বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সতীনাথ ভাদুড়ীকে নিয়ে আকিমুন রহমানের গদ্য : নিম্নবর্গের মানুষের মহানায়ক ঢোঁড়াই

সে এমনই এক নায়ক, ভাগ্য যার প্রতি প্রসন্ন হতেই চায়নি কদাপি। এমনই দুর্ভাগা সে, যাকে নিয়ে তার স্রষ্টারই অস্বস্তি ও অপরিতোষের শেষ নেই। তার পোশাকি নাম ঢোঁড়াই ভকত বা ঢোঁড়াই দাস, তবে তার সেই নাম তার পুরো জীবনেই ব্যবহৃত হয় দুই বা তিনবার মাত্র। অন্য সব সময়-সমস্ত জীবনব্যাপীই সে ঢোঁড়াই_অতি শিশুকালে পিতৃহীন, মায়ে খেদানো, ফেলনা একজন। 'ঢোঁড়াইচরিতমানস' (প্রথম চরণ ১৩৫৬, দ্বিতীয় চরণ ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসে সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-৬৫) বলেন তারই জীবনকথা।
তবে খুব প্রীতিপ্রসন্নচিত্তে, খুব স্বস্তির সঙ্গে থাকেননি তিনি, আখ্যানের ঢোঁড়াইয়ের সঙ্গে। 'ঢোঁড়াই' শীর্ষক স্বীকারোক্তিমূলক প্রবন্ধে সতীনাথ ভাদুড়ী খোলাখুলিভাবেই সে কথা ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, তিনি এমন এক নায়ককে গড়তে চেয়েছিলেন, যে সমাজের অন্তেবাসী, কিন্তু অসাধারণ। তাই নিম্নবাসী সাধারণদের মধ্যে 'যা কিছু ভালো নজরে পড়েছিল' স্রষ্টা সতীনাথ ভাদুড়ীর, সেইসব 'সদগুণ দিয়ে তাৎমাটুলির ঢোঁড়াইকে সাজাতে' থাকেন তিনি। এবং করে তুলতে চান নব্যকালের 'শ্রীরামচন্দ্র'। কিন্তু আখ্যান সম্পন্ন করার পরে নিজের কাছেই তাঁর স্পষ্ট হয়ে ওঠে, 'এতসব করে, শেষ পর্যন্ত ঢোঁড়াই-এর চরিত্র যা দাঁড়াল', তেমনটা চাননি তিনি। চেয়েছিলেন অন্য কিছু। আরো তুমুল 'বিশালতা' ও 'গভীরতা' ধারণকারী একজনকে। চেয়েছিলেন এক তীব্র 'নেতাকে' গড়ে তুলতে। কিন্তু স্রষ্টার সব পরিকল্পনা ও অভিপ্রায়কে এলেবেলে করে দিয়ে আখ্যানের ঢোঁড়াই হয়ে ওঠে একদম অন্য রকম একজন। 'কর্তব্যের পথে অবিচলিত থাকার দৃঢ়তা' তার মধ্যে আছে অনেকখানি- যেমনটা সতীনাথ ভাদুড়ী চেয়েছিলেন- তার অনেকটাই আছে ঢোঁড়াইয়ের মধ্যে। তবে কর্তব্যনিষ্ঠ ঢোঁড়াইকে দগ্ধে মারে তার জীবনের শোকতাপ, তা-ই তাকে শেষে আবারও পথে নামিয়ে নেয়, করে ধুকন্ত এক পথচারী- যার গন্তব্য জানা নেই। কর্তব্যের পথে অবিচল সে যতটা, হৃদয়ের সাধ-বাসনা দিয়ে বিচলিত সে তারও চেয়ে বেশি। আছে তার এক গভীর উরুঝুরু বাউলা মন- সেই মন যন্ত্রণায় পোড়ে, সম্পর্ক ও সকল বন্ধন ছেড়ে যেতে পারে নিমেষেই, তুমুল অভিমানে। একা একা বিবাগী অন্তর নিয়ে দেশান্তরী হয়ে থাকে, থাকে সংসারহীন- না সংসারে ফিরে আসে, না নতুন করে জীবনকে সংসারে বিন্যস্ত করে। থাকে চিরকাল ভ্রাম্যমাণ, সমাজের ও অন্য লোক-সকলের ভালো-মন্দের অংশীদার, জড়ায় রাজনীতিতে, দুর্ভোগ ভোগ করে শব্দহীন, কিন্তু সর্বত্রই সে খাপ না খাওয়া। কোনো কিছুতেই মিল খাওয়া, সুস্থিত একজন হওয়া কখনোই হয়ে ওঠে না তার। জীবনের বর্তমানের বর্ণগন্ধ আর তাকে স্পর্শ করে না, তার আছে শুধু অতীত স্মৃতি_তিক্ত ও অসহ কিন্তু জ্যান্ত। তার দংশনে ধুঁকতে থাকে ঢোঁড়াই, ধুঁকতে ধুঁকতেই সক্রিয় ও সংলগ্ন হয় সে, তার গোত্রের অন্য সকলের সকল কাজে। বিপদের দিনে সকলের জন্য পরিত্রাণের পথ খুঁজে বেড়ায় সে, সকলকে সে পথের সন্ধানও দেয়। বেপরোয়া ঝুঁকি নেয় সে গোষ্ঠীর সকলের স্বার্থে, আবার ওই ঝুঁকির দায়ভার বহনেও কুণ্ঠিত বা অনীহ হয় না কখনো সে। দায়িত্ব যেমন নেয়, তেমনি দণ্ড ভোগও করে সহজ মনেই। রোজকার কাজকাম, হতাশা, বিপদ, ঝামেলা-জটিলতার দুনিয়ায় সদাই সচল ঢোঁড়াই, অন্য সকলের চেয়েই বেশি সক্রিয় ও সমর্থ সে, তবে অন্তরে অন্তরে সে অন্য একজন। দগ্ধাতে থাকা, একেবারেই নির্বান্ধব ও দুঃখী। দুঃখ যাতনার যে আগুন দগ্ধায় তাকে, সে ধ্রুব বলে মেনে নেয় ওই দগ্ধ হওয়াকেই। তাই না সে দেয় কাউকে ওই বেদনার ভাগ, না চেষ্টা করে নিজেকে ওই দগ্ধদশা থেকে উদ্ধারের। পুড়তে থাকে সে, পুড়েই চলে নিরুদ্ধার- সকল সময়।

ফলে উপন্যাসে ঢোঁড়াইয়ের সঙ্গে যেতে যেতে একসময় আমাদের মনে হতে থাকে, তার সকল রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ড, নিরুপায় অন্তেবাসীগণের হিতসাধনের প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ- এগুলোর কিছুই স্থিরপ্রজ্ঞ, কল্যাণকামী কোনো সচেতন মানুষের সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড নয়। মনে হতে থাকে যে দগ্ধ পরান এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তির নিজেকে ছিঁড়ে-ফেড়ে ফেলারই নানা রকম উদ্যোগ-আয়োজন ওইসব কিছু। হতদরিদ্র কিষানদের জন্য বীজধান সংগ্রহের অভিযান চালানো, বা জমিদারের বিরুদ্ধে সকল আধিয়ারকে ঐক্যবদ্ধ করা, বা ইংরেজ খেদানোর জন্য সশস্ত্র কর্মী দলে অংশ নেওয়া- ওই সব কিছুকেই মনে হতে থাকে বেদনাদীর্ণ একজনের নিজের জীবনকে ছন্নভন্ন করার জন্য নানা মাধ্যম অবলম্বন করা বলে। তার রাজনৈতিক সত্তার ওপর গাঢ় ছায়া ফেলে রাখে ওই ভেতরের ক্রন্দনরত বাঁকাচোরা সত্তাটি। বরাবর।

ঢোঁড়াই পেরিয়েছে কেমন জীবন? আমরা জেনে নিতে পারি সে জীবনের গল্প। এ আখ্যানে এসেছে উত্তর ভারতের প্রেক্ষাপট। উত্তর ভারতের কোন দূর ভেতরে আছে এক অঞ্চল- তার নাম জিরানিয়া। এলাকার লোকেরা তাকে ডাকে 'জিরানিয়া টৌন'। সেই টাউন থেকে অনেকটা ভেতরে, এলোমেলো শিমুলগাছে ভরা প্রায় ধু ধু মস্ত মাঠ আছে । 'মাঠের বুক চিরে গিয়েছে কোশী শিলিগুড়ি রোড।' সেইখানে আছে 'মজা নদী কারীকোশী', সেইখানে দুই মহল্লা- তাৎমাটুলি আর ধাঙরটুলি। 'তাৎমারা জাতে তাঁতি', তবে তা ছিল তারা বহু পুরুষ আগে। এখন এদের পেশা ভারি অদ্ভুত। 'রোজগার এদের ঘরামির কাজ আর কুয়োর বালি ছাঁকার কাজ।' তাদের সকলেরই প্রবণতা একই রকম, 'এরা চাষবাস করে না, বাসের জমি ছাড়া চায় না, আর বাড়িতে এক বেলার খাওয়ার সংস্থান থাকলে কাজে বেরোয় না।' বাঁচে কোনো রকমে, বসত করে তারা কোনো রকমে, 'খড়ের ঘরগুলো বাঁকা নড়বড়ে- দেশলাইয়ের বাক্স পায়ের তলায় চেপ্টে যাওয়ার পর ফের সোজা করবার চেষ্টা করলে যেমন হয় তেমনি দেখতে।' পরিচ্ছন্নতার পরোয়া করে না তাৎমারা। না নিজেরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, না তাদের আঙ্গিনা, ঘর, পথ পরিষ্কার রাখে। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতায় তারা এতই অভ্যস্ত যে 'ফরসা কাপড় পরা লোক দেখলে, এখানকার কুকুর ডাকে; কোমরে ঘুনসিবাঁধা ল্যাংটো ছেলে ভয়ে ঘরের ভেতর লুকোয়।' নিজেদের দৈন্য নিয়েও কোনো সমস্যা বোধ করে না তাৎমারা। অবস্থা ফেরানোর কোনো তাগাদাই তারা পায় না কখনো। 'জিরানিয়ার অধিকাংশ বাড়িরই খোলার চাল, আর প্রতিটি বাড়িতেই আছে কুয়ো, তাই কোনো রকমে চলে যায় তাদের। ওতেই সন্তুষ্ট থাকে তারা বরাবর।

অন্য কোনো বিষয়েই চাঞ্চল্য বোধ করে না ঠিকই তাৎমারা; কিন্তু একটি বিষয়ের প্রতি তাদের চাঞ্চল্য ও আগ্রহের কখনো কোনো কমতি নেই। ধাঙড়টুলির ধাঙড়দের সঙ্গে বিবাদ-কলহের বিষয়টি তাদের অতি পছন্দের। 'ধাঙড়টুলির সঙ্গে তাৎমাটুলির ঝগড়া, রেষারেষি চিরকাল চলে আসছে।' বড় বড় বিষয় নিয়ে বড় বড় বিবাদ যেমন আছে, তেমনি ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে তাৎমা আর ধাঙড়দের মধ্যে আছে নিত্য ঝগড়া, সর্বক্ষণ। সেইখানে, সেই তাৎমাটুলিতে, ঢোঁড়াই জন্মায় 'ভালোমানুষ হাবাগোবা' বাপ আর মা বুধনীর ঘরে। ঢোঁড়াই যখন বছর দেড়েকের, তখন হঠাৎ আসা তুমুল জ্বরে ঢোঁড়াইয়ের বাপ মারা যায়। তারপর প্রায় বছর দেড়েক 'দু'দুটো পেট চালাতে বড় মেহনত' করে চলে বুধনী। নানাজন নানা রকম প্রস্তাব দিতে থাকে, একজন বিবাহেরও প্রস্তাব দেয়, "বুধনীকে সে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু 'পরের ছেলে' তিন বছরের ঢোঁড়াইয়ের ভার নিতে" সে চায় না। বাবুলাল বিয়ের কথা বলতে থাকে, বুধনী ভাবনা-চিন্তা করতেই থাকে। শেষে একদিন বাবুলালের সঙ্গে সংসার করতে চলে যায় বুধনী। তিন বছরের ঢোঁড়াইকে ফেলে রেখে যায় তাৎমাটুলির গোঁসাইথানে। গোসাইথানে তাৎমাটুলির একমাত্র সন্ন্যাসী বৌকা বাওয়ার আস্তানা। এক সকালে বুধনী ঢোঁড়াইকে নিয়ে যায় 'ওই আস্তানায়, বৌকাবাওয়ার পায়ের কাছে ছেলেটাকে ধপ করে নামায়, কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে...তারপর ঢোঁড়াইকে ওইখানে রেখেই বাবুলালের বাড়ি'তে গিয়ে ওঠে। রোগবালাই, অনাহার -অর্ধাহারের মধ্য দিয়ে বৌকাবাওয়ার সঙ্গে জীবন যেতে থাকে ঢোঁড়াইয়ের। মা বুধনী পরের সংসার থেকে মাঝেমধ্যে সুখাদ্য দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে ওই চেষ্টারও সমাপ্তি ঘটে অচিরেই। বাবুলাল ও বুধনীর ঘরে জন্ম নেয় দুখিয়া। তারপর থেকে বুধনীর সবটা মনোযোগ চলে আসে দুখিয়ার দিকে। ঢোঁড়াই পুরোপুরি হয়ে যায় ভিখারি বৌকাবাওয়ার সাঙ্গাত। বৌকাবাওয়ার সঙ্গে ভিক্ষা করে সে, জ্বালানি জোগাড় করে, জল টানে, ফয়ফরমাশ খাটে আর সুযোগ পেলেই গিয়ে হাজির হয় ধাঙরটুলিতে। তাৎমাটুলির ওই একজনের সঙ্গেই শুধু ধাঙরটুলির সকলের সদ্ভাব হয়। ক্রমে ঢোঁড়াই ভিক্ষা করা ছেড়ে, পিতৃপুরুষের ঘর ছাওয়ার পেশা ছেড়ে নেয় এক নতুন পেশা। দূর মাঠের ভেতর দিয়ে তৈরি হতে থাকা পাকা সড়কের নির্মাণ শ্রমিকের কাজ নেয় সে। আর ওই কাজ পাওয়ার জন্য নেয় ধাঙরদের সহযোগিতা। তাৎমাটুলির সকল তাৎমা ক্রোধে ফেটে পড়ে এ দুই সংবাদে।

তারা দলবদ্ধভাবে গিয়ে বৌকাবাওয়ার আস্তানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। ভিখারির সবটুকু সম্বল ছাই হয়ে যায়। তবে তাৎমাদের ওই অপকর্মের পরে থানা-পুলিশি জটিলতা দেখা দিলে ঢোঁড়াই-ই সকলকে রক্ষা করে। পাকা সড়ক বা পাক্কীর কাজ নগদ মুদ্রার নাগাল পেতে দেয় ঢোঁড়াইকে। সুখী হয় ঢোঁড়াই, বৌকাবাওয়াকেও সে সুখী করতে চায় নিজের উপার্জন দিয়ে। এভাবেই দিন যাচ্ছিল যখন, তখন একদিন ঢোঁড়াইয়ের দেখা হয় 'পশ্চিমা দেশ মুঙ্গের'-এর বাপ-মা খোয়ানো মেয়ে রামিয়ার সঙ্গে। অনেক ঝাপটাঝড় সামাল দিয়ে ঢোঁড়াই রামিয়াকে বিয়ে করে। সংসারে ঢোঁড়াইকে থিতু করে দিয়ে বৌকাবাওয়া নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ঢোঁড়াইয়ের জীবনে তারপর আসতে থাকে বিপর্যয়- একের পর এক। রামিয়া তেজী মেয়ে, সে ঢোঁড়াইয়ের সঙ্গে যতটা না হেসে কথা বলে, তার চেয়ে বেশি হেসে কথা বলে ধাঙড়টুলির 'কিরিস্তান' ছেলে সামুয়ের-এর সঙ্গে। সামুয়ের মেয়ে পটানোতে অতি দক্ষ লোক। তার সঙ্গে রামিয়াকে একদিন অনেক বেশি হাসি-মশকরারত দেখে ঢোঁড়াই জ্বলে ওঠে ঈর্ষায়।

স্ত্রীকে চড়-চাপড় দিয়ে সামলাতে যায় বটে, কিন্তু প্রবল বিপত্তি ঘটে যায় তাতে। রামিয়া বাড়ি ছাড়ে। তাৎমাটুলির পঞ্চায়েতের সালিসিতে গিয়ে ঢোঁড়াই শোনে, রামিয়া তার সঙ্গে আর থাকতে চায় না, চায় বিবাহ বিচ্ছেদ। পঞ্চায়েত সেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্যই ডেকেছে ওই সালিস। ঢোঁড়াই পঞ্চায়েতের কাছে শোনে, সামুয়েরের সঙ্গে রামিয়ার বিবাহ পাকা, শুধু ওই ঢোঁড়াইয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়িটা হওয়ার যা বাকি! সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বেদম প্রহার করে ঢোঁড়াই, তারপর ঘর-গৃহস্থালি, চেনা জীবন ও নিজ সমাজ_সব কিছু ছেড়ে যাত্রা করে দূর অজানার দিকে। বিবাগী হয়ে যায় ঢোঁড়াই, তবে পত্নী রামিয়াকে একবারও পঞ্চায়েতের কথাগুলোর সত্যতা বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে না সে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে। একটি শব্দও উচ্চারণ করতে ঘৃণা হতে থাকে তার।

'ঢোঁড়াইচরিতমানস : দ্বিতীয় চরণ'-এ আছে ঢোঁড়াইয়ের বিবাগী জীবনপর্বের গল্প। তাৎমাটুলি পেছনে ফেলে আসে ঢোঁড়াই; কিন্তু পরান তার অহর্নিশি দগ্ধাতেই থাকে কষ্টে, অপমানে, প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রণায়। বিসকান্দা গ্রামের কোয়েরিটোলা পাড়ায় বিধবা বৃদ্ধ মোসম্মতের বাড়িতে ঠাঁই হয় ঢোঁড়াইয়ের, শুরু হয় তার ক্ষেতমজুরের জীবন। জমিনির্ভর মানুষের জীবনের চলাচলতি, সমস্যা-সংকট যে তাৎমাটুলির মানুষের সংকট সমস্যা থেকে সম্পূর্ণই ভিন্ন_ক্রমে উপলব্ধি করতে থাকে ঢোঁড়াই। এখানে অনাবৃষ্টি মানেই সর্বনাশ। জমির ফসল শুকিয়ে শেষ, অনাহার অনিবার্য। আবার বৃষ্টি এলেও কিষান স্বস্তি পায় কই! বীজ নেই যে বোনে, চারা নেই যে রুয়ে দেয়। সব আছে একজনের_'গাঁয়ের বাবুসাহেব বচ্চন সিংয়ের', যার জমি আছে প্রায় তিন হাজার বিঘা। ক্রমে ঢোঁড়াই ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ে বিসকান্দার সকল পাড়ার মানুষের জীবনের সঙ্গে, তাদের সমস্যা ও সংগ্রামের সঙ্গে। মোসম্মতের বিধবা মেয়ে সাগিয়া তাকে নিঃশব্দেই মায়া, মমতা ও দরদ দিতে থাকে। ঢোঁড়াই বোঝে তা, তবে নিজের ভেতরে কোনো সাড়াতাপ সে বোধ করে না। দিন যেতে যেতে অনেক দিন যায়। গ্রামে এসে পৌঁছে গান্ধীবাদী আন্দোলনের ঢেউ। ঢোঁড়াই গ্রামকেন্দ্রিক সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। যুক্ত হয় স্বরাজবাদীদের সঙ্গে। থানা জ্বালায়, রেললাইন উপড়ায়, গাছ কেটে কেটে রাস্তায় রাস্তায় ইংরেজ ফৌজদের পথে ব্যারিকেড দেয়, স্বরাজবাদীদের সঙ্গে পালিয়ে বেড়াতে থাকে এক আস্তানা থেকে অন্য আস্তানায়। নিজেদের ব্যয় নির্বাহের জন্য গ্রামের সম্পন্নদের নানাভাবে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। উত্তর ভারতজুড়ে গ্রামে গ্রামে রাজনীতির তুমুল হুলস্থূল, ঢোঁড়াই নিজেও হয়ে যায় সেই হুলস্থূলের অংশ। তবে গান্ধীজীকে সে মানে শ্রীরামচন্দ্রের নব্যঅবতার বলে, মহা এক রাজনীতিবিদ বলে নয়। ইংরেজ শাসক ওইসব স্বরাজবাদীকে আত্দসমর্পণ করার ডাক দিলে, ঢোঁড়াই দেখে যে তাদের গ্রাম্যস্বরাজ দলের বাঘা সব নেতাই নানা ছলছুতায় আত্দসমর্পণের দিকে যেতে থাকে। কেউ কেউ দলের জমানো সব টাকা নিয়েই সটকে পড়ে, কেউ সটকে পড়ে কার্তুজ, পিস্তল ও মূল্যবান অন্য সব কিছু নিয়ে।

ঢোঁড়াই নিজের রাজনীতির মত ও মন্ত্রে অটল থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তবে দলে নতুন আসা কিশোর বিপ্লবী এন্টনি তাকে ভেতরে ভেতরে মমতাকাতর, স্নেহ বুভুক্ষু করে তোলে। তার বিশ্বাস হতে থাকে, এই এন্টনি হচ্ছে রামিয়ার গর্ভে রেখে আসা তার সেই সন্তানটি। সামুয়েরকে রামিয়া পরে বিয়ে করে বলেই ঢোঁড়াইয়ের পুত্র এই এন্টনি নাম পেতে বাধ্য হয়েছে বলে গভীর প্রত্যয় জন্মে ঢোঁড়াইয়ের ভেতরে। খুব অসুস্থ হয়ে পড়া এন্টনিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে যায় ঢোঁড়াই। গিয়ে দেখে এন্টনি ও তার মা বসত করে ঢোঁড়াইয়ের সেই তাৎমাটুলির বাড়িটাতেই। কিন্তু এন্টনির মা রামিয়া নয়, সে অন্য এক নারী। সামুয়েরের সঙ্গে ওই নারীর বিয়ে হয় বটে; কিন্তু স্ত্রীকে জ্বালিয়ে শেষ করে সামুয়ের ধাঙড়টুলির অন্য এক ধাঙড় বউকে নিয়ে পালিয়ে যায়। এন্টনি ওই দুর্ভাগা মা ও ছন্নছাড়া বাপ সামুয়েরের ছেলে। আর রামিয়া? সে সেই বহুকাল আগে 'এক মরা ছেলে বিয়োনোর পর' মারা যায়। লোকেরা এখনো বলাবলি করে, 'সে মেয়েটার দোষ ছিল কি না ভগবান জানে', তবে 'তাকে না জানিয়েই পঞ্চারা এই কাণ্ড করেছিল।' সামুয়েরের টাকা খেয়েছিল পঞ্চারা, তাই ওইদিন অমন বিধান জারি করেছিল পঞ্চারা। ক্রুদ্ধ-হতভম্ব ঢোঁড়াই সেদিন তা খতিয়ে দেখেনি। আজ, বহুদিন পরে, তা জানতে পেরে ধস নামতে থাকে ঢোঁড়াইয়ের ভেতরে; পুড়তে থাকে তার বাকি আয়ুটুকু। আর চলার শক্তি থাকে না ঢোঁড়াইয়ের। থুবড়ে পড়ে যায় সে, পড়ে যায় তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশ ও দিনবদলের ধুকপুক আশা সব কিছু। ঢোঁড়াই তবু শ্লথ পায়ে হাঁটা শুরু করে, হাঁটতে থাকে সে, তবে এবার আর নিরুদ্দেশের দিকে নয়। এবার তার গন্তব্য শহরের কাছারি আর এসডিও অফিস। জেলখানার গারদের ভেতরের জ্বালা-যন্ত্রণা শাস্তি ছাড়া নিজেকে আর কিছু দেওয়ার কথা ভাবতেও পারে না এখন ঢোঁড়াই। সেই শাস্তি অবধারিত করে তোলার জন্য ঢোঁড়াই যেতে থাকে সারেন্ডার করার দিকে।

এই যে জীবন পেরোয় ঢোঁড়াই, সেই জীবনে সে থাকে দুই ভূমিকায়। এক ভূমিকায় সদা সক্রিয়, সচল একজন সে। এই ভূমিকায় সে অন্য সকলের চেয়ে বেশি বুঝবুদ্ধি বিবেচনার শক্তিসম্পন্ন। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তির ওপর পুরো আস্থা আছে তার এবং সমাজের সকলেই তার বিরুদ্ধাচরণ করলেও নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকার মনোবল তার কখনো নড়ে যায় না। নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করার ক্ষমতা তার ঢের। ক্রমে অবোধ মাথা গরম করা নিজের লোকসকলকে সে তার সিদ্ধান্তের যথার্থতা বুঝিয়ে ওঠারও শক্তি রাখে ভালো রকম। যতই ঢোঁড়াই সামাজিক সমস্যা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে, ততই সে বুঝতে থাকে, একা যে মানুষ, প্রকৃতপক্ষে সে অতি অসহায় একজন। নিজেকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই মানুষকে হতে হবে সংঘবদ্ধ। সে বুঝে ওঠে, 'হকের ধন সামলাতে লাগে লড়াই, অথচ একা হাতে লড়া যায় না।' ঢোঁড়াই সংঘবদ্ধ করে কোয়েরীটোলার ভূমিমজুরদের- সে নিজেও যাদের একজন। থাকে স্বরাজসংঘে, সংঘবদ্ধভাবে লড়ে যেতে থাকে জীবনকে বদলে ফেলার জন্য। তবে এ সক্রিয় ভূমিকা পালনকারীর ভেতরে বাস করে সমাজবদল বা দিনবদলের স্বপ্নময় একজন নয়। বাস করে এক হতোদ্যম, ক্লিষ্ট বিবাগী। সংসার বাসনা যার তীব্র, কিন্তু বঞ্চনা ও দুঃখ ছাড়া তার প্রাপ্তি কিছুই নেই। সে কেবলই পোড়ে, যন্ত্রণা সয়ে যায়; কিন্তু পরিত্রাণের পথ জানা নেই তার। ঢোঁড়াইয়ের জীবনে শেষ পর্যন্ত সেই সক্রিয় সচল সত্তাটি প্রবল হয়ে ওঠে না, আধিপত্য বিস্তার করে নেয় ওই বিবাগী সত্তাটিই। ওই দুঃখীপ্রাণের দুঃখই আমাদের প্রাণকে ছুঁয়ে থাকে প্রবল রকম, তার রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের ওঠানামাটা নয়।

'ঢোঁড়াইচরিতমানস' ঢোঁড়াইয়ের আখ্যান যতটা, ততটাই হচ্ছে অন্তেবাসী সমগ্র এক জনগোষ্ঠীর কাহিনী। এ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের প্রধান আঞ্চলিক রংবাদী উপন্যাসের একটি, যাতে উত্তর ভারতের ভূপ্রকৃতি_তার সমাজ-অন্তবাসী সম্প্রদায়ের জীবন, রীতি-নিয়ম, ভাষাভঙ্গি, ধর্মাচরণ, জীবন পদ্ধতি_সবই উঠে এসেছে অতি তন্নতন্ন রূপে, আর উঠে এসেছে একটি বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রভাবের ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিচয়টি। ওই অন্তেবাসীগণের জীবনের নিয়ন্ত্রক শুধু ধর্ম নয়, বরং অনেক শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকই হচ্ছে রাজনীতি। ঢোঁড়াই এই দুই শেকল দিয়েই শৃঙ্খলিত।


লেখক পরিচিতি
আকিমুন রহমান 
ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। ১৪ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও পিএইচডি। পেশা- শিক্ষকতা। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে (১৯৯৭), এইসব নিভূত কুহক (২০০০) এবং বিবি থেকে বেগম (১৯৯৬)।





1 টি মন্তব্য: