বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৪

রমাপদ চৌধুরী'র গল্প : পোস্টমর্টেম

সক্কালবেলাতেই সতীশবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। আসলে ভোরের দিকে ইদানীং ঘুমটা পাতলা হয়, কেমন একটা আচ্ছন্ন ভাব নিয়ে পড়ে থাকেন। জানালার দিকে মাথা, বেশ ফুরফুরে বাতাস আসে ভোরের দিকে। এই না-ঘুম না-জাগা বাতাস মাখা সময়টুকু বিছানায় পড়ে থাকা সতীশবাবুর কাছে একটা উপাদেয় বিলাস। ঠুং-ঠাং বাসনের আওয়াজ, দরজা খোলা, কোথাও গয়লার ডাক, সবই কানে আসে। কিন্তু তেমন স্পস্ট নয়। তাই ঘুম-জড়ানো চোখ বুঁজেই থাকেন।

আজকের দিনটা ব্যতিক্রম।


বিস্ময়ে চোখ মেললেন। কান পেতে একটু অনুধাবন করার চেষ্টা করে বললেন, কি ব্যাপার বলো তো?

বেশ জোরে জোরে কাছেই কোথাও দরজার ধাক্কা দিচ্ছিল কেউ। কোন্ বাড়ি কে জানে। সতীশবাবু একটু বিরক্তই হচ্ছিলেন। মানুষগুলো আজব। কেউ কারো সুখ-সুবিধে দেখে না, কেউ অন্যের কথা ভাবে না।

ঘরে তখন আলো ফুটেছে, সতীশবাবু তাকিয়ে দেখলেন স্ত্রী কখন বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে। কাকে প্রশ্ন করছিলেন তবে? নিজেরই হাসি পেল।

আর ঠিক তখনই একটা মেয়েলি গলায় চিৎকার, ডুকরে কেঁদে ওঠা।

স্ত্রী অনেক ভোরে ওঠে। সংসারের কাজকর্ম।

সতীশবাবু দেখলেন স্ত্রী ছুটে এসে মাথার কাছের জানলায় উঁকি দিতে যাচ্ছে।

-কি ব্যাপার বল তো।

স্ত্রী চিন্তত মুখে বললে, কি জানি।

ব্যস্, তারপর অনেক ক্ষণপর আর কিছু জানাও যায়নি। কৌতুহল চাপা পড়ে গিয়েছিল।

বাসন মাজার ঝি এসে খবর দিল।-শুনেছেন বৌদি। লালবাড়ির একতলার বাবু গলায় দড়ি দিয়েছে।

সতীশবাবু জমকে উঠলেন, গলায় দড়ি দিয়েছে?

স্ত্রী বলে উঠলো, সে কি! ইস্, অবিশ্বাসের সুরে বললে, ঠিক শুনেছিস?

তারপর মেয়েটাকেই প্রশ্ন করে বসলো, কেন?

-কি জানি বাপু। কত লোক, পুলিশ এয়েছে।

সতীশবাবু জামায় মাথা গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। যেতে যেতে চিন্তিত মুখে বললেন, শেষে ধনঞ্জয়বাবু!

অবাক করার মতই ঘটনা। লোকটা, মধ্যবয়সী লোকটা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে।

যতক্ষণ না একটা মানুষ মরছে, সে মৃতপ্রায় হয়ে আছে কিনা কেউ জানতে চায় না। গলায় দড়ি দিয়ে মরলেই হাজারটা প্রশ্ন। কেন? কেন? কেন?

সতীশবাবু সঙ্কোচের পায়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এগোলেন। দোতলার বারান্দা থেকে ব্যানার্জিবাবু হাঁকলেন, এই যে!

সতীশবাবু গাঢ় তুলে তাকাতেই হাত দেখিয়ে থামতে বললেন। অর্থাৎ আমিও আসছি।

সতীশবাবু তখনই দেখতে পেয়েছেন গলির মোড়ে ছোট্ট একটা জটলা। পাড়ার দু’-চারজন, কয়েকটা ট্রাউজার পরা অল্পবয়সী ছেলে, বাজারের থলি হাতে ঝি-চাকর, একজনের হাতে একটা কেরোসিন আনার টিন।

ব্যানার্জিবাবু নেমে এলেন। চাপা গলায় বললেন, শুনলেন কিছু? কি ব্যাপার বুঝতেই পারছি না।

সতীশবাবু উত্তরের বদলে প্রশ্ন করলেন, মারা গেছেন, না কি...

-না, না, ইনস্ট্যান্ট ডেথ। গলায় দড়ি, বুঝলেন না। এ-সব কেস...স্লিপিং পিল হলে তবু কথা অনেক সময়...

সতীশবাবু মুখে একটা দুঃখের আওয়াজ করলেন, চ্। তারপর সমবেদনার গলায় বললেন, এত খারাপ লাগছে! এই গতকাল আমার সঙ্গে দেখ হ’ল, ওষুধ আনতে যাচ্ছি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ গল্প করলাম।

ব্যানার্জিবাবু বিষণ্ন হাসি হাসলেন।-সত্যি দু’বেলা দেখছি, কথা বলছি, কোনদিন মনেও হয়নি সেই লোক একটা কাণ্ড করে বসবে।

সতীশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।-কার কে কখন কি হয়! দিব্যি সুস্থ মানুষ। হাসছেন, গল্প করছেন, অফিসে যাচ্ছেন...

ব্যানার্জিবাবু বলে বসলেন, এই সুইসাইড জিনিসটা আজকাল এত বেড়ে গেছে। আসলে তো এক ধরনের লুনেসি, পাগলামি ছাড়া কি বললেন।

সতীশবাবু বিষন্ন হাসি হেসে বললেন, আমি তা অবশ্য তা মনে করি না। আসলে কার যে কখন কোথায় লাগে, কোন্ ব্যাপারটা কত অসহ্য হয়ে ওঠে...

-আমাদের কারো তো অভিজ্ঞতা নেই।

চমকে দু’জনেই ফিরে তাকালেন। পাড়ারই একটি ছেলে, বেশ ঢ্যাঙা, ফুলপ্যান্টের জন্যে আরো, সে পিছন পিছন আসছিল, লক্ষ্য করেননি। সতীশবাবু আর ব্যানার্জিবাবুর কাছে এরা এখনো ছোকরা। কারণ ওঁরা এখনো ফুলপ্যান্ট বলেন। ট্রাউজার্স মুখ দিয়ে বেরোয় না।

এই বয়সের ছেলেগুলোর সঙ্গে কেমন একটা লুকোনো রেষারেষি আছে যেন, পছন্দ করতে পারেন না। ঐ হাঁটার ভঙ্গি, শার্টের ডিজাইন, আচমকা পাশ থেকে বা পিছন থেকে কথা বলা, কোনোটাই ওঁদের ধাতে নেই। ছিল না। অভ্যবতা মনে করতেন।

ছেলেটার নাম সঞ্জয়। চেনেন। রাহাদের বাড়ির ছেলে।

ফিরে তাকাতেই সঞ্জয় আবার বললেন, লোকে বলে বোকামি। কেউ বলে পাগল। লোকটার পজিশনে গিয়ে কেউ তো বিচার করে না। কি বলেন?

ওঁরা দু’জনেই কথা যাতে না বাড়ে সেজন্যই বললেন, তা ঠিক।

বলেই স্পীড বাড়ালেন।

এসে পৌঁছলেন জটলার কাছে।

সুমন্তবাবু একটা নামী প্রাইভেট ফার্মে বড় অফিসার। ফুটফুটে সাদা পায়জামা, রিন-এর বিজ্ঞাপনের মত সাতা পাঞ্জাবী, পায়ে দামী নক্শা-প্যাঁচ কোলাপুরি চটি। হাতে সিগারেট।

ওঁদের দেখে বললেন, পুলিশ এসেছে শুনলাম।

ব্যানার্জিবাবুর সঙ্গে ওঁর আলাপ আছে, সতীশবাবু একটু এড়িয়ে চলেন, বোধহয় সুমন্তবাবুর পদমর্যাদার জন্যেই। বাড়িতে ইনভার্টার আছে সুমন্তবাবুর, লোড শেডিং হলে দু’খানা ধরের জানালা থেকে জ্যোৎস্না ঠিকরে পড়ে। সতীশবাবু সাধারণ।

সুমন্তবাবু বললেন, দেখে তো মনে হ’তো খুব সুখী পরিবার।

সুমন্তবাবুর উপস্থিতিতে সতীশবাবু একটু সঙ্কোচ বোধ করছিলেন, একটু বাধো বাধো ঠেকছিল, ভাল আলাপ নেই বলে।

তবু বললেন, না না, সে-সব কিছু মনে হয় না। আমি তো কালও গল্প করেরছি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আগে ওঁর বাড়িতেও গিয়েছি।

ব্যানার্জিবাবু বলে বসলেন, আঃ, সে যদি বলেন, নো ওয়ান ইজ হ্যাপি। তা হলে কি সবাই সুইসাইড করে বসবে?

সেই সঞ্জয় ছোকরা যে এখানেই এসে জুটেছে, কেউ লক্ষ্য করেন নি।

পিছন থেকে সে বলে বসলো, কে কতখানি আনহ্যাপি তার থার্মোমিটার তো আমাদের হাতে নেই।

সুমন্তবাবু হেসে ফেললেন, বেশ শব্দ করেই। তারপর সবাই সচকিত হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়েছে দেখে ব্রেক টেনে হাসিটা বন্ধ করলেন। আর ভিতরে ভিতরের সঞ্জয়েরর ওপর রেগে গেলেন। এ-সময় এই থমথম পরিবেশে ও-রকম একটা হাসির কথা বলে।

ব্যানার্জিবাবুই কথা ঘোরালেন।-ও-সব কথা কিছু নয়। সুইসাইড করলেই ঘর-সংসারের কথা ভাবতে যাওয়া বোকামি।

সতীশবাবু সায় দিলেন।-ঠিক বলেছেন। আরে মশাই, আত্মহত্যা করার হাজারটা কারণ থাকে।

সতীশবাবু ভিড়ের মধ্যে ততক্ষণে দত্তকে দেখতে পেয়েছেন। এক সঙ্গে তাস খেলতেন, এখন আর ও-সব পাঠ উঠে গেছে লোড শেডিংয়ের উৎপাতে।

দত্তকে দেখতে পেয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেলেন।

গিয়ে বললেন, কিছু শুনলেন?

-নাঃ, বোঝা যাচ্ছে না। ও সি বেরোলে যদি জানা যায়। চিঠিফিটি যদি কিছু লিখে রেখে গিয়ে থাকেন। ওঁদের চাকরটা নাকি বলছে সকালে উঠে ওঁর স্ত্রী...

পাশ থেকে একজন বললে, সে-রকম কিছু কান্নাকাটি কিন্তু শুনছি না।

সতীশবাবুর সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। বেশ ক্রুব্ধ ভুরু তুলে তাকালেন তার দিকে। কোন কথা বললেন না।

দত্তকে ফিসফিস করে বললেন, একটা লোককে জাজ করা এতই সহজ? কান্নাকাটি শুনছি না। এখন ওঁদের কত রকম ভয়, কত রকম ঝামেলা, এখন ওঁকে সন্তুষ্টু করার জন্যে বৌটাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদতে হবে। নুইসেন্স।

বলে ফেলেই নুইসেন্স বলতে চেয়েছেন না ননসেন্স, ভেবে দেখলেন।

দত্ত হাসলো। তারপর বললে, তাছাড়া স্ত্রী তো কান্নাকাটির পার্টি নয়। সিল্পভলেস ব্লাউজ পরেন, একটা ফ্যাশনদুরস্ত...

দত্ত বন্ধু লোক। তার মুখেও এ-ধরনের কথা সতীশবাবুর ভাল লাগলো না। মনে মনে ভাবলেন, শালা কি পৃথিবী। একটা লোক গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে, বৌটার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো, কোথায় সহানুভূতি পাবে, তা নয়, বৌটাকেই প্রথমে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।

সতীশবাবু আবার ব্যানার্জির কাছেই ফিরে গেলেন। সুমন্তবাবু তখনও দাঁড়িয়ে আছেন, তবু। ইতিমধ্যে আরো দু’-একজন জুটেছে।

কে একজন, সতীশবাবু চেনেন না, হাত-পা নেড়ে বলছে, আমার যদ্দুর মনে হয়, অফিসের ব্যাপার। ওঁর অফিসের এক ভদ্রলোক আমার চেনা, বলছিলেন, ওঁর ওপরওয়ালা কি একটা ইনসাল্ট করেছিলেন। সে অবশ্য অনেক আগের কথা...

সুমন্তবাবু চুরুটের ছাই ঝেড়ে বলে বসলেন, ইনসাল্টেড হলেই সুইসাইড করতে হবে? তাছাড়া এতদিন বাদে তো আর...

ব্যানার্জিবাবু বললেন, তা অবশ্য ঠিক, তখনই তো সুইসাইড করতে পারতেন!

আরেকজন ফোড়ন কাটলো, স্লিপিং পিল থাকতে থাকতে গলায় দড়ি...আজকালের দিনে দিনে শিক্ষিত মানুষ...

সুমন্তবাবু বললেন, না, সে-কথা বলতে পারেন না! গলায় দড়ি দেওয়ার টেন্ডেসি হতে পারে। টু মেক ইট সামথিং ড্রামা।

সতীশবাবু বললেন, যে-কোন সুইসাইড কিন্তু যে-কোন একজনকে অথবা একধিক ব্যক্তিকে অ্যাকিউজ করা।

ব্যানার্জিবাবু বলে উঠলেন, বাঃ তা কেন হবে? চিঠি লিখে সে-কথা বলে গেলে অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না। তবে, জীবনে বীতস্পৃহ হয়েও কেউ কেউ আত্মহত্যা করে।

-সেটাই বেশি। সুমন্তবাবু বললেন।

দত্ত কখন এ-দলে এসে হাজির হয়েছে সতীশবাবু করেন নি। লক্ষ্য করলেন তার কথা শুনে।

দত্ত বলে উঠলো, কিছু লিখে না রেখে গেলেই যে কাউকে অ্যাকিউজ করা হয় না, তা নয় কিন্তু। যেখানে লিখে রাখা মানে নিজেরই লজ্জা বা অপমান...

সুমন্তবাবু চুরুটে টান দিয়ে বললেন, মরেই যখন যাচ্ছে তখন আবার লজ্জা বা অপমানের কথা কি কেউ ভাবে নাকি!

ব্যানার্জিবাবু আপত্তি করলেন।-সে কি কথা বলছেন! মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব কি শেষ হয়ে যায়? তার পরের কথাও মানুষ ভাবে।

কে সায় দিয়ে বললে, পরের কথাই বেশি ভাবে! অভাবে দারিদ্রে কত লোক তো সুইসাইড করে। এমনি কি প্ল্যান করে বৌ-ছেলেমেয়ে সকলকে নিয়ে। তা হ’লে চুরি-ডাকাতি করে তাদের টাকা এনে দিয়েও তো সুইসাইড করতে পারতো।

-আসলে সে সময় কি আর অত ভাবনাচিন্তা করার মত অবস্থা থাকে। কে একজন বললে।

সতীশবাবু তাকালেন তার দিকে, সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন। তারপর হঠাৎ বলে বসলেন, আমার কিন্তু মনে হয় সুইসাইড একধরনের প্রতিবাদ।

-প্রতিবাদ? প্রোটেস্ট? সুমন্তবাবু হেসে উঠলেন।

এই চুরুটখেকো লোকটা ভাল চাকরি করে, ভাল মাইনে পায়, গাড়ি আছে, সে-জন্যেই যেন মাটি না ছুঁয়ে দু’ ইঞ্চি ওপরে ভেসে ভেসে হেঁটে বেড়ায়। ভাবখানা এমন, যেন হাঁটা অভ্যাস নেই। আর কথা বলার সময় ধরে নেয় শেষ কথাটা ওর কাছেই শোনবার জন্যে সবাই যেন উন্মুখ হয়ে আছে। অথচ লোকটার সাধারণ বুদ্ধি কত কম। একটা সহজ কথা ঠিক ধরতেও পারে না, বুঝতেও পারে না।

সতীশবাবুর তাই জিদ চেপে গেল। বললেন, হ্যাঁ, তাই, প্রোটেস্ট। যে কোনো লোকের বিরুদ্ধে হতে পারে, যে-কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

ব্যানার্জিবাবু দু’পক্ষ রাখার মত করে বললেন, হ্যাঁ, হতেও পারে। যেমন অভিমান বা রাগ। ইনসালটেড হলেও অনেক সময়...

সতীশবাবু বললেন, সেগুলোও প্রতিবাদ। আইনের বিরুদ্ধে হতে পারে, সমাজের বিরুদ্ধে হতে পারে, আবর ভগবানের বিরুদ্ধেও।

সকলেই হেসে উঠলো, যেন হাসিরই কথা।

সতীশবাবু দমে গেলেন! মনে মনে ভাবলেন, এই সহজ কথাটা এরা বুঝলো না কেন!

দত্ত কৌতুকের স্বরে বললে, তা হ’লে পাড়া-প্রতিবেশীর বিরুদ্ধেও হতে পারে, কি বলো। বলে হাসলো।

ব্যানার্জিবাবু বললেন, দেখবেন মশাই, শেষে আমাদেরও জড়াবেন না যেন।

এই সময়েই ও সি ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে একজন সনেস্টবল্।

সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো।

ও সি বললেন, এই যে আপনারা রয়েছেন। দু’জন কেউ আসুন তো।

অমনি সুমন্তবাবু বলে বসলেন, আমার তো আবার ট্রাঙ্ককল আসার কথা, বুক করে রেখেছি, দিল্লিতে...

ব্যানার্জিবাবু বললেন, বাজার যেতে হবে...

দত্ত বললে, আমার আবার আটটায় মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতে হবে...

আসলে এই সব কারণেই তো কেউ ভিতরে ছোকেনি। যদিও সবারই চাপা কৌতূহল ভিতর সম্পর্কে! ধনঞ্জয়বাবুর লাশ কি নামানো হয়েছে, নাকি এখনো ঝুলঝে। ওঁর স্ত্রীর মুখখানা এখন কি রকম। সত্যি কি খুব দুঃখ পেয়েছে? কিসের দুঃখ। স্বামী আত্মহত্যা করছে বলে, নাকি ওর ওপর অভিমান বশেই সুইসাইড করেছে বলে! হাজারো প্রশ্ন।

সবাই আরজি, ও সি সতীশবাবুর দিকে তাকিয়ে বললে, আপনি চলুন।

সতীশবাবু সকলের মুখের দিকে তাকালেন, একটু বিভ্রান্ত বোধ করলেন, আবার কি ঝামেলায় পড়লাম গোছের মুখের ভাব ক’রে অসহায়ের মত বললেন, চলুন।

আসলে কোন একটা অজুহাত চট্ করে ওঁর মাথায় এলো না।

সুমন্তবাবু, ব্যানার্জিবাবু, দত্ত-সবলেই দু’পা দু’পা করে পিছিয়ে যাচ্ছিল। যেন চলেই যাচ্ছে। সতীশবাবু রাজি হয়েছেন দেখেই সকলে থেমে পড়লো।

সুমন্তবাবু এক-পা এগিয়ে এলেন। ও সি-কে প্রশ্ন করলেন, কোনো চিঠি-ফিটি রেখে গেছেন?

ব্যানার্জিবাবু বললেন, কিছু জানতে পারলেন?

দত্ত বললে, আমাদের অফিসের এক ভদ্রলোক, কেউ সন্দেহই করেনি, ভেতরে ভেতরে ধার-দেনায় ডুবে গিয়েছিল, শেষে বারো তলা থেকে লাফিয়ে...

ব্যানার্জিবাবু বলে উঠলেন, ইস্।

যেন বারো তলা থেকে লাফিয়ে পড়া লোকটার থেৎলেনো চেহারার রক্তমাংস চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন।

সুমন্তবাবু হাসলেন।-ওঁর মতে এটা বোধহয় কাবুলিওয়ালার বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট।

সতীশবাবু একবার ফিরে তাকালেন, উত্তর দিলেন না।

দত্ত বললে, সুইসাইড-এর কোন নিয়ম আছে নাকি। পরীক্ষায় ফেল করলেও তো সুইসাইড করে।

ব্যানার্জিবাবু বললেন, সে-জন্যেই তো বলে টেম্পোটারারি ইনস্যানিটি।

-আপনার কি মনে হচ্ছে? ও সি-কে সুমন্তবাবু আবার প্রশ্ন করলেন।

আর ও সি বিরক্তমুখে ফিরে তাকিয়ে সুমন্তবাবুর সাদা ফুটফুটে পাঞ্জাবী-পাজাড়া, আঙুলের ডগায় চুরুট এবং ভারিক্কি চেহারা দেখেই মুখে হাসি আনলেন।

বললেন, কি জানি। কিছুই তো পেলাম না। বাড়ির লোকও কিছু বলতে পারছে না।

একটি লোক এগিয়ে এলো।-মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপার নয় তো? আমি কিন্তু ওঁকে একদিন আলিপুর কোর্টে দেখলাম, উকিলের পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন...

ও সি তার দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না। কোনো কৌতূহলও দেখালেন না। শুধু সতীশবাবুকে বললেন, চলুন।

ও সি আর সতীশবাবু ভিতরে ঢুকে গেলেন।

তা দেখে আরো দু’জন তাঁদের পিছনে পিছনে গেল। বোধহয় নিজের চোখে লাশটা দেখার লোভে। কিংবা ধনঞ্জয়বাবুর স্ত্রীর যথেষ্ট শোক হয়েছে কিনা দেখে আসার জন্যে।

পাড়ার কে একজন ফিসফিস করে পাশের লোককে বললে, একদিন কিন্তু দেখেছি, খুব বৃষ্টি, ট্যাক্সিতে আসছিলেন।

পাশের লোকটি বললে, তাতে কি হয়েছে।

-না মানে, এক মহিলাও ছিলেন। স্ত্রী নয়।

তখন একটি মেয়ে, নোংরা শাড়ি, পায়ে কাদা, ধনঞ্জয়বাবুদের কাজের লোক, বেরিয়ে বিভ্রান্তের মত এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজলো।

কে একজন বললে, ঐ তো, ওঁদের বাড়িতেই কাজ করে। ঠিকে ঝি। জিগ্যেস করুন না।

ব্যানার্জিবাবু ডাকলেন মেয়েটিকে।

মেয়েটি এগিয়ে এলো।-আমায়?

-হ্যাঁ, হ্যাঁ।

সেই ফুলপ্যান্ট ছোপছোপ শার্ট রাহাদের ছেলেটা এগিয়ে এলো। বললে, কি হয়েছিল বাবুর?

-তা কি করে জানবো গো বাবু। কাঁদো কাঁদো মুখে মেয়েটা বললে।-আমি তো এয়েছি একটুন আগে। এসে দেখি হুলুস্থুলুস চলছে।

সুমন্তবাবু রাশভারী গলায় বললেন, কিছু ঝড়াঝাটি হয়েছিল?

-তা কি করে জানবো গো! আমি কি ওঁদের ঘরে শুই।

একটু থেমে বললে, দু’টো বাসন গায়ে গায়ে থাকলে ঠুংঠাং করে, আর পতি-পতিন থাকলে হবে নি? তা বলে গলায় দড়ি দেয় কেউ?

ব্যানাজ্যিবাবু আবার কি জেগ্যেস করতে যাচ্ছিলেন, আর আগেই মেয়েটা বলে বসলো পথ ছাড়েন দেখি, কি বলতে কি বলবো, পুলিস আছে। গিয়ে পুলিসকেই জিগ্যেস করেন না।

বলে ভিড়ের ভেথর দিয়ে দপ্ দপ্ করে পা ফেলে এগিয়ে গেল, একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পেয়েই তার হাতখানা ধরে পিঠে একটা বেদম চড় কষিয়ে দিলো।

কাছে বস্তিটায় মেয়েটা থাকে, ভিড় দেখে পাঁচ বছরের ছেলেটাও ঘর থেকে চলে এসেছে।

ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে তাকাতে তাকাতে চোখে হাতের মুঠো ঘষতে ঘষতে চলে যাচ্ছিল, মেয়েটা, মানে ছেলেটার মা চেঁচিয়ে বললে, বাবুদের মতন হুজুগে দেখতে এয়েছেন। মের পিঠের চামড়া তুলে নেব তোর।

সুমন্তবাবু পিঠে হাত দিলেন, পিঠ চুলকোলেন বোধ হয়।

কথাটা সবারই গায়ে লাগলো। সবাই ভাব দেখালো যেন শুনতে পায়নি। কিংবা বুঝতে পারেনি।

সুমন্তবাবু বোধহয় অস্বস্তি কাটাবার জন্যেই বললেন, এ এক ধরনের এসকেপিস্ট মেন্টালিটি। এই সুইসাইড।

পাশ থেকে কে একজন বললে, আসলে এ-সব লোক একটু কাপুরুষ হয়। জীবনকে ফেস করতে ভয় পায়। আরে জীবনে সবই তো আছে, ভালো মন্দ, বিপদ আপদ, সুখ দুঃখ, শুড ফেস ইট, ফাইট ইট।

কে একজন বসিকাত করলে, জীবনযুদ্ধ।

রাহা ছেলেটি ঠাট্টার ঢঙে বললে, হ্যাঁ বিপ্লবী হতে হয়। আমরা সকলেই তো বিপ্লব করছি, অথচ এই কাপুরুষগুলো...

সুমন্তবাবু আর ব্যানার্জিবাবু সরে যাচ্ছিলেন। এইসব ছেলে-ছোকরাগুলো সম্ভ্রম রেখে কথঅ বলতে জানে না। আনকালচার্ড হলে যা হয়। আসলে এসকেপিস্ট ব্যাপারটা জানেই না।

-চলুন, চলুন। সুমন্তবাবু ব্যানার্জিবাবুকে বললেন।

কে একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, যার বাজে সে বোঝে। কার কোথায় কষ্ট, কতখানি কষ্ট, তা কি আমরা বুঝি না!

ঠিক তখনই ও সি আবার বেরিয়ে এলো। পিছনে পিছনে সতীশবাবু আর দত্ত।

ওঁরা সতীশবাবু আর দত্তকে ঘিরে ধরলেন।

ও সি বললে, ভ্যানটা এখনো এলো না। পোস্ট-মর্টেম হবে, দেরী করলে আজ আর ডেড বডি দেওয়াই যাবে না।

এই সময়েই একজন সাব-ইনন্সপেক্টর এসে হাজির হল। খাকি পোশোক দেখেই ভিড় দু’ফাঁক হয়ে রাস্তা দিল।

-লাহিড়ি তুমি থাকে, আমি চললাম। ও সি বললে।

চলে গলে।

লাহিড়ি গট গট করে বাড়িটার ভেতর ঢুকলো।

ব্যানার্জিবাবু সতীশবাবুকে প্রশ্ন করলেন, কিছু শুনলেন?

সুমন্তবাবু দত্তকে বললেন, সুইসাইড তো?

কে একজন বললে, তা হলে পোস্টমর্টেম কেন?

সমন্তবাবু তার দিকে ফিরে তাকিয়ে ফেললেন।-ওটা নিয়ম।

সতীশবাবুকে খুব বিষন্ন দেখালো।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, উঃ, ধনঞ্জয়বাবুর স্ত্রীর মুখের দিকে তাকনো যাচ্ছে না। পাথর, পাথর হয়ে গেছেন।

দত্ত কার সঙ্গে যেন চোখাচোখি করে চোখ টিপলো।

তারপর ধীরে ধীরে বললে, হ্যাঁ, খুব শোক পেয়েছে! পাবারই কথা।

সতীশবাবুর দিকে ফিরে তাকালো দত্ত। বললে, কিন্তু দেখলেন, চাকরটা চায়ের কাপ নানালো, ওঁর স্ত্রী কেমন কাপটা নিয়ে চায়ে চুমুক দিলো।

সতীশবাবু বললেন, উনি কি আর জেনেশুনে খেলেন? ও তো যন্ত্রের মত, দেখে বোঝাই যাচ্ছিল উনি যেন ওঁর মধ্যে নেই।

দত্ত বললে, রাতে পরে শুলে তো কুঁচকে থাকার কথা...

সতীশবাবু বিরক্ত হলেন।-তোমার কি দেখে মনে হল পাটভাঙা শাড়ি পরেছেন?

-না, তা নয় অবশ্য। তবু...

তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করলে, আপনি যে বলছিলেন, দরজা ধাক্কা দেওয়ার শব্দ শুনেছেন।

রাহা ছেলেটা বললে, আমি কিন্তু শুনলাম, পাড়ার লোকদের বিরুদ্ধে কি-সব লিখে রেখে গেছেন...

-কে, কে বললে? সুমন্তবাবু বলে উঠলেন।

ছেলেটা বললে, ও সি যাবার সময় নাকি কাকে বলেছে।

বলেই সেখান থেকে চলে যেতে যেতে শব্দ করে অট্টহাসি হেসে উঠলো।

সকলেই বুঝলো আসলে রসিকতা। রেগে গেল। সুমন্তবাবু বললেন, যত সব রকবাজ।

ব্যানার্জিবাবু বললেন, এমন একটা সিরিয়াস ব্যাপার, রসিকতা আসে কি করে, বুঝি না।

এই সময়েই হর্ন শোনা গেল।

কে বলে উঠলো, ভ্যান এসে গেছে।

দু’জন কনেস্টবল, দু’জন মুদ্দোফরাস।

এস আই ভদ্রলোক ভিতরে চলে গেলেন। তাঁর পিছনে পিছনে ওরাও।

বাইরে সকলেই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলো ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িটার দিকে। কেউ কোনো কথা বললো না। চুপচাপ।

এখনই তো ডেডবডি বের করে আনবে। সবাই উৎসুক চোখে অপেক্ষা করলো।

আর তখনই তীব্র কান্নার শব্দ ভেসে এলো। দু-তিনটি কান্না।

সতীশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ধনঞ্জয়বাবুর মেয়েটার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। ঐ টুকু একটা মেয়ে।

দত্ত বললে, ওঁর মা, বুড়ি মা তো পাথর।

সুমন্তবাবু বললেন, ওরাই কাঁদছে।

মুদ্দোফরাস দু’জন প্রথমে বেরিয়ে এলো। একটা স্ট্রেচার বয়ে নিয়ে। স্ট্রেচারে ধনঞ্জয়বাবু ডেডবডি, চাদর ঢাকা।

ব্যানার্জিবাবু বললেন, সে ছোটাছুটি করছে। পোস্ট-মর্টেম যাতে না হয়।

-কেন? কেন? দু-তিনজন বলে উঠলো।

দত্ত বললে, আবার কাটাছেঁড়া! কে চায় বলুন।

-ও তাই বলুন।

সতীশবাবু বললেন, ইনফ্লুয়েন্স থাকলে হয়।

ব্যানার্জিবাবু দুঃখের হাসি হাসলেন।-কি ঝামেলা, দুঃখ করারও সময় নেই ছেলেটার। শোক করার উপায় নেই। বাপ মারা গেছে, এইভাবে মারা গেছে, এখন ঝামেলা সামলাও।



ডেডবডির মুখ ঢাকা। চাদরে।

তবু সবাই ঘাড় উঁচিয়ে এমনভাবে তাকালো, যেমন মুখটা দেখা যাচ্ছে।

কনেস্টবল আর এস-আই বেরিয়ে এরা বেশ খানিকটা পরে।

ওদের পিছনে পিছনে শুধু ধনঞ্জয়বাবুর বাচ্চা মেয়েটা। কে একজন, ওদেরই আত্মীয় বোধহয়, মেয়েটাকে দু’হাতে জোর করে আটকালো। ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

এখন আর বুজি মা’র কান্না শোনা যাচ্ছে না।

সব চুপচাপ।

পুলিশ চলে গেল। ভ্যানে গিয়ে উঠলো! স্টার্ট দেবার আওয়াজ। হর্ন। শব্দ করের চলে গেল।

-ব্যাপারটা কি, ঠিক বোঝা গেল না। সুমন্তবাবু বললেন।

ব্যানার্জিবাবু বললেন, হুঁ।

সতীশবাবু বললেন, চলি, বাজার যেতে হবে।

দত্ত বললে, আপিস আছে।

একে একে সকলেই যে যার পথ নিলো।

কারো মনে যেন শান্তি নেই।

রাহাদের সেই ছোকরাটি হঠাৎ বলে উঠলো, লোকটা মশাই নিজেকে এক্সপ্লেন করে গেল না।

দু’জন হেসে উঠলো।

কে একজন প্রশ্ন করলো, পোস্ট-মর্টেম ঠেকাতে পারবে তো ছেলেটা? তা হলে এখনই সৎকার করতে পারবে।

ব্যানার্জিবাবু প্রতিধ্বনি তুললেন যেমন।-পোস্টমর্টেম।

দত্ত বললে, ঠেকাতে পারবে না। গলায় দড়ি বলে ব্যাপার।

সবাই চুপ করে রইলো।

সকলেই যেন মনে মনে বললো, ঠেকাতে পারবে না।

পুলিসের, মর্গের ডাক্তারের কাটাছেঁড়া করা যেতেও পারে। কিন্ত...



রাহা ছোকরা হাসতে হাসতে বললে, আমরা ছাড়বো কেন? অ্যাঁ? পোস্ট-মর্টেমের কথা বলছি। ব’লো আবার হেসে উঠলো। শব্দ করে। ০

------------------------------------------------------------------------------
পোস্ট মরটেম গল্পটি নিয়ে কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রের আলোচনা
লিঙ্ক

1 টি মন্তব্য:

  1. সুতোর টান এমন যে শেষ পর্‍যন্ত ঝুলতেই থাকি। সব মৃত্যুই কি রহস্যের দ্যোতক? শ্রদ্ধেয় লেখক মানুষের চরিত্র এমনভাবে লেখেন, যে নিজেরাও ধরা পড়ে যাই। অসাধারণ!
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন