শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

ইচ্ছে নিয়ে খেলা

ভগীরথ মিশ্র



সাতসকালে হিমানীশকে উঠোনে বসে জুতো পালিশ করতে দেখেই ভুরুতে কমনীয় ভাঁজ পড়ে দোলনের।

সকালে টিউশনি পড়তে যাচ্ছে বাবাই, ওকে খাইয়েদাইয়ে, রেডি করিয়ে উঠোন অবধি এগিয়ে দিতে এসেছিল দোলন। তখনই দেখতে পাই দৃশ্যটা। উঠোনের একপ্রান্তে বসে একমনে জুতো পালিশ করে চলেছিল হিমানীশ। মাঝউঠোনে হাঁটতে হাঁটতেই দোলন আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, ওঁর সেই সাধের পাম্প-শ্যু, খুব গুরুত্বপূর্ণ কোথাও যেতে হলে অর্থাৎ কিনা, যেখানে মান-সম্মান রক্ষাটা হিমানীশের পক্ষে খুবই জরুরী, সেখানে ওটা পড়ে যান তিনি।


দেখতে দেখতে দোলনের চোখেমুখে একাধারে খুশি এবং কৌতুক উঁকিঝুঁকি মারে যুগপৎ। ছেলেকে সদর-গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে সে দ্রুতপায়ে পেরিয়ে আসে উঠোনটা, তারপর সটান নিজের শোবার ঘরে।

শুভাশিস তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শেষ আলসেমিটা সেরে নিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে একটুখানি চায়ের প্রত্যাশাও করেছিল সে। তৎসহ দোলনের থেকে একটুখানি আস্কারা মাখানো সান্নিধ্য। ব্যস, তারপর তো তার দিন শুরু হয়ে যাবে। দিনভোর ঘোড়দৌড়। নিজেদের গ্রাম থেকে তিন কিমি সাইকেল চালিয়ে স্টেশন, আটটা বাইশের মেছেদা লোক্যালে চড়ে হাওড়া, সেখান থেকে পদব্রজে বিবাদী বাগ, দিনভোর গরম-ঘাম-কাজ-বস্‌- ইউনিয়ন, পাল্টা ইউনিউন-মিটিং-মিছিল, অবশেষে ছ’টা বাইশের মেছেদা লোক্যালে চড়ে আটটা নাগাদ দোলনের ‘কোলে ফেরা’।

‘দোলনের কোলে ফেরা’। কথাটা শুনে আগে মুখ টিপে হাসত দোলন, এখন শুভাশিসকে কিল দেখিয়ে মারতে যায়।

এই বাড়িতে যখন বিয়ে হয় দোলনের, আজ থেকে বছর দশেক আগে, তখন শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন। নির্বিকার, নিরাসক্ত ভালো মানুষ। দোলনকে খুবই ভালো বাসতেন। শুভাশিস তখন সদ্য চাকরি পেয়েছে। সকালের ট্রেণে যায়, সন্ধ্যেয় ফেরে। তখনই ফি-সকালে শুভাশিস অফিস রওনা হওয়ার আগে দাদাকে আর মা’কে প্রণাম করত, আর দোলনের শাশুড়ি রোজই শুধোতেন, কখন ফিরবি? সুবোধ বালকের মতো খুব নির্দোষ গলায় শুভাশিস জবাব দিত, সাড়ে-সাতটা বড়জোর আটটার মধ্যেই তোমার কোলে ফিরে আসব মা। কথাটার মধ্যে যদি কোনওরূপ শ্লেষ বা কৌতুক থাকেও, সেটা বুড়ির মগজ অবধি পৌঁছত না একেবারেই, খুব গাঢ় আশঙ্কা মেশানো গলায় বলতেন, দুগ্‌গা... দুগ্‌গা..., তাড়াতাড়ি ফিরিস।

কিন্তু কথাটা শোনামাত্র প্রথম প্রথম কানে খুব বাজত দোলনের। এ-তো কৌতুক করে বলে মানুষ। অথচ ওই মুহূর্তে শুভাশিসের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখত দোলন, ওই মুখে কৌতুকের লেশমাত্র নেই। ভয়েভক্তিতে ভারাক্রান্ত, জলভরা শ্রাবণের মতো চোখদুটি। মা’কে প্রণাম করে, একেবারে শেষমুহূর্তে দোলনের দিকে একপ্রস্থ তাকিয়েই উঠোনে নামত শুভাশিস, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলে চড়ে বসত মাঝ উঠোনেই। কাজেই, ওটা কোনও পুছতাছ করবার মুহূর্তই নয়। দোলন মুখিয়ে থাকত সন্ধ্যের জন্য।

সাড়ে-সাতটা আটটা নাগাদ যখন শুভাশিস ফিরে এসে, চানটান সেরে, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে, চা-জলখাবার খেয়েটেয়ে ধাতস্থ হয়েছে, দোলনও নিজেদের বিছানায় জুত করে বসে টিভিটা অন করেছে একটা সিরিয়াল দেখবে বলে, আচমকা শুভাশিস এসে ওর কোলে মাথা রেখে ধপ করে শুয়ে পড়বেই।

- অ্যাই, কী হচ্ছে?

শুভাশিসের আকস্মিক চপলতায় বেজায় বিব্রত দোলন ওর ঝাঁকড়া চুলগুলোকে দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরে প্রাণপণে টান মারতে থাকে ওপরের দিকে, ওঠ, ওঠ, ইস্‌ এক্ষুণি কেউ এসে পড়বে। কথাগুলো বলত বটে, কিন্তু দোলন তখন ভালমতোই জানত, কেউই আসবে না। এই সময়টা শাশুড়ি দোতলায় ওঠেন না, আর, বড়দা দোকান বন্ধ করে ফিরতে ফিরতে সেই দশটা। তবু কথাগুলো বলত দোলন। শুভাশিসের সঙ্গে রগড় করবার জন্যই বলত। রগড় করতে করতে আদর খেতে বুঝি সব মেয়েরই ভালো লাগে। প্রথম বিবাহিত জীবনের প্রেম-ভালবাসা বিয়ের আগের প্রেমের মতো একেবারে ফুলকো মুড়িটি হয় না, বরং নানা জাতের দাম্পত্য দায়িত্ব সইতে সইতে সংসারের আপাত রুক্ষতার থেকে নিংড়ে নেওয়ার প্রেম, খানিকতে চালভাজার মতো। আর চালভাজায় একটুখানি নুন-ঝাল থাকলে ভালোই লাগে।

কাজেই, কথাগুলো বলতে বলতে দোলনের গলায় ফুটে উঠত কপট ক্ষোভ আর অভিমান, তুমি বরং মায়ের কোলে গিয়ে শোও গে।

- কেন? মায়ের কোলে কেন?

এমনভাবে কথাগুলো শুভাশিস, যেন খুবই অপমানিত বোধ করেছে দোলনের সর্বশেষ পরামর্শে।

- বা-রে, সকালে তো তাই বললে মা’কে।

বলতে বলতে ফিক করে হাসে দোলন।

- আটটার মধ্যে তোমার কোলে ফিরে আসব ম্যা-।

দোলন শুভাশিসের গলা নকল করবার চেষ্টা করে।

- ও ...।

বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে আরও জুত করে শোয় শুভাশিস।

খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে দোলন বলে, সকালে আমার এত হাসি পাচ্ছিল। দোলনের হাসবার ধরণে শুভাশিসের মনে হতেই পারে, যে-হাসিটা সকালেই পাচ্ছিল, সেটা শুভাশিসের সামনে হাসবার জন্য দিনভর বুঝি জমিয়ে রেখেছিল দোলন, এইমাত্র সেই হাসিটা হাসল।

শুভাশিস চোখ তুলে সরাসরি চোখ রাখে দোলনের চোখে, কেন?

- বা-রে হাসি পাবে না? তুমি কেমন গদগদ গলায় বলছিলে, আটটার মধ্যেই তোমার কোলে ফিরে আসব মা। এক্কেবারে পালাগানের পার্টের মতো লাগছিল। যেন দুষ্ট কৃষ্ণ পাড়া বেড়াতে যাবার আগে মা-যশোদাকে বলছে, খিদে পেলেই তোমার কোলে ফিরে আসব মা। ঐ যে গেলবারে কেষ্টযাত্রার আসর বসেছিল মনসাতলায়, ঠিক ওর’ম করে বলছিল।

বলতে বলতে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ফিকফিক করে হাসতে থাকে দোলন।

দোলনের হাসিটা বুঝি তাৎক্ষণিকভাবে সংক্রামিত হয় শুভাশিসের মধ্যেও। বলে, যখন কথাগুলো জোরে জোরে বলি মায়ের সামনে, মনে মনে অন্যকথা বলি।

- অন্যকথা মানে?

- ঠিক অন্যকথা নয়, ঐ কথাটাকেই একটুখানি অন্যরকম করে বলি। বলি, আটটার মধ্যে দোলনের কোলে ফিরে আসব মা।

বলতে বলতে শুভাশিস আচমকা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে মাথাটা গুঁজে দেয় দোলনের কোলে। আর, তাই দেখে দোলনকেও দ্বিতীয় দফা প্রতিরোধে নামতে হয়, ‘অ্যাই, ওঠো বলছি’, যদিও সেই প্রতিরোধে তেমন নিষ্ঠা থাকে না।

পরের দিন থেকেই, শুভাশিস সামনের বারান্দায় মায়ের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে কথাগুলো যখন বলছে, দোলন তখন বারান্দারই একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোরাচোখে দেখে নিচ্ছে শুভাশিসকে। সে নিশ্চিতভাবে জানে, কথাগুলো বলতে বলতে একেবারে শেষমুহূর্তে সে আড়চোখে একবার তাকাবেই দোলনের মুখের দিকে। দোলন ওষ্ঠাধরে মধু জমিয়ে একটুখানি হাসবে, আর মনে মনে ভাববে, আজকের ছেলেগুলো কী পরিমাণ পাজিই না হয়েছে!

বছর তিনেক আগে শাশুড়ি মারা গেলেন। তারপর থেকেই কথাগুলো দোলনকেই বলে শুভাশিস, আটটার মধ্যেই তোমার কোলে ফিরে আসব, দোলন।

দোলন প্রথমে ভুরুতে কপট ভৎর্শনা ফোটায় বটে, পরমুহূর্তে ফিক করে হেসে ফেলে। কিন্তু পরের দিনই সে ঐ একই প্রশ্ন শুধোয় শুভাশিসকে, কখন ফিরবে? শুধোয়, কেবল ওই জবাবটা শোনার জন্য, আটটার মধ্যেই ফিরে আসব, দোলন। এটা যেন দিনের প্রথম পর্বে দুজনের মধ্যে রোজদিনের একচিলতে মধুর খেলা। ঐ খেলাটা দিয়েই রোজ শুরু হয় ওদের দিন।

বিছানায় আলতো গড়াগড়ি খেতে খেতে আর এক প্রস্থ চায়ের বায়না ধরেছিল শুভাশিস, দোলন তার সেই প্রার্থনায় একঘটি ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে বলে, বাপ রে, এখন তোমায় চা দেবার সময় কই আমার?

- কেন? প্রায় ফুঁসে ওঠে শুভাশিস।

- বা রে, বড়দার জন্য আমাকে এক্ষুনি জলখাবার বানাতে হবে। আর সময় নেই একটুও।

এই সাতসকালে বড়দার জন্য জলখাবার বানানোর কথায় একটুখানি বিস্মিত হয় শুভাশিস। দাদা দোকানে যাবে দশটায়। সাড়ে ন’টার আগে তো তাকে জলখাবার দেবার প্রশ্নই ওঠে না।

সে কথায় ফিক করে হাসে দোলন। বলে, নীচে নেমে দ্যাখো না, বড়দা সাতসকালে উঠেই তাঁর সাধের জুতোজোড়াটি পালিশ করতে বসেছেন।

- আ-বা-র? শুভাশিসের সারামুখে বিস্ময় ও কৌতুক মাখামাখি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, গড়িয়ে পড়ে।




আজ থেকে বছর দশেক আগে, শ্বশুরবাড়িতে পা দেওয়া ইস্তক দোলন দেখেছে, মানুষটার সৌরভে একেবারে ম-ম করছে বাতাস। দোলনের শাশুড়ি, দু’ননদ সোনালি আর রূপালি, শুভাশিস এবং পাড়াপড়শি সবাই মিলে মানুষটাকে একেবারে স্বর্গের উচ্চতায় তুলে দিয়েছে।

শ্বশুরমশাই সারদাপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। শুধু নিজেদের গাঁয়েই নয়, এলাকার সবগুলি সচ্ছল পরিবারের যাবতীয় পুজোয়াচ্চায় তিনি ছিলেন একেবারে বাঁধা পুরোহিত। ওই এতবড় সংসারটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলত। ধানের জমি বলতে বিঘে দু’তিন, তাও বর্গায় ছিল ওগুলো। ফসলের ভাগ হিসেবে যা পেতেন, তাতে করে সম্বৎসরের চালের খরচ মিটত না। শ্বশুরমশাইয়ের যজমানির আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল সংসারটা।

শ্বশুরমশাই যখন মারা গেলেন, দোলনের ভাসুর হিমানীশ, দু’ননদ সোনালি-রূপালি, আর শুভাশিসের বয়স ছিল যথাক্রমে কুড়ি, পনেরো, বারো এবং দশ। হিমানীশ তখন সবে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে বাগনান কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছেন। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন হিমানীশ। ঐ যুগে স্টার পেয়েছিলেন, গোটা স্কুলে ওদের ব্যাচে ওই একজন। কোলকাতার কোনও নামী কলেজ লুফে নিত, কিন্তু তখন সংসারে যা হাল, কাজেই, বাগনান কলেজেই ঘরের খেয়ে পড়াশোনাটা কোনওগতিকে চালিয়ে যাচ্ছিলেন হিমানীশ। আচমকা সারদাপ্রসাদ চলে যাওয়াতে গোটা সংসারটা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেই তখন থেকেই গোটা সংসারটাকে যেভাবে মাথায় করে বয়ে বেড়িয়েছেন হিমানীশ, আজও সেকথা বলতে বলতে শুভাশিসরা গদগদ হয় শ্রদ্ধায়। চোখের কোনায় অশ্রু জমে। প্রথমেই পড়াশোনাটা ছেড়ে দিলেন হিমানীশ। তারপর সবাইয়ের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে একবিঘে জমি বেচে দিলেন বর্গাদারদেরই একজনকে। ওই টাকায় বাগনান বাজারে একটা দোকানঘর ভাড়া নিয়ে একটা বইয়ের দোকান খুললেন। শ্বশুরমশাইয়ের নামে দোকানের নাম দিলেন, ‘সারদা বুক স্টোর’। কোলকাতা গিয়ে খদ্দেরের চাহিদামতো বইগুলো খুঁজে পেতে আনতেন। আর, সকাল থেকে রাত অবধি পড়ে থাকতেন দোকানে কিংবা দিনভোর আশেপাশের স্কুলগুলোতে গিয়ে পড়ার বইয়ের ক্যানভাসিং করতেন। আর, এলাকা জুড়ে এমন খ্যাতি ছিল তাঁর, মেধাবী ছাত্র বলে, সুভদ্র আচরণ বলে, প্রায় সব স্কুলেই বুক-লিস্টে হিমানীশের কিছু বই রাখতই। স্কুলগুলোকে সেইসব বই একেবারে যথাসময়ে সাপ্লাই দিতেন স্কুলে স্কুলে গিয়ে। এব্যাপারে একচুল এদিক-ওদিক হত না তাঁর। আর, কথার দাম ছিল একেবারে কিংবদন্তিতুল্য। শাশুড়ি আর ননদের মুখে শুনেছে দোলন, ওই সময়টায় নাওয়া-খাওয়ার সময়ই থাকত না হিমানীশের। বলতে বলতে শাশুড়ির চোখের মণিতে হিরে জ্বলে উঠত অকস্মাৎ, ওই করেই বড়খোকা একদিন দাঁড় করিয়ে ফেলল দোকানটা। সোনালি আর রূপালিকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করাল, সুপাত্রে বিয়ে দিল, শুভকে বি-এস-সি পাশ করাল, ... শুভ কলকাতায় চাকরি পেল, তুমি এলে ..., ঘটনাগুলো ঠিক সিনেমার সেলুলয়েড-রীলের মতো নিঃশব্দে ঘুরে যেতে থাকে শাশুড়ির স্মৃতিতে। পরক্ষণেই শাশুড়ির গলা ভেঙে আসে একটু একটু করে, ওইসব করতে করতে কবে কবে বয়ে গেছে নদীর অনেকখানি জল। যখন ঝড়ঝাপটাগুলোকে একে একে সামাল দিয়ে দম ফেলবার ফুরসৎ পেল ছেলেটা, তখন ওর বয়েস চল্লিশের ওপার ...। ওই কারণে তো বিয়েটাই করল না। বলতে বলতে শাশুড়ির কাপড়ের আঁচল রোজকার মতো অলক্ষ্যে চলে যায় চোখদুটোর দিকে।

শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে দোলনের। এমন রূপবান, গুণবান, দায়িত্বশীল মানুষ শেষ অবধি একটা সংসার পাবেন না, এটাই খুব বিঁধছিল ওকে। বলে, আপনারা কেউ ওকে সাধলেন না?

- সাধিনি আবার! শাশুড়ি চোখের কোনা থেকে সরিয়ে নেন আঁচল, সোনালির বিয়ের আগে থেকেই সবাই ওঁকে পীড়াপীড়ি করছিল। আমি তো ওর পেছনে লেগেই ছিলাম। কিনা, আগে তোর বিয়েটা হোক বড়খোকা। সোনালির বিয়ে হবে তারপর। কিন্তু আমার কথায় কান দিলে তো। ... তারপর ... একে একে সোনালির বিয়ে হল, তারপর রূপালির, শুভাশিস তখন সবে হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে। তখন ওর বিয়ের কথাটা আবার তুলেছিলাম, কিন্তু ছেলের জেদটাকে তো অ্যাদ্দিনে চিনেছ, ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিল আমার কথাটা। কিনা, শুভর এখনও অবধি পড়াশোনাটাই শেষ হল না, ওর জন্য সামনে কত খরচ, এখন আমার বিয়ে করবার সময় কোথায়, মা?

শুভাশিস যখন চাকরি পেল, হিমানীশ তার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছেন দেখে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মা। তোর ব্যাপারটা কি বল্‌ তো দেখি খুলে? ছোটভাইকে বিয়ে দেবার আগে নিজের বিয়ের কথাটা একবার ভাব্‌। আর কবে ভাববি?

প্রশান্ত হাসিতে মুখ ভরিয়ে হিমানীশ বলেছিলেন, এই বয়সে কি কেউ বিয়ে করে মা? আমি এখন পয়তাল্লিশ।

মায়ের ডাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে ছুটে আসে সোনালি আর রূপালি। সবাই মিলে হিমানীশকে চেপে ধরে। কিন্তু হিমানীশ একেবারে অনড় হয়ে রইলেন। এই বয়সে বিয়ে করা তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। একসময় চোখের জলে বুক ভাসিয়ে শুভাশিসের বিয়ের ব্যাপারে মত দিতেই হল শাশুড়িকে।

- আর তার ফলেই এই বাড়িতে এলে তুমি। শাশুড়ি ঘনঘন চোখের জল মোছেন। পাশটিতে বিষন্ন মুখে বসে থাকে সোনালি, রূপালি আর শুভাশিস। হিমানীশের কথা বলতে গেলে ওরা বুঝি থামতেও ভুলে যায়।

- কী সুন্দর কবিতা লিখত বড়দা। সোনালি গদগদ, সে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না দোলন, কী মিষ্টি কবিতা সব।

- বল না গো দু’চার পংক্তি, শুনি।

- সেকি আমাদের মনে আছে নাকি? তবে সত্যি বলছি, সেসব পংক্তি এখনও বুকের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে।

- একদিন তোমার ছুটির দিনে বড়দা দোকানে চলে গেলে পর ওঁর কবিতার খাতাটা খুলে পড়ব আমরা, বলো? দোলন শুভাশিসের দিকে তাকিয়ে প্রস্তাবটা রাখে।

- ধুশ, কোথায় যে সেই খাতা..., আমরা তাকে চর্মচক্ষে কতদিন দেখিইনি।

- কবিতার খাতা না দেখলে কী হবে, আমি কিন্তু মাঝে মাঝেই বড়দাকে কবিতা লিখতে দেখেছি। কাছে গেলেই ঝপ করে বন্ধ করে দেন খাতা।

- ওটা কবিতার খাতা নয়, ডায়েরী। সেই ছেলেবেলা থেকেই বড়দার ডায়েরী লেখার অভ্যেস।

- হয়ত ওই সঙ্গে কবিতাও লিখেছেন, তোমরা বুঝবে কেমন করে?

- বুঝি। বোঝা যায়। শুভাশিস বলে।

- কেমন করে? হাত গুণে? দোলনের চোখে কপট রোষ।

- আচ্ছা বল তো সেদিন তুমি কেমন করে বললে, টুনটুনিটা বোধ করি লেবু গাছে বাসা বেঁধেছে। তুমি কি বাসাটাকে দেখতে পেয়েছিলে?

- আমি এখন অবধি দেখিইনি বাসাটা।

- তবে? কেমন করে বুঝলে ওইদিন?

- না বোঝার কী আছে? সারাক্ষণ দেখছি, টুনটুনিটা লেবু গাছের আশেপাশেই ওড়াওড়ি করছে। মাঝে মাঝে গাছের ঠাসবুনোট ডালপালার ভেতর ঢুকে পড়ছে, কিছুক্ষণ বাদে আবার বেরিয়ে আসছে। আবার ঢুকছে। আবার বেরোচ্ছে। এমনকি আমি এটাও বুঝেছি, বাসার মধ্যে ডিম পেড়েছে ওটা। বাচ্চাও ফুটিয়েও থাকতে পারে। বাসাটাকে যেন সারাক্ষণ চোখে হারায় পাখিটা।

- কবিতা লেখার সময় বড়দাও একটা টুনটুনি পাখি হয়ে যেত। তখন, ওই পাখিটার মতোই, সারাক্ষণ নিজের মধ্যে ঢুকছে, বেরোচ্ছে। আমাদের চারপাশে ওড়াওড়ি করছে। ভাবুক চোখে চারপাশটাকে দেখছে, আর ঠোঁটে করে দু’একটি কলি নিয়ে ফের ঢুকে পড়ছে ভেতরে।

- বাব্বা! দোলন ঠোঁট ওলটায়, তুমিও তো কাব্যি করছ কম নয়।

- না, না, কাব্যি নয়। শুভাশিস বলে ওঠে, বড়দা যখন কবিতা লিখত, আমরা ওকে দেখেই সেটা বুঝতে পারতাম। এখন আর বড়দার মধ্যে ওটা দেখি না।

শুনতে শুনতে বুকের মধ্যেটা পাথরের মতো ভারী হয়ে আসে দোলনের। একসময় বলে, বড়দার বিয়ের বয়েস কিন্তু একেবারেই পেরিয়ে যায়নি মা। এই বয়েসে কেউ কেউ বিয়ে করেছে বৈকি।

সোনালি আর রূপালি একযোগে বলে ওঠে, তুমি ওঁকে রাজী করাও দেখি, আমরা মোটা ইনাম দেব তোমায়?

দোলনের মনে আছে, যখন প্রথম ওকে দেখতে গেল শুভাশিসের সঙ্গে ছিল ওর দু’দিদি আর বড়দা। হিমানীশ আর শুভাশিসের রূপ দেখে দোলনের বাড়ির কেউই বুঝি নজর সরাতে পারনি। পড়শিরা তো রীতিমতো ধন্ধে পড়ে গিয়েছিল, কিনা, ওদের মধ্যে পাত্রটি কে? কিন্তু ওরা ফিরে যাবার পর শুভাশিসের চেয়ে ওর দাদাকে নিয়েই আলোচনাটা বেশী হয়েছিল দোলনদের বাড়িতে। রূপ তো বটেই, কিন্তু আলোচনাটা বেশী হয়েছিল ওর বয়েস নিয়ে। শুভাশিসের চেয়ে হিমানীশ দশ বছরের বড়, এটা কেউই মানতে চায়নি দোলনদের বাড়িতে। দুজনকে একেবারে পিঠোপিঠি মনে হয়েছিল। বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় যখন বাপের বাড়ি গেল দোলন, ওর মুখে শুনে তো সবাই আকাশ থেকে পড়ে, কিনা, বলে কি, ওর দাদা ওর চেয়ে দশ বছরের বড়!

বাপের বাড়িতে ভাসুরের কথা সাতকাহন করে বলেছে দোলন। ও যে বাড়ির ছেলেমেয়েগুলোর দাদা, নাকি বাবা, সেটাই এখনও অবধি গুলিয়ে যায় দোলনের। শুনতে শুনতে আপ্লুত হয়ে ওঠে সবাই। আজকের দিনে এই ধরণের স্বার্থত্যাগ বিরল। দোলনের মা বলেন, এবার তবে তুইই একটা উদ্যোগ নিয়ে তোর ভাসুরের একটা বিয়ে দিয়ে দে। শুভদের পেছনে সারাটা জীবন তো দিলেন। এইবার একটু থিতু কর্‌ বেচারাকে। তাঁরও তো একটা ভবিষৎ রয়েছে। উঠে পড়ে লাগ্‌ দেখি। তোর ননদদের বল্‌।

- বাব্বা, ঐটি কে করবে? যা রাশভারি, গম্ভীর! সব্বাই ভালোবাসে ওঁকে, বড়দা বলতে অজ্ঞান, তবে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবার সাহস নেই। আমার ননদেরা তো ওঁকে দেখলেই চাপা গলায় বলে ওঠে, ওই এলেন আমাদের ঠাকুরদা। বলেই ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরে। এখনও অবধি, হ্যাঁ ...।

বাস্তবিক, দোলন একা হলে ইদানিং ঐ কথাটাই ভাবে। এখন তো আর সংসারে অভাব বলতে নেই। শুভাশিস ভালো মাইনেই পায়, হিমানীশের দোকানটাও বেশ চলছে। এবার তো তিনি সচ্ছন্দে বিয়ে-থা করতে পারেন। কিন্তু এখনও তিনি তাঁর দোকান নিয়ে দিনরাত এক করতেই ভালোবাসেন। আর, কেউ সাহস করে বিয়ের কথাটা তুললে হালকা হেসে পাশ কাটিয়ে যান।

একদিন কেন জানি মধু বৈরাগী এল শুভাশিসদের বাড়িতে। দু’ভাইয়ের কেউ ছিল না তখন। তবে দোলন ওকে চিনত। এলাকার নামকরা ঘটক সে। দোলনের দু’ননদের তো বটেই, দোলনের সঙ্গে শুভাশিসের বিয়েটা হয়েছে ওরই ঘটকালিতে। মধু হিমানীশের খোঁজ করেছিল সেই বিকেলে। বাড়ি নেই শুনে ফিরে গেল।

তার পরের দিন, সেই প্রথম, দোলন দেখেছিল, হিমানীশ সকাল-সকাল চান সেরে নিলেন। পরিপাটি করে সাজলেন। চকচকে পাম্প-শ্যু গলালেন পায়ে। তারপর দোলনকে ডেকে বললেন, আমি একটুখানি বেরোচ্ছি। ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে। আর, আমি আজ দুপুরে খাব না।

- কোথায় চললেন? দোলন অবাক হয়ে শুধোয়।

- একটু কাজ আছে। বলেই উঠোনে নামলেন হিমানীশ।

দোলন দিনভর ঘর-বার করল, যদি মানুষটা পড়ন্ত বেলায় ফিরে আসেন, কিন্তু হিমানীশ ফিরলেন সন্ধ্যে গড়িয়ে।

রাতের বেলায় বাড়ি ফিরে শুভাশিস শোনে কথাটা। মধু বৈরাগীর কথাটাও ওকে বলে দোলন। ভারি ধন্ধে পড়ে যায় শভাশিস। আচমকা সেজেগুজে কোথায় গিয়েছিলেন দাদা? যাত্রার পালাগান শোনার নেশা রয়েছে বটে হিমানীশের। আশেপাশে কোথাও পালাগান হলে তিনি যাবেনই। কিন্তু সে তো রাতের বেলায়। তবে?

অবশেষে, দিন দুয়েকের মাথায়, শুভাশিস অনেক গোয়েন্দাগিরি করে, মধু বৈরাগীর পাত্তা লাগিয়ে, ওকে জেরা-টেরা করে দোলনকে যা রিপোর্ট দিল, তাতে করে দোলন তো অবাক। মধু বৈরাগীর সঙ্গে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন হিমানীশ!

দোলন হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না।

প্রথমেই কিছুটা হাসাহাসি করল দু’জনে।

দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে দোলন বলে ওঠে, দুগ্‌গা দুগ্‌গা! কোনও গতিকে বড়দার জন্য একটা বউ জুটে যায় যেন! আমি গাঁয়ের মা-মনসার থানে জোড়া পাঁঠা দেব।

- মনসাকে পাঁঠা দিয়ে কী হবে? শুভাশিস দোলনের পেছনে লাগে, মনসা কি বউ জোটাবার মালিক নাকি? শেষ অবধি একটা কালকেউটে এনে ঢুকিয়ে দেবে ঘরে? তাকে তুমি দিদি বলে ডাকলেই ফোঁস করে উঠবে। বিয়ে দেবার মালিক হলেন প্রজাপতি।

- জয় বাবা প্রজাপতি। দোলন জোড়হস্তে প্রণাম করে ওপরের দিকে তাকিয়ে, আমি তোমাকে, আমি তোমাকে, অ্যাই, প্রজাপতিকে কী দেওয়া যায় বল তো?

- জানিনে। মুখ টিপে শুভাশিস বলে, তবে মনে হয় ঘন্টজাতীয় কিছু তাঁর প্রিয়। কথায় বলে না, প্রজাপতি নির্ঘণ্ট।

দুজনে মিলে সেই সন্ধ্যেয় খুব হাসাহাসি করল বটে, তবে অবশেষে দুটো সিদ্ধান্ত নিল। এক, হিমানীশকে এব্যাপারে কিছুই জিজ্ঞেস করা যাবে না। বেজায় লজ্জা পেয়ে হয়তো বা থেমে যেতে পারেন তিনি। এমনকি, ওরা যে ব্যাপারটা জেনে ফেলেছে, সেটাও জানতে দেওয়া যাবে না। দুই, মধু বৈরাগীর পেছনে লেগে থাকতে হবে, যাতে একটা মেয়ে সে যেকোনও গতিকে জুটিয়ে দেয়।

পরের রোববার শুভাশিস যায় মধু বৈরাগীর কাছে। বলে, তোমার হাতযশ তো দেখেছি দিদিদের বেলায়, এবার শেষ খেল্‌টা দেখাও দেখি। তোমাকে আমি ডবল ঘটকবিদায় দেব।

তাতে করে উৎসাহিত হয়ে মধু বুক বাজিয়ে বলে, আমি এখনও অবধি একটা কেসেও ফেল মারিনি ছোড়দা। এবারে ওস্তাদের শেষ মারটা দেখো।

বিদায়কালে মধু বৈরাগীকে আগাম একশো টাকা দিয়ে আসে শুভাশিস।

শুভাশিস আর দোলন দিন গুনতে থাকে।

ইদানিং মাঝে মাঝেই, মানে, মাসে এক-দু’বার সকাল-সকাল সেজেগুজে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন হিমানীশ। দোলন ওই দিনগুলোতে দম আটকে বসে থাকে সারাক্ষণ।

হিমানীশ যে আবার কোনও মেয়ে দেখতে যাবেন, ইদানিং সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারে দোলন। আগের দিন সন্ধ্যেপ্রহর থেকেই হিমানীশকে একটুখানি উড়ুউড়ু লাগে। কেমন থমথমে ভাব। যেন রাত পোহালেই কোনও শক্ত পরীক্ষা রয়েছে। সেই রাতে ভালো করে খান না। কারোর সঙ্গে ভালো করে কথা বলেন না। কেবল নিজের মনের মধ্যে কী এক ভাঙাগড়ার খেলা চলে সারাক্ষণ। আর, তখনই দোলন নিশ্চিতভাবে বুঝে যায়, রাত পোহালেই হিমানীশ বেরিয়ে পড়বেন মধু বৈরাগীর সঙ্গে। পরের দিন সত্যি সত্যি সাতসকালে চানটান সেরে পাটভাঙা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়ে নেন হিমানীশ। আর, তাই দেখে দোলন শুভাশিসকে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, কেমন, তোমায় বলেছিলাম না কাল রাতে।

সেদিন সারাটা দিন, দোলন অধীর উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটায়। শুভাশিসও অফিসে গিয়ে তিলমাত্র স্বস্তি পায় না। ওরা প্রতিবারেই আশা করে, যে কোনও মুহূর্তে মধু বৈরাগী এসে বলবে, এবার আমার ঘটক-বিদায়ের পাকা ব্যবস্থাটা পাকা কর গো দোলনদিদি, মাছ এবার পুরোপুরি ছিপে গেঁথেছে।

কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় হিমানীশ ফিরে এলেই ওঁর মুখ দেখলেই দোলন বুঝে ফেলে, খালি হাতে ফিরেছেন বড়দা। পরের একটা দুটো দিন হিমানীশকে কেমন বিষন্ন, আনমনা লাগে। তাই দেখে দোলন ষোলআনা নিশ্চিত হয়, এবারের সফরটাও একেবারে বৃথায় গেছে।

দোলন সেটা নিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিলেও, শুভাশিস কিন্তু ফি-বারেই আশায় বুক বেঁধে ছুটে যায় মধু বৈরাগীর কাছে। কী হল? মেয়ে পছন্দ হয়েছে দাদার?

মধু বৈরাগী প্রত্যেকবারই ঠোঁট ওলটায়, কোথায় হল ছোড়দা? পলাশপুরের মেয়েটা তো সবকিছুতেই ভালো ছিল। তবুও বড়দা নাকচ করে দিলেন। কিনা, গায়ের রঙটা বেশ চাপা। ছেলেমেয়েগুলো চাপা রঙ নিয়ে জন্মাতে পারে। শিমূলতলায় চক্কোত্তিদের বাড়ি থেকে একটা সমন্ধ নিয়ে এলাম, মেয়েটা বেশ ফর্সা, কিন্তু তাও বড়দার মত পেলাম না। কিনা, মেয়েটা ফর্সা, তবে কটা ফর্সা। মেয়েদের কটা ফর্সা হওয়া নাকি ভালো নয়। গেল মাসে হেতমপুরে গিয়ে যে মেয়েটাকে দেখিয়ে আনলাম, তাকে দেখে বললেন, রঙটা ঠিক আছে, কিন্তু কপালটা একটু উঁচু। উঁচকপালী মেয়ে ভালো নয়। দিনকয় আগে একটা ভালো সমন্ধ পেয়েছি হরিরামপুরে। বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে। খুব সুন্দরী, আর স্বভাব-চরিত্রও খাসা। জানি না, এবার কোন ফ্যাকড়া তোলেন বড়দা।

শুনতে শুনতে দমে যায় শুভাশিস। মধু বৈরাগীর ওপরই ক্ষেপে ওঠে, তুমি কেমন ঘটক হে? একটা পছন্দসই মেয়ে জোগাড় করতে পারছ না। মধু লজ্জায় বুঝি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চায়। তাও শেষ অবধি ওকে আরও একশো টাকা দিয়ে আসে শুভাশিস। বলে, দ্যাখো- দ্যাখো, খোঁজ। বিশ্বসংসারে একটা বিবাহযোগ্যা মেয়ে পাওয়া যাবে না?

কিন্তু এরপরও দু-দুটো মেয়েকে বাতিল করে দিলেন হিমানীশ। মধু বৈরাগীর থেকে সেই খবর, ভায়া শুভাশিস, চলে এল দোলনের কাছে। একজনার নাকি রাশি-নক্ষত্রে মেলেনি, আর একজনার নাকি রাক্ষসগণ। এই নিয়ে নিত্যদিন গবেষণা চলে শুভাশিস আর দোলনের মধ্যে। শুভাশিস এর ব্যাখাটা এইভাবে দেয়, অল্প বয়েসে মন হল একটি রোমান্সের পুঁটলি। তখন যে-কাউকে দেখলেই ভালো লেগে যায়। তখন একটুখানি উঁচু কপাল হলে সেটা ছেলেদের চোখে প্লাস পয়েন্ট হয়ে ওঠে। দাদার সেই পুঁটলিটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। তাঁর চোখে এখন কেবল বাস্তব আর বাস্তব। ছোটখাট খুঁতগুলো আগেভাগেই নজরে পড়েছে তাই। নইলে আমার কথাই ধর না-, তখন তো তোমাকে দেখামাত্রই আমার ‘আঁচাব কোথায়’ ভাব, কিন্তু অ্যাদ্দিনবাদে, এই বয়েসে তোমাকে দেখলে পরে হয়ত-বা...। এই অবধি বলেই দোলনের দিকে আড়চোখে তাকায় শুভাশিস। আর, ওই মুহূর্তে সে দোলনের চোখে ঝড়ঝঞ্ঝা, সুনামির সংকেতগুলি পেয়ে যায়। কপট রাগে ততক্ষণে নাকের পাটা ফুলতে লেগেছে দোলনের।

ইদানিং বেশকিছু দিন বন্ধ ছিল ব্যাপারটা। প্রায় মাস তিনেক। অ্যাদ্দিন বাদে দোলনের মুখে খবরটা শুনে শুভাশিসের চোখেমুখে নির্মল কৌতুকের ঝিলিক।

দোলন বলে, বড়দার জুতো পালিশ প্রায় হয়ে এল। এক্ষুণি হয়ত বা চান সেরেই বলবেন, দোলন, একটু কিছু খেতে দাও তো, আমায় আজ একটু বেরোতে হচ্ছে। আমি যাই গো।

দোলন সাত-তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢোকে।

দোলন যা ভেবেছিল ঠিক তাই হল। একটু বাদেই চান সেরে খাবার চাইলেন হিমানীশ।

সাত-তাড়াতাড়ি খাবার সাজিয়ে দেয় দোলন। কিছু না বোঝার ভান করে বলে, দুপুরে খেতে আসবেন তো?

- না, না, আজ বাইরেই খেয়ে নেব আমি।

- ঠিক আছে। আপনার ভাই কাল অফিস-ফেরত বড় বড় কই এনেছে। এবেলা তেলকই রাঁধব ভাবছিলাম। ঠিক আছে সন্ধ্যেবেলায়ই রাঁধব। রাতের বেলায় খাবেন।

- না, না, ইয়ে- মানে- আজ বোধ করি ফিরতে পারব না। একটু দূরে যেতে হচ্ছে কিনা।

হিমানীশ বেরিয়ে যাওয়া মাত্র দৌড়তে দৌড়তে শুভাশিসের কাছে চলে আসে দোলন। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, এবার নির্ঘাত আমার দিদি আসছে ঘরে।

শুভাশিস ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

চোখ মটকে দোলন বলে, বড়দা আজ দূরে কোথায় গেলেন। আজ আর ফিরবেন না রাতে। তার মানে, এবার নির্ঘাত মধু বৈরাগী দূরের কোনও খানদানি দিঘিতে চার ছড়িয়েছে। ছিপে এবার মাছ না গেঁথে যায় না।

দু’চোখে আলো জ্বেলে শুভাশিস বলে, তাই যেন হয়!

কিন্তু পরের দিন ফিরে এসে মধু বৈরাগী হতাশ মুখে শুভাশিসকে জানায়, সবই ঠিক ছিল ছোড়দা, একেবারে শেষমুহূর্তে বড়দা ফ্যাঁকড়া তুললেন, কিনা, দাঁতগুলোর মধ্যে চিরুনির মতো ফাঁক রয়েছে। চিরনদাঁতি মেয়ে অশুভ।

বলতে বলতে মধু বৈরাগী একসময় ক্ষেপে ওঠে, মনে হচ্ছে আমার দ্বারা আর হবে না ছোড়দা। আপনারা বরং কেষ্টনগরে গিয়ে অর্ডার দিয়ে আসুন মেয়ের।

শুভাশিস অনেক বলে-কয়ে একসময় ঠান্ডা করে মধুকে, অত রেগো না মধুদা। এই বয়েসে যে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে, এই না কত! একটুখানি ধৈর্য ধরে লেগে থাক দাদা, তুমি নির্ঘাত পারবে।

মধু বৈরাগী গজগজ করতে করতে রাজী হয়।

শুভাশিস ওর হাতে গুঁজে দেয় একখানা কড়কড়ে একশো টাকার নোট। তাতে করে কিঞ্চিৎ শান্ত হয় মধু।




রোজ দুপুরবেলায় দোকান বন্ধ করে বাড়িতে খেতে আসেন হিমানীশ। তখন বাড়িতে দোলন ছাড়া আর কেউ থাকে না। দোলনও ওই অবধি না খেয়েই থাকে। হিমানীশ এলে পর তাঁকে পাশে বসে যত্ন করে খাইয়ে তবে খায়।

এটা পছন্দের নয় হিমানীশের। রোজ ওই নিয়ে অনুযোগ ভত্সনা করেন খেতে বসে। কিনা, আমার জন্য মোটেই অপেক্ষা করবে না। আমার ব্যবসাপাতির হাজার ঝামেলা। কখন কোথায় থাকি, ঠিক থাকে না। তুমি কেন রোজ রোজ না খেয়ে বসে থাকবে? দোলন নিঃশব্দে শুনে যায়। তাবলে হিমানীশের নির্দেশমতো আগেভাগে খেয়েও নেয় না।

একদিন সাহসে বুক বেঁধে কথাটা বলেই ফেলে দোলন, বাড়িতে একটা দিদি আনুন, আর আমি না খেয়ে থাকব না। তখন ওই-ই হেঁসেল আগলে বসে থাকবে আপনার জন্য।

গ্রাস মুখে তুলতে গিয়েও থমকে থেমে যান হিমানীশ। দোলনের চোখের ওপর সরাসরি চোখ রাখেন। পড়তে চেষ্টা করেন, দোলনের ওই মন্তব্যে কোনও রসিকতা লুকিয়ে রয়েছে কিনা। যখন নিশ্চিত হন যে, তা একেবারেই নয়, তখনই তাঁর মুখে ফুটে ওঠে আলতো হাসি। বলেন, কী যে বল, এই বয়েসে তোমার জন্য দিদি আনতে যাব আমি! লোকে হেসে কুটোপাটি হবে না?

দোলন বুঝতে পারে, চতুর্দিকে মেয়ে খুঁজে বেড়ানোর ব্যাপারটা এখনও অবধি গোপন রাখতেই চাইছেন হিমানীশ। কাজেই, সেও খুব নিপাট মুখ করে বলে, কেউই হেসে কুটোপাটি হবে না। এমন কিছু বয়েস হয়নি আপনার। আমাদের দেশেগাঁয়ে গাদা গাদা দোজবর এর চেয়ে বেশী বয়েসেও দ্বিতীয়বার বিয়ে করে। তাছাড়া, আপনার যা শরীর-স্বাস্থ্য, এখনও যা রূপ, বোঝাই যায় না আপনার পঞ্চাশের ওপর বয়েস।

দোলনের কথা ধরণে হিমানীশের ভুরুতে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ে। গোটা বাড়িতে কেউই তাঁর সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে সাহসই পায় না। এমনকি, তাঁর বোনগুলো, দুটো তিনটে বাচ্চার মা ওরা, তবুও হিমানীশের সামনে এভাবে কথা বলবার কথাও স্বপ্নেও ভাবে না। সেই কতদিন ধরে হিমানীশের অভিজ্ঞতা তেমনই। ওদের মধ্যে কেবল দোলন, পরের বাড়ি থেকে আসা পুঁচকে মেয়েটা, হিমানীশের থেকে না-হোক পনেরো বছরের ছোটো, কেমন পাকা বুড়ির মতো কটকট করে কথা বলছে, ওর মুখের ওপর তক্কো করছে! কতদিন বাদে এই সংসারের একজন কেউ তাঁর সঙ্গে এমন সাবলীল ভঙ্গিতে কথা বলল! এটাই হিমানীশকে বেশ আপ্লুত করে তোলে। দোলনের চোখের ওপর সরাসরি চোখ রেখে শুধোন, কত মনে হয় আমার বয়েস?

- সত্যি বলব বড়দা? দোলন অকম্পিত গলায় বলে ওঠে, মনে হয় বড়জোর চল্লিশ।

মাথা নিচু করে খেতে থাকেন হিমানীশ। একসময় বিড়বিড় করে বলেন, অনেকেই অবশ্য বলে এমনটা। কিন্তু তাই বলে, বয়েস তো আমার সত্যি সত্যি চল্লিশে থেমে নেই। এই বয়েসে বিয়ে... না, না...। হালকা হাসিতে মুখ ভরিয়ে হিমানীশ সেদিনের মতো তাঁর শেষ রায়টা দিয়ে দেন।

- তুমি এত কথা বলতে পারলে? সন্ধ্যেয় অফিস থেকে ফিরে দোলনের মুখে ওইসব কথার সারাৎসার শুনে শুভাশিসের দু’চোখ কপালে উঠে যায়। মানে, তোমার ভয় করল না?

- ভয় করবে কেন?

- বাপ রে, যা গম্ভীর!

- তোমাদের সামনেই গম্ভীর। একা একা বাড়িতে থাকলে বড়দা যে কত মজার মজার কথা বলেন!

শুনে অবাক হয়ে যায় শুভাশিস।

হিমানীশ ইদানিং খাওয়ার সময় নিজের পাশটিতে দোলনকেও ডেকে নেন। বলেন, আর দেরি করলে তোমার পিত্ত পড়ে যাবে দোলন।

প্রথম প্রথম খুব বাধত দোলনের। লজ্জা করত। একসময় হিমানীশের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে।

হিমানীশের পাশটিতে বসে খেতে খেতে দুজনে কত কথাই হয় ইদানিং। হিমানীশ নিজের জীবনের কত অজানা কথা বলেন দোলনকে। বাবার কথা, তাঁর ছেলেবেলার কথা, স্কুল-কলেজের কথা, তাঁর আজীবন লড়াইয়ের কথা ...।

- আপনি তো এককালে ভালো কবিতা লিখতেন বড়দা। দেশ-এও নাকি আপনার কবিতা বেরিয়েছে?

- কে বলল তোমায়? হিমানীশ খাওয়া থামিয়ে বড় বড় চোখে তাকান।

- আমি শুনেছি। এখন আর লেখেন না কেন বড়দা?

সে কথায় আলগোছে হাসেন হিমানীশ, আনমনা হয়ে যান, কবিতা লেখার একটা বয়েস থাকে, জানো তো? এই বয়েসে কি কবিতা লেখা যায়?

- এটা বোধহয় ঠিক নয় বড়দা। মহাকবি বাল্মীকি, বেদব্যাস কত বছর বয়েসে ওইসব মহাকাব্য লিখেছিলেন, বলুন তো?

দোলনের কথায় হেসে ফেলেন হিমানীশ। কাদের সঙ্গে তুলনা করছ আমার!

পরের মেয়েটাও বাতিল হয়ে গেল। এবারে আর রঙ নয়, কপাল নয়, দাঁত নয়, এবার গোল বেঁধেছে মেয়ের পায়ের আঙুল নিয়ে। মেয়ের দু’পায়ের মধ্যম আঙুলদুটি বেখাপ্পা লম্বা। সেটা ভালো নয়।

বড়ই ধন্ধে পড়ে যায় শুভাশিস। দাদা কি সত্যি সত্যি বিয়ে করতে চান? নাকি ...




সেদিন ভরদুপুরে দোকান থেকে খুব গম্ভীর মুখে ঘরে ফেরেন হিমানীশ। দেখেই কেমন জানি ভাবনায় পড়ে যায় দোলন। সাততাড়াতাড়ি ঠান্ডা জল এনে ধরে দেয় সুমুখে।

একটুখানি জিরিয়ে নিয়ে খেতে বসেন হিমানীশ। ভালো করে খেতেও পারেন না। দোলন ভাবনায় পড়ে যায়। খুব ব্যকুল গলায় শুধোয়, আপনার শরীর কি খারাপ লাগছে বড়দা?

তার জবাবে হিমানীশ কপালটা চেপে ধরে বলেন, শরীর ভালোই, তবে মাথাটা কেমন ধরেছে। আসলে রোদ্দুরটা লেগে গেল বাড়ি ফেরার বেলায়।

মুখ ধুয়ে হিমানীশ নিজের ঘরে বিছানায় গিয়ে শুলেন। দোলন একটা অম্রতাঞ্জনের কৌটো নিয়ে হাজির হয় হিমানীশের ঘরে।

- আপনার কপালে একটু অম্রতাঞ্জন ঘসে দিই। মাথাধরাটা চলে যাবে।

হিমানীশ বাধা দেন না। শিয়রের পাশে বসে দোলন হিমানীশের কপালে আলতো আঙুলে অম্রতাঞ্জন বোলাতে থাকে।

চোখদুটো বুঁজে ছিলেন হিমানীশ। খুবই যে আরাম পাচ্ছিলেন, সেটা বুঝতে পারছিল দোলন। একটা সময় সে বলে ওঠে, বড়দা, একটা কথার সত্যি জবাব দেবেন?

দোলনের গলায় এমন কিছু ছিল, হিমানীশ চোখ মেলে তাকান ওর দিকে। দোলন সরাসরি বলে, আপনি কি সত্যি সত্যি বিয়ে করতে চান না?

হিমানীশ অকস্মাৎ চোখ খোলেন, হঠাৎ এমন প্রশ্ন?

- হঠাৎ নয়, আমি আর আপনার ভাই বেশকিছুদিন ধরে ভাবছি কথাটা। আপনি নিশ্চয় বিয়ে করতেই চান না। নইলে মহিমপুরের মেয়েটাকে বাতিল করে দিতেন না। মেয়েটা তো সব দিক থেকে খুবই ভালো। তবে, কেন আপনি পছন্দ করছেন না ওকে?

দোলনের কথায় বিস্ময়ে থ হয়ে যান হিমানীশ। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন দোলনের দিকে।

একসময় খুব অবাক চোখে শুধোন, কেমন করে বলছ, মেয়েটা সবদিক থেকে ভালো? তুমি তো তাকে দেখোইনি!

- দেখেছি। মৃদু গলায় জবাব দেয় দোলন। আপনার ভাইও দেখেছে। মধুদার থেকে ঠিকানা নিয়ে আমরা দুজনে গিয়ে দেখে এসেছি ওকে। খুবই ভালো মেয়ে সে। রূপে-গুণে একেবারে আপনার যোগ্য সে। আপনার সঙ্গে ওকে খুবই মানাবে, বড়দা।

অকস্মাৎ খুবই গম্ভীর হয়ে যান হিমানীশ। গম্ভীর গলায় বলেন, কতদিন আমার ওপর এই গোয়েন্দাগিরিটা চলছে? বলেই খুব ধারাল দৃষ্টিতে দোলনের দিকে তাকিয়ে থাকেন হিমানীশ। পরক্ষণেই ফিক করে হেসে ফেলেন।

এতক্ষণে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে দোলন। হিমানীশের দিক থেকে এক ধরণের প্রশ্রয়ও পেয়ে যায় বুঝি। খুব জেদি গলায় বলে, আমি বলছি, ওই মেয়েটা আপনার জন্য খুবই ভালো হবে। রাজী হয়ে যান বড়দা, প্লীজ।

হিমানীশ একটুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর দুদিকে নিঃশব্দে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বুঝিয়ে দেন, ওই মেয়েটাকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

রাগত গলায় দোলন বলে ওঠে, তবে কেমন মেয়ে আপনার পছন্দ শুনি? কেমন মেয়ে হলে আপনার মনে ধরবে?

এতক্ষণে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকান হিমানীশ। চাপা হাসিতে মুখ ভরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন দোলনের দিকে। একসময় ফস করে বলে ওঠেন, যদি বলি, তোমার মতো।

থরথর করে কেঁপে ওঠে দোলন। এই নির্জন বাড়িতে এই মুহূর্তে সে আর হিমানীশ ছাড়া আর তৃতীয় প্রাণী নেই।

দোলনকে কেমন অসহায় লাগে। একটুক্ষণ পাথরের মতো বসে থাকে সে। একসময় উঠে দাঁড়ায়। আলতো গলায় বলে, আপনি একটু ঘুমোবার চেষ্টা করুন বড়দা। দেখবেন, মাথাধরাটা চলে যাবে।

বলেই আর হিমানীশের ঘরে দাঁড়ায় না দোলন। ঘর থেকে বেরিয়েই এক দৌড়ে চলে আসে নিজের ঘরে।

সেই রাতেই নিজের ডায়েরীতে লিখলেন হিমানীশঃ দোলন, তুমি ইদানিং আমাকে বিয়ে করবার জন্য পীড়াপিড়ি কর। আজ তো খুবই চেপে ধরেছিলে। আমি যে প্রায় মেয়ে দেখে বেড়াই, আমার যে কোনও মেয়েই পছন্দ হয় না, ওই নিয়ে তোমাদের মধ্যে হাসাহাসি চলে, আমি জানি। আজ তুমি ওই নিয়ে খুব জেরা করছিলে। তোমার ওই জেরার জবাবে যখন আমি বলে বসলাম, তোমার মতো একটি মেয়ে চাই, স্পষ্ট দেখতে পেলাম, একেবারে থরথর করে কেঁপে উঠেছিলে তুমি। খুব সম্ভব বেজায় ভয় পেয়েই তুমি আমার ঘর থেকে সাততাড়াতাড়ি পালালে। সম্ভবত আমাকে খুব নিচু স্তরের লম্পট বা তেমনই কিছু ভেবে নিয়েছ, যে কিনা তার ভাতৃবধূকে কামনা করে মনে মনে। তাহলে তোমায় খুলেই বলি দোলন। শুভর জন্য তোমাকে দেখতে গিয়ে প্রথম দর্শনেই তোমাকে আমার এতটাই ভালো লেগে গিয়েছিল যে, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, সর্বোপরি মায়ের কথায়ও যে-আমি কিনা বিয়ের যাবতীয় প্রস্তাব ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছি, সেই আমার মধ্যে, স্রেফ তোমাকে দেখেই, সেই প্রথম, বিয়ে করবার বাসনাটা উথলে উঠেছিল। কিন্তু দেখলাম, তোমার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয়েছে শুভ। তার ওই মুগ্ধতাকে টপকে তোমার কাছ অবধি পৌঁছতে পারিনি সেদিন। তবে এর ফলে আমার একটা লাভ এবং একটা বড়সড় ক্ষতি হয়ে গেল। লাভ হল এই, তোমাকে দেখবার পর যে বিয়ের বাসনাটা তৈরি হয়েছিল, সেটা একটু একটু করে স্থায়ী হল মনে। ক্ষতি হয়ে গেল এই যে, তুমি আমার চোখের মধ্যে এমনটাই স্থায়ী হয়ে গেলে, ওই চোখ দিয়ে দেখে আর কোনও মেয়েকে বরণ করতে চাইছে না মন। খুবই কি অসাধারণ সুন্দর দেখতে তুমি? খুবই রূপবতী? না। তুমি কাঞ্চনবর্ণা নও, দীর্ঘআঁখিপল্লবা নও, শিখরদর্শনাও নও, ভ্রমরের মতো নয় তোমার চোখদুটো, নাকও নয় তিলফুলি, চকিতা হরিণীর চাহনিও নেই তোমার দৃষ্টিতে, ডালিমের কোয়ার মতো নয় তোমার ঠোঁট, তোমার শরীরের প্রতিটি প্রত্যঙ্গ ধরে ধরে বিচার করলেও কোথাও নেই সেই দেবদুর্লভ সৌন্দর্যের আয়োজন। মুখে নেই, চোখে নেই, নাকে নেই, গাত্রবর্ণে নেই, কণ্ঠে নেই, স্তনযুগলে, নিতম্বে, পদচারণায়, ভ্রকুটিতে, কোথাও নেই। হয়তো-বা শরীরের কোথাও নেই সেই অনিন্দ্যসুন্দর রূপ। কিন্তু কোথাও রয়েছে তোমার এমন-কিছু সৌন্দর্যসম্পদের সম্ভার, যা দেখে আজ থেকে দশ বছর আগে আমি আর শুভ, দুজন রূপবান যুবক, একসঙ্গেই মুগ্ধ হয়েছিলাম একেবারে তৎক্ষণাৎ। তারপর ... , কতদিন ... , কত মুহূর্তে আমি সেই রূপের উৎসটিকে আবিস্কার করতে চেয়েছি। হয়তো শারীরিক রূপ নয়, কেবলমাত্র কমনীয় ব্যক্তিত্বই নয়, শরীরজ রূপের সঙ্গে ওই ব্যক্তিত্ব কোন এক দুর্লভ রসায়নে মিশে গিয়েই এমন মুগ্ধতা সৃষ্টিকর প্রতিমাটি গড়ে দিয়েছেন মনে।

এতদ্বারা, কেবল তুমি কেন, যে কেউ আমাকে লম্পট ভেবে বসতে পারে। কিনা, আমি বুঝি মনে মনে ছোটভাইয়ের স্ত্রীর রূপে পাগল হয়ে গেছি। আমি বুঝি মনে মনে তাকে কামনা করছি। দোলন, তুমি তো জানোই, একেবারেই ভুল সেটা। ইদানিং তোমার সঙ্গে কত কথা, গল্প, আড্ডা চলে আমার, শুধু তোমার সঙ্গেই তো চলে, আমরা কত দীর্ঘসময় মুখোমুখি বসে গল্প করি ইদানিং। ওই সময়টা আমার চোখের দিকে এক ঝলক তাকালেই যেকোনও মেয়ের পক্ষেই বুঝে ফেলা সম্ভব, সেই দৃষ্টিতে বাস্তবিক কী আছে। এই দুনিয়ার সব মেয়েই তা বুঝে ফেলে, আর, তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়ে তো ...। কিন্তু তুমি নিশ্চয় জান, আমার দৃষ্টিতে একমুহূর্তের জন্য তেমন কোনও কামনার ছায়া দ্যাখোনি তুমি। সেটা তুমি দেখতে পারোই না, কারণ, সেটা আমার মধ্যে নেইই। এখনও আমার চোখে তুমি ষোলআনা আমার ভাতৃবধূ, ভগ্নীসমা, কন্যাসমা। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার বুকের মধ্যে, সেই দশ বছর আগে, যেদিন তুমি প্রথম হাজির হলে আমার সামনে, যে ছবিটি আঁকা হয়ে গিয়েছিল তৎক্ষণাৎ, সেটা কেমন করে জানি পাকারঙ হয়ে রয়েছে আজও। এবং সেই ছবিটি আজকের দোলন নয়।

আমি পাত্রী পছন্দের অজুহাতে সেই মেয়েটাকেই খুঁজে বেড়াই দোলন। আমার বুকের মধ্যেকার ছবিটির সঙ্গে যদি আচমকা কোনও মেয়ের ছবি হুবহু মিলে যায়, আমি তৎক্ষণাৎ তার গলায় মালা পরিয়ে দেব। কিন্তু আমি জানি, সেই দিনটি আমার জীবনে কোনওদিনও আসবে না। কারণ, এই দুনিয়ায় দুটো মেয়ে, তার সবকিছু নিয়ে, হুবহু এক হয়, এমন একটাও ঘটনার কথা আমার জানা নেই। কাজেই মধু বৈরাগীর সাধ্য নেই তেমন মেয়ের কাছে এজন্মে আমাকে হাজির করতে পারে।

কাজেই, চলবে। আমার খোঁজা, খুঁজে চলা। এটা আর আমার কাছে, উপস্থিত, পাত্রী খোঁজা নেই দোলন। এটাকে এক ধরণের খেলা বলতে পার। মনের ওই গোপনতম ছবি আর ওই সম্পর্কিত ইচ্ছেটাকে নিয়ে এই বয়েসে একটুখানি খেলতে থাকা। এই খেলার মধ্যেকার মজাটা তুমি বুঝতে পারবে না দোলন। তুমিও না, শুভও না। এই খেলার সুখটাকে তোমরা ঠিক চেন না।

সেই সুখটা, এজন্মে, কেবল আমিই ভোগ করে গেলাম।





1 টি মন্তব্য: