শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

ইকবাল করিম রিপন এর গল্প ; লাল রাতা

মাঝে মধ্যে এমনটিই হয়। মোরগটা অসময়ে বাক্ দেয়। বিছানার এপাশ ওপাশ করে কিছুতেই ঘুম আসে না কালু মিয়ার। চৌচালা শনের ঘর। মাঝখানে বেড়া দিয়ে দু'টো রুম। আড়চালা টেনে মাটির চুলো বসিয়েছে কালুর বৌ রহিমা। বেড়ার দু'একটা গোয়াড় আর কয়েক জায়গায় বেড়া ভেঙ্গে গেছে বলেই রাত-দুপুরে ফকফকা চাঁদের আলোয় ঘরের ভিতরে অনেকটা আলোকিত। কালু টের পায় এখনও মাঝরাত।


চাঁদের আলো আর ধলপহরের কিছুইলা আন্দাজ করা যায় না। অনেকবার লাঙল কাঁধে নিয়ে গোয়াল ঘর থেকে গরু বের করে ধীর পায়ে জমিনের দিকে পা বাড়ায়। ফজরের আযান শুনলে কালু টের পায় তার ভুলটা। আজ তেমনটি হয় নি। তবুও ইচ্ছে এই নিঝুম ঘুমের পাড়ায় অাকাশফাটা জোছনারাতে জমিনে একাকী লাঙল ঠেলতে। মাটিতে তেল চিটচিটে একটা পাটি বিছিয়ে রহিমা শুয়ে আছে আলাদা হয়ে। বেশ গরম পড়ছে এ কদিন ধরে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে গলে পড়া চাঁদের আলো রহিমার এলোচুলে স্থির হয়। ভ্যাপসা গরমে শরীরের ঘামের ফোঁটাগুলো মাঝরাতের শীতল পরশে আর নেই। শরীরের গন্ধ এখন আলাদা হয়েই আছে। নিজের শরীরের ঘ্রাণ শুঁকে নেয় কালু মিয়া। বেশ ভালোই লাগছে। মাঝে মধ্যে রহিমার শাড়ীর আঁচল তৃপ্তিতে অস্থিরতার ঝড় তোলে। ইতস্ত:ত ভাবে কালু মিয়া। রহিমা জেগে নেই। জাগিয়ে দিলে হয়তো বিরক্তি বোধ করবে। তাছাড়া রহিমা বেশ সাবধানী মেয়ে। সময়ের সঠিক হিসেব বাংলা মাসে গণনা করে হাতের পাঁচ আঙুলে। কয়দিন হলো কে জানে। হিসেবের দায়িত্বটা ভাগাভাগি করে নিলেইতো হয়। রহিমা ঠিকই হিসেব রাখে। জমিতে লাঙলের ফলা কতটুকু মাটি উপড়িয়েছে। বলদ দু'টোর শক্তির পরিমাপ। গাভীটির ওলানের দুধ দিন দিন কমে যাচ্ছে ইত্যাদি।

মোরগটি বেশ কয়েকবার বাক্ দিতেই পোষা কবুতর দু'টিও কেমন গুম্ গুম্ বাকর্ বাকর্ স্বরে ডেকে উঠলো। কালু মিয়া শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠে বসলো। ঘুমের লেশ মাত্র নেই। শরীরটাকে তাজি ঘোড়ার মতো বেশ শক্ত সামর্থ মনে হয় তার। কালু যখন উদোম শরীরে রোদেলা দুপুর নিয়ে হালটানা বলদের পিছনে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, রহিমা তখন গাছের ছায়ার নিচে শাড়ীর সবুজ আঁচলে মুখ ঢেকে কালুর লোমশ বুকে একঝাঁক স্বপ্নের ডানায় ভর করে। কালু এরে...তিতি... ব...ব... বলে হালের বলদ দু'টোকে থামিয়ে দিয়ে রহিমার দিকে এগিয়ে এসে এক গ্লাস পানি চায়। রহিমাও বুঝতে পারে তার পানির পিপাসাটা কখন জাগে। কালু ভাবে, এই মাঝ রাতে রহিমাকে ডেকে এক গ্লাস পানি চাইবে কিনা। পানিতো সে ইচ্ছে করলে নিজেই খেয়ে নিতে পারে। মাটির লাল কলসি দুটোও বেশ স্পষ্ট। কালুর দৃষ্টি স্থির হয় ভরা দুটো কলসির দিকে। হাত বাড়ালেই হাতের কাছে। নাহ্, এত রাতে অন্ধকারে হাতড়ে কলসি ছোঁয়া ভালো হবে না। তবুও পুকুরের পানি বাসি বা সেদ্ধ করে কলসি পুরিয়ে রাখে রহিমা। ভরা কলসীর পানির দিকে কালুর দৃষ্টি। আজ তৃষ্ণাটা অন্যরকম। বুকের অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে কালুর। মাঝে মাঝে এরকম হয়। দিনগুলো খরা যাচ্ছে। দিনের সূর্যটার তেজও বাড়ছে দিন দিন। জমিনের মাটির ফাটল কালুর দৃষ্টির সচেতনতায় আসলে অন্যরকম এক অস্থিরতায় জেগে উঠে। রহিমাও শরীরের আড়মোড়া ভেঙ্গে তাগাদা দেয়। ওগো! সেচের ব্যবস্থা করো। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়া অসম্ভব। খোদাতালাও ধৈর্য ধরতে বলেছেন। মাঝে মধ্যে রহিমাও বলে এই! সাবধান। শরীয়তের বাইরে গেলে গুণাহ্ হবে। কালু ধৈর্য ধরে। ধৈর্যের বাঁধ কতক্ষণ থাকে?

আকাশের চাঁদটা বেশ জ্বলজ্বলে। ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের কাঁপা কণ্ঠ -.....। গামছাটা কাঁধে নিয়ে দরজা ঠেলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায় কালু। ভোরের ঝিরঝিরে হাওয়া পুরো পৃথিবীটাই যেন সেজদা থেকে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। পাখালির বিচিত্র কোলাহলে পৃথিবীটাকে যেন আরও অস্থির করে তুলছে। গোয়াল ঘরের বলদ দু'টোর উপর জোঁযাল তুলে দিয়ে লাঙল কাঁধে কালু মিয়া রওনা হলো জমিনের আল ঘেঁষে। ততক্ষণে রহিমা মুরগীর খোয়াড়েরর দরজা ঠেলে দিতেই বাচ্চার ঝাঁক নিয়ে মুরগীটি বেরিয়ে পড়লো সারা উঠোনে। রাতাটা বেশ কয়েকবার পালক ঝুলিয়ে মুরগীটির পাশ ঘেঁষতেই মুরগীটি প্রতিবাদী হয়ে সরিয়ে পড়ে। লাল ঝুটির উপর রহিমার দৃষ্টি। শরীর ফুলিয়ে বেশ কয়েকবার বাক্ দিয়ে উঠলো রাতাটি। উদগ্র রতিচ্ছায় রাতাগুলো বরাবরই এরকম হয়। মুরগীর বাচ্চাগুলোকে রহিমার আজ বেশ বড় লাগছে। পালকের ছায়ায় এই বাচ্চাগুলি বড় হবে। পিতৃ পরিচয় এই লাল রাতাটি। এসব রহিমার চোখের সামনে ঘটা করেই হয়।

রহিমার মনে পড়ে বাসরের পয়লা স্মৃতি। হারিকেনের মৃদু আলো, শ্যামলা গতরের মরদটির বোকাভাব। রহিমা প্রথমে দেখে আড়ষ্ট হলেও দু'চামচ চিনি মুখে তুলে দিতেই নেতিয়ে পড়ে লজ্জায়। রহিমার হাত দিয়ে চিনি তুলে নেয় কালু মিয়া। দুষ্টুমীর ছলে হাতের উপর আলতো কামড় দিয়ে বলেছিলো চিনিগুলো নোনতা। পৃথক ঘ্রাণের সন্ধানে সেদিন কালু মিয়া ডুব দিতে চেয়েছিল আকণ্ঠ সবুজের সন্ধানে। রহিমার প্রতিবাদ মুরগীটির মতো অতো সরব ছিল না। একটা পুরুষকে সেবার প্রথম অনেক কষ্টে জানিয়েছিল রহিমা, জমিনে লাঙল দিও আপত্তি নেই তবে মৌসুমে দাও। কালুও বুঝে নিয়েছিল। জমীনটি এখনও খরা নিতান্ত তার জন্যে। বৃষ্টি কখন হবে? কালু মুখ ফুটে কিছুই জেনে নিতে পারেনি সেদিন রহিমার কাছ থেকে। এখনও সে সবিস্তারে অতোসব জানে না। যদিও মৌসুমী ফসল বুনে জমীনে জমীনে।

চারটি বছর হয়ে গেলো তাদের বিয়ে হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে। রহিমার। রবিজার মা'র তাবিজ তুমার, মৌলানা আলী আহমদের পানি পড়া, ঝাড় ফুক, সাত পুকুরের পানি তোলে অমাবস্যার রাতে উদোম গোসল সারা, কিছুইতো বাদ যায় নি। পুরুষটিও কেমন পুরুষ। মেম্বার চাচা বলেছিলেন গঞ্জে ডাক্তার দেখাতে। কবিরাজ লাল মিয়ার লাল বোতলগুলিও ঢককঢক্ করে আস্ত গিলে ফেলে কালু মিয়া। যে যাই বলে তাই করে। কালু মিয়ার রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, দু:খ নেই এ ব্যাপারে রহিমার উপর। অথচ এসব কারণে রহিমার চাচাত বোন সুফিয়াকে তালাক দিয়েছিল তার সোয়ামী। বেধড়ক মারপিটের কাহিনী শুনে রহিমাও আঁতকে উঠতো। তার চোখে ভাসে, সুফিয়া'বু বুকে কাপড়ের পুটলী জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পেছন দিয়ে বাপের বাড়িতে ঢুকে পড়তো। মা-বাপ-ভাইগুলিও কেমন, আবার ঝেঁটিয়ে পাঠিয়ে দিত শ্বশুর বাড়ি। পাড়ার বুড়ী মুরুব্বীগুলোও নানারকম বুজভাজ দিয়ে সেই পাষাণ পিশাচগুলোর হাতে বিক্রিত দাসীর মতো তুলে দিত। সুফিয়াবু আত্মহত্যা করেছিল বলেই রহিমার চোখে এখন সব ষ্পষ্ট। এসব ভাবতে ভাবতে রহিমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠে। বিন্দু বিন্দু ঘেমে নেয়ে উঠে পুরো শরীর। এমন সময় ভরাট গলায় ডাক পড়ে সামনের উঠোন থেকে ও রহিমন ..............রহিমন। কালুর মনটা যেদিন বেশ সরস থাকবে সেদিন রহিমাকে রহিমন বলেই ডাকবে। রহিমা ছুটে যায়। রোদে পোড়া তামাটে ঘর্মাক্ত শরীর, ক্লান্ত হয়ে ঘরের পৈঠায় বসে পড়ে। রহিমার কাছে এক গ্লাস পানি চায়। গাছের ছায়ার নিচে বলদ দুটোও বেশ ক্লান্ত হয়ে মাটিতে লুটে জাবর কাটে।

জমীনের মাটি উপড়ানো আজ বেশ ভালোই হয়েছে। কালুর সাত রাজার ধন বলদ দুটো। লাঙল ঠেলে পরিশ্রান্ত হয়ে বিশ্রামের সময় আনমনে ভাবে কালু, -এ বছর কানিতে চল্লিশ আড়ি। হাতের আঙুলে নিজের হিসেব মিলিয়ে নিজে নিজে হাসতে থাকে। রহিমা গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে পরিশ্রান্ত মরদটির পাগলামী দেখে। দুষ্টুমী করে গ্লাস থেকে সামান্য পানি ছিটিয়ে রহিমা সোয়ামীর স্বপ্নগুলোকে আউলা করে দেয়। কালু উত্ফুল্ল হয়ে বলে রহিমন! এইবার একটা বড় গোলা বানাবো। ধানের গোলায় সারা বছর পড়ে থাকবি, বুঝলি তো। রহিমা কোন উত্তর দেয় না। নিরবে এই মরদটাকে দেখে। গত বছরও জমীনে বেশ ধান হয়েছিল। গোলার ধান এখনও শেষ হতে না হতেই কালু মিয়া ধানের আড়ি গুণে। শক্ত সামর্থ এই জোয়ান পুরুষটি লাঙল ঠেলে সবুজের প্রতিটি শস্যদানাকে কুড়িয়ে নিতে পারে। আজ চারটা বছর হয়ে গেলো সে একটা সন্তানের জনক হতে পারলো না। উত্ফুল্ল পুরুষটিকে যখন কেউ এ কথাটি শোনায় তখন সে নির্বাক অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। এই সরলতায় রহিমার আরও কাছে টানে পুরুষটিকে। তাদের সংসারে কিছুর অভাব নেই। তবুও এই সৌষ্ঠব শক্ত মরদটির প্রতি মাঝে মধ্যে অব্যক্ত একটা অপূরণে বেশ অভিমানী হয়ে উঠে রহিমা।

সন্ধাবেলার চেরাগ জ্বলছে ঘরে। লাল শিখার কালো ধোঁয়াগুলো চুলোঘরের আড়চালায় জমছে। তাদের সংসারের প্রতিটি মুহুর্তের সাক্ষী যেন এই চুলোঘরের আড়চালার ঝুলকালির লিখনে লেপ্টে যাচ্ছে। কালের সাক্ষীতে কালু আর রহিমার সংসার বইয়ের ছাপানো কালো অক্ষরে হয়তো কখনও দেখা যাবে না। গ্রামের রীতিতে রাতের খাওয়াটা সন্ধার পর পর। রহিমা আজ শীতল পাটিতে নকশী কাঁথার চাদর বিছিয়েছে। আকাশের জোছনা বেড়ার ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, যেন প্রথম বাসরে নব দম্পতির মিলন আজ। তাই পাড়ার উঠতি ছেলেদের ফিসফাস করছে। রহিমার চোখ ভাসছে রোদপোড়া গন্ধমাখা লাল রাতাটির দৌঁড়, রাতাটির চঞ্চল সওয়ারে দু'পা ভাঁজ করে বসে পড়া এক প্রণয়লীলা। কালুর চোখে ভাসে সোনালী ধানের শীষ। হাতের আলতো ছোঁয়ায় লজ্জায় নেতিয়ে পড়ে। সবুজের সমস্ত ঘ্রাণ সবুজ আঁচলে ভিড় জমিয়েছে। কালুর শরীরের রোদপোড়া ঘ্রাণে উতলা হয়ে উঠেছে জমিনের কাঙ্খিত সংগম। পৃথিবীর সব পাপ যেন গুটিয়ে পালায় এই রাতে। রূপালী চাঁদের মিষ্টি আলোতে অদ্ভুত এক কন্ঠ শুনতে পায় কালু। এ কোন মানুষের কন্ঠে নয়। দিগন্তজোড়া জমীনের এক কোণে দাঁড়িয়ে সবুজের নাচন দেখছে আর শুনছে -এ তোমার শস্যক্ষেত্র। যেভাবে ইচ্ছে গমন করো। কিন্তু রহিমার মনে সংশয়। তবুও আশার আকাশে তাকিয়ে দেখে, একঝাঁক মুরগীর বাচ্চা নিয়ে তার সংসার। আর লাল রাতাটি শরীর ফুলিয়ে বাক্ দিচ্ছে সময়ে অসময়ে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন