বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৪

নাহার মনিকা'র গল্প : বাতাস মূর্তিমান

দুপুর পার হওয়া রোদ আরো বিনীত, যদিও অপেক্ষা আমাদের ত্বকে বিন্দু বিন্দু ঘামের জন্ম দিয়ে চলে। ফুটপাত ঘেষে ঘ্যাচ করে অন্যান্য রুটের বাসগুলো থেমে বাচ্চাকাচ্চা, মহিলা আর মানুষকে বাস থেকে দ্রুত নামায় আর ঢেকুর তোলার মত টেনে বাসে তোলে কিন্ত আমাদের কাংখিত দূরপাল্লার বাসটির দেখা মেলে না, তাকে দূরের বাস ডিপো থেকে আসতে হবে। এমন সময়ে এক পশলা কথা উল্টোদিকের যানবাহন থেকে ভেসে এসে ঠান্ডা ঠুন ঠুন শব্দে কানে বাজে আর আমাদেরকে বাসের পথ চেয়ে থাকার বিরক্তি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। প্রথমে ফতুয়া পরা মিষ্টি চেহারার মেয়েটির দিকে চোখ পড়ে, যে, ঠোঁট টিপে হাসে, -‘শাড়ি পরে দৌড়ানো তো কঠিন ব্যাপার শিউলি মামী! অবশ্য স্বপ্নেতো কত কিছুই সম্ভব’,-তার রসিকতাকে পাশ কাটিয়ে শিউলি, মেয়েটির কাছ থেকে যার নাম জেনে যাই, চেহারায় বহুবর্ণী অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে কখনো মেয়েটির মুখের দিকে তাঁকিয়ে, কখনো নিচে বা আশ পাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে তার স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলে যায়, সে একটা বেগুনী ফণার কথা বলে, যা থেকে হিস-হিস করে দ্বিখন্ডিত জিভ যুগপৎ বাইরে বেরিয়ে আবার ভেতরে ঢুকছে, খয়েরী, কালো ইষৎ চ্যাপ্টা-চিকন দেহ ক্ষিপ্রগতি আটকে রেখে এক লোকের দুই হাতের মধ্যে ছটফট করে, লোকটি অর্থপূর্ণ হাসি হেসে ডাকে- ‘শিউলী, ও শিউলী আসো কাছে আসো, ধরে দেখো কেমন ঠান্ডা আর পিছলা শরীর, কে বলবে এই জানোয়ার জলে স্থলে সবখানে বিচরণ করতে পারে!আর এর মাথা এত ঠান্ডা!’- শিউলী ঘরের চৌকাঠে আটকে থাকা এক থোক রোদের ওপর ভেজা পায়ের ছাপ ফেলে তীব্র চিৎকারে পিছু হটে। লোকটা শিকার ফসকে যাওয়ার দৃষ্টি চোখে ঝুলিয়ে এক লাফে বার্ণিশ করা মেহগনির খাট থেকে নামে আর শিউলীকে ধাওয়া করে, শিউলী দৌড়ায়, উঠোন পার হয়ে শুকনো খালের ততোধিক শুকনো কচুরীপানার স্তুপ মচমচিয়ে মাড়িয়ে বড় রাস্তায় উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে একটু দম নিতেই লোকটার টাক মাথার আভাস রাস্তার ঢাল বেয়ে উঠতে থাকলে শিউলী আর থামেনা, আবার উর্ধশ্বাসে দৌড়ায়। লোকটার দুই হাত চৌকো ভঙ্গি সাপের ঝাঁপির মত, তার শাদা পাঞ্জাবীর কোনা ছেঁড়া ঘুড়ির মতো ওড়ে, শিউলী ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকায় আর ছোটে, তার আঁচল ওড়ে, ফর্শা, গুড়ি গুড়ি ঘাম জমা নাকের ফুটো বড় হয়ে অধিক বাতাসের পথ প্রশস্ত করলে তাকে আরো হাঁপাতে হয়, পরনের কাপড় শুকনো ডাল পাতায় আটকে গেলে সে তা গোটানোর জন্য উবু হয় আর এমন সময় লোকটার বাঁ হাত তার কাঁধ আঁকশির মত আটকে তাকে টানে, ডান হাতে জিভ ওগরানো প্রানী শিউলীর চোখ বরাবর ক্ষুধিত আর স্বার্থান্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। বন্ধ চোখে চিৎকার দেয়ার উপক্রম হলেও শিউলি তার চিৎকার কোথাও ছড়াতে পারেনা, নির্গমনের পথ না পেয়ে দৈত্যর মত সশব্দ অনুভূতি বুকের ভেতর এপাশ থেকে ওপাশ আর ওপাশ থেকে এপাশ একটা বিশালাকার গোলক হয়ে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু করলে শিউলি তার বুকের মধ্যে অচেনা এক ব্যথাবোধ দু হাতের দশ আঙ্গুল দিয়ে খুবলে বাইরে বের করতে চায়, তার দু চোখের মনি ঠেলে বেরিয়ে আসে আর ভয়ার্ত চিৎকারটি প্রসবের আগে প্রতিবারই স্বপ্নের এ পর্যায়ে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।

শ্রোতা মেয়েটি, শিউলি যার কোন এক সম্পর্কের মামার সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ, তার বাস চলে এলে সে শিউলির স্বপ্ন বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ বঞ্চিত হয়ে চলে যায়। মেয়েটি চলে গেলে আমাদের মধ্যে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন দেখা দেয়। স্বপ্নের লোকটা কে? সেকি কোন পরিচিত পুরুষ যাকে ঘিরে তার দুঃস্বপ্ন জন্ম নেবার মত প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে? শিউলি এমন ভঙ্গীতে তার স্বপ্ন বলে, যে ভঙ্গীর মানে খুঁজতে আমাদের আরো গভীর মনযোগের দৃষ্টি দিতে হয়। তার সামান্য ভাসা ভাসা চোখ আর তার নীচে কালির একটা আপাতছায়া আমাদের রোদ্রাক্রান্ত আঠালো ত্বকে সাময়িক শান্তি বুলিয়ে দিলে আমরা আরো মুখরোচক কোন গল্পের আকাঙ্ক্ষায় অপ্রত্যাশিত এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার বাসটি দেরি করেই আসুক।

শিউলির মুখ দেখে যা বোঝা যায় না তা হলো তার বয়স। এই রকম একটা বয়সে মানুষ কিছু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ কিংবা মরণোপযুক্ত একটা বয়সের অবয়ব ঝুলিয়ে শিউলী যখন বাসের জন্য অপেক্ষা করে, তখন দেখি যে, সে না তরুণী না যুবতী, কিংবা না প্রৌঢ়ার মাঝামাঝি একটা বয়সে আটকে আছ, তার স্বপ্ন বয়ানের যতটুকু আমরা শুনতে পাই, তাতে তার স্বামী থাকলেও থাকতে পারে, স্বামী পরিত্যাক্তা হবার সম্ভাবনাও নাকচ করা যায় না। তৃতীয় সম্ভাবনা,-এই মেয়েটির পাণিপ্রার্থী হয়ে কোন যুবক হাত বাড়ায়নি, এটিকে আমরা কেউই তেমন আমলে আনি না। সেই সূত্র মেনে আমরা তার স্বপ্নে বর্ণিত পুরুষটিকে নিয়ে কথা পাড়ি। সে যদি নিতান্ত এই স্বভাবের হয় যে কিনা একটি নারীর বশ্যতাকে তার অভিষ্ট হিসেবে দেখে তাহলে কথা ভিন্ন। তখন আমরা, শিউলীকে এই বাসষ্ট্যান্ডে ইতিপূর্বে দেখি নাই কেন ইত্যকার বিষয় নিয়ে গল্প জমাবো। আমাদের এও মনে হয়ে যে শিউলীর মধ্যে যে সহজাত আভিজাত্যের ছাপ তাতে তাকে বাসে প্যাসেঞ্জারীতে একটু বেমামান মনে হয়। হতে পারে কোন ঘটনাচক্রে তার এ হেন বাস যাত্রা, কে জানে হয় তো তার বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছে আর সে কারণে বহুদিন পরে সুযোগ হয়েছে উত্তর বঙ্গে মায়ের ভাই একমাত্র মামার বাড়ি যাওয়ার।

আমাদের অহেতুক কথাবার্তায় নিজের নাম উচ্চারিত না হওয়ায় শিউলি কিছু অনুমান করতে ব্যর্থ হচ্ছে কিনা না বোঝা গেলেও আমরা যে তাকে যথেষ্ঠ পরিমাণে বিচলিত আর সচকিত করতে সমর্থ হইনি তা স্পষ্ট হয় যখন দেখি সে তার ব্যাগসমেত বাসে উঠে গেছে। আমাদের গন্তব্যের অভিন্নতায় অগত্যা, আমরাও তার অনুবর্তী হয়ে বাসে উঠে বসি।

দূরপাল্লার বাসে যাত্রীর কমতি নেই, নানা বয়সী, নানা প্রকারের মানুষ ওঠে কিন্তু কোন এক বোধঅগম্য কারণে আর কাউকেই আমাদের চোখে পড়ে না! আমরা আমাদের কয়েকজন আর শিউলিকে নিয়েই ভ্রমণ সম্পূর্ণ করার আয়োজন করি, সেটা কি এজন্য যে শিউলি যেখানে থাকে সেখানে অন্যান্যদের উপস্থিতি গৌণ মনে হয়। আমাদের দলে ভিড়ে যাওয়া বেসরকারী কলেজের যে অধ্যাপিকাটি থেকে থেকে হাতে লোশন মাখেন, বললেন-‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষেরা এ রকম স্বভাবের থাকে, স্ত্রীকে কব্জাবন্দী করা তাদের এক প্রকার কাম্য বিষয়’। ব্যক্তিত্বে জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতার ছাপ থাকায় তার কথা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা শিউলীকে নিয়ে জল্পনা দীর্ঘায়িত করতে থাকি,- স্বপ্নে দেখা পুরুষটি কি তার স্বামী, যে, বৌকে সাময়িক ভয় দেখিয়ে বা ভয় ভাঙ্গিয়ে একটি ক্লান্তিকর সাংসারিক খেলায় মেতে ওঠে? সেক্ষেত্রে শিউলির মত একজনের কোন গ্রহণ কিংবা বর্জনযোগ্য উপায় থাকার সম্ভাবনা কি কি? শিউলীকে যেরকম যৌবনমত্ত দেখায় আর তার বুক টুক ভালো রকমই ভারী বলে বোধ হয়, তাতে তার তো উপায়ের অভাব থাকার কথা না। শিউলীর কি বাচ্চা আছে? হতেই তো পারে সে তিন বছরের বড় ছেলে আর দুই বছরের দুরন্ত মেয়ে শিশুটিকে শাশুড়ির জিম্মায় রেখে অফিসের কাজে মতিঝিলে আসে, আর সারাদিন তার দুশ্চিন্তায় কাটে, ডায়াবেটিসের রোগী শাশুড়ি দুপুরে ঘুমিয়ে গেলে তার ফাঁকিবাজ কাজের মেয়েটি বাচ্চাদুটোকে মারে কিনা। আর সে ঘন ঘন চেষ্টা করেও ঢাকার বাইরে ট্যুরে যাওয়া স্বামীর ফোনের নেটওয়ার্ক পায় না। তবে আমরা ঠিক নিশ্চিত হতে পারিনা যে শিউলীর বাচ্চা আছে নাকি নেই, এক আধটা বাচ্চা হয়ে গেলে স্তনের সুডৌল ভাব এত প্রকট হতে পারে কি? বাজারে সুলভ নানাপ্রকার ব্রা’র কথা আমরা আলোচনায় আনি, অন্তত যারা এইসব সামগ্রীর উপযুক্ত ব্যবহার কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে, তারা নিশ্চিত হয়ে মন্তব্য করে। শিউলি যখন তার অপেক্ষাকৃত বড় ব্যাগটি মাথার ওপরের বাঙ্কে দুই হাত উঁচু করে ঠেলে ঠেলে ঢোকানোর চেষ্টা করছিল, তখন আমাদের কেউ কেউ খুঁটিয়ে দেখার দাবী করে বলে যে শিউলীর পেটে বাচ্চা বিয়ানোর প্রমাণ বিদ্যমান। তখন তার শাড়ি আর ব্লাউজের মাঝখানের আড়াল সরে গিয়ে পেটের অংশবিশেষ উন্মুক্ত হলে ফেটে যাওয়া ভাপা দৈ এর মত তার তলপেটের উপরিভাগে কুচকানো চামড়া দেখতে পায় আর তা একজন সন্তান জন্মদাত্রী নারীর ক্ষেত্রে হওয়া স্বাভাবিক।

আমাদের দুরপাল্লার কোচটি আরামদায়ক হবার কথা, তার এসি, জানালার ফুল ফুল পর্দা সে তথ্যই জানান দেয়। প্রয়োজনীয় সবরকম সৌন্দর্য্য অঙ্গ-সৌষ্ঠবে ধারণ করে সে তার সহজাত স্বভাবের চেয়ে অধিক শব্দ ছড়ায়, হয়তো ইঞ্জিনঘটিত সমস্যা, যা এইসব লং রুটের বাসে পরীক্ষা করা হয়, তবু আমরা নিশ্চিন্তভাবে নিজেদেরকে একটি অনিরাপদ চক্রযানের জিম্মায় ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক হয়ে চালকের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ি যে, সেকি বাসের ইঞ্জিনটি পরীক্ষা করিয়েছে? বিপুল শব্দের আড়ালে আমাদের কথা চাপা পড়ে গেলে আর কোন উপায় থাকে না, জানলা দিয়ে বাসের ধোয়ার উদ্গীরণে চলমান দোকানের সাইনবোর্ড ঢেকে যাওয়া দেখতে দেখতে আমরা দীর্ঘ রাতের যাত্রায় সদ্য পরস্পরের মুখচেনা আরো দু একজন যাত্রীর সঙ্গে নিজেদের আলাপ পরিচয় পোক্ত করতে উদ্যোগী হই। খবরের কাগজের খেলার পাতা আর মফস্বল সংবাদ আলাদা করে ভাগাভাগি করে বিভিন্ন সীটে চালান হয়ে যায়। বাসের জানালা দিয়ে ক্লান্ত সূর্যের নিয়ন্ত্রিত তাপের ভ্যাপসা ছাঁট আসে।

ফিকে অন্ধকার পাখা গুটিয়ে মাটিতে নেমে এলে এক সময় আমাদের ঝিমুনী আসে, হিন্দী গানের ভল্যুম নিজের আয়ত্বের মধ্যে রাখলে কোন কোন যাত্রী চালকের উদ্দেশ্যে-‘গানের সাউন্ড বাড়ান’,- চিৎকার দেয়, অন্যরা বিরক্ত হয়, আরো কিছু সময় পরে তাদের একজন আবার-‘গান বন্ধ করেন’-বললে সিডি বদল হয়। আমরা ঘুমে, জাগরণে, অচেনা আর চেনাজানা আলো আঁধারীর মধ্যে গতিশীলতায় ডুবে থাকি।

অন্ধকার আরো বর্ণান্ধ হলে হঠাৎ আমাদের বাস বিকল হয় সেই বিরান প্রান্তরে, যেখানে শুকনো নদী জীবনের কেচ্ছা খুলে বসেছে। প্রান্তরে গাছ পালা কম, অনেকখানি খোলা দেখা যায়, তবে পূর্ণিমা নেই বলে কত খোলা তা বুঝতে পারিনা, কিন্তু শীতবোধ সাঁই সাঁই ধেয়ে আসে। আমরা আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে, হাই তুলতে তুলতে তবু বাস থেকে নামি। বাসের নীচে ধুলো সাঁতরে সাঁতরে হেল্পার আর ড্রাইভার কালিঝুলি মেখে যন্ত্রপাতি সারে।

এমন হওয়ার কথা না, তারপরও জন-মানবশুণ্য রাস্তায় বাস থেমে গেলে বুকের ভেতরে জমে থাকা এক বানোয়াট অতিপ্রাকৃত ভয় হয়, আর তা তাড়াবার কৌশল হিসেবে কয়েকটি উপায়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজটি বেছে নেই, সহযাত্রী হিসেবে সবচেয়ে আকর্ষনীয়া শিউলীর খোঁজ করি। শিউলী তখন চালকের থেকে তিন চার সারি পেছনের দিকে দুটো সিটে একলা আধভাঙ্গা হয়ে বিবশ ঘুম ঘুমায়, শীতে কুকড়ে থাকে তার হাত, পা। গায়ে জড়ানো লাল রঙ্গের শাল, শীতের তুলনায় অপ্রতুল মনে হয়। আমরা ঘুমভাঙ্গা মৃদু কণ্ঠে ‘আহা- আহা’- শুরু করলে সে মাথা তুলে শাল সরায় আর তার স্বপ্নহীন চোখের পাতা উম্মীলন দেখি। আমাদের কৌতুহলী দৃষ্টি, দু একজনের প্রশ্নবাণ তাকে বিদ্ধ করার শুরুতেই তার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে, আর সে চারপাশে তাঁকিয়ে-‘হ্যালো’-বলতে বলতে তার ব্যাগ কাঁধে উঠে দাঁড়ায়, বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করে।



শিউলিকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সামান্যই সময় লাগে। অপেক্ষা ছাড়া তেমন মোহময় কিছু করার নেই বলে আমরা শিউলির পেছনে পেছনে সতর্ক দুরত্বে হাঁটি। ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে সে কানে ফোন চেপে কথা বলে, আমরা তার নীচু কন্ঠের কথাবার্তার কিছু শুনতে পাই, কিছু শুনতে পাই না। সে হঠাৎ রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে গেলে আমাদের হতভম্ব লাগে, কারণ সামনে আর কিছু দেখা যায় না। সহসা আমাদের জন্য অন্ধকারের একটা ভারী চাদর তাবুর মত নেমে আসে, বিস্মিত হয়ে দেখি যে শিউলি দিব্যি অন্ধকার দুহাতে সরিয়ে ওপাশে চলে যায়। কিচ্ছু দেখা যায় না, কেবল কখনো কখনো দু একটা কথার আওয়াজ, চামচ নাড়াচাড়ার শব্দ আর ডালে পাঁচফোড়ণের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। কড়া নাড়ার সাহস করিনা, কারণ কড়া নাড়া দিলে আমাদের কাকে, কি রকম তোলা গুনতে হবে- সেই খেসারতের ফিস ফিস হিসাব-কিতাব নিয়ে আমাদের ধন্ধ বাড়ে, সেই সঙ্গে অতিকায় অন্ধকারের ভয়তো আছেই। দাঁড়িয়ে বসে আমরা প্রত্যাশা করি যে কৃত্রিম আলোর একটি সন্ধ্যা দ্রুত এসে নামুক। আমাদের প্রত্যাশার মুখে আকাশের দু একটি তারাকে কেমন মামুলী দেখায়।



ভোর নামতে এখনো দেরী, ঠান্ডা কচি পাতার স্বাদ তিক্ত করে অন্ধকারে বাতাস শির শির শব্দ তুললে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে, না, কালবোশেখী না। শিউলী ফোনালাপে যেভাবে বলছিল, তাদের ছোটবেলায় খুব কাল বোশেখীর ঝড় উঠতো। আকাশ কালো, বৃষ্টির নাম নিশানা নাই, রাস্তার ধূলো উড়ে ঘূর্ণি বানালে ছোট বড় সবাই আশংকায় থেকেছে। ধুলোর ঘূর্ণিতে অদৃশ্য অশুভ ছায়া থাকা খুব স্বাভাবিক ভেবে তারা দরজা জানালা আটকে দিয়েছে। শিউলীই শুধু বাতাসের ঘূর্ণি দেখলে প্রথম বর্ষার মাছের মত উথলানো খুশিতে ভেসে রাস্তায় নেমে ঘূর্ণির গোল ঘের ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে নাচতে চায়। কালো ঘূর্ণির ভেতর থেকে তার হাত আর ফর্শা আঙ্গুল বেরিয়ে থাকে, যে আঙ্গুলের প্রশংসা শুনে নিজেকে একটা লালরঙ্গা মোড়ানো গড়ানো কার্পেটের ভেতর থেকে ফুঁসে বের হওয়া সোনালী সাপের ফণার মত শ্লাঘা আর আনন্দে পরিপূর্ণ লাগে। ক্রমে ক্রমে কাল বৈশাখীর ঋতুতে ধূলো-বাতাসের ঘূর্ণি-উদ্ঘাটন একটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেলে আর কেউ শিউলীকে নিয়ে মাথা ঘামায় না, ছেড়া কাগজ, পলিথিনের ব্যাগের টুকরা, শুকনো পাতা ইত্যাদির সঙ্গে তার হাত আর হাতের আঙ্গুল একাত্ম হলে তার কৈশোর বেলার আঙ্গুলের কথা মনে পড়ে যখন তার হাত যথেষ্ঠ পরিমানে সৌন্দর্যমন্ডিত ছিল না বলে গুটিয়ে যাওয়া শেকড়ের মত মন খারাপ হতো, যে নাকি গাছের জন্যও আর রস গ্রহণে আগ্রহী নয়, গাছের সবুজ শুকিয়ে লালচে ম্লান হওয়ায় তার কিছুই আসে যায় না। সেই সব শিশুতোষ মনোকষ্টের দিনে তার উচ্চাকাংখাগুলো নিজস্ব আঙ্গুলের দিকে তাঁকিয়ে প্রকারান্তরে দমে গিয়ে তাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিতো যে তার মনে হতো সে প্রাচীন চীনযুগে বাস করে আর তার পায়ে পরানো আছে এক লোহার জুতো, যা তার পা জোড়াকে বিদ্ঘুটে বড় হওয়া থেকে বাঁচাবে। ছোট্ট পা জোড়া নিয়ে, কমজোর গোড়ালী নিয়ে শিউলি এখন কি করে? তার নিজেকে লতাগুল্মের উপমা দিতে ইচ্ছে হয়।



অন্ধকারের ওপারে, আমরা শুনতে পাই, শিউলী কারো কাছে হাঁটুমুড়ে ক্ষমাপ্রার্থী হয়, তার কন্ঠ বুজে আসে। বাঁধভাঙ্গা কান্নার তোড়ে সে জোরে ফুঁপিয়ে উঠলে কেউ তার কাছে শুকনো কন্ঠে জানতে চায়-‘কাঁদছো কেন, কান্নার মত তো কিছু হয় নাই’।

কিন্ত তাহলে সে কেন কাঁদে, সে কি আসলে ফোঁপানোর অনুশোচনায় আরো বেশী করে ফোঁপায়? কোন কারণে, হাঁটুমুড়ে, কার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে? তার কি এই ক্ষমা প্রার্থনার দীনতা মেনে নিতে কষ্ট হয়, সে কারণে ভেতরে এক রকম বিদ্রোহী বোধ জন্ম নেয়, যাকে সে আপাত ফোঁপানির বাইরে অন্য কোন ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনা? এ সময় হয় তো কেউ তার চুলে বিলি কাটে আর তা শিউলির শরীর জুড়ে শিহরণ ছড়ায়, আমরা ঘাড় উঁচু করে, চোখ সরু করে তা দেখতে চাইলেও কালো পর্দ্দা নিশ্ছিদ্র থাকে। চরাচর জুড়ে শুয়ে থাকা স্থির সময় আলস্য ভরে গা তুললে শিউলির কান্নাক্লান্ত স্বর ভেসে আসে

-‘আমার জন্মের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও’।

-‘হায় রে কপাল! জন্মেছিস বলে ক্ষমা চাইছিস?’ কন্ঠস্বরটি একটু গম্ভীর আর সর্দিলাগা প্রতীয়মান হলে আমাদের পক্ষে ঠাহর করা সম্ভব হয় না যে কে কথা বলে। কিছু কিছু ফিস ফিস কথা আমাদের বোঝার বাইরে রয়ে যায়।

… “মানুষ মাতাল হলে খুন করে, নাকি, খুন করার অপরাধে মাতাল হতে চায়?” কন্ঠস্বর যারই হোক, প্রশ্নটি যার কাছ থেকেই আসুক, এটাকে একটি সঙ্গত প্রশ্ন বলে মনে হয়। আমাদের সামনে শিউলির ব্যাক্তিগত প্রাপ্ত তথ্যাদিতে কেবল তার বর্তমান, কিংবা প্রাক্তন অথবা মৃত স্বামীর উল্লেখ আছে, কাজেই ওর জন্মদাতা পিতা মদ্যপ ছিলেন এমন অবাঞ্ছনীয় প্রসঙ্গ উত্থাপনের আগে আমরা বেখাপ্পারকমভাবে ধরে নেই শিউলির স্বামীই হয়তো মাতাল এবং খুনি। তারপর আমরা এই চিরায়ত প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজতে তৎপর হই, ‘আসলে মাতাল অবস্থায় কি মানুষ খুন করে নাকি খুন করে মাতাল হয়ে যায়’? অদুরবর্তী ধানক্ষেত থেকে ঘোলা পানির গন্ধমাখা বাতাস লঘুচালে উঠে আসে আর আমরা আবার নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করি- আসলে কি হয়? ‘নিয়মমতে মাতালেরা’,… যথারীতি আমাদের দল দুভাগে ভাগ হয়ে গেলে এক দল বলে যে, ‘শিশুর সারল্যে তাদের চাপা স্বভাব খোলস ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে, আর তাদের নিজস্ব বিবেচনা ক্ষমতা যা কিনা- পারিপার্শ্বিকের জটিলতাপ্রসুত, লোপ পায়, এবং অকপট হয়ে তখন তারা সত্যি সত্যি যে আচরণটিকে উপযুক্ত বলে বিবেচনা করে তাই করে, সেখানে তার বোধ আর অনুভব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন মাতাল মানুষের কাজ হয়ে ওঠে তার নিজের কাছে অলংঘনীয় নির্দেশ’। আমাদের কোন একজনের নীচু স্বরের বক্তব্যের ওজন বইতে অধ্যাপিকার কষ্ট হয়, উনি আর্তস্বরে না না করে ওঠেন, তার গালের দুপাশ লালচে। রাগান্বিত অবস্থা থেকে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বাটিক প্রিন্টের শাড়ির আঁচলে মুখ মুছলেও তার উত্তেজিত ভঙ্গিটি সহযে ঘায়েল হয় না। --‘মানুষ,’ তার অভিজ্ঞতা বলে যে, ‘মাতাল অবস্থায় হিতাহিত বোধশূণ্য থাকে’- তারপর আমরা শিউলির সংলাপ থেকে কান সরিয়ে অধ্যাপিকার কথা শুনতে চাইলেও তার গল্প জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়। কারণ শিউলি তখন আরেকটি পুস্তকের মহা-উৎসাহী পাতা খুলে দিয়েছে যেখানে মানুষের মমতা বা এই জাতীয় বোধ সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব মতামত সুতোবদ্ধ করার সুযোগ আছে। আমাদের শ্বাস ঘন হয়ে আসা বিতর্কের মধ্যে কিছু সময় পরে সুতোর সেলাই ছিঁড়ে সেখানে ঢুকে পড়ে সুসজ্জিত একদল পাকিস্থানী আর্মি আর কয়েকজন মুখচেনা রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এরা কি মাতাল ছিলো? আমাদের কারো পিতা বা পিতার বয়সী কারুর চাক্ষুস অভিজ্ঞতার বংশানুক্রম বয়ানে জানতে পাই যে তারা যখন নিজেরা আটক হয়ে অথবা বন্দী আত্মীয় বন্ধুর খোঁজে ভীত আর আতংকগ্রস্থ হয়ে আর্মি ক্যাম্পে গেছে আর সেখানে প্রতিষ্ঠিত দৃশ্যে একজন, বা দুজন কুখ্যাত মেজরের হুইস্কি পানরত লাল চোখ দেখেছে, তখন তারা নিশ্চিত নয়, যে, সামনে দাঁড়ানো বিনীত পাপোষের মত রাজাকারটিও তার ভাগ পেয়েছে কিনা।

এই পর্যায়ে এক অদ্ভুত কণ্ঠ শোনা যায়, শিউলির একার কন্ঠস্বর না, একটি কোরাস কণ্ঠ শিউলির সুরে কথা বলে। শিউলি, শিউলির মা নাকি মায়ের মত কেউ, তাদের একজন, কিংবা দুজন তিনজন। শিউলি দেখতে পায় তার মায়ের পুরুষ্ট দুটি স্তন ধারালো ছুড়ি দিয়ে কেটে ফেলে হাহা করে হাসছে সৈন্যরা। দীর্ঘ ক্ষরণের পর স্তনের জায়গায় কালো কুচকানো গোলাপের মত রক্ত জমে আছে। কদর্য দুই গোলাপ বুকে ফুটিয়ে মায়ের অপেক্ষা শুরু হয় অনাগত সন্তানকে পৃথিবী দেখানোর।

কত ব্যাথাতুর আর ক্লান্তিময় এই অপেক্ষা? শুরু হয়েছিল কখন, ধর্ষণের আগে নাকি পরে? রাজাকারদের সাক্ষী রেখেই তো নির্বিঘ্নে একটি করে উত্তপ্ত সেদ্ধ ডিম মায়ের যোনিতে প্রবেশ করিয়েছে, তখনি বুঝি শিউলি, যে কিনা ভ্রুণ হয়ে ভাসছিল, তীব্র আর্তচিৎকারে জঠরের দেয়াল চৌচির করেছে। নাকি সে কোনক্রমে সেই ডিমের মধ্যে ঢুকে গেলে লালা আর লাভায় ঢেকে নয় মাসে ভুমিষ্ঠ হলে এক বিশাল চঞ্চু বাজপাখি তাকে ছোঁ মেরে একটি চার রাস্তার মোড়ে ফেলে যায়। আর কয়েকজন লোক বেরিয়ে তাকে দেখে “একে কবর দাও, নাইলে কাপড় পরাও” বললে নবজাতক ব্যাকুল চিৎকারে তার মায়ের বুকে ফিরতে চায়। কিন্ত তার মা, স্তনহীন, তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে না পেরে বুক চাপড়ে চাপড়ে কাঁদে, তার বুক আরো রক্তাক্ত হয়, ক্ষত আরো গভীর হয়। এক পর্যায়ে থাকতে না পেরে রোদুদ্দমানা নারীটি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে বুকে জড়ালে সে ক্ষিদের জ্বালায় তার শীর্ণ, তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মায়ের বুক আঁচড়ালে তার কান্না থেমে আসে। সে চুক চুক করে লেগে থাকা আঠালো রক্ত চেটে চেটে খায়। পরবর্তীতে এমন হয় যে, শিউলির আর দুধের স্বাদ ভালো লাগে না।



অন্ধকার ভেদ করে এবার শিউলির কন্ঠ পরিস্কার ভেসে আসে, ‘শুনতে পাই মরাদেহ কাটার জন্য ডোমের চোলাই মদ লাগে, জ্যান্ত মানুষ কাটতে রাজাকারের মদ লাগে নাই’?

পর্দ্দার এপাশে থেকে আমরা কোন রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার প্রস্তুতি নেবো ভাবি, কিন্তু আর কোন শব্দ বাতাসে ছড়ায় না। তার বদলে কাঁধের ওপর ভারী বাতাসের ভার ক্রমাগত নুইয়ে ফেলে আমাদেরকে, হাঁটুভেঙ্গে ‘দ’ ভঙ্গিতে যাওয়ার প্রাক্কালে বাসের গগন বিদারী হর্ণে আমাদের মনযোগ ছিন্ন হয়। আমরা নিজেদেরকে খুব বেশী দূরত্বে আবিস্কার করিনা। ফেরার প্রস্তুতি নিতে সারি সারি পিপীলিকার মত বাসের সিঁড়িতে ডান পা রাখি, তারপর বাম পা রাখি। হাতলের কাছে পেট্রোলের গন্ধ আমাদের নিঃশ্বাস পেটের ভেতর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনলে বমিভাব ওঠে। শিউলির কথা আমাদের প্রত্যেকের মনে থাকে, তাকে ডেকে বাসে তোলার দায়বোধ করি না যে তাও না। কিন্ত যেখানে আমাদের প্রবেশাধিকার নেই সেখান থেকে তাকে ফেরাই কি করে?

বাস মৃদু চলতে শুরু করলে হেল্পারের হঠাৎ বাস থামতে বলার ঢাপ ঢাপ শব্দে আমরা চমকে যাই। বাসের গতি কমে আর শিউলি ফোন কানে চেপে উঠে আসে। এক হাতে একের পর এক সিট ধরে ভারসাম্য রক্ষা করে নিজের সিটে পৌঁছাতে চায়, কিন্তু ইতোমধ্যে অন্য কেউ তার সীট দখল করে নিয়েছে, তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় হেল্পারের অপেক্ষায়, যে এসে তাকে আসন্ন ঝামেলা থেকে উদ্ধার করবে। চলন্ত বাস কোন আলোকিত দোকানপাটের সামনে দিয়ে এগোলে তার শাড়ির রং স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অধ্যাপিকা ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘সবুজ কি আর ফ্যাশন এখন?’

বাস আলো আঁধারীর মধ্যে দিয়ে এগোয়। শিউলির শাড়ির রং কখনো কালচে, কখনো খয়েরী মনে হয়, আর সে, পরিপূর্ণ জাগ্রত তখন, বেগুনী ফণা, মেহগনি খাট আর শাদা পাঞ্জাবির দুঃস্বপ্নের কথা ভুলে গিয়ে পেছনের কোন খালি সীটে কোনমতে পৌঁছাতে চায়।


লেখক পরিচিতি
নাহার মনিকা

জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে। পড়াশুনা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন।
বর্তমান নিবাস : কানাডা।
গল্পগ্রন্থ : পৃষ্ঠাগুলি নিজের।
কাব্যগ্রন্থ : চাঁদপুরে আমাদের বরষা ছিল।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন