বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : তার

(১)

ঢেউগুলো খোয়া ওঠা সিমেন্টের বারান্দায় আছাড়ি পিছাড়ি খেতে থাকে। জালের পরে জালের যেন বেজায় টানাটানি, মরণ যন্ত্রণার বেশি।

তুঝ সে হমনে দিল কো লগায়া... জো কুছ হ্যাঁয় সব তু হী হ্যয়...

হিমানী ঠিক জলপরী হয়ে ভিজতে থাকে, কী রূপ! হিমি রে, হিমি, মরলি তুই?

--মেডা-ম, তু ইশকুলে যাস্‌ নাই?


--আমার জ্বর গো চন্দুদিদি, কপকপি-জ্বর।


হিমানী বেড়াল-কুন্ডুলি সরু খাটিয়াতে। জাড়ের শুরুটা এমনধারা – কন্‌কনে, শুকনো। কোয়ার্টারে উইলাগা দরজা, ছাতাপড়া দেওয়াল, টালি-ছাদ। মায়া করে চন্দু কাঁথাটা গায়ে লেপে দেয়। শাপলারঙের মুখ থেকে ভাপ বেরচ্ছে। চন্দু মাথার কাছে বসে বাতাস করে। হুই মৈয়া – চোখ কপালে তোলে। খানিক পরে জ্বরের ধমক কমে, হিমানী চোখ খোলে। রুটি তরকারী বানিয়ে রেখেছে চন্দু, দুধ জ্বাল দিয়েছে।

--এন্‌দের আম্‌খি ইর্‌তাদি। মোখ্‌না মেডাম।

--খেতে ইচ্ছে নেই। লে জাও তুম্‌, পান্নু খেয়ে নেবে।

--জী। দুধ ওনায় মেডাম... আরাম লাগবে। মুন্নি কো তৈয়াই চি আয় মেডাম? মানা করো না।

--ইত্‌না সোচতী কিঁউ? ঠিক হয়ে যাব।


চন্দুর বস্তি মেলা দূর, হাঁটা পথ। হিমানীর জানালায় ধূধূ টাঁড়, চোখের হাতায় ইস্কুলবাড়ি – একতলা টালিঘর। চন্দু ইস্কুলে নানান্‌ কাজে একাই একশ। হিমানী ওকে রাতে থাকতে বলেনি তার ঘরে, যদিও কণিকা তাই চেয়েছিল। ফিরেছিল দুশ্চিন্তার বটুয়া বগলে, যেমন সব মা’দেরই হয়। অথচ না ফিরেও কী করে বা - ঘর-সংসার-যৌথ পরিবার, পরমুখাপেক্ষী বিধবা! হিমানী তাজা শালগাছ - মালভূমির রুখু মাটির। মরা বাপের মতো খাড়া জিদ!

খবর শুনে রাজরূপ মুম্বাই থেকে ফোন করেছিল,

--হিম, সচমুচ জা রহী হো? সরকারি নৌকরি বলে? বহুৎ সুনসান – জঙ্গল, ডর লাগবে! কি করে থাকবি?

--তো? তুমি থাকছ তো মানুষের জঙ্গলে! সেটা ভাল?


রাজরূপ যাবার আগে মাউথ-অর্গান হিমানীতে গচ্ছিত রেখে গেছে। গানগুলো ওতে চুপ। হিমানীর চামড়ায় নদী, বুকে পাথরফাটা ঝোরা। তাদের শহরের আগল পেরোলে আর তেমন বাঁধাধরা নেই, রাস্তা নেই। শূন্যের গায়ে নিচু পাহাড়ের ঢেউ লেপ্টে আছে। পায়ের তলায় কাঁকরমাখা ধুলো আছে, হাড়িয়া আছে, মহুয়া আছে, শাল – তাদের রক্তে, জন্ম থেকে। হিমানী আর রাজরূপের সম্পর্ক কোনওদিনই শেকলে নেই – নির্ভার।

--মেরা অর্গান – এবার ফেলে দিবি, হ্যায় না হিমি?

--চুপ রহো! ওতে তোমার...

--কেয়া? বোল্‌! থামলি কেন?

হিমানী আর বলে? রাজরূপের লালা, ঢেউ, স্বপ্ন, প্রাণ – কুয়াশার থলেতে ভরে দিয়েছে। যবে ফেরে, যদি ফেরে - কে জানে?


এ্যায় মালিক তেরে বন্দে হম্‌... ইয়ে হো হমারি করম - প্রেয়ার শেখায় হিমানী। বোবা চারাগুলো হাত জুড়ে, একবর্ণ না বুঝে কলের ঠোঁট নড়ে। বাদাড়ের সরলতা তাকিয়ে থাকে।

--এ মেডাম, মিড-ডে-মিল? মিড-ডে-মিল? আকুন চি আয় কি রা লগ্‌ গলি!

ইংরেজি শব্দটা শিখিয়েছে ভূখা পেট। হিমানীর চোখ উঠোনে। দাওয়ার শক্ত শালখুঁটিতে বাঁধা তার সাইকেল। আঙনে ছাউনির নিচে উনুন জ্বেলে খিচ্‌ড়ি চাপিয়েছে চন্দু। পট্‌পট্‌ করছে শুকনো কাঠ। ফুলকি উড়ছে।

হিমানী চটা-ওঠা বোর্ডে খড়ি দিয়ে হিন্দী লেখে,

--প-ঢ়া-ই... সুন, পঢ়্‌, পহ্‌লে পঢ়াই কর লে বচ্চোঁ!



(২)

কেউ বলতে পারে না – নামটাও পর্‍যন্ত! আজিম বা আসিম - ওরকম হবে একটা কিছু। কবে যেন কেউ জেনে ছিল। আসিম? না অসীম? হিমানী একথা ভাবে। পান্নারঙ উদোম মাঠ পেরিয়ে ঢিবি। কোত্থেকে জন্মে, নদীটা উঁচুনিচু পাথরের খোঁচাল খাঁজখোঁজ খুঁজে বছরওয়ারি ঝিরঝির। ইস্কুলঘর ছাড়িয়ে পঁচিশ পা - দু’টো বড় গাছ ঘন হয়ে এক। ওখানে ডেরা – কোন্‌ আমলের কোঠাঘর একখানা, হা হা করা কঙ্কাল।


ওরা কখনও বলে ‘চোরচোট্টা ডাকু’, আবার বলে ‘দেওতা, বড়া সাধুজী’, বলে ‘অপ্‌দেওতা, ভূঁত, শৈতান’। লোটা হাতে লোকটা টাঁড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে স্রেফ নেমে যায় নদীতে। ওপারে অনেক উঁচু টিলার মাথায় এত্‌টুকুনি মন্দির। পালাপাবর্ণে, ওধারের রাস্তায় ধরে ভক্তেরা ওঠে হাঁফিয়ে, ছেঁচড়ে। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্না চাদরে রূপোর জলে ভেসে দুঃখগুলো বিলাস হয়ে ভাসে। হিমানী ছটফটিয়ে যায় আগল খোলা বারান্দায়। মা পইপই করে সাবধান করে দেয় প্রত্যেকবার, ভয়ে কাঁটা।


পৌঁছে দিয়ে ক’দিন পরে চলে গিয়েছিল মা। একা রাত্তির, ভয় ঢিপঢিপ, কান্না পাচ্ছিল। মুন্নি ঘুমিয়ে কাদা, গায়ের কাপড়ে মাথা মুড়ে। বাইরে ইস্কুলবাড়ির দাওয়ায় সোম্‌রা, চন্দুর মরদ, নোংরা সাদা চুলে গাঁট্টাগোঁট্টা বুড়ো। গায়ে ছেঁড়া চট, কোমরে হাঁসুয়া। নেশায় বুঁদ। ঘুমের মধ্যে থেকে থেকে মাভৈঃ শোনায়। কথার ভাষা বোঝে না হিমানী, চোখদুটো কেমন বাবা-বাবা।

তুঝ সে হমনে দিল কো লগায়া... জো কুছ হ্যায় সব তু হী হ্যায়!

কোথায় শুনেছে গানটা, সেই কবে! বুকফাটা কালো আকাশে ভূমিকম্প। মেঘেরা গতি বাড়িয়ে, কুচিকুচি তারাদের তুলে লুকিয়ে রাখছে বুকে। হিমানী জানালা থেকে দৌড়ে এসে, চন্দুর বাচ্চা মেয়েটাকে ঠেলছিল,

--মুন্নি মুন্নি এ মুন্নি, গানা শুনতে পাচ্ছিস?

--মেডাম চু তায়... ও গান শুনতে নাই।

--কেন রে?

একচুলও নড়েনি মুন্নি মেয়েটা, যে কাতে শুয়েছিল তেমনই।


প্রায় রাতেই গান ভাসে। কথা বোঝা যায় না স্পষ্ট, ভাষা অচেনা, অন্য রকম। কেমনধারা সীমাহীন সমর্পন। হিমানী গান শেখেনি। সিনেমার কাওয়ালি সুর, সুফিগান বেজেছে রাজরূপের মাউথ-অর্গানে। হিমানীর ঘুম ভাগল বা। দেখে, আকাশ নেমে আসে পৃথিবীর খোলামেলা আদুড় গায়ে। গাঢ় গম্ভীর সঙ্গম ঝড়ে হিমানীর টালির ছাদ কাঁপে, বাঁশের খুঁটি নাচে। থরথর করে উঠোন চৌহদ্দি, স্কুলবাড়িটা উড়ে যায় না কি? হিমানী ঘরের সামনের দাওয়ায় বসে প্লাস্টিকের চেয়ারে। টিপটিপ করে ঘামের ফোঁটা চিবুক থেকে, শীর্ণ দীঘল লতা বেয়ে পায়ের আঙুল... শিরশির মোক্ষণ। অসাড় হাত-পা কোলে করে ভোর হয়ে যায়, হিমানীর আর ভয় করেনা। স্বর্গত বাবার শান্ত আঙুল কপাল ছুঁয়ে যায়, ভোরের দিকে ঘুম আসে।

কবে যেন রাজরূপের মাউথ-অর্গানটা সে বাড়িতে সযত্নে আলমারিতে তুলে রেখে এসেছে। রাজরূপ বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে। ক্রমশঃ তারা ধোঁয়াটে, নৈব্যর্ক্তিক। হিমানী বাড়ির ঠিকানায় অন-লাইনে অনেক বই আনে। মায়ের কাছে টাকা রেখে আসে। যদিও বাড়ি যাওয়া কম, মোবাইলে যা কথা শুধু মায়ের সাথে।

কোনও দিন গানের বদলে তারযন্ত্র শুধু বাজে। ছোট্ট জলে পাথর পড়ে, ঘূর্ণি অবিরাম। অন্ধকার মাঠে কারা নেচে বেড়ায়। ‘আমাগো ছুটকালে দ্যাশগাঁয়ে রাইতের কালে বাঁশি বাজাইতে আছিল না, পরী নাম্যা আইত’, বলত মায়ের ঠাকুমা। ওবাঙলার মানুষ, হাওড়ার বালিতে থাকত। হিমানী খুব কমবার গেছে মামাবাড়িতে।



(৩)
খ্বাজা মেরে খ্বাজা – দিল মেঁ সমা জা... খাদানে পড়ে যাচ্ছে হিমানী। জলস্তরে অগাধ ভারী জল। শুদ্ধ ব্রাহ্ম মুহুর্ত নদী থেকে উঠে এসে, প্রকৃতির ধ্বনি শোনে – টুকরো টুকরো নিয়ে এক, সম্পূর্ণ। কে ওই মানুষ? হিমানী স্কুলঘরের কপাটহীন জানালা দিয়ে অপলক – তাও মুখ দেখা যায়না। বাঁশ একটা, এলোমেলো চুল, খালি গা, হাঁটু অবধি গোটান পায়জামা। কী ইচ্ছে, একবার সামনে গিয়ে দেখে। ভয় ঢিপঢিপ, জড়তাও। যায় কি যায় না? এখানের মানুষ নদীর ওদিকে ভুলেও পা রাখে না, গায়ভৈঁসকে যেতে দেয় না, এমন ভয়। বৃষ্টিথামা পড়ন্ত দুপুরে ঢাল ধরে একলা হেঁটে যায় হিমানী সেই একদিন, সাইকেল নেয় না।


ভরা নদীর তীরের কাছে নাঙ্গা আধমানুষ – চরাচরে আর নেই কেউ। হিমানীর ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল, ছোটো ছোটো কালো চোখ টানটান তাকিয়ে থাকে। সেও ঠিক দেখেছে হিমানীকে, বর্ষার মেঘ বাজে,

--কউন হ্যায়?

--আপ কওন হ্যায় জী?

হিমানীর স্বর মৃদু না, মিষ্টিও নয়, পরিষ্কার, শীলিত। ভাঙাচোরা মুখ, চুলদাড়ি মোড়া কিম্ভুত মানুষ সামনে। ডান চোখ বন্ধ - দৃষ্টি নেই। বাঁ চোখের রশ্মি শিরদাঁড়ার হাড় ভেদ করে মজ্জায়। শিউরে উঠে হিমানী খপ করে দাঁড়ায়, উলটো হাঁটে একপা একপা। মুখোমুখি ভালো চোখটা নিয়ে একপা তার দিকে। তারপর থেমে থেবড়ে বসল ভেজা ঘাসে, বালিপাথর। কৌপিনটুকুর নিচে সিক্ত সঘন ঊরু, জঙ্ঘা, লোমশ। হিমানী তাড়াতাড়ি চড়াই বেয়ে ফিরে হাঁফাতে থাকে। অদূরে স্কুলঘরটা যেন আদিবাসী মিউজিয়াম, আপন আপন। ওখানে সাইকেল বেঁধে এসেছে খুঁটোয়। আকাশের জলে মাটির কোল ভরে সন্তান এসেছে। ছোটবেলায় পুজো দেখতে বাবার সঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশনে, বেলুড়েও একবার কবে যেন, মামাবাড়ি থেকে।

তুঝ সে হমনে দিল কো লগায়া!

খাটিয়ায় কেতরে পড়ে থাকে, আগড়ম-বাগড়ম ভাবে। সন্ধ্যে হয়ে এলে মুন্নি আসবে। শ্লেট, পেনসিল, হ্যারিকেন, কেরোসিন তেল, হিমানী শহর থেকে আনে। হিন্দী শিখছে মুন্নি। ওদের পরবে, তৌহারে খুব ভালবাসা আর আলোর গন্ধ - ওটুকু জৌলুস। সেও তাতে জুড়ে গেছে। কবীরের দোহা ইশকুলে পাঠ্য ছিল। একঢাল চেনা সুর মাঝ রাত্তিরে বয়ে এলে স্নান হয় রোজ। এমন যাপন! হিমানী রোজ বদলায় ফোঁটা ফোঁটা করে। একেক সময়ে মনে হয় তক্ষুণি ছুটে যায়, হানটান করে। আর, ভাবতেই শর্মিলি, ছি ছি! ইয়ে তেরা কেয়া হো রহা হ্যায় হিমি? রাত কেটে যায় উপোসী বিছানায়।


সে রাত্তিরে মুন্নি আসতে পারে নি, কার সাঙা ছিল ভেতর গাঁয়ে। সোম্‌রাবাবাও নেই। দিরিম দিরিম মাদল-ছন্দ নুয়ে নুয়ে মাটি ছুঁচ্ছে। বারান্দায় সে, আর ভুলু লেজ গুটিয়ে অঘোরে পায়ের কাছে। হলই বা হিমানী ‘পরবাসী বাঙালি,’ রক্তে ভাষার স্রোত যে আছে। সুর উথালি পাথালি একেবারে আচমকা। ঘরের পাশে আরশিনগর তাতে পড়শি বসত করে-! ওই সে...। দুলে উঠছে হিমানীর শাপলা শরীর, মহুয়া নেশার সুখে। কখন উঠোনে নেমে এসেছে, পথ ধরে এগিয়েছে, খেয়াল হয় নি। হৃদ্‌পিণ্ড ঢকঢকায়, গলা থেকে বেরিয়ে আসে যেন। অপার খোলা সুর বাতাসে বিদ্ধ - এমন গান। কতক্ষণ হিমানী পাশে দাঁড়িয়ে, বেকুবের মতো।

--ইধার কেয়া চাহিয়ে?

--কিছু না, গান শুনতে এসেছি।

--ও! বাঙালি? এখানে?

--এখানকার, মালভূমির, টাঁড়ের – বাঙলা বুঝতে পারি।


লোকটা হো হো করে বিকট হাসে, গায়ে বেঁধে। কেন হাসে? গলা শুকিয়ে গেছে হিমানীর। অনেক কথা বলে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

--আপনার নাম কি আজিম আসিম না অসীম?

--কি করে জানা হইল?

--মানে...!

--ও-ই। তিনটাই।

স্তিমিত শব্দ বড্ড ভারবাহী। হিমানী ভাবে, বসে কি হবে? গান গাইলেই তো পারে। জেগে থাকা চোখটা তার দিকে, বিঁধে আছে। তখন কিছু করার নেই। জলো বাতাস না-পাওয়াগুলো তুলে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কোথায় ফেলে দিচ্ছে কে জানে। হিমানীর ছোট কপালে কুচো চুল উড়ছে, কামিজের কোণ উড়ছে, শালের মাথা নড়ছে, পাতা ঝরছে – ঝড়-ঝড় ভাব একটা ... আমি একদিনও না দেইখলাম তারে।

--রবি ঠাকুর শোনা আছে? শান্তিনিকেতন যাওয়া হইছে?

হিমানী চেয়ে রয় – চুপ। কখন একরত্তি গোল সূর্‍যি গ্লুপ করে লাফ মেরে উঠল ওপার থেকে। অনেক দূর থেকে কেউ চেঁচাচ্ছে,

--মেডাম মেডাম মেডাম... কিঁউ উঁহা গয়ী? আ জা... মে-ডা-ম।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ইস্কুলঘরের কাছে মুন্নি, সাথে চন্দু। ভীষণ বিরক্ত লাগল, সে কি দুধের বাচ্চা?



(৪)

হিমানীর সোনু নিগম প্রিয়, এ আর রহমানও। অর্জিত সিং আর ফতেহ্‌ আলি খান। না তেমন বাঙলা জানে, না বোঝে উর্দু। আজকাল প্রায় রোজ এসে উবু হয়ে পাশে বসে থাকে। কোনও দিন কিছু শোনা হয়নি, বোধ হয়নি, ডোবা হয়নি। ছুঁয়ে যায় মেঘ, ছুঁয়ে যায় জলও – কিসের ইঙ্গিত, কোন্‌ দিশা দেখায়। সুরগুলো ধমনীতে লালনীল কাটাকুটি খেলে। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কী যে কষ্ট, কোথায় আঘাত! দুহাত তুলে মানুষটা গান শোনায়,

--খাঁচার ভিতর অচিন্‌ পাখি কমনে আসে যায় - ধরতে পারলে মনোবেড়ি...

--গানের মানে কি আছে? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে আজিম -।

--মানে দিয়ে কাজ কি? আমি আজিম না...

--তবে তুমি কি আসিম? অসীম? বলো না, বলো!

উত্তর আসে না। হঠাৎ চঞ্চল হয়ে পাথর ভেঙে তরতরিয়ে নামতে থাকে। নদীর পাশে খুলে পাড়ে ছুঁড়ে দেয় আধকাপড়টা। হিমানীর চোখ পড়লে দু’হাতে মুখ ঢেকে গোলাপ হয়ে ওঠে।


শাপলা পদ্ম হল কখন, কত তাড়াতাড়ি, হিমানী বুঝল না। সেই ছোটো হাত-আয়নাটা দিয়ে গেছে মা, সময় পেলে মুখ দেখে। সাজুগুজু করার জিনিসপত্তর নেই। সাজতে শেখেও নি। ভারী রক্ষণশীল বাড়ি তাদের। চুলের ঝোপকে জবরদস্তি করে বেঁধে ফেলে। চেপে রাখে – আহ্‌ বড্ড বেয়ারা। এত কোঁকড়া না হলে কি চলত না? মুন্নি বেশ হিন্দী পারছে আজকাল, একটু বাঙলাও। চন্দুও খানিক খানিক।

--মৎ জানা মেডাম। কিঁউ জাতী হো? ডর লগতা হ্যায়। কভী কুছ হো জায়ে তো...।

--ধুৎ, তুই খাতা বই নিয়ে আয়। যা তো।

--তেরি মম্মী পাস চলী জা মেডাম, ইয়ে কাম-ধান্দা ছোড়্‌ দে।

--পাগলে গেছিস? কল্‌ ভী মা ফোন করেছিল, ভাল আছি বললাম। তোরা আছিস না? বেকার সোচ্‌না মৎ!

--নহীঁ মেডা-ম, তু পগলি গয়ী... চলী যা ঘর্‌।


বাড়িতে এসেছিল হিমানী। দুটো ভালো চিরুনি, কাজলপেন্সিল কিনল। কণিকা মহাখুশি। মেয়ের কঠিন মুখে ইষৎ ঝিলিক, ঢলঢল লাবনি! মা তো, কিছু ভাবে, খোঁজে। জিজ্ঞেস করতে সঙ্কোচ হয়। সাতাশ-আঠাশের মেয়ে। অবেলার অবসরে পাশে এসে শোয়। বাহুতে নীরব মেয়ের কপালে হাত রাখতে যায়, হিমানী ঠেলে সরায়। জ্বর আসছে, বুঝতে দিতে চায় না মাকে।

--রাজ কি শিগগিরই ফিরবে রে হিমি? তাহলে যাব ওদের বাড়িতে কথা বলতে, তোর কাকামণি বলছিল।

--ওহ্‌ মা শোন, কাল আমি ফিরব, নতুন বইগুলো গুছিয়ে দিও তো।

--ওমা কালই কেন? বললি যে ছুটি আছে? রাজরূপ কবে... ঘুমিয়ে পড়লি? ঘুমো। আহা গো, খুব ক্লান্ত।

চোখ টিপে বুজে থাকে হিমানী। কণিকা মুখের পানে তাকিয়ে – চোখের কোল বেয়ে জল মেয়েটার। তপতপে মুখ।


(৫)

--এতদিন আসা হয়নি কেন?

--বারে, আমার ঘরবসত নেই নাকি? মা আছে, আরও...

--কি? পতি আছে? বর? মরদ?

--হী হী হী।

--পোলাপানের মতো হাসির কি মানে হয়?

--‘পোলাপান’? সেটার কি মানে? তোমার নাম বল না, বয়স বল না...! কোথায় তোমার ঘর?



রাগ হয়েছে - বুঝে ফেলে হিমানী। বিনা দ্বিধায় নেমে এসে পাশে বসে, হাসে। উদাস চোখটা ওপারের উঁচুনিচু ছুঁয়ে ফেরে, ফেরায় না। এধারটা বিষ্ঠা আর হাবিজাবি উচ্ছিষ্টে নোংরা, গন্ধ। ইঁট দিয়ে উনুন পাতা গাছের তলায়। হিমানী বাচ্চাদের মতো বলে,

--একটা জিনিস এনেছি।

--দিলেই হয়...

--হাত পাতো! গান শোনাও দেখি-।

--শ্যাষ রাইতে আসলে - আমি গান শুরু করব পরে।

--আউঙ্গি।

তেরে নাম সে জী লুঁ তেরে নাম সে মর্‌ জাউঁ – গাইতে গাইতে জঙ্গলের এক দিশায় চলে গেল মানুষটা। মন বেজার হিমানীর, রক্ত ফুটছিল। বারবার নিজের কাছে লজ্জায় মরে!


মুখোমুখি পাথরে নদীটার প্রায় মাঝ বরাবর গিয়ে ওরা বসেছে। দু’পাশে জঙ্গল, পাখিরা জেগেছে সবে। অনেকক্ষণ বলার মতো কথা ছিল না। মনের মধ্যে মৌমাছি গুনগুন করছে হিমানীর। কখন গান হবে? ঠিক সময়ে সমে পড়ল ভাবনা। ঐশ্বরীয় স্বর,

--আওয়াল হামাদ খুদা দা ভির্দ কী জায়... ইশ্‌ক কেতা সু জাগ দা মুল মিয়াঁ...! তারযন্ত্র অনুষঙ্গে – মিহি মেদুর।

নিস্তব্ধ হয়ে থাকে মেয়েটা। শব্দ মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সুরটা চুঁইয়ে আসছে বুকে। মানে কি এ গানের? হাওয়ায় শরীর ভিজছে। শেষ হল, তাও খেয়াল হয় নি ঘোরের মধ্যে। আলো ফুটছে এবারে।

--মানে বোঝা গেল?

--নহীঁ!

--ঈশ্বরের গান... খুদা সত্যই আছে... দুনিয়ারে ভালোবাসতে শিখাচ্ছে। ঈশ্বরকে ভালবাসতে শিখতে হয়, আর নবী হইল ঈশ্বর প্রিয়। খণ্ড খণ্ড মিল্যা অখণ্ড – পৃথিবী বেঁচে আছে অমন করে। বোঝা হল?

--তুমি কি সিঙ্গার, মানে গায়ক নাকি? কতবার যে জানতে চাইলাম-।

--ইশকুলের দেরী হয়ে যাবে না?



(৬)

টিলার ওপরের ছোট মন্দিরটা এপারে দাঁড়িয়ে আরও ছোটো দেখায়। শুনেছে ওখানে জাগ্রত বিগ্রহ। কতবার চন্দুকে সেধেছে, মুন্নিকেও। নিয়ে যেতে চায়নি। ক’দিন আগে ফোন করেছিল রাজরূপ। দুবছরের জন্যে বিদেশ যাচ্ছে। তার আগে সে আসবে, হিমানীর মতামত নিতে।

--আমার মতামত কি হবে? আগে তো কোই কিসি কা-

--বাত অভী দুসরা হ্যায়। কেন বুঝতে পারছিস না হিমি? আমরা আর বাচ্চা নেই।

--না! তোমাকে আসতে হবে না।

--তো! তু আএগী? কবে? তোদের ওখানে নাকি একটা ছোটো মন্দির আছে? দুজনে একসাথে দেখতে যাব।

--ফালতু কথা বলো না। ওখানে কেউ যায় না, লোক্যালাইটস্‌ ছাড়া।


সেই শেষ পহরে কুঁয়োর পাশে স্নান সেরেছে হিমানী। মায়ের কাছ থেকে আনা লালপাড় শাড়ি পরে, ভেজা চুল আঁচড়েছে। কাজল চকচক করছে চোখে। সঙ্গীর নাম জানা হয় নি, হয়ত বলবে। চেয়ে দেখে, তার উপহারের চিরুনি দিয়ে চুলদাড়ি আঁচড়ানর চেষ্টা করেছে সেও। পরণের ফতুয়াটা বাবার, মায়ের আলমারি খুলে লুকিয়ে এনেছে। হিমানী আড়দৃষ্টিতে, আর সে দেখছে একচোখের পূর্ণতায়। নদীর পাড়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল, হিমানীও। ভরসার শ্বাস নিয়ে, ঝিম-ধরা পায়ের নিচে ঠাণ্ডা জল ছুঁচ্ছে, এবার পাড়ি। কোত্থেকে রাত ভেঙে বিবেকের মতো আসছে মুন্নি। গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে,

--ইকিয়া কা দিন্‌ মেডাম? মত্‌ জানা, মত্‌ জা-না মেডাম!


কোন্‌ তিথি কে জানে, ঘুটঘুটে। তারাদের আকাশ। মাঝখানে কনকনে হাঁটু জল। শক্ত করে আঁকড়ে আছে হাত। ঢেউ বয়ে যাচ্ছে মাথা থেকে পা। আগুপাছু কিছু মনে পড়েনি, বিপদের কথা মাথাতে আসেনি। হিমি, তুঝে চুপকে সে কেয়া কুছ হো গ্যয়া? হিমহিম উদলা বাতাসে কাঁপছে দুজন, গরম কাপড় নেই গায়ে। পেছল পাথরে পা টিপে টিপে পেরলো জল। নতুন অভিজ্ঞতায় মশগুল হিমানী, টিলার সানুদেশে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস ফেলল। এধারে পাহাড়ের গায়ে পথ আঁকা নেই। ছোটো কাঁটাঝোপ, আলগা পাথরের টুকরো বেয়ে সাবধানে অনেক পথ চলে টিলার আগায় একরত্তি মন্দির। চূড়োয় পতাকা। লোহার গেটে তালা, জনপ্রাণী নেই। কখন খোলে, পুজো হয় কখন? টিলার মাথা থেকে নিচে চিত্রিত জন্নৎ, আকাশে লাল রঙের দু’একটা রেখামাত্র। নরম ঘাসে গুছিয়ে বসে।

--এখন গান করো অসীম... তুঝসে হমনে দিল্‌কো লগায়া, আর তোমার নামটা বল।

--আজ অন্য গান গাই!

--গাও, কি গান?


খোলা সুর পর্দায় চড়ছে। ভোর ফুটছে পরতে পরতে। চোখ বুজে আছে হিমানী। ভাসছে। ...পহলু মেঁ পলী বন্‌ কে যোগন চলী... মীরারাণী দিওয়ানী...! অনুভবের স্বীকৃতি প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে। পবিত্রবোধ করছে সে। ফুটে ওঠার ঠিক আগের ভরাট পদ্মের মতো তার গড়ন। ক-ত-ক্ষ-ণ! হঠাৎ শাড়ির আঁচলে টান - চমকে চোখ খুলেই, বুজে ফেলছে। দীর্ঘ দৃঢ় উদ্যত নগ্ন পুরুষ। ভোজালিটি একেবারে চোখের সামনে। হিমানী চিন্তা করে নি এমন অনিবার্‍য আশঙ্কার কথা। উৎসর্গের ভরপুর শান্ত মন এনেছিল, কিন্তু নিমিষে হতভম্ব সে। করার ছিল না কিছু, একেবারে অনুপায়। ভীষণ বিস্ময়ে দেখছিল, আস্তে-সুস্থে না, অসম্ভব তাড়াহুড়োয় একেকটি করে পাপড়ি খুবলে ছিঁড়ে নিচ্ছে খুব নরম ডাঁটা থেকে। ক্রমে কুকুরের লালসায় জিভের জল। এক সময়ে শরীর ধ্বসিয়ে হাঁফ জুড়োল আজিম বা আসিম বা অসীম। হিমানী নিচে চাপা, ধন্দে পড়ে বোকার মতো ভাবছিল, তা হলে কি...! এবার কি হবে? মানুষটা সঠিক নামটাও জানায়নি তাকে।

কুয়াশা ভোরে ভাঙনের স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছিল কণিকা। ইস্কুলের বারান্দায় রাতভর অপেক্ষায় ঝিমিয়ে পড়েছিল মুন্নি। তন্দ্রায় দেখেছিল বাড় এসেছে ইস্কুলের আঙনে। তার স্ফটিক শরীরে দুটি আকাশজোড়া ডানা, আবছা ধোঁয়াটে। মিলিয়ে গেল একটু পরে। সে হাঁ হয়ে গিয়েছিল। গাঁওয়ের মানুষ, তার মা বলেছিল, চুরৈল ভর করেছে লড়কীটাকে। সাত সকালে রাজরূপের হিরো-হণ্ডা প্রচণ্ড বেগে হাইওয়ে ধরে ছুটেছিল, হিমানীকে নিয়ে আসতে। মাঝ রাস্তায় জানজটের ভীড়ে থেমে যেতে হয়েছিল। ট্রাক-চাপা পড়েছে কে একটা উটকো লোক - হাতপা নাড়িভুড়ি দেহাংশ ছিটিয়ে আছে চারপাশে।


(৭)

সারা রাত জানালার শার্সিতে এ্যাবস্ট্রাক্ট নক্সা আঁকে মিহি বরফ। গাছের ডালে ঝুলে স্ফটিকের মতো। গায়ে গত্তি লেগেছে বেশ মা-মা মতো, হিমানী তাপিত ঘরে পালকের কম্বলের নিচে শুয়ে অলস চোখ খুলে রাখে। জানালার ঝাপসা কাঁচে দশটা আঙুলের ডগা দেখা যায় – থ্যাবড়া, নখ-ভাঙা, নোংরা। ধাক্কা মারে না, শুধু করুণ ছাপ ফেলে। ক্ষমা চায়? তারযন্ত্রটি বাজে না কি? পাশে নিশ্চিন্ত রাজরূপ অঘোরে ঘুমোয়। ছোটো কটে শিশু তাদের। হিমানী ওঠে, বসে, শোয় আবার। এমনি পার করেছে কত শেষ রাত। কড়া ঘুমের ওষুধের ক্রিয়া ফুরিয়ে যায় আধা-নিশীথে। রাজরূপের কাছে কতবার ওই প্রশ্ন নিয়ে – সে শোনে না, হাসে, উড়িয়ে দেয়। একচুল একটা তারের ফাঁক দুজনের। রাজরূপ বলে, দেশে ফিরে প্রথমে সেই টিলার ওপরে মন্দিরে যাবে তাকে নিয়ে। তা হলে? হিমানী কেবল ভাবে, হবে না। রাজরূপ করুণা করেছে, অনুগ্রহ। আর, ওদের বিশাল গাড়িটা কোনওদিন সে পথ ধরে যেতে পারবে না।


লেখক পরিচিতি
শ্রাবণী দাশগুপ্ত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।
এখন রাঁচিতে থাকেন।

৪টি মন্তব্য:

  1. " হিমানী গান শেখেনি। সিনেমার কাওয়ালি সুর, সুফিগান বেজেছে রাজরূপের মাউথ-অর্গানে। হিমানীর ঘুম ভাগল বা। দেখে, আকাশ নেমে আসে পৃথিবীর খোলামেলা আদুড় গায়ে। গাঢ় গম্ভীর সঙ্গম ঝড়ে হিমানীর টালির ছাদ কাঁপে, বাঁশের খুঁটি নাচে। থরথর করে উঠোন চৌহদ্দি, স্কুলবাড়িটা উড়ে যায় না কি? হিমানী ঘরের সামনের দাওয়ায় বসে প্লাস্টিকের চেয়ারে। টিপটিপ করে ঘামের ফোঁটা চিবুক থেকে, শীর্ণ দীঘল লতা বেয়ে পায়ের আঙুল... শিরশির মোক্ষণ। অসাড় হাত-পা কোলে করে ভোর হয়ে যায়, হিমানীর আর ভয় করেনা। স্বর্গত বাবার শান্ত আঙুল কপাল ছুঁয়ে যায়, ভোরের দিকে ঘুম আসে।" ...এটি গদ্য না কবিতা, আমি জানি না। গল্পটি, চলনে কোথাও ফ্রিজ শটের মতো, কোথাও রোদ-মেঘের স্বপ্ন-চাদর। শ্রাবণীর গল্পের মধ্যে এটি অন্যতম হয়ে থাকবে, আশা করি। ইচ্ছুক পাঠককে গল্পটি পড়তে বলব--ঠকবে না।

    উত্তরমুছুন
  2. Shudhu porhar jonye onek onek dhonyobad - baki shirodharjyo.
    Srabani.

    উত্তরমুছুন
  3. উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা
      শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

      মুছুন