সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

আবির্ভাব

দিব্যেন্দু পালিত

প্রিয়নাথরা যে গরীব, দিন চালায় কায়ক্লেশে, এটা সকলেই জানত। যে-পাড়ায় ওরা থাকত সেই পাড়ার মানুষদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল না। তাদের সাচ্ছল্যের সঙ্গে অবশ্য কোনও তুলনাই চলত না প্রিয়নাথদের। তবে সচ্ছল মানেই তো আর খারাপ নয়। পাড়ার যারা পুরনো বাসিন্দা এই গরীব পরিবারটিকে তারা আগলে রাখত ভালবাসা ও মমতা দিয়ে। নতুন কেউ এলেও চেষ্টা করত চিনিয়ে দিতে, যাতে প্রিয়নাথদের প্রতি তারাও হয়ে ওঠে সহানুভুতিশীল।


এমনতর পরিবেশে গরীব হওয়ার সুবিধা আছে। পাড়ার যে-কোনও বাড়িতে উৎসবের উপলক্ষ থাকলে এবং খাওয়াদাওয়া হলে লিস্টের সবচেয়ে উপরে নাম থাকত প্রিয়নাথদের। দু-ঘরের সংসারে স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ঠাসাঠাসি করে থাকা--দরজা খুললেই খসে পড়ে আব্রু। ব্যাপারটা সকলেই জানত বলে কেউই আর ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করত না। দরজায় দাঁড়িয়েই বলত, সামনের রবিবার আমার বড় ছেলের বিয়ে। তোমরা কিন্তু অবশ্যই আসবে--, ইত্যাদি। প্রিয়নাথ বা তার স্ত্রী শ্যামা বলত, একটু বসে যাবেন না? সকলেই জানত এটা ভদ্রতার কথা। বলত, না, না। এখন অনেক জায়গায় যেতে হবে তো! বরং আর একদিন--। তারপর বলল, শুধু রাত্রে নয়, দিনের বেলাতেও আসবে সকলে, খাবে--

প্রিয়নাথের তিন ছেলেমেয়ের বড় দুটির বোধবুদ্ধি হয়েছে কিছুটা। আড়ালে থেকে এইসব কথোপকথনে কান দিত ওরা এবং আহ্লাদে আটখানা হত যখন শুনত দু'বেলারই নেমন্তন্ন পেয়েছে তারা। ওদের লোনা করা আহ্লাদ প্রত্যক্ষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলত শ্যামা। আর প্রিয়নাথ? দীর্ঘশ্বাস না ফেললেও একরকম বোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত সে, ক্ষুধা ও খাদ্যের সম্পর্কটা গোলমাল হয়ে যেত মাথার মধ্যে।

তবে এই কাঙালপনায় শুধু যে দুঃখ ছিল তা নয়। কিছু মজাও ছিল। অভাবের সংসারে যেদিন কোনও কারণে হাঁড়ি চড়ত না বা শুধুই ভাতে ভাত হত, প্রিয়নাথের ছেলেমেয়েরা সেদিনও খাবার জন্যে বায়না করত না কোনও। সেদিন কবে, কোথায়, কাদের বাড়িতে কী কী ভালো খাবার খেয়েছে, এই নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠত তারা বিভিন্ন সুস্বাদু খাদ্য সম্পর্কিত আলোচনায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।

এই ধরনের কাঙালপনা পছন্দ হত না প্রিয়নাথের। গোরার দিকে তা অপমান লাগত রীতমত। কিছুতেই ভুলতে পারত না সে এম-এ পাশ, সুতরাং শিক্ষিত এবং ভদ্রলোক। কিন্তু তার পরেই ভাবতে বাধ্য হত কী হল এসব তকমায়! মানুষের বিচার হয় অর্থ ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে-- এই দুটোর কোনওটাই পায়নি সে। কোনও চাকরিতেই পার্মানেন্ট হয়নি, কোনও কাজেই এঁটে বসতে পারেনি। নির্দিষ্ট কোনও কাজ করতে না পারায় এখন সে অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করবার চেষ্টা করে এবং কোনওটা থেকেই সেরকম উপার্জন করে না। টাকার দাম কমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের দামও কমে গেছে অনেক-- সংসারের কোনও ইচ্ছাই পূরণ করতে পারে না। এই অবস্থায়, তার সক্রিয় চেষ্টা ছাড়া ইচ্ছাগুলো যদি পাড়া প্রতিবেশীরাই পূরণ করে দেয়, তাতে সে বাধা দেবে কোন সাহসে!

ভাবনাটা একটা আপস শিখিয়ে দেয় প্রিয়নাথকে। নিজে শেখার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামাকেও ব্যাপারটা শিখিয়ে দেয় সে। আপসটা হল, নেমন্তন্ন পেয়ে কাঙাল ছেলেমেয়েগুলোকে ক্ষুধা নিবৃত্তিতে পাঠালেও সে বা শ্যামা যুগ্মভাবে কখনও তাদের সঙ্গী হত না। অর্থাৎ কখনও প্রিয়নাথ যেত, কখনও শ্যামা। যে যেত না সেদিন সে অসুস্থ থাকত। এইভাবে লোকের চোখে না হলেও নিজেদেরই চোখে তারা পুরোপুরি কাঙাল হওয়া ঠেকিয়ে রাখত।

কিন্তু, শুধু খাবার জন্যেই যে ডাক পড়ত তাদের তা নয়। পাড়ার কোনও বাড়িতে কোনো মান্যিগন্যি বা বড় মানুষ এলেও ডাক পড়ত তাদের। যারা ডাকত, বড় মানুষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে তারা বলত, প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি, আমাদের খুব প্রিয়জন। বড় ভালো মানুষ। এই ওর স্ত্রী শ্যামা। আর এরা-- ভুনি, টাকু, বিনি-- ওদের ছেলেমেয়ে। বলত, ছেলেমেয়ে। বলত, চুপ করে কেন প্রিয়নাথ! আলাপ করো ওঁর সঙ্গে। তুমি তো অনেক কিছু জানো। এসব কথায় বিলক্ষণ লজ্জা পেত প্রিয়নাথ, কথা ফুটত না মুখে। কোলের ওপর জড়োসড়ো হাত দুখানি রেখে ও দেখত বড় মানুষটির সান্নিধ্য পাবার জন্যে অনেকেই ঘুরঘুর করছে আশেপাশে, কিন্তু সান্নিধ্য পাচ্ছে শুধু তারাই। ভুল করে হলেও কখনও নিজেকেই বড় মানুষ ভেবে ফেলত।

বাড়ি ফিরে বড় মানুষের গল্প করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ত ভুনি, টাকু, বিনি। তখন সে ও শ্যামা বড় মানুষ নিয়ে সাধারণ গল্প ছেড়ে ঢুকে পড়ত বিশেষ গল্পে। তারপর তারাও ঘুমিয়ে পড়ত।

এইভাবে একদিন একটা অদ্ভুত কথা বয়লে ফেলল শ্যামা।

'পয়সা নেই বলে আমরা না হয় কাউকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে পারি না। কিন্তু একজন বড় মানুষকেও কি ডাকতে পারি না কোনও দিন?'

প্রিয়নাথ কথাগুলি শুনল, কিন্তু আমল দিল না কোনও। শুধু বলল, 'কোন বড় মানুষটিকেই আর চিনি আমরা!'

'কেন! তোমার সেই হ-বাবু, তিনি তো বিখ্যাত হয়েছেন।'

'হ-বাবু!' মনে করার ধরনে প্রিয়নাথ বলল, 'হ্যাঁ, তাকে এখন বড় মানুষ বলা যেতে পারে।'

'এককালে তাঁর জন্যে তুমি অনেক খাটাখাটি করেছ, তাঁকে দাঁড়াতে সাহায্য করেছ।' শ্যামা বলল, 'বিয়ের পরও অনেকদিন তুমি তার গল্প করতে। একদিন এসেও ছিলেন, মনে আছে?'

প্রিয়নাথ বলল, 'তখনও তিনি বড় হননি। সেসব অনেক বছর আগেকার কথা। এখন হয়তো মনেও নেই আমাকে--যেখানে পৌঁচেছেন সেখানে তাঁর পাশে অনেক অনেক অন্য মানুষ। আমাকে দেখলে চিনতে পারবেন না। চেহারাটাও কত বদলে গেছে আমার!'

শ্যামা বলল, 'যে সিঁড়ি দিয়ে উঠল সেই সিঁড়িটাই ভুলে যাবে, এমন হয় না কি!'

'তা হয়তো হয় না।' প্রিয়নাথ বলল, 'তবে আমাকে সিঁড়ি ভাবা ভুল। হয়তো সিঁড়ির একটা ইট-- হয়তো তাও নয়।'

'এগুলো তোমার ধারণার কথা। সামনে গিয়ে পড়লে ঠিকই চিনতে পারবেন।'

ভুনি তার ফ্রকে হাঁটু ঢাকতে ঢাকতে বলল, 'কোন হ-বাবু মা, যার নাম কাগজে বের হয়?'

'হ্যাঁ। এককালে তোর বাবার খুব চেনাশোনা ছিল। বয়সে যদিও বড়, অনেকটা বন্ধুর মতো--'

লন্ঠনের মৃদু আলোয় খুব শ্রদ্ধা সহকারে প্রিয়নাথের দিকে তাকাল ভুনি। তারপর বলল, 'একদিন তাঁকে নিয়ে এসোনা, বাবা? আমরা দেখতাম, অন্যদেরও দেখাতাম।'

'বাড়িতে!' প্রিয়নাথ বলল, 'এই বাড়িতে কাউকে ডাকা যায়, মা?'

'বাড়িতে দোষ দিচ্ছ কেন? নিয়ে এসো। তারপর দেখো এই বাড়িই ধুয়ে নিকিয়ে কেমন ঝকঝকে করে দিই। আজকাল কেউই আমাদের বাড়িতে ঢোকে না। চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখে, যেন চিড়িয়াখানার জন্তু!'

প্রিয়নাথ জবাব দিল না। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল শুধু। ভাবল, খাঁচাটা ভাগ্যের দান; দোষ যারা দেখে তাদের নয়।

শ্যামা বলল, 'যে-কোনও বড় মানুষের পায়ের ধুলোই মঙ্গল আনে সংসারে।'

একজন বড় মানুষকে বাড়িতে নিয়ে আসার ভাবনাটা ঘুরপাক খায় মাথায়; বদ্ধ বন্ধ দুটি ঘরের আনাচে কানাচে। তাঁকে নিয়ে আলোচনা করে শ্যামা আর ভুনি। খবরের কাগজে বেরুনো হ-বাবুর একটা ছবি কেটে দেয়ালে সেঁটে রাখে টাকু। বড় মানুষ-- বড় মানুষ, অন্তর্নিহিত গুঞ্জনে ছড়িয়ে পড়ে চাপা উত্তেজনা, মনে হয় পুজো আসছে। কবে, কখন, এ-সবের হদিশ থাকে না যদিও।

ঠিকানা খুঁজে একদিন সকালে হ-বাবুর বাড়িতে পৌঁছে গেল প্রিয়নাথ। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে নিল নিজের কল্পনার সঙ্গে। ভাবল, বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কারও আসে। এই বাড়ি তারই নিদর্শন। এতদূর উচ্চতায় পৌঁছতে ইট-সুরকির সিঁড়ি কাজ দেয় না, স্বর্গের সিঁড়িই দরকার হয় বুঝি বা। তবু, নিজেকে সেই সিঁড়িরও একটা ইট ভাবতে ভালো লাগল প্রিয়নাথের। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, অনেক বছর আগে এক দুঃসময়ে তার কাছে পঞ্চাশ টাকা ধার নিয়েছিলেন হ-বাবু, টাকাটা ফেরত দেবার সময় পাননি। তখনকার পঞ্চাশ টাকার দাম আজ কয়েকগুণ হবে। সে যেভাবে ভাবে, হ-বাবু নিশ্চয়ই সেভাবে ভাবেন না। এখন তাঁর অনেক টাকা। ধারের কথাটা মনে পড়লে লজ্জা পাবেন নিশ্চিত।

বাড়িতে ঢুকে হলঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা লোকগুলির মুখের দিকে তাকিয়ে প্রিয়নাথ বুঝতে পারল এরা সকলেই দর্শনপ্রার্থী, অপেক্ষা করছে অনেকক্ষণ ধরে। হয়তো তাকেও অপেক্ষা করতে হবে।

একটি লোক এসে জিজ্ঞেস করল, 'কাকে চাই?'

বিনীতভাবে প্রিয়নাথ বলল, 'হ-বাবুর সঙ্গে দেখা করব একটু।'

'আপনার নাম?'

'প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি। অনেককালের চেনা, নাম বললে চিনতে পারবেন।'

লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, 'লোক আছে। বসতে হবে।'

প্রিয়নাথ ঘাড় নাড়ল। ভাবল, ব্যস্ত থাকাই স্বাভাবিক।

প্রায় আধঘণ্টা পরে লোকটি ফিরে এসে ডেকে নিয়ে গেল তাকে।

দোতলার হলঘরের কোণায় একটা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলেন হ-বাবু। সোফার একদিকে তাকে বসিয়ে দিয়ে লোকটি চলে যাবার পর মুখোমুখি হল প্রিয়নাথ।

হ-বাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার?'

'চিনতে পারছেন? আমি প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি। মেসে একসঙ্গে থাকতাম।'

'নাম শুনে বুঝিনি।' সূক্ষ্মভাবে হাসলেন হ-বাবু, 'চেহারায় চেনা লাগছে। একটু একটু মনেও পড়ছে--'

কৃতার্থ ভঙ্গিতে মাথা নিচু করল প্রিয়নাথ।

'কী করা হয় এখন?'

'আজ্ঞে, বিশেষ কিছু নয়। দু'তিনটে টিউশনি করি, পোস্টাপিসে মানি অর্ডার, চিঠি লিখে দেই। পাকা কিছু আর হল কোথায়? কষ্টেই আছি--'

কথা শেষ করার আগেই তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিদ্ধ হল প্রিয়নাথ।

'চাকরির খোঁজে এসেছ?'

কুঁজো-হওয়া ঘাড়ে ছোট্ট একটা ঘা লাগল প্রিয়নাথের। তার পরেই অবশ্য ভাবল, আজ তাঁর যে-অবস্থা, সম্মান, প্রতিপত্তি, তাতে এ-ধরনের ভুল করা অস্বাভাবিক নয়। এরকম অনেকেই হয়তো নিত্য আসে যায় হ-বাবুর কাছে এবং তাদের অনেকেই চাকরি-টাকরি চায়। দোষ হ-বাবুর নয়। তখন চোখ তুলে বলল, 'সেজন্যে আসিনি। আমার ছেলেমেয়েদের ভারী শখ একদিন আপনাকে দেখে। যদি একদিন পায়ের ধুলো দেন আমাদের বাড়িতে--'

'ছেলেমেয়েদের শখ! নাকি ইমেজ বাড়াতে চাও?'

'আজ্ঞে!' থতমত খেয়ে বলে উঠল প্রিয়নাথ, 'তা নয়। গরিবের ইমেজ কি আর বদলায় কিছুতে!'

'ঠিক। ঠিকই বলেছ।' হাসলেন হ-বাবু, 'তবে এসব শখ মেটানোর সময় কোথায় বলো!' পৃথিবীর মজাই হল যারা শখ মেটাতে চায় তাদের চেয়ে যারা শখ মেটাবে তাদের সংখ্যা অনেক কম। সময় কোথায়?'

প্রিয়নাথ চুপ করে থাকল।

'থাকো কোথায়?'

'সেই বাড়িতেই। আপনি গিয়েছিলেন একবার--অনেক বছর আগে--'

'বাড়ির পাশে একটা পুকুর ছিল না?'

'এখন নেই। এখন সেখানে তিনতলা বাড়ি উঠেছে।'

'ঠিকানাটা রেখে যাও। চিন্তিতভাবে বললেন হ-বাবু, 'কথা দিচ্ছি না। সময় কোথায়? তবে ছেলেমেয়ের নাম করে বললে। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কখনও ওদিকে গেলে একবার ঢুঁ মারার চেষ্টা করব।'

'কবে?'

'সে কি বলা যায়! যে-কোনও একদিন। তবে--কথা দিচ্ছি না--'

না-বোঝা কিছু আশা এবং কিছু হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরল প্রিয়নাথ।

শ্যামা জিজ্ঞাস করল, 'দেখা হল?'

প্রিয়নাথ ঘাড় নাড়ল।

'কী বললেন গো? আসবেন?'

'আসতেও পারেন। তবে ব্যস্ত মানুষ তো! কবে আসবেন কিছুই বললেন না।

'তোমার কী মনে হল?'

'আগে হলে বলতে পারতাম। এখন অনেক বদলে গেছেন-- বড় মানুষই শুধু নন, দূরের মানুষও। পুরোপুরি অচেনা লাগল। ইচ্ছে হলে আসবেন-- ঠিকানাটা নিলেন--'

'তাহলে নিশ্চয়ই আসবেন।'

শ্যামার ইছায় এবং ভুনি, টাকুর লাফালাফিতে কয়েকদিনের মধ্যেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেল পাড়ায়-- হ-বাবু আসবেন প্রিয়নাথের বাড়িতে। অনেকেই বিশ্বাস করল এবং তাঁর আবির্ভাবের দিনক্ষণ সম্পর্কে কৌতূহল দেখাতে শুরু করল। যারা বিশ্বাস করল না, প্রিয়নাথদের প্রতি ভালবাসা হেতু তারা বলাবলি করল, বাজে কথা। প্রিয়নাথদের বাড়িতে আসবার মতো সময় কোথায় তাঁর! ওটা কথার কথা।

শ্যামা, ভুনিদের বিশ্বাসে চির ধরল না তবু। যবেই আসুন, বড় মানুষের আবির্ভাবের সম্ভাবনায় বাড়তি উৎসাহ নিয়ে ঘরদোর পরিষ্কারের কাজে লেগে গেল শ্যামা। কিছুদিনের মধ্যেই লক্ষ করল প্রিয়নাথ, ঘরদোরের চেহারা ফিরে গেছে তার। পুরনো লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে যা-কিছু সঞ্চয় ছিল, তাই দিয়ে সস্তার কাপড় কিনে পর্দা বদলেছে জানালার; তাদের বিয়ের ছবির ঘুণধরা ফ্রেমটা পালটিয়ে লাগিয়েছে নতুন ফ্রেম। শ্রীযুক্ত এই ঘরদোর মেঝের দিকে তাকালে কেউই আর তাদের গরিব ভাববে না। মনে মনে খুসি হলেও একটা আশঙ্কাও পেয়ে বসল তাকে!

একদিন স্ত্রীকে ডেকে বলল, 'এসব যেমন ছিল তেমন থাকলেই হত। হ-বাবু এলেই কি জীবন বদলে যাবে?'

'তা হয়তো বদলাবে না। তবে মানুষের দয়া থেকে তো বাঁচা যাবে।'

'হ-বাবু এলেও দয়া করেই আসবেন।'

চুপ করে থেকে কিছু ভাবল শ্যামা। তারপর বলল, 'বড় মানুষের দয়ায় পুণ্য থাকে। যদি আসেন, বুঝব ভাগ্য। সকলের বাড়িতে তো আর পা পড়ে না তাঁর!'

'তা অবশ্য ঠিক।' প্রিয়নাথ বলল, 'না এলে সবাই হাসবে। এখনই হাসছে অনেকে--'

'ঈর্ষায়।'

হয়তো ভুল বলেনি শ্যামা, প্রিয়নাথ ভাবল, ঈর্ষা মানুষকে ছোট করে দেয়, আলাদা করে দেয়। এই চিন্তা কিছুটা বিপর্যস্ত করে দিল তাকে।

কয়েকদিন পর একদিন বিকেলে তুমুল বৃষ্টি নামল। শহর-ভাসা বৃষ্টি, জল পড়তে লাগল প্রিয়নাথদের ছাদ চুইয়ে। বৃষ্টি থেমে যাবার পরও বন্ধ হল না জল পড়া। ঘরদোর বাঁচানোর জন্যে বালতি আর বাটি নিয়ে জলের নিচে দাঁড়াল শ্যামা আর ভুনি।

শ্যামা বলল, 'আর দিন দুয়েক এই অবস্থা চললে আমরা ছাদ চাপা পড়ে মরব।'

'তা ঠিক।' প্রিয়নাথ বলল, 'মৃত্যুই দয়া। আজকাল মনে হয় শুধু মৃত্যুই পারে আমাদের বাঁচাতে।'

কথাগুলোয় অর্থ ছিল। প্রিয়নাথের দিশেহারা মুখের দিকে তাকিয়ে দুঃখিত শ্যামা বলল, 'কী যে বলো! সারাক্ষণ অমঙ্গলের চিন্তা।'

এই সময় হঠাৎ সজোরে ধাক্কা পড়ল দরজায়।

তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ছিটকিনি খুলল প্রিয়নাথ এবং শূন্য চোখে তাকিয়ে প্রত্যক্ষ করল, দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই বড় মানুষ--হ-বাবু। বিস্ময়ের ঘোরটা কেটে যেতে সে চেঁচিয়ে উঠল, 'শ্যামা, ভুনি, দেখে যাও--'

'যা বৃষ্টি! তেমনি কাদা!' প্রিয়নাথ সরে দাঁড়াতেই চৌকাঠ পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেন হ-বাবু, 'এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তা, তোমার ছেলেমেয়েরা কোথায়?'

'আছে--'

পুরনো সুজনি পাতা চৌকির দিকে তাঁকে নিয়ে যেতে যেতে প্রিয়নাথ লক্ষ করল, হ-বাবুর কর্দমাক্ত জুতোর দাগ শ্যামার হাতে নিকানো মেঝেয় ছাপ ফেলে যাচ্ছে পরিষ্কার। এত কাদা কোত্থেকে এল ভাবতে না ভাবতেই শ্যামা ও ছেলেমেয়েরা ভিড় করে দাঁড়াল।

'ইস, ভুল হয়ে গেল তো! জুতোটা বাইরে খুলে রেখে এলেই পারতাম।'

'না, ও কিছু নয়--', তাঁর পায়ের ছাপের দিকে তাকিয়ে বলল প্রিয়নাথ, 'সামান্য কাদা। মুছলেই উঠে যাবে। আপনি আরাম করে বসুন--'

'বসবার সময় কোথায়! গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এখুনি চলে যাব হে। নেহাত ছেলেমেয়েদের নাম করে বলেছিলে--'

'তবু, একটু বসুন!'

প্রিয়নাথের ইশারায় ভুনি, টাকু এসে প্রণাম করল হ-বাবুকে।

'মঙ্গল হোক।' আলগোছে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে হ-বাবু তাকালেন ছাদের দিকে, ঘরের আশেপাশে। বললেন, 'এটা তো শুনেছিলাম বড়লোকের পাড়া। এরকম বাড়িও আছে নাকি!'

প্রিয়নাথ বলল, 'পুরনো ভাড়াটে বলেই টিকে গেছি কোনওরকমে--'

বলতে বলতে চোখ পড়ল শ্যামার দিকে। হাত নেড়ে ডাকল শ্যামা। কাছে পৌঁছুতে বলল, 'কী বিশ্রী কাদা হয়ে গেল মেঝেটা। মুছে দেব?'

'না, না। উনি বিব্রত হবেন। পরে করলেই চলবে। তুমি বরং একটু চা-টা করো।'

কয়েক মুহূর্ত হা করে প্রিয়নাথের মুখের দিকে তাকিয়ে শ্যামা বলল, 'তোমাকে বলেছিলাম না! দরজার বাইরেটা দ্যাখো। কত লোক!'

শ্যামার মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাল প্রিয়নাথ এবং লক্ষ করল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন পাড়ারই কয়েকজন; অদ্ভুত দৃষ্টি তাঁদের চোখে-- কখনও হ-বাবুকে দেখছেন, কখনও মেঝের ওপর তাঁর জুতোর দাগের দিকে। স্বাভাবিক নয় বলেই দৃশ্যটা বিমূঢ় করে দিল প্রিয়নাথকে। এঁদের কেউ কেউ তাঁদের বাড়িতে উপলক্ষ হলে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছেন দরজার বাইরে থেকে--ভিতরে ঢোকেননি; সে ঠিক বুঝতে পারল না, আজ ওঁদের ভিতরে ডাকবে কিনা। তারপর ভাবল, এই বড় মানুষটির আবির্ভাবের জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না তারা, সেইজন্যে আয়োজনও রাখেনি কোনও। এখন ডাকলে বসতে দেবে কোথায়! তখন হ-বাবুর দিকে তাকিয়ে ভাবল, দারিদ্র্যের সংসারে এই মানুষটির আবির্ভাবের আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল কি না! নিজের কাছে কোনও উত্তর না পেয়ে সে ছুটে গেল হ-বাবুর দিকে।

হ-বাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

‘এরা কারা, প্রিয়নাথ?'

‘পাড়া-প্রতিবেশী। আমাদের প্রিয়জন, আপনাকে দেখতে এসেছেন।'

‘এই ভয়ই পাচ্ছিলাম। ভিড়, যেখানেই যাই সেখানেই ভিড়! লক্ষ করলেই বুঝতে পারবে, পৃথিবীর জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশের কোনও পজিটিভ কন্ট্রিবিউশন নেই। এরা শুধুই ভিড়!'

‘দরজাটা বন্ধ করে দেব?'

‘না, তাহলে লোকের কৌতুহল বাড়বে। তোমার এখানে আসা হল--এবার চলি--'। কথাগুলো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন হ-বাবু। তখনও কোনও আপ্যায়ন করে উঠতে পারেনি শ্যামা। তাঁর চলে যাওয়ার শব্দে ছুটে এসে বলল, 'এ কেমন আসা! এর চেয়ে--

‘হ্যাঁ, না এলেই ভালো হত।' কিছু বা বিরক্তি ও হতাশায় অদ্ভুত শোনাল প্রিয়নাথের গলা, 'ওঁকে ধরে রাখা কি আমাদের সাধ্যে কুলোয়! যাকগে, মেঝেটা কাদা হয়ে গেছে একেবারে। মুছে নাও।'

দরজার বাইরে তখনও কৌতূহলী কয়েকজন দাঁড়িয়ে। ওরা দেখল, একই সঙ্গে চোখের জল ও মেঝের কাদা মুছবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে শ্যামা। কারুর মুখেই কথা ফুটল না কোনও।

তখনই ধরা পড়ল ব্যাপারটা। বিব্রত, অন্যমনস্ক প্রিয়নাথকে সম্বোধন করে শ্যামা বলল, 'শুনছ, এ কেমন কাদা! এত ঘষছি, কিছুতেই তো উঠছে না!।'

প্রিয়নাথ বলল, 'কাদা কাদাই। ঠিক করে ঘষো-- উঠে যাবে।'

‘ঘষছি তো! আর কত ঘষব!' বিরক্ত গলায় বলল শ্যামা, 'কী যে ছাই বড় মানুষ! লাভের মধ্যে শুধু ঘরদোর নোংরা।'

প্রিয়নাথ চুপ করে থাকল।

কিন্তু হাজার ঘষা ও ধোয়ামোছা সত্ত্বেও উঠল না দাগগুলি। ন্যাতা ঘষে না, ঝাঁটা ঘষে না, ঝামা ঘষেও না। প্রিয়নাথের গোটা সংসার তখন সেই দাগগুলির ওপর ঝুঁকে এল এবং লক্ষ করল, দাগগুলি দেখবার জন্যে আরও অনেকে এসে জড়ো হয়েছে তাদের পিছনে। তাদের চোখে কৌতুহল এবং বিস্ময় ছাড়াও আরও কিছু ছিল। ব্যাপারটা রটনা হতে দেরি হল না। ক্রমশ আরও অনেকে এসে জড়ো হতা লাগল প্রিয়নাথের দরজায়। প্রতিবেশীদের অনেকেই অনেকরকম পরামর্শ দিল এবং দাগগুলি মুছে দেবার চেষ্টা করতে লাগল। কিছুতেই কিছু না হওয়ায় সকলেই ধরে নিল ব্যাপারটা মোটেই মঙ্গলসূচক নয়।
সে যাই হোক, অদ্ভুত এবং অলৌকিক এই ঘটনার পর একটু অন্যরকম হয়ে গেল প্রিয়নাথদের জীবন। তারপর ক্রমশ অন্যরকম হতে লাগল। পাড়ার কারও বাড়িতে কোনও উৎসব, অনুষ্ঠান হলে কিংবা কোনও বড় মানুষের আবির্ভাব ঘটলে আর কেউই ডাকত না তাদের। প্রিয়নাথ বা শ্যামা এই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করলেও স্বভাববশত ভুনি, টাকু ও বিনি কোন বাড়িতে কী কী সুস্বাদু খাদ্য পরিবেশিত হতে পারে এবং কী কী ঘটনা আলোচিত হতে পারে এই নিয়ে চাপা আলোচনা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ত। বাড়ির দরজায় ঘা পরলেই তারা ধরে নিত, বড় মানুষের পায়ের দাগ দেখবার জন্যে কেউ না কেউ এসেছে। নিঃশব্দে দরজা খুলে দিয়ে সরে দাঁড়াত তারা। দর্শনার্থীরা চলে গেলে আবার ছিটকিনি তুলে দিত দরজায়। নিঃশব্দে।
একদিন দরজা খুলল না। তখন পুলিশ এল। এবং দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখল, বড় মানুষের পায়ের দাগগুলোকে সামনে রেখে পর পর শুয়ে আছে প্রিয়নাথের পরিবারের শীর্ণ, কঙ্কালসার পাঁচটি মানুষ। কেউই জানতে চাইল না কেন এমন হল।

তবে, অনেকেই বলল, কোনও বড় মানুষের আবির্ভাবের পর অনেক সময়েই এমন হয়।



রচনাকালঃ ১৩৮৯


আবির্ভাব গল্প নিয়ে আলোচনা পড়ুন--
এক যন্ত্রণাময় দুঃখ-সুরের গল্প, তীব্রভাবে বিঁধে থাকবারও গল্প : আবির্ভাব


1 টি মন্তব্য: