সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

স্মৃতির জগতে আপনাকে স্বাগতম

রেজা ঘটক

কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ২০০৩ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে। চট্টগ্রামে সবুজের আড্ডায় আমাকে একদিন নিয়ে গেলেন কথাসাহিত্যিক খোকন কায়সার। সেখানে গিয়ে পেলাম কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর আর কবি হাফিজ রশিদ খানকে। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে চট্টলার কবি-সাহিত্যিকদের একটা ছোটখাটো জটলা হল। শ্রোতার চেয়ে সেখানে বক্তা বেশি হওয়ায়, সত্যি কথা বলতে গিয়ে তখন আড্ডায় আমার একদম মন ছিল না। আমি তখন ভাবছিলাম, কিভাবে সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার জন্য ফয়েটস লেক বা পতেঙ্গা সিবিচে যাওয়া যায়।
কিন্তু খোকন কায়সার এক নাছোরবান্দা। আমাকে আর গল্পকার রোকন রহমানকে দুপুর পর্যন্ত আটকে রাখলেন। দুপুরে তার বাসায় খেয়ে বিকালে আবার ভোরের কাগজ চট্টগ্রাম অফিসে গমন। সেখানে দাপ্তরিক টেবিলে নিজ নিজ আসনে বসেছিলেন কবি ওমর কায়সার আর কবি সৌমেন ধর। আর ওমর কায়সারের মুখোমুখি একটি চেয়ারে পা তুলে বসা চট্টগ্রামের সেই সময়ের সবচেয়ে ক্ষ্যাপা কবি জ্যোর্তিময় নন্দী। জ্যোতি'দার সাথেও সেদিন আমার প্রথম পরিচয়।
তারপর থেকে যখনই চট্টগ্রাম যেতাম, খোকন-রোকন গংদের সবার সঙ্গেই আমার দেখা সাক্ষাৎ হতো। কিন্তু মাঝে মধ্যে কালেভদ্রে পেতাম জাহাঙ্গীর ভাইকে। এরপর ২০০৫ বা ২০০৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সাথে আমার দীর্ঘ আড্ডা হল। খেয়াল করলাম, ওই সময়ের আলোচিত লেখকদের প্রায় সবার লেখাই জাহাঙ্গীর ভাইয়ের পড়া। তারপর থেকে প্রতি বছরের অমর একুশে বইমেলায় আমাদের প্রায়ই দেখা হতো, আড্ডা হতো। এ বছর অমর একুশে বইমেলায় জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ আড্ডা হয়েছে। সর্বশেষ আড্ডাটি ছিল মেলার শেষ দিন। আমরা লিটলম্যাগ চত্বরে নন্দনের স্টলে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। ওই সময় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবার আগে আগে লিটলম্যাগ চত্বরের ছোটকাগজের স্টলগুলো দেখতে দেখতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নূর ভাই তখন এ বছর ত্রয়ী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আমার লেখা 'বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবনী: মুজিব দ্য গ্রেট' বইটি হাতে নিয়ে দেখছিলেন। আর টুকটাক কথা বলছিলেন। আমার সঙ্গে কথা শেষ করেই জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে নূর ভাই কথা বলা শুরু করলেন। জাহাঙ্গীর ভাই তার ছোটকাগজ 'কথা'র সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০১৪ সংখ্যাটি নূর ভাইকে গিফট করলেন। সেই ফাঁকে আমি স্টল থেকে বের হয়ে সামনে চলে যাই। পরে আমাদের আরো কিছুক্ষণ দলীয় আড্ডা হয়েছিল। জানতাম রাতের ট্রেনেই জাহাঙ্গীর ভাই চট্টগ্রাম চলে যাবেন। সেদিন জাহাঙ্গীর ভাই আমাকেও কথা'র ওই সংখ্যাটি দিয়েছিলেন।

এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে বন্ধু কবি মোশতাক আহমদ আর আমি বসে বসে জাহাঙ্গীর ভাই'র সাথে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। জাহাঙ্গীর ভাই আর মোশতাক দুজনেই ডাক্তার। দুজনেই একসময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। আর জাহাঙ্গীর ভাই এখনো কর্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা। বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রামের বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অমর একুশে বইমেলার শেষদিনে আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বাংলা একাডেমি চত্বর ও সামনের রাস্তায় আড্ডা মারলাম। কোন ফাঁকে জাহাঙ্গীর ভাই বিদায় নিলেন, এখন ঠিক সময়টা মনে নাই। তারপর আবার আমাদের বইমেলা পরবর্তী ঢাকার স্বাভাবিক জীবন শুরু হল। তখন ঢাকার আড্ডা আর সুধি মহলে একটাই আলোচনার বিষয় াভিজিৎ রায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে নির্মমভাবে খুন হন বিজ্ঞান লেখক ডক্টর অভিজিৎ রায়। একই হামলায় আহত হন তার স্ত্রী লেখক বন্যা আহমেদ। 

অভিজিতের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ৭ মার্চ দুপুরবেলায় লেখকমহলের জন্য নেমে আসল আরেকটি শোকের বার্তা। ফেসবুক থেকেই প্রথম জানতে পারলাম কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর আর নেই। সেদিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফেরার পথে ট্রেনে তার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। দ্রুত ভর্তি করা হয় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ড. মুজিবুর রহমান ফেসবুকে জানিয়েছেন, "আমাদের হৃদয়ের বান্ধব চমেক বাইশ ব্যাচের ডা.কামরুজ্জামান জাহাংগীর আজ বেলা ১ টা ৪৫ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রাণবন্ত যে মানুষটির সঙ্গে বইমেলায় আড্ডা দিলাম, সে কিনা এমন দিনদুপুরে একেবারে পৃথিবী থেকেই হাওয়া! এটা কোনোভাবেই মানা যায় না জাহাঙ্গীর ভাই। এমন কথা তো সেদিন একবারও হয়নি। তারপর সারাদিন আর সত্যি সত্যিই কিচ্ছু ভালো লাগেনি।

পরদিন রাতে নাট্যকার-নির্মাতা ও লেখক গোলাম শফিক ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হল। শফিক ভাই জাহাঙ্গীর ভাইয়ের খুব কাছের বন্ধু। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার সরিষাপুর গ্রামে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে যেখানে জাহাঙ্গীর ভাইকে কবর দেওয়া হয়েছে, সেই কবরে বন্ধুকে রেখে শফিক ভাই তখন খুব কষ্টে সেই ঘটনা শুনাচ্ছিলেন। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়াকে কেউ-ই ঠিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। 

পরের সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে অনলাইন সাহিত্যের কাগজ গল্পপত্রের সম্পাদক কুলদা রায় আমাকে জানালেন, গল্পপত্রের চৈত্র সংখ্যাটিকে জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে বিশেষভাবে করতে চান। আমি যেনো বাংলাদেশের লেখক বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়ই সমন্বয় করি। গল্পপত্রের ফাল্গুন সংখ্যায় একটি ঘোষণা দিয়ে আমাকে এই বিশেষ সংখ্যাটির জন্য অতিথি সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দিলেন। তখন থেকেই লেখকদের সঙ্গে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের উপর লেখা সংগ্রহ করছি। সংগৃহীত সবগুলো লেখাই আমি নিয়মিত পড়ছি। কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে আমি ঠিক কি লিখব এখনো বুঝতে পারছি না। 

জাহাঙ্গীর ভাইয়ের লেখা নিয়ে কিছু বলব, তেমন প্রস্তুতিও এই মুহূর্তে নেই। মানসিকভাবে আমি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। অন্যদের লেখা পড়ে জাহাঙ্গীর ভাইকে আরো নতুন করে আবিস্কার শুরু করলাম। কিন্তু কিছুতেই আমার মন ভরছে না। সেদিন কথা কথায় বন্ধু চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কবি টোকন ঠাকুরকে বলছিলাম, জাহাঙ্গীর ভাইয়ের প্রথম গল্প ছাপা হয় আপনার হাতে। মুক্তকণ্ঠের খোলা জানালায়। জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে আপনি একটা স্মৃতিচারণমূলক লেখা দেন। ঘটনাটি টোকন তখনো অবগত ছিলেন না। আমি গল্পপত্রেই জাহাঙ্গীর ভাইয়ের একটা সাক্ষাৎকারে তার এ সংক্রান্ত স্বীকারোক্তি'র লিংকটি টোকনকে পরে দিলাম। 

কিন্তু আমি কি লিখব এটা এই কয়দিনেও বুঝে উঠতে পারিনি। তবু তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়টুকু পাঠকদের জন্য আবার তুলে দিচ্ছি। কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার সরিষাপুর গ্রামে। পড়াশুনা করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। জন্ম ১৯৬৩ সালের ৩১ জানুয়ারি। তার এক ছেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও এক মেয়ে চট্টগ্রাম কলেজে পড়েন। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: 'মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম' 'স্বপ্নবাজি', 'কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প', 'ভালোবাসা সনে আলাদা সত্য রচিত হয়', 'জয়বাংলা ও অন্যান্য গল্প'। উপন্যাস: 'পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী', 'যখন তারা যুদ্ধে', দেশ-বাড়ি : শাহবাগ', 'হৃদমাজার', ’কমলনামা’। অন্যান্য বই: 'উপন্যাসের বিনির্মাণ, উপন্যাসের জাদু', 'গল্পের গল্প', 'কথাশিল্পের জল-হাওয়া'।

১৯৬৩ থেকে ২০১৫ সাল মাত্র ৫২ টি বছর কি এমন দীর্ঘ সময়? মাত্র ৫২ বছরের একটি সল্পায়ু জীবনে জাহাঙ্গীর ভাই নিস্বার্থভাবে বাংলা সাহিত্যের জন্য যতটুকু করে গেছেন, সেখানে কোনো ফাঁক ছিল না। পরম দরদ আর মমতা দিয়ে তিনি নিজের মত ছোট-বড়-সমসাময়িক অন্য সকল লেখকদের লেখা পর্যবেক্ষণ করতেন। আর নিজের লেখার ভূবনটি ছিল ভারী নির্লিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ এক তীর্থযাত্রার মত। একেবারে প্রচারবিমুখ তার সেই উচ্চারণ। নিজস্ব একটি ভারী সুন্দর গদ্য ঢং তিনি রপ্ত করেছিলেন। জীবনকে নানাভাবে বিশ্লেষন করার এক আশ্চার্য জাদু জানতেন তিনি।
পেশাগত কারণে ডাক্তার হওয়ায় মেডিকেল ছাত্রাবস্থায় তিনি যেমন মানুষের কংকাল নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, তেমনি সাহিত্যের নানামুখী অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন এক অতি উঁচু মাত্রার পর্যটক। সাহিত্যের রূপ-রস-স্বাদের একেবারে নির্যাস যার চোখে ধরা পড়ত সেই খোয়াই নদীর পাথর কুড়ানিদের মত। জলের গভীর থেকে পাথর কুড়ানিরা যেমন ছেকে আনেন জীবনযুদ্ধের ক।ষুধা তাড়ানো এক একটি সোনার টুকরা পাথর। তেমনি কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক নিবিঢ় অনুসন্ধানী পরিব্রাজক। তার হাতে সাহিত্যে কতটুকু জাদু লেগেছিল তা সময়ই যথাযথভাবে বলে দেবে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ভূবন যে একজন একনিষ্ঠ কর্মঠ নির্মেদ রুচিশীল তপস্বীকে হারালো, সে কথা এখন দিবালোকের মত সত্য। 

সেই অনুসন্ধানী চোখ মেডিকেল ছাত্রদের জন্য দান করার শেষ ইচ্ছে ছিল জাহাঙ্গীর ভাইয়ের। কিন্তু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যথেষ্ঠ সাপোর্ট না থাকায় তার সেই শেষ ইচ্ছাটি পূরণ হয়নি। আমরা বিভিন্ন আসরে নানান কিসিমের আড্ডায় হয়তো কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করব, কিন্তু তার লেখনীর যথার্থ মূল্যায়নের জন্য তার অপ্রকাশিত লেখাগুলো এখন প্রকাশ হওয়া জরুরী। কোনো সৃজনশীল প্রকাশনা যদি আগামীতে একসঙ্গে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর রচনাবলী প্রকাশ করে, তাহলে হয়তো তার লেখনি সম্পর্কে আমাদের আরো সুস্পষ্ট ধারণা হবে। 

কথা'র কমলকুমার মজুমদার সংখ্যার সম্পাদকীয়তে জাহাঙ্গীর ভাই যা লিখেছিলেন তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, জাহাঙ্গীর ভাইকে আমরা ভালোবাসতে চাই, তার লীলাকে স্পর্শ করতে চাই, তিনি আমাদের চৈতন্যে অমর হয়ে থাকুন। যেখানেই থাকুন হে কথাশিল্পী আপনাকে আমাদের মনে থাকবে। আপনার নির্মল হাসির মত টাটকা সব স্মৃতিও আমাদের স্মরণে থাকবে।

.................................
ঢাকা
৬ এপ্রিল ২০১৫

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন