শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

গল্প নিয়ে আলাপ : রাজীব নূরের গল্প --পিতৃত্ব

অনিন্দ্য আসিফ

এক পিতার অন্তর্ব্যুহে যাত্রা


মেয়েটির শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলে কান্দাপাড়ার প্রায় সকল পতিতা তার মুমূর্ষু অবস্থা দেখতে জড়ো হয়। রমলা মাসি ইতোমধ্যে পতিতালয়ের চারটি মেয়েকে বিয়ে করা মোতালেবের সাথে এই মেয়েটির বিয়ে দেওয়ার উদ্যেগ নিচ্ছিল। কিন্তু পতিতালয়ে আসা এই নতুন মেয়েটি কোনোমতেই পরপুরুষের সঙ্গ নিতে চাইছিল না। শেষমেশ নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এভাবেই সে নিজেকে রক্ষা করে। মোতালেব তার সবচে কমবয়েসি স্ত্রী মৌরির কাছে জানতে পারে মেয়েটির নাম পলি। সে আঁতকে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে দেখে দগ্ধ মেয়েটি তার ছোট মেয়ে পলি। নিজের আত্মজার সাথে রমলা মাসি বিয়ের ব্যবস্থা করছিল!


সারা গল্পজুড়ে কোথাও পলির শারীরিক উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। কিন্তু গল্প শেষে একবারের উপস্থিতি যেন বা টোটাল গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে চায়। মোতালেবের দিনযাপন আর জিনপালন এবং তার স্ত্রী ক্রমাগত কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ায় সে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাতে সুখপাঠ্য ছয় হাজার দুই শতাধিক শব্দবিশিষ্ট এই গল্পের শেষে একটা ক্লাইমেক্স পাঠক আশা করে। তবে এতোটা হৃদস্পর্শিতা হয়তো কামনা করে না। পাঠকের হৃদয়ে এই ফাইনাল টাচ দেওয়াটা লেখকের সার্থকতা। তবে এটাই গল্পের একমাত্র চমক নয়। গল্পজুড়ে শেষোক্ত ক্লাইমেক্সের ছায়া হয়ে যাওয়া বেশ কিছু চমক পাঠককে উপহার দিতে লেখক সমর্থ হয়েছেন। কিন্তু এক বা একাধিক ঘটনা-উপঘটনাই একটা গল্পের সার্থকতা বহন করে না। প্লট, চরিত্র, সেটিং, থিম ইত্যাদির সাবলিল সমন্বয় গল্পকে কাঙ্খিত উচ্চতায় পৌছে দেয়। সেক্ষেত্রে ‘পিতৃত্ব’ সাধারণ পাঠককে মোহাবিষ্ট করতে পারলেও সচেতন পাঠককে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছে কী? লেখক খুব স্বাভাবিক এবং সাধারণভাবে গল্পটা শুরু করে চমৎকার কাহিনী বর্ণনায় ধীরে ধীরে সমাজে কন্যাসন্তানের প্রতি আমাদের মানসিক দৈন্যতা তুলে ধরেছেন। গল্পের গতি চমৎকার। অর্থাৎ পাঠককে একাগ্রচিত্তে ধরে রাখতে সক্ষম। অযাচিত সংলাপ চোখে পড়ে না। তবে সংলাপে টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষা এবং মনে হয় পতিতালয়ের আরও কিছু প্রচলিত ভাষা আছে যা সংলাপে প্রযোজ্য ছিল, যা লেখক প্রয়োগ করেননি অথবা পারেননি। সচেতন এবং ঋদ্ধ পাঠক বর্ণনার ভাষায় আরও অধিক কারুকার্য আশা করে। গল্পের ভাষা ব্যবহার খুবই সাদাসিধে হওয়ায় গল্পের গভীরতাকে ব্যাহত করেছে।

গল্প কেবল পাঠককে মোহাচ্ছন্নের বৃত্তে আটকে রাখা নয়; গল্প বর্তমান সমাজ, সংস্কৃতি আর রাষ্ট্রব্যবস্থার চিত্রকে ভবিষ্যতের কাছে চিত্রিত করে। তাই জাদুবাস্তবতার কতিপয় আইটেমের বাইরে গল্পে ব্যবহৃত তথ্য এবং তার ফলে তত্ত্বগত বিশ্বাস পাঠককে সঠিক নির্দেশনা দেয়। গল্প যখন সময় আর সামাজিক দর্পন তখন লেখক মৌরির মুখ দিয়ে জুঁই, চশমা আর রেশমার পতিতা হওয়ার কাহিনী বর্ণনায় পাঠককে এই সত্যটা জানিয়ে দেন যে আমাদের সমাজে নেহায়েৎ বিপাকে পড়েই মেয়েরা এই পথে পা বাড়ায়।

গল্প কখনও কখনও একটা ইজম অথবা ব্যক্তিগত মত প্রচারের মাধ্যমও হতে পারে। পিতৃত্ব গল্পে জিন সম্পর্কিত সচেতন ও সুচারুভাবে লেখকের নিজস্ব একটা মত প্রচারের মাধ্যমও মনে হতে পারে। যদি তাই হয় তবে জিনের অস্তিত্ব অস্বীকারের জন্য গল্পে ব্যবহৃত চরিত্রগুলোর মধ্যে লেখক হয়তো অবচেতনে একটা ভুল চরিত্র নির্বাচন করেছেন। মোতালেবের মনে বার কয়েক জিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করেছেন। ইসলাম ধর্মে জিন ও ইনসানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। গল্পের প্রধান চরিত্র মোতালেব একজন কোরআনের হাফেজ। মসজিদের মুয়াযযিন। যে সমস্ত হারানোর পরেও পতিতাপল্লিতে রমলা মাসির নির্দেশানুসারে কন্যা সন্তান জন্মের বীজদানের জন্য জুঁই এবং পরে রেশমা, চশমা আর মৌরির সাথে সঙ্গমে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও একপ্রকার বাধ্য হয়ে সে প্রত্যেককে বিয়ে করে এবং জুঁইয়ের গর্ভে সন্তানবীজ দিলেও কন্ডম ব্যবহারের ফলে বাকীদের গর্ভে সন্তান সম্ভাবনার কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। সেই মোতালেব নিশ্চয়ই জিনকে অস্বীকার করতে পারে না। বড়জোর জিন পালিত হওয়ার বিষয়কে অস্বীকার করতে পারে। তবে সে সে-টা পারে যখন সে চার বউয়ের সাথে রঙ্গলীলা এবং চা-চুরুট আর তারপর দাড়ি কামিয়ে আর দশজনের মতো হয়ে ওঠে। কান্দাপাড়া পতিতালয়ের রমলা মাসী যখন অবলীলায় মোতালেবের শরীয়তি কথার বিপক্ষে গিয়ে বলে যে, আল্লাহর কাছে আমার নামে বিচার দিয়া কইবেন, কান্দাপাড়ার রমলা মাসী আপনেরে বন্দি কইরা জেনা করতে বাধ্য করছে। গুনাগাতা সব আমার নামে লেখাইয়া দিবেন। তখন বরং লেখকের এই মতামত রমলা মাসীর মাধ্যমে ছড়ানোটাই উপযোগী হত। যেমন আল মাহমুদের খুবই উল্লেখযোগ্য গল্প ‘গন্ধবণিক’-এর এক জায়গায় কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার ফলে তাঁর ভেতর ভয় ভর করা সম্পর্কে বলেন, ছাত্রজীবনে আমি ঘোর নাস্তিক ছিলাম। তখনও এধরনের সংস্কার বা ভয় আমাকে ত্যাগ করেনি। এধরনের ভয় কেন জন্মায় আমি জানি না। আমরা তাঁর বিষয়ে যা জানি গল্পে হলেও তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয় এভাবে বর্ণনা করেছেন।

সবশেষে ‘পিতৃত্ব’ পড়ে আমরাও মনস্তাত্ত্বিক দ্ধন্ধ আর আনন্দে তলিয়ে যেতে থাকি। লেখক এই রাস্তাটা আমাদের জন্য উন্মুক্ত রাখেন।

লেখক পরিচিতি

অনিন্দ্য আসিফ
জন্ম ১৯৮১।
কিশোরগঞ্জে বেড়ে ওঠা।
গল্পকার।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন