শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

বুদ্ধদেব বসুর গল্প আবছায়া

আই এ পাশ ক’রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেদিন ভর্তি হলাম সেদিন মনে ভারি ফুর্তি হ’লো। বাস্ রে, কত বড়ো বাড়ি! করিডরের এক প্রান্তে দাঁড়ালে অন্য প্রান্ত ধু-ধু করে। ঘরের পরে ঘর, জমকালো আপিশ, জমজমাট লাইব্রেরি, কমনরুমে ইজিচেয়ার, তাসের টেবিল, পিংপং, দেশ-বিদেশের কত কত পত্রিকা-সেখানে ইচ্ছেমতো হল্লা, আড্ডা, ধূমপান সবই চলে, কেউ কিছু বলে না। কী যে ভালো লাগলো বলা যায় না। মনে হ’লো এতদিনে মানুষ হলুম, ভদ্রলোক হলুম। এত বড়ো একখানা ব্যাপার-যেখানে ডীন আছে, প্রভস্ট আছো, স্টুঅর্ড করতে হয়, আরো কত কী আছে, যেখানে বেলাশেষে আধ মাইল রাস্তা হেঁটে টিউটরিয়াল ক্লাশ করতে হয়, তারও পরে মাঠে গিয়ে ডনকুস্তি না-করলে জরিমানা হয়, যেখানে পার্সেন্ডেজ রাখতে হয় না, আনুয়েল পরীক্ষা দিতে হয় না, যেখানে আজ নাটক কাল বক্তৃতা পরশু গান-বাজনা কিছু না-কিছু লেগেই আছে, রমনার আধখানা জুড়ে যে-বিদ্যায়তন ছড়ানো, সেখানে আমারও কিছু অংশ আছে, এ কি কম কথা! অধ্যাপকেরা দেখতে ভালো, ভালো কাপড়চোপড় পরেন, তাঁদের কথাবর্তার চলই অন্যরকম, সংস্কৃত যিনি পড়ান তিনি বিশুদ্ধ ইংরেজি বলেন-ঘন্টা বাজলে তাঁরা যখন লম্বা করিডর দিয়ে দিগি¦দিকে ছোটেন, তাঁদের গম্ভীর মুখ আর গর্বিত চলন দেখে মনে হয় বিশ্বজগতের সমস্ত দায়িত্বই তাঁদের কাঁধে ন্যস্ত। এ-সব দেখে-শুনে আমারও আত্মসম্মান বাড়লো, এ-সংসারে আমি যে আছি সে-বিষয় অতিমাত্রায় সচেতন হ’য়ে উঠলুম। মন গেলো নিজের চেহারার দিকে, কেশবিন্যাস ও বেশভূষা সম্বন্ধে মনোযোগী হলুম। শার্ট ছেড়ে পাঞ্জাবি ধরলুম, সদ্যোজাত দাড়িগোঁফের ওপর অকারণে ঘন-ঘন ক্ষুর চালিয়ে ছ-মাসের মধ্যেই মুখমণ্ডল এমন শক্ত দাড়ি গজিয়ে তুললুম যে আজ পর্যন্ত কামাতে বসে চোখের জলে সেই স্বকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। তখন অবশ্য ভবিষ্যতের ভাবনা মনে ছিলো না, বালকত্বের খোলশ ছেড়ে খুব চটপট যুবাবয়সের মূর্তি ধারণ করাই ছিলো প্রধান লক্ষ্য।


এর অবশ্য আরো একটু কারণ ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি ছাত্রীও ছিলেন। ওখানকার নানারকম অভিনবত্বের মধ্যে এ-জিনিশটাই ছিলো আমার চোখে-প্রায় সব ছেলেরই চোখে-সবচেয়ে অভিনব। যখনকার কথা বলছি, তখনও মেয়েদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বান ডাকেনি, সারা বিদ্যালয়ে পাঁচটি কি ছ-টি মেয়ে মাত্র ছিলো সব সুদ্ধু। আমার সঙ্গে অপর্ণা দত্ত নামে একজন ভর্তি হয়েছিলো।


পাৎলা ছিপছিপে মেয়ে, শ্যামলা রং, ফিকে নীল শাড়ি প’রে কলেজে আসে। দু-শো ছেলের সঙ্গে ব’সে একটিমাত্র মেয়ের বিদ্যাভ্যাস ব্যাপারটা বিশেষ সোজা নয়, বিশেষত যখন ক্লাশে ছাড়া আর সবখানেই ছেলেদের থেকে তাকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ক’রে রাখার আঁটোসাঁটো ব্যবস্থা থাকে। অপর্ণার কেমন লাগতো জানি না, কিন্তু আমার ওর জন্য দুঃখ হ’তো। ছেলেদের মধ্যে ওকে নিয়ে নানারকম আলোচনা শুনতুম, তার সবগুলো বলবার মতো নয়। তাদের ভদ্রতার আদর্শ সমান ছিলো না। মনের মধ্যে যে-চাঞ্চল্যটা স্বাভাবিক কারণেই হ’তো, সেটাকে ব্যক্ত করবার উপায়ও ছিলো এক-এক জনের এক-এক রকম; বেশির ভাগ শুধু কথা ব’লেই খুশি থাকতো-অর্থাৎ জীবনে যা ঘটবার কোনো সম্ভাবনাই নেই, নিজের মনে সে-সব কল্পনা ক’রে নিয়ে গল্প করতো; কয়েকজন দুঃখসাহসী কোনো-না-কোনো অছিলায় মেয়েদের কমনরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে অপর্ণার সঙ্গে আলাপ ক’রে এলো; আর কেউ-কেউ ছিলো একেবারে চুপ। ব’লে রাখা ভালো আমি ছিলুম এই শেষের দলে। ক্লাসে আমি বসতুম সব শেষের বেঞ্চিতে; অনেকগুলো মাথার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ কখনো কখনো অপর্ণাকে আমার চোখে পড়তো-তার স্বতন্ত্র চেয়ারে ব’সে খোলা বইয়ের দিকে তাকিয়ে, একটি হাত গালের উপর ন্যস্ত। ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো সেই মুখ, বসবার সেই ভঙ্গিটি আমার মুখস্থ হ’য়ে গিয়েছিলো, এখনো মনে করতে পারি। সরু হাতে একটি মাত্র চুড়ি, মাথার কাপড়ের চওড়া পাড় মখখানাকে ঘিরে আছে। লক্ষ্য করতুম, অপর্ণা আগাগোড়া বইয়ের উপরেই চোখ রাখে, যেন অত্যন্ত সংকুচিত হ’য়ে নিজেকে দিয়েই নিজেকে আড়াল ক’রে রাখতে চায়। শুধু মাঝে-মাঝে অতগুলো কালো মাথা ভেধ ক’রে ওর চোখের দৃষ্টি আমারই মুখের উপর যেন এসে পড়তো। তবে এটা খুব সম্ভব আমার কল্পনা।

চার বছর অপর্ণা ছিলো আমার সহপাঠিনী, কিন্তু তার মধ্যে এটুকুই আমার সঙ্গে ওর পরিচয়। সে-চার বছরে ওর কণ্ঠস্বর পর্যন্ত আমি কোনোদিন শুনিনি, মুখোমুখি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ওকে দেখিনি কখনো। ও-সব পুরস্কার লাভের জন্য আমার চেয়ে যোগ্য অনেকেই ছিলো। তার মধ্যে অশোক ছিলো পয়লা নম্বর। অশোক কাপ্তেন গোছের ছেলে, বাপের দেদার পয়সা, মাঝে-মাঝে বাড়ির গাড়ি চ’ড়ে কলেজে আসে, শীতকালে ফ্ল্যানেলের পাৎলুন আর বিলেতি শার্ট পরে, সিগারেট নিজে খায় যত, বিলোয় তার বেশি, সমস্ত ইউনিভার্সিটিতে নিংসন্দেহে সে সব চেয়ে পপুলার। চমৎকার চেহারা, তাছাড়া গুণও তার অনেক। টেনিস খেলতে পারে, অভিনয় করতে পারে, সাইকেল চালাতে অদ্বিতীয় ইত্যাদি ইত্যাদি। হল-এর ড্রামাটিক সেক্রেটারি থেকে আরম্ভ ক’রে ইউনিভার্সিটি ইউনিয়নের সেক্রেটারি পর্যন্ত যেটার জন্যই যখন দাঁড়িয়েছে, অসম্ভবরকম বেশি ভোট পেয়ে অনায়েসে নির্বাচিত হয়েছে। সত্যি বলতে, ওর প্রতিদ্ব›দ্বী হবার মতো ছেলে আর ছিলো না।


এই অশোকের কাছে অপর্ণার কথা অনেক শুনতুম। সে তুখোড় ছেলে; কমনরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দু-মিনিট আলাপ ক’রেই তৃপ্ত হয়নি, গেছে অপর্ণার বাড়িতে, চা খেয়েছে তার মা-কে মাসিকা ডেকেছে; তার বাবার সঙ্গে পলিটিক্স চর্চা করেছে ভাই-বোনদের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে; এক কথায়, যা-যা করা দরকার সবই করেছে সে। এক বছরের মধ্যে এই ভাগ্যবান পুরুষ এমন জমিয়ে তুললো যে অন্য ছেলেরা তাকে মনে-মনে ঈর্ষা ও বাইরে খোশামোদ করতে লাগলো-যদি তার সূত্রে তারাও সেই অমরাবতীর কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। কিন্তু অন্য সকলকে অগ্রাহ্য ক’রে অশোক গায়ের প’ড়েই আমার কাছে শুধু ঘেঁষতো, তার কারণ বোধহয় এই যে, আমি ছিলুম আদর্শ শ্রোতা, আমার কাছে কাছে মনে সমস্ত কথা উজোড় ক’রে সে ভারি আরাম পেতো। কতদিন আমাকে নিয়ে ক্লাশ পালিয়েছে, শীতের সুন্দর দুপুরবেলায় ঘাসে উপর ব’সে আমাকে শুনিয়েছে অফুরন্ত অপর্ণা-চরিত। এ ধরনের গল্প সাধারণত ক্লান্তিকরই হয়, কিন্তু আমি স্বীকার করবো যে, আর কিছু না হোক, বার-বার ঐ অপর্ণা নামটি শুনতেই আমার ভালো লাগতো।

সব কথার শেষে অশোক আমাকে প্রায়ই বলতো, ‘চলো না তুমি একদিন ওদের বাড়ি।’

আমি বলতুম, ‘পাগল।’

‘ও চায় তোমার সঙ্গে আলাপ করতে। ডক্টর করের সঙ্গে ও টিউটরিয়াল করে, তিনি ওকে প্রায়ই বলেন কিনা তোমার কথা।’

এখানে লজ্জার সঙ্গে ব’লে রাখি যে লেখাপড়ায় বরাবরই আমি একটু ভালোর দিকে। আত্মীয়রা আশা করেছিলেন হোমরা-চোমরা মস্ত চাকুরে হবো, কিন্তু কিছুই হ’লো না, সামান্য মাষ্টারি ক’রে সংসার টিকে আছি।

অশোকের কথা আমি রাখিনি, একদিনও যাইনি ওর সঙ্গে অপর্ণার বাড়ি। অপর্ণার সঙ্গে আলাপ করার লোভ আমার ছিলো না এমন অসম্ভব কথা আপনাদের বিশ্বাস করতে বলছি না। খুবই ছিলো। কিন্তু অত্যন্ত লাজুক হ’লেও ভিতরে-ভিতরে আমি ছিলাম গর্বিত। অশোকের মধ্যস্থতায় অপর্ণার সঙ্গে আলাপিত হওয়া আমার পক্ষে অসম্মান। আমিই বা ওর চেয়ে কম কিসে! তাছাড়া ছাত্রজীবনের নানারকমের কাজে ও অকাজে, দিন ভ’রে আড্ডা আর রাত জেগে পড়ায় এত ব্যস্ত ছিলুম যে, তার মধ্যে অপর্ণার কথা ভাববার খুব বেশি সময়ও ছিলো না।

হু-হু ক’রে কাটতে লাগলোা দিন, বি. এ. পরীক্ষা হ’য়ে গেলো। আমার বিষয় ছিলো দর্শন, আজগুবি রকমের ভালো নম্বর পেয়ে ফাস্ট ক্লাশে উৎরের গেলুম। অপর্ণা আর অশোক দু-জনেই ছিলো পাশ-কোর্সে, এম. এ.-র শেষ বছরে এসে অপর্ণা আমার নিকটতর সহপাঠিনী হ’লো, কারণ সেও দর্শনে এম. এ. নিয়েছিলো। মর্ডান ইয়ং ম্যান অশোক নিয়েছিলো ইকনমিক্স, কিন্তু অধ্যয়নের ব্যবধান ডিঙিয়ে সে সমীপরবর্তিতায় মৌরশিপাট্টার ব্যবস্থা ক’রে এনেছিলো। একদিন খুব চুপে-চুপে আমাকে বললে কথাটা। সবই ঠিকঠাক এম. এ.টা হ’য়ে গেলেই হয়।

পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে দর্শনের বাজার-দর তখন থেকেই নামতে শুরু করেছে। সবসুদ্ধু আমরা সাতজন ছিলাম ক্লাশে, ছ-টি ছেলে ও একটি মেয়ে। আলাপ করার সুযোগ ছিলো অবারিত। পড়াশুনোয় সাহায্য করার অছিলা হাতের কাছেই, আর আমার মুখে সেটা ফাঁকা বুলিও শোনাতো না। কিন্তু যখনই কথা আমার মনে হ’তো তখনই আমার ভিতর থেকে কে আর একজন ব’লে উঠতো-‘তুমি গিয়ে কারো সঙ্গে যেচে আলাপ করবে-ছি!’

একদিকে অশোক আমাকে বড়োই পিড়াপিড়ি করতে লাগরো অপর্ণাদের বাড়ি যাবার জন্য। কান্ট দুর্বোধ্য ঠেকছে অপর্ণার, আমার সাহায্য দরকার। আমি হেসে বললুম, ‘বড়ো-বড়ো বিদ্বান মাষ্টার মশাইদের মুখে শুনে যা সরল হচ্ছে না, তা কি বোঝাতে পারবো পারবো আমি!’ আর একদিন অশোকের হাকুম, হেগেল সম্বন্ধে আমার কী-কী নোট আছে দিতে হবে। শুনে মনে হ’লো, হায় হায়, কেন অন্য ছেলেদের মতো নোট রাখিনি! কিন্তু আমার যে কোনো নোটই নেই, এ-কথা অশোক বোধহয় বিশ্বাস করলো না; ভাবলো পরীক্ষা সংক্রান্ত আমার সব গোপনীয় তুকতাক ফুশমন্তরে আমি অন্য কাউকে অংশী করতে চাই না। যাই হোক,ত অপর্ণার হ’য়ে অশোক আমাকে পড়াশুনো বিষয়ে আর কোনো কথা জিগেস করেনি।


অতএব দর্শনের ছোটো ক্লাসে দুটো বেঞ্চির ওপারে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরটা কাটলো। আমার মনে হ’তো, অপর্ণা আমার দিকে ঘন-ঘনই তাকাচ্ছে কিন্তু এই নিশ্চয়ই আমার মনে ভুল।

এম. এ. পরীক্ষা হ’য়ে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদায় দিয়ে বেকার-বাহিনীতে ভর্তি হবার সময় যখন ঘনাচ্ছে, এমন সময় অশোক একদিন আমার বাড়ি এসে সুখবর দিয়ে গেলো। তারিখ পর্যন্ত ঠিক। আজ সন্ধ্যায় কন্যার আশীর্বাদ উপলক্ষ্যে অপর্ণাদের বাড়িতে উৎসব, আমি যেন অবশ্যই যাই।

আমি তক্ষুনি বললুম, ‘যাবো।’ আমার হঠাৎ মনে হ’লো আজ আর আমার যাবার কোনো বাধা নেই, যদিও এতদিন যে কী বাধা ছিলো তাও আমি জানি না।

এই প্রথম আমি অপর্ণাকে কাছাকাছি দেখলুম, তার কথা শুনলুম। কিন্তু সেদিন তার সম্পূর্ণ অন্য মূর্ডু, কপালে চন্দন, পরনে খয়েরি রঙের রেশমি শাড়ি, গা ভরা গয়না। চেনাই যায় না। যে-ঘরটায় গিয়ে বসলুম সেখানে অনেক লোক। অধিকাংশই আমার অচেনা, সুতরাং জড়োসড়োভাবে চুপ ক’রে রইলুম।

অশোক এক সময়ে আমার কাছে এসে চুপি চুপি বললে, ‘এখানে তোমার ভালো লাগছে না, বুঝতে পারছি। চলো আমার সঙ্গে।’

নিয়ে গেলো আমাকে পাশের একটি ছোটো ঘরে, অপর্ণার পড়ার ঘর সেটা। চারদিকে দর্শনের বই দেখে খানিকটা আরাম পেলাম। আমাকে বসিয়েই অশোক যেন কোথায় অন্তর্হিত হ’লো, ভারি ব্যস্ত সে। একা ব’সে আমি একটি বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলুম।

মৃদু শব্দ শুনে চমকে তাকিয়ে দেখি অপর্ণা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। সন্ত্রস্ত হ’য়ে উঠে দাঁড়ালুম, কী বলবো ভেবে পেলুম না।

অপর্ণা প্রথমে কথা বললে, ‘এতদিনে আপনি এলেন!’

আমি বললুম, ‘আমার অভিনন্দন আপনাকে জানাই।’

‘এতদিন আসেননি কেন?’

‘আসিনি-আসিনি-তার মানে-আসা হয়নি আরকি।’

‘অশোক আপনাকে বলেনি আসতে?’

‘বলেছে।’

‘আপনি কি ওর কথা বিশ্বাস করেননি?’

‘অবিশ্বাস করিনি, তবে-’

‘তবে আমার সঙ্গে আলাপ করার আপনার ইচ্ছে হয়নি, এই তো?’

‘না-না-ইচ্ছে হবে না কেন।’

অপর্ণা একটু মুচকি হেসে বললে, ‘থাক, এখন আর ভদ্রতার কথা ব’লে কী লাভ-এখন তো আর সময় নেই।’

শেষের কথাটা শুনে হঠাৎ আমার বুকের ভিতরটা ধ্বক ক’রে উঠলো। অপর্ণা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘এই চার বছরে অশোককে দিয়ে এতবার আপনাকে খবর পাঠালুম,-একবার এলেন না!’ তারপর একটু চুপ ক’রে থেকে ঈষৎ মাথা নেড়ে খুব নিচু গলায় বললে, ‘কিচ্ছু বোঝেন না আপনি!’ সঙ্গে-সঙ্গে শুনতে পেলুম অপর্ণার দীর্ঘশ্বাস, কিন্তু সেটাও বোধ হয় আমার কল্পনা।

বাড়ি ফিরে অনেক রাত অবধি ঘুমোতে পারলুম না, হয়তো তার একটা এই যে অন্যমনস্কভাবে ও-বাড়িতে অত্যন্ত বেশি খেয়ে ফেলেছিলুম। শুয়ে-শুয়ে অনেক কথা মনে হ’লো। অপর্ণার কথাগুলি বিষাক্ত পোকার মতো মগজের মদ্যে যেন কামড়ে ফিরছে। ভাবনাগুলো যেখান থেকেই শুরু হোক, খানিক পরে এক অন্ধ গলির সামনে এসে পড়ে, তারপর আর রাস্তা নেই। আমি যে কত বড়ো বোকা তা উপলব্ধি ক’রে স্তম্ভিত হ’য়ে গেলুম। অন্ধকারে চোখ মেলে নিজের মনে বার-বার বললুম, ও আমাকেই চেয়েছিলো, আমাকেই চেয়েছিলো, হয়তো এখনো-না, না, এখন আর সময় নেই, আর সময় নেই।

কয়েকদিন পরেই অপর্ণার বিয়ে হ’য়ে গেলো, আর আমি চ’লে এলুম কলকাতায় চাকরির চেষ্টায়।

দশ বছর কেটে গেছে। আমি এখনো বিয়ে করিনি, তার কারণ আমার ক্ষীণ আয়ের উপর মা-বাবা-ভাই-বোনের নির্ভর, আমি বিয়ে করলেই তাদের ভাগে কম পড়বে, অতএব সে-বিষয়ে আমার উদাসীন থাকাই কর্তব্য। অশোক ঢুকেছিলো ইনকাম ট্যাক্সে, এতদিনে নিশ্চয়ই অফিসার হয়েছে, হয়তো রংপুরে, হয়তো বরিশালে, হয়তো চাটগাঁয়ে হাকিমি করছে। আমার জীবন অত্যন্ত শান্ত ও নিয়মিত; কোনো আক্ষেপ, কোনো উচ্চাশা, কোনো কল্পনা নেই। দর্শন পড়ি ও পড়াই, নিছক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকেই জীবনের একমাত্র সুখ ব’লে মেনে নিয়েছি। ভালোই আছি।

শুধু মাঝে-মাঝে অনেক রাত্রে সেই একটি তরণ শ্যামলা মুখ আমার মনে পড়ে, সরু হাতে একটিমাত্র চুড়ি, নীল শাড়ির পাড় মাথাটিকে ঘিরেছে। অন্ধকারের কে যেন চুপি-চুপি কথা বলে-‘এত দেরি ক’রে এলেন-আর তো সময় নেই।’ ০

২টি মন্তব্য:

  1. নিছক ত্রিকোণ কাহিনি মনোরম করে লেখা - কবিতার মতো।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন
  2. অন্ধকারের কে যেন চুপি-চুপি কথা বলে-‘এত দেরি ক’রে এলেন-আর তো সময় নেই।’ ০- অসাধারণ লেখা।

    উত্তরমুছুন