বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

মাহফুজ পারভেজ-এর গল্প : অন্বেষণ

লোকটির কথায় অকস্মাৎ বাজ পড়ল। কথাটির প্রবল প্রক্ষেপে ফুটবল মাঠের মিনি সংস্করণ মন্ত্রীর সাউন্ডপ্রুফ কামরার পুরোটাই কম্পমান। মাঠ-ভর্তি দর্শকের মতো ঘর-ভর্তি দর্শনার্থী পিলে চমকানো উত্তেজনায় একযোগে তাকায় মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের টেবিলের সামনের লোকটির দিকে। যে লোকটি কথাটি বললেন, তিনি দেখতে পুরনো কালের পণ্ডিতমশাইয়ের মতো।
সাদা ফতুয়া আর পায়জামা পরে লম্বা মানুষটি খালি পায়ে চেয়ারের ওপর চড়ে উবু হয়ে বসে আছেন। সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচা-কাহিনীতে ওরকম পণ্ডিতমশাইয়ের গল্প আছে। যিনি মুজতবাকে শাখামৃগ বলে সম্বোধন করতেন। মুজতবার ভাষায় ‘শাখামৃগ শব্দটি যোগারূঢ় অর্থে বাঁদর আর ক্লাসারূঢ় অর্থে আমি’। শব্দটি এক্ষণে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের ওপর আপতিত।

রাজনীতির বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মন্ত্রী মহোদয় পরিস্থিতি আঁচ করে সহসাই সুন্দরী পিএ-র দিকে মনোযোগী। যেন কিছুই শুনতে পাননি! ভাব ধরেছেন, অন্য জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন। কথা ও বিষয় ঘুরে যাচ্ছে দেখে লোকটি আবার গর্জে ওঠলেন, ‘আপনি সাহেব একটা যা-তা...আপনি একটা বানর...।’


কথাটা শুনেই একটা টক ঢেঁকুর অন্ত্রে পাঁকিয়ে উঠলেও মন্ত্রী মহোদয় সবার অলক্ষ্যে সেটা গিলে ফেললেন। কিন্তু সামনের আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষকে আর এড়াতে পারলেন না। শক্তিতে নয়, কৌশলের আশ্রয়ে লোকটির মুখোমুখি হয়ে আক্ষরিক অর্থেই কাঁদো কাঁদো গলায় মিনমিনিয়ে বললেন, ‘জনাব, আমার অপরাধটা কি সেটা দয়া করে বলবেন?’

‘ভড়ং’। জনান্তিকে খেঁকিয়ে ওঠেন লোকটি। যেন মন্ত্রীর ভালোমানুষী মার্কা ভদ্রতার মুখোশটি এখনই টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন।

মন্ত্রীও কম ঘাঁগু মাল নন। বিনয়ে বিগলিত ঢঙে উত্তরের জন্য কাতর হয়ে আছেন। পরিবেশের সঙ্গে স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে পারার জন্যই রাজনীতির নালা-নর্দমা থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত উঠে এসেছেন তিনি। তিনি জানেন, এমন অবস্থায় উত্তেজনা বা শক্তি নয়; কৌশল, ধৈর্য্য, ছলাকলা জরুরি। পিএ-র দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ চাহনি দিয়ে বললেন, ‘লিলি! উনাকে চা-নাস্তা দিতে বলো। চা খেতে খেতে উনার মূল্যবান কথা শুনব এখন।’ এক ঝটকায় সমঝদার পিএ ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে যেতে উটকো ভিজিটরদের টেনে নিয়ে গেল। ঘটনার সাক্ষী-সাবুদের অস্তিত্ব রইল না। ঘরে এখন মন্ত্রী আর লোকটি ছাড়া কেউ নেই। বিরাট টেবিলের দুই প্রান্তে সামনা-সামনি দুইজন।

মন্ত্রী মহোদয় বুঝলেন, ভয়হীন, অস্বাভাবিক, লাভ-লোভ-লোকসানের পরোয়াহীন, উত্তেজিত লোকটিকে ক্ষমতার দাপট, দম্ভ বা ত্রাসে বশ করা অসম্ভব। বিনয় ও মধুর সুবচনই ভরসা। লোকটিকে একাকী পেয়ে চিঁড়ে ভেজানো কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘জনাব, আপনার বক্তব্য পেশ করুন। একদম নির্ভয়ে বলুন। আমার ঘোরতর শত্রু ও সমালোচকরাও বলে থাকে, আমি অহিংসার রাজনীতি করি। শত্রুকে শ্রদ্ধা করি। সম্মান, নিরাপত্তা ও মূল্য দিই। আপনি নিঃসঙ্কোচে আপনার কথা বলুন।’

‘অহিংসা...’ গালাগালের মতো লোকটির গলা থেকে বের হয়ে মন্ত্রীর দিকে চলে এলো শব্দটি।

‘জ্বি, শুদ্ধ অহিংসাই,’ মন্ত্রী দমলেন না, ‘আমি প্রমাণ দিতে পারি।’

‘প্রমাণ!’ একদলা ঘৃণা ছড়ালো লোকটির মুখ দিয়ে।

মন্ত্রী হাসলেন। অতি বিনয়ের কপট হাসি। ড্রয়ার থেকে একটি বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা হাতে নিয়ে বললেন, ‘নিজের মুখে বলতে লজ্জা করছে। মিডিয়া কি ছাপিয়েছে দেখুন...’

মন্ত্রীর কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটি তাচ্ছিল্যে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়লেন, ‘তুচ্ছ প্রশংসা!’ তারপর খানিক ভেবে জানতে চাইলেন, ‘কি ছাপিয়েছে পোঁ ধরা স্তাবকরা?’

বরশিতে বড় মাছ ধরা পড়লেও শিকারি এত খুশি হয় না। মন্ত্রী ডগমগিয়ে পাঠ করেন, ‘গান্ধীবাদীরা নন, জৈনরাও নন, প্রকৃত অহিংসাবাদী নাকি আমি। কারণ, সাংবাদিকরা সরেজমিনে তদন্ত করে জেনেছেন, আমি ফল পর্যন্ত ভক্ষণ করতে ভয় পাই ফলবাসী কীটপতঙ্গের অনিষ্টকরণের আশঙ্কায়। বিনা প্রয়োজনে ফুলও তুলি না, তৃণও কাটি না...’

‘অসহ্য!’ মন্ত্রীকে থামতেই হল লোকটির হুঙ্কারে। থামলেও ভড়কে যাওয়া ও চুপ থাকা মন্ত্রীদের স্বভাব ধর্ম বিরুদ্ধ, ‘কেন অসহ্য জনাব? আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে না?’

‘মোটেই না।’

‘কারণ জানতে পারি, জনাব?’

‘কারণ আপনি নিজে এবং আপনার চরিত্র।’

মন্ত্রী টিস্যু পেপারে কপালের মাইক্রো ঘাম মুছলেন। ভাবলেন, এই লোক তো মারাত্মক চিজ। এত সাহস পাচ্ছে কিভাবে? গোপন কোনো বিষয় জেনে এসেছে নাকি! একে সাবধানে খেলতে হবে। চটানো চলবে না। ভেতরের সঙ্কট ঢেকে মন্ত্রী বাধ্য ছাত্রের মতো প্রশ্ন করেন, ‘আমি? আমি কেন জনাব? আমি কি করেছি?’

দ্বিধাহীন চিত্তে লোকটি বলেন, ‘আপনি মানুষের চক্ষুশূল হয়েছেন। সবাইকে উত্যক্ত করছেন। রাজনীতি করতে এসে আপনি রাজনীতির বিরাট ক্ষতিই করছেন। কারণ আপনি একজন রোমান্টিক লুটেরা। আপনার মানবিকতা ও নৈতিকতা শোচনীয়ভাবে স্বল্প।’

জীবনে এত নিরাপদ কমই বোধ করেছেন মন্ত্রী মহোদয়। যাক! বাঁচা গেল। এই লোক তাত্ত্বিক সমালোচক। তথ্যভিত্তিক সমালোচনার অস্ত্র ও উপাদান লোকটির হাতে নেই। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তাই বুঝি?’ হাসির সঙ্গে কিঞ্চিত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মাখিয়ে বললেন, ‘এজন্য আমাকে বাঁদর বলেছেন?’

হাসি বা ঠাট্টা উড়িয়ে দিয়ে লোকটি ভরাট গলায় বললেন, ‘না। এ কারণে আপনাকে মুর্খ বলা সঙ্গত ছিল। কিন্তু আপনি বাঁদর, এইজন্য যে, প্রেম ও রোমান্টিক লুটতরাজের পার্থক্য বোঝেন না।’

কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীর কম্পিত হাত টেবিলে টিস্যু পেপারের বক্স খুঁজতে লাগল। কপালের ঘামগুলো এখন আর মাইক্রো নেই, ম্যাক্রো হয়ে গেছে। বিধ্বস্তভাবে পানির গ্লাস টেনে নিলেন তিনি। লোকটির এই কথায় বুকে মরুভূমির পিপাসা এলো কেন? মন্ত্রী নিজেকেই আনমনে প্রশ্ন করেন, কে এই লোক? কোন ব্যাপারে ইঙ্গিত করছেন লোকটি?

ঘোরলাগা বিভ্রমের মধ্যে আত্মচিন্তামগ্ন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় লোকটির চলে যাওয়া টের পেলেন না।





ধাতস্থ হয়ে মন্ত্রী দেখলেন, রুম ফাঁকা, লোকটি নেই। তিনি ঘরের মধ্যে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি এবং অসীম শূন্যতা ছাড়া আর কিছু এখন এখানে নেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। টেবিলের আরেক প্রান্তে যে চেয়ারে লোকটি বসে ছিলেন, সেখানে গিয়ে দেখলেন, শূন্য। চেয়ারের রেকসিনে উবু হয়ে বসা লোকটির দুই পায়ের আবছা চিহ্ন। কিছুক্ষণ আগেও লোকটি ওখানে বিশেষ ভঙিতে বসে ছিলেন। চেয়ারের উপরিভাগের কুশনে লোকটির পায়ের পরিস্ফূট জলছাপ।

মন্ত্রী কিছুতেই বুঝতে পারলেন না, লোকটি কখন গেলেন? এত নিঃশব্দে কেউ কি করে যেতে পারে? জাগতিক জীব মন্ত্রী বাহাদুর; অতএব আধিভৌতিকতায় বিশ্বাস করেন না। তবু তার রোমকূপ বেয়ে ভয়ের একটি স্রোত বয়ে গেল। ভয়টি অস্পষ্ট। ভয়ের কারণ লোকটির চলে যাওয়ায় নাকি লোকটির আসায় সৃষ্টি হয়েছে, সেটা ঠিক ঠিক শনাক্ত করতে পারলেন না তিনি। নিজের চেয়ারে ফিরে এসে তিনি ত্রস্ত হাতে টেলিফোন তুললেন, ‘লিলি! লোকটি কোথায়?’

‘চলে গেছেন, স্যার!’

‘আর য়্যূ শিওর?’

‘অফকোর্স স্যার! আমার চোখের সামনে দিয়ে তিনি গেছেন।’

‘লোকটি কে, কিছু জানো?’

‘নো স্যার। এই অফিসের কেউই তাকে আগে কোনোদিন দেখেনি।’

‘ওকে। আমি আজকে এখনই বের হবো। জরুরি কিছু থাকলে কালকের জন্য রেখে দাও।’

ফোন রেখে মন্ত্রী মহোদয় আরেক গ্লাস পানি খেলেন। তার বুক এই লোকটির সঙ্গে আলাপের পর থেকে মরুভূমি মরুভূমি লাগছে কেন! ঘড়ি দেখলেন তিনি। তিনটা পয়তাল্লিশ। মোবাইল হাতে নিয়ে বাসায় রিং করলেন। রিং হচ্ছে। কেউ ধরছে না কেন? তিনি লক্ষ্য করলেন, সামান্য ব্যাপারেই ধৈর্য্য হারাচ্ছেন। এমনটি তার স্বভাব নয়। তিনি অনেক দিন পর নিজের ব্যাপারে চিন্তিত হলেন। এমন তো হওয়ার কথা নয়? নানা রকমের টেনশন আর ক্রাইসিস টানতে টানতে তিনি পোক্ত হয়ে গেছেন। তার এ রকম এলোমেলো অবস্থা কেন?

‘হ্যালো!’

বেগম সাহেবার ঘুম জড়ানো গলা শুনে চিন্তায় ছেদ পড়ল। আহ! মন্ত্রীর বৌ! খাও আর ঘুমাও। তোমার চিন্তা কি!

‘কি করছ ডার্লিং?’

প্রশ্নটি করেই নিজেকে ন্যাকা ন্যাকা মনে হল।

‘কি বলতে চাও, বলো। আলগা ঢঙ করছ কেন?’

বৌ-এর হাতে ধরা পরা চলবে না। সর্তক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন মন্ত্রী মহোদয়—

‘ঢঙ বলছ কেন?

পাত্তা পাওয়ার কোনো সুযোগ দিলেন না বেগম সাহেবা—

‘ঢঙকে ঢঙ বলব না তো কি বলব?’

‘আমি তোমাকে মিস করছি।’

বেগমের ঘুম-গলা কেটে গেল। ঝরঝরে গলায় বললেন—

‘আমার চেয়ে ভালো তোমাকে কেউ চেনে না। ধাপ্পাবাজি রেখে বলো ফোন করেছ কেন?’

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বুঝলেন, স্ত্রীকে তেলানোর কাজে এখন সুবিধা হবে না। এবং তিনি আরও যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আন্দাজ করতে পারলেন, সেটা হল, এই গবেট ভদ্রমহিলা লোকটিকে তার কাছে পাঠায়নি। পাঠালে প্রতিক্রিয়া জানতে আগ্রহী হত এবং নানা প্রশ্ন ও ইঙ্গিতে এতক্ষণে বুঝিয়ে দিত। কিছুটা নিশ্চিত হওয়া গেল বটে। কিন্তু লোকটিকে পাঠালো কে? মূল সমস্যার সমাধান তো এখনও হল না।

‘চুপ মেরে আছ কেন? কি জন্য ফোন করেছ, সেটা বলো?’

বেগমের তাড়ায় চিন্তা করার জো নেই। কাজের কথা বলে ফেলাই ভালো। মনে মনে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করলেন না মন্ত্রী মহোদয়। বেশ শান্ত গলায় জানালেন—

‘আমাকে জরুরি ট্যুরে ঢাকার বাইরে যেতে হচ্ছে। আজ রাতে না-ও ফিরতে পারি।’

‘ও আচ্ছা।’ যেন কিছুই হয়নি, এমন ভাব করলেন বেগম।

মনে মনে খেপে খেলেন মন্ত্রী মহোদয়, স্বামী বাইরে যাচ্ছে, রাতে ফিরবে না আর এই মহিলার কোনো বিকারই নেই। তিনি ফোন রাখার আগে বেগমের গলা শুনতে পেলেন—

‘না জানালেও পারতে। আমার কাছে এটা কোনো জরুরি সংবাদ নয়।’

আর ফোন রাখা হল না। এই মহিলার সাইকিটা জানা দরকার। মন্ত্রী মহোদয় পাল্টা প্রশ্ন করলেন—

‘জরুরি নয় কেন?’

‘কেন নয়, সেটা ব্যাখ্যা করতে সময় লাগবে’, বেগম স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘তুমি মাননীয় মন্ত্রী, অতএব ব্যস্ত। আমার ব্যাখ্যা শোনার সময় তোমার হবে না। আমারও এসব কথা বলার প্রবৃত্তি হয় না। শুধু শুধু কথা বাড়ানোর কি দরকার!’

মন্ত্রী ঘাবড়ে গেলেন। একটি অদ্ভুত লোকের অস্বাভাবিক আগমন, স্ত্রীর মনের মধ্যে তাকে নিয়ে গোপন বিশ্লেষণ, বিচলিত হওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুত্বর্পূণ কারণ বটে। তিনি দেরি না করে বলেন—

‘আমার সময় আছে, তুমি বলো।’

শোনতে না-পারার মতো একটি হাসির সঙ্গে বেগমের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে—

‘প্রথম প্রথম তুমি প্রায়ই ট্যুরে যেতে এবং দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতে। আমি স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে করেছি সব কিছু। পরে আমার সন্দেহ হল। শেষ দিকে আমার বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হয় তখনই, যখন তুমি ট্যুরে যাওয়ার আগে ও পরে খাবার টেবিলে বসে রাজনীতির নানা জটিল বিষয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলে। আমি নিঃসন্দেহ হলাম, তোমার ট্যুরের পেছনে অন্য মতলব আছে। কারণ, সত্যি সত্যি ট্যুরের ব্যাপার হলে তা নিয়ে খাবার টেবিলে এত কথা বলতে না, অফিসেই সেসব সেরে আসতে। আর দীর্ঘক্ষণ ধরে তো বলতেই না এবং সেটা শোনার জন্য আমাকে এত জোরও দিতে না।’

মন্ত্রীর গলা শুকিয়ে গেল। তিনি যে এখনও মানুষই চিনতে পারেননি। ‘গবেট’ বলে যে স্ত্রীকে জানতেন, সে তো মহাগবেষক। আরও কি কি জেনে বা ভেবে বসে আছে এ মহিলা, আঁচ করার জন্য মন্ত্রী উৎকর্ণ।

মন্ত্রীর নীরবতা ভেঙে বেগম বললেন—

‘শোন, তোমাকে আমি একটি কথা বলি। সেপিয়া নামের এক ধরনের জলজ জীব আছে। তারা আক্রান্ত হলে নিজের শরীর থেকে কালি ছিটিয়ে নিজের গতিবিধি গোপন রাখার চেষ্টা করে। তুমিও সে রকম ট্যুরের দোহাই দিয়ে কালির মেঘ সৃষ্টি করে নিজের গতিবিধি গোপন রাখার চেষ্টা চালাচ্ছো। আমি বহুবার দেখেছি, তুমি ট্যুরের কথা বলে ঢাকাতেই বিশেষ কোথাও থেকে গেছ। তোমাকে আমি ভালো ভাবেই চিনি।’

বেগমের কণ্ঠে ঝাঁঝ টের পেয়ে তর্কে গেলেন না কৌশলী মন্ত্রী মহোদয়। ঝগড়ার চেয়ে বৌ তাকে নিয়ে কি সব চিন্তা-ভাবনা করে, আপাতত সেটা জানাই জরুরি। বেশ নরম গলায় তিনি জানতে চান—

‘আমাকে চেন বলতে তুমি আর কি বুঝাতে চাচ্ছো?’

কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না বেগম সাহেবা। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—

‘শুধু এতটুকু বলে রাখি, তোমার শরীরের সবগুলো গোপন দাগ আমার জানা।’

‘তুমি খুব অশ্লীল উদাহরণ দিলে। অ্যাই অ্যাম সরি।’

‘অশ্লীল না, বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড প্র্যাকটিক্যালি কারেক্ট উদাহরণ দিলাম।’

একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় ফোন রাখার আগে কোনো রকমে শুধু বলতে পারলেন, ‘বাই!’

লোকটি চলে যাওয়ার পর যে বিভ্রম ও বিহ্বলতা তাকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটা স্ত্রী সঙ্গে ফোনালাপ শেষে এখন আরও সুতীব্রভাবে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। একই দিন তিনি দ্বিতীয় বার আহত ও আক্রান্ত বোধ করলেন। তিনি ক্ষুণ্ন ও তাড়িত হচ্ছেন কিন্তু সেটা বলতে পারছেন না। বলবেন কি? প্রপঞ্চের কারণটিই তিনি ঠিক ঠিক ধরতে পারছেন না। ছায়াবাহী প্রতিপক্ষ তাকে ঘিরে ফেলেছে।

‘মেন হ্যাভ হ্যাড এভরি অ্যাডভান্টেজ অব আস ইন টেলিং দেয়ার ওন স্টোরি’, তিনি কার কাছে সঙ্কটের গল্প বলবেন?

দুইশ বছর আগে জেন অস্টেনের পারসুয়েশন উপন্যাসে ব্যক্ত বনেদি কথাটি মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে এইবেলা পুরোপুরি মিথ্যা মনে হচ্ছে।




সোয়া চারটা নাগাদ মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় অফিস থেকে বের হয়ে পাঁচটা পনেরো মিনিটে মীরপুর ডিওএইচএস-এ পৌঁছেছেন। তিনি তার পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে আসেননি। অফিসের একটি সাধারণ গাড়িতে করে এসেছেন। তিরিশ নম্বর রোডের মুখে তিনি একজনকে ফোন করে বললেন, ‘আমি আসছি।’

‘আচ্ছা,’ বলেই ও পাশ থেকে ফোন কেটে দেওয়া হল।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বিমূঢ় হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আরও কিছু কথা বলবেন কিনা, সেটা পরোয়া না করেই ফোন রেখে দেওয়াটা চরম অপমানকর। দিনের তৃতীয় অপমানটি হজম করে তিনি একটি অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের গাড়ি বারান্দায় নামলেন। স্টাফরা কিছুই বলল না। সেলাম দিয়ে মন্ত্রী মহোদয়কে লিফটে পৌঁছে দিলেন। এখানে তার আগমন খুবই স্বাভাবিক এবং তিনি যে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, সেটা স্পষ্ট। পাঁচ তলায় লিফট থেকে নেমে তিনি একটি ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে ডাকলেন, ‘অর্পিতা! অর্পিতা।’

‘আমি এখানে।’ বারান্দা থেকে একটি নারীর কিন্নর কণ্ঠ ভেসে এলো।

চমৎকার স্নোসিমের পেইন্ট করা ঝুলবারান্দায় আর্মচেয়ারে গা এলিয়ে চা খাচ্ছেন অর্পিতা। তাকে দেখে বিলক্ষণ টের পাওয়া যায় যে, তার মাথা থেকে সর্বাঙ্গ বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে যাচ্ছে সুখ। আবেশে দুই চোখ তার আধবোজা। শরীর ও পোষাকে স্নিগ্ধ, ঝরঝরে ভাব।

‘এসো! এখানে আমার পাশে বসো,’ মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের দিকে মনোযোগী হতে হতে অর্পিতা প্রশ্ন করেন, ‘আজকে অসময়ে চলে এলে?’

‘তোমার কাছে সময়-অসময় কি?’ বলতে বলতে তিনি বিধ্বস্ত মানুষের মতো অর্পিতার পাশে বসেন।

অর্পিতা এবার মনোযোগীর বদলে সতর্ক হলেন। মধ্য বয়েসী, জীবনযুদ্ধজয়ী, মারকুটে মন্ত্রী এত ধ্বস্ত কেন? আনমনে তার ঠোঁটে চলে আসে, ‘এনিথিং রং, কি হয়েছে তোমার?’

ম্লান ও বিষণœভাবে হাসেন ক্ষমতাধর মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, ‘না, তেমন কিছু না,’ তারপর জানতে চান, ‘বাবু কোথায়?’

‘স্কুল থেকে এসেই প্রাইভেটে চলে গেছে? ছেলেটির পড়াশোনার চাপ বাড়ছে।’

‘ও, আচ্ছা।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকেও এক কাপ চা দাও।’

গ্রিক পৌরাণিক অপ্সরীর অপরূপ দেহবল্লরী নিয়ে অর্পিতা উঠে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের প্রবল ইচ্ছা হল, সব যাতনা ভুলে অর্পিতার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যেতে। তিনি টের পেলেন, তার ক্লান্ত শরীর ও আহত মন একটি অচেনা তৃপ্তির সন্ধান করছে। ঠিক তখনই তার ভেতরে সদ্য সৃজিত মরুভূমিটি বৃষ্টি বৃষ্টি বলে জেগে ওঠল। তিনি বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে বারান্দা থেকে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। তার বড় আশা, যদি একটু বৃষ্টির গন্ধ পাওয়া যায়!

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বা অর্পিতা, কেউই দেখতে পেলেন না, সন্ধ্যা আকাশের সুগোল চাঁদটা ঢেকে গেল এক-টুকরা কালো মেঘে। তারপর ক্রমশ ধূসর একটা চাদর বিছিয়ে পড়ল আকাশের গায়ে। সেই ধূসরতা একটু-একটু করে ঘন-কালো হয়ে উঠল। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় জানতেও পারলেন না, তার দৃষ্টির পেছনে দূর আকাশে পুঞ্জিভূত চাঁদ-ঢাকা-মেঘ বৃষ্টির বদলে শুধুই আঁধার এনে দিয়েছে।

রান্নাঘরে নিঃশব্দ-আগন্তুকের অস্তিত্ব ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে টের পেয়ে পেছন ফিরে অর্পিতা দেখলেন, কিছুক্ষণ আগেও জ্বলতে থাকা ঘরের সবগুলো আলো এখন নিভানো। দরজার ছায়ায় একটি হাত রান্নাঘরের সুইচবোর্ড খুঁজছে। এই আলোটিও নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্পিতা ঘরের অন্ধকারের মধ্যেই নিঃশব্দে হাসলেন।

দুর্ভেদ্য পাথরের মূর্তি ছাড়া এমন নৈঃশব্দমাখা দুর্বোধ্য হাসি সম্ভবত আর কেউ হাসতে পারে না।





বিছানায় পাশ ফিরতে ফিরতে অর্পিতা আলতো গলায় বললেন, ‘তোমার মনে হয় হয়ে গেছে...’

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় কোনো উত্তর দিলেন না। অর্পিতার আঙুলগুলো হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে রাখলেন। অর্পিতা বিছানা থেকে নামতে চেষ্টা করেও পারছেন না। কপট বিরক্তিতে বলেন, ‘অ্যাই! কি হচ্ছে? এবার ছাড়ো। এখনই বাবু চলে আসবে।’

‘আসুক’, মন্ত্রী ভ্রুক্ষেপহীন।

‘আসুক মানে!’ এবার সত্যি সত্যি খেপে গিয়ে ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে অর্পিতা খাট থেকে নেমে দাঁড়ান।

‘বসো, বসো,’ মন্ত্রী মহোদয় শান্ত কণ্ঠে অর্পিতাকে বলেন, ‘তোমার সাথে জরুরি কথা আছে। একটু বসো।’

‘জরুরি কথা’, স্বাভাবিক স্বর বদলে গিয়ে শ্লেষ মেশানো গলা এখন অর্পিতার, ‘আমার সাথে তোমার জরুরি কাজ আছে জানি। সে কাজ এখনই হয়েও গেছে। জরুরি কাজের পর জরুরি কথা তো কোনোদিন আসেনি, আজকে কি হল?’

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে এবার সত্যিকারের অসহায় মনে হচ্ছে অর্পিতার কাছে। অর্পিতা আগেই টের পেয়েছে, মন্ত্রী আজকে বেশি সময় নিতে পারেননি। এখন আবার বলছেন জরুরি কথা। দেশ-জাতি রসাতলে চলে যাওয়াও যার কাছে জরুরি নয়, তার মুখে ‘জরুরি’ শব্দটি শুনে অর্পিতা মনে মনে ভাবলেন, ‘ঘটনা কি? মন্ত্রী কি এমন জরুরি কথা তার কাছে বলতে চায়?’ শোনার জন্য অর্পিতা চুপ করে থাকেন।

খানিক ভেবে খুবই স্পষ্ট ও স্বাভাবিক গলায় মন্ত্রী সরাসরি অর্পিতার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি আমার কাছে কাউকে পাঠিয়েছিলে?’

প্রশ্নের ধরনে অবাক অর্পিতা। উত্তর দিতে পারেন না। অর্পিতার নীরবতা দেখে মন্ত্রী আরও চেপে ধরেন, ‘উত্তর দিচ্ছ না কেন? বলো?’

‘কি বলব?’ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে অর্পিতা বলেন।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আবার জানতে চান, ‘কাকে পাঠিয়েছিলে?’

‘কাউকেই নয়’, ‘রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন অর্পিতা, ‘আমার জন্য তুমি এমন কাউকে রাখোনি, যাকে কোথাও পাঠানো যায়।’

‘মানে কি? কি বলতে চাচ্ছ?’ মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর এবার বিস্ময়ভরা।

কালবিলম্ব না করেই অর্পিতা বলেন, ‘তোমার সাথে জঘন্য জীবনযাপন করার পর কেউ আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, ভাবো কিভাবে তুমি!’

‘জঘন্য জীবনযাপন?’ মন্ত্রী আর স্বাভাবিক নেই, খানিক ক্ষিপ্ত, ‘কি দিইনি আমি তোমাকে?’

অদ্ভুত অবজ্ঞার হাসি মেখে অর্পিতা বলেন, ‘অনেক কিছু দিয়েছ। চাকরি, অ্যাপার্টমেন্ট, টাকা এবং মাঝে মাঝে তোমার নিজের প্রয়োজন ও চাহিদা মতো খানিক শারীরিক সুখ। তারপরেও তুমি আমাকে কিছুই দাওনি। বাবুকে পর্যন্ত তুমি বাধ্য করেছ তোমাকে আঙ্কেল বলে ডাকতে। তুমি একটি কাপুরুষ। কাপুরুষের কাছে কাউকে পাঠাতে হয় না। আমি কাউকে পাঠাইনি।’

কথাগুলো বলে অর্পিতা মুহূর্ত মাত্র দাঁড়ালেন না। এক ছুটে বারান্দার অন্ধকারে এসে হু হু কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার মনে হচ্ছে ইতিমধ্যেই বড় দেরি হয়ে গেছে। বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে, যতটা সম্ভব নিজের মুখখানা অন্ধকারে ভাসিয়ে দিলেন আটত্রিশ বছরের জ্বলন্ত চিতাস্তম্ভের মতো অর্পিতা। কতক্ষণ পর মনে নেই, একটা বড় নিঃশ্বাস নিজের অজান্তে বেরিয়ে এলো তার চাপ-চাপ কষ্টময় বুক থেকে। বারান্দায় দাঁড়িয়েই বাইরের পৃথিবীটাকে দেখতে দেখতে অর্পিতা নিজের দিকে নিজেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘ফাঁসির আসামি শেষ ইচ্ছা পূরণের সময়ে কী বলে?’

অন্ধকারের মধ্যেই অর্পিতার হঠাৎ মনে হল, নিজের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তরটি তার অজানা।





‘লোকটি কে?’ মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় উত্তর জেনে যাওয়ার বদলে একটি ধাঁধার মতো প্রশ্ন অর্পিতার উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছেন, ‘লোকটি কে?’

অর্পিতা ভেবে আকুল। কে হতে পারেন? কে যেতে পারেন মন্ত্রীর কাছে এবং মন্ত্রীর মতো ঘোড়েল মালকেও কিঞ্চিত ভীত ও যথেষ্ট চিন্তিত করে তুলতে পারেন? কে? লোকটি কে?

ঠিক তখনই কোথাও, কোন সুদূরে অসংখ্য কণ্ঠ যেন আকাশ-পৃথিবী কাঁপিয়ে বুকফাটা আর্তনাদে বলে উঠল, ‘কে?’ ‘কে?’

ভাবনাজালে আত্মমগ্ন অর্পিতাকে সামান্য উত্তেজিত দেখাচ্ছে। তিনি বেশ সময় নিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেললেন কয়েকটা। তারপর নিজেকে শান্ত করে আনমনে গুনগুনিয়ে গাইলেন, ‘দিবস ও রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি...।’ মন যখন উতলা হয়ে থাকে, কিছুতেই কিছু ভালো লাগে না, এই জীবন, এই যাপিত দিনক্ষণ তুচ্ছ মনে হয়, তখন প্রিয় বারান্দায় বসে একেকটা গান তাকে খানিকের জন্য অন্য আরেক জগতে আচ্ছন্ন করে রাখে। আজকেও আচ্ছন্নতায় তন্দ্রালু একটা ভাব চলে এসেছিল, সেটা কেটে গেল বাবুর ডাকে, ‘মা, তোমার মোবাইল বাজছে!’

দৌড়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে মোবাইল ধরেন অর্পিতা, ‘হ্যালো!’

ওপাশে নীরবতা, কেউ কথা বলছে না।

‘হ্যালো’, অর্পিতা দ্বিতীয় বার বলতে বলতে ফোনের লাইন কেটে দেওয়ার পোঁ পোঁ শব্দ শোনা গেল।

নিজেকে এবং বাবুকে শুনিয়ে শুনিয়ে অর্পিতা বলেন, ‘কেউ তো কথা বলল না!’

পড়ার টেবিল থেকে মুখ তুলে বাবু বলল, ‘বাহ! বেশ মজা তো মা! কথা-না-বলা লোক আরেকটি পাওয়া গেল।’

চমকে উঠেন অর্পিতা। বাবু কি বলতে চাচ্ছে? দশও হয়নি ছেলেটির বয়স, অথচ কথাবার্তায় যথেষ্ট চৌকস। নিজের ছেলে বলে নয়, প্রশংসা পাওয়ার যথেষ্ট গুণ এই অভাগা ছেলেটির আছে। ‘কথা-না-বলা লোক’ বলতে কি বোঝাতে চাচ্ছে বাবু?

অর্পিতা ছেলের দিকে মনোযোগী হন। বাবুর কাছে এগিয়ে গিয়ে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে হেসে বলেন, ‘কথা-না-বলা লোক তোমারও আছে নাকি?’

বাবু মিটি মিটি হাসে, ‘হু, আছে একজন। প্রায়ই স্কুল ছুটির পর আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। লম্বা একজন মানুষ। পায়জামা-পাঞ্জাবি শরীরে হঠাৎ আসেন আবার হঠাৎ চলে যান।‘

‘ও মা! তাই নাকি!’ অর্পিতা চোখে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে নিজের সুপ্ত আগ্রহ লুকিয়ে রেখে পুরো ব্যাপারটি জেনে নিতে চেষ্টা করেন, ‘শুধুই আসে? কোনো কথা বলেন না?’

‘হু’, খানিক ভেবে বাবু বলে, ‘প্রথম প্রথম একটি প্রশ্ন করতেন, এখন দেখা হলেও কোনো কথা বলেন না। চেয়ে থাকেন শুধু।’

অর্পিতার ভেতরে অস্থিরতা টগবগ করছে, ‘প্রথম প্রথম কি প্রশ্ন করতেন?’

‘তিনি বলতেন’, বাবু বড়দের মতো ভঙ্গিতে বলে, ‘তুমি অর্পিতার ছেলে?’

বুকটা ধক করে উঠে অর্পিতার। কে এই লোক? নিমেষে নিজেকে সামলে ছেলের কাছে জানতে চান, ‘প্রশ্ন শুনে তুমি কি বলতে?’

‘আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতাম। লোকটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে চলে যাওয়ার সময় বলতেন, মায়ের কথা খুব শুনবে আর ভালো থাকবে।’

‘ও, আচ্ছা’, বলেই অর্পিতা আলগোছে সরে আসেন। বারান্দায় এসে ধপ করে আর্ম চেয়ারে বসে পড়েন। অর্পিতার মনে হচ্ছে, এবার সবকিছু ভেঙে পড়বে। স্নায়ুগুলো আর কাজ করতে চাইছে না। শরীর সহনশীলতার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে গেছে, মনও। মনে হচ্ছে সব গুলিয়ে যাবে। চোখের কোণ বেয়ে একটা গরম ধারা নেমে আসছে, টের পান অর্পিতা। জীবনের এই তাপিত সঙ্কুলে গান নয়, বিস্মরণের কবিতা চারপাশে ভাসতে থাকে:

‘ধানের খেতের গন্ধ মুছে গেছে কবে

জীবনের থেকে যেন; প্রান্তরের মতন নীরবে

বিচ্ছিন্ন খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে ঘুম পায় তার

বিক্ষত খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে, বুকে নিয়ে, ঘুম পায় তার

ঘুম পায় তার।’

পাঁজরে দু’-একবার মৃদু হিক্কার মতো কাঁপুনি নিয়ে কান্নারা বন্য হয়ে ওঠায় অর্পিতা টলতে টলতে নিজের শোবার ঘরে চলে আসেন। আলো নিভিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিছানায়। নিঃশব্দ কান্নার বেগটাকে দমন করতে না পেরে শক্ত হাতে বালিশটাকে বুকে চেপে ধরে নিশ্চল ভঙ্গিতে চুপচাপ শুয়ে থাকেন অর্পিতা। প্রাণপণে ঘুমের মধ্যে ডুব দিয়ে হারানো স্বপ্ন খুঁজতে চাইছে তার বিরহী হৃদয়। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, ‘তাহলে তুমি!’ ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে স্বপ্নযাত্রায় অর্পিতা বিড়বিড় করেন, ‘ভালো থাকার কথা তোমার মতো আর কেউ তো বলতে পারবে না, জানটুস!’





উৎসুক চোখে রিকসায় বসে অর্পিতা দেখলেন, লালমাটিয়ার টপোগ্রাফি এখন আর চেনাই যাচ্ছে না। সাজানো একতলা-দুতলা বাড়িগুলোর জায়গা কেড়ে নিয়েছে স্কাইরাইজরা। সাউন্ডস্কেপও বদলে গেছে। চারদিকে দালান বানানোর যান্ত্রিক ও শ্রমিক আওয়াজের মচ্ছব। আধো গ্রামের চেহারাটা একেবারেই বিলীন। ছায়াঢাকা লালমাটিয়া আর নেই। সুনশান নীরবতাও উধাও।

কি ভেবে রিকসা ছেড়ে দিলেন অর্পিতা। বহুবছর পর ঠিক জায়গাটা খুঁজে বের করতে হলে হাঁটতে হবে। বাসার হোল্ডিং নম্বরও এত দিনে মনে থাকার কথা নয়। স্মৃতিতে আবছা ভাসছে আড়ং-এর পিছনে পানির ট্যাঙ্কের পাশের গলিটা। গলির শেষে কামিনী গাছের লাগোয়া একটি দোতলা। দেয়ালে হলুদ আর ক্রিমের মেশানো রঙ।

অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা লালমাটিয়া চলে এসেছেন অর্পিতা। কেন যাবেন, কি বলবেন, সে ব্যাপারে ভালো রকমের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারেননি। মনের মধ্যে একটা আহত আবেগের ডানা ঝটপটানি তার সঙ্গী। না, কোনো অন্ধকার রাস্তায় আর হাঁটবেন না অর্পিতা। সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়। তিনি ত্যাগের জন্য তৈরি।

হঠাৎ তার মনে হল, আরে, যে বাড়িটি খুঁজছেন, সে বাড়ি থেকে দুই হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ভালো করে তাকিয়ে বিস্ময়াভিভূত অর্পিতা, একি! এ-তো বাড়ির কঙ্কাল। দরজা-জানালাগুলো ফাঁকা চতুর্ভূজের মতো হা হা করছে। রেক্টঙ্গল। ছাদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ধূসর বর্ণের ধুলোয় দণ্ডায়মান কোণের কামিনী গাছটি।

‘দাঁড়ান’, গেট পেরিয়ে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে পাহারাদার গোছের একজনের গলা শুনতে পেলেন অর্পিতা, ‘কোথায় যাচ্ছেন? এখানে তো কেউ থাকে না!’

অর্পিতা দাঁড়িয়ে গেছেন। লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা হায়দার সাহেবের বাড়ি না?’

‘জ্বি’, লোকটি ততক্ষণে অর্পিতার সামনাসামনি, ‘কিন্তু তারা তো এখানে থাকেন না।’

‘কোথায় থাকেন?’

‘আমি জানি না’, লোকটি হাত উঁচিয়ে বলে, ‘ওখানে সাইট ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আছেন, তিনি বলতে পারবেন।’

‘তার সাথে বলা বলা যাবে?’ অর্পিতার কণ্ঠে আকুতি।

‘আপনি অপেক্ষা করুন, আমি স্যারকে খবর দিচ্ছি’, বলেই অর্পিতার কথায় দয়ার্ত পাহারাদার ভেতরে চলে গেল।

অল্পক্ষণেই আবার ফিরেও এলো। সঙ্গে এক তরুণ। সম্ভবত সাইট ইঞ্জিনিয়ার। সদ্য পাস করে এটাই যে তার প্রথম চাকরি বোঝা যায়। তরুণটি ঠিক বিব্রত না হলেও অপ্রস্তুত। রবাহুত একজন মহিলার এইবেলা সাইটে চলে আসার কারণটি তার কাছে অজ্ঞাত; ফলে অর্পিতাকে তার কাছে রহস্যময় মনে হচ্ছে। চোখে জোরালো বিস্ময়ের ছাপ এঁকে তরুণ প্রকৌশলী অর্পিতার সামনে এসে শশব্যস্ত কণ্ঠে জানতে চান, ‘আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’

এক টুকরো ভদ্রতার হাসিতে অর্পিতা বলেন, ‘এটা হায়দার সাহেবের বাড়ি, তাই না?’

‘হ্যাঁ! কিন্তু ওরা তো এখানে থাকেন না।’

‘কোথায় থাকেন?’

‘ঠিকানা আমার কাছে নেই। আমাদের অফিসে থাকবে। আমরা তাদের বাড়ি ডেভেলপ করছি। কোম্পানির নির্মাণ কাজ আমি দেখি। অন্য বিষয়গুলো অফিস জানে।

‘তাহলে...’ অর্পিতার গলা থেকে আশাহত ধ্বনির মতো বের হল। তিনি কি ফিরে যাবেন? নাকি অফিসের ঠিকানা নিয়ে সেখানে খোঁজখবর করবেন, ঠিক বুঝতে পারছেন না। অর্পিতা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তরুণ প্রকৌশলীর দিকে চেয়ে রইলেন। শেষ বিকেলের বিষণœ রোদ পেছনের ধুলা-ধূসরিত কামিনী গাছের পাতায় পাতায় অদ্ভুত আলোর ঝিকিমিকিতে খেলা করছে। এত শব্দ, ধুলার মধ্যেও টানটান হয়ে মাথা উচু করে পুরুষালি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাছটি। অর্পিতার মধ্যেও যেন জেদি ও দুর্দমনীয় একটি বোধ ঠাঁই নিয়েছে। অনুসন্ধানের শেষ না দেখে তিনিও মনে হচ্ছে ফিরে যাবেন না।

তরুণ প্রকৌশলীটি সম্ভবত কিছু টের পেয়ে থাকবেন। নির্বাক কিন্তু অনড় অর্পিতার কাছে মোলায়েম গলায় জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি হায়দার সাহেবদের আত্মীয়?’

‘না’, ধ্যানভাঙা গলায় অর্পিতা বললেন, ‘ঐ পরিবারের আমি একজন পরিচিত। ওদের খবর জানা আমার বিশেষ দরকার।’

এক নিমেষ ভেবে প্রকৌশলী বললেন, ‘মতিঝিলে আমাদের অফিসে গিয়ে খবর আনতে পারেন। তবে আপনি চাইলে আমি ফোনে অফিস থেকে হায়দার সাহেবদের খোঁজ নিতে চেষ্টা করতে পারি।’

লোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় অর্পিতার গলা প্রায় ভিজে এলো, ‘প্লিজ, আপনি একটু কথা বলে দেখুন। আমার খুব উপকার হবে।’

অর্পিতার অনুরোধের জন্য যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রকৌশলী। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। মিনিট পাঁচেক কথোকথনের পর তিনি অর্পিতাকে জানালেন, ‘হায়দার সাহেব কানাডায় মাইগ্রেট করেছেন।’

‘তাহলে...’ স্বরভঙ্গের মতো শোনালো অর্পিতার গলা। আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। চারদিক যেন তার ধূসর হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে যেন একে একে নিভে যাচ্ছে সব আলো। তিনি ব্যথিত দৃষ্টিতে প্রকৌশলীটির দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তরুণ প্রকৌশলীও মনে হচ্ছে ব্যথায় আক্রান্ত। তিনি সত্যি সত্যি এই ভদ্রমহিলাকে সাহায্য করতে চেয়েছেন। নীরবতা ভেঙে মুখ খোলেন তিনি, ‘আমি কি আপনার জন্য হায়দার সাহেবের কানাডার ঠিকানা জোগার করব?’

‘না’, বিড়বিড় করে বলেন অর্পিতা, ‘তার দরকার নেই।’

তরুণ প্রকৌশলী নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখেন অর্পিতাকে। তার আর বলার মতো কিছু নেই।

চলে আসার আগে অর্পিতা জিজ্ঞেস করেন, ‘হায়দার সাহেবের ছেলে সাগরের কথা কি আপনি কিছু জানেন?‘

এবারও তরুণ প্রকৌশলী নিশ্চুপ। লালমাটিয়ায় একটি বাড়ির ভাঙা-গড়ার কাজে নিয়োজিত একজন মানুষের মৌন প্রতিচ্ছবি সঙ্গী করে অর্পিতা ফিরে আসেন।





অর্পিতা ভেবে পান না, সবাই কানাডা চলে গেলে বাবুর কাছে মাঝে মাঝে কে আসে? কে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ে কাছে গিয়েছিল? কে? কে?

অর্পিতা স্থির-নিশ্চিত, সাগর কোনো অবস্থাতেই মাইগ্রেট করতে পারে না। দেশ ছেড়ে যাবার প্রশ্নই তার নেই। বিদেশি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার সে অবলীয়ায় ফিরিয়ে দিতে দিতে বলেছে, ‘বিদেশে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হতে পারব না।’

হায়দার সাহেব কখনও কখনও দেখা হলে বলতেন, ‘মা, ছেলেটিকে বোঝাও, জীবনে বিদেশি ডিগ্রি লাগে। উচ্চশিক্ষার দরকার হয়। ওসব দেশে না থাকলেও সেখানে পড়াশোনার জন্য যেতে হয়।’

সাগর কোনো কথাই পাত্তা না দিয়ে উল্টো বলেছে, ‘এদেশেরই অনেক কিছু জানা হয়নি। বিদেশে আর কি শিখব?’

বেশি চাপাচাপি করলে কাউকে কিছু না বলে সাগর উধাও হয়ে যেত। হায়দার সাহেব খোঁজ নিতে লোক পাঠান অর্পিতার কাছে। অর্পিতাও কিছু জানে না। লালমাটিয়ায় গিয়ে সাগরের উদ্বিগ্ন মায়ের সামনে বসলেও নিজেকে তার অপরাধী মনে হয়। সাগর কোথায় গেছে, তাকেও কিছুই বলে যায়নি। ভীষণ রাগ হয়। অভিমান। এসব কেমন ছেলেমানুষী? সবাইকে চিন্তায় ফেলে এ কেমন নিশ্চিন্তে অজ্ঞাত স্থানে চলে যাওয়া? অর্পিতা বিরক্ত হয়ে থাকে সাগরের ওপর।

কদিন বাদেই হৈ হৈ করে ফিরে এসে সাগর ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে মেতে থাকে। না বলে চলে যাওয়া যে অপরাধ এবং সবাই এজন্য কষ্ট পেয়েছে, দুঃচিন্তায় ভুগেছে, সে ব্যাপারে তার কোনোই মনোবেদনা নেই। বরং তার আগ্রহ ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনায়:

‘যে নদী স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমেছে, তার উৎস ছাড়িয়ে যাওয়া মানে পুরাণের জগতে এসে পৌঁছানো। শিবলিঙ্গ শৃঙ্গের পায়ের কাছে সবুজ প্রান্তর চিরে চলে যাওয়া নীল নদীর পাশে পরাবাস্তবকে প্রত্যক্ষ করে এসেছি আমি।’

সাগরের আবেগ-মথিত বিবরণ অগ্রাহ্য করা যায় না। উৎসুক্য নিয়ে তার দিকে আরও কিছু শোনার জন্য তাকাতেই হয়।

‘জানো অর্পি, পাহাড়ের বেস-ক্যাম্পে ঘুম যখন ভাঙল তখন সবে আলো ফুটেছে, কিন্তু সূর্য প্রকট হয়নি। চরাচর জুড়ে ভোর জাঁকিয়ে বসেছে। বাইরে কুয়াশার লেশমাত্র নেই। দূরে শিবলিঙ্গ ধ্যানস্থ। আর আকাশগঙ্গা ক্ষীণ হয়ে বয়ে চলেছে। ওখানেই গঙ্গা নদীর উৎপত্তি। জায়গাটির নাম গঙ্গোত্রী। চারদিকে তাকিয়ে মনে হল প্রকৃতই মহাবিশ্বের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। আকাশ এত বড় হতে পারে? বরফ থেকে এমন আলোও বেরয়? চরাচরবিস্তৃত সবুজ মাঠ, একপাশে সাদা এক শৃঙ্গ, আর নীল এক নদী। হাওয়া বেগে বইছে। সমুদ্র সমতল থেকে পনের হাজার ফুট উপরে দাঁড়িয়ে আছি মেঘের গালিচায়। ধীরে ধীরে আলো বাড়ছে। দূরে সুদর্শন, মেরু আর ভাগিরথীর গা থেকে ধোঁয়া উঠছে। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে হিমালয়ের কোলে ভোর থেকে সকাল হওয়া দেখলাম। দেখলাম ক্রমে আলো বাড়ছে। ধীর লয়ে রং পাল্টাচ্ছে পৃথিবীর। মুখ তুলে চারিদিকে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম সূর্যের আভা চুম্বন আঁকছে হিমালয়ের শরীরে। যেন এক মহাপ্রাণ জাগছে।’

কখনও সমুদ্র দেখে এসে সেন্টমার্টিনের জোছনা-প্লাবিত রাতের আবেশে অর্পিতার দু’চোখ জুড়ে সাগর স্বপ্নময় যৌথঘুম নিয়ে এসেছে। তবু প্রাত্যহিকতার নিয়মের মাঝে ফিরিয়ে আনা যায়নি সাগরকে। প্রকৃতি ও তার মাঝখানে কোনো বিঘ্নই এসে দাঁড়াতে পারেনি।

অর্পিতা প্রায়ই জানতে চেয়েছে, ‘তুমি কি আমাকেও ফেলে চলে যাবে অজানার পথে?’

‘তা কি করে সম্ভব?’ হাসতে হাসতে বলেছে সাগর, ‘তুমি তো প্রকৃতিরই অনিবার্য অংশ।’

অর্পিতার তখন মনে হয়, দিন যেভাবে রাতের শরীরে, আলো যেভাবে আঁধারের বুকে হারিয়ে যায়, সেভাবে সাগরের অতলান্তে নিজেকে মিশিয়ে দিতে।

তখন টের পাননি, এখন বুঝতে পারেন, সাগরে মিশে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে থাকে ঢেউয়ের পর ঢেউ। ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে তিনি এমন বদ্ধ-জায়গায় চলে এসেছেন, যেখান থেকে জল-কল্লোলিত সাগরের দেখা পাওয়া সম্ভব নয়।





কিছু ঘটনা এমনই মর্মান্তিক যে, এ নিয়ে কথা বলা দুষ্কর, চুপ থাকা অসম্ভব। অর্পিতার জীবনে মাননীয় মন্ত্রীর আবির্ভাব ও উপস্থিতি তেমনই আকর্ষিক ও জটিল দুর্ঘটনার মতো ব্যাপার, যা বলাও যাচ্ছিল না, না বলেও থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। অর্পিতার সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতা টের পেয়ে সাগর আবার প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যান। সে যাওয়া যে চিরদিনের জন্য, অর্পিতা ভাবতেও পারেননি। বার বার অর্পিতা অস্থির অন্বেষণ শেষে ফিরে এসেছেন সাগরের দেখা না পেয়ে এবং তার সম্পর্কে সঠিক কোনো খোঁজ না জেনেই। অতি অন্তরঙ্গ-নিকটজনেরা শুধু জানে, যে লোকটিকে অর্পিতা খুঁজছেন, সে লোকটি একদা তার প্রেমিক ছিল।

আজকাল ‘একদা’ ও ‘ছিল’ শব্দ দুটি অর্পিতার মগজের কোষে বল্লমের মতো গেঁথে থাকে। তার প্রচ- ইচ্ছে করে স্কুলের গ্রামার বইয়ের ভেতর ঢুকে টেনস নামক চ্যাপ্টারটি ছিঁড়ে ফেলতে। তার সামনে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত বা কালাকাল থাকবে না। থাকবে মহাকালের আদিঅন্তহীন বিস্তার। সেখান থেকে ফিরে-না-আসার আশায় চিরকালের জন্য হারিয়ে যেতে সাধ জাগে তার। তার একটি চোখ প্রজ্ঞা আর অন্য চোখ পারমিতা হয়ে তক্ষশিলার আচার্য পু-রিক ভরদ্বাজ এবং তার পত্নী আচার্যা স্বাতীর কন্যাদ্বয়ের মতো প্রাচীন মগধের চম্পানগরীর পথে-প্রকৃতিতে মিশে যায়। ইন্দ্রপ্রস্থ, শ্রাবস্তী, কপিলাবাস্তু, কুশীনগরের ধূসর সুমৃত্তিকায় তার দুই নয়ন যেন খুঁজতে থাকে সম্রাট বিম্বিসার জেষ্ঠ্যপুত্র অজাতশত্রুর প্রলম্বিত ছায়ায় সাগরের মুখচ্ছবি। অন্বেষণের প্রহরে প্রহরে অর্পিতা নিজেকে মৃত্যু ও জন্মের নব নব আখ্যানে দেখতে পান। এক সময় তিনি লেভ তলস্তয়ের রেজারেকশন উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র কাতিউশা হয়ে যান। কেন্দ্রীয় চরিত্র নেখলিউদভের জীবনে কাতিউশা পুনরুজ্জীবনের বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু তার জীবনে পুনরুজ্জীবনের সমুদ্র-সমান ডাক কে দেবে?

সাগরের চিরঅন্বেষণে উন্মুখ অর্পিতার ভেতরে এই জিজ্ঞাসার অন্তঃহীন প্রতিধ্বনি আদিম বন্যতায় ধাবমান বেগে বয়ে যায়। 


লেখক পরিচিতি
মাহফুজ পারভেজ
কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক। জন্ম ৮ মার্চ, ১৯৬৬ সালে, কিশোরগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে। আদিবাস কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রাম। পড়াশুনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সংঘাত ও শান্তি বিষয়ে পিএইচডি। সাংবাদিকতা করেছেন সাপ্তাহিক রোববার, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক মানবজমিন ইত্যাদি পত্রিকায়। কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধসহ তার বইয়ের সংখ্যা বর্তমানে ১৫-এর অধিক। 

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, স্নানঘর ভেঙ্গে পড়ে অরণ্যের অন্ধকারে, গর্ন্ধবের অভিশাপ (কবিতা), 
ন্যানো ভালবাসা ও অন্যান্য গল্প, পার্টিশানস, নীল উড়াল (উপন্যাস),
 রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে (ভ্রমণ), 
বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি (গবেষণা-প্রবন্ধ) ইত্যাদি। ফোন: ০১৮১৮১১৬৪১৮, ইমেইল: mahfuzparvez@gmail.com

২টি মন্তব্য: