বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

দীপেন ভট্টাচার্য'র গল্প : নীলকান্তমণি

১. সুনন্দ

মানুষগুলো সব চলে যায়, কোথায় যায়? ভাবে সুনন্দ।

বর্ষার নতুন জল নদীটার বাঁকে ঘূর্ণী তুলছে। ওপাশে পাট ক্ষেত, এপারে কয়েকটা গজারির গাছ। নদীর পারে একটা সাইনবোর্ড, তাতে রঙচটা সাদা লেখা 'মগরা শ্মশানঘাট'। বোর্ডের নিচে একটা সিমেন্ট-করা জায়গা, তাতে ফাটল ধরেছে, সিমেন্টের ধূসর রঙ কালো হয়ে গেছে বহুদিনের আগুনে। সিমেন্টের একপাশে দুটো শিক, চিতার কাঠ যাতে আটকানো যায়।


শ্মশানের নামফলকটার পাশে নদীর ধারে বসে সুনন্দ, সকাল দশটা প্রায়, পাশ দিয়ে ছোট ছেলেমেয়েরা বই হাতে করে যায়, প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী তারা। কলবল করে কথা বলতে বলতে যায় তারা। তাদের কথায় সুনন্দ নিজের মনেই হাসে।

নদীটার নাম কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না। কেউ বলে লৌহজং, কেউ বলে বাঁশি, কেউ বলে বংশাই। শেষ পর্যন্ত সবাই শুধু নদী বলে এই স্রোতধারাকে সম্বোধন করে। যেন পৃথিবীতে এই নদী ছাড়া আর কোনো নদী নেই।

তারপর বৃষ্টি নামে। বর্ষা এখন দেরি করে আসে, পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে, আষাঢ় আর আষাঢ় নেই বরং বৈশাখেরই আর একটি রূপ। এখন শ্রাবণ। বৃষ্টিতেই বসে থাকে সুনন্দ। গরম বৃষ্টি। ওপাশের পাটক্ষেতটা জলের পর্দায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

এক বছর আগে এই দিনে বাবাকে এইখানে পুড়িয়েছে সে। চিতায় আগুন দিয়েছে। তার দুবছর আগে মাকে। নিজের পিতা মাতাকে স্বহস্তে আগুন দিয়ে পুড়ানো একটা কষ্টকর কাজ। রাতের অঙ্গার আর ছাইকে নদীতেই ফেলা হয়েছে। তাদের দেহকণা ছোট নদী থেকে বড় নদী হয়ে সাগরে, সাগর থেকে মহাসমুদ্র হয়ে এই গোলাকার পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়বে। এটাও এক ধরণের স্বান্তনা, নিজেকে বোঝানোর জন্য।

বাবার অস্থি এনে ভিটের পাশে একটা তুলসীর নিচে পুঁতেছে, মায়ের অস্থির পাশে। মানুষগুলো কত সহজে চলে গেল, ভাবে সে। বেঁচে যখন ছিল তাঁদেরকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, এই হাসপাতাল, এই ডাক্তার, রাতের পর রাত জেগেছে। মা'ই প্রথম গেলেন, মা যাবার পর সে জানতো এবার বাবারও দিন ফুরিয়েছে, সংসারটা তো মা'ই ধরে রেখেছিলেন। বাবা অসুস্থ ছিলেন, স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল, থেকেও যেন ছিলেন না। খুব চাপ পরেছিল সুনন্দর ওপর। তবু বাবাকে যথাসম্ভব পরিচর্যা করেছে সে। ঢাকার ছোট ফ্ল্যাটে যতদুর পেরেছে একাই দেখাশোনা করেছে।

বাবা রোদ্দুর চাইতেন, কিন্তু শান্তিবাগের ঘুপচিতে রোদ আটকে যেত অনেক ওপরে। তবু এক চিলতে সূর্য সামনের দুটি বাড়ির মাঝ দিয়ে এসে পড়ত, মাসে মাসে সেই আলো ওঠা-নামা করত, কিন্ত বাবা সব ভুলে গেলেও কেমন করে যেন সূর্যের চলনটা ঠিকই রপ্ত করে রেখেছিলেন।

কলকাতা থেকে সুনন্দের পিসীমা লিখেছেন, "বাবা সুনন্দ, আর যাই কর, চিনুর প্রথম বৎসরের বাৎসরিক কাজটি করবে, এর পর নাহয় নাই কর। ঐ ভিটে-মাটি তো এর পরে থাকবে না, শেষবারটির মত চিনুর নামটি তাঁর জন্মস্থানে স্মরণ কোরো।" চিনু মানে বাবা সুপ্রিয় সেন। চিঠি আজকাল আর কে লেখে? পিসীমা সুলতার সুন্দর হস্তাক্ষরকে সুনন্দ অগ্রাহ্য করতে পারে নি।

ঢাকা থেকে গতকাল রাতে সে এসেছে। আজ বাবার বাৎসরিক কাজ, পণ্ডিতমশাইকে বলা হয়েছে, উনি দুপুরের পরে আসবেন। সুনন্দকে একাই কাজ সারতে হবে। বোন আর জামাই থাকে খুলনা, তারা আসতে পারবে না।

শুধুমাত্র একটা ভিটেকে রক্ষা করতে পেরেছে সুনন্দ, আর বাদবাকি জমি-জিরেত সব গেছে। বাবা সুপ্রিয় সেন ওকালতি ব্যবসা করেও গ্রামে নিজের ভিটে-মাটিকে অবহেলা করেছেন, চাষযোগ্য জমি ধীরে ধীরে খুইয়েছেন, তার মধ্যে সামান্য অংশ দান করেছিলেন, বাদবাকিটা জাল দলিলে হারিয়েছেন। কিন্তু এসব নিয়ে সুনন্দ ভাবে না। সে বুদ্ধিমান ছেলে, ডাক্তার হয়েছে, খাটা-খাটনি করতে হয়, কিন্তু মানিয়ে চলতে পারে। একা মানুষ, টাকা-পয়সা নিয়ে বেশী কিছু ভাবতে হয় না।

পণ্ডিতমশাইয়ের নাম তীর্থংকর চক্রবর্তী। পারিবারিকভাবে বহুদিনের সম্পর্ক। বাবার মক্কেলও ছিলেন। পাশের গ্রাম ভারাণীপাড়ায় থাকেন। মোবাইলে ওনার সঙ্গে দু দিন আগেই কথা হয়েছে, আজ কখন কাজ শুরু হবে জিজ্ঞেস করলে তীর্থংকর বলেছিলেন, "তা বাবা, তোমার যখন সুবিধা হবে সেইমতই হবে। সকালে বললে সকালে, দুপুরে বললে দুপুরে।"

সুনন্দ আর কথা বাড়ায় নি, জিজ্ঞেস করেছিল কি কি জিনিস জোগাড় করতে হবে। তীর্থংকর বলেছিলেন মণীন্দ্র যেন তাঁকে ফোন করে, তিনি বলে দেবেন। মণি সপরিবারে সুনন্দর ভিটেতেই থাকে, বাড়িটা দেখাশোনা করে। সুনন্দ মণিকে ফোন করে বলল ভারাণীপাড়ায় যেয়ে তীর্থংকর পণ্ডিতের কাছ থেকে জেনে নিতে বাৎসরিকে কি কি জিনিস লাগবে।

ঘূর্ণী তোলে জল, সশব্দে ঐ পাড়ের মাটি ভেঙ্গে পড়ে। বালি-ভর্তি প্রায় ডুবুডুবু নৌকা ঘটঘট শব্দ দ্রুত চলে যায়। দূরে একটা পাল-তোলা নৌকা লোক পারাপার করে। আছে কিছু নৌকা এখন পাল-তোলা, ভালোই লাগে সুনন্দর। মাঝ নদীতে কয়েকটা মাছ জলের ওপরে লাফায়। সময়ের স্রোত নদীর জলের মত, ভাবে সুনন্দ। অতীত হল ভাটায়, ভবিষ্যৎ উজানে, কিন্তু মানুষ ভাটায় বা উজানে কোনোদিকেই হাঁটতে পারবে না।


২. তীর্থংকর

মগরায় সুনন্দর বাড়ি থেকে ভারাণীপাড়ায় তীর্থংকরের বাড়ি মাইলখানেক হলেও হতে পারে। সুনন্দর বাড়ি যাবার জন্য তীর্থংকর তৈরি হন। ধুতির ওপর সাদা ঢিলে পাঞ্জাবী। ঘরের জানালায় শিক দেয়া, তার ভেতর দিয়ে বাগানটা দেখা যায়। নিজের হাতে লাগিয়েছেন গাছ। ডুলিচাঁপা, নাগকেশর, শাল, ছাতিম। পাঞ্জাবীটা পরে দুহাতে জানালার শিক ধরে বাগানের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন তীর্থংকর, বৃষ্টিটা ধরে এসেছে, গাছগুলোর নিচে এখানে সেখানে জল জমেছে। গরমটা একটু কমেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তীর্থ, তারপর ঘরের ভেতরের একটা মাঝারি আকৃতির কাঠের আলমারি খোলেন।

সেগুন কাঠের ওপর ল্যাকার করা প্রায় দেড়শ বছর পুরোনো এই আলমারিটা। যত্ন করে রেখেছেন তীর্থ। ভেতরের একটা ড্রয়ারে তালা আছে, চাবি দিয়ে সেটা খুলে তীর্থংকর একটা মালা বের করে আনেন, সোনার মালা, তার মধ্যে একটি নীল পাথর।

একটা পাথর কি করে পাথর হয়? আর কিছু পাথর কেমন করে এত সুন্দর হয়? ভাবেন তীর্থংকর। মাটির অনেক নীচে, অন্য পাথরের চাপে, গরমে, আগ্নেয় ও পাললিক শিলা তার স্ফটিক চরিত্র বদলে হয়ে ওঠে নীলাভ অনন্যসুন্দর অসিতোপল--নীলা। এরকমই একটি পাথর তার পরিবারে এসেছে।

মালাটি ঠিক কোনখান থেকে এসেছে সেটা তীর্থংকর জানে না। তাঁর মা বলেছিলেন ঠাকুরমা উত্তরাধিকারসূত্রে মালাটিকে পেয়েছিলেন রংপুর থেকে, সেখানে তাদের নাকি রাজা বলা হত। অবশ্য রংপুরের জমিদারির কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধু আছে নীলকান্তমণির মালাটি।

পাথরটি থেকে একটা অদ্ভূত নীল আলো ছড়িয়ে পড়ত, অন্ধকারেও যেন জ্বলত। কমলা বলতেন, "আমি মরে গেলে ভুলে যেও না যেন, মিহিরের বউয়ের হাতে মালাটা দিও।" তীর্থংকর স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন, বলতেন তুমি মরলে ওকে দেখবে কে?"

পাথরটিতে ডান হাতের মধ্যমা ও অনামিকা রেখে আবার বাগানের দিকে তাকান তীর্থংকর। এটাকে অভ্যাস বলা যাবে না, বরং একটা প্রক্রিয়া। তীর্থংকর সব মিলিয়ে কমলাকে হয়তো তিন-চারবার এটা পড়তে দেখেছেন। ৭১ সালে পালাবার আগে মালাটিকে বাড়ির এক কোণায় পুঁতে রেখে গিয়েছিল তারা। গহনা-পাতির মধ্যে ওটাই শুধু বেঁচেছে, বাকি সবকিছু পথে ডাকাতের কাছে খোয়া গেছে। আর বাড়িতে যা ছিল সব লুট হয়েছে। এর মধ্যে কাঠের আলমারিটা মোজাম্মেল মিঁয়া নিয়ে গিয়েছিল, ৭২য়ের জানুয়ারীতে তারা সব ফিরলে ফেরত দিয়ে গেছে। মোজাম্মেলের কাছে তীর্থংকর চিরঋণী, কারণ মোজাম্মেলই স্থানীয় শান্তি বাহিনী নেতা কেরামত আলীর দলবলকে তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়া থেকে নিবৃত্ত করেছিল।


৩. কমলা

যেন নিজের কথা রাখতেই কমলা আগে চলে গেল। চৌদ্দ বছর হয়ে গেল। খুবই দুর্ভাগ্য বলতে হবে, কমলার মৃত্যুর জন্য তীর্থংকর নিজেকে দায়ী করেন। উঠোনের এক কোণায় বহুদিনের একটা ইঁদারা কাঠের একটা পাটাতন দিয়ে ঢাকা দেয়া ছিল। তার জলটা খারাপ ছিল না, কিন্তু কে আর বালতি দিয়ে জল টেনে তুলবে, আর জল খারাপ ছিল না বললেই হবে। ডিপ টিউবয়েলের বদৌলতে মাটির অনেক নিচের বিশুদ্ধ জল যখন পাওয়াই যাচ্ছে তখন ইঁদারার উন্মুক্ত জল কে খাবে? তাই তীর্থংকর সেই ইঁদারার পাশেই টিউবয়েল বসিয়েছিলেন। অনেক বছর সেই টিউবয়েল ভালই কাজ করছিল, জলটার স্বাদও খারাপ ছিল না, অসুখ-বিসুখও তেমন হয় নি। তারপর একদিন টিউববয়েলে জল আর ওঠে না।

চৌদ্দ বছর আগের ঘটনা, সেবার খুব বন্যা হয়েছিল। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল। কমলা বলল, "ইঁদারার ওপর কাঠের ঢাকনাটা সরিয়ে দেখি, ইঁদারায় জল আছে কিনা?" সকাল তখন, তীর্থংকর নারায়ণপূজা করছেন, অল্প শুনলেন, অল্প শুনলেন না, বললেন, "দেখ।" কাঠের ঢাকনা সারানোর শব্দ পেলেন। তারপর চিৎকার শুনলেন কমলার, চমকে উঠতে না উঠতেই পৃথিবীর গভীর থেকে ভেসে এল একটি মানুষের জলে পড়ার শব্দ। কমলা নিচে পড়েছে, সোজাসুজি জলে পড়লে মারা যাবার কথা নয়, কমলা ভাল সাঁতাড় জানতো, কিন্ত নিচে পড়তে পড়তে তার মাথা বোধহয় দেয়ালের ইঁটে লেগেছিল, অজ্ঞান হয়েই তার দেহ নিচে পড়েছে।

আসনে বসেই তীর্থংকর মূহুর্তে বুঝেছিলেন কি ঘটেছে। দৌড়ে ইঁদারার পাশে গিয়ে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকলেন, কিন্তু জানতেন ডেকে লাভ নেই, ছেলে সকাল উঠেই স্কুলে চলে গেছে। কিন্তু দ্বিধা করলেন না, কাঠের পাটাতনটা অর্ধেক খোলা ছিল, সেটা টান মেরে পাশে ফেলে দিলেন। তারপর ইঁদারায় ঝাঁপ দিলেন। কমলার অচেতন দেহটা খুঁজে পেতে তার দেরি হল না, জল বেশী ছিল না, পাঁচ ফুট হবে না, নিচে নরম কাদা। কমলার মুখটা কোনোরকমে জলের ওপর তুলে দিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে রাখলেন। চিৎকার করে লাভ হবে না জানতেন, ঘন্টাখানেক পরে লক্ষ্মী উঠান ঝাড় দিতে আসবে, অপেক্ষা করতে হবে ততক্ষণ। ওপরের গোলাকৃতি সাদা আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল তার মুখে।

এর পরের ঘটনাটা সংক্ষেপেই বলি। লক্ষ্মী এসে দেখে ইঁদারার পাটাতন নেই। উঁকি দিয়ে দেখে নিচে তীর্থংকর আর কমলা। লোক ডাকল। গ্রামের সবচেয়ে কড়িৎকর্মা ছেলে নজরুল দড়ি বেঁধে নিচে নেমে একে একে দুজনকেই তুললো।

এদিকে স্কুলে খবর গেছে, ছেলে মিহির এল, নজরুল ইত্যাদি সবাই মিলিয়ে টাঙ্গাইল সদরে নিয়ে গেল হাসপাতালে। কিন্তু কমলা সেই যে কোমায় গেল আর ফিরল না।


৪. শানাজ

কমলা যখন মারা যায় মিহিরের বয়েস তখন আট হবে, ক্লাস ফোরে পড়ে। এরপরে ১৪ ব্ছর কেটে গেছে। গ্রামে নতুন কলেজ হয়েছে, সেখানে মিহির ব্যাচেলর শেষ করছে। শহরে যাবার মত পরীক্ষায় নম্বর ওঠে নি, তারপর মাঝে দুবছরের ছেদ পড়েছে, এখন কি যে পড়ে নিজেই জানে না। কোনো কিছু না হলে বাবার মতই যজমানগিরি করবে।

বাড়ির একটা উঠান, উঠানের তিনদিকে তিনটি ঘর, একদিকে সেই অপয়া ইঁদারা, তার কাঠের পাটাতন এখন তালা দেয়া। একটি ঘরের মাঝে টিনের দেয়াল। একদিকে থাকে তীর্থংকর, অন্যদিকে মিহির। অন্য একদিকের ঘরটি রান্নার। সেখানে লক্ষ্মী এখনো থাকে। আর একটি ঘর ভাড়া দেয়া হয়েছে।

একদিন মিহির গেছে তার কলেজের বন্ধুর বাড়িতে পাথালিয়া গ্রামে। বন্ধুর নাম মজিবুর। সেখানে আরো দু-তিনজন, খুব আড্ডা হচ্ছে, এমন সময় মুজিবের মা শানাজ খালা ঘরের দরজায় এসে মিহিরকে ডাক দেয়। মিহিরকে শানাজ খালা খুব পছন্দ করে, সেই কত ছোট থেকে দেখে আসছে, মা-মরা ছেলেটার ওপর খুব টান।

শানাজ বলে, "বাবা মিহির, তোমারে একটা কথা কতদিন হইল কমু কমু বইলা ভাবতাসি, কিন্তু কওনের সাহস পাইতাসি না।" মিহির কথা বলে না, কি হতে পারে। "শোনো, আমাগো গেরামে এক ঠাকুরবাড়ি আসে, তোমাগো মতন চকরোবোর্তী, তুমি কি তাগো আগে থিকা চিনো?"

মিহির মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে। চেনা মানে চক্রবর্তী বাড়ির ছেলে অসীম স্কুলে তার দুই ক্লাস নিচে পড়ত, এখন পরীক্ষায় ভালো ফল করে ঢাকায় পড়ছে। অসীমের বাবা বা মাকে সে কোনোদিন দেখে নি। শানাজ বলে, "তাগো এক মাইয়া আছে। হের নাম হইল," শানাজ মনে করতে চায় মেয়েটির নাম, "কি যেন পুস্কুরুনি নাকি পুষ্পক। ও! পুষ্পা।"

এতক্ষণ পর্যন্ত মিহির পুষ্পার অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞান ছিল। সে মনোযোগ দিয়ে শানাজের পরের কথাগুলি ধরার চেষ্টা করে। "পুষ্পা যেসুম ছোড আছাল, সেসুম দেখছিলাম, কিছু বুঝবার পারি নাই। মেলা বছর পর সেদিন একটা দরকারে ঐ পাড়ায় গেছি দেখি খুব সুষ্টোবের একটা মাইয়া চকরোবোর্তী বাড়িতে ঢুকতাসে। আমি জিগাই তুমি কে, তোমার নাম কি। হে কয় ,পুষ্পা। আমি কই, তুমি অসীমের বুন? হে মাথা ঝাঁকায় কয়, হ। আমি তো মাইয়াডার মুখ দেইখ্যা হ্তবম্ব হইয়া গেলাম। বুঝলা মিহির, আমার তো হুঁশ নাই, অবিকল তোমার মার মত। তোমার মার মুইখটা এক্কেবারে যেন তার ঘাড়ে বসানো। হেই চোখ, আর ভুরু, নাক। দিদিরে কি আমি ভুলতাম। আমি নড়তে পারতাসি না। আমি কই, পুষ্পা তোমার বয়স কত? হে কয়, চৌদ্দ। শুইন্যা আমি তো ঐখানেই বইসা পরতাম। খালি শুকনা গলায় কইলাম, আইচ্ছা, আইস এখন।"

মিহির ঠিক বোঝে না শানাজ খালা কি বলতে চাইছেন, পুষ্পা তার মার মত দেখতে, কিন্তু এর মধ্যে চৌদ্দ বছরের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল।

শানাজের কথা থামে না। সে বলে, "তোমার মা যেদিন মারা গেল সেদিন কি বৃষ্টি, চিতা প্রায় নিভ্ভা যায় হেইরকম অবস্থা। সেইবছর যে কি বন্যা হইছিল, নদীর পানি বাড়ীত উঠছিল। চৌদ্দ বছর হইল।" শানাজ একটু দম নেয়, মিহির যেন অল্প অল্প বুঝতে পারে চৌদ্দ বছরের তাৎপর্য।

শানাজ বলে, "আমি পরদিন আবারো গেলাম, বাড়ির ভিতর গেলাম। পুষ্পার মার সাথে আমার আগে থিকা পরিচয় আছাল। একসাথে সমবায় করতাম, নাম হইল মিতা। আমারে খুব ভালবাসতো। আমি বসলাম। একটু পরে মাইয়া চুল বাইন্ধা বাইর হইল। বিশ্বাস করবা না আমার বুকটা মনে হইল বন্ধ হইয়া যাবো। মনে হইল তোমার মা বাচ্চা হইয়া ফিরা আইসে। তোমার মা ঠিক যেবা কইরা চুল বানধতো এক্কেবারে সেইরকম বাঁধসে। কিন্তু আমি তো মিতা দিদিরে কইতে পারি না, তোমার মেয়ে এক্কেবারে কমলা দিদির মতন। কমলা দিদেরে হে তো চিনে না । শুধু জিগাইলাম, তোমার মেয়ের জন্মদিন কবে। কয় আশ্বিন মাসে। ফিরা আইলাম। গত এক সপ্তাহ ধইরা তোমারে যে বলুম সেই সাহসটা হইতাসে না।"

মিহির এখনো যেন বোঝে ব্যাপারটা। তবুও ভাবে, একটা মেয়ের মুখ তার মায়ের মত, তো তাতে কি হয়েছে। পৃথিবীতে এত লোক, তাদের মধ্যে কেউ তার মার মতো দেখতে হতেই পারে। তার মতোও নিশ্চয় অনেক লোক আছে।

মিহিরের প্রতিক্রিয়ায় শানাজ মনে হয় একটু হতাশ হয়। সে খালি বলে, "তুমি একবার ওদের বাড়ি থেইকা ঘুইরা আইস।"


৫. মিতা

ঘুইরা আইস বললেই ঘুইরা আসা যায় না। ঐদিন শানাজের কথাটায় পাত্তা না দিলেও পরদিন থেকে মিহিরের মনে কথাটা ঘুরঘুর করে। পুষ্পা নাম মেয়েটির। চৌদ্দ বছর, তার থেকে ছোট।

ধীরে ধীরে মিহিরের মাথায় ব্যাপারটা আসে। চৌদ্দ বছর। তার মা মারা গেছেন চৌদ্দ বছর। শ্রাবণ মাসে। ভরা বর্ষায় জলের খোঁজে। পুষ্পা জন্মেছে ঐ বছর আশ্বিনে। শানাজ খালার উত্তেজনার কারণ খুঁজে পায় মিহির। পরদিন যেয়ে হাজির পাথালিয়ার চক্রবর্তী বাড়ির সামনে। কিন্তু গেলেই তো হবে না, ঢোকার জন্য একটা উছিলা চাই। বাড়ির সামনে এসে মনে হল বাড়ির কর্তার নাম জানে না, কর্ত্রীর নাম জানে, তিনি হলেন মিতা। তা ঠিক আছে, কিছু একটা বলা যাবে। পাকা একতলা দালানবাড়ি। খুব বড় নয়, বাইরে একটা গ্রিল দেয়া বারান্দা। সেখানে দুটো মোড়া, দুটো চেয়ার, একটা বেতের টেবিল।

বাইরে গ্রিলের দরজার হাতলে শব্দ করে মিহির। কে বলে বেড়িয়ে আসন বছর পয়তাল্লিশের এক মহিলা, মুখে বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পষ্ট। "কাকে চান?" বলেন মিতা চক্রবর্তী। মিহিরের কথা আটকে যায়। তারপর বলে, "আমার নাম মিহির চক্রবর্তী, মগরার তীর্থংকর চক্রবর্তীর ছেলে।"

মিতা একগাদা হেসে বললেন, "ওঃ, তুমি তীর্থংকর পণ্ডিতের ছেলে, আইস বাবা, ভিতরে আইসা বহ।" বসলে পরে মিতা জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি আমাগো অসীমের সঙ্গে পড়তা?" মিহির ভাষা খুঁজে পায়, বলে অসীম তার থেকে ছোট। মিতা জিজ্ঞেস করে মিহির কি অসীমের বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে কিনা, এসে থাকলে তার কপাল মন্দ কারণ আনন্দ চক্রবর্তী নদী পার হয়ে ভাবলার বাজারে গেছেন তার ওষুধের দোকানে বসতে। মিহির একটু হাঁপ ছাড়ে। কিন্তু পুষ্পা নামের মেয়েটিকে দেখে না। বাড়িতে মনে হয় এখন কেউ নেই।



৬. তীর্থংকর

সেই রাতে রান্নাঘরের মেঝেতে খেতে বসে তীর্থংকর আর মিহির। খাবার বেড়ে দেয় লক্ষ্মী। মিহির বলে, "বাবা, তুমি পাথালিয়ার আনন্দ চক্রবর্তীকে চিনো?" তীর্থংকর বলেন, "আনন্দকে চিনব না, অবশ্যই চিনব। ওঁর ছেলের অন্নপ্রাশন, তারপর পৈতা তো আমিই করাইছি। আমারে এইডা জিজ্ঞাস কেন করতাছ?"

"ওঃ, বাবা আমি ওদের সবাইকে আগামী শুক্রবার নেমন্তন্ন করছি।"

ছেলের কথার কোনো মাথামুণ্ডু করতে পারলেন না তীর্থংকর। "তুমি ওদের নেমন্তন্ন করছ? কি ব্যাপার? তুমি তো বন্ধুদের ছাড়া কাউকে ডাকো না?"

মিহির বাবার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, "বাবা, আমি বইলা আসছি, কিন্তু তোমাকে আলাদা কইরা ওদের বলতে হবে। শুধু আমার কথায় তো আসবেন না।"

ছেলের ওপর রাগ করতে পারেন না তীর্থংকর। মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত ছেলে। পরীক্ষায় ভাল ফল করে না ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন বাবাকে ঝামেলায় ফেলে নি।

তীর্থংকর বললেন, "তা নেমন্তন্ন যখন করেছে কি খাওয়াইবা ভাবছ?"

"তা হবে, বাবা। আমি লক্ষ্মী মাসীর সঙ্গে সামাল দিব। তুমি খালি একবার ওদের বাড়ি থেকে ঘুইরা আইস। কালই যাও। আজ তো সোমবার।"

ছেলের রহস্য বোঝেন না তীর্থংকর। লক্ষ্মী এতক্ষণ সব শুনছিল, হাসে। তীর্থংকর তার দিকে তাকিয়ে বলেন, "তুমি কিছু জানো নাকি?"

লক্ষ্মী তীর্থংকর থেকে বছর দশেক বড়, তবু এই সংসারের ভেতর বাড়ি সেই টিঁকিয়ে রেখেছে। তীর্থংকরকে সে বলে কাকাবাবু আর মিহিরকে দাদু। লক্ষ্মী বলে, "সে আমি কিবা কইরা জানমু, কাকাবাবু। তবে আপনি যখন যাইবেন সবাইরে কিন্তু বইলা আসবেন। ওদের বাড়িতে তিনজন।"

"তিনজন?" এতক্ষণে তীর্থংকর যেন কিছু বুঝতে পারেন। মিহির সাথে সাথে অবস্থাটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। "ওনাদের ছেলে অসীম ঢাকায় পড়ে, অসীমের একটা ছোট বোন আছে।"

"ওঃ," মিহিরের কথায় আশস্ত হবেন কিনা বোঝে না তীর্থংকর। ছেলে কি কিশোরী মেয়ের প্রেমে পড়েছে?

পরদিন তীর্থংকর গেলেন আনন্দ চক্রবর্তীর বাড়ি সকাল সকাল, আনন্দ কাজে বেড়িয়ে যাবার আগে। গ্রিল-দেওয়া বারান্দায় বসলেন। একটু পরে পুষ্পা বেরিয়ে আসল স্কুলের পোষাক পড়ে, স্কুলে যাবে। আনন্দ বলল, "ইনি তোমার জেঠা, প্রণাম কর। " পুষ্পা সলজ্জে প্রণাম করে মাথা তুলল। তীর্থংকর দেখলেন কমলার মুখ। বুক কাঁপল। বুঝলেন কেন ছেলে এদের ডাকতে বলেছে। তারপর খেয়াল করে দেখলেন থুতনির ডানদিকে একটা ছোট্ট আঁচিল, কমলার যেরকম ছিল। তীর্থংকর বললেন, "আপনারা এত কাছে থাকেন। আপনাদের অনুষ্ঠানও আমি করেছি। শুক্রবার দুপুরে কোনো কাজ না থাকলে আমার বাড়িতে বেড়াইতে আসবেন। গতকাইল ছেলেরে পাঠাইছিলাম, সে হয়ত বলতে পারে নাই ঠিকমত।"

আনন্দ বলল, "আপনি বলছেন, অবশ্যই যাব। আপনার ছেলে কাল এসেছিল। অগ্রিম বার্তা আমার স্ত্রীকে দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কি উপলক্ষ বলেন তো?"

তীর্থংকর বলেন, "কোনো উপলক্ষ নাই। আমার অনেক দিনের শখ আপনার সাথে একটু কথা বলার, আপনি বিদেশ-ঘোরা মানুষ। আর এইটাকে চক্রবর্তী সম্মেলনও বলতে পারেন।"

তীর্থংকর চলে যাবার পরে মিতা বলে, "আমার মাইয়ার বিয়া দিবার বয়স হয় নাই।" আনন্দ বলে, "কি যাতা বলো। তোমার মনে হয় তীর্থংকর পণ্ডিত এই জন্য আসবো? মহাজ্ঞানী মানুষ। আমাদের পুষ্পা এক্কেবারে বাচ্চা আর তা নিজের ছেলের তো এখনো কোনো প্রতিষ্ঠা হয় নাই। না, না, আমার মনে হয় এমনেই আসছেন উনি।"

মিতা বলল, "তা জানি না, আমার মাইয়াটা বাচ্চা, আর মিহির ইন্টারে ফেল করা ছেলে।" গতকাল মিহির চলে যাবার পরে মিতা তার সম্বন্ধে খোঁজখবর করেছে।


৭. নীলকান্তমণি 

শুক্রবার দুপুরবেলা মিতা ও আনন্দ চক্রবর্তী ও তাদের কন্যা পুষ্পা তীর্থংকরের বাড়িতে এলেন। বাইরের বারান্দায় বসে কথাবার্তা হল। মিতা চক্রবর্তী সমবায় করেছে, মেয়েদের স্কুলে পড়ায়, সে আনন্দ ও তীর্থংকরের সঙ্গেই এক কাতারেই আলোচনা করতে থাকল। এদিকে তীর্থংকর আর মিহির দুজনেই পুষ্পার দিকে ক্ষণে ক্ষণেই তাকাচ্ছিল। এটা আবার মিতা আর আনন্দের চোখ এড়ায়নি, তারা নিসন্দেহ হল তীর্থংকর ছেলের জন্য পাত্রী চাইছে। কিন্তু তীর্থংকর কথাটা তুললে যে একটা অপ্রস্তুতকর পরিস্থিতি হবে সেটা ভেবে তারা আতঙ্কিত হল।

কিছুক্ষণ পরে পুষ্পা বড়দের কথায় বিরক্ত হয়ে পেছনের বাগানে ঘুরতে গেল। তীর্থংকর মিতাদের পুষ্পার সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর মিলটির কথা কিছুতেই বলতে পারলেন না।

লক্ষ্মীর রান্না চমৎকার হয়েছিল। খিচুরী, বেগুন ভাজা, মুগ ডাল, ডাঁটার চচ্চরি, আলু-ফুল কপির তরকারি, কাত্লা মাছের ঝোল, টক-চাটনি, মিষ্টান্ন। বিকেল পড়তে না পড়তে মিতারা চলে গেল। তীর্থংকর পাত্রী হিসেবে পুষ্পার কথাটা ওঠায় নি দেখে তারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ওরা চলে যাবার পরে তীর্থংকর একদম চুপ করে গেলেন, মিহির ভেবেছিল বাবা দু-একটা কথা বলবে, তা আর হল না।

পরদিন সকালে মিহির কলেজ গেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তীর্থংকরের কাছ থেকে তার মোবাইলে একটা ফোন পেল। তীর্থংকর মিহিরকে বললেন, বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে যেন পাথালিয়া যেয়ে আনন্দ চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে অপেক্ষা করে। ভাবলা গ্রাম থেকে কাজ সেরে আনন্দ যখন তার বাড়িতে ফিরবে তীর্থংকরকে যেন একটা ফোন করে মিহির, কিন্তু আনন্দ যেন তাকে না দেখতে পায়। মিহির খুব উৎকন্ঠিত হল, জিজ্ঞেস করল, "কি হয়েছে, বাবা?" কিন্তু তীর্থংকর তাকে কিছু খুলে বললেন না।

মিহির ফোন করলে তীর্থংকর পাথালিয়া উপস্থিত হন। আবার সেই গ্রিলের বারান্দায় বসেন, আনন্দ বেড়িয়ে এলে বললেন, "আপনার সঙ্গে কথা আছে। জিনিসটা কিভাবে বলব বুইঝা পাচ্ছি না।"

আনন্দ উৎসুক হয়ে তীর্থংকরের মুখের দিকে তাকালেন। তীর্থংকর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, আনন্দও অপেক্ষা করল। তারপর তীর্থংকর বললেন, "আপনার মেয়ে পুষ্পা...।" এটুকু বলে আবার চুপ হয়ে যান তীর্থংকর।

আনন্দ একটু ঘাড়টা কাত করলেন, তার মুখটা দেখে বোঝা গেল না পুষ্পার নামটা শুনে সে আশ্চর্য হয়েছে কিনা। কিন্তু আনন্দ ভাবল মিতা ঠিকই বলেছে, পুষ্পাকে এরা গৃহবধু করতে চায়। যদিও গতকালই তীর্থংকরের বাড়ি যাবার সময় এই ব্যাপারে কি বলবে ভেবে গিয়েছিল, কিন্তু আবারো এই পরিস্থিতির সম্মুখীণ হতে হবে ভেবে একটু অসহায় লাগে তার।

কিন্তু তীর্থংকর বলেন, "পুষ্পা কি আমার বাড়ি থেকে একটা মালা নিয়ে আসছে গতকাল? মালাটির মাঝখানে একটা নীলা পাথর আছে।"

আনন্দর মুখ কালো হয়ে গেল। কে এই কথার জন্য প্রস্তুত থাকে? সে প্রথমে তীর্থংকরের দিকে হতবাক তাকিয়ে রইল সেকেন্ড পাঁচেক, তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "আপনি কি পুষ্পাকে চোর বলছেন?"

তীর্থংকর প্রস্তুত হয়ে এসেছিলেন। বললেন, "না, পুষ্পার এখ্ন এমন একটা বয়েস যখন সে হয়তো নিজেই জানে না সে কি করছে। আর আপনাকে বলি আমাদের বাড়িতে প্রায়ই অদ্ভুত সব ব্যাপার হয়। কি ব্যাপার সেটা আপনাকে খুলে বলতে চাই না। আমি এটুকু খালি বলতে পারি পুষ্পা যদি নীলকন্ঠমণি নিয়েও আসে সে নিজের ইচ্ছায় সেটা আনে নি।"

অবস্থাটা সামাল দিতে তীর্থংকরকে একগাদা মিথ্যে বলতে হল। আজ সকালে স্নান সেরে আলমারী খুলে তিনি চিরাচরিতভাবে নীলার মালাটি হাতে ধরতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন কমলার গয়নার বাক্সটা খোলা। বাক্সতে সবই আছে শুধুমাত্র কমলার সেই নীলকান্তমণি মালাটা নেই। এই ঘরের একটা দরজা পেছনের বাগানের দিকে। সেখান থেকে সহজেই ঢোকা যায়। তীর্থংকর মনে করে দেখলেন গতকাল পুষ্পা বাগানে গিয়েছিল, তারপর পেছনের দরজা দিয়ে এই ঘরে ঢুকেছিল, তাকে তীর্থংকর দেখেও ছিলেন এই ঘরে কিন্তু তখন কিছু মনে করেন নি। পুষ্পা কমলার জিনিস নিয়ে গেছে, এমন যেন এরকমই হবার কথা। তীর্থংকর ভাবেন কমলা কি নিজের জিনিস নিয়ে গেছে, নইলে ঐ ছোট মেয়েটির এমন সাহস হবে কেমন করে?

আনন্দ অনেকক্ষণ কথা বলে না, তারপর থমথমে মুখে পর্দা সরিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেল। ঐ ঘরের লাগোয়া একটা ঘর, সেটা নানান কাজে ব্যবহার করা হয়, ভাড়ার ঘর, চাল ডাল রাখা হয়। একটা কেমন সোঁদা গন্ধ সেখানে সবসময়। একটা পুরাতন কাঠের আলমারি একদিকে, তার পাল্লা খুলে গেছে, কাঠও উঁইপোকায় খাওয়া। সেই আলমারির একটা তাক থেকে আনন্দ পুরোনো একটি বিস্কুটের টিনের বাক্স বার করে, বাক্সের ওপর খুব সুন্দর করে আঁকা দুটি ইউরোপীয় কিশোরী, নিচে একটা লাল আপেলের ঝুরি, ওপরে লেখা Make Your Wishes Come True।

এই কৌটায় পুষ্পা তার সখের জিনিস রাখে। পুঁতির মালা, দামী কলম। কৌটার মুখটা খুলল আনন্দ, ভেতরে কাগজপত্র কিছু, রং-বেরয়ের সুতো, অন্ধকারে ভাল বোঝা যাচ্ছিল না, ডান হাত দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল সে, তর্জনীটা অসাবধানে ধারাল টিনে লাগল। "আঃ," বলে চিৎকার করে উঠল সে। চিৎকারটা বাইরের বারান্দা থেকে শোনা গেল, তীর্থংকর চেয়ার থেকে উঠলেন উদ্বিগ্ন হয়ে। এর মধ্যে মিতা আর পুষ্পা ভেতর থেকে ছুটে এল ঐ গুদাম ঘরে।

তারা এসে দেখল আনন্দ একটা উজ্জ্বল সোনার মালা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর মালাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পুষ্পা দু-হাত মুখে দিয়ে একটা আর্তনাদ চাপল, ঘুরে পালাতে চাইল, আনন্দ চিৎকার করে বলল, "কোথাও যাবি না।" তারপর মিতার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "আমরা কেমনি কইরা একটা চুররে এদ্দিন ধইরা বড় করসি?"

মিতা কেঁদে দিল, আনন্দর রক্তমাখা হাতটা ধরে দেখতে চাইল। সেরকম কিছু হয় নি, কিন্তু তাতে রক্ত বের হচ্ছে অনেক। রক্তে মালাটা লাল হয়ে গেছে, শুধু নীলকান্তমণিটা থেকে নীল আভা বের হচ্ছে।

আনন্দ পুষ্পার হাত ধরে, তিনজনে বাইরে বের হয়ে আসে। মিতা হাপুস নয়নে কাঁদছে, আনন্দের মুখের চোয়াল শক্ত, পুষ্পা মাটিরে দিকে তাকিয়ে থাকে। পুষ্পাকে দেখে আবারো বুক ছ্যাঁত করে ওঠে তীর্থংকরের। কমলা ফিরে এসেছে। পুষ্পার হাতে রক্ত লেগেছে। কমলা হাতের চারদিকে লাল আলতা মাখত, ঠিক সেরকমভাবেই যেন পুষ্পার হাতে আলতা লেগেছে।

আনন্দ তীর্থংকরের দিকে তাকায়, এবার সে আর চোখের জল রাখতে পারে না, রক্তমাখা হাতে মালাটা তীর্থংকরের দিকে বারিয়ে দেয়। তীর্থংকর আবার চেয়ারে বসে পড়ে। মাথাটা নিচের দিকে ঝঁকিয়ে কি যেন বলে নিজের মনেই। তারপর মাথা উঁচু করে পুষ্পাকে বলে, "পুষ্পা, তুমি ঐ মালাটা একটু পরবে মা?"

মিতা আর আনন্দ দুজনেই আশ্চর্য হয়ে তাকায় তীর্থংকরের দিকে। কিন্তু কথা বলতে সাহস পায় না। আনন্দ নিজেই পুষ্পাকে মালাটা পরিয়ে দেয়। সেখান থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত পুষ্পার জামায় পড়ে। নীলকান্তমণিটা পুষ্পার বুকে থাকে। তীর্থংকর অনেকক্ষণ ধরে পুষ্পার দিকে তাকিয়ে থাকেন, পুষ্পা কি এই মণিটির জন্মাধার সেই পাললিক শিলা হয়ে উঠতে পারবে? হঠাৎ তাঁর খেয়াল হয় পুষ্পার থুতনিতে সেই আঁচিলটা আর দেখা যাচ্ছে না। আর আগে রক্ত-মাখা হাতে আলতা পড়ানো ভেবেছিলেন, সেই আলতাও যেন নেই, পুরো হাতটাই লাল। আবারও পুষ্পার মুখের দিকে তাকান তিনি। না নেই, একটা দীর্ঘপ্রশ্বাস বের হয় তাঁর থেকে। কমলা ফিরে আসে নি। তিনি বলেন, "আজ উঠি আমি।"

মিতা আর আনন্দ দুজনেই একসাথে বলে ওঠে, "দাদা, মালাটা নিয়া যান।" মিতা মালাটা পুষ্পার গলা থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে ভেতর থেকে ধুয়ে নিয়ে এল, তীর্থংকরের পায়ের কাছে মালাটা রেখে গড় হয়ে নিজের মাথা রেখে মিতা আর্তস্বরে বলে, "দাদা, আপনের দুইটা পায়ে পড়ি, ওরে ক্ষমা কইরা দিইয়েন, দাদা আপনি যা কইবেন আমরা তাই করমু, কিন্তু হাত-জুড় কইরা কই এইটা বাইরে কেউরে কইয়েন না দাদা। এইটা যদি বাইরের কেউ জাইনা যায় তাইলে আমরা পুষ্পারে এইখানে রাখতে পারমুনা।"

তীর্থংকর বললেন, "তুমি ওঠ, মিতা। ভেবো না, আমি কাউকে বলব না। এই ঘটনাটা হয়তো ভালোর জন্যই হয়েছে।" মিতা উঠে চোখের জল মুছতে মুছতে মালাটি একটা কাগজে জড়িয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটে মুড়ে তীর্থংকরের হাতে দেয়। তীর্থংকর আর কথা না বলে গ্রিলের দরজাটা ঠেলে বাইরের রাস্তায় আসেন। বিহ্বল মিতা আর আনন্দ নড়তে পারে না, তারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, কিভাবে এই ঘটনা ভালোর জন্য হয়েছে সেটা তার বুঝতে পারে না। পুষ্পা কখন যে ভেতরে চলে গিয়েছে।


৮. বাৎসরিক

মন্ত্র পড়তে পড়তে থেমে যান তীর্থংকর। নীলকান্তমণি জ্বলজ্বল করে চোখের সামনে। জরাগ্রস্ত মানুষ চলে গেলেও অবোধ পৃথিবী নীলাভ পাথরকে বাঁচিয়ে রাখে লক্ষ কোটি বছর। কিন্তু তার মাঝে মানুষের আত্মা বাঁচে না।

সুনন্দর ঘরে সব ব্যবস্থা হয়েছে, সব কিছু সাজানো হয়েছে, প্রদীপ, ধুতি, গামছা, ছাতা, পাদুকা, মুদ্রা, কুশাসন, কোলার খোল, দই, ঘি, মধু, কর্পুর, আতপচাল, চন্দন, হরতকী, তুলসীপাতা। পিঁড়িতে আসন করে বসে সুনন্দ, পণ্ডিত মশাই সামনে একটা জলচৌকিতে বসেন। তীর্থংকরের মৌনতাকে আশ্রয় করে সুনন্দ প্রশ্ন সে করে, "কাকা, এই যে জিনিসগুলো আমার বাবাকে উৎসর্গ করছি উনি তো আসলে এসব ব্যবহার করতে পারবেন না?"

তীর্থংকর উত্তর দেন, "মৃত্যুর পর আত্মা প্রেতরূপে থাকেন, সেই রূপ থেকে মুক্তির জন্য তোমার আজকের এই প্রার্থনা, আর তারপর চলার পথের তাঁর যেন কোনো বাধা সৃষ্টি না হয় সেইজন্য এই সব দান।"

"কিন্তু এই ধুতি আর গামছা তাকে কি করে সাহায্য করবে? আর সেগুলো তো তাঁর কাছে পৌঁছাচ্ছে না?"

তীর্থংকর হাসেন, বলেন, "এগুলো সবই প্রতীকী।"

দুজনেই নিশ্চুপ থাকে । তারপর সুনন্দ বলে, "কাকাবাবু, বাবার কি জন্মান্তর হবে বলে মনে হয়?" তীর্থংকর বলেন, "জন্মান্তর যেন হয় সেই জন্যই আজকের অনুষ্ঠান।" সুনন্দ তাতে আশ্বস্ত হয় না। বলে, "আপনার কি মনে হয় বাবা আমার বাবা হয়ে জন্মানোর আগে তাঁর অন্য জন্ম ছিল?"

তীর্থংকর এসব কথার উত্তর দিতে চান না। তিনি জানেন এগুলোর কোনো সঠিক উত্তর নেই। তবু বলেন, "হয়তো ছিল।"

সুনন্দ যেন নিজের মনেই বলতে থাকে, "হয়তো আগের জন্মে বা তার আগের জন্মে তিনি পিতা বা মাতা ছিলেন, সেই জন্মের সন্তানরাও তাঁর উদ্দেশ্যে মন্ত্র পড়েছে, আগামী জন্মের পুত্ররাও পড়বে, আমার পিতাও পড়বেন। আমার মাতারও একই দশা হবে, আমারও। তাহলে তো সব ঘেঁটে যাবে কাকাবাবু, হয়তো আগামী কালের কন্যা আগের জন্মে আমার পিতা। তাহলে আমার পিতার বা কন্যার বৈশিষ্ট্য থাকলো কোথায়?"

সুনন্দ ডাক্তার, মৃত্যুকে সবসময় দেখছে, মানুষকে কাঁটা-ছেড়া করছে, করোটি খুলে দেখেছে। সেই নরম মস্তিষ্কে কি আত্মা লুকিয়ে থাকতে পারে? মাকে সে এত ভালবাসতো, মৃত্যুর পর সেই মা কোথায় গেল? আর বাবা ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ডিমেনশিয়া। ভাষা, স্মৃতি, বোধ হারিয়ে ফেলছিলেন, শেষে এসে কাউকে চিনতেন না। সেই মানুষটা বেঁচে থেকেও চলে গিয়েছিলেন, তার আত্মা তখন কোথায় ছিলে? তাঁর বাবার ডিমেনশিয়া পীড়িত আত্মার স্থান কি এই মহাবিশ্বে আছে? সেই আত্মারই বা মূল্য কি?

আর কমলার আত্মা, সে কোথায় আছে এখন, ভাবেন তীর্থংকর। পুষ্পার বুকে জ্বলে ওঠে নি নীলকান্তমণি যেমন জ্বলে উঠত কমলার বুকে। কমলা পুষ্পা হয় নি। কমলা এই বিশ্বে একটাই ছিল, একটাই থাকবে। কমলার শরীরের প্রতিটি পরমাণু মিশে গেছে এই পৃথিবীর বাতাসে, জলে, মাটিতে। তার বোধ মিশে গেছে সেই সাথে। কমলা যদি কোথাও বেঁচে থাকে সে আছে শুধু আমার মনে। কত অন্তেষ্ট্যি ক্রিয়ায় সে পৌরহিত্য করেছে, আত্মাকে মুক্তি দিতে চেয়েছে, কিন্তু এই প্রথমবারের মত তীর্থংকর বুঝলেন মুক্তির অর্থ কি হতে পারে। 

মন্ত্র আর পড়া হয় না তীর্থংকরের। সুনন্দ বলে, "কাকাবাবু, আজ এখানেই থাক।" জীবনে এই প্রথম তীর্থংকর কোনো আচার শেষ করতে পারলেন না।

দুজনেই যেন কোনো একটা ঘোরে বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসে। কিছু দূরেই নদী। তার অন্য দিকে সূর্য ডুবছে। সকালের বৃষ্টির পর আকাশ এখন মেঘমুক্ত, ধূলিমুক্ত। সুনন্দ ভাবে তাঁর বাবার দেহের অণু বাঁশী নদী বেয়ে শীতলক্ষ্যা, শীতলক্ষ্যা থেকে মেঘনা, মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগর, সাগর থেকে ভারত মহাসাগর, সেখান থেকে দক্ষিণ সাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পৌঁছে গেছে। সেই কোটি কোটি অণু-পরমাণুর কয়েকটি জলীয় বাষ্পর সাথে বায়ুমণ্ডলে পৌঁছেছে, তারপর সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মিতে কিছু অণু ভেঙ্গে পরমাণু হয়েছে, তার মধ্যে গুটিকয়েক পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে হার মানিয়ে মহাশূন্যে উড়ে গেছে। তারা কি সূর্য পর্যন্ত যেতে পারবে? সুনন্দ কল্পনা করে এক সূর্যগামী ধূমকেতুর যে কিনা পৃথিবীর কক্ষপথ পার হতে হতে বাবার দেহের কোনো অণুকে তার দেহের সঙ্গে বিলীন করে সূর্যে নিয়ে গেছে। সেই ধূমকেতু যখন আছড়ে পড়েছে সূর্যের বুকে এই মহাবিশ্বে তার বাবার অভিযান সাঙ্গ হয়েছে। সূর্য ভালবাসতেন সুপ্রিয় সেন, সেই সূর্যতেই হোক তাঁর মুক্তি, শান্তিবাগের ঘিঞ্জি গলি থেকে সূর্যপানে উড়ে গিয়েছেন তিনি, সেখানেই তাঁর সার্থকতা। সেই সার্থকতা দিতে পারবে না কোনো প্রেতলোক, কোনো জন্মান্তর।

পড়ন্ত সূর্যে পশ্চিমের আকাশ যত লাল হল বাদবাকি আকাশ তত নীল হতে লাগল। গাড় নীল। এই আমার নীলকান্তমণি, ভাবেন তীর্থংকর।



লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন