শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : বিদুর

(এক)

মোহনবাঁশি ছিলনা, চাঁদের তিথি ছিলনা, মেঘে মেঘে ছয়লাপ সদ্য রাতে, চেনার কথাও ছিলনা। আশা? আদ্যোপান্ত থর্‌থরিয়ে ভেবেছিল পারিজাত। জাল বিছিয়েছে অন্ধকার... আহা মরি, একটাও তারা না জ্বললে আকাশ অন্যরকম। পারিজাত এখানে কাউকে সঙ্গে আনেনা। মুখোমুখি হওয়ার জন্যে আকাশজোড়া আয়নাটা একলা চাই। থেকে থেকে ওর পালিয়ে যাওয়া কৃষ্ণকলি জানে, বাধা দেয়না। বাড়িতে সে আর কলাপ তখন খুনসুটি করে, চাইনিজ খায় দোকানে গিয়ে, পড়ায় দেদার ফাঁকি মারে। কৃষ্ণকলি এত স্বাভাবিক থাকতে পারে, প্রথম আট বছর জানতে পারেনি পারিজাত।


বন বাংলোয় কৃষ্ণকলিকে নিয়ে দু’বার এসেছিল পারিজাত, বিয়ের আগে আর ঠিক পরে। এস-এল-আর ক্যামেরায় তোলা শ’য়ে শ’য়ে ফোটো ল্যাপটপে... কৃষ্ণকলিতে ছেয়ে আছে। কৃষ্ণকলির কপালের ঢালে সবুজ গুঁড়ো টিপ, টিলার প্রান্তে দিন শেষ। সবজে-পাড় কালো শাড়ির আঁচলে উড়ন্ত মেঘের গা ঘেঁষে বনভূমি, খোলা চুলে শেষ রাত্তির। কৃষ্ণকলি পারিজাতের শখের ফোটোগ্রাফি - ছিল। সেই দু’বার এঘরে এই পাকাবাঁশের চৌকিতে দাপাদাপি খেলেছিল পারিজাত আর কৃষ্ণকলি। কৃষ্ণকলির সরষের তেল রঙ গায়ে আগুণ তুমুল, লেজ-ফোলান গোলা পায়রা পারিজাত। অতঃপর, নিয়মের অভ্যাসের বর বৌ।

--আপনের খাবার।

হাট করা দরজায় ভৌতিক শিল্যুট। কাঠের জানালার কপাটে বারমুডা-পা তুলে বেঁকেটেরে শুয়েছিল পারিজাত। উফ্‌, ক্যামেরায় চার্জ খতম্‌। কাপড় নেই মাথায়, হাতের থালা টেবিলে নামাতে গিয়ে ইল্যাস্টিক শরীর ঝুঁকল। কারেন্ট গেছে কখন... নিবুনিবু লণ্ঠন, দেওয়ালে বিকট ছায়াবাজি। উসকালে অসমান সলতে থেকে কাঁচে দপদপ কালি ছেটে। কী দরকার?

--লাইট কি আজ আসবেনা?

ছায়ার ঘনক মাথা দোলায়, জানেনা। বেড়িয়ে যাওয়া পা চৌকাঠের ওপারে। পারিজাত চেঁচায়,

--আশা... শোন-ও!


হুমড়ি খায় উঠতে পড়তে, পড়তে উঠতে, দৌড় পেছনে না তাকিয়ে। আহা, লাগল নাকি? পারিজাত চোখ সরায় না। খোলা দরজাটা ঠেলে দেয়, বন্ধ করে না। ঘরের ক্যাঁটক্যাঁটে হলুদ দেওয়াল কংক্রিট, চালে টালি, বৃষ্টির জলে সাপ। পারিজাত কখনও দেখেনি অবশ্য। উঠে খাবারের ঢাকা সরিয়ে গন্ধ নেয় - হরেক সবজির ঘ্যাঁট, দেশি মুরগির ঝোল। সরু সরু ধোঁয়ায় সৌরভ। পারিজাত অন্যমনষ্ক, রুটি ছেঁড়ে। কৃষ্ণকলিকে ফোন করতে... মোবাইলেও চার্জ নেই। ভাল আছে, ভালই থাকে আজকাল কৃষ্ণকলি, ভাল থাকার বয়স পাঁচ।


(দুই)

সুরভিত শয্যায় নিবিড় মেঘ বিদ্যুৎ, ঝড়জল... ফসলের আকাঙ্ক্ষা! ভালবাসে তো দু’জনেই খুব, খুবই। তামাদি হয়ে যাচ্ছে বুঝেও কতবার, আবার... জানে বারবার হেরে যাওয়ার মতো অশালীন হয়না আর কিছু। প্যাকেট প্যাকেট দামী কন্ডোম বেড-সাইড ড্রয়ারে ব্রাত্য। ওরা তখন সব মানছে, যা তা বিশ্বাস করছে – সেফ-পিরিয়ড, তাবিজ কবচ, গুরু পুরুত, থান মাজার! অতবড় একটা ‘নেই’! কৃষ্ণকলির মামা গাইনি। বড় গোলমাল অথচ খুঁজে পাওয়া গেলনা কারও, সামান্য জটিলতা। হতেও পারে ভবিষ্যতে, তবু... ভরসা দেয় কে? ওরা হয়তো আলাদা হওয়ার মতো কঠিন ভাবেনি, ভালবাসে যে দুজনে! দিনগুলো তখন ওরকম, সেই কীরকম ছেঁড়া ছেঁড়া, ভাঙাচোরা। ঠেকো দিয়ে আটকানো ফাঁকটা, শূন্যতাটা, একটা গর্জ্‌।

অজন্তা পুজোয় ওর গ্রামের বাড়ি থেকে আশা কুড়িয়ে এনেছিল। অজন্তা বন্ধু ওদের, মানে দু’জনের।

--শোনো, খুব অভাবী গো পরিবারটা। স্বামীস্ত্রী দুজনেই সুস্থ, মানে রোগটোগ নেই কিছু। টাকাটা বেশি চাইছে। কথা বলে নিও, নেগোশিয়েট করে।

আবার আলো জ্বলে, অল্পস্বল্প ঝড় হয় রাতে। ডাক্তার রাহা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আগেই ওইরকম পরামর্শ দিয়েছিলেন। চেষ্টা... একটা, একটি বার। আশা হরেনের সঙ্গে ডাক্তারের শীতল অভিজাত চেম্বারে জড়সড়। পারিজাত তাকাল, দেখল, শুনল। কৃষ্ণকলির মুখ নামান, পারিজাত আলগোছে ঠেলে, কী? ডাক্তারকে বলল, আলোচনা করে জানাবে। উপায় নেই! উপায় নেই কিছু এদের, ওদেরও। কত রাত চোখের জলে কৃষ্ণকলি... পারিজাত কী যে ভেবে গেছে রাতভর, সাত বছরের গলিঘুঁজি ঘুরেছে। কৃষ্ণকলির পঁয়তিরিশ পার। রাজি হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় আর... গলা বুজে থাকে কেন?

--আমাদেরই থাকবে কলি... বিলীভ মী। দে ওন্ট ডিম্যান্ড... নেভার! আর বেবি তো আমাদের, তোমার আর আমার... শীজ্‌ ওনলি দ্য কন্টেইনার। দে ওয়ান্ট মানি, কলি... সো নিডি!

কি বৈশিষ্ট্য ছিল, কি ছিল না, ভাবেনি পারিজাত। সময় ছিলনা। বাড়ির অমতে, সম্পর্ক বাঁচাতেই... দ্বৈত বা একলার জিদে।

যেন ফুলে পরাগ সংযোগ, অনুঘটক ডাক্তার রাহা... সুতরাং আশা তাদের ফ্ল্যাটের গেস্টরুমে ন’মাস অতিথি হয়ে। পারিজাত কৃষ্ণকলি এক সঙ্গে সকাল আটটায় বের হয়,

--ঠিকমতো খেয়ে নিও বুঝেছ? যা ইচ্ছে করবে খাবে, যখন... যেরকম।

কী ভাব দু’জনার, আশা দেখে। হরেন শতর্মতো অধের্ক নিয়ে ফিরে গেছে। এরপর এসে বাকিটা আর আশাকেও নিয়ে যাবে। দুলি, বেলি, রমুর মুখগুলো খাঁখাঁ দুপুরে বদ্ধ ফ্ল্যাটের ছোট চৌহদ্দিতে... একলা আশা এদিক সেদিক ঘোরে, মন ছটফটায়। টিভি দেওয়ালে সাঁটান। কী বড়, বাস্‌ রে! শরীরের নোতুন এই চারাটা... শুদ্দু টাকা দেবে বলে! কবে ফেরা? ঘরে ফেরা? অসময়ে চোখ লেগে আসে। নরম বিছানায় কোন্‌ জম্মে শুয়েছে? ফ্রিজ খুললে ফল, ঠান্ডা জল, শরবৎ। হরেন লাইগেশন করিয়ে টাকা পেয়েছে চার বছর আগে, রমুটার জন্মের পরপর। ক্ষয়া, গাময় বিড়ির গন্ধ, কালো দাঁত হরেন গাঁটগাঁট কড়া আঙুলে ধামসায়। এবাড়ির মানুষটাকে লুকিয়ে সে দেখে... দাদাবাবু! এত ইচ্ছে করে, এতটাই... তাও সামনে যায়না। লম্বায় বেশি নয়, চশমা-চোখ, ঠোঁটের নিচে চিবুকে একটু কেমন দাড়ি। মাথার চুল কম কম। হরেনের ধুলো খসখসে ঘন চুল। এনার জলের ফোঁটার মতো ছলছল চোখ, উজল দাঁত – সেই আলোখান বুকের ভিত্‌রে কেবল মনসাপুজোর ঢাক...! বউদি’টার সঙ্গে কী এত গপ্প করে, বোঝেনা আশা। একসাথে বসে খায় দু’জনা। রাতের বিছানায় সে ছটফটায়, আইঢাই, থেকে থেকে পেটে গোঁত্তা – পাঁচ মাস পেরিয়েছে। ছোটো ঘরে লম্বা আয়নার ছবিতে লজ্জা... গোলগাল, চকচকে টান চামড়া, থৈথৈ চুল। সাবান আর শ্যাম্পুতেই হয় নাকি শুধু?

--মনিষ্যির এলেমে হইল কুনোদিন? আরামে রাকবার?

ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেও ইচ্ছে করে কই? ভয় ধরে, ছেলেমেয়ের মুখ মনে করতে বসে... অস্পষ্ট। ঘুম ছড়ান শরীরে ভার হয়ে সুখ নামে... সেই গোরাপানা, ওই সাদা দাঁত, খোলা হাসি। ভরা বুকদুটোর মধ্যেটায় ফুঁড়ে দেওয়া চোখ! ফস্‌ফস্‌ গায়ে মাখে ছান করে উঠে, সেই বাস! চোখ এঁটে দু’হাতে ডাকে আশা - টাকলু গো, আদর আদর আদর। যদি কখনও...!

ইতিউতি বেশ চোখ তো! ঠোঁটের নীচটা চাপা, চিবুকে তিল। প্রথমদিনে শস্তা ন্যাকড়ার পুতুলের মতো নুয়েছিল - ল্যাকপ্যাকে, ফ্যাকাশে। সিঁদুর, কাঁচের চুড়ি, ছাপাছাপা শাড়ির পাশে ষণ্ডামার্কা হরেন। বেজার মুখে বদহজমি বিতৃষ্ণা। ইচ্ছাপূরণের আধার টাকায় কেনাবেচা। ডাক্তার রাহা বলেন প্রতিস্থাপনের পরে,

--ইট’স ইমপ্ল্যান্টেড পারফেক্টলি এ্যাণ্ড শী’জ সাককেস্‌ফুলি ক্যারিয়িং ইয়োর বেবি। শুড্‌ বী প্রপারলি কেয়ারড্‌। ওর হাজব্যান্ডকে একেবারে এ্যালাও করবেন না।

আগুণ ঝিমিয়ে গেছে কবে... ক্বচিৎ চটপটি জ্বলে বিছানায়, নিয়মের মতো। পরষ্পরকে কী লুকোয়? কেন অপরাধবোধ? রোগা হয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণকলি? পাশের ঘরে বাড়ছে শিশু – তাদের, পারিজাতের শুক্রানু আর ডিম্বানু কৃষ্ণকলির। কত দিন সামান্য আগে ফেরে পারিজাত। কোথায় লুকিয়ে আশা, কিন্তু আশেপাশেই। টের পায় - সোফার গদি একটু দাবান বা টেবিলে ভেজা প্লেটটা। পারিজাত গন্ধও পায়, পন্ডস্‌ পাউডার পছন্দ মেয়েটার? হঠাৎ পেছনে টুকুরটাকুর চাউনি। পারিজাত ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে। ওদিকে ঘুরতেই অশরীরি মিশে যায়। অথচ, পারিজাত চায় যে সামনে থেকে, গভির্নীর ভরে ওঠা শরীরের শিল্প কাছ থেকে চোখে, ক্যামেরায়... স্বপ্নগুলো লাটপাট, কবে ফিকে হয়ে গেছে। তলপেটে কান পেতে অনুভব, আরও কীসব... অস্পষ্ট নেগেটিভ! নিমেষে শিউরে উঠে আড়চোখে দেখে, কৃষ্ণকলির দেওয়া ঘননীল শাড়ি উঁকি দিয়ে সরে গেল। লুকোচুরি হচ্ছে? বা বেশ।

--ডাকব কি? উচিত না একটু খোঁজ নেওয়া?

ডোর বেল দরজায়, খোলে হাসিমুখে। কৃষ্ণকলি হাক্লান্ত, বিমর্ষ।

--কতক্ষণ এসেছ? কি করছিলে?

স্বচ্ছন্দে ঢুকে যায় আশার ঘরে। গা জ্বালা করে। কৃষ্ণকলি, সন্দেহ? মেয়েটা হয়ত ততক্ষণে পা মুড়ে চোখ বুজে বিছানায়। কৃষ্ণকলি তোয়ালে চেপে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে ঘরে,

--ভালই আছে দেখলাম, তবু ডাক্তারের একটা ডেট নিয়ে...।

অবশেষে মেনে নিয়েছে! পারিজাতের উচিত নিশ্চিন্ত হওয়া। জড়িয়ে ধরতে যায় বউকে, পাথর প্রতিমা ইদানিং। ছাড়িয়ে নিচ্ছে,

--প্লিজ জাতো, চল খেয়ে নিই। রাত হচ্ছে।

ঘুম। সঙ্কেত মাথার ভেতরে, আসছে সে কোন্‌ আঁধার পেরিয়ে। পাশ ফিরে অঘোরে কৃষ্ণকলি, নিরেট পাঁচিল ঘেরা। পারিজাত লাইল্যাক রঙ সিলিঙে চোখ। উঠে, শোওয়ার ঘর থেকে বের হয় সাবধানে। হয়ত পিপাসা বা ঘুম আসেনা বলে। ড্রইংরুমের অন্ধকার সোফায় আশা পা তুলে গোল হয়ে। তখুনি থতমত, নেমে পড়তে চায়। পারিজাত খুব আস্তে কথা বলে এমনিতেও,

--বসো বসো... মানে, বসুন। ঘুমোন নি?

লজ্জাবতী লতা দোলে, মাথা নাড়ে। তার ও তাদের সন্তানের মা। মুখোমুখি পারিজাত। হলদে হাতকাটা ম্যাক্সি কৃষ্ণকলি দিয়েছে, রাতে শোবার। অন্য সময়ে শাড়িই। আশা পা পা এগোচ্ছিল, মিনতি করে সে,

--আর একটু... প্লিজ্‌!

মাথা হেঁট করে দু’হাতের নখ খোঁটে,

--বউদি উটে পড়বে!

শুধু এই ভয়। ঘরে পা টিপে তার ক্যামেরাটা... সকালে চার্জ দিয়ে রেখেছে, পরশু ম্যারেজ গ্যাদারিং।

আশার দুহাতে গাময় পদ্মকাঁটা শিরশির, সুড়সুড়ি পিম্‌ড়ে। সাদা হাতকাটা গেঞ্জিপরা দাদাবাবু ছুঁচ্ছে তার চিবুক, কাঁধ, বুক। পেটের কাছে ম্যাক্সি টেনেটুনে ঠিক করে দিচ্ছে। ধবধবে লম্বা আঙুল, সোনার কি আঙটিদুটো? ক্লিক্‌ ক্লিক্‌। মুখ দেখে, গা দেখে ... কেমন যে তাকায়!

ভাগ্যে জাগেনি কৃষ্ণকলি, কবে থেকে ওর ঘুমের ওষুধ অভ্যাস। চুপচাপ নিঝুম, কোন্‌ তার কবে গেছে কেটে! নিজের বালিশে মাথা পারিজাতের। আচ্ছা, কপালের লালটিপ তজর্নী না মধ্যমা, কোন্‌টা দিয়ে ঠিক অতবড় গোল পরেছে? ঘন চুলে একটু গুমসো গন্ধ। ওঘরে এসি নেই, তাই? সোঁদা সোঁদা অপার ভাললাগা, মধু মধু মধু। ওরে পারিজাত, কি হল রে তোর?

এমনি অশ্রুত শব্দে রাত সজাগ... ল্যাবরেটারিতে রসায়নের নোতুন ফর্ম্যুলা! ভোর হচ্ছে রোজ, পন্ডস্‌ ড্রিম ফ্লাওয়ারের গন্ধে, কল্পনার বেবি পাউডারের গন্ধ মিশে। পারিজাত! ভয় নেই তোর? লজ্জা নেই? ঠকাচ্ছিস? কাঁহা তক?

--মোটেও না, কলি জানতে চাইলে বলে দেব।

--ওহো তাই নাকি? কি বলবি?

--ডাক্তারের বারণ না থাকলে সবটাই নিতাম, ওতো চেয়েছিল... আশা!


(তিন)

--হ্যালো কলি, দেখনা রাত্তিরে চার্জ ছিলনা একটুও। যা পাওয়ার-কাট্‌! ঠিক আছ? তোমার মা আছেন তো? কলাপ স্কুলে? আমি হয়ত আর দু’তিনদিনই, জায়গাটা একটু এক্সপ্লোর করব। নো প্রবলেম? ওকে থ্যাঙ্কস্‌। অফিসে সাবধানে বেরিও। বৃষ্টি হচ্ছে, না?

--হুঁ, মা আছে। কলাপের জ্বরজ্বর, আজ পাঠালাম না।

কবে ঘুচে গেছে বিরোধ, মনোমালিন্য, ঠাকুমা দিদিমার এখন কলাপের বেশি প্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতা। কার মতো দেখতে? মা না বাবা? দু’জনের মিশিয়ে কলাপ। পারিজাত অন্য একটা নাম চেয়েছিল, কৃষ্ণকলি চোখ সরু করে তার দিকে,

--মানে?

--নাঃ, মানে নেই। এমনিই।


কলাপ তার আর কৃষ্ণকলির, বেশিটা কৃষ্ণকলির। একটা সেতু, এপার ওপার।

--কলি, তুমি অবজ্ঞা কর আমাকে? এলেবেলে ভাব?

--অবান্তর অবান্তর - বোকাবোকা।

--ভয় পাচ্ছ? লুকোচ্ছ কী যেন?

--কী সব মানেহীন চিন্তা!

--বলছ, আমি ভুল? ঐ প্রথমদিন তোমার উল্টোদিকের চেয়ারে হরেন ঘড়াই। গিলছিল লালচোখ... তোমার বডিহাগিং টী-তে প্রোট্রুডেড... আর টাইট জিন্সে থাই! শয়তান!

--আঃ, প্লিজ চুপ কর... আজেবাজে! ডোন্ট বী রঅ। মুখ খারাপ করছ!

--অস্বীকার কোরনা কলি, তুমিও জান। কতদিন ঘুমের ভেতর... বলব?

--বানিয়ে কিছু বোলনা জাতো... ডোন্ট ইনসাল্ট মী। নিজের মতো ভেব না, আমি তোমার সব জানি।

--রাগ করছ? নাগো, সবটা তুমিও জান না। জানানোর সুযোগ দাওনি! তবে, তুমি আমাকে লুকোতে...! আমার মিয়নো আঁচে তুমি আর জ্বলতে না কলি! আগ্রাসন চাইতে, চাইতে রেপড্‌ হতে... কড়া বিড়ি আর ধেনোর গন্ধে তুমি সুখ পেতে, কলি! কালো লোমশ শক্ত হাত... দলে মুচড়ে রক্তমুখী আঁচড়ে দুহাতে...! পারেনি আমার ফর্সা আঙুলে সোনার আঙটি... নরম করে তোমায় ছোঁওয়া, যাতে না -!

--এসব কথার কি সিগ্‌নিফিকেন্স হয়, জানো জাতো? আমি কোনও চোরা কারবারি নই তোমার মতো।

--আমি চোরা কারবার করতে চাইনি কলি। শুধু তোমায় অসম্মান করতে চাই না বলে! কলি, তুমি নিজের সন্তানের আধার নিজে হতে চেয়েছিলে। ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলে... বিরক্ত হচ্ছ!

--স্ট্রেঞ্জ! হাস্যকর। সেটা কি অস্বাভাবিক চাওয়া নাকি? না অনৈতিক?

--কোনওটাই না, তোমাকে সামান্য হলেও বুঝি। কলি, ওদের তিনটে বাচ্চা নিজেদের তৈরি করা, দু’বছর পরপর...। তুমি একদিন আমাকে বলেছিলে কথাটা। ভুলি কি করে? ওই হরেন ঝাঁপিয়ে পড়ত মাঠে – অসংখ্য সক্রিয় বীজ নিয়ে, তারপর... আশা বীজতলা! তুমি কতখানি চেয়েছ কলি জানি, আমি পারি নি... পুরোটা পারি নি। মেয়েটা অনেক ছোট তোমার চেয়ে -।

--জাতো, পাঁচবছর পেরিয়ে গেছে। কলাপকে তুমি ভালবাসনা?

--তোমার, আমাদের সন্তান... গভর্জাত বলতে পারা যায়? বল কলি, সঙ্কোচ কোরনা, আমি তোমার সমব্যথী। হরেনকে আর একবার মাত্র অনুরোধ করলেই কিন্তু... নিয়োগ প্রথা? মহাভারত?


বাল্‌বের টিমটিম মরচে আলো। তাও ভাগ্য, লোডশেডিং নয়। অঝোর বৃষ্টি থেমে গেছে ঘণ্টাখানেক আগে। পেছনে হুহু জঙ্গুলে জলো হাওয়া, গাছপালার তীব্র শব্দময় অস্তিত্ব। বাঁশের টেবিলে গড়াগড়ি যাচ্ছে কতগুলো খালি বোতল। অথচ পারিজাত মদ্যপ নয়... অবকাশে শৌখিন দু’এক পেগ। বাদলার পোকা উড়ে উড়ে ঘরে। সিলিঙে কখন সাপের ছোট বাচ্চা গুঁড়ি মেরে... চোখে পড়ে না। এলোমেলো সব, সব পাগল পাগল। আজ খিচুড়ি, ডিমের কষা রেখে দিয়ে গিয়েছে গদাই। ভালো গন্ধ ছিল ঘরে... এখন আর আসছে না। আশা তখন আসে নি।

--দাদাবাবু! থালা বাসুন নিতে এসেচি।
কত রাত! দরজার সামনে সে-ই তো? দুটো দেখছে পারিজাত, মাথা ঝাঁকায়... জ্বলজ্বল করে চোখ। ঐ সে!

--এসো, বসো। বৃষ্টি পড়ে?

বসে, মেঝেতে উবু। খোঁপায়, মুখে জলফোঁটা টোপায়। শাড়ি স্যাঁতস্যাঁতে।

--থামে নাই বিশ্‌টি, খালি কমেচে। খান নাই?

শুধু তাকিয়ে থাকাটাই এত ভাল... ক্যামেরাটা সে মোছে। এখন টিপ্‌সি, ফোটো কি করে হবে? নিতান্ত রোগা পাতলা গেঁয়ো বৌ।

--আশা! আশাই করি নি, জান? এখানে কি করে?

--আমিও করি নাই বাবু। আমারে গাঁ থেকে...


থেমে গেছে, জানতে না চাইলে কি বলা যায়?

--বল... আমাকে বল। এই, আমায় দাদাবাবু বলিস না।

এই জিলাতেই বাড়ি। থাকতে দেয়নি গ্রামের মানুষ। শরীরবেচা নষ্টপচা মেয়ে। গভ্‌ভ-ভাড়া দেয় কারা? হরেনের দু’হাত ভর্তি সেই পেট-ভাড়ার টাকা... তাড়িয়ে দেবার আগে তারও সন্দেহ! কি করে কী টের পেয়েছে। বদনাম দিলে,

--ফস্‌সাপানা বাবুটার সনে নষ্টামি?

--যেমন করে আমিও, কলিকে... শুধু অনুমানে, শুধু ধারণায়। কলি শক্ত মেয়ে, খুব ভাল মেয়ে খুব। খুব কষ্টে, ওঃ! কষ্ট ওর।

--কি-কিছু বলচ? বাবু?


তারপর এঘাট ওঘাট। কারও সাথে এই বনবাংলোয় বছর তিন। রান্না ভাল করে। ঝালঝাল, মশলার সুস্বাদ, তারিফ করে ট্যুরিস্টরা।

--অনেক রোগা হয়েছ। বাচ্চাটাকে রেখে আসতে খুব দুঃখ হয়েছিল, আশা? বুক গুঁড়িয়ে গিয়েছিল, না?

--অই- কোকিলের ছা... টুকুন খালি খালি, তেমন নয়, ঝ্যাতটা...

অন্ধকারে পারিজাতের খালি শরীরে বগলের গুহায় মুখ গুঁজে... ঐ সরু তক্তপোষে, ঐ বিছানায় তারা দু’জনে, রাতভর। আশার গা থেকে ঘাম, বৃষ্টি, মশলার স্যাঁতান গন্ধ। একটু আলগোছে ছোঁয় পারিজাত - ওর সিঁথি থেকে পায়ের আঙুলের ডগা, সাদা লম্বা আঙুল দিয়ে, টিপটিপ টিপটিপ। টাটকা উষ্ণ হাতরুটির স্পর্শ। আশা চুপ। অপেক্ষা কি দিবাস্বপ্ন? আবেশ? কত বছর পরে বনবাংলোয় দাবানল জ্বলে দাউদাউ। পরণের চেকচেক লুঙ্গি, লতাপাতা শাড়ি, মেঝেয় কখন যেন। তারপর চুপ।

--আশা রে, পুরো করে নিলাম।

--কিগো বাবু?

--আঃ স্টুপিড একটা - বাকি ছিল যেটা...। বুঝলে না? পাপ হল নাকি তোর? আশা?

--পাপ নাই। ওটা তুমি আমায় দিলে গো।

--না, তুই তো দিলি! আর একটা চাইব? তোর কাছে? আমার, মানে তোর, যদি আসে কেউ - আমি জানিনা, আমার বীজ এভাবে ফুল ফোটায় কিনা... জানতে পারি নি... আশা সবটাই... তুই-

--কী গো?

--যে নামটা রাখতে চেয়েছিলাম ওর, কৃষ্ণকলির আপত্তিতে...!

--ওর নাম কি বাবু? বউদি’ ভাল আছে?

--হ্যাঁ আছে। ওর নাম কলাপ, মানে সুন্দর, মানে পেখম। শোন্‌ যদি কেউ আসে, তুই নাম রাখিস... পা-শা - মানে ছোট্ট, মানে রাজাও। আমার স্বপ্নের ফুল... ওকে আয়ু দিবি, বল্‌?

চোখ খোলে না আবেশে। পারিজাত হারিয়ে যাচ্ছে গাঢ় বৃষ্টিবনে।

--বাবু! ও বাবু, ই ক্যামনধারা নাম গো? জান, ইখানে ঝ্যা মোউর আসে গো! রঙিল প্যাখম মেলা... কেমন সোন্দর।

--আঃ, বড্ড বাজে বকিস্‌। বল্‌, রাখবি কিনা?

--তা রাখব বাবু... লোকে আমারে যাই বলুক।

ট্রেকার প্রচন্ড ঝাঁকাচ্ছে। বৃষ্টিতে এদিককার রাস্তার জঘন্য দশা। এতক্ষণে বনবাংলো থেকে মাত্র একঘন্টার পথ এসেছে। ট্রেন ধরা – কে জানে কি হয়? পারিজাত ক্যামেরার উইন্ডো খোলে। ছবিগুলো ভাল হল কি না... পাখির ছবি ভালবাসে কলাপ, দেখে খুশি হবে। জ্বর হয়েছে, আহা। ঘোরাতে ঘোরাতে আরও এলোমেলো কিছু, আবছা... শিল্যুট না, ব্যাঙের মাথা! রাবিশ্‌ সব, ডিলিট করে দিতে হবে।




বিদুর গল্প লেখার গল্পটি

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

বিদুর গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হল কালিমাটি১০১ সংখ্যায়। লেখার বিষয়বস্তু ‘পরকীয়া।’ পরকীয়া শব্দটিই নামে-গন্ধে সরস। লুকনো বাক্সের শুকনো লালগোলাপ, পারফ্যুমমাখানো নীল চিঠি। লোলিটা, লেডি চ্যাটার্লি, আনা কারেনিনা, শ্রীরাধা, বিনোদিনী, অচলা... পৃথিবীর সাহিত্যে এবং বাস্তবে অসংখ্য গোপনচারী নামের সারি।

পরিচিত ও স্বল্পপরিচিতদের অভিজ্ঞতা আগ্রহ নিয়ে শুনি। গল্পে চুরি করার ইচ্ছেও হয়। লিখতে গেলেই মনে হয়, এই বিষয় নিয়ে কত অসংখ্য অগ্রজ কবি ও গল্পকার লিখে ফেলেছেন।

এবিষয়ে অভিজ্ঞতাবিহীন হয়েও ইচ্ছে হল, লেখা যাক কিছু। পরকীয়া অর্থে আইনি স্বীকৃত নারী বা পুরুষ ছাড়া প্রেমবহির্ভূত সম্পর্ক। অভিধান আঁতিপাতি খুঁজে এই পেলাম। এটি কাগজে লেখা এক থিওরি। আসল কথাটা প্লেটোনিক প্রেম? না শরীরী সংশ্লেষ? অতৃপ্তি না সম্পৃক্তি? পরস্মৈপদী আর পরকীয়া সমার্থক? কুটকচাল চিন্তার মধ্যে ঘুরঘুর, গল্পের দেহ আর খাড়া করতে পারিনা।

বহু বছর আগে ‘সারোগেট মাদার’ নিয়ে কোনও বাংলা নাটক দেখেছিলাম। তখন বিষয়টা ছিল পরীক্ষামূলক স্তরে। সিনেমা ইত্যাদিতেও বোঝানর চেষ্টা চলছিল, এভাবে যদি অভাব পূরণ করা যায়! এদিকে দেখা গেলে, বিশ্বপুরানে, মহাভারতে বহু বিশিষ্ট চরিত্রের জন্ম এভাবেই। মাথায় ছিল ভাবনাটা। পরকীয়া লেখায় আনা যাবে কি! নিয়োগপ্রথায় সন্তানলাভ, সেও তো পরকীয়, হলেই বা পিতামাতার বীজ।

উঠি, বসি, হাতড়াই। কীভাবে আনা যাবে পরকীয়া? পরকীয়া প্রেম? মিলেটিলে জগাখিচুড়ি হয়ে যাচ্ছিল। কাজেকর্মে, সামাজিকতায় অদেখা গল্পের কাঠামো গাঁথতে থাকি। রোদেলা দিন দেখি। মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখি। শেষ পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার রঙ দেখি। গল্প আসে আসে, ধরা না দিয়ে পালিয়ে যায়। শেষবেশ জোর করে কম্প্যুটারে বসি এবং সবচেয়ে আরামের ব্যাপার, খুব সহজে গড়গড় করে প্রাথমিকভাবে গল্পের কাঠামো নেমে আসে।

মা তখন আমার কাছে এসে ছিলেন কিছুদিন। কম্প্যুটার চালিয়ে গল্প খুলে দিয়ে বলি, ‘দেখো তো পড়ে, কী বোঝা গেল।’

মা পড়ে বললেন, ‘সারোগেট মাদার নিয়ে লিখেছিস? ভালো হয়েছে।’

মুখে তো বললাম, ‘হ্যাঁ, আচ্ছা’। মনে মনে ভাবলাম, পরকীয়া প্রেমের কথা কি প্রকাশ করা হল? নাকি শুধু অন্যটাই? সব শাটার বন্ধ করে পাঠক হয়ে, নিজে আবার আগাপাশতলা পড়ে ফেলি। ছাঁটকাট করি, দুএক টুকরো জুড়ি, ছোটোখাট অলঙ্কার পরাই, পালিশ লাগাই। পালিশ তুলে কোথাও খড়খড়েও করি একটুআধটু। শেষে মনে হয়, যা বলতে চেয়েছি... আনা গেছে।

জনাদুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে মেইল করি। দুজনেই খুব উচ্ছ্বসিত। ‘পরকীয়া-উত্তীর্ণ কাহিনি’... বলল একজন।

বললাম, ‘আরে ওই তো সবকিছুর গোড়ার কথা মহাভারত... স্বকীয়া পরকীয়া...।’

৫টি মন্তব্য:

  1. এটি 'ঝুরো গল্প'-এ পড়েছিলাম। যা জানতাম না তা হচ্ছে গল্পর গল্প বা হয়ে ওঠার কাহিণী। এই অংশেও শ্রাবণী সমান দক্ষতায় সাবলীল।
    গল্পটিতে ছোট ছোট বাক্যের ইঙ্গিতময় প্রয়োগ পাঠক আমাকে টান টান করে রাখে। দু'এক জায়গা অবশ্য বুঝিনি (হরেনকে আর একবার মাত্র অনুরোধ করলেই কিন্তু... নিয়োগ প্রথা? মহাভারত? ) আমার অক্ষমতার কারণে... যদি খানিক ব্যাখ্যা পেতাম...

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ঝুরো গল্প-তে নয়, কালিমাটি১০১ সংখ্যায়। ধন্যবাদ মতামতের জন্যে।
      শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

      মুছুন
  2. Jinbonto chhobi, choloman jibon, ojosro ovinandan lekhika ke

    উত্তরমুছুন