সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

শিপা সুলতানা'র গল্প : ময়না ভাই

ময়না নিবে? এ্যা ময়না?
অয়... কই রওয়ানা অরিনবালা?
মোর ননির বুয়ারে তুকাই..

মেয়ের বাপকে খুঁজতে বেরিয়েছে হরিনবালা।

কিতা খাও?

পান খারু সাদা খারু...


ময়না তার আধ-খাওয়া বিড়ি তুলে দেয় হরিনবালার ঠোঁটের ফাঁকে। হরিনবালার শরীরের রঙ যদি হয় বিলের তলার প্যাক, গড়ন লিকলিকে নাগিনী, ঠোঁট যেন টসটসে পানিজোঁক। ভেতরে রক্তরাঙা রসালো জিভ। জামাইকে খুঁজতে বেরিয়েছে বেড়া-ভাঙ্গা গরসি হাতে। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে খুঁজুক।

এই গ্রামের শেষ আর পাশের গ্রামের শুরু নিয়ে চৌধুরীদের রাবার বাগান। বাগান বললেও পাহাড়ের ভেতর ছোট ছোট হৃদকে জোড়া দিয়ে দিয়ে এখন মাইলা খানেক লম্বা ফিশারী বানিয়ে ফেলেছে চৌধুরীরা। এখন এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় যেন একেকটা দ্বীপ। হরিনবালারা ডাল কুড়াতে যায় কলার ভেলায় বা সাঁতরে। কোনো টিলার সামনে শাপলা তো কোনটার আড়ালে হিংরাই। সেগুন অর্জুন রাবার গাছ দিয়ে আড়াই তিনশ কিয়ারি জায়গাটা যেন গ্রামের ভেতর একটা অচিন দেশ। সেই রাজ্য পাহারা দেয় নয় দশ ঘর কুলি। থাকতে থাকতে এখন ভাল বাংলা বলতে পারে, তবুও গাঁয়ের লোকদের ‘হারামীর’ চোখে দেখে, তবে ময়না ভিন্ন। রাজ্য ছেড়ে ভিন দেশে অর্থাৎ গাঁয়ের ভেতর কেউ ঢুকতে চায় না, তবে হরিনবালার জামাই মঙ্গা অন্য জিনিস। সপ্তায় পাঁচদিন যে ব্যাটা বৌয়ের ঠ্যাঙ্গানি খেতে খেতে দৌড়ায় সে এ-গাঁয়ের এদিকেই নিরাপদ আশ্রয় নেবে।

খোদ হরিনবালার কপালে একবার খারাবি এসেছিলো। ময়নার ছোট ভাগ্নার কুকুরটির রাত হলে বাড়িতে মন বসে না। তারপর দিনে দিনে বিবাগীই হয়ে গেলো। খোঁজ নিতে জানা গেলো গাঁয়ের প্রায় বাড়ির কুকুরই রাত হলে অভিসারে বেরিয়ে সকাল হলে বাড়িমুখী হয়। আরেকটু খুঁজতেই জানা গেলো চৌধুরীদের বাগান পাহারা দেয় রাতভর, কয়েক চুমুক পঁচাইয়ের বিনিময়ে। বুবুর ছেলের আবার চন্ডালের মেজাজ। দু’নালা বন্ধুক কাঁধে সোজা হরিনবালার উঠান। মারতে হলে পালের গোদা খানকি হরিনবালা। গাঁয়ের আরো অনেকে দৌড় লাগালেও সবার আগে ঢ্যাঙ্গা-পা নিয়ে হাজির ময়না। 

হর কইলাম বান্দির পুয়া মামু! বন্দুক তাক করতে করতে গর্জে উঠে ধন মিয়া।
ময়না না-সরে একলাফে ক্যাঙ্গারুর মত ফাল দিয়ে পড়ে ভাগ্নার উপর। তারপর বন্দুক সহ ছিটকে পড়ে লেকের পানিতে। ধন মিয়া তখন মামুকে গুলি করতে গিয়ে দেখে একটা বেলে হাঁস আসমান থেকে সোজা নেমে আসছে মাথা বরাবর। এ্যাবে ময়না...তুই মোর ননির বুয়াক দেখছত? না, দেখলে বাড়িত পাটাইমু..
তারপর দু’জন দু’মুখি পথ ধরে হাঁটতে থাকে।

বারান্দায় জল চৌকিতে বসে কাঁকই দিয়ে উঁকুন ঝাড়ছিলো দীনা। লম্বা লম্বা চুল বেয়ে বান্দর বান্দর খেলছে বিড়াগুলো। যারা অভিজ্ঞ তারা উর্দ্ধমুখি। যারা নেহাত ছেলে মানুষ কিংবা পেটে সন্তান সন্তুতি তারা ভুতলে পড়ে দিশাহারা। পাকা মেঝেতে নখ দিয়ে পটাপট তাদের পেট ফাটিয়ে দিচ্ছে দীনা। আমি পাশে বসে মরিচমাখা নুন দিয়ে কাঁচা কমলার কোয়া খাচ্ছি। এমন সময় ঘামতে ঘামতে বাড়িতে উঠে আসতে দেখলাম ময়না ভাইকে। সাথে সাথে মনে পড়লো আমার দুই সেট ত্রি পিস সেলাইতে পাঠানোর কথা, এবং টেইলারও বদলাতে হবে। ‘মুন’ সবচেয়ে ভাল তবে তারা পুরুষদের কারবারী। ময়না ভাই ছাড়া কেউ তাদের কাবু করতে পারবে না। তিনদিন, না কি চারদিন পর ময়না ভাইকে দেখলাম! হয়তো এর ভেতর কণ্ঠ শুনেছি। হয়তো গাঁয়ের কারো বাড়ি, পুকুর ঘাঠে, বাল্লায়, রান্নাঘরে, বন্দের আইলে, হাইন্দে, পাহাড়ের খাঁজে ঢ্যাঙ্গা-পা ছড়িয়ে, দুধ-দোয়ানোর গাভির বাছুর বুকে-ধরে বসা। একদিন দেখলাম বৈদা-টিলার রুবিনাদের লেবু গাছে গোবর ন্যাকড়া দিয়ে কলম দিচ্ছেন। তড়বড় করে দেখলাম নয়া ভাবীর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। নয়া ভাবীর কোন “মাল” পকেটে নিশ্চয়। পেছন দিকে আর ডাকলাম না। দীনাও চুলের ফাঁকে দেখছে। আমি লবন মাখিয়ে আরো দুই কোয়া কমলা মুখে পুরলাম। আজকাল ভাবীদের মুখে শুনি আরেক কাহিনী। যদিও তাদের আগে আমরাই জানি,' শোনার বেলা এমন ভাব করি যেনো ‘ছি: ছি:’ তোমাদের মুখে লাগাম নাই নাকি। আমাদের ছয় ঘরে ছয়টা টিভি হলেও চ্যানেল তো একটাই। রঙিন টিভিতে যখন ফেমিকনের মোড়কটি দেখানো হয় আমরা ভাব ধরি যেন কতো না-বলা কাহিনী এই মাত্র মনে পড়লো। এখনই বলতে না-পারলে ভুলে যাবো। শুক্রবারে আবার একঘরে বসে দলবেধে ছবি দেখা। যদিও শাবানার সেই বিখ্যাত নয়ান জল! মোড়কটি দেখলেই সাবিহা ভাবীর আট বছরের ছেলেটা বলবেই- আমার আম্মায় খাইন। ভিটামিন টেবলেট!

গুষ্ঠীতে আরেকজন বউ আসা অবধি ময়না ভাই বিগতদের বান্দা মাল।

কে রেবা... ময়না মামু নি?

অয়গো মামি... কোনো দরকার নি?

একবার আইও রে বা।

আইচ্ছা...


দীনার নাকি তক্ষুনি মনে পড়লো টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। উঁকুন মারার সাবানের। রোজ রোজ বলবে বলবে করে আব্বাকে বলা হয় না। ময়না ভাই কে বললেই তো হয়।
ময়না ভাই...

দরকার নি? তুড়া ভিজি আছি!

একবার আইও।

ইনশাআল্লাহ...

চৈত্রমাস। গাছে গাছে কাঁঠাল। যেন হাজার হাজার বান্দর ঝুলছে ডালে ডালে। ক’দিন পর পাকতে শুরু করে দুই মাসেই বান্দর খসে গাছ ফকফকা। ময়না তিন লাফে উঠে বসেছে একটা ডালে। দ্রুত মোচড় দিয়ে একটা কাঁচা কাঁঠাল উঠানে ফেললো। উত্তর ঘরের ভাগ্নাবউ অর্থাৎ মামী শুটকি নাগামরিচ চিংড়ি দিয়ে ঘাটি রাঁধবে।

দুনিয়াই উল্টি গেছে। কিয়ামতের আর বাকি নাই। কিতা কছবে হালা ময়না? বৈশাখ মাসো দিবো মেঘ তুফান দিন করছে খনখনা! দাদাজি আজকাল খুবই ঘনঘন কেয়ামতের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন। তার রোজ নয়টার সময় বিছানায় যাবার অভ্যাস। নয়টা গিয়ে এগারোটা যায়যায়। আকাশে মেঘের ছিটাফোটাও দেখছি না। আজ মাধ্যরাত উড়ে যাবে মাথার উপর দিয়ে। একটু পরপর উঠে গিয়ে চৌ আসমান খুজে আসছে সোনা ভাই। আম্মা, চাচি-আম্মা, বিবিজি, পূব-দক্ষিণ মাঝর ঘরের সব চাচি-দাদি গিয়ে জুড়ে বসেছে উত্তর-ঘরের উঠানে। বাড়িটা এতো বিশাল লম্বা যে, এক ভিটা থেকে আরেক ভিটায় হাসি ঠাট্টার আওয়াজ আসবে না। না-হলে দাদাজি আরেকবার কেয়ামতের আভাস পেতেন উত্তর ঘরের উঠানে।

দীনাদের বারান্দায় পাটির উপর ভুড়ি বাড়িয়ে শুয়ে আছেন দাদাজি। তার কদম গাছের মত পা জোড়া কোলে নিয়ে আমি আর দীনা। আগে পা টেপাটেপি করে কমলা চকোলেট পেতাম। এখন দুই টাকা করে। বারান্দা থেকে পা ঝুলিয়ে বসেছে সোনা ভাই, তার নাকি ইচ্ছা করছে ঝাড়ের সমচেয়ে লম্বা বাঁশ দিয়ে আসমানের ভুড়ি ফাটিয়ে বৃষ্টি নামিয়ে দেয়। আল্লারও এটা বান্দার প্রতি অবিচার। নাউজুবিল্লাহ ছি, ছি। বে-ছবর সোনা ভাইয়ের চোখেও পষ্ট কেয়ামতের আলামত। দাদাজি হাতের লাঠি খুঁজতে থাকেন। তার মাথার কাছে বসে ধীরে ধীরে হাত পাখার বাতাস খাচ্ছে ময়না ভাই।চাঁদের আলোয় মাঝর ঘরের উঠান জুড়ে বাড়ির বিচ্ছুগুলো ছয়ঘরি, গোল্লাছুট, লুকালুকি খেলছে । ওড়নার বাতাস খেতে খেতে আমাদের দিকে আসতে দেখলাম সুমান্নাকে। এখন পাহাড় যদি দম না-ছাড়ে উঠানে উঠানে জটলাগুলো মধ্যরাত গড়াবে। সুমান্না এসে সোনা ভাইয়ের পাশে বসতেই পশ্চিম ঘরের চাল থেকে হঠাৎ করে কাকের ডাক। রাতের বেলা কাউয়া ডাকে! দাদাজি এবার নিশ্চিত, রোজ কিয়ামত একেবারে নাকের ডগায়। আর তখুনি শুনা গেলো পুবের কুটের বন থেকে ঘুম ভেঙ্গে আঁতকে-ওঠা এক কোকিলের কান্না। উঁচা ডালে বইসা কুকিলরে কুকিল ডাকো ঘনঘন... ময়না ভাই গুনগুন করে শুরু করলেও শেষে গলা খুলে দিলো। সোনা ভাই আলগোছে পাখা হাতবদল করে দাদাজির মাথার সামনে বসলো। আজ পাহাড় দম না-ছাড়লেও হবে।

খবর হুনছনি ময়না ভাই? পানা আপার নু বিয়া লাগছে...

পানা মানে ও-বাড়ির আনা ভাবির বোন। বউ নিয়ে সাব্বির বিলাত থাকে। ময়না আঙুলে হিসাব কষে দেখে ঐ সময় তার হাতে কোনো কাজ আছে কী না। থাকলেও বিয়ের তিন-চারদিন আগেই যেতে হবে। সে কার্ড পায়নি, না পাক। আনা ভাবীরা ছয় বোন। বিয়ের নানান ফেরকা। আত্মীয়-কুটুম যার যেখানে যত রাগ গোস্বা ছিল, দেখা যাবে ‘বিয়াত যাইতাম নায়’ বলে মুখ ফিরিয়ে বসে আছ। আত্মীয়-স্বজনের মান ভাঙ্গানি ছাড়া বিয়ে! তার উপর কেনাকাটা। জবাই করতে গিয়ে দেখা যাবে গরুই কেনা হয়নি। মোকাম বাজার গরুর বাজার প্যাঁচ কষাতে পারলে অনেক কমে পাওয়া যাবে।
বিয়েতে অবশ্যই যাওয়া দরকার।

তুই বাড়িত যাছ না কেনেরে আতা?

ভাতের নলা মুখে পুরতে পুরতে বুবুর দিকে তাকায় ময়না। এক বুবু ছাড়া বুবুর দেশের কেউ তাকে আতা বা আতাউর রহমান বলে ডাকে না। অনেকেই জানেও না। সবার কাছে ময়না ভাই, কেউ ময়না মামু আর বুড়ারা অর্থাৎ গাঁয়ের ভিন গাঁয়ের যারা দুলাভাইয়ের ভাই বেরাদব সম্পর্কীয় তারা ময়না হালা বা হালা ময়না। মাস দেড় মাস গেলেই বুবুর এই এক তাগদা। যদিও মাসে এক-দুদিনের বেশি বুবুর ঘরের পাতে বসা হয় না, গুষ্টি ভরা তার বয়সি নাতি-নাতনি বুবুর। যেখানে রাইত, অখানো কাইত, অর্থাৎ যার যার ঘরে যে-সময়, সেখানে পাত পেড়ে বসা তার প্রায় জন্ম থেকেই বরাদ্ধ। বুবুর ঘরের জন্য সুযোগ বের করতে হয়। না-হলে ভাগ্না বউই বা কী মনে করবে। বুবুর তিন ছেলের বলতে গেলে বিয়ের বয়েস হতে তার জন্ম। ভাগ্না বউরা কোনোদিন মুখ বাঁকা করেনি বরং আপন মামুর মত এটা ওটা করে দেবার, বাপের বাড়ির খবর আনা-নেয়ার আব্দারটা তাকেই করে। বুবুর তবুও ন্যাংটা বয়েস থেকে এক ভয়, ভাইটা না জানি তার বাড়ি উঠরা বইতল হয়ে পড়ে। তাহলে ছেলে বউদের কাছে তার মুখটা ছোট হয়ে যাবে, অথচ খালি ভিটায় পাঠায়ও কোন বুকে। তুমি চিন্তা করিও না বুবু...ইবার ঘর-দোয়ার ঠিক করমু ভাবিয়ার। বিয়া শাদির কিতা চিন্তা করলে? শরীরো পুক পড়লে কে কার পুড়ি তোর ঘরো দিবো?
দেখি...
কাঁঠাল বিচির ভর্তা, তারপর হাঁসের মাংস দিয়ে বাঁশের করুল; সব শেষে ইলিশ দিয়ে রাঁধা ডেফলের ঠেঙ্গার বাটির দিতে হাত বাড়ায় ময়না।

জ্যৈষ্ঠ মাসের এই এক খেলা। গরমে যখন শরীরের ঘি গলতে শুরু করেছে, হঠাৎ আসমান কালো হতে থাকবে। পাহাড়ের মাথায় ছায়া পড়াতে হতভম্ব গরু ঘাস-খাওয়া বাদ দিয়ে এদিক-ওদিক কারণ খুঁজতে থাকবে। পাখ-পাখালি ভাব বোঝার জন্য থেমে পড়বে ডালে ডালে, সবশেষে খয়েরি আলো পিছলে যাবে ঘরের ভেতর। খোদার কি লীলা ঘট ঘট করে তখন মাথার উপর ঘুরতে থাকবে ফ্যান। আম্মা পাটি ছেড়ে রান্না ঘরে পা বাড়াবেন চায়ের জন্য। দুপুরের ভাতমাছ রাঁধা থাকলেও এমন উৎসবে বাড়তি কিছু রাঁধার জন্য মনটা ছলকে উঠবে ঘরে ঘরে বউ-শাশুড়িদের। যেমন নালিয়া শাক, সুটকি ভর্তা, লেবু-ডাল, ডালের বড়া। লাঠি ঠুকে ঠুকে তেলগাছের তলা দিয়ে পুকুর দিকে হাঁটতে থাকবেন দাদাজি।

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো গাছের মাথায়। আকাশ ঘন নীল সুর্মার মত। সহজে থামার নয়। দাদাজি আটকা পড়েছেন ঘাটে। কাচের মত স্থি'র পুকুরের উপর বড় বড় ফোঁটা। ফোঁটা পড়ছে আর মনে হচ্ছে ঘা খেয়ে লাফিয়ে উঠছে চ্যাপ্টা পেটের পুঁটি মাছ। ঝিনঝিন ঝিনঝিন শব্দ অবশ করে তুলছে শরীর। পাহাড়ে পাহাড়ে আর এক খেলা। যেন প্রতিটি ফোঁটায় ভর করে পরিস্থানের সব পরি নেমে আসছে তরতর করে। বন জুড়ে ঝনঝন ঝনঝন সুর। নুপুর পরা লক্ষ লক্ষ পরির ছুটাছুটি। অতি সাহসি পুরুষ তো পুরুষ, চোখ বড় বড় করে“ ঘাস-খাওয়া গোল্লায় যাক বলে বন ছেড়ে গরু বাছুর নেমে আসবে জান হাতে করে।

ময়না নি রে ভাই?

অয় দাদাজি, কোনো কাম নি?

পাছ টেকার টিকি আনিস রে ভাই..

ময়না নিরে?

অয়গো বুয়াই

বাজারো জাইরে নি?তুড়া পান আনিসরে ভাই..

এভাবে বাজারে পৌছা পর্যন্ত নানান জনের ফরমাসে ময়নার ঝুলি ভরে উঠতে থাকে, কেউ কাঁঠাল গাছের গোড়ায় বসে হুকার নলে গুড়গুড় শব্দ তুলতে তুলতে,কেউ পাখার বাতাস খেতে খেতে, কেউ আবার খামাখাই কুড়েমি করে ফরমাস করতেই থাকবে তাকে, ময়নার সবকিছুতেই আছ্চা ঠিকাছে…আবার নিজে নিজে খোঁজে খোঁজে মানুষের সমস্যার সন্দানে সকাল থেকে রাত অবধি ঘুরে ঘুরে মরবে গ্রামজোড়ে, কার বাছচা হবে, কার ডাক্তর লাগবে মধ্যরাতে, কার ঢাকা এয়ারপোর্টে যাবার সঙ্গী নাই, কার ফেমিকন, কার বাপের বাড়ি গোপন খবর নিয়ে যাওয়া দরকার, বাসর ঘরে কি কি লাগবে, কে কার প্রেমে বশ মানছেনা, তাবিজ লাগবে, আমলার তদবির লাগবেই এই ব্যাপারে, পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক যুগলের সাথে হাজতবাস, কার জন্য চন্দন সাহার দোকানের সিঁদুর লাগবে,ঠাকুরবাড়ি মানস আছে অথচ নারকেলের খবর নাই, খোকার নুনুতে ঘন্টি বাঁধতে হবে, ময়না ভাই আছেই...

আমি দীনা, সুমান্না তখন পাতা ভাবীর বাড়িমুখী। যতবার পাতা ভাবীর কাছে যাই, ফিরে আসি তওবা করে। এমন কিছু নাই যাতে ভাবীর মুখে বাধো বাধো ঠিকে। তাই ভাবীর মুখ যদি এই হয়, গোষ্ঠীর দেবররা গুড়ের মাছি। পানি-ভেজা হাত পাখা হাতে দিয়ে, চালতার আচার নিয়ে আসছেন পাতা ভাবী। মুখের ভঙ্গিতেই আমাদের কান লাল হতে থাকে। খবর হুনছনি? কুন খবর? ময়না ভাইর কথা...গুলামর যদি তিকশিক থাকতো! আমি, দীনা, সুমান্না উদাসীন ভাব করি। কী হয়েছে বলে ঝাঁপ দেবার দরকার দেখি না। কারণ ময়না ভাই ঠিক আমাদের গাঁয়ের পাহাড়ী বাতাসের মত নিতচেনা। কখন কি করবে বলবে কোথা দিয়ে চলবে, কারুর না-বোঝার কথা নয়। কার কোন কাজে ময়না ভাইর হাত লাগেনি বলা দূরুহ। সবার সব কথা কানে তুললে হয় না। ক’দিন আগে ধুমধাম করে সুজন ভাই আর বাবলি আপার বিয়ে খেলো গাঁয়ের লোক। যে সুজন ভাই বাবলি আপাদের বাড়ির চৌ সীমানায় গোখরা সাপের মত নিষিদ্ধ ছিলো, যে কোনো দিন দুই বাড়ি দা টানাটানি চলতো, এখন তারা সুখে শান্তিতে বাস করছে। মুরগা মোল্লার কী মহান গুণ! যেখানে লাখ টাকা গুন্ডা হায়ারের প্ল্যান কষছিলো সুজন ভাই, ষাট টাকার এক লাল-মুর্গার বিনিময়ে পানপড়া পড়িয়ে আনলো ময়না ভাই। যেখানে ‘গাঁয়ের ছেলে-ছুকরা আবার পুরুষ নাকি’ ভাব করে বাবলি আপা আঙুলে পেছিয়ে বেনি ঘোরায়, সেই হাত বাড়িয়ে ময়না ভাইর হাত থেকে মিষ্টি পানের খিলি গালে পুরে নিলো। পাতা ভাবীর ভেতরের কথা আমি জানি। কারু ভেতরে আত্মসম্মানবোধ থাকলে এরকম হতো না। গত নির্বাচনে বিরুদ্ধ পক্ষের মানুষ ছিলো হাসনু মিয়া। কথা কাটাকাটি থেকে দা টানাটানি। হাসনু মিয়ার দা’য়ের তলায় প্রায় ভবলীলা সাঙ্গ হতে চলেছিলো ময়না ভাইয়ের। হাসনু মিয়া নাকি এখন ছনের ঘর ভেঙ্গে পাকাঘর তুলবে। ময়না ভাইয়ের চেয়ে ভাল পাথর-বালুর সন্ধান কে দিতে পারবে! তাই ‘লও ব্যাটা মামা’ বলে হাসনু মিয়া এখন জাফলংয়ে। পাতা ভাবী বললো তা নয়।অন্য আরেক কাহিনী…

সেই কবে কোন বছর মাঝর ঘরের আজাদ লন্ডন থেকে এসে একটা ট্রাভেল কিট দিয়েছিলো, ব্যবহারে ব্যবহারে কোনোমতে খোল ঠিকে আছে। তাতেই দুখানা লুঙ্গি, একখানা প্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি, একখানা সুলেমানী খাবনামা, আর নিম পাউডারের সাথে দাঁতের মাজন। মাজা ভাঙ্গা উটের মত কোনোমতে সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছে ময়না। গতকাল বাজার-ফেরত হঠাৎ মনে হলো পাতা ভাবীর জামাই বিদেশ-বাড়ি থাকে। হাতে করে কেউ যে কিছু নিয়ে যাবে, বাড়িতেও এমন কেউ নেই। ভেবে ভেবে একহালি বরিশালি আমড়া নিয়ে বাড়িতে উঠছিলো। সিঁড়ির মুখে আসতেই মনে হলো অনেকগুলি রমণী কন্ঠের হাসি-তামাশা। তারপরেই পাতা ভাবীর মুখে : ‘হে একটা মানুষ নি, ডাকের কুত্তা, হালা ময়না’।

ময়না কুকুর? ডাকের কুকুর! হাতের উল্টা পিঠে দু চোখের ধারা আটকাতে থাকে সে। আর না, আর এই গ্রামে নয়, ছত্রিশ বছর যেন গাঁয়ের পাহাড় আর বনভূমি তাকে গোলক ধাঁধায় ফেলে মজা দেখছিলো। এবার বিদায়, সব খেলা খতম…

কিতা বে...ময়না নি?

ঝাঁপসা চোখে ময়না বুঝতে পারে না, লোকটা সাহা বাড়ির লোকনাথ সাহা নাকি তার বড়দা অমরনাথ সাহা। দু’জনই নব্বই ছুঁই ছুঁই কিন্ত কী তেজরে বাপ!

অয় দাদা, কুনো দরকার নি?

অয়রে ভাই, আমার নাতি আইবো কুয়েত থাকি, কাইল একবারনু ইয়ারপোর্ট যাইতে অইবো?
ময়না তখনি পষ্ট চোখে দেখে বাপহারা অনীলের ঠাকুর্দা আমর নাথ লাটি ঠুকে ঠূকে তার পাশ কাটিয়ে আগে আগে যাচ্ছে। কাঁধের ব্যাগ হাতে এনে ময়না ও তার পিছে পিছে হাঁটতে থাকে সাহাবাড়ির দিকে….



লেখক পরিচিতি
শিপা সুলতানা

জন্ম সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ধারাবহর গ্রামে.১৯৮২ সালের ৮ নভেম্ভর. বনিক পরিবারে.গল্প লেখার শুরু ৯ বছর বয়সে,গ্রাম জড়িয়ে থাকা চাতলা পাহাড়,নিয়াতি পাহাড়,মাঘাইমা পাহাড়,পাহাড় থেকে নেমে আসা নাব্তলার পানি আর ঠাকুর বাড়ি থেকে হাতে খড়ি,কোনদিন তাদের কাছ থেকে অনুমতি আদায় হলে প্রকাশিত হবে উপন্যাস' ঠাকুর বাড়ি'. সেই অপেক্ষায়......২০০৩ থেকে স্বামী মুজিব ইরম এবং পুত্র অন্য ইরম কন্যা ইনকা ইরম এর সাথে ইংল্যান্ড এ বসবাস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন