বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সাগর রহমানের গল্প : হোলা চোর

কলুকাটি গ্রামে কথা এবং আ-কথা ছড়ায়- হয় কলুকাটিহাট হতে, কিংবা মুৎসুদ্দী দীঘির ঘাট হতে।

যা-ই ছড়াক: কথা কিংবা আ-কথা, যেখান থেকেই ছড়াক: কলুকাটিহাট কিংবা মুৎসুদ্দী দীঘির ঘাট, তা বিদ্যুৎ বেগে সমস্ত গ্রামের আনাচে-কানাচে, আগানে-বাগানে ঘুরে আবার ছড়ানো জায়গায় আসতে আসতে, লোকজনের মুখে মুখে দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্তে বেড়ে, কিংবা সংকুচিত হয়ে যায়। কথাটি তখন ঘরে ঘরে ইনিয়ে-বিনিয়ে, দরকারে-অদরকারে, আবালবৃদ্ধবনিতারা জায়গায়-অজায়গায় আলোচনা করে করে কিছুদিনের জন্য কথাটি জিইয়ে রাখে। তারপর একদিন কলুকাটিহাট কিংবা মুৎসুদ্দী দীঘির ঘাট হতে আরেকটা কথা ছড়ায়, এবং পূর্বের ছড়ানো কথাটির জায়গা নিয়ে নেয় বিন্দুমাত্র সোরগোল না তুলে।
এ জাতীয় কথাকে কলুকাটিতে বলে - ‘চলতি কথা’। অযু করার সময় যেমন কুলকুচি করার দরকার পড়ে, তরকারিতে যেমন লবণ দেয়া লাগে, এবং রাস্তায় হাঁটার সময় যেমন কায়দা করে ডান ও বাম হাত নাড়ানো লাগে, কলুকাটি জনগণের সেরকম সবসময়ই একটা কোন চলতি কথা নিয়ে বাঁচার দরকার হয়। গ্রাম থেকে কেউ কয়েকদিনের জন্য বাইরে কোথাও গেলে, গ্রামে ফিরে প্রথমে যে খোঁজটি নেয়, তা হলো - এই মূহূর্তে চলতি কথা কোনটা, সেটি। কেননা, সে মোতাবেক কথাটির সাথে তার একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে, নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে। এক কথায়, ম্যালা কাজ জমা হয়ে থাকবে কিছুদিনের জন্য অনুপস্থিত মানুষটির জন্য। এটাই কলুকাটির চিরকালীন দস্তুর। এ দস্তুরের ভিন্ন হলে, মানে কোন কথা ছড়ানোর পর, গ্রাম ঘুরে ছড়ানোর জায়গায় ঘুরে আসতে না আসতে যদি নেতিয়ে যায়, মুখের মধ্যে ঠিক সোয়াদ না লাগে আলোচনার সময়, তাহলে বুঝতে হবে, কথা কিংবা আ-কথাটির ছড়ানোর মতো আসলে যোগ্যতাই ছিল না। তখন লোকজন কথাটি নিয়ে আফসোস করে। তারা মাথা নেড়ে বলে, ধুর ও, এক্কেরে বেহুদা কথা লইয়া মাতামাতি।

ছড়ানোর মতো যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হলে একটা কথার কি কি গুণ থাকতে হবে, তা হয়তো একটা নৃতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়ই, কিন্তু কলুকাটির লোকজন এত সব গবেষণার ধার ধারে না। এটা ¯্রফে, তারা, মানে কলুকাটির জনগণ জন্মসূত্রেই কেমন কেমন করে যেন জেনে ফেলে, এবং দিন তিনেকেরে বেশি তাদের লাগে না এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিতে: কোন কথাটি বেহুদা এবং কোন কথাটি চলতি।

সেবার যেমন, মফিজ উল্যা তার পীর বাড়ি হতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে কলুকাটি ফিরে এসে হাটে রমিজের আড়তে বসে, অসর্তকতায় উপরের দিকে উঠে যাওয়া হাঁটুর কাপড়কে বাম হাত দিয়ে নিচের দিকে টানতে টানতে বললো, কি মাজেজা পীর বাবার, শুনলে তাব্বু খাইয়া যাইবা। রমিজের আড়তে সাধারণত বেশি ভীড় থাকেনা, কথা ছড়ানোর মোক্ষম জায়গা এটা নয়। কিন্তু দিনটা আড়তের হালখাতার দিন বলে বেশ জনসমাগম হয়েছিল, আর সে সুযোগটাই নিল মফিজ উল্যা। হাতে রসগোল্লার রস ছিল বলে তার লুঙিতেও তা লেগে গেল এবং সে মনে মনে ভাবছিল, মাবুদ রে মাবুদ, আইজ না পিঁপড়ায় ধরে রাইতে? এবং মুখে পীর বাবার মাজেজার কথা উঠালো। কাজ কর্ম বাদ দিয়ে পীরের দরবারে সে প্রায়ই পড়ে থাকে। আর সেজন্য তাকে লোকজন ঠ্যাস মেরে কথা বলে, সুতরাং সে পীর বাড়ি থেকে প্রতিবার এসেই বাবার নানাবিধ মোজেজার কথা উঠায়। আরো যারা তার চারপাশে রসগোল্লা কিংবা নিমকি খাচ্ছিল, তারা মফিজের দিকে তাকাল, তবে কারোই আলাদা করে আগ্রহ দেখা গেল না। মফিজ লোকজনের অনাগ্রহ লক্ষ্য করে আরেকটু উঁচু গলায় শুরু করলো, রাইত তিনটা সোয়া তিনটা হইব। দরবারের মজমা তখনও চলতাছে। দোয়া-দরুদ-মিলাদ-জিকির-আজকারের বিরাম নাই। হঠাৎ আমার কি জানি মনে হইল, মনে হইল বাবায় আমারে ডাকে। চোখ বন্ধ কইরা ছিলাম, চোখ খুললাম। দেখি আমার চারদিকে মানুষে মানুষ, বাবায় তো নাই। কিন্তুক আমি তো পষ্ট শুনলাম। স্টেজে তাকায়া দেখি বাবায় ওখানেও নাই, কখন যে নি উইঠা গেছে। আমি ঘোরের মধ্যে উইঠা হুজরাখানার দিকে আগায়া গেলাম। দেখি কি, ও মারে মা...।

এ পর্যন্ত বলে মফিজ নিমকিতে কামড় দিলো। এটা মফিজের টেকনিক। মিনিট খানেক এখন একটু চুপ করে থাকা দরকার। লোকজনের আগ্রহের পাল্লাটা মেপে ঝুপে আগানো দরকার। ‘ও মারে মা...’ টা সে যথেষ্ট কায়দা করেই উচ্চারণ করলো, তবু বেশির ভাগ লোকই তার দিকে তেমন একটা খেয়াল করলো না। মফিজ একটু দমে গেল। আজকে হালখাতার খাওনের দিকেই আসলেই লোকজনের মনোযোগ। শুধু চুনু কারিগর বললো, কি দেখলা হুজরাখানায়? মুখে পান চিবাতে চিবাতে এমন ভাবে সে কথাটি বললো, মফিজের মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। পীর বাবার এমন অদ্ভুত মোজেজার গল্প এমন জায়গায় দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না মনে হয়। তবু একবার যখন সে শুরু করলো, বাকিটা বলতেই হয়। মফিজ বলতে শুরু করলো, হুজরাখানায় সবসময় মশাল জ্বালানি থাকে। ঘি মাখাইন্যা লাল রঙা মশাল। আলোর রঙও কেরুম মরিচের মতন লাল। কিন্তুক আজকে মনে হইল কেমন চমকা চমকা আলো। আর তার লগে লগে ধোঁয়া উঠতাছে। আমি ঘটনা কি ভাইবা আগায়া গেলাম। সকলের আবার হুজরাখানায় আশে পাশে বিনা অনুমতিতে যাওনের হুকুম নাই, শুধু আমরা কয়জন বিশিষ্ট মুরীদগো কথা আলাদা।

‘বিশিষ্ট মুরীদ’ শব্দটি বলে মফিজ সগর্বে সবার দিকে তাকালো। কেউ তেমন গ্রাহ্য করলো বলে মনে হলো না। সে কিঞ্চিত দমে গিয়ে বলতে লাগলো, হুজরাখানার জানালায় মোটা পর্দা। ভাল কইরা সব কিছু ঠাওর করন যায় না ভিতরে। শুধু একটা জানালার পর্দা একটু উইঠা রইছে দেইখা আমি আগ-পিছ কিছু না ভাইবা চোখ দিলাম ভিতরে। ইয়া মাবুদ, চোখ দিয়াই তো আমার গায়ের লোম তারের মতো খাড়ায়া গেছে। দেখো, দেখো, এখন আবার খাড়ায়া গেছে।

বলে সে চেরাগ বাত্তির আলোয় তার পাঞ্জাবীর ঝুল ঘুটিয়ে হাত দেখাল। এতক্ষণে মনে হচ্ছে লোকজনের কিছুটা আগ্রহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই তার হাতের লোম পরখ করতে চাইলো। ঘটনা সত্য, তার হাতে যদিও লোম কম, তবু যে ক’গাছি আছে, সব যেন দাঁড়িয়ে আছে। গভীর উদ্বিগ্ন হয়ে সাদিক চৌকিদার বললো, কি দেখলা ভিতরে? মফিজ হাত গুটিয়ে নিয়ে বললো, দেখি কি, পীর বাবায় নামায পড়ে। একলা। ঘরে ফুরফুরা আলো আইসা বেহেস্তখানার মতো হইয়া আছে। আর বাবার জায়নামাযের চার কোণায় চারটা ইয়া বড় গোখরা মস্ত ফণা তুইল্যা চার দিকে মুখ কইরা বাবারে পাহারে দিতাছে। ও বাবারে, যেই আমি পর্দার ফাঁক দিয়া চোখ দিছি, একটা গোখরা চক্ষের পলকে স্যাঁত কইরা জানালায় আইসা হাজির, এক্কেরে আমার মুখের সামনে আইসা ইয়া বড় ফণা দোলাইতেছে। তোমাগোরে কি কমু, চোখের মধ্যে যেন আগুন, রাগে দাউ দাউ কইরা জ্বলতেছে। আমি ধান্দা খাইয়া খালি তাকাইয়াই আছি, তাকাইয়াই আছি, মনে হইল জানালার ঐ পার থেইক্যা আমারে শুইষ্যা নিতেছে, অথচ আমার নড়নের ক্ষমতা নাই, ঠিক সে সময় পীর বাবার নামায শেষ হইল আর ‘হেই ও’ কইয়া যে ধমক দিলো...

এমন আচানক মোজেজার গল্প কিন্তু কলুকাঠির দস্তুরের বাইরে পড়লো। দিন সাতেক পরে, হাটের দিন, গল্পটি যখন সারা গ্রাম ঘুরে তার উৎপত্তিস্থল রমিজের আড়তে ফিরে এলো, তখন শোনা গেল, গোখরা সাপ না, ‘পীর বাবারে পাহারা দিতেছিল কুচকুইচ্যা মাইট্টা সাপ, হাত খানিক লম্বা’। এবং তার সাথে আড়তের এক কোণায় বসা জাফর জাইল্যা সংগে সংগে যোগ করলো, ‘মাইট্টা সাপের বিষ পোলাপাইনের দুধের দাঁতের বিষের সমানও না, কামড়াইলে বরংচ আরাম লাগে’, এ কথার পর বেদম হাসাহাসি শোনা গেল দোকান জুড়ে এবং সবশেষে উপসংহার টানলো রমিজ আড়তদার নিজে, ধুর ও, কি বেহুদা কথা লইয়া মাতামাতি। মফিজ্যাটা একটা বাইত্তা, কাম কাইজ ফালাইয়া পীর ফকির লইয়া ফালায়, আরে পীরে নি খাইয়াইবো জমিত হাল না দিলে... ইত্যাদি।

অথচ গত আশ্বিনে, মুৎসুদ্দী দীঘির ঘাটে ছেলের মূত্রা-কাঁথা ধুতে ধুতে হাবেজের মা যে আলগা স্বরে খাসের বাড়ির লাল মিয়ার নয়া বউকে বললো, বুঝলানি বউ, আমার ননাসগো দেশের কথা। হে গো বাড়ি তো আবার চরে। চরুয়া কথা আর কি। হে গো দেশে নাকি কুত্তায় অসুখ বিসুখ হইলে ঝালা ক্ষেতে নাইমা গরুর মতো ঝালা খাওন ধরে। কি আচানক কথা কও তো দেখি!

ব্যস, এটুকুই। এ কথাটাই কলুকাটি গ্রামের দস্তুর পেয়ে গেলো। সপ্তাহখানেকের মধ্যে শোনা গেল, খালি ঝালা না, গরু অসুখ বিসুখ হইলে হাবেজের মা’র ননাসদের দেশে মূলা, লালশাক, পাটশাক এবং কোন কোনটা তিতা করলা পর্যন্ত চিবায়। এ কথার সাথে কুকুর প্রজাতি সম্পর্কিত প্রচুর উপকথা আলোচনা হতে থাকে, যাতে কুকুর যে আসলে মানুষ এবং অশরীরীদের মধ্যবর্তী একটা প্রাণী, যারা স্রেফ কুকুরের চেহারা-ছবি নিয়ে থাকে, তেমন গুরু-কথাও অত্যন্ত জোর দিয়ে আলোচনা হতে থাকলো। এমনকি কুকুরের লেজ কেন বারো বছর চোঙার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলে সোজা হয় না, তার উত্তরও এ প্রসংগে কলুকাটিতে আবিস্কৃত হলো। মজুর বাপ তার লম্বা দাড়িতে এক টাকা দামের কালো চিরুনী বুলাতে বুলাতে এবং দু’একবার চিরুনী দাড়িতে আটকে গেলে, দাড়ি ছেঁড়ার বেদনায় উহ্ উহ্ করতে করতে তার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলো, মাইনষের বুদ্ধি থাকে কই? মাথায়, ঠিক কিনা কও? কিন্তুক কুত্তার বুদ্ধি থাকে কই? হেহ হে, মাথায় না, কুত্তার হইল চিকন মাথা, খাওয়া-খাদ্যের চিন্তা আর ঘেউ ঘেউ করনের জায়গা ভিন্ন তো ফাঁকা নাই। হে গো বুদ্ধি থাকে লেজে, ঘুরাইন্যা-প্যাঁচাইন্যা বুদ্ধি, লেজও থাকে ঘুরাইন্যা-প্যাঁচাইন্যা। হেই বুদ্ধি কি আর চুঙার ভিতর ঢুকাইয়া সোজা করন যায়? বুঝলা না, হেই জাত তো... বলে মজুর বাপ তার ধান কাটার সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বিশেষ ধরনের চোখ টিপে। সবাই মাথা ঝুঁকায়, কুকুর যে আসলে হেই জাত- তারা বুঝেছে।


তো এই হলো কলুকাটির দস্তুর। এ মোতাবেক, কলুকাটির লোকজন নিয়মিত হাটে কিংবা মুৎসুদ্দী দীঘির ঘাটে কাজ-কর্মের ফাঁকে ফাঁকে কান খাড়া করে রাখে। তাই যখন বশিরের বাপ বড় রাস্তার রেইনট্রি গাছের প্রশস্ত গুঁড়ির উপরে বসে আকিজ বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে কথাটি বললো, কেউ তেমন একটা গা করলো না প্রথমে। রেইনট্রি গাছের গুঁড়ির উপর বলা কোন কথা এ পর্যন্ত কলুকাটিতে জনপ্রিয় হয়নি। অথচ এবার হলো। বশিরের বাপ বলছিল, পোলাপাইনরে চোখে চোখে রাখন দরকার। মইজ্যার পুলে বলি খুঁজছে। বলি দেওনের লাগি গেরামে গেরামে হোলা চোর বাইর হইছে।



দুই.
মইজ্যার পুল যে বলি খুঁজবে - এটা অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরে লোকজনের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ‘এতবড় খালের উপর পুল বানাইবা, আর খাল চাইয়া চাইয়া দেখবো, হের পেটে ভুক লাগবো না, তাতো হইব না, সব কিছুরই একটা ভুক আছে ’ - এমন ধরনের কথা তারা সেই প্রথম থেকেই বলে আসছে। মইজ্যার খাল দিয়ে সেই মেঘনা থেকে এদিকে পানি আসে, ঘোলা পানি বিশাল বিশাল সব কচুরীপানা কোন মুল্লুক থেকে জোরসে টেনে এনে আশেপাশের গ্রামের বিলে, খানায়-খোন্দে ঢুকিয়ে দিয়ে যায় আর কলুকাটির গরুরা সেসব কচ্ কচা কচুরীপানা খেয়ে আল্লার দরবারে শোকর গুজার করে।

মইজ্যার খালে যে জায়গায় পুল বানানো হচ্ছে, তা থেকে কলুকাটি মাইলখানেক দূরে। তার মাঝখানে আরো গোটা পাঁচেক গ্রাম আছে, তবু বলি বিষয়ে কলুকাটির লোকজনকে যারপরনাই সর্তক হতে হয়। বশিরের বাপ শুধু খবরটা দিয়েই ক্ষান্ত হয় নাই, যেহেতু হাতের হুক্কাটায় তামাকের আগুন তখনো নিভেনি, এবং হুক্কার তামাম শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের মাটি কাটার বিরতি, তাই সে বাকি সময়টায় বলি সম্পর্কিত তার জ্ঞান বিশদ করে, বুঝলা, বলির কিন্তুক কিছু নিয়ম আছে। একটা খাইয়াও মানতে পারে, আবার দশটা খাইয়াও না মানতে পারে। ভুক মতো আর কি। গভরমেন্টে তখন বেতন দিয়া হোলা চোর রাখে। হেই হোলা চোররা বড় বড় বস্তা লইয়া গেরামে গেরামে ঘুরে, কেউ কটকটি বিক্রির ধান্দা লইয়া আসে, কেউ আইসক্রিম লইয়া আসে, মগর ঘটনা কিন্তুক এক। পোলাপাইন কোনটারে একলা পাইলে বস্তায় ঢুকাইয়া পগার পার। তাইলে বুঝ, সাবধান হওন দরকার কিনা?

বলি সংক্রান্ত খবরাখবর এরপর থেকে আরো বিশদ হওয়া শুরু হলো সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে। কলুকাঠির চলতি কথা হিসেবে মইজ্যার পুলের বলি খোঁজার আলোচনা হতে লাগলো। মুৎসুদ্দীর দীঘির ঘাটে সোলায়মানের মা তার বাপের দেশে দেখা ঘটনাটাও সবিশেষ ব্যাখ্যা করলো। দেখা গেলো শুধু সোলায়মানের মায়ের বাপের দেশে না, এ গ্রামে বউ হয়ে আসা প্রায় সব মা’দের বাপের দেশেই এজাতীয় ঘটনার ইতিহাস আছে। কলুকাটির পুরুষদের বাপের দেশ যেহেতু এটাই, জন্মাবধি এ গ্রামেই তারা আছে, তারা স্ব স্ব স্ত্রীদের বলা ঘটনাই মাল-মশলা সহযোগে প্রচার করে বেড়াতে লাগলো। যার স্ত্রীর বাপের দেশের ঘটনা যত মুখরোচক, খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছিল, তার বুক কিঞ্চিত ফুলেও উঠছিল গর্বে। কিন্তু শুধু মুখরোচক আলোচনা করেই ক্ষান্ত হবার কোন উপায় ছিল না বর্তমান চলতি কথাটার। হোলাচোরদের ঠেকানোর পথ ও মত নিয়েও তাদের আলোচনা শুরু করতে হলো।

দেখা গেল, ঘটনা আসলেই প্যাঁচ খেয়ে গেছে: কলুকাটিতে কটকটিওয়ালা ও আইসক্রিমওয়ালার যাতায়াত যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে গত কয়েকদিন ধরে। কলুকাটিতে কটকটি, আইসক্রিম, মাটির হান্ডিপাতিলা এবং চুড়ি-তাগা-তাবিয বিক্রি করতে আসা লোকগুলো তাদের চিরচেনা; তাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠি-ঠিকুজি-কুলজির খবর এ গ্রামের লোকেরা জানে। তবু গভরমেন্ট যে কখন কাকে গোপনে বেতন দিয়ে হোলাচোর বানিয়ে ফেলেছে, সে খবর ঠিক ঠিক না জানা থাকার কারণে কলুকাটিবাসীকে অতিরিক্ত সর্তক হতে হয়। তারা দরকারে-অদরকারে চোখ ও কান খোলা রাখার পরিকল্পনা মোতাবেক খেয়াল করলে কটকটিওয়ালা বা আইসক্রিমওয়ালা কিংবা মাটির হান্ডিপাতিলওয়ালার হাবে-ভাবে একটা আলগা ভাব দেখতে পায়: মফিজ্যার চোখ মুখে কেরুম যেন চোর চোর ভাব, খেয়াল করি দেখছ নি? কিংবা, জলিল্যা মালের ডালা থুই কেরুম বাড়ির ভিতর দিকে চগর-বগর করি চাই থাকে, খেয়াল কইরছ নি? -জাতীয় কথাবার্তা তাদের আলোচনায় শোনা যেতে থাকে। এভাবে, মফিজ্যা কিংবা জলিল্যার মতো আরো যারা যারা পোলাপাইন ও মহিলাদের নানান জিনিস ফেরি করতে গ্রামে আসে, তাদের প্রায় প্রত্যেকের আচরনেই হোলাচোরের নানাবিধ বৈশিষ্ট্য প্রকট হয়ে উঠতে থাকলে তারা তক্কে তক্কে থাকে: চুরিতো দূরে থাক, আমগো হোলাহাইনের দিকে নজর দি চাক না একবার, ধরি জিন্দা কবর দি ফালামু না এক্কেরে!

কিন্তু, ঘটনা ঘটে যায়। অথবা, এভাবে বলা যায়, ঘটনা একটা ঘটে।

মইজ্যার পুলের বলি সংক্রান্ত কথাটা পুরো গ্রাম ঘুরে তার উৎপত্তিস্তল বড়রাস্তার রেইনট্রির নীচে ফিরে আসতে না আসতেই কলুকাটি হতে অনেকগুলো ছেলে চুরি যাওয়ার খবর বৈশাখের উতলা বাতাসের মতো সারা গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে।

জৈষ্ঠ্য মাসের এক ঝড়-বৃষ্টিহীন রাতের দ্বিতীয় প্রহরে, ফক্ফকা চাঁদের আলোয় যখন মিয়া বাড়ির আধাপাগল কুকুরটার ঘেউ ঘেউ আর মানিক্যা বাড়ির কবর খোলা হতে ‘সুখ না দুখ’ পাখি মানুষের স্বরে ডেকে সুখ না দুখ জিজ্ঞাসা ভিন্ন সারা গ্রাম সুনসান হয়ে ছিল, তখুনি পুরো গ্রামকে সচকিত করে একটা সুরেলা আর্তনাদ নাড়া পোড়ানো বুনকা বুনকা ধোঁয়ার মতো মুচড়িয়ে মুচড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে রাস্তার দুইধারে ঘুমন্ত কলুকাটিবাসীর মশারীর ভিতরে। প্রথমে তারা ভেবেছিল শব্দটি বুঝি মশার ভ্যান ভ্যান। এ রকম প্রতিদিনই হয়। অনেক যত্ন করে টাঙানো মশারীর ভিতরেও কিভাবে যে মশা ঢুকে পড়ে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে তারা বের করেছে, রাত্রিতে তারা যখন ঘুমিয়ে যায়, মশারা কয়েকটা মিলে মশারীর একটা প্রান্ত তুলে ধরে রাখে, আর কয়েকটা এক সংগে ঢুকে পড়ে; তারপর ভিতরে ঢুকে পড়া মশারা ভিতর থেকে মশারী তুলে ধরে আর বাইরের গুলো ঢুকে পড়ে। তাই প্রায় রাতেই মশার ভ্যান ভ্যান শব্দে তাদের ঘুম মাঝ রাতের দিকে একটা পাতলা হয়, ঘুমের ঘোরেই তারা বুকে-পিঠে-মুখে হাত চালিয়ে চড়-চাপ্পড় এবং বিড় বিড় করে ‘হালারপুত’,‘ হুমুন্দীর পুত’ বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সেদিনও আর্তনাদটিকে মশার ভ্যান ভ্যান মনে করে দস্তুর মতো যা যা করার, তা করে তারা যখন আবার পাতলা হয়ে আসা ঘুমটাকে ঘন করে তুলবার নিমিত্তে পাশে শুয়ে থাকা স্ব স্ব বউ কিংবা সন্তান কিংবা নিদেনপক্ষে শিমুল তুলার বালিশটাকে ঝাপটে ধরে, তখন আর্তনাদটি আবার তারা শুনতে পায়। এবং এবারে তাদের ঘুম চটে যায়। জৈষ্ঠ্য মাসের গরমে ঘামে ভিজে উঠা শরীরটাকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে তারা বাড়ির বাহির হয়। রাস্তায় বেরিয়ে আসলে তারা দেখতে পায়, বড় রাস্তায় সারি সারি করই আর মান্দার গাছের উপর উপচে পড়া চান্দের আলোর তৈরি আবছায়া মাড়িয়ে একটা দীর্ঘ মানুষ হেঁটে চলেছে। মানুষটার দুই হাতে সাদা রঙের দুটি লম্বা লাঠি। হাঁটার তালে তালে লাঠি দুটি মাটিতে ঠক্ ঠক্ করে আওয়াজ তুলছে আর প্রতিবার চাঁদের আলোয় ঝিলিক মেরে উঠছে। মানুষটার পরনে পা অব্দি ঝোলানো জুব্বা। জুব্বার গায়ে অনেকগুলো জোনাক পোকা জ্বলছে আর নিভছে। মাথায় সাদা পাগড়ি। পাগড়িতেও জোনাক পোকার বাসা। মানুষটি হাঁটতে হাঁটতে একটু থামে, তারপর আচমকা গলা তুলে গায় : জাগো জাগো গেরামবাসী, ঘুমাইওনা আর, হোলাচোরায় নিছে সোনার পুত্তুলি তোমার। ওহ্ হো রে। ওহ্ হো রে।

ওহ্ হো রে বলার সংগে সংগে তার গায়ে বসা হাজার হাজার জোনাকি এক সংগে পাখা মেলে তাকে ঘিরে এক পাক উড়ে আসে। তারপর আবার তার জুব্বা আর পাগড়িতে বসে জ্বলে আর নিভে। লোকটা তখন আবার হাঁটতে শুরু করে। কিছু দূর চলে আবারও সেই সুরেলা হুংকার আর ওহ্ হো রে শব্দের নিদারুণ হাহাকার।

মানুষটি ঋজু হেঁটে চলে কলুকাটির বড় রাস্তা ধরে। কেবলি ঘুমভাঙা কলুকাটিবাসী চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে এই আচানক মানুষটিকে দেখে। ‘এই অদ্ভুদ অচেনা মানুষটি কে?’ - এ প্রশ্ন তাদের মনে দানা বাঁধার আগেই মানুষটার গাওয়া সুরে তাদের গা ঝিলিক মেরে উঠতে থাকে, ‘ওহ্ হো রে’ শব্দটি বুকের মধ্যে একটা ভয়ানক ঘাঁই মেরে মেরে উঠতে থাকে। বিভ্রান্ত বোধে হোলাচোরে সোনার পুত্তুলি চুরি করে নিয়ে যাবার কথাটি স্পষ্ট হতেই তারা সচকিত হয়ে উঠে, জুব্বা আর পাগড়ি পরা লোকটার কথা ভুলে গিয়ে তারা উর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে দৌড়ায়। তাদের দৌড়ানোর ধুপধাপ আওয়াজের ভিতর দিয়ে শোনা যেতে থাকে: ওরে খাইছে রে খাইছে, হোলাচোরায় বুঝি আমগো মনুরে লই গেছে। কথাটি শোনা যেতে থাকে এ বাড়ি, ও বাড়ি- প্রায় সব বাড়ি হতেই। বাক্যটি মোটামুটি একই থাকে, শুধু বাড়ি ভেদে মনুর জায়গায় বাসু কিংবা কাশেম কিংবা আবু, এরকম বিবিধ নাম শোনা যেতে থাকে, সাথে ধুপধুপ করে বাড়ির দিকে দৌড়ানোর আওয়াজ।


তিন.

কলুকাটি গ্রামের মাঝখান হতে নাক বরাবর উত্তর দিকে তাকালে, এ বাড়ি ও বাড়ির মাথার উপর দিয়ে চোখ গিয়ে ঠেকবে দুটি দোষ লাগা ন্যাড়া তালগাছের আগায়। তালগাছ দুটি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের একেবারে উত্তরে, বইদ্যার জঙ্গলের শুরুর সীমানায়। বহুবছর আগে দুটি তালগাছে একসংগে বাজ পড়ে, এবং সেই থেকে গাছ দুটিতে দোষ লেগে যায়। এছাড়াও কলুকাটির এ কোণায় ও কোণায়, এ দীঘিতে কিংবা ও পুকুরে কিছু দোষ লাগা জায়গা আছে যা তারা এড়িয়ে চলে। কলুকাটিবাসী ভূত, পেত্নি, দেও, পরী, জ্বিন - সবকিছুতেই বিশ্বাস করে। দুনিয়াতে এসব জিনিস যে সংখ্যায় মানুষের চেয়েও ঘন, এ ব্যাপারটিও তারা জানে। তাই, সেদিন রাত্রিতে দৌড়ে নিজ নিজ ঘরে ফিরে তারা যখন তাদের সোনার পুত্তুলিদের, মানে মনু কিংবা বাসু কিংবা জয়নাল কিংবা আবু, প্রভৃতিকে চৌকির উপর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখে, দেখে নিশ্চিত হয় যে তাদের সোনার পুত্তুলিরা ঘরেই আছে, হোলাচোরায় নেয়নি, হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে তারা একযোগে সিদ্ধান্ত নেয়, কামটা জ্বিনের, দুষ্ট জ্বিনের।

এ সিদ্ধান্ত নিতে তাদের তেমন বেগ পেতে হয় না। এমন লম্বা মানুষ সচরাচর দেখা যায় না, কেউ কেউ সাক্ষ্য দেয় যে, লোকটার মাথা করই গাছের আগায় বেঁধে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। তারওপর সারা গায়ে জোনাকির বাসা, আর মাইকের চোঙার মতো গলায় গান: জাগো জাগো গেরামবাসী, ঘুমাইওনা আর, হোলাচোরায় নিছে সোনার পুত্তুলি তোমার। ওহ্ হো রে। ওহ্ হো রে..., হাঁটতে হাঁটতে গেছেও বইদ্যা জঙ্গলের তালগাছের দিকে- নাহ্, দুষ্ট জ্বিন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। তাদেরকে ধোঁকা দেবার জন্য বদমাইশটায় সে দিন রাস্তায় নেমেছিল। কেউ কেউ এ কথাও বলে যে, ভাগ্যিস, তারা জ্বিনটার সাথে বাহাসে না গিয়ে বাড়ির দিকে চলে গিয়েছিল, নইলে কিন্তুক ঘটি গেছিল কাম! কি ঘটে যেতো- তা অবশ্য বক্তা খোলাসা করে না, কেবল চোখ টিপ দিয়ে বাক্যটি শেষ করে। বক্তা ভিন্ন অন্যরা বিষয়টা না বুঝে থাকলেও চুপ করে থাকে, কেননা, বক্তা হয়তো তাকে সবার সামনেই বলে বসতে পারে: তুই কোন ভোদাই নি ব্যাডা? অতএব ভোদাই হবার ভয়ে সবাই যে যার যার মতো- কি যে ঘটতো সেদিন, যদি তারা জ্বিনটার কথার প্রতিবাদে রাস্তায় পথ রোধ করে দাঁড়াতো- তার একটা রূপরেখা করে নেয়। জ্বিনটা যে তাদেরকে ধোঁকা দিতে পারেনি, এ আনন্দে কলুকাটিবাসীর বুক গর্বে ফুলে উঠতে থাকে। হোলাচোর তো হোলাচোর, জ্বিনওযে তাদের ছেলেমেয়েদের চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে না, এ আনন্দে ও প্রত্যয়ে তারা নিজ নিজ ছেলেমেয়েদের মিষ্টি গুলগুলা কিনে দেয়। শুধুমাত্র কারণে অকারণে একটা তীক্ষè সুর তাদের কানে পিঁপড়া হাঁটার মতো পিন পিন করে বেজে উঠে: জাগো জাগো গেরামবাসী, ঘুমাইওনা আর, হোলাচোরায় নিছে সোনার পুত্তুলি তোমার। ওহ্ হো রে। ওহ্ হো রে।



চার.

মইজ্যার পুলের ওপর দিয়ে প্রথম ইঞ্জিনচালিত যে যানটি ট্যাক্সিটি কলুকাটিতে প্রবেশ করে, তা একটি বেবিট্যাক্সি। পুল চালু হবার দুই সপ্তাহের মাথায় চিটাগাং হতে বেড়াতে আসা নিয়ামত পাটোওয়ারীর বড়জামাই বেবি ট্যাক্সি চড়ে গ্রামে প্রবেশ করেন। কলুকাটিবাসীর ভাষায়, পাটারীর জামাই ঠেক্কর ঠেক্কর একখানে চড়ি পুরা গেরাম গরম করি দিছে। গাড়িটির গগন বিদারী আওয়াজ সমস্ত গ্রামকে সচকিত করে তুললে, প্রথমে অনেকগুলো রোগা, ছালওঠা, আছে-কি-কোনমতে আছে লেজওয়ালা নেড়ি কুকুরের দল, তার পেছন পেছন ততোধিক রোগা, ফোঁড়া ও ঘা হওয়া, ন্যাংটি পরা বা না পরা টিঙটিঙে শরীরের অনেকগুলো শিশু, তাদের পেছনে নানান ক্ষেত খামারে ব্যস্ত থাকা, পাঁজরওঠা, লুঙিতে মালকোচা মারা, কামানো-আধকামানো-না কামানো দাড়িগোফেঁর, কাদা-মাটি মাখা পুরুষরা যাবতীয় কাজে মুলতুবি রেখে বড় রাস্তায় উঠে আসে। তাদের সাথে সাথে ঘাস খাওয়া মুলতুবি রেখে চোখ-কান বাড়িয়ে চেয়ে থাকে কলুকাটির যাবতীয় গরু, ছাগল ও মহিষের দল। কলুকাটির মহিলারা সাধারণত বড়রাস্তায় হাঁটার সুযোগ পায় গভীর রাত্রিতে, এ বাড়ি হতে ও বাড়িতে যাবার সময়। এ ভর দুপুর বেলায় তারা বাড়ির আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মেরে ’ঠেক্কর ঠেক্কর’ আওয়াজের কিনারা করতে উদযোগী হয়। এই বেবিট্যাক্সিটির আগে কলুকাটিতে ইঞ্জিনচালিত যান কখনো প্রবেশ করেনি, করার সুযোগ ছিল না, কেননা, বর্হিবিশ্বের সংগে কলুকাটির একমাত্র যে রাস্তাটি যোগাযোগ রক্ষা করতো, তা কলুকাটির বড় রাস্তা। রাস্তাটি গ্রামের মাঝ বরাবর পুব পশ্চিমে শুয়ে থেকে পা ও মাথা বের করে দিয়েছে কলুকাটির বাইরের দিকে। কলুকাটিবাসী এই রাস্তা বরাবর হাত দুইদিকে ঝুলিয়ে যখন হাঁটতো, তখন রাস্তার দুইপাশের ঝোপজঙ্গলে শন্ শন্ হাওয়া বইতো, দুই পাশের বিল হতে একটা সোঁদা গন্ধ এসে তাদের নাকে ওম দিতে থাকতো আর তারা তাকিয়ে দেখতে পেতো, কাঁচা রাস্তাটা এ বাড়ির কোণা বেয়ে, ও বাড়ির কাছা ঘেঁষে, পানিতে আয়েশে চলা মাইট্টা সাপের মতো এঁকে বেঁকে পৃথিবীর শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। তাদের এ সীমানাটা গিয়ে শেষ হবে আরো দুই গ্রাম পরে বাইন্যা খালের পাড়ে, আচমকা। প্রবল আক্রোশে ছুটে চলা বাইন্যা খালের প্রশস্ত শরীরের পরের যে পৃথিবী, তার সংগে তাদের পরিচিতি আছে বটে, কিন্তু সে পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তা গত-কত- শত বছর কলুকাটিবাসীর বোধ হয়নি। তাই পৃথিবী মানে এই গ্রামটি, আর তার আশে পাশের আরো গোটা কয়েক গ্রাম এবং, চাঁদ আর সুরুজ জয়কৃষ্ণা বাড়ির নারিকেল আর আম বনটার ভিতর থেকে জেগে গিয়ে খাসের বাড়ির আসমান ছোঁয়া করই গাছটার শরীর ঘেঁষে ঘেঁষে নেমে যায়- এসবইতো তাদের সীমানার মধ্যেই। সুতরাং আরো দূরের দূরের গ্রাম, গঞ্জ, শহর- যে সব তাদের কেউ কেউ ভাগ্যচক্রে কখনো কখনো দেখেছে, কিংবা এর-তার কাছে গল্প শুনেছে- তার সংগে তাদের মিথস্ক্রিয়ার পরিমাণ এত কম হয়েছে, কিংবা দরকার হয়েছে যে, কলুকাটিবাসী তাদের নিজস্ব পৃথিবীর মানচিত্র হতে বাকি পৃথিবীকে নির্দ্ধিধায় মুছে দিতে পারে। অথবা পারতো এই সপ্তাহ দুই আগ পর্যন্ত-ও।

কিন্তু মইজ্যার পুলের চকচকা পিঠে চড়ে পাটারীর জামাইর বেবিট্যাক্সি কলুকাটিতে হুলস্থুল শব্দ তুলে ঢুকে পড়ার পর দিন থেকে, হঠাৎ চারপাশের এবং দূর এবং আরো দূরের গ্রাম-গঞ্জ-নগর-বন্দর তাদের মানচিত্র পৃষ্ঠায় রীতিমত হুলস্থুল করে উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করলো। এভাবে সুনির্দিষ্ট একটা দিনকে চিহ্নিত করার ফলে কলুকাটি গ্রামের ইতিহাসের খানাখন্দে অলৌকিকতার ছোঁয়া পেয়ে যাবার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মোটা দাগে দিনটিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। এই যেমন, আগে কলুকাটির পুরুষেরা যখন বাজারে যেত, তাদের পেছনে পেছনে ঘরের ন্যাদা বাচ্চাটা বাজারে যাবার জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর করতো। তখন উপর-উপর বিরক্তি দেখিয়ে ন্যাদা বাচ্চাটির কপালে পাতিলের তলায় জমা কালি দিয়ে একটা বিশাল টিপ পরিয়ে বাজারে নিয়ে যেতো তারা। তারপর গোবিন্দের দোকান হতে মিষ্টি গুলগুলা ( যেগুলো গোবিন্দের মা এবং তার বউ সারা দুপুর চুলায় জ্বাল দিয়ে দিয়ে তৈরি করেছে) কিনে দিতো। বাচ্চাটি সে গুলগুলা সদ্য গজানো দাঁতে কাটতে কাটতে খুশিতে বাজারের ধূলায় গড়াগড়ি খেত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কলুকাটির পুরুষরা খেয়াল করতে শুরু করে, বাচ্চাগুলো গুলগুলা পেয়ে ঠিক আগের মতো খুশি হয় না, গুলগুলার চেয়ে লেমুনচুষ কিনে দিলে তাদের বেশি খুশি লাগে।

কলুকাটিহাটে ইদানীং টুং টুং করে দুয়েকটা রিকশা এবং রিকশাওয়ালা আসতে শুরু করেছে, এবং তাদের সাথে সেই কোন কোন দূরের রাজ্য হতে লেমুনচুষ সহ বিচিত্র সব জিনিস আমদানী হতে শুরু করেছে। আগে যে বাইদানীরা নৌকায় চড়ে মেয়েদের চুড়ি-তাগি-কানপাশা-নাকপাশা-বাসওয়ালা সাবান-চুলের ফিতা-তাবিজের ঠোল আনতো, এবং বাড়ির বউরা সারা বছর ধরে বিলে পানি বাড়ার অপেক্ষা করে থাকতো, সেই সব জিনিস দুয়েকটা দোকানে সবসময় পাওয়া যায়। আগে পুঁইশাকের পাকা পাকা গোটা দিয়ে বাড়ির মেয়েরা হাত ও পা রাঙাতো, তারা এখন বাবার জামার খোঁট ধরে আব্দার জুড়ে দেয়, আব্বা, একখান আলতা কিনি দিবেন নি? বাজারে নয়া আসছে। কিংবা, কোঁয়ার বাড়ির শংকরের তৈরি যেসব মাটির হাড়িতে এত যুগ তারা নিশ্চিন্তে ভাত, ডাল, তরকারি রেঁধে আসছে, ইদানীংকালে মাঝরাত্রিতে সোহাগ করার প্রাক্কালে কলুকাটির পুরুষেরা বউয়ের গলায় শুনতে পায়, মাডির হাড়িত রাঁধি আমার শরীর কয়লা অই গেল। দুইটা এলুমিনিয়ামের হাড়ি কিনি দিবেন নি আমারে, কন চাই?

কিংবা সারা দুপুর বাবা-চাচার সাথে ক্ষেতে-খামারে ধান বোনা কি মরিচ তোলা কি নিড়ানি দেবার পর, এবং বিকেলে সব্জি ক্ষেতে ঘড়া ঘড়া পানি ঢালার পর আগে যখন কলুকাটির পোলাপাইনরা দল বেঁধে দাঁড়িয়া বান্ধা কি গোল্লাছুট কি হা ডু ডু খেলতো, হঠাৎ সে সব খেলা তাদের কাছে কেমন পানসে লাগতে লাগলো, তারা লুকিয়ে সুপারি ও পুরনো লোহা বিক্রি করে এক পয়সা এক পয়সা জমিয়ে ফুটবল কিনে পরস্পরকে ল্যাং মারতে শুরু করে।

কিংবা জৈষ্ঠ্যের কাঠফাটা যে জমিন নিড়াতে গিয়ে কলুকাটির পুরুষরা নিজেদের অপুষ্টিজনিত পেশির ব্যর্থতার ঝাল মেটাতো হাড় লিকলিকে গরুর পাছায়, তারা রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে একদিন দেখতে পায়: লোহাগড়াগঞ্জ হতে বিকট শব্দ তুলে একটা ট্রাকটর মইজ্যার পুলের উপর দিয়ে এসে তাদের গ্রামে প্রবেশ করে, তারপর তাদের ও তাদের গরুর পেশিগুলোকে ভয়ানক শব্দে ভেংচি কাটতে কাটতে কয়েক একর জমি দেড়দিনের মাথায় নিড়ানি দিয়ে তুলা তুলা করে ফেলে।

কিংবা চায়ের দোকানে, জমির কিনারে, দীঘির ঘাটে আগে সেসব আকথা কুকথাকে তারা রসিয়ে রসিয়ে নানান দিক হতে বানিয়ে-ছানিয়ে বলতে বলতে সকাল-দুপুর-রাত পার করে ফেলতো, সেই তাদেরই আকথা-কুকথায় উৎসাহে ভাটা পড়ছে ক্রমশঃ। সেসব কথার চেয়ে গত সপ্তাহে হাটে আসা বাইস্কোপওয়ালার দেখানো আজইব্বা জিনিসটার এবং জিনিসটার ভিতরে দেখানো ছবিটার সাথে সাথে লোকটার বর্ণনার কথা বলাবলি করতে তাদের ভাল লাগতে থাকে: তারপরেতে কি আইলো, ঢাকা শহর দেখা গেল, আরে তারপরেতে কি আইলো, মিয়া বিবি বইসা রইলো, তারপরেতে কি আইলো, দুলদুল বুঝি পাখা মেললো...

কিংবা মইজ্যার পুলের উপর দিয়ে তরতর অথবা ফরফর অথবা ঘরঘর অথবা ঠেক্কর ঠেক্কর করতে করতে যেসব যানবাহন প্রবেশ করতে থাকে তাদের গ্রামে, কাঁচা মাটির রাস্তায় সেসবের চিহ্ন বসে থাকে পানিতে-কামড়ানো-পায়ের-তালুর-ফাটা-দাগের মতো, সেসব দাগ ধরে গ্রামের আণ্ডা-বাচ্চার দল সকালে বিকালে মুখে ঘররর, ফররর, ঠেক্কররর শব্দ তুলে গাড়ি চালানোর অভিনয় করে প্রচ- গতিতে দৌড়ে যায় সামনের দিকে, তা দেখে এবং শুনে তাদের মনে হয়- বাচ্চাগুলি যেন তাদেরকে, এই চৌদ্দপুরুষের চেনা জনপদকে এক ঝটকায় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে দূর্বার গতিতে।

এত গতি আগে দেখেনি কলুকাটির বাতাস, এত বিচিত্র শকট আগে বুকে নেয়নি তাদের কোদাল-খুন্তি দিয়ে গড়া বড়রাস্তাটি, এত সামনে যাবার শোরগোল কভু শুনেনি তাদের দীঘিটি, আমতলাটি, সবজি বাগানটি।

তাই তাদের হঠাৎ আচমকা ভয় লাগতে থাকে। প্রথম ভয়ের কথাটি কে যে তোলে- সে মীমাংসায় যাওয়ার কথা তাদের মনে আসার আগেই একটা প্রচ্ছন্ন আতংক তাদের সম্মিলিত হৃদয়ে ফিনফিনে-বাতাসে-তিরতির করে-কেঁপে-উঠা মুৎসুদ্দী দীঘির পানির মতো আলোড়ন তোলে। তারা তখন তাদের সোনার পুত্তলীদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবে, হোলাহাইন এইগুলা এরুম অস্থির কেন? গ্রাম জুড়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অস্থিরতার চিত্র তাদের আলোচনার বিষয় বস্তু হয়ে উঠতে থাকলে একদিন, কলুকাটি হাটের বটগাছের নিচে সুপারি চিবুতে চিবুতে মন্নান পাটোওয়ারি বলে, লেমুনচুষ খাইয়া খাইয়া হোলাহাইন কেরুম বেদিশার মতো হই যায়, খেয়াল করছো নি তোমরা?

মন্নান পাটোওয়ারীর বলা বাক্যটি এক তাড়া কথার বাঁধ ভেঙে দেয় এরপর; উপস্থিত কয়েকজন পর পর যেসব বাক্য বলে যায়, তা এরকম-

: কি একটা আইছে বাইস্কোপ। হাবিজাবি দেখাইয়া হোলাহাইনের মাথা দিছে বিগড়াইয়া।

: দুই পা হাঁটতো চায় না, কয়, আব্বা, রিকশা একখান লন।

: দিনকাল কেরুম বদলাইয়া গেছ, ক্যান? হোলাহাইনে বাতাসের আগে ছুডে বেদিশা অই।

: আমার মাইয়া চুনু পাউডার লাগি কান্দি বুক ভাসাই ফালাইছে। কয়, চুনু পাউডার না দিলে ভাত খাইতাম ন। আমগো মা দাদীরা জীবনে শুইনছেনি চুনু পাউডারের নাম, কও চাই।

: আজকাইলকার হোলাহাইনে কেরুম বেতালা বেতালা করে। মাইন্য-গইন্যও কেরুম কমি গেছে, খেয়াল করছো নি তোমরা।

: জেডায় কয় কি, না কমি উপায় আছে নি। আচুব্বা আচুব্বা যেসব জিনিস পাতি গেরামে ঢুকতেছে, আগের হেই গেরাম কি আর আছে নি?

: আজকাইলকার হোলাহাইন এই গুলান আর আগলা জমানার হোলাইনের তুলনা করি, আমার তো ঝাড়ি কান্দন আইয়ে রে ভাই। কি দিন আছিল, আর কি দিন আসতে আছে!

এইসব বিচিত্র অভিযোগ, পাল্টানোর হাওয়া লাগা গ্রামের নানাবিধ লক্ষণ তাদের ছাড়া ছাড়া কথায় উঠে আসতে থাকলে, একটা বিকট দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে আলোচ্য বিষয়ের সূত্রপাত করা মান্নান পাটোয়ারিই একধরনের উপংহার টানে: হোলাহাইনের দিকে তাকাই আমার তো ডরই লাগে। মনে হয়, আছে ঘরে, খায় ঘরে, ঘুম যায় ঘরে, কিন্তুক মতি-গতি দেখলে মনে হয়, আমগো হোলাইন এগুলান আমগো আর নাই। যেন হোলাচোরায় টানি লই গেছে কোনদিকে। শরীর দেখা যায় সত্য, কিন্তুক আগলা জমানার মানন-চিননের গুষ্ঠিও নাই লগে। কেয়ামত ঘনাই গেল নি কোন, কে জানে! ইয়া মাবুদ। ইয়া মাবুদ।


পাঁচ.

তারপর একদিন কলুকাটির মুরুব্বীরা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বড়রাস্তার উপর দিয়ে দুইহাত দুইদিকে দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখে- মইজ্যার পুল তার ধনুকের ছিলার মতো পিঠ কিংবা বুক পেতে দিয়ে পড়ে আছে, তার গতরের নিচ দিয়ে মইজ্যার খালের প্রমত্ত স্রোত একশো কিংবা দেড়শো হাত নিচে নেমে গেছে হঠাৎ, এবং একটা বিপুল চরাচর তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। সে চরাচরে চালচলন-খিদে-ঠাক-ঠমক ভিন্ন। সে স্রোতে তারা ঘূর্ণিবাত্যায় পড়ে যাবার মতো খাবি খাচ্ছে, হাত বাড়াতে গিয়ে পা পিছলে যাচ্ছে, কিংবা পা পিছলে গেলে চোখ সরে যেতে যাচ্ছে। অথচ তাদের মনু কিংবা বাসু কিংবা কাশেম কিংবা আবুরা সে স্রোতে কি সাচ্ছন্দ্যে সাঁতার কাটছে, হাসছে, খেলছে, বায়স্কোপ হতে নতুন শেখা গানটি গাইতে গাইতে ডুব বৌচি কিংবা কানামাছি খেলায় মেতে গেছে সেই চরাচরটির সাথে। তখন তারা আতংকগ্রস্ত হয়, চিরচেনা পৃথিবীটার দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে আশ্বস্ত হতে চায়। কিন্তু তাতে আতংক আরো বাড়ে, কেননা, বড় রাস্তার পা এবং মাথাটির শেষ ভাগ হঠাৎ করে তাদের চৌহদ্দীর বাইরে পড়ে যায়, ডানে-বায়ে-পুবে-পশ্চিমের চরাচরের বিস্তৃতি তাদেরকে অচেনা ভয়ে ভীত করে তোলে। তারা দ্রুত ঘরে ফিরে যায়। ঘরে ফিরে, নিজ নিজ বউ, ছেলে-মেয়েদের ডেকে নিয়ে, দরজা এবং জানালাগুলো ধপাধপা বন্ধ করে দিয়ে, ‘ভুল না আমারে’ লেখা সূচীকর্মের পর্দা প্রাণপনে টেনে দিয়ে- তারা ঘুমায়, ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায় তাদের মনু, বাসু, কাশেম, আবুদের: ঘুম যা রে বাছা, ঘুম যা। মইজ্যার পুলে বলি খুঁজছে, আইলো রে হোলাচোরায় আইলো।

অনেক রাত্রিতে কলুকাটির মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়লে, লম্বা আলখাল্লা পরা একজন মানুষ নেমে আসে বড় রাস্তায়, মাথায় পাগড়ি, দুইহাতে দুটি লাঠি, সারাগায়ে বাসা বাঁধা জোনাক পোকাদের সন্ত্রস্ত করে দিয়ে দিয়ে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষটা উঁচু গলায় গায়, শোন শোন গ্রামবাসী, ঘুমাইয়ো না আর, হোলাচোরায় নিছে সোনার পুত্তুলি তোমার...। মানুষটার লম্বা পা উঠে, পা নামে, জোনাক পোকার দল গুঞ্জন করে উড়ে, আবার বসে যায় পরিপাটি শৃংখলায়। এ গান তাদের স্বপ্নে হানা দেয়, ঘোর ঘোর লাগা মনে ত্রস্ত হাত বুলিয়ে তারা দেখে সোনার পুত্তুলিদের। হাতে ঠেকে, কি ঠেকে না আবুদের মনুদের বাসুদের শরীর- সে মিমাংসার লড়াই চালাতে চালাতে গাঢ়তর ঘুমে ঢলে পড়তে থাকে কলুকাটিবাসী।


পাদটীকা:
মইজ্যার পুলের বলি সংক্রান্ত চলতি কথাটি সারা গ্রাম ঘুরে রেইনট্রি গাছের নীচে অতঃপর যখন ফিরে আসে, মইজ্যার পুল ভেঙে পড়ার কোন সংবাদ পায় না তারা। ‘হেতে তাইলে বলি পাইছে, বলি পাই ভুগ মিটছে’ বলাবলি করতে করতে শিগগীরই বলি দেয়া মাথাগুলো গভীর পানির নীচ হতে বুদ্ করে ভেসে উঠবার আশায় তারা চোখ রগড়ে তৈরি হতে থাকলে- বেহুদা কারণেই হয়তো বা, মনুর, বাসুর, আবুর, কাসেমের সারি সারি কল্লা ভেসে উঠতে থাকে তাদের দৃষ্টিসীমায়।

৩টি মন্তব্য:

  1. আহা কী লেখা! এই গল্পকার আমার বন্ধু, এই অনুভূতি আমাকে সবসময় আনন্দ দেয়।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

      মুছুন
  2. সৈকত, তোমার পাঠের জন্য কৃতজ্ঞতা। মন্তব্যের জন্যও। যদিও সাহিত্যের শিক্ষকদের হাতে লেখা পড়লে ভয় ভয় লাগতে থাকে। হা হা হা।

    উত্তরমুছুন