বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

হান্টারের হিরোনি এবং উল্টোটাও

সাদিক হোসেন

নিকে পড়ানো হয়ে গেলে ৪০ বৎসরের খাদিজাকে যখন তার চেয়ে ১৫ বৎসরের ছোট বরের সহিত বসিয়ে ফক্কুরে বুলবুলিরা সিটি মেরে উঠল, এবং ব্যান্ডমাস্টার ট্যানট্যান- ট্যানট্যান- ট্যানট্যান করে বাজনা বাজিয়ে হিরোনিকে নাচিয়ে দিল; সেই সময় হান্টার ২৫ বৎসরের বরটিকে জোক মারলে চারদিক খামোকা নিশ্চুপ ব’নে যায়। নাচের ঝারোকা থামিয়ে হিরোনি তো ততক্ষণে রেগেমেগে একসা, তায় ক্লান্ত।
এদিকে শাদিবাড়িতে রাগ দেখানো যায় না বলে হান্টারকে খ্যাপায়, ‘ওইটা বলো না, ওইটা’। বুলবুলিরা বুলবুলি – দু-কান পালকে ঢাকা; হান্টার তাই আর পালাবার পথ পায় না। শেষে বলতে যখন হবেই, এই ভেবে, দু-হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে খাদিজার দিকে তাকায়, হিরোনিকে দেখে, কিন্তু খাদিজাকেই বলে, My gun is extremely long.

হিরোনি কোনদিন গাদা বন্দুক দেখেনি। শুনেছে গাদা বন্দুক সাইজে বড়। পাইপগান, স্টেনগান সে দেখবেই বা কী উপায়ে। তবে আসগার আলি মরে গেলে জাসুসি করতে আসা পুলিসটার কোমড়ে খাপে ঢোকানো পিস্তলের বাঁট দেখে ফেলেছিল সে। ওইটা এইটকুন, তার উপর কালো কুচকুচে - তার ভাল লাগেনি । কিন্ত প্রথমবার ভোট দিতে গেলে মিলিটারির হাতে ধরা কালাশনিকভ তাকে ফিদা করে দিয়েছিল।

রাতের বেলা, তাই, খলি উসপাস করে সে। আবার আঙুলে নখ রাখায় রিক্স নিতে পারে না। একসময় আর থাকতে না পেরে হান্টারের খোয়াবের ভিতর ঢুকে মটকা ভেঙে মেঝেতে পানি ফেলে দেয়। তারপর সেই পানিতে শুয়ে, বসে, গড়াগড়ি খেয়ে চালাকির সুরে জিজ্ঞেস করে, How long is your gun?

সকালে ঘুম ভাঙলে Close-Up করল হান্টার। ক’বার হাই তুলল। পায়খানায় গেল। চা খেল। বাইরে বেরিয়ে হাওয়া গিলল। ঘরে ফেরার পথে বুঝল, তার আর হিরোনির কিসসা এইতো শুরু হল।

এবার একটু পায়তারা মারা যাক। অর্থ্যাৎ, কিসসার কথায় আসি –
এই গল্পটা লেখার আগে অব্দি আমি মনে করতাম, গল্পকারের অবস্থান পাঠকের অবস্থানের থেকে কিছুটা উপরে। কিন্তু গল্পকার প্রায় সবসময় ছলেবলেএই Hierarchy-টাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাতে পাঠক হিনমণ্যতায় না ভোগে। কৌশল হিসেবে সে পাঠকের সঙ্গে বিভিন্ন চালাকির খেলা খেলে। কখন সখন সে পাঠককে সেইসব খেলায় জিততেও দেয়। পাঠক ভাবে, আম্মো, কী দিলুম। কিন্তু মজা হল, পুরো ছকটাই তো আসলে লেখকের তৈরি। নিয়মগুলো তারই বানানো!
এই পর্যন্ত যাকে বলে, খাপে খাপ আবদুল্লার বাপ। কিন্তু গোত্তা খেলাম ক’দিন আগে। আমার এক চাচা যেদিন ইন্তেকাল করলেন।
তো টানা তিনদিন ভেন্টিলেশানে থাকবার কারণে বডির অবস্থা ভাল নয়। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন, বেশীক্ষণ রাখা যাবে না। তাই ঠিক হল সকাল ১০টায় মাটি হবে। সেই হিসেবে চাচাকে গোসল করিয়ে, গায়ে কাফন বিছিয়ে, খাটে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার কাছে আগরবাতি জ্বলছে। আত্মীয়সজনরা আসছে, লাশ দেখছে। আমরা তাদের চাচার স্ট্রোক হওয়া থেকে মরা অব্দি সব খুটনাটি ঘটনা বলে চলেছি। তারাও আবার একই ঘটনার বিবরণ দিচ্ছে এক অপরকে। মানে, এই সময় আমরা পরস্পরের ভেতর একটা common space তৈরি করতে চাইছিলাম – যে spaceটার মধ্যিখানে কথক ও শ্রোতা উভয়ই সাবলীল ভাবে চলাফেরা করতে পারে। এমনকি পরস্পরের অবস্থানও অদলবদল করে নিতে পারে। অর্থাৎ, এখানে, কেউই কারোর উপর একক ভাবে খবরদারি করতে পারছে না। তার মানে কি এখানে কথক ও শ্রোতা পুরোপুরি স্বাধীন? তাও না। আসলে এখানে তারা একটি শর্তসাপেক্ষ গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে। আবার এই ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখছে ব্যবস্থাটা নিজেই। অর্থাৎ, space-ই রচনা করছে space.
যেমন :-
ঘরে ফিরে হান্টার হুলস্থুল বাঁধিয়ে দেয়। আলমারি, আলনা থেকে সব কাপড় চোপড় নামিয়ে মেঝেয় তা জড়ো করে স্তুপ বানায়। হামাগুড়ি দিয়ে সেই স্তুপে উঠে ছিটে বন্দুকটা নিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ রেখে হিরোনির নাচের ঝারোকা দেখে। খিদে পেলে খায়। কানা বাপের কোলে মাথা রেখে শোয়। তারপর আবার হিরোনিকে দেখতে চাইলে, হিরোনির মুখটা ঠিকঠাক মনে করতে না পেরে যে ভুলে যাওয়াটা তৈরি হয়েছে, সেইটাকে হিরোনির অনুপস্থিতি ভেবে নিশপিশ করে। কখন নিজেকে মনে হয় কাচরার ডাব্বা। এই তো রাস্তার এককোণে পরে রয়েছি। কোন নড়নচড়ন নেই!
ঐদিকে হিরোনি যেন ডবলইঞ্জিন, ধাক্কা মারবার আগেই ছুটে চলেছে। ফক্কুরেদের সঙ্গে খাদিজার ঘরে গিয়ে ক্যাচকোচ করে। সরবত খায়। বুলবুলিদের গান গাইতে বলে। নিজে খাদিজার সিক্রেট হাপিস করে বিস্কুটের কৌটো খোলে। খাদিজা খাটের চাদর থেকে বিস্কুটের গুড়ো ঝারতে ঝারতে বলে, উনি কিন্তু অন্যকিসিমের।
তা হোক। হিরোনি হাসে।
না, বয়স কম হলি কী হয়, উনি জানলেঅলা মানুষ। আবার নাজুকও।
তা হোক। হিরোনি আবার হাসে।
সত্যি।
হিরোনি তবু হাসি থামায় না। খাদিজার ঘর থেকে ফিরে নখগুলো মুড়িয়ে নেয়। বারান্দায় চপ্পল পড়ে হাঁটে। রেডিও চালিয়ে শেয়ালের ডাক শোনে। তখনও ছিটে বন্দুক নিয়ে বসে থাকা হান্টারের কোয়াবে সিগন্যাল পাঠায়। হান্টার রেডিও অন্ করলে শোনে : তুমি টুসটুসে খরগোস শিকার করে এনো। আমি ঝালঝাল করে রান্না করে তোমাকে খাওয়াব।

সেদিন হাফিজের চায়ের দোকানে বসে খৈনি ডলছিল হান্টার। হিরোনি বুলবুলিদের সঙ্গে বুকের উপর বইখাতা চেপে কলেজে যাচ্ছে। হান্টার খৈনি ডলা থামিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, কথাটা বলে আসি। একবার হাফিজের দিকে তাকায়। হাফিজ অন্যদের চা দিতে ব্যস্ত। সে খোইনিটা মাড়ির ফাঁকে গুজে লুঙ্গিতে হাত মোছে। কিছুদূর গিয়ে হিরোনি বুঝি এদিকে তাকাল!
দোকানে খাদিজার অতছোট ভাতারটাও ছিল। সে কাছে এসে বলে, কী গো হান্টারভাই?
হান্টার বলে, ঐটা।
কোনটা?
ঐ, ঐটা। এবার হান্টার হিরোনির দিকে হাত বাড়ায়।
সমস্যা তবে ঐখানে? খাদিজার বর তাকে আড়ালে নিয়ে এসে বলে, তো এখন?
বলে দোবো? হিরোনিকে কথাটা বলে আসি? হান্টার ছটফট করে।
কী বলবে?
ঐ যা সবাই বলে।
খাদিজার বর বলে, যা সবাই সবসময় বলে, তা কি আর শুধু বাক্য আছে গো। ঐটা এখন আর বাক্য নেই, কাজ হয়ে গেছে। কাজ কি মানুষ বলে, না করে?
কাজ তো মানুষে করে।
তবে তোমাকেও কাজটা করতে হবে। এখন বলতো তোমার কাজটা কী?
কী?
তুমি হিরোনিকে চাও তো?
সেইটাই তো।
কোথায় চাও?
নিজের কাছে।
এই নিজের কাছটা কোথায়?
নিজের কাছে মানে নিজের কাছে।
এইটাই। মানে, তুমি হিরোনিকে এমন একটা জায়গায় পেতে চাও, যে জায়গাটা তোমার নিজের। সেই জায়গাটায় হিরোনির সাথে খেতে চাও, বসতে চাও, চোটপাট করতে চাও।এই তো।
হান্টার সরমে হাসে।
খাদিজার বর বলে, জায়গাটা বানাতে হবে। তোমাকেই বানাতে হবে।
কি করে বানাব?
ঐ যে হিরোনির সাথে বুলবুলিরা ঘোরে, তা কি এমনি? ওদের কাছে যাও। ওদের সাথে ভাব জমাও। ওদেরকে গল্প দাও।
গল্প বানাব?
খাদিজার বর আর উত্তর করে না।
হান্টার খুশি মনে ঘরে ফেরে।ঘরে ফিরলে তার কানা বাপটা আবার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চেক করে নেয়। একজায়গায় হাত দিলে বলে, পিঠ?
হুম।
‘হুম’ বলতে গিয়ে হান্টার টের পায়, শব্দগুলো কত নরম। কথা বললেই জিভের যেন আরাম লাগছে। বুঝি শব্দগুলো জিভটাকে আদর করছে।
সে বাপকে গালে তুলে খাওয়ায়। তারপর নিজে খেয়ে বাপের কোলে শুয়ে গল্প ভাঁজতে থাকে।
হান্টারের আর ঘুম আসে না।

বুলবুলিদের কাছে বলা হান্টারের ১’ম গল্প
আসগার আলির বারোটা বেজে গেছে। মানে, ক’দিন আগে অব্দিও সে হাফিজের চায়ের দোকানে এসে আড্ডা-ফাড্ডা দিত, পার্টি পলিটিক্স করত, কাজকারবারে খামতি দিত না। কিন্তু এখন এসবে তার আর মতিগতি নেই। কারবারে লালবাতি জ্বেলে দিয়েছে। ঠিক সময়ে গোসল সারে না। লোকের সামনেই নাক খুটেখুটে পোটা বার করে। আর থাকতে থাকতে জানলার সামনের ঝোপঝাড়টাকে তুমুল নাড়ায়। কী করে সে নিজেই বোঝে।
ঝোপটাকে কেটে দিলে ঘরে আলো আসত। তবু সে ঝোপটাকে কাটে না। এমনিই ডাল-লতা-পাতা নেড়ে সেঁধিয়ে যায়।
একবার খাদিজার বর জিজ্ঞেস করল, কী গো আসগার ভাই?
আসগার আলি উত্তর করে না। ফুচ করে থুতু ফেলে পালায়।
তো, এই আসগার আলিকে নিয়ে সকলের হেভি চিন্তা। খাদিজার বর জ্ঞানী মানুষ। সে কিছুতে আসগারকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সকলকে বোঝায়, ওনার কোথাও একটা কষ্ট আছে। সেই কষ্টটাকে ধরতে হবে। কষ্টটাকে ধরতে পারলেই আসগার আলি আবার আসগার আলি হয়ে যাবে।
ইদের দিনেও আসগার আলি নামাজে গেল না। খাদিজার বর ভাবে, এই তো তোফা সুযোগ। সে আসগারের ঘরের সামনে এসে, আসগার, ও আসগার ভাই, ব’লে ডাক পাড়ে। খানিকপর আসগার জানলা খোলে। ঝোপের আড়াল থেকে তার আধখানা চোপা দেখা যায়।
এসো গো আসগার ভাই। ইদের দিন গলায় মিলবে না?
আসগার আলি জবাব দেয় না।খালি গায়ে লুঙ্গি পড়ে বাইরে বেরোয়।
ইদ মুবারক।
আসগার আলি মুখ ফিরিয়ে ঝোপের দিকে তাকায়।
খাদিজার বর আবার বলে, এসো, গলায় মিলি।
আসগার আলি ঝপ করে ঝোপের তলায় বসে পড়ে।
কী হলো?
আসগার নখ চিবোয়।
নামাজে গেলে না কেন?
আসগার নিশ্চুপ।
ইদের দিনে নতুন কাপড় পড়বারর নিয়ম। নতুন কিছু কেনোনি? আমার কাছে একটা বাড়তি লুঙ্গি আছে, নেবে?
আসগার আরও ঝুকে পড়ে। ঝুকে পড়ে ডাল-লতা-পাতা ধরে নাড়ায়।
ও আসগার, আসগার ভাই, কী হলো তোমার? এদিকে তাকাও।
আসগার তবু হাতের কাছে যা পায়, তা ধরে নাড়াতেই থাকে।

বুলবুলিদের কাছে বলা হান্টারের ২’য় গল্প
আসগার আলির বারোটা বেজে গেছে। তা না হলে, সে খামোকা এমনি এমনি হাট থেকে দু-দুটো খরগোস কিনে আনল কেন?
তা এই খরগোস নিয়ে কী করে আসগার আলি? সে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। খরগোস দুটোকে খোলতাই পেটের উপর ছেড়ে দেয়। সে-দুটো বিছানায় নেমে এলে আবার তাদের পেটের উপর তুলে আনে। খরগোস দুটো হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে জিভ বার করে। জিভ দিয়ে তার বুকের পশমের গোড়ায় জমে থাকা ঘাম চেটে খায়।
সকাল হলেই আসগারের তাই কাজ জুটেছে। সে ঝোপ থেকে কচিকচি ঘাস, পাতা, এইসব তুলে খরগোসকে খাওয়ায়। সেগুলি খেতে না চাইলে সে চুপ মেরে থাকে। আসগার সারাক্ষণই চুপ মেরে থাকে।
খরগোস গুলোর জন্যে আলাদা বাসা বানায়নি আসগার আলি। তারা ঘরমায় দৌড়ায়, কাথা-বালিশ-চাদরে হাগে। আসগার সেই গু-মুতের উপর শুয়ে খরগোস দুটোকে বুকের উপর তুলে নেয়।
তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি চলছে। রাস্তায় হাঁটু খানেক পানি। আসগারের ঘরটা নীচু জমিতে, মেঝেতেও পানি জমেছে তাই। হাঁটলে ছপছপ শব্দ হয়। আসগার শব্দ শোনে। খাটে পা গুটিয়ে বসে থাকে।খরগোস দুটোকে দেখে। বাইরে বেরিয়ে কচিকচি পাতা তুলে আনে। নিজেও পাতা চিবিয়ে খায়। তারপর এক বালতি পানি তুলে একটা খরগোসকে বালতিতে ডবিয়ে দিয়ে অন্যটিকে আদর করতে থাকে।


হিরোনির ইন্টারপ্রিটেসন
আসগার আলির কেসটা এ তল্লাটে জানেনা এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এখন প্রশ্ন, হান্টার বুলবুলিদের খামোকা আসগারের কাহিনীটাই বা শোনালো কেন? আমার মনে হয়(হিরোনি এইসময় আঙ্গুলগুলোকে যথাস্থানে চালিয়ে দিয়ে ভাবে), সে আসলে আসগারের ছলে অন্য কিছু বলতে চাইছে। আসগারের লেগে কোন যুক্তি খাটে না। আবার হান্টারের বাপ কানা, নিজে থেকে নড়াচড়ার খমতা নেই। মানে, হান্টারের অবস্থান যুক্তিহীনতা আর অন্ধত্বের মধ্যিখানে। মানে, হান্টার ভালবাসাটালোবাসায় ডুবে আছে। কিন্তু কেন ডুবল সে তা নিজেও জানে না। আবার ডুবে গিয়ে চারদিক আন্ধার দেখছে। যেন তার গায়েহাতেপায়ে কচুরিপানার শেকড়ের যেইসা জটপাকানো চুল জাপ্টে গিছে। সে ডুবে যাচ্ছে। হেজেমেজে যাচ্ছে। তাই বলতে পাচ্ছে না, হিরোনি, I love You.
প্রথম গল্পে, খাদিজার বর খালি আসগারকে জ্ঞান মারছে। আর আসগার সেই সব কথা শুনতে পাচ্ছে না। সে যেন অন্য দুনিয়ার বাসিন্দা। জ্ঞান যত তার কাছে আসে, সে তত দূরে দূরে চলে যায়। সে অপর। সে ছাওয়ার মত, ভরহীন। সে, আসলে, হাফিজের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা হান্টার নিজেই। আমি হেঁটে চলেছি, কলেজে যাচ্ছি; আর সে কিছুই করে না, শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের দু-জনের ভেতর টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। তাই, আমি আড়চোখে না তাকালেও সে ভাবছে, এই বুঝি আমি তার দিকে তাকালুম। তখন ডাল-লতা-পাতা নাড়ানো ছাড়া আর কীই বা করার থাকতে পারে তার?
২’য় গল্পটায়, খরগোস দুটো হল আমার অনুপস্থিতি। খাদিজার বিয়েতে আমি নাচছি। এদিকে খরগোস দুটো দৌড়চ্ছে, হাঁটছে, ডিগবাজি কাটছে। ব্যান্ডপার্টি ট্যানট্যান-ট্যানট্যান করে বাজনা বাজাচ্ছে। পানিতে মেঝে ডুবে গেছে আসগারের। সে জমা পানিতে পা ফেলে। ছপছপ শব্দ ভাসে। সে পানি ভর্তি বালতিতে একটা খরগোসকে ফেলে দেয়। সেটা লাফিয়ে বালতির বাইরে আর আসতে পারে না। তার নাকে মুখে পানি ঢুকে দম আঁটকে আসে। সেটা ডুবে যায়। ডুবে যেতে যেতে ভুস করে একবার ভেসে ওঠে যেন। আবার তলিয়ে যায়। আর সেই সময় অন্য খরগোসটাকে আদর করে আসগার। অন্য খরগোসটাকে আদর করে আসগার কেননা ঐ সময় বাপের কোলে শুয়ে পানির শব্দ শুনতে শুনতে সে, হান্টার, বেহুঁশ হয়ে যায় কখন।

বুলবুলিদের কাছে বলা হান্টারের ৩’য় গল্প
আসগার আলির বারোটা বেজে গেছে। তা না হলে, সে সবার কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে কেন?
তো, সেবার হলো কী, খাদিজার বর ক’জনকে সঙ্গে নিয়ে সোজা আসগারের ঘরে ঢুকে এল। আসগার তখন ন্যাংটো, চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছে। খরগোসটা তার বুকের উপর ঘুরছে।
আসগার, ও আসগার ভাই?
আসগার উঠে বসে।
উদোম হয়ে শুয়ে আছো। তোমার এ কী হাল হলো?
আসগার কথা কয় না।
সারা ঘরতো গু-মুতে ভরিয়ে রেখেছ। ক’মাস গা ধোওনি?
আসসগার খরগোসটাকে মেঝেয় ছেড়ে দেয়। খাদিজার বর বলে ক’য়ে, শেষে তাকে ধরেবেঁধে গোসলখানায় নিয়ে চলে। লাইফবয় মাখিয়ে বলে, নাও, এবার নিজেই গায়ে পানি ঢালো। আমরা তোমার ঘরদোর সাফ করি গিয়ে।
মেঝে ঝাট দিয়ে মোছা হয়ে গেছে। খাটের চাদর পাল্টানো হয়েছে। থালাবাসন ধুয়ে রেখে এসেছে। তবু আসগার আর বের হয় না। শেষে গোসলখানার দরজা খুললে দেখা গেল, আসগার এককোণে জড়সড়ো হয়ে বসে রয়েছে। গায়ে সাবানের ফেনা শুকিয়ে গেছে। ঠান্ডায় হুহু করে কাঁপছে সে।
অনেকসময় তাকে ঝোপঝাড়ের তলায় লুকিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। যেন নিজের ঘর, ঘরের আসবাব, আমনকি খরগোসটার থেকেও সে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাইছে। কিন্তু ঠিক মত লুকোনোর জায়গা পাচ্ছে না।
সন্ধ্যা নেমে এল। দূরে কোথায় শেয়াল ডেকে উঠল। আসগার তবু ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে না।
একদিন সকালবেলা, ঝোপের তলায়, খদিজার বর আসগারকে পোঁদ উলটে পড়ে থাকতে দেখল।


ধরো, লাইফে আমরা যা যা গোনা করি সেই অনুযায়ি তো দোযখে শাস্তি পাই। আবার যে যত বেশি ভাল কাজ করে সে কি বেহেস্তেতে তত বেশি ভাল হুরী-পরী পায়? সব হুরী-পরীরাই তো সুন্দর। একরকম সুন্দর। কিন্ত দোযখের শাস্তির রকমফের আছে। যে রকম গোনা করবে, সেই রকম শাস্তি কপালে জুটবে। মানে, লাইফের কন্টিনিউটি একমাত্র দোযখেই আছে, বেহেস্তে নেই।
কিন্তু এসব আমাকে বলা কেন? হান্টার বুঝতে পারে না।
কেন আবার, এমনি। খাদিজার বর হেসে বলে, আমরা কি লাইফে সবসময় সূত্র মেনে চলি?
তা না।
তবে?
তবে কি?
খাদিজার বর জাসুস আদমির ঢঙে বলে, বুঝলে, কাল রাত্তিরে ছাদে উঠে আমি চাঁদের বয়স মাপতে ছিলুম, এই সময়, আমার খেয়ালে কে যেন সিগন্যাল পাঠাল। অমনি রেডিওটা অন্ করতেই শুনি একটা শেয়াল ডাকছে।
শেয়ালের ডাক? হান্টার টেনসান খায়।
খাদিজার বর তার পিঠে হাত রেখে বলে, সিগন্যালটা তোমার লেগে পাঠানো হয়ে ছিল। কিন্তু আমি তো তিনতলার ছাদে ছুলুম তখন, তার উপর আমার পড়াশুনোটা আবার বেশি, তাই আমার খেয়ালটাই ওটাকে ক্যাচ করে নিল।
আমার জন্যি সিগন্যাল? কে? হিরোনি?
খাদিজার বর এবার মুচকি হেসে বলে, সকালে উনি খাদিজার কাছে এসে মাফ চেয়ে গেছে। বলে, সিগন্যাল যে ওইরকম ফলস্ খেতে পারে সেটা ওনার জানা ছিল না। আহা, মেয়েটা এখন বড্ড সরমে পরেছে।
হান্টারও লজ্জায় একসা, এখন আমি কী করি?
তোমাদের দুজনার জন্যি জায়গাটা তৈরি। যাও এবার জায়গাটাতে গিয়ে খেলাধুলো করো। টাইম লস কোরো না।

রাত্তিরে ফুলটুস চাঁদ উঠেছে। বাইরে কুয়াশা নেমে এল হঠাৎ। হান্টার হাঁটু অব্দি লম্বা শিকারি জুতো পড়ে, মাথায় হ্যাট চাপিয়ে, ছিটে বন্দুকটা নিয়ে ঘরের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করে। যেন সে জঙ্গলের মধ্যে, এখুনি বুনো শুয়োরটাকে গুলি করবে, তাই সজাগ হয়ে আছে। কোথা থেকে খোরগোসটা এসে তার জুতোয় মুখ ঘষে। সে খরগোসটাকে সরিয়ে দেয়। তারপর রেডিও চালিয়ে কান পাতে। একসময় শেয়ালের ডাক শোনে ঠিক।
হ্যাল্লো, হ্যাল্লো, হ্যালো হ্যালো।
হান্টারের সারা গা থম মেরে যায়। কে দরজার ওপার থেকে হ্যালো হ্যালো করছে? তার গা দিয়ে ঘাম ঝরে। কি করবে বুঝতে পারে না। হাতে ধরা বন্দুকটা কেঁপে ওঠে যেন। বুকটা ধ্বকধ্বকাস করে। দরজাটা খুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এবার দরজার আংটা নাড়ানোর আওয়াজ শোনে। সে দু-কদম পছিয়ে যায়।
হিরোনি নিজেই ভেজানো দরজাটা খুলে এগিয়ে এসে বলে, দেখাও।
কি?
আসল বন্দুকটা।
হান্টার বন্দুক দেখালে হিরোনি যেন ভয় পায়, ইস, এত্তো বড়! চোখ সয়ে গেলে বলে, না, অতটাও বড় নয়। আমি তো মিলিটারির কালাশনিকভ দেখেছি। ঐটা আরও বড়।
আমরা তো গরীব মানুষ। অত বড় চিজ পাবো কোথায়? হান্টার মিইয়ে গিয়ে বলে, তবে তোমার একটা জিনিস আমার আকছে আছে। ঐটা নিয়ে যেও।
কি?
হান্টার খরগোসটাকে ধরে হিরোনির হাতে তুলে দেয়।
ইস, কী টুসটুসে! আসগারের?
হান্টার মাথা নাড়ে।
কি করে পেলে? চুরি করেছ?
হুম
তুমি খুব সুইট। খুশিতে হিরোনির চোখ চিকমিক করে ওঠে। উম্মা করে খরগোসটাকে চুমু খায়। বলে, তালে যাই?
হান্টার হিরোনিকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে। দাওয়ায় বসা বুড়োটাকে দেখে হিরোনি বলে, উনি তোমার আব্বা?
হান্টার হিরোনিকে বুড়ো বাপের কাছে নিয়ে যায়।
বুড়ো হিরোনির পিঠে হাত দিয়ে বলে, তুমি হিরোনি?
হান্টার কিছু বুঝতে পারে না। তার বাপ হিরোনিকে চিনল কি করে? সে ভ্যাবাচ্যাকা খায়।
হিরোনি হান্টারের দিকে চেয়ে পিচপিচ হাসি ছাড়ে।
বাপ বলে, তোমরা দেখতে পাও বলে তোমরা না দেখেও দেখতে পাও। তাই তোমাদের কাছে খোয়াবও আছে, আবার হাকিকতও আছে। কিন্তু আমার কাছে কি আছে? আমার কাছে কচু আছে। তবু ঐদিন যখন ইনি তোমার খোয়াবের ভেতর ঢুকে মটকা ভেঙে মেঝেটা পানিতে ভরিয়ে দিল, সেইদিনেই এনার সাথে মোলাকাত হয়েছে। তখনি চেক করে নিয়ে ছিলুম।
হান্টার ধপাস করে বাপের পাশে বসে পড়ে, যা বাবা, এ আবার কী?
খরগোসটা এতক্ষণ মেঝেতে ঘুরঘুর করছিল। হিরোনি সেটাকে খপাৎ করে ধরে উঠে দাঁড়ায়। হান্টারকে বলে , একটা বঁটি দাও।
বঁটি? তুমি ঘরে যাবে না?
যাবই তো।
তালে?
তালে কি?
বঁটি কি হবে?
হিরোনি খরগোসটাকে আদর করে বলে, আগে এটাকে ছাল ছাড়িয়ে ঝালঝাল করে রান্না করি।রান্না করে তোমাদের খাইয়ে তবে যাব।

হিরোনি আর দেরী করে না। সোজা রান্নাঘরে ঢোকে। হান্টার বাপের পাশে ছিটে বন্দুকটা রেখে হিরোনির পিছুপিছু বঁটি ও ছুরি জোগার করতে চলে।



লেখক পরিচিতি
সাদিক হোসেন
জন্ম - ১১ই ডিসেম্বর, ১৯৮১

প্রকাশিত বই - দেবতা ও পশুপাখি (কবিতা), ২০০৮
সম্মোহন (ছোট গল্প), ২০১০
মোমেন ও মোমেনা (উপন্যাস), ২০১১
গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময় (ছোট গল্প), ২০১৩

পুরস্কার সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কার, ২০১২
নমিতা চট্টোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার, ২০১৫

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন