বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

আবছায়ায় জ্বল জ্বলে নীল দুটি চোখ

মাহমুদ হাসান পারভেজ

নভেম্বরে শেষ সপ্তায় হাড় কাঁপানো শীতের সন্ধ্যায় রাঙ্গু শেষতক মারা গেল। তার আগে গৌরির ঘন ঘন আদুরে হাতগুলোর যাদুমাখা পরশ- বার বার তার হারানো মায়ের কথা মনে করিয়ে দিল। কত বয়স হবে ওর? পনের কি ষোল দিন। আমার পুত্র সন্তানের বয়সের সমান কি! ঐটুকু নবজাতকের বেঁচে থাকার জন্য মায়ের ওম যে কি দরকারি!
তবু শেষ চেষ্টা করেও হ’লনা। বাঁচানো গেলনা তুলতুলে লোমশ শরীরের রাঙ্গুকে। যাকে সাঁওতাল রাজার একমাত্র জীবিত বংশধরের গ্রাম থেকে তুলে এনেছিলাম দু’দিন আগে। সে গ্রামের নাম রঙ্গন গাঁ। গৌরি গাঁয়ের নামের সাথে মিলিয়ে বিড়াল ছানাটির নাম রেখেছিল- রাঙ্গু।

জন্মের পর শিশুকে মা তার শরীরের ওম দিয়ে যেভাবে আগলে রাখে- গৌরিও সেভাবে চেষ্টা করে গেল। না, লিকলিকে শরীরে আসল মায়ের উষ্ণতা কোনভাবে ফিরে এল না। ছানাটি গৌরির হাতের তালুতে ছোট্ট মুখটা গুঁজে দিল। মুখে হালকা সাদা বুদবুদ ফেনা হয়ে ঝরছে। লালার মত। শেষবারের মত আমার চোখে চোখ রাখতে পারল। ছানাটির ভেজা আর্ত চোখের চারপাশে কালসিটে পড়ে গিয়েছিল। গর্তের ভেতরে ঢুকে যাওয়া চোখ দুটি কোন রকমে সে মেলে রাখলো। টের পেলাম- গৌরির নীল যাদুময় চোখের মতই রাঙ্গুর চোখজোড়াও নীল। আর কোটরাগত সেই জ্বল জ্বলে নীল চোখের তারায় তখন মৃত্যুর আবছায়া! আর শেষবার সে অস্ফুট ‘মিউ মিউ’ স্বরে আমাকেই যেন বলল- ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ নয়, আমিই দায়ী।’

নিঃসাড় তুলতুলে দেহটা গৌরি তখনও ধরে রাখল। যেমন করে কোন মা তার সদ্য ভূমিষ্ট শিশুকে ধরে রাখে, হওয়ার পরপর আলতো কোলে - বুকের সাথে- ঠিক সেভাবে। যেন নবজাত শিশুটি মায়ের বুকে ধড় রেখে চিরদিনের মত ফিরে গিয়েছিল – মহাশুন্যে। সন্তান হারানো মায়ের মতই গৌরির চোখ ভিজে উঠল। বাঁধ না মানা অশ্রুরা গৌরির নীলাভ ঝাপসা দৃষ্টির কাজল ভিজিয়ে টপ টপ করে পড়ল, পড়েই হারিয়ে গেল ছোট্ট মৃতদেহের ফুলে থাকা লোমের ভেতরে। রাঙ্গুকে হারানোর শোকে বসে থাকা গৌরিকে জগদ্দল পাথরের মত ভারী দেখাল। দুই হাতে রাঙ্গুকে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে কাঁদল । সে কান্নার কী অর্থ- তা আমার বোঝার সাধ্যে ছিল না। আমরা ঠিক করলাম, আগামীকাল ফাঁকা রাস্তার পাশে মাটি খুঁড়ে কবর দেওয়া হবে।

আবাসিক হোটেল রুমের বাইরে তখন ভারি কুয়াশার কুন্ডলিরা দ্রুতই নিকশ এক অন্ধকার রাত নামিয়ে আনল। আমার চলে যাবার সময় হয়েছিল। গৌরিকে সান্তনা দেওয়ার মত কোন ভাষা আমার জানা নাই। ‘কাল দুপুরে দেখা হবে’ বলেই আমি হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

আমাকে তখন ফিরতে হবে পঞ্চাশ মাইল দুরে অন্য আরেক শহরে। হোটেলের গাড়ী গ্যারাজ থেকে আমি মোটর বাইক স্টার্ট করলাম। হেড লাইট জ্বালিয়ে দিলাম মহসড়কের পাসিং লাইন বরাবর।

ঘন্টা দুয়েক পর মহাসড়কের সাদা পাসিং লাইন গুলো সোজা গিয়ে ঢুকলো আমার শহরে। সে শহরে আমরা বহুকাল ধরে বাস করি, একই বাড়ীতে- আমাদের পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া ছোট বড় ঘরগুলোর সাথে মিলেমিশে। বাড়ীটায় সকলের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সুখ-দুঃখ আর হাসি কান্না আমরা ভাগ করে নিতে শিখেছিলাম কোন অদৃশ্য উপায়ে। আমাদের কন্যা-পুত্র সেখানে বেড়ে উঠছে পরম যত্নে ওদের মা দাদা দিদা চাচ্চু ফুপ্পি’র সাথে।

আমি বাড়ীতে ফিরলাম রাত সাড়ে দশটায়। ছোটরা তখন ঘুমিয়েছে। পরিবারে অন্যদের সাথে নিয়মিত কথোপকথন সারলাম। হ্যাপীর সাথে গুরুত্বপুর্ণ কিছু সাংসারিক আলোচনা শেষ করলাম- মনের ভেতরে থাকা গোপন প্রেমিককে জাগিয়ে রেখেই। যে প্রেমিক পুরুষ গত হয়ে যাওয়া দুটো দিন কাটিয়ে দিয়েছিল নিঃসঙ্গ গৌরির সংসারে।

রাতের খাওয়া শেষে দেরি না করে আমি শুয়ে পড়লাম। অতি পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বিছানাটা আমার কাছে অসহ্য ঠেকল। হ্যাপীর সাথে আমার বিয়ের দশ বছর গড়িয়েছে। এত দিনে ওর সাথে আমার বলার মত টু শব্দটিও হয়নি। ঝগড়া তো দুরে থাকুক। খুবই লক্ষী বউ আমার। বাবা-মায়ের পছন্দেই আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আমিও তাকে কোনদিন অপছন্দ করি নি। বিয়ের পর থেকে আমরা ভালবাসতে শুরু করেছিলাম। এখনও সে ভালবাসায় কোন কমতি নেই। বউ হিসেবে আর সবার কাছে হ্যাপী উদাহরণ।

আরেক দিকে অন্য দশজনের মত গৌরিও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার সাথে আমার বলার মত বন্ধুত্ব পর্যন্ত হয়নি। গৌরি ছিল ভীষণ দেমাগি মেয়ে। অসম্ভব সুন্দর নীলাভ দৃষ্টির কারণে গৌরি ছিল সকলের কাঙ্খিত। স্বভাবমত আমি গৌর বর্ণের অধিকাংশ সুশ্রী মেয়েদের অহংবোধের কাছে হার মেনে চলেছি। যেমন হয়- বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে যে যার মত কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমিও তেমনি একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। সে ও প্রায় একযুগ পেরিয়ে গেছে।

গৌরির সাথে আমার নতুন করে পরিচয়-বন্ধুত্ব হয়েছিল মাস ছয় আগে। সে আদিবাসি শিশুদের শিক্ষা নিয়ে একটা বেসরকারি সংস্থা চালায়। কাজের সূত্রেই এসেছে আমার কর্মস্থলে। আর এভাবেই অকস্মাৎ দেখা হওয়া। আর সেটা বন্ধুত্ব অবধি গড়াল। জেনেছি, সে এখনও বিয়ে করেনি। কেন করেনি সেটা কখনও জানতে চাইনি। তবে কোনদিন বিয়ে করবেনা বলেই তার সিদ্ধান্ত- সেটা আমাকে বলেছিল। এরপর গৌরি ফিরে গেলে মোবাইল ফোন আর ফেসবুকে কথা হয়েছে রোজ রাতে- যখন আমি অফিসের ক্যাম্প হাউজে একা থেকেছি তখন। প্রতিদিনের এই যোগাযোগ যে কোন ফাঁকে আমাদের ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল বোধ হয় আমরা কেউ তা টের পাইনি। পরষ্পরকে আবিষ্কারের ঘোরে আমরা তলিয়ে গিয়েছি।

দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার কিট কিট শব্দটা দুই কান দিয়ে আমার মাথার মগজে ঢুকে যাচ্ছিল। মাঝরাত পেরিয়ে গেলেও আমি ঘুমাতে পারছি না। লেপের ভেতর পাশ ফিরে শুয়ে হ্যাপীর শান্ত মুখের দিকে তাকালাম। ঘরের হালকা নীল আলোয় দেখলাম মমতাময়ী মায়ের পরশে হ্যাপী শিশু পুত্রকে জড়িয়ে ধরে আছে। লেপের ভেতর থেকে খোকার চুক চুক করে খাওয়ার শব্দ পাচ্ছি। গত সন্ধ্যায় মরে যাওয়া রাঙ্গুর কথা মনে হ’ল। মরার আগে শেষ কথাটা সে বলেছিল- ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ নয়, আমিই দায়ী।’ রাঙ্গুর কোটর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা চোখদুটি তখন আমার বন্ধ চোখের পাতায়। ভিষণ নীল জ্বল জ্বলে সে চোখের আকুতি। গৌরির নীলাভ দৃষ্টিও আমার দিকে একইভাবে চেয়ে আছে। আমার বুকটা কেঁপে উঠল। গৌরি না কি হ্যাপী! হ্যাপী না কি গৌরি!

আমার গুমোট অস্থিরতায় তখন প্রকট সিদ্ধান্তহীনতা। কষ্মিনকালেও আমি এ ঘর- এ বিছানা ছাড়তে পারবনা। এ অসম্ভব! এই যে আমার খোকা- সে তো আমার দাবিদার। তাকে আমি ফেলে যাই কি করে? ও ঘরে আমার আরেক অংশ- বড় কন্যা। দিদার সাথে পরম স্নেহ জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুম থেকে জাগলেই যে বাবার জন্য অনেকদিনের নিয়ম মতো অপেক্ষা করবে শুধু একটি মাত্র কথা শোনার জন্য- ‘গুড মর্নিং বাবা’। তাকে ফেলে যাই কি করে? অথচ আমার জন্য অপেক্ষায় আরো একটি ঘর।

‘কি হয়েছে! কোন সমস্যা?’ হ্যাপী জিজ্ঞেস করতেই টের পেলাম সে জেগে আছে। আর নিরবে জ্বলতে থাকা ঘরের নীল বাতির আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে আমাকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। আমার অস্থিরতা যাতে কোনভাবে টের না পায়- স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, ‘ না, এমনি। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল’। ঘুম জড়ানো গলায় সে আবারও তলিয়ে গেল। শুধু শুনতে পেলাম- ‘ও’। যার অর্থ হতে পারে- দীর্ঘ গর্ভ ও প্রসবজনিত বিরতিতে অপেক্ষমান স্বামীর জন্য স্ত্রীর আপ্তবাক্য- ‘ও। এই তো আর কয়েকটা মাত্র দিন। একটু ধৈর্য ধর- আমার প্রাণভোমরা।’

কিন্তু হ্যাপী কোনভাবেই জানলনা যে- তার প্রাণভোমরাটি এখন অন্য কোন ফুলে। সমস্ত অপেক্ষা আর ধৈর্য-শুড় যেখানে বিলীন হয়ে গিয়েছিল- সেই মন মাতানো ফুলের গোলাপী পাপড়ির অজস্র আকর্ষণে। যার মধুরসে নীল বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল প্রাণভোমরাটি। আর কেবল একটা কথাই বলতে পেরেছিল। ‘ইটস আ সুইট নভেম্বর!’


সে রাতটা কেটেছিল এক অজানা অস্থিরতায়। সারারাত জেগেই কাটল। বারবার ফিরে আসছিল- গৌরির নীলাভ দৃষ্টির সাথে রাঙ্গুর জ্বল জ্বলে নীল চোখগুলোর আকুতি। যে চোখের ভাষায়- ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ নয়, আমিই দায়ী।’। স্বরটা মাথার ভেতর পুণশ্চ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল!

রাতের পরের দিনটা ছিল আমার সপ্তাহান্তিক ছুটি। নিয়ম মতো সকাল বেলা আমার কন্যাকে বললাম ‘গুড মর্ণিং বাবা’। লেপের ভেতর গুটিয়ে থাকা কন্যা গত সপ্তাহের আঁকিবুকি খাতাটা তার বালিশের তলা থেকে বের করে আমার দিকে তুলে ধরল। আমি দেখলাম- সাদা ক্যানভাসে সে প্যাস্টেল দিয়ে এঁকে রেখেছিল একটা নাম না জানা বড় পাপড়িওয়ালা ফুল। একেকটা পাপড়ি একেক রঙের। নীল হলুদ সবুজ আর নানা রঙিন। তার পাশে তারকাখচিত যাদু কাঠি হাতে ছোট্ট পাখায় উড়তে থাকা এক ঝাঁকড়াচুলের ঝলমলে পরি। যে পরি তার নিয়মেই ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে। অবিরত। প্রতি ভোরে। আমার ছোট্ট মেয়েটার মতই ঘন কালো আর ঝাঁকড়া সে চুলগুলো। আমি অভিভূত হয়ে ছবিটাকে দেখলাম। আর কি আশ্চর্য! সেই পরির চোখদুটিও নীল জ্বল জ্বলে!


এই ছুটির দিনে দুপুরেই আমার সেই শহরে ফিরে যাওয়ার কথা। যে শহরে আমি মৃত রাঙ্গুর জ্বল জ্বলে নীল চোখ আর নীলাভ দৃষ্টির গৌরিকে ফেলে এসেছিলাম। যে শহর আমার কর্মস্থল। কাজের দিনগুলোতে অন্যান্যদের সাথে অফিসের ক্যাম্প হাউজে একটা গেস্টরুমে আমার দৈনিক রাত-বাস। সেখানে গৌরিকে নিয়ে থাকা অসম্ভব বলেই শহরের একটা আবাসিক হোটেলে উঠেছিলাম- এই বলে যে সে আমার বিবাহিতা। আর বিবাহিতদের মতই সে হোটেলে আমরা গত দুই রাত কাটিয়েছি। আর অপেক্ষায় ছিলাম, একটা যুতসই বাসা-বাড়ী পেয়ে গেলে আমরা সেখানে উঠে যাব। গৌরি তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে বাড়ীতে এসে থাকবে। আর আমি ক্যাম্প হাউজ ছেড়ে সে বাড়ীতে গিয়ে উঠব। বিয়েতে গৌরির কোন বিশ্বাস ছিলনা। সে মনে করে, আত্মা শুদ্ধ হলেই- মানুষ পবিত্র হয়।


গৌরি আমার সবকিছুই জানে। আমার পরিবার। আমার ঘর। আমার খুঁটিনাটি সব। তবু কেন সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই। আর আমি সেই লোক- যে শেষ পর্যন্ত কোন কথাই রাখিনি। না সেই জ্বল জ্বলে নীল চোখের আকুতি। না নিঃসঙ্গ গৌরির চার দেয়ালের ঘর। যে ঘরটা তার কোনকালেই ছিলনা। সে বহুকাল আগের কথা। শহরের রাস্তায় পুরনো কাপড়ের হকার বাবার বড় মেয়ে গৌরি। যে বাবা নেশার রাজ্যে বিকিয়ে দিয়েছিল নিজের বাবা জীবন। আর মা গৌরিকে রেখে বিয়ে করেছিল অন্য কোন পুরুষকে। আরো একটা নতুন ঘরের আশায়। যে ঘরের জন্যই এতদিন বাদে ছুটে এসেছে মধ্যবয়সের গৌরি। সন্ধ্যা রাতে মোটর বাইকের হেড লাইটের আলোতে যেভাবে এসে আছড়ে পড়ে পতঙ্গের দল। অথবা কোন উল্কাপিন্ড যেমন করে শব্দহীন রাতে আকাশের বুকে ঝরে পড়ে- ঠিক সেভাবেই।

সবটাই গৌরির কাছ থেকে শোনা। ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে গৌরি বেড়ে উঠেছিল তার নানীর কাছে। তার নানী ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হলে পারমানেন্ট কুক। নানীর সাথে কোয়ার্টার এ থেকে সে হাইস্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা তার জীবনের এই গোপন বৃত্তান্ত কোনভাবেই জানতে পারিনি, পারার কথাও না। আমার সাথে ঘনিষ্ঠতায় সে আমাকে জানিয়েছিল, তার জীবনের সবচে গোপনীয়তাটুকুও। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনয়ির কর্মকর্তার কাছে হাইস্কুল জীবনেই তার কুমারীত্ব হারানোর যন্ত্রণার কথা। এরপর কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এমন কি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর পর্যন্তও যে গৌরিকে রক্ষিতার মত ব্যবহার করেছিল দীর্ঘদিন ধরে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি সেটা মেনে নিয়েছিলে কেন? কেন প্রতিবাদ করনি?’ উত্তরে গৌরি জানিয়েছিল, ‘প্রতিবাদ করিনি, কারণ সেই অফিসারটি ছিলেন আমার সৎ বাবা।’

ফলে বিয়ের সিদ্ধান্তে গৌরি ‘না’ করেছিল। যদিও তার জীবনে প্রেম আর বিয়ের প্রস্তাবের এক দীর্ঘ তালিকা আছে।

সারাদিন পরিবারের সাথে সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটিয়ে আমি ফিরে যাচ্ছি ফেলে আসা সে শহরের রাস্তায়। যেখানে আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল- দুপুরেরই। যেখানে অপেক্ষা করে আছে একটা মৃত তুলতুলে শরীর আর তার একমাত্র জীবিত সঙ্গী হতভাগ্য গৌরি। কথা ছিল মৃত রাঙ্গুকে আমরা রাস্তার পাশে মাটি খুঁড়ে কবর দেব। আমি ভাবছিলাম যে গৌরি কি ভাবছে। আমার ফিরে আসার কথা ছিল সেই দুপুরে। আর আমি সেখানে ফিরে আসছি ঠিকই। কিন্তু নিয়ম মাফিক অন্য সপ্তাহান্তিক ছুটি শেষের সন্ধ্যা গুলোর মতই। এমন কি এই দীর্ঘ বিরতিতে একটা ফোনও দিইনি। আসলে আমি বাড়ীতে ফিরে গিয়ে ফোনের ইনকামিং কল বন্ধ করে রেখেছিলাম-এই ভয়ে যে, আমি চাই নি কোনভাবেই গৌরির বিষয়ে হ্যাপী জানতে পারুক। যদিও গৌরিকে আমি বলেছিলাম যে, হ্যাপী তার কথা জানে। তবে সেটা সম্পর্কের ব্যাপারে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো সহপাঠীর সাথে অনেকদিন পর দেখা হওয়া।

ব্যাপারটা ছিল আমার জন্য ভীষণভাবে ছাপোষা। আর গৌরি সেটা জানত। হয়ত সে আমাকে কোন কলই দেয়নি। কারণ ওর ব্যক্তিত্ব ছিল আমার চাইতে পরিষ্কার। আমি ভেবে পাইনি তবু সে আমার কাছেই ছুটে এসেছিল কেন? সে উত্তর আমার জানা নাই।


রাস্তা জুড়ে সাদা আর ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে আমি মোটর বাইকটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম যতটা দ্রুত যাওয়া যায়। সে নিশ্চয়ই ভেবেছে আমার অপারগতা। আমার ভীরুতা। আমার শঠতা। সে কি জেনে গেছে আমার অপবিত্র আত্মার ভাষা? সে আমাকে ঘৃণা করেছে নিশ্চয়ই।

রাত নয়টার কিছু পরে আমি হোটেলে এসে পৌঁছালাম। হোটেলের নিজস্ব গাড়ী গ্যারাজে মোটরবাইকটা রাখছি তখন পরিচিত গেটম্যান জানাল, ‘ম্যাডাম তো সন্ধ্যায় বেরিয়ে গেল। বলল- সকালে একটা বাসা খুঁজে পেয়েছে- কথা পাকা করতে সেখানে যাচ্ছে’ আমি চুপ থাকলে সে আরো জানালো ‘কিন্তু এখনো ফিরল না’। এক অজানা আশঙ্কা আমার হৃদযন্ত্রকে নিস্তব্ধ করে দিতে চাইল। অনেক প্রশ্ন আমাকে যেন ঘিরে ধরে রাখল। এক পা ও সরাতে পারছিলাম না। গেটম্যানকে শুধু বললাম- ‘দাঁড়াও দেখছি’।


বাইক সেখানেই দাড় করিয়ে রেখে গেলাম হোটেলের দোতলায় রিসেপশনে। আমার উদ্ভ্রান্ত চোখ রিসেপশন টেবিলের ওপারে থাকা চাবি বোর্ডটায়। যেখানে সেই পরিচিত রুম নম্বর এর চাবিটা তখনও দুলছিল। রিসেপশন থেকে চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে উঠে গেলাম সেই রুমে। যেখানে তখনও গৌরির উষ্ণ শরীরের গন্ধটা আটকে ছিল। আর খুঁটিয়ে দেখলাম সাজিয়ে রাখা কামরাটা। না গৌরির ট্রাভেল ব্যাগটা তখনও কাঠের তাকের ভেতরে আছে। আমি সস্তি বোধ করলাম।

আর তখনই মনে হল রাঙ্গুর মৃতদেহটার কথা। দেখলাম টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখা নীল সাদা ফুলের ছবি আঁকা হ্যাটটা। যে হ্যাটটা মাসখানেক আগে ডাকযোগে গৌরির জন্মদিনের উপহার হিশেবে পাঠিয়েছিলাম। আর এবার যেটা মাথায় পরেই গৌরি এই শহরে এসে ঢুকেছিল। হ্যাটটাতে করে মুড়িয়েই আমরা রাঙ্গুকে তুলে এনেছিলাম সাঁওতাল রাজার জীবিত বংশধরের সেই রঙ্গন গাঁ থেকে। দিকভুল করা গেরস্ত বাড়ীর উঠানের পাশের ফাঁকা রাস্তা থেকে।

টেবিলের ওপর নীল সাদা ফুলের ছবি আঁকা হ্যাটটা উপরে তুলতেই দেখলাম- নিথর শুকনো আর গুটিয়ে থাকা দেহটা। এখন আর কোনভাবেই দেহে তুলতুলে ভাবটা নেই। তার বদলে লোমশ একটা উদভ্রান্ত শরীর। আর ছোট্ট হাঁ করা মুখের ওপর নেতিয়ে পড়া গুচ্ছ গোফ। ঝুলে থাকা মুখের ফাঁক দিয়ে খুব তীক্ষ্ণ ও সরু জোড়া দাতগুলোকে দেখাচ্ছে অসম্ভব রকমের হিংস্র। আর সেই জ্বল জ্বলে নীল চোখদুটি ফিরে গিয়েছিল অক্ষি কোটরের ভিতরে।

হঠাৎ আমার চোখ জ্বলতে শুরু করেছে। হঠাৎ ছোট পোকা চোখে পড়লে যেমন হয় তেমন। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আবার চোখ খুললাম। রুমের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় তাকালাম। চোখে কী পড়েছে দেখার চেষ্টা করতেই দেখলাম আমার চোখগুলোও নীল হয়ে জ্বল জ্বল করছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। মনে হল শ্বাস আটকে আসছে। কিন্তু আশ্চর্য যে, আমি রাঙ্গুকে স্পষ্ট দেখতে পারছি!

আমি দেখতে পারছি, ডেরা থেকে দুধের বাচ্চাটা কৌতুহলবশতঃ একাই তার মাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। মা, মা করে ডাকতে ডাকতে রাঙ্গু ডেরার বেশ দুরে চলে এসেছে- উঠানের পাশের ফাঁকা রাস্তার ধারে। রাঙ্গুর মা শিকার ধরতে নেমে গিয়েছিল রাস্তার উল্টোদিকে ছোট্ট ঝোপটায়। মা মুখে শিকার ধরে ডেরায় ফিরল। রাঙ্গু কই? মা এ পাশ ও পাশ কোন পাশেই রাঙ্গুকে খুঁজে পেল না। ডেরা থেকে ছুটে বেরিয়ে মা বিড়ালটা শুন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

আমিই গৌরিকে উপহার দিয়েছিলাম ছোট্ট ছানাটি। গৌরির সংস্থার কাজে আমরা গিয়েছিলাম শেষ সাঁওতাল রাজার বংশধর এর বাড়িতে। সেখান থেকে ফেরার পথে ছানাটিকে একা দেখে আমার ভীষণ মায়া হ’ল। কিসের ঘোরে ছানাটাকে তুলে দিয়েছিলাম গৌরির হাতে। বলেছিলাম- ‘তোমার একা জীবনের অন্যতম সঙ্গি।’ ঠাট্টার হাসিতে গৌরিও একটা অসম্ভবকে সম্ভব বানিয়ে বলতে পেরেছিল- ‘বুঝিনা বুঝি’! আমি মনে করতে পারলাম, গৌরি ছানাটিকে নিজের সন্তানের মতই পালন করবে বলেছিল!

রাঙ্গুর জন্য আমরা বাজার থেকে কেনা দুধ আর ফিডার নিপল কিনে আনলাম। গৌরি আমি আর রাঙ্গু মিলে আমরা তিনজনের সংসারে পরিণত হয়েছিলাম। আমরা তিনটি প্রাণ মিলিত হয়েছিলাম এক অসীম মুক্তির আনন্দে! নিশ্চিত সংসার ফেলে রেখে অনিশ্চিত এই গোপন কামরায়!

মনে পড়ল, দু’দিন আগে অচেনা বিশ্বাস ঘাতক এই শহরে আমরা রাঙ্গুকে এনেছিলাম খুব আদরে, আর স্নেহময় পরশে। প্রথম রাতে সবল রাঙ্গু বেশ খেলা করতে থাকল গৌরির সাথে, আমার সাথে। লেজ নাড়িয়ে ঘন ঘন মিঁউ মিঁউ করল। ছোট ছোট লাফে সে পেরিয়ে যেতে পারলো এ কোল থেকে ও কোলে। মাঝে মাঝে ফোলা লোমশ শরীরটা গৌরির গায়ে গা ঘেঁষে কম্বলের নীচে ঢুকে ওম নিতে থাকল। গৌরিও নকল মা সেজে নানা রকম বুলিতে ভুলিয়ে রাখতে চাইল। মুখে মুখে ছড়া কাটলো- গাঙ শালিকের মা- দিচ্ছে ডিমে তা।

দ্বিতীয় রাতে রাঙ্গু মধ্যরাতে নীল সাদা ফুল আঁকা হ্যাটটার ভেতর থেকে জেগে উঠল। হেঁটে বেড়ালো ভারী কম্বলের ওপরে। যার তলায় দুটো উষ্ণ শরীর- পাশাপাশি। একে অন্যকে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। সে আবিষ্কারের নেশা ভেঙ্গে আমরাও খেলতে থাকলাম সেই ছোট্ট রাঙ্গুর সাথে। যাকে আমরা ‘প্রণয়ের সন্তান’ বলেছিলাম।

নিজের সন্তানের খুনি মনে হতে লাগল নিজেকে। খুনি পিতার মতই আমি নিথর রাঙ্গুর শরীরটাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলাম। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি কিছুতেই চোখ খুলতে পারছিনা। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে গৌরিকে বা হ্যাপীকে কল দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু হায়! আমি তো কিছুই দেখতে পারছিনা। অদ্ভুত নীল অন্ধকার হাতড়ে আমি কোন রকমে টেবিলটা খুঁজে পেলাম। দ্রুত মৃতদেহটা হ্যাটটায় মুড়িয়ে পেঁচিয়ে ফেললাম। হাতড়ে হাতড়ে হোটেলের জানালা শার্সি একটানে খুলে দিলাম। সাদা শীতের একটা কুন্ডলি জোর করে ঢুকে পড়লো ঘরে। আর সেই খোলা জানালা দিয়ে ওটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বাইরে- অন্ধকারে, শুন্যে। আমার জানা নাই সে শুন্যে কি ছিল? কোন বাড়ীর ছাদ? নাকি ডোবা জলাশয়? নাকি শহরের কোন গলি রাস্তা? নাকি কিছুই না? আমি সেটা জানতেও চাইনি।

দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ আসছে। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! নাকি জেগে ছিলাম? আমার আর কোন স্মৃতি অবশিষ্ট নেই নাকি? হ্যাঁ। মনে করতে পারলাম। আমি তো সেই হোটেলটাতে। গৌরির জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু গৌরি কি আর ফিরে আসে নাই? এই এত রাত অব্দি সে কোথায় আছে? আমি শুনতে পারছি- দরজার ওপাশ থেকে এক সাথে অনেকগুলো মানুষের আনাগোনা আর ফিসফাসও ভেসে আসছে। সবাই দরজার ওপারে। আবার জোরে জোরে দরজাটাতে ধাক্কা দিচ্ছে? কারা ওরা? ওরা কি হোটেল কতৃপক্ষ? নাকি দারোগা পুলিশ? গৌরি কি এসেছে? নাকি চলে গিয়েছে অন্য কোন ঘরে? অন্য কোথাও- যেখানে পবিত্র আত্মার মানুষ থাকে!

আমি আর কিছুই জানতে চাইনা। তোমরা দরজা ভেঙ্গে ফেল। তবু আমি দরজার ভেতরেই থাকতে চাই। এই ঘরে। একা। আবছায়ায় জ্বলজ্বলে নীল দুটি চোখের সঙ্গি হয়ে।


লেখক পরিচিতি
মাহমুদ হাসান পারভেজ
জন্ম : ১৯৮০।
মিঠাপুকুর। রংপুর।

অক্টোবর ২০১৪ সাল থেকে লেখা শুরু করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন