সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

শোক গাঁথা

রুখসানা কাজল

অকাল মৃত্যু কেমন আমি জানি, চিনি। এই মৃত্যুগুলো শীতের কুয়াসার মত ছায়া ফেলে শুয়ে থাকে। বুকের ভেতর। মনের ঘরে। চোখের নোনা জলে। বইমেলার আগেই তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল বন্ধুর সাথে বন্ধুদের। জাহাঙ্গীর ভালমানুষের মত মুখ নিয়ে পুরো ঝগড়াটা শুনলো, দেখলো । তারপর নিঃশব্দে উঠে চলে গেল। লিটল ম্যাগ চত্বরে এক ঝলক আবার দেখা। গল্প কবিতার মানুষরা এমন কেন হয় রে ?
আমার ক্যাবলু প্রশ্নকে চুরমার করে দিয়ে জানালো, মানুষ বলেই। কথা আর বাড়েনি। আমি তখন ছুটছি। বাংলা একাডেমি থেকে সোহরাওয়ার্দ্দির মেলার মাঠে। দিনে তিনবার চারবার। কবিতার বই বেরিয়েছে। প্রথম বই। একদিকে খুশী আর আনন্দে হামলে পড়ছি আমার বই প্রকাশনীর স্টলে অন্যদিকে বন্ধুদের টানে বার বার ছুটে আসছি বাংলা একাডেমীর লিটল ম্যাগ চত্বরে। আসা যাওয়ার পথের ধারে আবার দেখা। “গল্পে আসো । আমাদের গদ্য চাই।” ভিড় ভেঙে ছুটন্ত আমি বলেছিলাম, আসব।

বইমেলার সমস্ত কোলাহলকে বিদ্ধ করে নেমে এলো নিঃস্তব্দতা। অভিজিতের মৃত্যুতে শংকা আশঙ্কা, দুঃখ, ক্ষোভের ক্ষরণ বইছে মনে । উৎকট লালসায় রাজনীতির রাক্ষসরা খোক্কসরা গিলে নিচ্ছে মুক্ত চিন্তার সুতুঙ্গ উড়ালগুলোকে । এমন মন খারাপের কালবেলায় খবর এলো কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর আর নেই। খবরটা আচমকা চমকে দিল আমাদের। সেই থেকে কষ্ট কুড়াচ্ছি। আঁচল ভরে। উপচে পড়ছে ব্যাথার মণি মাণিক্য। চোখ থেকে মন জুড়ে হু হু জলোচ্ছ্বাস। বেঁচে থাকার আশ্বাস বিশ্বাস, বন্ধুত্ব , ভালবাসার পাড়গুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। মৃত্যুর অর্থ তো বিচ্ছেদ । চিরতরে ছেড়ে যাওয়া , চলে যাওয়া । আমার মগজে ফাঁকা অংশ বেশি। প্রাত্যহিক জীবন যাপনে বুদ্ধির যে জটিল কারুকাজ মানুষকে জিতিয়ে দেয়, তার কণা মাত্র নেই। মৃত্যুকে তাই মৃত্যু হিসেবেই চিনি। আজ বার বার মনে পড়ছে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে। প্রথম দিনের মত অবাক বিস্ময় নিয়ে আর জানতে চাইবে না, খুব চেনা চেনা মুখ। অমুক কবির মত। কি হয় তোমার ? গল্পকার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে আর বলা হল না, আমার অস্তিত্বের চাদোয়াল ঘুড়িতে মাঝে মাঝেই আজন্মের ছায়া হয়ে ছুঁয়ে যায় সেই কবি। কথা ছিল বইমেলা শেষে বসব আমরা বাংলা একাডেমীতে। তা আর হলো না। হবেও না কোনদিন। অসময়ের এই মৃত্যুতে কষ্টে আছি। মানুষের আখড়ায় কষ্টে ভেজা এক সাদা পাখির মত কষ্ট পাচ্ছি।

মৃত্যু আমার ভাল লাগে না। সিলভিয়া প্লাথ, বোঁদলেয়র জীবনানন্দকে পারতপক্ষে এড়িয়ে যাই। যতবার পড়ি নদী হয়ে ভেসে চলি। ভাঁটফুল, হিজল ছুঁয়ে কার্তিকের নবান্নে, হিম হিম ধোঁয়াশা জ্যোৎস্নায় মেঠো ইঁদুরের মায়াবি চোখে কতবার দেখি এই পৃথিবীকে । কত যে ভালবাসি ! দু পায়ে জড়িয়ে থাকা শিশিরের সাথে শুকনো ঘাস, তাতে অস্ফুট আবছা বেগুনী গোলাপী ফুলের মুখটেপা হাসি , নিশ্চল দুপুরে কাঁসারঙা আকাশে সোনালী চিলের মন্দ্রিত উড়ে চলা, পোয়াতি ধানের দুধসবুজ গন্ধ, শর্তহীন নিস্তব্ধতা দিয়েছে আমাকে। একা করেছে। বিচ্ছিন্ন করেছে। কোলাহলের সূচীপত্রে অবিরাম অনুপস্থিত রেখেছে আমার এই হৃদয়কে। নৈঃশব্দের ঘনসবুজ বনে একলা এক গাঙ শালিক আমি। বোধের বিপন্নতায় জেগে উঠা হাজার প্রশ্ন করা হল না আসা যাওয়ার পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক গল্পকারকে । স্বল্প পরিচয়ের কানা ভেঙ্গে যে বলেছিল, রোলা বার্থ পড়ে দেখো। গদ্য লেখার সাহস পাবে।

মৃত্যু তো হলুদ ঘাস। কিংবা জলবাসি ছেঁড়া পদ্ম। মৃত্যু তো অঞ্জলির অর্ঘ্য নয়। শুন্যতার চরাচরব্যেপে জলে ভাসা ছিন্ন খঞ্জনার সুতীব্র অবিনাশী হাহাকার। এক অন্ধ, বদ্ধ, বোবা, কালা অনমিত শক্তির কাছে জীবনের অনিচ্ছুক আত্বসমর্পন। জীবনের গভীর স্বপ্নগুলোকে শুন্য ঘাটে রেখে চাঁদ পহরে একা শুধু একা চলে যাওয়া। সিনিয়রত্বের গরিমা ঝেড়ে ফেলে নতুনদের লেখা নিয়ে অপরিসীম আগ্রহ আর কৌতূহল দেখাবে না এই লেখক। কোন একটা শব্দ কিম্বা বানান নিয়ে খুব মৃদু ভাবে জানতে চাইবে না আর। অনেকগুলো বইয়ের পাশে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের বইগুলো পড়ে আছে। খুব হালকা সতেজ আর প্রচ্ছদে সপ্রান। ত্রস্ত জীবনবোধ, সম্পর্কের ঘাত প্রতিঘাত, অনুচ্চারিত প্রেম বা করতলে নাচানো দেহসুখ, দ্রোহের পাশে স্বপ্নের চাষাবাদ , আধেক পাওয়ার তিক্ত যন্ত্রনা, বর্ণনার জটিলতায় অগণন কারুকাজ, একটি দুর্বোধ্য আবদ্ধতার ভাবলেখনীতে লেখকের অরুদ্ধ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে আছে লেখার পাতায় পাতায়। এই বঙ্গভূমির পৃথক অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে মুক্তিযুদ্ধকে এক অসাধারণ সূচক হিসেবে দেখিয়েছেন লেখক। লেখকের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে এক মহা পরিবর্তনের রুপক হয়ে। তার লেখায় বার বার উঠে এসেছে আমজনতার সুখ দুঃখ, সাতচল্লিশের দেশ ভাগ, সামরিক শাসকের প্রতি সমালোচিত কটাক্ষ, সোঁদা মাটির ভেজা গন্ধ। ব্যক্তিগত জীবনে কামরুজ্জামান জাহাংগীর ছিলেন একজন চিকিৎসক। তার লেখায় যেমন জীবন কথা বলত তেমনি ব্যক্তি জীবন যাপনেও মানব সেবা ছিল ধ্যান ও পেশা।

আমি পড়ছি স্বপ্নবাজি , পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদি , যখন তারা যুদ্ধে, প্রবন্ধ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ । পড়েই চলেছি। ভাবনার ঘরে আবার প্রশ্নেরা শতমুখে গুঞ্জন তোলে, লেখকের মৃত্যুর মুল্যেই কী জন্ম হয় পাঠকের ?




লেখক পরিচিতি
রুখসানা কাজল

কবি। গল্পকার। প্রবন্ধকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন