বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

নীহারুল ইসলামের গল্প : কেমন আছেন টগরলাল?

- কেমন আছো টগরলাল?

একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল, এমন জিজ্ঞাসায় সেটা ভেঙে গেল। এদিক ওদিক চাইলেন তিনি। না, কেউ কোথাও নেই। নিজের তিনতলা ছাদে তিনি শুধু একা, একটা মান্ধাতার আমলের ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে আছেন।

অথচ সন্ধ্যারাতে, যখন তিনি ছাদে উঠে এসেছিলেন, তখন আশপাশের ছাদে মানুষ ছিল। তাদের কথাবার্তার অসংখ শ্নদ ছিল। লোডশেডিং চলছিল বলে পার্শ্ববর্তী সিনেমাহলের জেনারেটরের ফটফট আওয়াজ ছিল। যদিও সেসব বন্ধ এখন। নিস্তব্ধ চারিদিক।
তার ওপর গুমোট আবহাওয়া। বাতাস নেই একটুও। গাছ-গাছালির পাতা নড়ছে না। লোডশেডিং চলছেই। এরকম অবস্থায় কে তাঁর হাল-হকিকত জানতে চাইছে। ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে তাকালেন টগরলাল। আর দেখলেন, সন্ধ্যারাত্রে দেখা পূব আকাশে খন্ড-মেঘের মাথায় চড়ে থাকা আস্ত চাঁদটিকে। যেটি এখন পশ্চিম আকাশে বিরাজমান। খন্ড-মেঘটির কোনও পাত্তা নেই আকাশের কোথাও। তাহলে কি ওই চাঁদ তাঁকে এমন প্রশ্ন করল?

টগরলাল ভাবছিলেন, তখনই আবার প্রশ্ন, টগরলাল কেমন আছো?

হ্যাঁ, ওইতো চাঁদই তাঁকে প্রশ্ন করছে। কিন্তু সব ছেড়ে চাঁদ তাঁকে প্রশ্ন করছে কেন? চাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী?

- কী হে টগরলাল, পাত্তা দিচ্ছো না যে বড়!

চাঁদ কথা বলছে! কথা বলছে তাঁর সঙ্গে! তাঁর হাল-হকিকত পুছ করছে! অথচ চাঁদের ভাষাটা যেন চাঁদের নয়, অন্য কারও। খুব চেনা মনে হয় টগরলালের।

কতদিন আগে স্ত্রী মারা গেছে। স্ত্রীর কথা টগরলালের মনে ছিল না। চাঁদের এমন কথায় হঠাৎই মনে পড়ল। স্ত্রীও তাঁকে মাঝে মাঝে এমন ভাষায় কথা বলতো, তুমি কিন্তু আজকাল আমাকে পাত্তা দিচ্ছো না! নতুন কাউকে মনে ধরেছে নাকি?

জাস্ট রসিকতা। তবু টগরলাল রেগে যেতেন। ঝগড়া বাঁধিয়ে বসতেন স্ত্রীর সঙ্গে। তারপর দু-চারদিন কথা বন্ধ।

যদিও টগরলাল রাগলেন না এখন। তাছাড়া চাঁদের ওপর রেগে লাভ কি? বরং চাঁদ যখন তাঁর সঙ্গে কথা বলছে, তিনিও কথা বলবেন চাঁদের সঙ্গে। কিন্তু চাঁদ কি বুঝবে তাঁর কথা? তাঁর দুঃখ?

দেখা যাক বলে টগরলাল এতক্ষণে মুখ খুললেন, না-না। ঘুমোবো কি-এই বয়সে ঘুম কি সহজে আসে? তাছাড়া যা গরম! দেখছো না, কেমন গুমোট আবহাওয়া! গাছপালার পাতা নড়ছে না। আবার লোডশেডিং চলছে।

- তবু তো সবাই ঘুমোচ্ছে। খালি তুমি একা ছাদে বসে আছো। জানো টগরলাল, আমার মনটাও আজকাল ভীষণ খারাপ থাকছে। এমন রূপ নিয়ে আকাশে ভাসছি আমি, তবু আমার এই রূপ দেখবার কেউ নেই। খুঁজে খুঁজে তোমাকে পেলাম। তো দেখছি তুমিও মাথা গুঁজে ঘুমোনোর চেষ্টা করছো। তাই ডেকে তুললাম তোমায়। যাতে তোমার সঙ্গে মনের দু’টো কথা বলতে পারি!

- কেন, কেন ডেকে তুললে আমাকে? আমি কী কথা বলবো তোমার সঙ্গে? তাছাড়া তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার কী লাভ?

- এখনও লাভটাই দেখছো টগরলাল? কেন- আলাপপরিচয়টা কি কিছুই নয়?

টগরলাল অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। যদিও ক্ষণিকের জন্য। তখন হঠাৎই তাঁর মনে পড়ে গেল একমাত্র পুত্রের কথা। তখন তিনি বললেন, আলাপপরিচয়ে কী হবে? রক্তের সম্পর্কই কিছু নয় এই যুগে। তুমি আকাশের চাঁদ হয়ে আমার খোঁজ-খবর নিচ্ছো! অথচ আমার রক্ত-আমার একমাত্র পুত্র, কই-সে তো আমার খোঁজ-খবর নেয় না!

- কেন-কোথায় থাকে তোমার পুত্র?

- প্রবাসে।

- প্রবাসে কোথায়?

- আমেরিকায়। আচ্ছা শশধর, আকাশ থেকে তুমি আমেরিকা দেখতে পাও?

- পাই। তবে এখন দেখতে পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ পরে পাবো, যখন পশ্চিম দিগন্ত বরাবর আমার অবস্থান হবে। কিন্তু আকাশে থেকে আমেরিকা দেখাটাও যে এখন অপরাধ হে! ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ওরা এমন আইন করেছে।

- তা বলে তোমার ক্ষেত্রেও ওই আইন? তুমি যে নিশিপতি! আকাশেই যে তোমার অবস্থান!

- আমাকে কি, আমার জ্যোৎস্নাকেও ভয় পাচ্ছে ওরা। আকাশ নিয়ে এখন ওদের বড্ড সতর্কতা! যাক্‌গে ওসব কথা। এখন বলতো, তোমার রক্ত-তোমার একমাত্র পুত্র কি তোমার কাছে আসে না?

- না।

- পুত্রের বিয়ে হয়েছে নিশ্চয়!

- সে আর বলতে!

- বউমা কোথাকার মেয়ে?

- ওই আমেরিকার।

- তো, তোমার রক্ত আমেরিকার রক্তে মিশতে গেল কেন?

- কেন, বুঝতে পারছো না? থাক্‌, তোমার আর বুঝে কাজ নেই। বরং বলো তোমার নিজের কথা, শুনি।

- আমার কথা কী বলবো টগরলাল, আমি এখ বড্ড একা। আগে আমাকে নিয়ে কবিরা ভাবতো। আমাকে নিয়ে কবিতা লিখতো। প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের প্রেমের সাক্ষী করতো আমাকে। মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের তুলনা করতো আমার সঙ্গে। তুমিও করতে নিশ্চয়। কিন্তু তোমাদের ওই নীল আর্মস্ট্রং নামের মানুষটা যেদিন আমার বুকে পা রাখলো, তারপর থেকে মা-বাবা তো মা-বাবা, প্রেমিক-প্রেমিকা, কবিরা পর্যন্ত আমার নাম মুখে উচ্চারণ করে না আর। এখন আমি নাকি রুক্ষ একটা গোলাকার পিন্ড ছাড়া আর কিছুই নই। আচ্ছা টগরলাল, সত্যি করে বলতো- তোমারও কি তাই মনে হয়?

- মনে না হওয়ার কী আছে! যে সন্তানকে চাঁদ মনে করে আমি কতদিন তোমার দিকে তাকাইনি, সেই সন্তান যখন এমন হৃদয়হীন প্রতিপন্ন হলো, তখন তোমাকে বিশ্বাস করি কী করে?

- তা ঠিক বলেছো টগরলাল। তবে একটা কথা কী জানো, এখন তোমার আর আমার অবস্থা একই।

চাঁদ তখন পশ্চিম দিগন্ত বরাবর নেমে গেছে। ক্ষণিকের মধ্যে সে অস্ত যাবে। এটা খেয়াল করে টগরলাল বলে উঠল, আমেরিকা দেখতে পাচ্ছো নাকি শশধর?

- কেন, আমি কি তোমাদের স্যাটেলাইট নাকি হে? যে, আমার মারফৎ তুমি তোমার ছেলের খবর নেবে?

চাঁদ যেন রসিকতা করছে টগরলালের সঙ্গে। টগরলাল লজ্জা পেলেন। চাঁদ তাই দেখে আবার বলল, লজ্জা পাওয়ার কী আছে টগরলাল! ছেলে তোমার খোঁজ-খবর রাখে না বলে তুমি ছেলের খোঁজ-খবর রাখবে না, তা তো হয় না। তুমি যে জন্মদাতা! দেখো না, আমার খোঁজ-খবর রাখে না কেউ, তাই বলে আমি কি কারও খোঁজ-খবর রাখি না? এই তো তোমার তন্দ্রা ভাঙিয়ে তোমার খবর নিচ্ছি, কীসের টানে?

টগরলাল বললেন, কী জানি ছাই! কীসের টানে? যাক্‌গে, তুমি দেখোতো এখন, আমার ছেলেটাকে দেখতে পাও নাকি?

চাঁদ কী দেখল কে জানে, কিছুক্ষণ পর বলল, আমেরিকা দেখতে পাচ্ছি ঠিকই কিন্তু তোমার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি কই?

- দেখতে পাচ্ছো না শশধর? সত্যি দেখতে পাচ্ছো না?

টগরলালের কণ্ঠে আকুতি যেন! চাঁদ তা বুঝতে পারলো। তাই বলল, সত্যি দেখতে পাচ্ছি না। তবে অন্য একজনকে দেখতে পাচ্ছি টগরলাল। যে আজও বসে বসে শুধু তোমার কথা ভাবছে।

- কে? কে ভাবছে আমার কথা? টগরলাল আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন।

- কেন, তোমার স্ত্রী।

- সে তো কবেই মরে গেছে।

- কে বললে মরে গেছে? আসলে তোমার মনটাই মরে গেছে টগরাল। নাহলে নিশ্চয় তুমি তাঁকে অন্তরে অনুভব করতে।

- অন্তরে অনুভব করতাম মানে?

- এতদিন বোঝোনি যখন, আজও সেটা বুঝবে না। যাক্‌গে এখন বলতো, তুমি কি তাঁর কাছে যেতে চাও? যেতে চাইলে আমি তোমায় নিয়ে যেতে পারি।

চাঁদ তখন পশ্চিম দিগন্ত স্পর্শ করছে। একটু একটু করে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যাবে এবার। কিন্তু তার আগেই টগরলাল জানতে চান, কোথায় আছে তাঁর স্ত্রী? কেমন আছে? কীভাবে তাঁর কাছে যাওয়া যায়?

- হ্যাঁ হ্যাঁ শশধর, আমি আমার স্ত্রীর কাছে যেতে চাই। তুমি আমায় বলো, কোথায় সে? কীভাবে আমি তাঁর কাছে যাবো? দেরি করো না। তাড়াতাড়ি বলো।

বলতে বলতে উত্তেজনায় থরথর টগরলাল ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

চাঁদ তখন অর্ধেকটাই দিগন্তের ওপারে। তবু সে ডাকছে, ছুটে এসো টগরলাল! ছুটে এসো! দেরি করো না! ছুটে এসো!

অমনি টগরলাল ছুটতে শুরু করলেন তাঁর তিনতলা ছাদের ওপর। আর ছাদটাও তখন যেন ওই পশ্চিম দিগন্ত বরাবর চাঁদের কাছ পর্যন্ত লম্বা হয়ে গেল।



পরেরদিন কোনও কোনও সংবাদপত্রে, পৃষ্ঠা ভরানোর কারণেই বোধহয়, অদ্ভূত একটি খবর স্থান পায়- টগরলাল নামের একজন বয়স্ক মানুষ নিজের বাড়ির তিনতলা ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরে আত্মঘাতী হয়েছেন। ওই বাড়িতে ভদ্রলোক একা থাকতেন। কিছুদিন যাবৎ তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। বাড়ির কাজের মেয়ে, প্রতিবেশীদের মতামত এরকম। ভদ্রলোকের একমাত্র পুত্র বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। প্রশাসনের তরফ থেকে সেই পুত্রকে সংবাদ পাঠানো হয়েছে।







৩টি মন্তব্য: