শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

আইভি চট্টোপাধ্যায়ের গল্প : রিয়্যালিটি শো

ডক্টর শীতল ভার্মা । স্টেথো খুলে গলায় জড়িয়ে নিলেন । আকুল দু’জোড়া চোখ। চেয়ে আছে তাঁর দিকেই । রোজই এমন আকুলতার সঙ্গে দেখা হয় । এত অস্থির তো লাগে না কোনোদিন । আজ যে কেন এমন !

চশমাটা খুলে একবার হাতে নিলেন, তারপর মাথার ওপর তুলে দিলেন । কি ভেবে সেটা নামিয়ে এনে আবার অ্যাপ্রনের পকেটে রাখলেন । যেন চশমাটা রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ । তারপর বললেন, ‘ও এবার পরীক্ষা ড্রপ করুক । লেট হার রিল্যাক্স ফর আ ইয়ার ।‘


আকুল দু’জোড়া চোখে এবার উদ্বেগ নেমে এল, ‘না না, তা কি করে হয় ডক্টর ? একটা বছর নষ্ট হবে ?’

উজ্জয়িনী বলল, ‘আমি এখন একদম ঠিক আছি ডক্টর । আমি পরীক্ষা দিতে পারব ।‘

‘আমি হলের বাইরে বসে থাকব । কালকের পরীক্ষার পর আবার সোমবার পরীক্ষা । ওকে পুরো বিশ্রাম দেব ।‘ মা বললেন ।

‘আমি স্কুলের সঙ্গে কথা বলছি, ও যেন সিক-বেডে পরীক্ষা দিতে পারে’, বাবা বললেন ।

‘নো প্রবলেম । উজ্জয়িনী ইজ দা ব্রাইটেস্ট চাইল্ড অফ দা ব্যাচ । ওর একটা বছর যেন নষ্ট না হয় । ও সিক-বেডে পরীক্ষা দিক । দরকার হলে আমি ওকে এক্সট্রা সময় দেব । কাউন্সিল থেকে আমাদের এক্সট্রা চল্লিশ মিনিট দেবার পারমিশন আছে ।‘সিস্টার বললেন ।

হ্যাঁ, সিস্টারও এসেছেন । সেই সন্ধে থেকেই । উজ্জয়িনী স্কুলের গর্ব । উজ্জয়িনীকে বড্ড ভালোবাসেন সিস্টার । ভালোবাসেন স্কুলের সব টিচার ।


ডক্টর ভার্মা তবু অনড় । বোঝাতে বসেন উজ্জয়িনীকেই ‘জীবনে একটা বছর কিছুই নয় । জীবন অনেক বড় । এ বছর পরীক্ষা না দিলেই সব শেষ হয়ে যাবে, তেমন ভাবার কোনো কারণ নেই । তোমার চিকিত্‍সা দরকার । ভালো ঘুম । পরিপূর্ণ বিশ্রাম । আমার কথা শোনো উজ্জয়িনী ।‘

‘উই প্রমিস ডক্টর‘, মা কেঁদে ফেললেন, পরীক্ষার পর আমরা ওকে পুরো বিশ্রাম দেব । আর মাত্র দশ দিন । প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন । একটি মেয়ের কেরিয়ারের ব্যাপার ..‘

‘কেরিয়ার’ .. ডক্টর শীতল ভার্মা ক্লিষ্ট হাসলেন । কেরিয়ার । বিদ্যা অর্জন । না, সে অর্জন জ্ঞানের জন্যে নয় । আসলে অর্থ-উপার্জনের উপায় । শিক্ষার সঙ্গে জীবনের যোগ নেই । কতকগুলো পুঁথির শুকনো পাতাকে মস্তিষ্কে ধরে রাখা কেবল । যে যত স্মৃতিধর, যত নিপুণভাবে প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারে, তার কেরিয়ার তত মসৃণ । বিষন্ন হাসলেন ।

‘আমি আবার বলছি একই কথা । উজ্জয়িনী এ বছর পরীক্ষা ড্রপ করুক । আপনারা আমার কথা শুনুন প্লিজ ।‘


শহরের সবচেয়ে নামী কনভেণ্ট স্কুলের ছাত্রী উজ্জয়িনী । বছর বছর প্রথম হয়ে স্কুলের সেরা মেয়ে হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে । বেশ ভালো ছবি আঁকত । ভালো ভারতনাট্যম নাচত । ক্লাস নাইনে ওঠার পর থেকে সব বন্ধ ।

এখন শুধুই পড়া । স্কুলে, বাড়িতে মাযের কাছে, দেবজিত-স্যারের কোচিং ক্লাসে । সিংহ-স্যারের ক্লাসে অঙ্ক, জয়ন্তী-ম্যামের কাছে কম্পিউটার সায়েন্স । মৃদুলা-ম্যামের স্পেশাল ক্লাসে ইংরেজি । নাচগান আঁকাজোকা করার সময় কই !

মা বলেন, ‘নাচ শিখে কি হবে ? কেরিয়ার বলতে টিভিতে রিয়্যালিটি শো । ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা টিভির পর্দা জুড়ে নাচানাচি করছে । তাদের বাপ-মাকেও বলিহারি !’

বাবা বলেন, ‘ঠিক তা নয় । রিয়্যালিটি শো অবশ্য আমারও পছন্দ নয় । তবু .. আজকের দিনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শিক্ষাটাও জরুরী । যা-ই করো, লেখাপড়াই বলো, আর নাচ গান আঁকা, তোমাকে হতে হবে দা বেস্ট । রিয়্যালিটি শো হল সেই সুযোগ ।‘

মা বলেন, ‘লেখাপড়াটা জরুরী । নাচ গান নয় । তুমি আর এসব উল্টোপাল্টা ভাবনা মেয়ের মাথায় ঢুকিও না । দেশটা উচ্ছন্নে গেল । পণ্যমনস্ক দুনিয়ার দেখনদারি ।‘

মেয়েকে বুঝিয়ে বলেন, ‘তপস্যা করার মতো করে পড়াশোনা করতে হবে । এই ক’বছরের জন্যে পৃথিবীর সব ভুলে যাও। একনিষ্ঠ হও । সব ছেড়ে দাও ।‘

এসব তর্ক শুনে শুনেই বড় হয়েছে উজ্জয়িনী । তপস্যা । ডেডিকেশন, যার বাংলা প্রতিশব্দ হল আত্মোত্‍সর্গ । নিজেকে উত্‍সর্গ করার নামই তপস্যা ।


বাবা তাপস কর্পোরেট জগতের ব্যস্ত মানুষ । মেয়ে আর মাযের পড়ার দুনিয়ার খবর রাখেন না । তবু মাঝে মাঝে বলেন, ‘বড্ড বেশি পড়ে রাণী । ও একটু ফিজিক্যাল কিছু করে না কেন ? অন্তত রোজ ক্লাবে গিয়ে একটু সাঁতার কেটে আসুক ।‘

মা রাগ করেন, ‘ওর সময় নেই । আজেবাজে কথা বলে ওকে ডিস্টার্ব করে দিও না ।‘

মা বিপাশা একটা নামী স্কুলের প্রিন্সিপাল । বেশ অল্পবয়সে এমন উচ্চতায় । বিপাশার স্কুল যে বছর বছর এত ভালো রেজাল্ট করে, তা প্রিন্সিপালের কড়া অনুশাসনের জন্যেই । খবরের কাগজ আর অভিভাবকমহল একবাক্যে স্বীকার করেন । স্কুল নিয়ে বিপাশারও চাপা গর্ব আছে । বিপাশার বিশ্বাস, এই সাফল্যের কারণ হল একাগ্র অধ্যবসায়, কাজের প্রতি ডেডিকেশন, ডিসিপ্লিন । নিজের স্কুলে ছেলেমেয়েদের যথেষ্ট যত্ন নেন বিপাশা । হায়ার ক্লাসের জন্যে স্পেশাল ক্লাস। পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের জন্যে স্পেশাল কোচিং । টিচারদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ।


নিজের স্কুলেই মেয়েকে রাখা ভালো ছিল । কিন্তু স্কুলটা কো-এড । ছাত্রবয়সে সংযম কোনোভাবেই নষ্ট করা যায় না । সময়টা তো ভালো নয় । এই তো গতমাসের চোদ্দই, আজকাল ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে খুব ধুম । স্কুলে স্পেশাল চেকিং-এর ব্যবস্থা করেছিলেন বিপাশা । গাদা গাদা চকোলেট আর গ্রিটিংস কার্ড জমা পড়েছে । বেশ ক’জন ছেলেমেয়ে শাস্তি পেয়েছে । গার্জিয়ান কল হয়েছে । বিপথে যাবার জন্যে মুখিয়ে থাকে ছেলেমেয়েগুলো।

ছাত্রজীবন মানেই তপস্যা, অনুশীলন আর অনুশাসন । কড়া শাসন আর পড়াশোনার চাপ। এই একমাত্র ওষুধ ।

একমাত্র মেয়েকে সেই মন্ত্র শেখান বিপাশা । তিনটে ‘ডি’ । ডিসিপ্লিন, ডেডিকেশন, ডিভোশন ।


রোজ সন্ধেবেলা মাযের কাছে পড়তে বসে উজ্জয়িনী । সকালে স্কুল, দুপুরে বাড়ি ফিরে আবার বিকেল চারটে থেকে টিউশন ক্লাস । সন্ধেবেলা স্কুলের পড়াশোনা, হোমওয়ার্ক । তারপর মাযের কাছে অঙ্ক । রাতের খাবার । আবার রাতে দুটো আড়াইটে পর্যন্ত পড়া । এই উজ্জয়িনীর রুটিন ।

যতক্ষণ মেয়ে পড়ে, বিপাশাও জেগে থাকেন । রাণীর জন্যেই নোটস, স্কুল-প্রোজেক্টের কাজ। ডেডিকেশন মেয়ের একার থাকলেই চলে না ।

পড়া, পড়া আর পড়া । এই জীবন । রাণী টিভি দেখে না, গান শোনে না, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয় না । খেলা তো কবেই বন্ধ । তাপস এক একদিন জোর করে রাণী-বিপাশাকে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়েছেন । হাইওয়ে দিয়ে কতদূর। গাড়ির সাউন্ডবক্সে গমগম সুরে ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ।‘ কতদিন পরে খোলাগলায় মা-মেয়ে মিলে ‘ওই উজ্জ্বল দিন, ডাকে স্বপ্ন রঙিন ।‘

তবে তেমন দিন আসেই খুব কম । ব্যস্ত বাবা, ব্যস্ত মা । সবচেয়ে ব্যস্ত রাণী নিজে ।

মা বলেন, ‘একদম সময় নষ্ট নয় । এই চার বছর সব বন্ধ ।‘


******

এত সতর্কতার পেছনের একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে ।

ক্লাস নাইনের ফার্স্ট টার্মিনাল পরীক্ষায় উজ্জয়িনী অঙ্কে উনসত্তর । যদিও বরাবরের মতই ফার্স্ট হয়েছিল, কেননা পুরো ব্যাচেরই অঙ্ক পেপার খারাপ হয়েছিল । কিন্তু মা এ অজুহাত শোনেন নি । অঙ্ক নিয়ে কঠোর হয়েছেন । রোজ একশ’টা অঙ্ক মাস্ট । অঙ্ক করতে করতে হাতব্যথা করত, ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসত । তবু একশ’টা অঙ্ক না করলে ছুটি নেই । অবশেষে সেকেন্ড টার্মিনালে অঙ্কে আটানব্বই ।

তবু এই সেকেন্ড টার্মিনালে বরাবরের মতো প্রথম স্থান হল না । প্রথম কেন, কোনো স্থানই পেল না উজ্জয়িনী । কারণ হিন্দী পরীক্ষায় ছত্রিশ ।

শিক্ষাব্যবস্থা । এখনো সর্বশিক্ষা পর্যায়ে । একজন অঙ্ক ভালোবাসে,তাকে তাই পড়তে দাও । তা হবে না । তাকে পড়তেই হবে আকবরের শাসনকাল,মোগল সম্রাজ্যের পতনের কারণ । একজন পাখি ভালোবাসে, তাকে হাজার পাখির জীবন পড়তে দাও । তা নয় । অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস, বাংলা, হিন্দী, ইংরেজি, সোশাল স্টাডি, ড্রয়িং, ড্রিল .. সব চাই ।

ভূগোল পড়তে চাও ? দেশ বিদেশের খনি, পাহাড়, জলপ্রপাত ? বললেই হবে ? আগে দুলে দুলে ‘নর: নরৌ নরা:’ মুখস্থ করো, তারপর ওসব হবে ।

লিটারেচার পড়া আজকাল একটু মান পাচ্ছে, কারণ মাস-কমিউনিকেশন পড়ার ফ্যাশন এখন ‘ইন’ ।

তবু সায়েন্স এখনো সবার আগে । এদেশে সায়েন্স না পড়লেই প্রতিযোগিতা থেকে আউট ।


হিন্দী পরীক্ষায় ছত্রিশ । ফেল করলে র্র্যাংক দেবার নিয়ম নেই । এত বছরের ছাত্রীজীবনে এই প্রথম ফেল করার লজ্জা । মাত্র চারটে নম্বর দিয়ে পাসমার্ক দিলে যে ছাত্রী এবং তার পরিবারের মানসিক সম্ভ্রম রক্ষা হয়, তা স্কুল কর্তৃপক্ষ মানেন না । ক্লাস নাইন থেকে খাতা দেখার ব্যাপারে কোনো আপস নেই । মেয়েরা যে মানসিক চাপের মধ্যে পড়ছে, সেটা কাম্য। তবেই তো পড়ায় উত্‍সাহ বাড়বে, ভালো রেজাল্ট করার জেদ তৈরি হবে ।

লজ্জায় অপমানে রাগে মা অসুস্থ । তিনদিন খাওয়া বন্ধ । বাবা অবশ্য একবার বলেছিলেন, ‘সামান্য স্কুলের পরীক্ষা । পরের বার ঠিক হয়ে যাবে ।‘

কিন্তু উজ্জয়িনী খুব ভয় পেয়েছিল । মাকে মুখ দেখানোর লজ্জা । স্কুলে মুখ দেখানোর লজ্জা।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একঘণ্টা হিন্দী টিউশন ক্লাস শুরু হল ।

এত পরিশ্রমের ফল মিলেছে । ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষায় উজ্জয়িনী আবার ফার্স্ট । সব সেকশন মিলিয়ে রেকর্ড মার্কস ।

স্কুল জীবনে এই একটা লজ্জার ইতিহাস আছে । যদিও বাইরের কেউই প্রায় ঘটনাটা জানে না, তবু এ নিয়ে উজ্জয়িনী মরমে মরে আছে । আর কোনোমতেই মাকে ছোট করবে না । মাযের আশাভঙ্গের কারণ হবে না কোনোদিন ।

বাবামাযের মুখ উজ্জ্বল করে স্কুলের শেষ পরীক্ষায়, আইসিএসসি পরীক্ষায়, ছিয়ানব্বই পার্সেণ্ট নম্বর নিয়ে পাশ করেছে। খবরের কাগজে, টিভিতে ছবি, ইন্টারভিউ ।

এবার তাই প্রত্যাশা বেশি । আইএসসি । প্লাস টু । এই পরীক্ষার রেজাল্ট হল উচ্চশিক্ষার চাবিকাঠি । এই দু’বছর নি:শ্বাস ফেলার সময় পায় নি রাণী । তাপসকেও কড়া করে বলে দিয়েছেন বিপাশা, ‘মেয়েকে নিয়ে কোনো আদিখ্যেতা নয় । রাণীর পড়া নিয়ে কোনো ছেলেখেলা বরদাস্ত হবে না । ওই লং-ড্রাইভ, বাইরে খাওয়ার প্ল্যান .. সব বন্ধ । বাড়িতে কোনো বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন নয় । নিজেরাও কোথাও যাওয়া নয় । দু’বছর সমাজ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হতেই হবে ।‘

মা সদা সতর্ক, ‘ফিজিক্সে তোমার আরো দু’ নম্বর পাওয়া উচিত ছিল রাণী । এত করে জিওমেট্রি করিয়ে দিলাম, তবু তিন নম্বর কম কেন ? কম্পিউটারে মাত্র ছিয়াশি ? এবার থেকে স্কুল থেকে ফিরে কম্পিউটারে বসবে রোজ ।‘

বাবা বলেন, ‘এই সময়টা কোনো দিকে দেখিস না । জীবনে দু’ বছরের পরিশ্রম, আর সারা জীবন সাফল্যের আনন্দ । বুঝলি রাণী ?’

সিস্টার বলেন, ‘দ্য মোস্ট স্টুডিয়াস অ্যান্ড ওয়েল-বিহেভড গার্ল । তোমার ওপর স্কুলের খুব আশা । উই এক্সপেক্ট ইউ টু টপ দ্য লিস্ট ।‘

রোজ সকালে স্কুলে অ্যাসেমব্লিতে ‘আওয়ার ফাদার, হু আর্ট ইন হেভেন ..‘ গাইবার সময় উজ্জয়িনী চোখ বুজে মনে মনে বলে, ‘এবার ম্যাথস-এ যেন হানড্রেড পাই ।‘

দুর্গাঠাকুর দেখতে গিয়ে হাতজোড় করে বলে, ‘ফিজিক্স-এ এবার যেন কোনো সিলি মিসটেক না হয় ।‘

দিদার বাড়ি সরস্বতীপুজোয় অঞ্জলি দেয় মন দিয়ে, ‘কেমিস্ট্রির সব ইকুয়েশন যেন সময়মত মনে পড়ে ।‘



******

বই আর নোটস । নোটস আর বই ।

সূর্যের আলোয় পৃথিবী ঝলমল করে । উজ্জয়িনী দেখতে পায় না । সারা সকাল কাচের জানলায় ভারি পর্দা, বাইরের আওয়াজে ডিসটার্ব না হয় । একটা পাখি ডাকে, আর একটা পাখি সাড়া দেয় । উজ্জয়িনী শুনতে পায় না ।

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর .. গাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ে .. বাতাসে ফুলের সুগন্ধ । উজ্জয়িনী জানলা বন্ধ করে দেয়, বড্ড শব্দ ।

সবুজ ঘাসের বিছানা খেলতে ডাকে । উজ্জয়িনী ঘাস মাড়িয়ে হেঁটে যায় ।

ঝড় উঠেছিল একদিন । কথা নেই, বার্তা নেই, ছোট্ট একটা চড়াই ঢুকে পড়েছিল ঘরে । এদিক সেদিক ফুরুত ফুরুত করে উড়ে গিয়ে গ্লোবের মাথায় বসল । উজ্জয়িনীর দিকে অবাক চেয়ে রইল পাখিটা । বই থেকে মুখ তুলেও দেখল না মেয়েটা !

‘যা চড়াই । লক্ষ্মীটি, আমায় পড়তে দে ।‘

পাটিগণিত বীজগণিত ত্রিকোণমিতি জ্যামিতি । মন দিয়ে করতে হবে সব । গত পরীক্ষায় জিওমেট্রির একটা ডিডাকশনে ভুল হয়েছিল । চড়াইয়ের দিকে তাকাবার সময় নেই ।

‘যা পাখি,যা তুই । আমায় পড়তে দে । আমার বাবা-মাযের অনেক আশা আমায় নিয়ে। আমি বরং আসছে জন্মে পাখি হব । তোর মতো । উড়ে উড়ে বেড়াব । আকাশে, মাটিতে । গাছে গাছে । জানলায় জানলায় ।‘

পেনসিল ইরেজার খাতা কলম । কম্পাস রুলার জিওমেট্রি-বক্স । হোমওয়ার্কের খাতা । গত দশ বছরের প্রশ্নপত্র । টিচারদের সাজেশন । মাযের দেওয়া টাস্ক ।

বাবা-মা বাড়িতে ফিসফিস করে কথা বলেন । কাজের মাসি এলে যা একটু শব্দ শোনা যায় ।

‘এই যে রাণীদিদি, কমপ্ল্যান আনছি । খায়ে নাও ..‘

‘আহ মিনতি ! বলেছি না অমন হুটহাট দিদির ঘরে ঢুকবে না ! ওকে ডিসটার্ব করছ কেন ?’

মাথাটা অঙ্কের খাতায় ডুবিয়ে দেয় রাণী । মাযের বাধ্য মেয়ে, ভারি লক্ষ্মী, ভারি শান্ত ।


মা বলেছেন, ‘ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার তো সবাই হয় । আমার মেয়ে বৈজ্ঞানিক হবে । স্পেস সায়েন্টিস্ট । নাসায় গিয়ে রিসার্চ করবে । ফিজিক্সে অন্তত নাইনটি-ফাইভ পার্সেণ্ট চাইই চাই ।’

বাবা বলেছেন, ‘ফিজিক্স ঠিক আছে । কিন্তু রাণী, আসল সাবজেক্ট হল ম্যাথমেটিকস । অঙ্কটায় কিন্তু হানড্রেড পার্সেণ্ট চাই । তারপর সব রাস্তা খুলে যাবে । বৈজ্ঞানিক হতে চাও, প্রফেশনাল হাতে চাও, অ্যাকাডেমিক লাইনে থাকতে চাও .. যা চাইবে তাই ।‘

বাবার ইচ্ছে, মেয়ে আইএএস হোক । কিংবা আইএফএস । তবে বাবা তেমন জোর করেন না । সবসময় পড়তেও বলেন না । বরং মাঝে মাঝেই ‘আয় রাণী, টিভি দেখি’ বলে ডাক দেন । রিয়্যালিটি শো-মার্কা হিন্দী বাংলা সিরিয়াল নয় অবশ্য, তপস্বিনীকে অমন প্রশ্রয় দেবেন না বাবা ।

মা বলবেন, ‘আবার টিভি কেন ? বরং গান চালিয়ে দাও । রিল্যাক্স করার জন্যে মিউজিক ভালো থেরাপি ।‘

বাবা বলবেন, ‘দ্যাখোই না, টিভিতে এমন প্রোগ্রাম দেখাব রাণীকে, যাতে বেশ ফাণ্ডা ক্লিয়ার হয় । জ্ঞান অর্জন হয় ।‘

‘ও আবার কি ভাষা ? ফাণ্ডা ক্লিয়ার !’

বাবা হাসেন, ‘জেনারেশন ওয়াই-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে না !’

তৃপ্তির হাসি মাযের মুখেও । আত্মপ্রসাদের হাসি । আদর্শ বাবা-মা কাকে বলে, লোকে দেখুক ।


ছোটবেলায় খুব গল্পের বই পড়ত রাণী । রূপকথার গল্প, বাঘ-ভালুক শিকারের গল্প । শুক-সারি, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী .. হাবিজাবি বই এনে দিয়ে নেশা ধরিয়েছিলেন তাপসই ।

বিপাশা আস্তে আস্তে সব নেশা ছাড়িয়েছেন । সন্তান-পালনে কোনো ত্রুটি নয় । এনে দিয়েছেন মনীষীদের জীবনের গল্প, খেলার ছলে বিজ্ঞান, ক্লাসিক সাহিত্য । যে কোনো উপায়ে জ্ঞান-অর্জন । ছাত্রজীবনের এই লক্ষ্য হওয়া উচিত ।

অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি । বাবা বলেন, ‘ইংরেজিটা মন দিয়ে খেয়াল করবি । উচ্চারণ, শব্দ । প্রোনাউনসিয়েশন আর ভোকাবুলারি । ঠিক আছে, রাণী?’

রাণী শুনতেই পায় নি । টিভি দেখতে গিয়ে হারিয়ে গেছে কোথায় । মাইলের পর মাইল জল । সমুদ্র । সাত সাগরের পাড়ের দেশ । বরফের দেশ । এস্কিমো, ঈগলু । সবুজ মাঠ, গাছ, পাখি । রামধনু । সোনা সোনা আলোর আকাশ । মহাকাশ ।

মহাকাশ ! আহ । স্পেস-সায়েন্টিষ্ট । মাযের স্বপ্ন । ফিজিক্স পরীক্ষাটায় অসাধারণ ভালো করতেই হবে ।


******

অবশেষে এসেছে সেই বহু প্রতীক্ষিত সময় । কাল থেকে শুরু পরীক্ষা । বিপাশা নিজে বারবার টেস্ট নিয়েছেন বাড়িতে । আগামীকাল ফিজিক্স ।

আজ দেবজিত্‍স্যার লাস্ট মিনিট ব্রাশ-আপ করানোর জন্যে ডেকেছিলেন । আটজনের ব্যাচ, সবাই ভালো ছাত্র ছাত্রী । ভালো স্টুডেন্ট ছাড়া টিউশন পড়ান না দেবজিত্‍স্যার । ভালো ছাত্রদের স্পেশাল ক্লাসেও উজ্জয়িনী স্পেশালি ভালো । আজও সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছে ।

ফিজিক্সে অসাধারণ ভালো রেজাল্ট করতেই হবে যে ।

সন্ধে সাতটা প্রায় । এখনো ফিরল না রাণী ? কাল পরীক্ষা । শ্রীময়ীর বাড়িতে ফোন করলেন মা, ‘শ্রীময়ী বাড়ি এসে গেছে ? কখন শেষ হল ক্লাস ?’

শ্রীময়ীর মাও উদ্বিগ্ন হলেন, ‘সে কী ?এখনো ফেরে নি উজ্জয়িনী ? আমি শিলাদিত্যর মাকে ফোন করছি এক্ষুনি । উনি তো ক্লাসের বাইরেই বসে ছিলেন, নিশ্চয় দেখেছেন উজ্জয়িনীকে ।‘

শিলাদিত্যর মায়ের কাছেও বিশেষ খবর পাওয়া গেল না, ‘উজ্জয়িনী একটা অটোতে চড়েছিল। হ্যাঁ, ক্লাস থেকে ঠিক সময়েই বেরিয়েছিল ।‘

দেবজিত-স্যারের বাড়ি, মৃদুল ঋত্বিক অনুপ্রিয়া সবার বাড়ি, তাপসের অফিস .. ফোনের পর ফোন । বিপাশার পাগল পাগল অবস্থা । কোথায় গেল রাণী ? আজকাল কত কাণ্ডই না ঘটছে । এ শহরে মেয়েদের নানা লাঞ্ছনার সত্যি গল্প রোজ। কেন যে একলা টিউশনে পাঠালেন রাণীকে ! ভয়ে উদ্বেগে বিপাশা কেঁদে ফেললেন ।

উজ্জয়িনী তখন অটো নিয়ে পৌঁছে গেছে শহরের অন্য দিকে ।

‘অব কিধর যানা হ্যায় ?’ অটো-ড্রাইভার বেশ বিরক্ত । সওয়ারি তখন থেকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে, কোথায় যাবে ঠিক নেই ।

উজ্জয়িনী দিশেহারা । ওর যে কিছুই মনে পড়ছে না । মাথাটা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেছে ।

‘আমি আর যাব না’, বিরক্ত হয়ে অটো থামিয়ে নেমে পড়েছে চালক । উজ্জয়িনীও নামতে বাধ্য হয়েছে । শীর্ণ ভীত মুখ দেখেও অটো-চালকের দয়া হয় নি । ‘আমার ভাড়া দিয়ে দিন ।‘

বারান্দায় বসে এক মহিলা এই দৃশ্য দেখেছেন । স্কুলের ব্যাগ কাঁধে শুকনো মুখের একটি মেয়ে আর এক বিরক্ত অটো-চালক । ‘কী হয়েছে ?’ বারান্দা থেকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করেছেন তিনি ।

‘দেখিয়ে না, কোথায় যাবে জানে না । আজকালের এই ঝামেলা । ছেলেমেয়েরা সব নেশা করে । মাথার ঠিক থাকে না । বাপ-মাগুলো হয়েছে তেমন .. ছোড় দেতা হ্যায় ..’

ভদ্রমহিলা কিন্তু বুঝেছেন, এটা ঠিক সে ব্যাপার নয় । উজ্জয়িনীকে ঘরে বসিয়েছেন । ঠিকানা, ফোন নম্বর নেবার চেষ্টা করেছেন । মেয়েটা শুধুই কেঁদে চলেছে, কিছুই মনে পড়ছে না ওর । বইখাতার মধ্যে লেখা একটা ফোন নম্বর পেয়েছেন ভদ্রমহিলা । উজ্জয়িনীর এক টিউশন টিচারের ফোন নম্বর । ভাগ্যিস !

বাবা-মাযের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতেই অজ্ঞান হয়ে গেল মেয়ে ।


তারপর হাসপাতাল । জ্ঞান ফিরেছে এক ঘণ্টা পর । এখন উজ্জয়িনী একেবারে স্বাভাবিক।

‘আমি এখানে কেন ? কাল আমার ফিজিক্স পরীক্ষা ।‘

কিন্তু ডক্টর ভার্মা বলছেন, ‘উজ্জয়িনী এক রাত অবজারভেশনে থাক ।‘

বিপাশা ব্যস্ত হয়েছেন, ‘তা কি করে হয় ? ওর কাল ভাইটাল একটা পরীক্ষা । বোর্ড এগজাম । এখন তো ভালই আছে । হাসপাতালে থাকতে হবে কেন ?’

ডক্টর ভার্মা বললেন, ‘ও এবার পরীক্ষা ড্রপ করুক । লেট হার রিল্যাক্স ফর আ ইয়ার ।‘

একান্তে বাবামাকে বুঝিয়েছেন, ‘স্মৃতি চলে যাওয়াটা ভালো লক্ষণ নয় । ওই যে কমপ্লিট ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যাওয়া .. আপনারা বুঝতে পারছেন না, ও কতখানি স্ট্রেস নিয়েছে । শী নীডস ট্রিটমেন্ট । কমপ্লিট রেস্ট । চেঞ্জ অফ অ্যাটমসফিয়ার । আপনারা বরং ওকে নিয়ে বাইরে চলে যান । ওকে সময় দিন । জীবনে এক বছর নষ্ট হওয়া কিছুই নয় । ওকে সুস্থভাবে বাঁচতে দিন ।‘

‘আমাদের একমাত্র সন্তান । ব্রাইট স্টুডেন্ট । আমরা জানি ও দুর্দান্ত রেজাল্ট করবে । বুঝতে পারছি অনিয়ম হয়েছে । খাওয়া ঘুম । কিন্তু আমরা কেয়ার নেব ডক্টর । ও তো এখন পুরো সুস্থ । পরীক্ষা দিতে না পারলে ও ডিপ্রেশনে পড়ে যাবে । প্লিজ ওর এবং আমাদের এত বড় ক্ষতি করতে বলবেন না ।‘

অনুরোধ করেন বাবা । অনুনয় করেন মা । ডক্টর ভার্মা অবিচল, ‘ও এবার পরীক্ষা ড্রপ করুক ।‘

বললেই হবে ? ডাক্তাররা অমন বলেন । এত বড় রিস্ক নেওয়া যায় না । জীবনের সবচেয়ে ইমপর্ট্যান্ট পরীক্ষা । আইসিএসসি পরীক্ষায় নাইনটি-সিক্স পার্সেণ্ট ছিল, এবার আইএসসি পরীক্ষায় অন্তত নব্বই-বিরানব্বই করতেই হবে ।

তাছাড়া মেয়ে তো সম্পুর্ণ সুস্থ । পুষ্টিকর খাবার । ভিটামিন প্রোটিন ট্যাবলেট । হরলিক্স কম্পল্যান হেলথ-ড্রিঙ্ক । মাযের শ্যেনদৃষ্টি ।

সিক-বেডে ফিজিক্স পরীক্ষা । তিনদিন পর সোমবারের কেমিস্ট্রি পরীক্ষাও হয়ে গেল । দারুণ পরীক্ষা দিয়েছে মেয়ে । তিনদিন গ্যাপ । শুক্রবার অঙ্ক । মা-বাবা নিশ্চিন্ত । তারপর কম্পিউটার আর ইংরেজি । চিন্তা নেই ।

বৃহস্পতিবার সকালে পড়ার টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল উজ্জয়িনী । মা এসে ডেকে তুললেন । ‘চোখে মুখে জল দিয়ে আয় রাণী ।‘

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল উজ্জয়িনী ।

আবার হাসপাতাল । কিন্তু এবার আর জ্ঞান ফেরে নি । ডাক্তাররা বলছেন, উজ্জয়িনী কোমায় চলে গেছে ।

এক বছর নষ্ট হলই । আর কত কি যে নষ্ট হল, তার হিসেব যে কে দেবে !

এই সাতদিন তাপস একটা কথাও বলেন নি । শূন্যচোখে বসে আছেন বিপাশা । দু’চোখেও ভাষা নেই ।

******

কে এসে পাশে বসল । নির্বাক দৃষ্টি ফেরালেন বিপাশা । ডক্টর শীতল ভার্মা । বিষন্ন শান্ত চোখ । আলতো হাতে স্পর্শ করলেন বিপাশার হাত, ‘আমি একটা অন্য ভয় পেয়েছিলাম । উজ্জয়িনী তা করে নি । ইউ আর আ লাকি মাদার । ইউ হ্যাভ আ ব্রেভ চাইল্ড । আমাদের গোগোল ..’

দু’হাতে মুখ ঢাকলেন, ‘গোগোল । আমার একমাত্র ভাই । ব্রাইট স্টুডেন্ট । উজ্জ্বল কেরিয়ার । আইআইটি কানপুর । থার্ড ইয়ারে থাকতেই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ে দারুণ চাকরি পেয়েছে । সেই গোগোল । ফাইনাল পরীক্ষার আগে কলেজে মক-টেস্ট হল । মাকে ফোনে বলেছে, পরীক্ষা খুব ভালো হয় নি । তারপর ..’

জানলা দিয়ে দূরে আকাশের দিকে তাকালেন, ‘শেষ চিঠিটাও মাকেই লিখে গিয়েছিল । সুইসাইড নোট । .. মক-টেস্ট আসলে খুব খারাপ হয়েছে মা, চল্লিশ পার্সেণ্ট নম্বরও হবে না । তোমাদের স্বপ্ন আমি পূরণ করতে পারলাম না । আর এই চাপ নিতে পারছি না । তুমি আর বাবা আমায় ক্ষমা কোরো ..’

জলের ধারা নেমে এল গাল বেয়ে, ‘তিনমাস কোমায় থাকার পর মা চলে গেলেন । বারো বছর ধরে বাবা কথা বলেন না । মানসিকভাবে বিধ্বস্ত । বারো বছর ধরে পঙ্গু । গোগোল, আমার ভাই । স্বচ্ছল পরিবারের একমাত্র ছেলে । বাবা-মা আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন । তবু কেন যে গোগোল .. সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কি জানেন ? মক-টেস্টের রেজাল্ট বেরোতে দেখা গেল, গোগোল তিয়াত্তর পার্সেণ্ট নম্বর পেয়েছে ।‘

চোখ মুছে চশমা পরে নিলেন শীতল, ‘আমাদের প্রত্যাশার চাপ কতটা ছিল, আমরা তা বুঝি নি । কেরিয়ার গড়ার রিয়্যালিটি শো । প্রচণ্ড চাপের প্রতিযোগিতা । পারে নি গোগোল । উজ্জয়িনীও পারে নি । আমরা সবাই লাকি, ও অন্তত গোগোলের মত ..’ থেমে গেলেন ।

হাত বাড়িয়ে বিপাশার কাঁধে চাপ দিলেন, ‘আলো-আঁধারিতে ঢাকা কিশোর-মন । তার নাগাল পেতে হলে বাড়তি সচেতনতা দরকার । আমরা ভাবি, সব জানি । হাতের মুঠোয় জ্ঞান । কিন্তু তা তো নয় সত্যিই । সব জানার পরও সেই অজানা অচেনা অন্ধকার । দূরের বাতিঘর । সেখানে পৌঁছানো হয় না ।‘

তাপসের দিকে ফিরলেন, ‘যারা শুধুই পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, তারা কিন্তু বড্ড মিডিওকার হয়ে যায় । জ্ঞানের জন্যে তো পড়ে না তারা, শুধু পরীক্ষায় বেশি নম্বর তোলার জন্যে পড়া । একটা ভালো চাকরির জন্যে পড়া । যে চাকরির দৌলতে বড় ফ্ল্যাট, বড় গাড়ি, ঘর ঠান্ডা করার মেশিন । ফর্সা সুন্দর স্বামী-স্ত্রী আর স্বাস্থ্যবান একটি শিশু । বিজ্ঞাপনের ছবির মতো । জীবন কি সত্যিই তেমন ?’

আলগা মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আগেকার বাবা-মায়েরা ভালো মানুষ হবার শিক্ষা দিতেন । আর আমরা, আজকের বাবামায়েরা ? সময়ের দোহাই দিয়ে, প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে সন্তানকে ইঁদুর-দৌড়ের জন্যে তৈরি হবার শিক্ষা দিই । ‘দ্য বেস্ট’ হতেই হবে তোমায়, এমন বলি । কেরিয়ার গড়ার রিয়্যালিটি শো ।‘

কি বললেন ডক্টর ভার্মা? রিয়্যালিটি শো? তাই তো । অন্য এক রিয়্যালিটি শো । ঝাঁকের কই । ইঁদুর-দৌড়ে দ্য বেস্ট ইঁদুর । স্বাতন্ত্র্য ব্যাপারটাই চলবে না । এত সচেতন, এত কৃতী, শিক্ষিত বাবা-মা হয়েও সেই রিয়্যালিটি শো-এর বাইরে ভাবতে শেখে নি ? মেয়েকে নামিয়ে এনেছে এই প্রতিযোগিতায় ? নামিয়েছে । হ্যাঁ, অধ:পতন । উত্তরণ নয় ।

তোতাকাহিনীতে পোক্ত হয়েছে মেয়ে । সেই নিয়ে কি গর্ব .. আমার সন্তান এ বিশ্বের প্রডিজি !

নিজের যা দেবার, তাই তো মানুষ সন্তানকে দিয়ে যেতে চায় । পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কি দিয়েছে বিপাশা ? পূর্ণ অভিভাবকত্ব নিয়ে কি দিয়েছে তাপস ?

নিছক লেখাপড়াকেন্দ্রিক কেরিয়ার সচেতনতা ! খবরদারি, টেনশন আর প্রতিযোগিতা ! একটা মানুষকে নিজের ইচ্ছেমতো গড়ার আকাঙ্খায় এ কি ছেলেখেলা করেছে দু’জনে মিলে?


******

রাণীর জন্মের সময়টা মনে পড়ল তাপসের । লাল কম্বলে জড়ানো ফুটফুটে রাণী । জীবনটাই অন্যরকম হয়ে গেল । হাসি হাসি, আলো আলো ।

বড্ড চঞ্চল ছিল ছোটবেলায় । সাইকেল চালিয়ে সারা বিকেল ক্যাম্পাসে ঘোরা । আজ একটা ডানাভাঙা পাখি, কাল একটা পা-ভাঙা কুকুরছানা কুড়িয়ে আনা । গ্রামের বাড়িতে গেলেই আমগাছ, পেয়ারাগাছে চড়া । ঠাকুমা বলতেন, ‘দেবী চৌধুরাণী নাতনী আমার ।‘

কবে থেকে এত শান্ত হয়ে গেল রাণী ? কতদিন হয়ে গেল খোলা আকাশের তলায় হাসে নি রাণী । কতদিন হয়ে গেল গ্রামের বাড়িও যাওয়া হয় না । রাণীর যে খুব পড়া । পড়া, আর পরীক্ষা ।

আকাশহীন মানুষ । মানুষের মধ্যে বিপুল বিশ্বের যে অনুভব, তার প্রথম প্রকাশ ওই আকাশ । আকাশমুখী মন হলে তবেই উচ্চতায় পৌঁছনো । সূর্য গ্রহ নক্ষত্র নীহারিকা । বিপুল মহাকাশ । মহাবিশ্ব ।

বেদ থেকে বাইবেল, সবই আকাশমুখী হবার শিক্ষা দেয় । আবহমান কাল থেকে মানুষ ওই নীল অনন্তের দিকে চেয়ে আছে মুক্তির আশায় । কল্পনায় ডানা মেলার আশায় । আকাশ নেই বলেই মানুষের মধ্যে হতাশা, লোভ, আতঙ্ক, ব্যভিচার, ইগো, আত্মম্ভরিতা । আহা রাণী !

ডক্টর ভার্মা বললেন, স্ট্রেস । স্ট্রেস-এর শিকার হয়েছে রাণী । কার দোষে এত স্ট্রেস ? এতখানি মানসিক চাপ ? কোনোদিন বুঝতেও দেয় নি মেয়েটা ! বাবা হিসেবে সেই নির্ভরতা দিতে পারে নি মেয়েকে ? সন্তানের জন্ম যে দেয়, জীবনের মূল্য তার চেয়ে বেশি কে বুঝবে ? অনেক অনেক বেশি জরুরী সন্তানের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা । কারণ, শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকাটাই এক মস্ত বিস্ময় । এত বড় কথাটা শেখানো হয় নি রাণীকে ?

কতদিন আর কথা বলে না রাণী । হাসে না । ভাবে না । কেউ জানতেও পারে না, ও পৌঁছে গেছে এক অন্য পৃথিবীতে । আশেপাশে একটাও গাছ নেই । ন্যাড়া পাথুরে টিলা । লাল, ধুসর, কালচে পাথর । গোল গোল হলুদ ফুল । ঝরা পাপড়ি । তার মধ্যেই খেলে বেড়াচ্ছে ছোট্ট চড়াই, শালিখ, সাদা পায়রা । উজ্জয়িনী বাদাম ছড়িয়ে দিল ।

ওমা, আকাশ থেকে নেমে এল একঝাঁক সাদা সীগাল । বাদাম খেতে নেমে এল নাকি ! সাদা সাদা সীগাল । অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে দেখেছে ওদের । সাদা ডানা, সাদা উড়ান । একঝাঁক সীগাল সাদা মেঘের মধ্যে হারিয়ে গেল ।

এদিকে মুখ ফেরাতেই .. ওমা, এ যে বিশাল সমুদ্র । সাদা সাদা ঢেউয়ের মাথায় রূপোলী রোদ্দুর । উজ্জয়িনী যেন এক নতুন মোজেস । নবীন ইহুদী নিয়ে নতুন কোনো সমুদ্রতীরে এসে পড়েছে । মাথার ওপর যেহোভার আশীর্বাদ । সমুদ্র দু’ভাগ হয়ে রাস্তা করে দিল ।

বন্ধ চোখ বেয়ে জল নেমে আসে অবিরাম । গালে লেগে থাকে দু:খ-ফোঁটা । বাবা মুছে নিলেন ।

‘কাঁদিস না রাণী । তুই স্বপ্নেই থাক । চোখ খুলিস না ।‘

মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকেন মা । মা-মেয়ের স্নেহ-নির্ভরতা । পারস্পরিক বাধ্যতা । পারস্পরিক ! মেয়ে হিসেবে তো সবরকম বাধ্যতা দেখিয়েছে রাণী, মা হিসেবে সেই বাধ্যতা কেন দেখাতে পারে নি বিপাশা ?

আহা রাণী ! একজনও বন্ধু নেই ওর । কাউকে কাছে পায় নি, যাকে তার ইচ্ছের কথা বলতে পারে । মা রাগ করবে । বাবা বুঝবেই না । বন্ধুরা হয় মজা করবে, নয় মজা পাবে । ভালো রেজাল্ট করে বলে এমনিই বন্ধুরা হিংসে করে দূরে সরিয়ে রেখেছে ।

স্কুলে উজ্জয়িনী প্রত্যাশা মেটাবার যন্ত্র । দারুণ রেজাল্ট করে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করবে । বাড়িতে মাযের ইচ্ছেপূরণের যন্ত্র । ছোট্টবেলা থেকে মাযের স্বপ্ন, মাযের ইচ্ছে মেনে চলা । আজ মেয়েটা জানেই না, ও নিজে কি চায় । শুধু জানে, কোনোমতেই বাবা-মাকে নিরাশ করতে পারবে না ও ।

মেধাবী সন্তান । যে কোনো বাবা-মাযের মনের মতো সন্তান । শুধু নিজের সম্বন্ধে কোনো মূল্যায়ণ করে উঠতে পারে নি উজ্জয়িনী । ভাবতে শিখে নি যে, কোনো পরীক্ষাই জীবনের শেষ পরীক্ষা নয় ।

পাতার মর্মর, পাখির ডাক, মেঘের মায়া, বৃষ্টির ছোঁয়া । মেয়েকে এসবের স্পর্শ দিতে পারে নি বিপাশা । আধুনিক মানুষ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ, এই স্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন । আমিসর্বস্ব মানুষ । আত্মকেন্দ্রিকতার মূল্য তার কাছে অপরিসীম । বাকি সব মূল্যহীন । প্রথমে প্রকৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন, তারপর নিজেদের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন । মা-বাবার কাছে থেকেও একলা দূরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস ছিল রাণীর ? এতখানি অসম্পূর্ণ জীবনে বাস করছিল মেয়ে ? যা সম্পুর্ণ নয়, তা কি করে সর্বাঙ্গসুন্দর হবে ?

উপত্যকা কাঁপিয়ে চিত্‍কার করে উঠল বিপাশা, ‘চাই না । চাই না । চাই না ।‘

অমনি শত শত নীল লাল হলুদ সবুজ পাখিতে ভরে গেল চারদিক । ভোরের পাখি । একঝাঁক মুনিয়া । অপরাজিতা ফুল। কামিনীর ঝোপ । আকাশ বাতাস । মেঘ বৃষ্টি । আকাশ থেকে বৃষ্টি । গাছ থেকে গাছে টুংটাং তরঙ্গ ।

নিজের হাতে আজ অঙ্কের খাতায় লিখে দিল মা, ছুটি, ছুটি, ছুটি ।

দিনের পর রাত । রাতের পর দিন । নতুন প্রভাত । রোজ একই রুটিন । এই অপরূপ নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্যপটে মেয়েকে যুক্ত করবে বিপাশা এবার । রিয়্যালিটি শো-এ যদি থাকতেই হয়, এও তো এক চমত্কার রিয়্যালিটি শো ।

উজ্জয়িনীর ঘুমঘুম চোখে সকালের রোদ্দুর । ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় পাখির শিস । মৌটুসি, দুর্গা-টুনটুনি । দু’হাত ছড়িয়ে একটা আকাশে ওর চিল । বিশাল ডানায় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ । আকাশকেও এক মহাসমুদ্র মনে হচ্ছে ।

উজ্জয়িনীর ঘুম কাঁপিয়ে ঝড় ওঠে । স্মিত মুখে সোনালি আলো । সেই উত্তাল উদ্বেলের দিকে তাকিয়ে অক্লান্ত হাত নাড়ে বিপাশা । আয়, আয়, রাণী আয় রে ।




লেখক পরিচিতি
আইভি চট্টোপাধ্যায়

জন্মস্থান :  জামশেদপুর, ঝাড়খণ্ড, ভারত
বর্তমান আবাসস্থল : জামশেদপুর
পেশা :ব্যাঙ্ককর্মী
গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার।
কোন কোন শাখায় লেখেন তার তালিকা – মূলত গদ্য । ছোটগল্প, বড়গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ-কথা

 দেশ, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার, সানন্দা, বর্তমান পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।


প্রকাশিত গ্রন্থতালিকা – 
নিরবলম্ব (উপন্যাস),
রাতপাখি এবং অন্যান্য (ছোটগল্প সঙ্কলন), ঃ
ছায়াতে আলোতে (ছোটগল্প সঙ্কলন),
অপারেশন স্বর্গদ্বার (উপন্যাস),
অনির্বাণ এবং (ছোটগল্প সঙ্কলন),
রামধনুর দেশে (ছোটদের জন্যে গল্প সঙ্কলন),
ভাবনার নানা প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ সঙ্কলন)
নদী যেমন ((ছোটগল্প সঙ্কলন)

প্রাপ্ত পুরস্কার - নিউ জার্সি আমেরিকা থেকে গায়ত্রী গামার্শ লিটারারি অ্যাওয়ার্ড।
শিলিগুড়ির উত্তরবঙ্গ নাট্যজগত থেকে পুরষ্কার।
ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে গঙ্গা-নন্দিনী কলকাতা থেকে পুরষ্কার।



একটি ফটো দিন - Attached
নিজের ওয়েব পেজ বা ব্লগ থাকলে লিঙ্ক দিন - None

২টি মন্তব্য: