সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

চান্নি পসর রাইতে

জেনেভা নাসরিন

চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়। প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের আমরণ ইচ্ছে ছিল--চান্নি পসর রাতে তার চির বিদায়। কী যেন এক প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে তাকে না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়েছিল ঘোর অমাশ্যায়!


আর ভরা ঝকঝকে জোছনায় যে চলে গেল, আমরা কেন, প্রকৃতি নিজেও হয়তো কখনও ভুল করেও কল্পনা করেনি। তার এভাবে চলে যাবার কথা! ছোটবেলা থেকেই একটা বিষয়ে আমার খুব ভয় কাজ করত-- অন্ধকার একটা মাটির ঘর...ওই ঘরে সব প্রিয়জন ছেড়ে একা মানুষ কিভাবে থাকে, এই কথা ভেবে ঘুমের ঘোরে ভয়ে শিউরে উঠতাম। সেই ভয় থেকে মৃত মানুষ দেখতেও আমার প্রচণ্ড ভয় করত। যে-কয়জন প্রিয় কাছের মানুষ আমার জীবন থেকে চলে গেছেন, কী এক অদ্ভুত কারণে শেষ দেখাটা আমার কখনও হয়ে ওঠেনি। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আমার দাদির মুখটাও না!

সেই ভীতু মেয়েটা ৭ই মার্চ ভোরে ঘুমের ভেতর থেকেই শুনতে পায় তার স্বামী কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে, চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে! ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানিয়ে দেয়--খুব ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে। মেয়েটা জানতে পারে--তার একমাত্র বড় বোনের স্বামী, তার ভগ্নীপতি অসুস্থ। তিনি তাঁর ছোট ভাইকে আমেরিকায় বিদায় জানিয়ে ঢাকা থেকে চিটাগাঙে কর্মস্থলে ফিরছিলেন, রাতের ট্রেনে। হয়তো অব্যক্ত কিছু যন্ত্রনায় তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয় ফজরের আযানের সময়। প্রিয়তমা স্ত্রী'কে ফোন করে বলেন--খুব শরীর খারাপ লাগছে, তাঁকে যেন যে-কোনওভাবে হোক হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাগল হয়ে অসহায় স্ত্রী বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন থেকে নামিয়ে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কোনও কিছু একবারও না ভেবে কুমিল্লার উদ্দ্যেশে রওনা হয়ে যায় তার বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে-- সেই ভিতু মেয়েটা। চিটাগাং থেকে ছুটে আসতে থাকে তাঁর স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে ঐশী, যে ছিল তাঁর কলিজার টুকরা। কিছুতেই যেন শেষ হচ্ছিল না সেই অনন্ত পথের রাস্তা। কুমিল্লা হাসপাতালে পৌঁছে দেখে--তার বড় ভাই এর চেয়ে বেশি মানুষটা, শরীরে অনেকগুলো মেশিন লাগান অবস্থায় শুয়ে আছেন। কথা বললেন, চিনতে পারলেন, একটু পানি খেলেন। নিজে একবার উঠে একটু বসলেন। মেয়েটা মনে একটু শান্তি পেল। যাক, তাঁকে নিয়ে ঢাকা রওনা দেয়া যাবে। চারদিকে দাঁড়ানো ওই জেলার সিভিল সার্জনসহ হাসপাতালের সব ডাক্তার। ডাক্তাররা জানালেন, এখন বিপদের ঝুঁকি একটু কমেছে। আপনারা যত দ্রুত পারেন, ঢাকায় নিয়ে যান।

ঢাকায় সব ব্যবস্থা করা ছিল। সবচেয়ে বড় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ইমারজেন্সি সব তৈরি করা ছিল। খুব আশা নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। তখনও তিনি সুস্থ। ওখানে কিছুটা সময় নষ্ট হয়। হঠাৎ করে কী জানি হল! তিনি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে কেমন যেন অস্থির হয়ে গেলেন! পাগলের মত চিৎকার করতে করতে ভীতু মেয়েটা, তার ভাই-বোন-নার্স-সবাইসহ সেই প্রিয় মানুষটার স্ট্রেচার আবার করোনারি কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যায়। এই জীবনে নাটক, সিনেমাতে দেখা দৃশ্য সে বাস্তবে দেখতে লাগল। তার বড়ভাই-এর মত প্রিয় ভগ্নীপতির বুকে জোরে জোরে চাপ দিচ্ছিলেন ডাক্তাররা। ভীতু মেয়েটার সব ভয় উড়ে গেল এক নিমিষেই। কী এক অসম্ভব সাহস এসে ভর করল তার ওপর। শক্ত করে সে ধরে থাকে সেই মানুষটার হাত। যত দোয়া কালাম জানা ছিল, সে পাগলের মত পড়তে থাকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে পাগলের মত কাঁদছিল তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী। মেয়েটা পাথরের মত দাঁড়িয়ে। সে বুঝতে পারছিল না যে কী হতে যাচ্ছে!

হঠাৎ সাহসী হওয়া মেয়েটাও সেন্স রাখার জন্য চিৎকার করছিল--দুলাভাই, চোখ খোলেন, আমি জেনেভা। আপনি চোখ কিছুতেই বন্ধ করতে পারবেন না। তাঁর মাথার চুলগুলো ধরে টানছিল আর পাগলের মত ডাকছিল...

ডাক্তাররা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন তখন। কী ভেবে মেয়েটা অনেক চিৎকার করে ডাকে তাঁকে চোখ খোলার জন্য... অনেক বড় করে একবারের মত চোখ খুলেই তিনি তাঁর চোখ বন্ধ করে ফেললেন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চলে গেলেন না-ফেরার-দেশে-- এই প্রজন্মের অনন্য কথাসাহিত্যিক, লিটল ম্যগাজিন 'কথা'-র সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর... যা কল্পনারও অতীত... এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল সবকিছু.... আকাশ থেকে খসে পড়ল একটা উজ্জ্বল তারা.... হতবিহবল সবাই কিছুই বুঝতে পারছিল না কী করবে! কী করতে হবে!

নিথর দেহ নিয়ে তাঁর পরিবার রওনা হল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় স্থান--গ্রামের বাড়ি; কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরিষাপুর নামক অদ্ভুত সুন্দর এক গ্রামে। যে-মানুষটাকে মেয়েটা বাবার মত শ্রদ্ধা করত, বড়ভাই-এর মত ভালবাসতো আর ভয় পেত, সেই মানুষটার নিথর দেহটাকে সে ছুঁয়ে থাকে আর দোয়া পড়তে থাকে পুরোটা পথ জুড়ে...এক অনন্ত যাত্রা!এ পথ শেষ হবার নয়। কোথায় ছিল এত গভীর মমতা !

রাত আনুমানিক ন'টার দিকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে তখন--এত মানুষ; তাদের আহাজারি... শোকে পাথর হয়ে যাওয়া মুখ। ছয় বোনের বোনের বুকফাটা কান্না। বৃদ্ধ মা'র হতবাক মুখ...

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের শেষ ইচ্ছা ছিল--চোখ দুটো দান করা। গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে ছ'ঘণ্টা সময় পার হয়ে যাওয়ায় আর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে চোখ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সেই ইচ্ছাটুকু পূরণ করা গেল না!

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যে পড়া একমাত্র ছেলে সিলেট থেকে বাবার কাছে আসে--একটা পাথরের মূর্তি যেন! বাবা তখন শুয়ে আছেন উঠানে, একটা কফিনে। আকাশে পরিপূর্ণ একটা চাঁদ... অদ্ভুত সুন্দর গৃহত্যাগী জোছনা। আকাশ ভরা তারারা তাঁকে দু'চোখ মেলে দেখছিল... চারদিকে আমের মুকুলের আর বাতাবী লেবুর ফুলের গন্ধে বাতাস আকুল...এমনটাই কি চেয়েছিলেন তিনি? এমন চান্নি পসর রাইত--এমন অদ্ভুত সুন্দর ফুলের গন্ধ! ছেলেটা বাবার মুখ ছোঁয় পাথরের মত... মেয়েটা বাবাকে ছুঁতে পারে না ভয়ে; হঠাৎ করে সাহসী হওয়া মেয়েটা, ঐশ্বীকে নিয়ে যায় তার বাবার কাছে। ও কিছুতেই সেই মুখ দেখতে চায় না--জোর করে ওর কচি হাত দুটো ওর বাবার মুখে ছুঁইয়ে দিলে, ও প্রথম বারের মত কেঁদে উঠে। ওর মা তো পাগলের মত প্রলাপ করছে--বইমেলা থেকে কেনা তোমার এতগুলো বই কে পড়বে? তোমার হাজার হাজার বই আমি কী করব! তোমার অসমাপ্ত লেখাগুলো কে শেষ করবে? পরের বইমেলায় তোমার আর কোনও বই বেরুবে না! তুমি কোন অভিমানে আমাদের এতিম করে চলে গেলে? কোনোভাবেই কোনও সান্ত্বনা তাঁর জন্য কারও কাছেই নেই। তাঁর নির্বাক মা ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে আছেন। আমেরিকা প্রবাসী দুই ভাই পাগলের মত কাঁদছেন ফোন করে। সারা রাত সেই পাগল করা জোছনায় প্রিয়জনরা আগলে রাখেন তাঁর নিথর দেহ।

এইভাবে কেটে যায় সারা রাত। ভোরের আলোয় তাঁর মুখ থেকে যখন কাপড়টা সরান হয়-- কিছুতেই মনে হয়নি এই মানুষটা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। শুধু মনে হচ্ছিল ঘুমিয়ে আছেন তিনি--শুধু একবার ডাক দিলেই জেগে উঠবেন-- প্রিয় বই নিয়ে বসবেন, হয়তো বা কলম হাতে তাঁর পরিচিত টেবিলটাতে--অথবা প্রিয়তমা স্ত্রীর হাতের তৈরি নাস্তা খেয়ে রেডি হয়ে চলে যাবেন হাসপাতালে রোগী দেখতে...সবকিছুকে ভুল প্রমাণ করে তিনি এক মাটির ঘরে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লেন।

শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকীগুলো তাঁকে নিয়ে অনেক বড় বড় লেখা ছেপেছে...কত জন যে তাঁর লেখালেখি, জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখেছেন! ভাবলাম, আরও আগে তাঁর এই পরিচয়টা আমাদের কেন জানা হল না! সত্যি অসম্ভব শোকের পাশাপাশি একটা অহংকার কাজ করছিল। ভাল লাগছিল...

... আর, ছায়া ও সুন্দরে ঘেরা, মমতামাখা একটা ঘরে বাবা'র পাশে, দাদু'র পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তিনি...কোকিল ডাকছে। ঘুঘু ডাকছে। তাঁর প্রিয় গ্রাম। ছোট্ট বেলার অদ্ভুত মায়াময় জায়গা।

চান্নি পসর রাইতে না-ফেরার-দেশে চলে যাওয়া মানুষটা যেন এখানে ফুলের গন্ধে থাকেন...


লেখক পরিচিতি
জেনেভা নাসরিন
প্রয়াত কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের নিকট আত্মীয়া

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন