শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

সাগর রহমানের গল্প : দিনু পাগলা

গল্প জাগে
কেরামত মিয়া হাইস্কুলের মাঠে 'বিয়াতি বনাম আবিয়াতি' ফুটবল ম্যাচ। মাঠ ঘিরে লোক। হৈ চৈ। চিৎকার। স্কুলের বারান্দায় প্যান্ডেল টানিয়ে মাইক বাজানোর ব্যবস্থা , তাতে প্রথমে 'আমার লাইন হয়ে যায় আঁকা বাঁকা', তারপর 'মুন্নি বদনাম হুয়ে', তা থেকে মুরব্বী কারো ধমক খেয়ে বেলাল মাইক সার্ভিসের ছোকরা রাগ হয়ে বাজিয়ে দেয় 'ইয়া নাবী সালা মালাইকা'।
খেলার ধারা বিবরণী দিতে মাইকের আয়োজন। এখন খেলার বিরতিতে ক্যাসেট বাজিয়ে এবং বদলিয়ে বেচারা ক্যারিশমা দেখাতে গিয়েছিল। লোকজন যারা এতক্ষণ নানান ধরনের বাংলা, হিন্দি চটুল গান শুনছিল, তারা 'ইয়া নাবী সালা মালাইকা' শুনে হতাশ হয়, কিন্তু যেহেতু আরবি বাজছে ক্যাসেটে, তা পাল্টানোর কথা বলার সাহস কারো নেই, পাছে গুনাহ হয়। ফলে, খেলা শুরু হবার আগে আর এ থেকে মুক্তি নেই ভেবে দর্শকরা ধনেশ বাদাম ব্যাপারীর 'দুই ট্যাকায় টিপাটিপি, খালি টিপেন আর মুখে দেন' ডাকে মনোযোগী হয়, 'দুই টাকায় টিপাটিপি'র কথা শুনে তারা মজা পায়, হাসে, ধনেশকে ডেকে বাদাম কিনে, 'টেস' করার কথা বলে কেনার আগেই একটা ভেঙে খেয়ে ফেলে, কেনার পর পোড়া বাদাম পাল্টিয়ে নেয়।  
মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোণে চুপচাপ বসে ছিল দিনমনি সাহা। তার ডান পায়ের তলায় গেঁজ পেকে আছে, দু'আঙুল দিয়ে গেঁজ টিপে ধরে রেখে ব্যথা অনুভব করা তার মুদ্রাদোষের মত। গেঁজটিকে সে ক্ষণে ক্ষণে টিপে ধরে রাখছিল আর অত্যন্ত তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখছিল মাঠের খেলোয়াড়দেরকে। একসময় বিরতীর সময় শেষ হয়, রেফারীর হুইসেল বাজে। খেলোয়াড়রা লবণ মেশানো আদা ও লেবুর টুকরো মুখে পুরে হাত-পা খেলাতে খেলাতে মাঠে নামতে থাকে। মাইকে ওয়াজ বন্ধ হয়ে ধারা বিবরণী শোনা যায়, 'দর্শকমণ্ডলী, বিয়াতী বনাম আবিয়াতী ম্যাচের হাফটাইম পরে আবার খেলায় শুরু হতে যাচ্ছে...' ইত্যাদি ইত্যাদি। আশেপাশের কেউ খেয়াল করে না, দিনমনি হঠাৎ অনেকক্ষণ ধরে তার পায়ের গেঁজের কথা ভুলে যায়, দু’বার কোন কিছু মেনে না নেবার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায় এদিক ওদিক, আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে করে খেলোয়াড়দের গুনতে চেষ্টা করে, আবার গোনে, আবার মাথা ঝাঁকায়, বিড়বিড় করে কি যেন বলে এবং হঠাৎ, সটান উঠে দাঁড়িয়ে ভীড়ের ভিতর হতে মাথা গলিয়ে সামনে আগায়। তারপর লাফ দিয়ে মাঠে নেমে এক দৌড়ে রেফারীর সামনে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় চিৎকার করে, 
একজন পেলেয়ার কম ক্যান? ও রেফারী সাব, এইটা কেমুন কাম অইল, পেলেয়ার একজন কম ক্যান?

ফ্ল্যাশব্যাক
জাভিদ্দা, অত ভিতরে যাইচ না তো, চল আরেক দিকে যাই। 
নিজাম মৃদু আপত্তি তোলে। কিন্তু জাভেদ অদম্য। 
তোর কি ডর লাগেনি?
প্রশ্নটা অসম্মানজনক নিজামের জন্য, বিশেষত সে এবার সেভেনে উঠেছে, যেখানে জাভেদ মাত্র প্রাইমারী পাশ করল। কিন্তু আসলেই তার একটু ভয় ভয় লাগছে। সে গলায় সাহস ফোটানোর চেষ্টা করে বললো, 
ডর লাইগব কিল্লাই। বুকে আয়তুল কুরসি পড়ি ফুঁ দিছিনা? কিন্তুক এদিকে মনে অয় নাই। চল অন্য দিকে গিয়া খুঁজি।
ধুর, কষ্ট না কইরলে কত্তুন পাবি ব্যাটা? কিচু অইতো ন। আয়, আরেকটু খুঁজি চাই।
নিজামের অস্বস্তির কারণ বুঝতে পারে জাভেদ। সে তাকে অন্য মনস্ক করার জন্য বলে, দেখবি, কাশেম জ্যাডায় ফাস্ট পেরাইজ পাইব। বাপরে, যেই টপ টপ করি মাছ তোলে! দেখছত নি তুই?
আরে যাহ্, তুই যতীন ব্যাপারীর খবর রাখছ? হে বার কেজি এক রুইত উঠাইছে। মাইকে ঘোষনাও দিছে। হুনছ নাই?
তারপরেও কাশেম জ্যাডায় জিতবো। হে কয়ডা জাল দিয়া মাচার নিচে মাছ জিয়াইয়া রাখছে, জানস?
নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি করতে করতে তারা আরো ভিতরে ঢোকে জঙ্গলের।
আজকে যদি একটা পিঁপড়ার বাসা পাওয়া যায়, তাহলে কাল আর আজকের বিক্রির টাকা মিলিয়ে তিন নম্বরি বলটা তাদের কেনা হয়ে যায়। বনরুটির সাথে পিঁপড়ের ডিম হলো মাছদের কাছে জেয়াফত খাওয়ার মত। একটা বড়-সড় ডিমওয়ালা পিঁপড়ার বাসা ভাঙতে পারলে আর চিন্তা নাই। কালকের পিঁপড়ার বাসাটা তারা বেচেছিল চল্লিশ টাকা। আজকেরটা পেলে শেষদিনে কমসে কম পঞ্চাশ টাকা বেচতে পারবে। আড়ল দীঘিতে বড়শি বাওয়ার প্রতিযোগীতা হচ্ছে গত দুই দিন ধরে। এক হাজার টাকা টিকেট কেটে বড়শীওয়ালারা দিনরাত বড়শী নিয়ে বসে আছে। দীঘির চারপাশ ঘিরে মাচা পড়েছে সারি সারি। বড়শী বাওয়ার সময় আটচল্লিশ ঘণ্টা। এর মধ্যে যত বেশি মাছ উঠানো যায়, তত লাভ। অবশ্য বেশির ভাগেরই লোকসান হয় শেষ পর্যন্ত, কিন্তু তবুও যতবার বড়শী বাওয়ার প্রতিযোগীতা হয়, ততবারই বড়শীওয়ালাদের ভিড় লেগে যায়। এর সংগে আবার পুরস্কারের ব্যবস্থাও আছে, সব'চে বেশি মাছ যে ধরতে পারবে, তার জন্য পাঁচ ব্যান্ডের রেডিও পুরস্কার। দ্বিতীয় পুরস্কার তিন ব্যাটারী টর্চ লাইট আর তৃতীয় পুরস্কার এক ব্যান্ডের রেডিও। এক কোণায় মাইক বাজানোর ব্যবস্থাও আছে। কারো বড়শীতে মাছ উঠলেই চিৎকার করতে করতে ঘোষনা দেয়া হয়, 'মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ, হাফেজ মিয়া দেড় কেজি ওজনের একটা রুহিত উঠাইছেন। মারহাবা। মারহাবা। ওদিকে উত্তর পাড়ে মশি ব্যাপারীর বড়শীত টান পড়ছে, দেখা যাক, কি উঠান তিনি, প্যাঁচ খেলছেন, প্যাঁচ খেলছেন...', সারাদিন এরকম বিবরণ দেয়া চলছে। আর মাছদের লোভ দেখানোর জন্য তাই সারা গ্রামের তরকারীর বাসী, ভাত পচা, পাঁচমিশালী মশলা, কেঁচো সব কিছুর কদর চলছে এখন বড়শিওয়ালাদের কাছে। এসবের মধ্যে সব'চে উত্তম হলো পিঁপড়ার ডিম। গ্রামের ছেলেরা সেই সব পিঁপড়ার ডিম খুঁজে খুঁজে এনে বিক্রি করে তাদের কাছে। 
ইতিমধ্যে গ্রামের সব পিঁপড়ার বাসাই উজাড় হয়ে গেছে মোটামুটি। পিঁপড়ার বাসা খুঁজে পাওয়া এখন প্রায় ভাগ্যের ব্যাপার। বড় পোলাপাইনেই খুঁজে পায়না আর সহজে। তার ওপর আছে দূর্বলের উপর সবলের চিরাচরিত অত্যাচার। জাভেদ আর নিজাম যদি কষ্টে সৃষ্টে একটা পিঁপড়ার বাসা খুঁজেও বের করে, বড় কেউ দেখলে বলবে, 'যা যা বাড়িত যা। কার গাছের থেইক্যা বাসা ভাঙতি আইছস। কই দিমু তোর বাপেরে।' তারপর নিজেরাই সে পিঁপড়ের বাসা ভেঙে নিয়ে যাবে। সুতরাং, তারা এসে পড়েছে বাইত্তার জঙ্গলে পিঁপড়ার বাসা খুঁজতে। বাইত্তার জঙ্গল গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। এদিকে পারতপক্ষে গ্রামের লোকজন আসে না। জঙ্গলটি প্রাচীন সব গাছ আর ঝোপঝাড়ে ভরা। তার ওপর জনশ্রুতি আছে জ্বিন-ভূতের। সুতরাং, গরু দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে না গেলে আর ফষ্টিনস্টি করার দরকার না পড়লে, জায়গাটাকে সাধারণত সবাই এড়িয়ে চলে।
নিজাম এবং জাভেদের চোখ গাছ হতে গাছে ঘুরে বেড়ায়। 
আইজগা যদি একটা পাই যাই, চোধরীর পোলার কাছে বেচিয়ুম। হেই মিয়া বালা দাম দে। রফিক্যায় কাইলকা একটা বেচছে ষাইট ট্যাকা। আমগো আর পঞ্চাশ ট্যাকা হইলেই হয়, তাইলে কাইলগাই বলটা কিনি পালাইয়ুম। কাউরেও খেলতাম দিতাম ন্ । শুধু তুই আর আমি, ক্যান?
কথা বলে বলে নিজামকে এবং নিজেকে উৎসাহ দেবার চেষ্টা করে জাভেদ। পায়ের তলায় শুকনো পাতা মচ্ মচ করে গুঁড়ো হতে থাকে। বাইত্তার জঙগলের ভিতরে ঘন সবুজ কচুরিপানা চাওয়া মজা পুকুর। লোকে বলে গান্ধী পুকুর। তার ভিতর থেকে থেমে থেমে টুব্ টুব্ টুব শব্দ উঠে। বাঁশ গাছের মুড়া হতে একটা সজারু বেরিয়ে ছুটে যায় আচমকা। ঘন গাছের ভিতর দিয়ে ভাল করে তাকালে দূরে ধানের খোলা ক্ষেত চোখে পড়ে। দুইজনেই সে দিকে তাকিয়ে নিজেদের সাহস দেয়, 'ওইত্তো, গেরাম দেখা যায়। বেশি ভিত্রে হান্দাই ন ত'। 
ঠিক তখুনি আচমকা মড়্মড়্ চড়্চড়্ শব্দ হতে হতে ঝুপ্ করে একটা বিকট শব্দ করে কিছু একটা মাটিতে পড়ে। তাদের কাছে মনে হয়, ঝোপজঙ্গল ভেদ করে আকাশ হতে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে ওটা। জাভেদের প্রায় ঘাড়ের কাছেই পড়ে, কিন্তু জাভেদের আগে জিনিসটা কি, বুঝতে পারে নিজাম। 
ততক্ষণে তারা ঢুকে গিয়েছিল বাইত্তার জঙগলের অনেকটা ভিতরে। এক জায়গায় নারিকেল গাছের একটা বুড়ো ডাল ঝুঁকে পড়ে আটকে পড়েছিলো পাশের আমগাছটার সাথে, ঝুলে যেন বেড়া হয়ে ছিলো তাদের পথে। জাভেদ হাতের দা দিয়ে কুপিয়ে  কাটার চেষ্টা করে ডালটাকে, নিজাম এসে হেঁচকা টান দেয় সজোরে এবং ডাল-পালার ভেতর হতে জিনিসটা লাফিয়ে পড়ে জাভেদের ঘাড়ের কাছে, গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। 
জিনিসটা এবং সাথে একখন্ড ঝুরঝুরে পাটের রশি।
জিনিসটা একটা ভূত।
ভূত দেখার কোন অভিজ্ঞতা তাদের নেই, ভূতের গল্প তারা শুনেছে এবং ভূত কি রকম হয়, তাদের জানা আছে। ফলে একটা নরকংকাল যখন বাইত্তার জঙ্গলে লাফিয়ে নেমে পড়ে জাভেদের ঘাড়ের কাছে, জিনিসটা গ্রামময় চাওর হতে সময় লাগে বড়জোর আধঘন্টা। বারবার কেঁপে কেঁপে ভিরমি খেতে থাকে জাভেদ। চোখ উল্টে নিজাম বলে উঠে থেকে থেকে, বাউরে, ভূতে খাই ফালাইলো রে।

নরকংকাল সংক্রান্ত স্মৃতিশূন্যতা 
মজফ্ফরের চা দোকানে মকবুল জ্যাঠার কাশি থামার অপেক্ষা করে বাকি কাস্টমাররা। ঝাড়া ত্রিশ সেকেন্ড কেশে মকবুল জ্যাঠা রায় দেয়ার মত করে বলে, নাহ্, আমার বয়স হই গেছে পেরায় সাড়ে তিন কুড়ি। আমগো গেরামে এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটে ন্, আমি শিউর হই কইতাম পারি। পুলিশে আমারে জিগ্গায়, প্রেম করি ধরা পড়নের কোন ঘটনা আপনে জানেন নি? আমি কইছি, আমগো আমলে পোলা মাইয়ারা বিয়ার দিনের আগে কেউ কাওরে চোখের দেখাও দেখতে পাইরত না। কিরে মোবু, আরো কদ্দুর চিনি দেচ্ না চায়ে। এত বখিলামি করছ্ কিল্লাই? 
মজফ্ফর চিনির ডিব্বা খুলে চামচ দিয়ে একপাশে পিঁপড়ে সরিয়ে ভরা এক চামচ চিনি ঢেলে দেয় মকবুল মিয়ার চায়ে। মুখে হাসতে হাসতে বলে, জেডা বুড়া হইলে কি হইব, মুখের টেস্ যায় ন্। আপনের মত বয়স অইলে আমগো ডাইবিটিস হই চিনি খান বন্ধ হই যাইব। 
কথার মোড় অন্য দিকে ঘুরে যাবার ভয়ে বলে উঠে মোহাম্মদ উল্যা, তাইলে এই লাশ আইলো কত্তুন? পুলিশে কইল, কঙকাল খান বেডা মানুষের। কিন্তুক কোন সময়ে, ক বছর আগে লোকটা গলাত ফাঁস লই মইরছে, এইটার কোন ঠিক ঠিকানা নাই। টাইম বাইর কইরতে গেলে নাকি ঢাকা তন বড় ডাকতর আনা লাইগব। 

জহির ডিগ্রি পাশ করে গ্রামের স্কুলে নতুন করে ঢুকেছে, তার প্রয়োজন পড়ে একটা বিশেষজ্ঞ মতামত দেবার। বেলা বিস্কুটে কুটুস করে কামড় দিয়ে আলোচনার উপসংহার টানার মতো বলে, পুলিশের কতা হইল, তাগো রেকর্ডে এই এলাকা থেইক্যা কোন মাইনষের নিখোঁজ হইবার ঘটনা নাই। আর আমগো জমানায় ত দেখি ন্, জেডার জমানায় ও তো এই ধরনের কোন মানুষ হারাই যাওনের কতা কারো জানা নাই, তাইলে এইটা লই হেগো আর মাতামাতি করি লাভ কি? তারা এখন একটা জিডি লেইখা জিনিসটারে মাডি দি ফালাইবো। 
দোকানের বাহিরের দিকে পাতা বেঞ্চিতে বসে চুপচাপ বিড়ি টানছিল দিনমনি। মুখে জমা ধোঁয়া বের করে, পায়ের গেঁজে দুই আঙুলে চাপ দিতে দিতে ভীষণ হাহাকারের সুরে সে বলে, আহারে বেচারা! কার পুত, কার জামাই, কোনাই বাড়ি, মইরচে কোনদিন, কোন ঠিক-ঠিকানা নাই। দেইখচ নি কারবারটা?

তখন তারা এ প্রজন্মের, ও প্রজন্মের স্মৃতি হাতড়ায়। জনে জনে বিষয়টা নিয়ে বলাবলি করে, জল্পনা-কল্পনা বাঁধে। পুলিশের নানাবিধ জেরার মুখে অকপটে মনে করার চেষ্টা করে। পুরো এলাকায় কিংবা সমগ্র ইউনিয়নে কোন পুরুষ মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাবার কথা শোনা যায় না কোন ঘর হতে। কারো নিখোঁজ হয়ে থাকা ছেলে কিংবা স্বামী কিংবা বাবার ঘটনার কথা তাদের মনে পড়ে না। এ সংক্রান্ত কোন স্মৃতি তাদের গ্রামের আনাচে কানাচে বেড়ে উঠা কিংবা বেড়ে উঠে জঙ্গলা বেঁধে যাওয়া ঘটনাবলীতে শত শত হাত চোখ মুখ হাতড়েও উদ্দেশ পাওয়া যায় না । 
অবশেষে তারা এক মত হয়, কোন লাওয়ারিশ পুরুষ এই এলাকায় গত তিন প্রজন্মে হারিয়ে যায়নি, হারিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়নি, নিখোঁজ হয়ে গিয়ে বাইত্তার জঙ্গলে আম গাছে গলায় ফাঁসে ঝুলে পড়েনি, ফাঁসে ঝুলে পড়ে নিজাম আর জাভেদের পিঁপড়ের বাসা খোঁজার ক্ষণটিতে ঘাড়ের রশি ঝুরঝুরে হয়ে ঝরে পড়ার জন্য বছর বছর ঝুলে থাকে নি। 
ফলে চেয়ারম্যানের গম চুরি ধরা পড়া অথবা মহম্মদের ঝি’র লগে কায়সের ভালবাসাবাসির ঘটনা চাওর হওয়া ভুলতে যে ক’দিন লাগে গ্রামবাসীর, বাইত্তার জঙ্গলের নাম পরিচয়হীন লাশটির কথা ভুলতেও তাদের প্রায় একই সময় লাগে, হয়তো কয়েক সপ্তাহ একটু বেশি, এই যা।

জনশূন্যতা সংক্রান্ত দিনমণি সাহার পর্যবেক্ষণ
'মানুষের চোখে অইছে কি? কেউ দেখতেছে না যে একজন মানুষ নাই হইয়া রইছে?'- এই অদ্ভুত জিজ্ঞাসাটি যখন দিনমণি সাহার মাথায় প্রথম ঢুকে পড়ে, তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। গঞ্জ হতে বাড়ী ফিরছিলো সে। বড় রাস্তার মোড়ে এসে তার হাঁপ ধরে গেল। মাথা হতে চালের বোঝাটা নামিয়ে খানিকক্ষণ জিরোতে দাঁড়ালো। কপাল বেয়ে তার র্দ র্দ করে ঘাম ঝরছে। কোমর হতে গামছা খুলে ঘাম মুছতে মুছতে সে দু'বার আনমনে ডাকল, হরি, হরি। গ্রীষ্মের এই দিনগুলি যেমন লম্বা, সন্ধ্যেটা ততই ক্ষণস্থায়ী। সূর্যটা টুক করে পশ্চিম পাড়ার কাজী বাড়ির লম্বা তাল গাছটার মাথা ছোঁয়, তারপর কেটে যাওয়া ঘুড়ির মত তার কা- বরাবর ঝরে পড়ে ঝোপজঙগলের ভিতর। বড় রাস্তার এ মোড়ে বিশুর চায়ের দোকান। বিশু নতুন বিয়ে করেছে। গত কয়েকদিন ধরে যেদিন ইচ্ছে দোকান খোলে, যেদিন ইচ্ছে দোকান বন্ধ করে বাড়ি বসে থাকে। আজকে মনে হচ্ছে তার দোকান বন্ধ রাখার দিন। দোকান খোলা থাকলে জায়গাটিতে সারাক্ষন লোকজনের একটা ছোট খাট ঝটলা লেগে থাকে। আজকে জায়গাটি সুনশান। দোকানের পেছনে চাপকল। কলটির ওয়াসার না কি জানি নষ্ট, মুখ দিয়ে সারাক্ষণ নিজে নিজেই ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে। পানি ঝরার টিপ্ টিপ্ ক্ষীণ শব্দটিকে এখন সন্ধ্যার এই নির্জনতায় ঝর্ণার কলকল ধ্বনির মতোই জোরে মনে হচ্ছে। 
পানি ঝরার শব্দটি কানে আসতেই দিনমনির মনে হয়, তিয়াস লেগেচে। ভাবনাটা বাক্যে সেজে সশব্দ হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে তার নিজের অজান্তে। তার কথার উত্তরেই যেন কলের দিক হতে একটা ঘোঁৎ করে নিঃশ্বাস ফেলার মত শব্দ ভেসে আসে। চমকে উঠে দিনমনি সে দিকে তাকিয়ে দেখল, এক টুকরো ঘন বাতাসের মত ঝাপসা শরীরের একজন মানুষ উবু হয়ে বসে আছে কলের গোড়ায়। বসে বসে কলের মুখে মুখ লাগিয়ে চুক্ চুক করে পানি খাচ্ছে। 
দিনমনি ভীত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, কে? কে?
তখন মানুষটি ধীরে সুস্থে উবু হওয়া থেকে উঠলো। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, মাথা নিচু করে, প্রায় মিনমিনে স্বরে বলল, আমি যে নাই, গেরামের কেউ বিষয়টা খেয়াল কইরতেচে না, এইটা কেমুন বিচার? 
তারপর মানুষটি দিনমনির দিকে তাকালো কাতর দৃষ্টিতে। দিনমণির মনে হলো, মানুষটির চোখে অশ্রু চক্চক্ করছে। দিনমনির চোখে চোখ রেখে, তার হতভম্ব চোখের সামনে ঘন বাতাস হতে হালকা বাতাস হয়ে ধোঁয়ার মত মিলিয়ে গেল মানুষটি হঠাৎ। 
দিনমনির গা ঝিলিক দিয়ে উঠলো কয়েকবার এবং ঠিক তখুনি তার মনে হলো কথাটি, তাইতো, মাইনষের চোখে অইছে কি? কেউ দেখতেছে না যে একজন মানুষ নাই হইয়া রইছে? 
ন্যায্য ভাবনাটি মাথায় নিয়ে দিনমনি তখন কলের মুখে মুখ লাগিয়ে পানি খেল ঢক্ ঢক্ করে। পানিতে তার মুখ গলা ভিজে গেল। সে গামছা দিয়ে পানি মুছে আপন মনে ডাকলো, হরি হরি। তারপর কোমরে গামছা বাঁধলো শক্ত করে। চালের ভারী বোঝাটি দুই হাত দিয়ে আলগোছে মাথায় তুলে দ্রুত বাড়ির পথ ধরলো।
উঠোনে পৌঁছে সে দেখল, তার বউ তুলসী তলার প্রদীপ নিভিয়ে ঘরে যাচ্ছে। দিনমনি বউকে ডাকল, ঝিনু, বিষয়টা কেরুম হইল, কও তো? একটা মানুষ নাই, কারো হেই ব্যাপারে কোন গ্যারাজ্জই নাই? 
ঝিনু অবাক হয়ে তাকাল, কার কতা কন? 
দিনমনি বোঝাটা সজোরে ঘরের দাওয়ায় রাখতে রাখতে বলল, আরে কইতেছি বাইত্তার জঙ্গলের মানুষটার কতা। চাইরদিকে খেয়াল কইরলেই তো বুজন যায়, একটা মানুষ কম। বাপুরে বাপু, মানুষের কারবার দেখলে অবাক অই। হরি, হরি।
ফলে যে কথাটা ঝিনু জানতে পারে একদিন আগে, তা জানতে পুরো গ্রামের অপেক্ষা করতে হয় পরদিন কেরামত মিয়া হাইস্কুলের মাঠে বিয়াতি বনাম আবিয়াতি ফুটবল ম্যাচের হাফটাইম শেষ হওয়া পর্যন্ত, যখন দিনমনি খেলার মাঠের মাঝখানে নেমে চিৎকার করে, একজন পেলেয়ার কম ক্যান? ও রেফারী সাব, এইটা কেমুন কাম অইল, পেলেয়ার একজন কম ক্যান?

ন্যায্য ভাবনা নিয়ে দিনমনি সাহার 'দিনু পাগলা' হয়ে ওঠা
কিন্তু সে খেলার মাঠেই, সরল সাধারণ মোট বওয়া দিনমজুর দিনমনি সাহা তখুনি তাদের কাছে 'দিনু পাগলা' হয়ে উঠেনি। গ্রামে এমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে। সারাদিন অভুক্ত থেকে প্রচন্ড রোদে কাজ করতে করতে কিছুক্ষণ আবোল তাবোল বকার ঘটনা তাদের গ্রামের ইতিহাস বইতে নেহায়েত কম নয়। এমন বকতে থাকা মানুষটাকে একটু মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে, দু'গালে প্রতিকার সুলভ তিন-চারটা চড় দিলে, এবং সবাই মিলে এমন দুর্লভ উপলক্ষ্যে হা হা হো হো করে নিলে শতভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর আরাম হয়। তাই, দিনু মাঠে ঢুকে চিৎকার শুরু করলে, মাঠের লাইন্সম্যানরা শক্ত হাতে তাকে চ্যাংদোলা করে মাঠের বাইরে নিয়ে আসে। মাঠ জুড়ে একটা হৈ চৈয়ের মাঝে রেফারি দুই পক্ষের খেলোয়াড় গুনে দেখে। ন্হা, ঠিকই তো আছে। সে বাঁশী বাজিয়ে খেলা শুরু করে দেয়, অন্যদিকে কয়েকজন মিলে স্কুলের টিউবওয়েলের মুখের নীচে দিনুর মাথা চেপে ধরে ঠান্ডা পানি ঢালতে ঢালতে হাসাহাসি করছিলো তার পাগলামি নিয়ে, বায়ু চওড়া হই গেছে। দেখছনি মাথার মাইঝখানে কি গরম! পানি ঢাল, ভাল করি পানি ঢাল।
তারপর থেকে তারা দিনমনিকে জায়গায় অজায়গায়, তাসের আড্ডায়, বিড়ি খাওয়ার জমায়েতে, ক্যারাম ঘরের উত্তেজনায় কিংবা জেয়াফত খাওয়ার আসরে চোখে মুখে ভীষণ আপসোসের ভঙ্গি ফুটিয়ে সময়ে অসময়ে বলে উঠতে, দেখতে ও শুনতে পায়, আচানক কারবার। একজন মানুষ কম, কারো কোন গ্যারাজ্জই নাই। 

যখন তখন এমন আচানক কথা বলা ছাড়া দিনমনি সাহা'র সারাদিনের কার্যক্রমে তারা আর কোন অস্বাভাবিকতা খুঁজে পায় না। সে আগের মতই ধান বুনতে বুনতে গলা ছেড়ে গান ধরে, জালে বড় মাছ ধরলে খল্বল্ করে হাসে, সুপারি গাছের চিকন কান্ড বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যায়, বউকে ফাঁকি দিয়ে পয়সা-মারি খেলে। ফলে দিনমনি সাহা পুরো পাগল উপাধি না পেয়ে খানিকটা আদরের, খানিকটা প্রশ্রয়ের 'দিনু পাগলা' ডাকে পরিচিত হয়ে রইল তাদের কাছে। তবে এ ঘটনার মজার দিকটি তারা দ্রুত তাদের জীবনধারায় আয়ত্ত করে ফেলে। দিন কতক যেতে না যেতে, কোথাও একটু লোক জমায়েত হলেই দুষ্টু পোলাপাইনে দিনুর গলার আফসোসের ভঙ্গিটি নকল করে বলে উঠে, আচানক কারবার! একজন মানুষ কম, কারো কোন গ্যারাজ্জই নাই। 
কয়েকদিনের মধ্যে কথাটি তাদের কাছে একটা দৈনন্দিন মজায় পরিণত হয়, হয়ে উঠে 'দেখচনি মফিজ, কুত্তা কেম্নে  জালা খায়' - এর মত অসংখ্য প্রচলিত বুলির সাথে আরো একটা মজার বুলি।
প্রায় রাতে ঝিনু তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, আপনের এত গরজ লাইগচে ক্যান? কোত্ তুন কে আসি মরি রইছে আমগো গেরামে, এইটা লই আপনের এত মাথা ব্যথা কেন?  
দিনু প্রায় হাহাকার করে উঠে, এইটা কি কইলা, বউ? সবতে হাসতেচে, খেলতেচে, অথচ একটা মানুষ নাই অইয়া রইল, কেউ ভুরুক্ষেপ করল না? তার খোঁজ খবর কইরল না? 
ঝিনু আরো কোমল স্বরে বলে, কারো আপন কেউতো মরে নাই, তাইলে হে গো এত চিন্তা করি লাভ আছে নি কোনো? 
যা দিনুপাগলার বউ ঝিনু এবং তার প্রতিবেশীগণ দেখতে পায়নি অথবা পায় না, মজফ্ফরের দোকানে নিয়মিত আড্ডা দেওয়া গ্রামবাসীগণ শুনতে পায়নি অথবা পায় না, ফুটবলের মাঠে শারিরিক কসরতে মত্ত অল্প-মধ্য-বেশি বয়সী খেলোয়াড়গণ জানতে পায়নি অথবা পায় না, পড়ন্ত বেলায় গোসলের ঘাটে কল্ কল করতে থাকা মা-ঝি-কুমারী-পোয়াতি-বিধবা মহিলাগণ আঁচ করতে পায়নি অথবা পায় না, তা হলো, দিনুর প্রতিদিনের একটা রুটিন হয়ে উঠে বাইত্তার জঙ্গলে একবার ঢুঁ মারা। প্রাচীণ জঙ্গলের গন্ধ নাকে মেখে দিনে অন্তত একবার দিনু এসে দাঁড়ায় আমগাছটির নিচে, তাতে এখনো ছিন্ন দড়ির এক অংশ ঝুলছে অসহায়ভাবে। তার নিচে সে বসে। তারপর পায়ের গ্যাঁজ টিপতে টিপতে দীর্ঘক্ষণ সে কথা বলতে থাকে তার নিজের সাথে অথবা অন্তত তারা যদি তাকে দেখত এ সময়, পাশে কাউকে শ্রোতা হিসেবে দেখতে পেত না এবং শুনতে পেত, দিনু বলছে, তাইজ্জব অইলাম রে ভাই। বড় তাইজ্জব অইলাম। কুত্তা মইরলে চোধরীর পোলায় শিন্নি খাওয়াইচিলো, অখনও মনে আছে। আর একটা মানুষ মরি কংকাল হই গেল, কোন খোঁজ পাওয়া গেল না! কারো ভুরুক্ষেপই নাই। আমি কইলে হাসে। বাউরে, মইরলে বুইঝতি, আমি কইলাম, তোগো আপনা মইরলে বুইঝতি।

আষাঢ় দুপুরে জলের ফেনা, ডুবে গিয়ে ভেসে যায় 
বর্ষা এলে একদিন, এক আষাঢ়ের হেলে পড়া বিকেলে, সুপারী শফিকে তারা পানিতে ভেসে থাকতে দেখে। 
পানির অল্প স্রোতে শফি দুলছিলো ডানে, তারপর বাঁয়ে। তার মোটাসোটা শরীরের উপর একটা মাছরাঙা বসে বসে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পানিতে তাকিয়ে থেকে কি মনে করে যেন টুইট্ করে উড়ে গেলো আরেক দিকে। মাছরাঙা উড়ে যাবার কিছুক্ষন পর কেউ একজন শফিকে দেখতে পায়। তারপর সে লোকটি গ্রামের দিকে চিৎকার করতে করতে ছুটে, ওরে, ইন্নালিল্লা রে, ইন্নালিল্লাহ। সুপারী শফি পানিত ডুবি ভাসি রইছে।
সুপারী শফি ছিলো খানিকটা বোকা-সোকা প্রকৃতির। বহুকাল আগে একবার ভাত খেতে মুখে অরুচি হওয়ায় সে চিকন করে কাটা কাঁচা সুপারী দিয়ে গরম ভাত খাবার চেষ্টা করেছিল, তারপর থেকে সারাজীবন তার নামের সাথে 'সুপারী' শব্দটি লেপ্টে যায়। তার নাম হয়ে যায়, সুপারী শফি। শফির লাশ যেখানে পাওয়া যায়, তা বাইত্তার জঙ্গলে যাবার পথের লাগোয়া পুকুরে। লাশ পাওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই সারা গ্রাম  ভেঙে পড়ে বাইত্তার জঙ্গলের পাশে। 
তাদের কাছে বর্ষা এলে তারা কাদা জলে মাখামাখি করে কুস্তি খেলে, পুকুরে নেমে ডুব সাঁতার দেয়, গলা পানিতে পাট কাটে এবং ভেঙে যাওয়া রাস্তায় বাঁশের সাঁকো গড়ে। কিন্তু বাইত্তার জঙ্গলে যাবার পথে যে ভেঙে যাওয়া পুকুরের পাড়, তা কারো মেরামতের দরকার পড়ে না। পুকুরের পাড়টি ভেঙে গিয়ে মিশেছে ওপারের মইষ্যার খালের সাথে। সে ভাঙা পাড় দিয়ে কখনো ওপাড়ের মাছ এপাড়ে আসে, কখনো এপাড়ের মাছ ওপাড়ে যায়।  কিন্তু অগম্য হয়ে পড়ে বাইত্তার জঙ্গল। জায়গাটিতে দুটি শক্ত সুপারী গাছের কা- পাশাপাশি ফেলে সাঁকো বানিয়ে ফেলে একদিন দিনু পাগলা। সুপারীর কান্ড এমনিতেই পিছল, তার উপর কাদা পায়ে এর উপর উঠলে পা আরো পিছলাতে থাকে। তাই যারা এ পথটি অতিক্রম করে, তাদেরকে খুব  সাবধানে হাঁটতে হয়, না হলে পা পিছলে পড়তে হবে পুকুরের খাড়া ঢাল বেয়ে গভীর পানিতে, হয় পুকুরের দিকে, না হয় মইষ্যার খালের দিকে। 
শফি ভাসছিলো মইষ্যার খালের দিকে, চিৎ হয়ে।
সুপারী শফি সাঁতার জানত না, এ সংবাদ টি তারা জানে। কতদিন তারা এ নিয়ে হাসাহাসি করেছে, মিয়া লা যেন বিলাতি সাব, বাউরে, হারা জীবন গেরামে থাকিও কেউ নাকি সাঁতার জানে না, এর থেইক্যা শরম আর আচে নি?  শফির বাইত্তার জঙ্গলে যাবার কারণটি তারা জানতে পারে পুকুরের পানিতে ভেসে থাকা পাইন্যা কচুর কাটা ডগা দেখে। খুব সম্ভব কাল শেষ বিকেলে পাইন্যা কচুর ডগা আনতে শফির বাইত্তার জঙ্গলে যাবার প্রয়োজন হয়। সে দিনমনি সাহার বানানো নড়বড়ে পিছল সুপারী কা- বেয়ে পার হবার সময় পিছলে পানিতে পড়ে যায়। তাহলেও একটা খটকা তাদের ঝটলার মধ্যে সাপের মতো কুন্ডলী পাকাতে থাকে, সাঁকোর তলে পানি এমন কিছু বেশী না যে একেবারে ডুবে মরে গিয়ে শরীর ফুলে উঠা লাশ পাওয়া যেতে হবে সোয়া অথবা পৌণে একদিন পর।
সুপারী শফিকে ঘিরে একটা ঘন স্যাঁতস্যাঁতে হাহাকার ছড়াতে থাকে ঝোপে, মাঠে, পুকুরে ছাওয়া গ্রামটিকে ঘিরে। একটা জলজ্যান্ত মানুষ দিনু পাগলার বানানো সাঁকোর পাড়ে হাত পা মেলে আকাশের দিকে মুখ করে সোজা হয়ে শুয়ে থাকে। গ্রামের বৃদ্ধ, যুবক, কিশোর, নারীদের দীর্ঘশ্বাস, হৈ চৈ, শোরগোল, জল্পনা, চিৎকার, কান্নাকাটি যখন চলছে, তখন ঘরের মধ্যে ঝিনু আরো একটা মোটা কাঁথা দিনু পাগলার ঝরতপ্ত গায়ের উপর ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে, বাউরে, শফি ভাই বলে মরি গেছে। আপনে শুই থাকেন চুপচাপ, আমি যাই, দেখি আসি এক দৌড়ে।  
সুপারীর শফির লাশকে ঘিরে তার মা আর এক বোন আছড়ে পিছড়ে কাঁদছে। সে কান্নায় ভিজে গেছে মানুষের পুরো দঙ্গলটি। তারা চোখ মুছতে মুছতে পরস্পরকে বলে, একটা জলজ্যান্ত মানুষ মরি গেল। আহা রে! অন্যজন উত্তর দেয়, আরে কাইলকা সকালেও আমি আর শফি এক লগে চা খাইছিলাম বিশুর দোকানে। শফি জোর করি আমার চায়ের দাম দি দিছে। আমারে কয়, আইজকা আমি ট্যাকা দি। আপনের আরেক দিন দিয়েন। তখন অন্য একজন এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করে, হ, শফি ঐ রকম করতো। এক লগে চা খাইতে গেলে হের জ্বালায় দাম দেওন যাইতো না। বড় ভালো মানুষ আছিল গো পোলাটা।
এভাবে শফির লাশকে ঘিরে মুখর হতে থাকে নানাবিধ স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাস। সে দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতিতে তারা নিঃসন্দেহ হয়, সুপারী শফির মতো দ্বিতীয় একটা ছেলে গ্রামে পাওয়া যাবে না। এখন থেকে ফুটবল মাঠে, জেয়াফতের আসরে, তাসের আড্ডায়, বিড়ির গুলতানিতে, ক্যারামের উত্তেজনায় তারা আর সুপারি শফিকে দেখতে পাবে না, সব মানুষের ভীড়ে তার জায়গাটি শূন্য পড়ে থাকবে, এ কথাটি ভেবে তাদের দীর্ঘশ্বাসগুলো পাঁক খেয়ে উঠতে থাকে আকাশের দিকে। আষাঢ়ের মেঘে মেঘে সে হাহাকারগুলো ঘুরবে, ফিরবে, কালো কালো হয়ে ভয় দেখাবে, যখন তখন ঝরে পড়ে তাদের ভিজিয়ে দেবে। 
সুপারী শফির লাশের কাছে পৌঁছার পর ঝিনুকে বেশ কসরত করতে হয় লাশের মুখটি দেখতে। অবশেষে অনেক কষ্টে মানুষের জমায়েতে মাথা গলিয়ে যখন সে লাশটি দেখতে পায়, একটা আচমকা ভাবনায় তার মুখ ভেজা সাদা কাগজের মতো বিবর্ণ হয়ে পড়ে । সে আঁচলে  দ্রুত মুখ ঢেকে নিলে তার গলায় একটা বিচিত্র শব্দ উঠে। মুখ ঢাকা শব্দটিকে মনে হয় নেহায়েত একজন পরিচিত মানুষের মৃত্যুতে উগরে উঠা শোকের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ঝিনুর সে শব্দে আছে এক নিদারুণ আতংক। মুখ ঢাকা থাকায় আতংকগ্রস্থ মুখের ঝিনুকে তারা লক্ষ্য করবে না যে, বেচারী অল্প অল্প কাঁপছে এবং বিচিত্র শব্দটি আসলে 'হরি হরি' জপমালার ছেঁড়া অংশের উচ্চারিত রূপ।
আতংকগ্রস্থ ঝিনুর মনে পড়ছে, কাল ভর সন্ধ্যায় ভেজা কাপড় এবং গায়ে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে ঘরে ফিরে দিনু বিড় বিড় করে বলছিল, দেখি রে বউ, তোর কতা সইত্য হয়নি! অচিন মাইনষ মইরলে যখন ভুরুক্ষেপ নাই, দেখি আপনা মাইনষ মইরলে মাইনষের গ্যারাজ্জ অয়নি। 


লেখক পরিচিতি
সাগর রহমান 
জন্ম- নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার সুলতানপুর গ্রামে, ১৯৭৮ সালে। 
গল্প লেখেন। সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। 
২০১৫ সালের বইমেলায় 'খড়িমাটির দাগ' নামে তার গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন