’

“কী করে হবে! দুই বাংলা তো এখন দুই রাষ্ট্রের কবলে। পুর্ব বাংলা কি পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে পারবে, আর পশ্চিমবঙ্গ? এ সব কথা প্রকাশ্যে বললে আমাদের পুলিশে ধরে গারদে পুরে দেবে।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “ভাবতে দোষ কি মামা? আপনি বলুন। আমরা ঘরে বসে চিন্তা করলে তো সরকার বাহাদুর টের পাবে না!’’

“তা ঠিক। আমার সঙ্গে হাসান ভাইয়ের অনেক কথা হয়েছে এ ব্যাপারে। তবে তিনি কবি মানুষ। শিল্প নিয়ে পড়ে থাকেন, তবু ভাবনাটা তাঁর ফেলে দেওয়ার মতো নয়।’’

“হাসান ভাই কে মামা?’’

“হোসেন সুহরাবর্দির বড় ভাই। ব্যাচেলর মানুষ। অধ্যাপনা করেই কাটিয়ে দিলেন জীবনটা। অবশ্য রাশিয়ার বিপ্লবে জেল খেটেছেন। মস্কো আর্ট থিয়েটারের ডিরেক্টরও ছিলেন। ভেরা, মানে হোসেন সুহরাবর্দির দ্বিতীয় বিবি তাঁর হাত ধরেই রাশিয়া থেকে ইণ্ডিয়া আসেন। তার পরের ঘটনা তো জানো।’’

কামরুন্নেসা প্রশ্ন করেন, “হাসান সাহেব কী বলেছেন আপনাকে?’’

“উনি বেশ কিছু দিন বিশ্বভারতীতে নিজাম প্রোফেসর ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ ছিলেন। তার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাণী বাগিশ্বরী অধ্যাপকের পোস্ট সামলেছেন। তাঁ গুণকীর্তন গাইলে বৃহৎ বাংলার কথা আর বলা যাবে না।’’

কামরুন্নেসা্র এ বার চমকানোর পালা, “বৃহৎ বাংলা! পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গ মিলে!’’

মামা বলেন, “হ্যাঁ, এ দুটো তো আছেই। সঙ্গে থাকবে ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামান, মেঘালয়; এমনকি বিহার ও উড়িষ্যার অংশও থাকতে পারে।’’

“অ্যাঁ, বলেন কি?’’

“শোনো মা, ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাস, তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। শরৎচন্দ্র বসু কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করলেন শুধু এই কারণে যে বাংলাকে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ভারত আর পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে তিনি বাংলাকে একটা দেশ হিসাবে দাবি করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসি নেতা্রা ভাবতেন যে তাঁদের মালিকানায় গোটা দেশ আছে। যেমন ভাবে খুশি তাঁরা দেশ ভাগ করবেন, হিসস্যাও তাঁরাই ঠিক করবে্ন। অখণ্ড বাংলার জন্য শরৎ বোস নতুন দল বানালেন-সোশালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি।’’

কামরুন্নেসা জিজ্ঞাসা করেন, “মুসলিম লিগের লোকরা কী বলেছে? হিন্দু মহাসভা?’’

মামা জবাব দেন, “বলছি বৌবিবি। সব জানতে পারবে। লিগের দুই নেতা—হোসেন সুহরাবর্দি আর আবুল হাশেম দুই বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র দেশ হিসাবেই দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লিগের অন্য দুই নেতা—আকরাম খাঁ এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের ইচ্ছে ছিল পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গ বৃহৎ বাংলা হিসাবে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হোক। হিন্দু মহাসভার নেতারা অখণ্ড বাংলা নামক ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী শরৎ বোস আর সুহরাবর্দির এই কল্পনার কথা জানতেন। তিনি অখণ্ড বাংলাকে ভারতের অংশ হিসাবে মেনে নিতেও রাজি ছিলেন না। জওহরলাল নেহরু এই বিষয়টাকে আমলই দেননি।’’

কামরুন্নেসা শুনে ভাবেন, তাঁর এই মামাশ্বশুর কতই না জানেন! মামা উঠে জর্মান মিঞার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কামরুন্নেসা তাঁর ডায়েরির পাতা খুলে বসেন। সেখানে লিখতে শুরু করেন,

“বাংলা ভাষার আদি কবিরা হইলেন লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ। লুইপাদের কথা স্মরণে না রাখিলে বাংলা ভাষার কোনও আন্দোলন সম্ভব হইবে না। এই সব কবিরা সিদ্ধাচার্য। তাঁহাদের দুইটি পথ ছিল—একটি বজ্রের মতো কঠিন আর অন্যটি সহজ পন্থা। তাই তাঁহারা একই সঙ্গে বজ্রযানী ও সহজযানী। চৌরাশি সিদ্ধাকে এখন আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তবে প্রত্যেক যুগে উহারা জন্মিয়া থাকে। যেমন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, সফিউর, ওহিউল্লা। ইহাদের সিদ্ধাচার্য বলিতে হয়। বাংলা ১৩৫৯ সালের ৮ ফাল্গুন বাংলা ভাষার নতুন ইতিহাস রচিত হইল। অদূর ভবিষ্যৎ কালে পুর্ব বাংলা নিশ্চয় পথ দেখাবে বাংলা ভাষার অন্য মানুষদের, যাঁরা অন্য এলাকায় থাকেন। এমনকি এমতো ঘটিলেও অবাক হইব না এই ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯ সন গোটা পৃথিবীর কাছে নিজেকে তুলিইয়া ধরিবে। সে দিন বাংলার জয়পতাকা উড়িবে, আর সেই বাংলার নাম হইবে বৃহৎ-বাংলা।’’




উরূজ-এ-নাউমীদী চশম-এ-জখম-এ চর্খ ক্যা জানে
বহার-এ-বেখিজাঁ অজ আহ-এ-বেতাসীর হৈ পৈদা

“রবার্ট অ্যাশবি যে রশিদ সুহরাবর্দি, তা কেমন করে জানলে তুমি? ওই নামে তো অন্য লোকও থাকতে পারে!’’ রুনাকে তাঁর নানি কামরুন্নেসা জিজ্ঞাসা করেন।

রুনা উত্তরে বলে, “তুমি নিশ্চয় জানো, হোসেন সুহরাবর্দির বড় ভাই হাসান শহীদ সুহরাবর্দি একজন নামকরা কবি। তিনি যেহেতু বিয়ে করেননি তাই তাঁর ওয়ারিশন হলেন ওই একমাত্র ভাইপো রবার্ট অ্যাশবি। একটি প্রকাশনা সংস্থা হাসানের কবিতা বের করে, আর তার অনুমতির জন্য তারা রবার্ট ওরফে রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রশিদের অনুমতি না পেলে সেটা ছাপাই হত না। এ বার বুঝলে তো রবার্ট হল হোসেন সুহরাবর্দির ছেলে।’’

“বুঝলাম। তিনি তো এখন অ্যাক্টো করেন। সেটা হওয়ারই কথা। সুহরাবর্দি পরিবার নাচ আর অভিনয়ের কদর বুঝত। হোসেন সুহরাবর্দি তো ভেরাকে বিয়ে করেই সেটা প্রমাণ করেছিলেন। এই নাচ-গান মৃত্যু অবধি তাঁর পিছু ছাড়েনি।’’

রুনা আবার গল্পের গন্ধ পায়। সে প্রশ্ন করে, “কী রকম নানি? বলো, শুনি।’’

“সে সব শুনতে গেলে বুড়ির অনেক জ্ঞান শুনতে হবে।’’

“হ্যাঁ, শুনব। শুরু করো।’’

“তোমার ধৈর্য থাকবে তো বুবু?’’

“আরে, বলো না! সাসপেন্স ক্রিয়েট কোরো না।’’

“সেটা আবার কী?’’

“বুড়ি একটা কথা বলবে আর তার জন্য হাজারটা প্রশ্ন করবে! সাসপেন্স ক্রিয়েট করা মানে গল্পটাকে টানটান করে তোলা।’’

“গল্প নয় রে বুবু, সব সত্যি। ভাষা-আন্দোলনের কয়েক বছর পর, মনে হয় তিন কি চার, আজকাল আর কিছুই মনে থাকে না! চৌধুরি মহম্মদ আলি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যান। সেই সময় হোসেন সুহরাবর্দি প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর চেষ্টায় বাংলাকেও উর্দুর সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়।’’

রুনা বলে, “এ তো অত্যন্ত ভাল ব্যাপার। তা হলে আন্দোলন থেমে যাওয়ার কথা। তবে যাই বলো নানি, পাকিস্তানের শাসকরা কেউ গণতন্ত্রের ধার ধারতেন না।’’

নানি বলেন, “এই কথাটা তুমি ভুল বললে। সুহরাবর্দিকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলা হত। তিনি পুর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে নানা বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করেন। সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়।’’

“কী সমস্যা?’’

“বছর দুয়েক পর ইস্কান্দার মির্জা, তোমাদের ওই মুর্শিদাবাদের লোক-- তিনি পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন।’’

“সেটাই হওয়ার কথা। মীর জাফরের পুতি তো তাই করবেন।’’

“একেই ইংরেজিতে কী যেন বলে, ইতিহাসের আবৃত্তি?’’

রুনা হাসে, “কী যে বলো নানি! একে বলে, রিপিটিশন অব হিস্ট্রি। তা কিসের আবৃত্তি, মানে পুনরাবৃত্তি হল?’’

কামরুন্নেসা বলেন, “পলাশীর যুদ্ধের। এখানে নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার ভূমিকায় হোসেন শহীদ সুহরাবর্দি। কয়েক দিনের মাথায় সুহরাবর্দিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।’’

“তার কারণ?’’

“ক্ষমতা। পাওয়ারের জন্য মানুষ সব করতে পারে বুবু।’’

রুনা জিজ্ঞাসা করে, “সুহরাবর্দি তখন কী করলেন?’’

“উনি তো ভদ্রলোকের রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিক ভাবে তার মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছেন।’’

রুনা জিজ্ঞাসা করে, “এই তো বললে, তাঁকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’’

“সেটাকেও তো রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়, তাই না! তার পর শোনো।’’

“বেশ বলো।’’

কামরুন্নেসা আবার গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়েন, “তার বছর তিনেক পর সুহরাবর্দিকে গ্রেফতার করা হয়। করাচির এক জেলে তাঁকে রাখা হয়। আট মাস জেলে থাকার পর তিনি মুক্তি পান। যদ্দুর মনে পড়ে, সেটা ১৯৬২ সাল।’’

“তার পর?’’

“এ বার আসরে নামেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান।’’

রুনা বলে, “সেই কুখ্যাত জেনারেল আইয়ুব খান?’’

“হ্যাঁ। সুহরাবর্দি জেল থেকে বেরিয়ে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে নামেন এবং নতুন দল গঠন করেন, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট। জেলে থাকার ফলে সুহরাবর্দির স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়। এমনিতেই তাঁর উচ্চ রক্তচাপ আর হার্টের ব্যামো ছিল। পাকিস্তানে চিরকাল চিকিৎসা ব্যবস্থা বেশ খারাপ। তাই তিনি লেবাননে যান চিকিৎসার জন্য। বেইরুটের একটি হোটেলে গিয়ে ওঠেন। ওই হোটেলের অন্য একটি ঘরে ছিলেন আইয়ুবের এক মন্ত্রী, জুলফিকার আলি ভুট্টো। আর একটি ঘরে করাচির বিখ্যাত নর্তকী রাজিয়া।’’

“এরা কী করছিলেন সেখানে?’’

“জুলফিকার ভুট্টোর ব্যাপারটা বেশ রহস্যজনক। তিনি জেনারেল আইয়ুবের লোক। তো, সুহরাবর্দির একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। রাজিয়ার সঙ্গে তাঁর দেখাসাক্ষাৎ হয়। রহস্যের, নাকি ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে কে জানে, নবাবজাদা নাসরুল্লাহ—সুহরাবর্দির এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে সাবধান করে দেন।’’

রুনা জিজ্ঞাসা করে, “কীসের ষড়যন্ত্র?’’

“সুহরাবর্দি যে কোনও সময় খুন হয়ে যেতে পারেন। ওই হোটেলে তিনি যাতে বাস না করেন, তার জন্য নাসরুল্লাহ অনেক অনুরোধ করেন। কিন্তু সুহরাবর্দি তাঁর কথায় কান দেন না। বলেন, এখানে তাঁর প্রচুর ভক্ত আছেন। তাঁদের আমন্ত্রণেই বেইরুটে এসেছেন তিনি, নইলে আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডে যেতে পারতেন। সেখানে তাঁর প্রাক্তন বিবি আছেন, এক সৎ ছেলে আর নিজের পুত্রও আছেন। আর হোটেলের ঘরেও তিনি যথেষ্ট সাবধানী, সব সময় দরজা বন্ধ করে থাকেন। কিন্তু ওই ঘর থেকেই বেরলো তাঁর মৃতদেহ। ময়নাতদন্ত করে জানা গেল, দমবন্ধ হয়ে তিনি মারা গিয়েছেন। বালিশ বা ওই জাতীয় কিছু একটা দিয়ে তাঁর শ্বাসরোধ করা হয়েছিল।’’

রুনা বলে, “ এ সব কি ময়নাতদন্ত থেকে জানা গেল?’’

“না, কারণ ময়নাতদন্ত ঠিক জায়গায় হয়নি।’’

“ তা পোস্টমর্টেম-টা হল কোথায়?’’

“লেবাননে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভুট্টো সেই সব ব্যাপার রুখে দেন। তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানেই সুহরাবর্দির মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হোক। হলও তাই।সব চেয়ে দুঃখের কথা কী জানো বুবু, সুহরাবর্দির মৃতদেহ করাচিতে গ্রহণ করেন তাঁর এক তুতো জামাই সুলেমান সাহেব। তার পর সেই লাশ আনা হয় ঢাকাতে, সেও তাঁর তুতো বোন শাইস্তার টাকায় কাটা প্লেনের টিকিটে।’’

“বলো কি নানি? তা সুহরাবর্দির লাশ ঢাকাতে আসার পর ঝামেলা হয়নি?’’

“তা আমি জানি না। তবে মুজিবুর রহমান সুহরাবর্দির লাশ দেখে বলেছিলেন তাঁকে খুন করা হয়েছে। মুজিবুরের ইঙ্গিত ছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের দিকে।’’

রুনা চমকে গিয়ে বলে, “কী কাণ্ড!’’

“শুধু কাণ্ড কি বলছ বুবু, এরা তো এ ভাবেই ক্ষমতা দখল করেছিল। সুহরাবর্দি কখনও পশ্চিম পাকিস্তানে সম্মান পাননি। তাঁকে ভারতের চর বলে গালি দেওয়া হত। আর ভারতও তাঁকে যোগ্য সম্মান দেয়নি কোনও দিন।’’

“কী আশ্চর্য! কিন্তু আসল রহস্যের সমাধান তো এখনও হল না!’’

নানি জিজ্ঞাসা করেন, “কোন রহস্যের কথা বলছ তুমি?’’

রুনা বলে, “করাচির ডান্সার রাজিয়া বেইরুটের সেই হোটেলে কী করছিলেন? এটা বোঝা গেল যে জুলফিকার ভুট্টো ছিলেন আইয়ুবের ভাড়া করা লোক, কিন্তু রাজিয়া?’’

“সে গল্প অনেক।’’

“আমি শুনব। তুমি বলো নানি।’’

“আর একটু বড় হও, তার পর শুনবে।’’

“আমি যথেষ্ট বড় নানিমা। শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছি এমন নয়, আমি রাজনীতিও করি।’’

“তাই নাকি! তা কী রাজনীতি করো?’’

“বললে কি আর বুঝবে! তোমরা তো রাজনীতি বলতে বোঝো লিগ আর কংগ্রেস।’’

নানি বলেন, “কেন! হিন্দু মহাসভা, কমিউনিস্টদের কথাও আমি জানি।’’

রুনা বলে, “বলব। তবে তোমাকে আগে রাজিয়ার গল্পটা বলতে হবে।’’

“শোনো বুবু, রাজিয়া ছিল করাচির নামকরা ডান্সার। সে কী করে ওই হোটেলে গেল আর কেনই বা গেল, সে এক বিরাট রহস্য। সেই রহস্যের জট খোলা কি চাট্টিখানি কথা!’’

রুনা বলে, “তুমি যেটুকু জানো, সেটা বললেই হবে।’’

“পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নর্তকী-গাইয়েদের খুব খাতির। সে হতেই পারে! রাজনীতিবিদরা যদি শিল্পের অনুরাগী না হন, তা হলে খুব মুশকিল। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। এই সব লোকেরা নানা ভাবে রাজনীতি-প্রশাসনে নিজেদের প্রতিপত্তি ফলাতো। আর নর্তকীর সঙ্গে যদি তুমি কোনও পলিটিশিয়ানের নাম জড়িয়ে দিতে পারো, তা হলে পাবলিক সেটা ভাল ভাবে নেয় না। রাজিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শুধু এই কারণে যে সুহরাবর্দিকে মেরে ফেলার পর যদি বেশি হইচই হয়, তখন রাজিয়ার ব্যাপারটা প্রচার হবে।’’

“কী প্রচার হবে, বুঝলাম না।’’

“লোকজনের কাছে এমন চিত্র দিয়ে দিলেই হবে, সুহরাবর্দি লেবাননে চিকিৎসা করাতে গেছিলেন না ছাই, ফূর্তি করতে গিয়েছিলেন। এতে জনগণের একটা বড় অংশ চেঁচামেচি থামিয়ে দেবে।’’

রুনা জিজ্ঞাসা করে, “তা এটাকে তুমি কী বলবে নানি, নাচের রাজনীতি, না রাজনীতির নাচ?’’

কামরুন্নেসা বলেন, “তোমাদের খালি কথার প্যাঁচ বুবু, সুহরাবর্দির মৃত্যুরহস্যের যে কোনও কিনারা হল না, এটা তোমাকে ভাবায় না?’’

“শোনো নানি, আমাদের প্রজন্মের কেউ সুহরাবর্দি নিয়ে ভাবিত নয়। ওই একটা উদ্যান আর অ্যাভিনিউয়ের বাইরে তারা কেউ সুহরাবর্দিকে মনে রাখেনি। ফলে তাঁর মৃত্যু নিয়ে এরা ভাবতে যাবে কেন!’’

নানি বলেন, “ইতিহাস নিয়ে এদের কোনও আগ্রহ নেই?’’

“না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই এরা জানে না। যাক গে, তোমার ওই রাজিয়া আর সুহরাবর্দির কথা শুনে একটা সিনেমার কথা মনে পড়ল।’’

“তোমরা সিনেমা দেখবে অথচ ইতিহাস জানবে না! ইতিহাস-রাজনীতি কি সিনেমার থেকে কম আকষর্ণীয়?’’

“এই বিষয়টা লাখ কথার এক কথা। খুব দামি। ওই সিনেমাটার কথা বলছিলাম না! এহসান কুদ্দুস নামে এক লেখকের নভেল থেকে সিনেমাটা হয়েছে। ফিল্মটা তোমাকে দেখাবো, দু একদিনের মধ্যেই, নেট থেকে ডাউনলোড করে—দ্য বেলি ডান্সার অ্যান্ড দ্য পলিটিসিয়ান। পাওয়ার আর অথরিটির দ্বন্দ্ব নিয়ে কাহিনি, এক বেলি ডান্সারের সঙ্গে রাজনীতিবিদের প্রণয়, এইসিনেমার মূল উপজীব্য।’’

নানি বলেন, “তোমার এই এক দোষ বুবু। একটা কথার মীমাংসা না করে অন্য কথায় ঢুকে যাও। অ্যাশবির কথা বলো আগে, ওই যে সুহরাবর্দির ছেলে!’’

“রবার্ট অ্যাশবি হলিউডের অভিনেতা। “জিন্নাহ” নামের একটা ফিল্ম হয়েছিল, তাতে জওহরলালের পার্ট করেছেন। তাঁর মা মস্কো আর্ট থিয়েটারের বিখ্যাত নটী ভেরা, মুসলমান হওয়ার পর কী যে নাম হল তাঁর?’’

“নুরজাহান বেগম। তার আগে তিনি ছিলেন ভেরা আলেক্সা্ড্রোনভনা টিসেনকো কাল্ডার।’’

“ভেরার তো আগের পক্ষের একটা ছেলে ছিল, তাই না?’’

“হ্যাঁ। দাঁড়াও, নামটা মনে করতে দাও বুবু, ওলেগ। ভেরার দ্বিতীয় ছেলে ওই রবার্ট?’’

“রবার্ট নয়, রশিদ। রশিদ সুহরাবর্দি। পরে নাম পালটে হয়েছে রবার্ট অ্যাশবি।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “তুমি আমাকে রাজনীতির নাচ না নাচের রাজনীতি নামেরসিনেমাটা দেখাবে না! তাড়াতাড়ি করো। ও দিকে জুলফিকার আলি ভুট্টো চীনের সাহায্য নিয়ে ভারত আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে।’’

“হ্যাঁ, আজই দেখাবো। নানি, এটা ভেবে দেখার মতো বিষয় যে ওই একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য আন্দোলন শুরু হয়েছে।’’

কামরুন্নেসা বলেন, “বড় অস্থির এই সময়টা। কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হওয়ার তোড়জোড় চলছে।’’

রুনা অস্থির হয়ে ওঠে, “আমি তোমাকে চারু মজুমদারের কাহিনি শোনাতে চাই। শুনবে নকশালবাড়ির কথা!’’

“বলো। তবে অস্থির হয়ো না। শান্ত হতে শেখো।’’

কামরুন্নেসা ও রুনা মুখোমুখি বসলেন।


শুরু হল নকশালবাড়ির গল্প।

লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন