বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'র গল্প : যারা গাছ হয়ে যায়

রাত একটা পঁয়ত্রিশ। দশ বাই আট ঘর। তাতে একটা জানলা। জানলার বাইরে জ্যোৎস্না। সেখানে সবে আঁকা শিখতে যাওয়া বাচ্চার এবড়োখেবড়ো শিল্প হয়ে সাজানো আছে কয়েকটা গাছ। খেজুর, পেঁপে, পেয়ারা, নিম- এই রকম। এই সব গাছের ব্রহ্মতালুতে ধাক্কা খেয়ে জ্যোৎস্নাটা ছিড়ে ছিড়ে চৌকো করে ঢুকে পড়ছিল জানলা দিয়ে। জানলার কাছে একটা কুকুর ডেকে যাচ্ছিল একভাবে। হেলাফেলার নেড়ি। এভাবেই রোজ রাতে ডেকে যায়। বেশি খেতে টেতে পায় না। কয়েকদিন ধরে পেটের কাছটায় একটা বড় ঘা হয়েছে। ঘা-টা ঝাঁটা-র কাঠি ( এটা দেখা যায়নি। অনুমান করা হয়েছে।) দিয়ে কেউ একজন খুঁচিয়ে দেওয়ায় তার ওপরের ঘিয়ে রঙের পর্দাটা অল্প সরে গিয়ে পেটের ভেতরের লালচে শক্ত মাংস বেরিয়ে এসেছে।
সেটা এমনিতে নজরে পড়বে না। তবে চোখটা সাতচল্লিশ সেকেন্ড ধরে চিরতার জল খাওয়ার সময়ের সাইজের মতো করে রাখতে পারলে এই বিষয়ে সাফল্য আসার কথা। যদিও দু-হাত, দু-পা’র জীবটি যা পারে নি; মাছিরা তা পেরেছে। ডেইলি তারা ওদিকটায় গিয়ে বসে। সকালে বুড়ো-বুড়ি, বিকেলে টিনএজার, রাত দশটার পর- কচি’রা। ঘা-টাকে খানিক আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই হবে হয়তো, তার পাশে একটা বড় সাদা কাগজ সেঁটে দিয়েছে কেউ। তাতে বেগুনি কালিতে বড় করে লেখা- টুকুন+টুম্পা। এসব কথা সাধারণত লাল কালিতে লেখা দস্তুর। হতে পারে, যিনি লিখেছেন, তিনি অতটা খেয়াল করেননি। বা, লাল কালির পেনটা পয়সার অভাবে কিনতেই পারেননি। এই জায়গাটা এসে আবার দু:খ হয়। আহা রে! সে যাগ্গে, এসব নিয়েই কুকুরটি ভ্রুক্ষেপহীন হাঁটাচলা করে। গাড়ি চলে। ফালতু গন্ধ বেরোয় না। আকাশের গায়ে লেগে থাকে সাদা আইসক্রিমের মতো মেঘ।

এই কুকুরটিই মিনিট পনেরো আগে একটি পুরুষাঙ্গ খেয়ে ফেলেছে।

যার গেল, সেই লোকটি দশ বাই আটের বাসিন্দা। জানলা দিয়ে পেচ্ছাপ করছিল। জানলার সামনে জ্যোৎস্নার আলো গোল করে বসেছিল। পেচ্ছাপে ধুয়ে যাচ্ছিল সেই আলো। আপনা আপনি তৈরি হচ্ছিল ফেনায় মাখামাখি হয়ে যাওয়া বুনো রূপকথা। মোচড়টা আসে এই সময়ই। ‘ঘঁত’ করে একটা শব্দ। তারপর বুড়ো বাঁশকে মাঝখান দিয়ে চ্যালা করে ফেললে যতটা আওয়াজ বেরোয় ঠিক ততটাই বেরোল চাপামতো ‘উরিহহহ’-র ভেতর দিয়ে। বাকিটা ব্ল্যাঙ্ক।

জিভের ডগায় মাঝারি সাইজের পুরুষাঙ্গের ছ্যাঁকা খেতে খেতে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলা আবছা কুকুরটিকে দেখতে পেল আশেপাশের গাছগুলো।

লোকটির নাম শিভাস চক্রবর্তী। দেড় বছর বয়সের মাথায় ওর মা মারা যায়। কারা যেন ধর্ষণ করেছিল। বাড়ি এসে আড়াআড়ি ঝুলে পড়ে সিলিং থেকে। পরনে ধপধপে সাদা তাঁতের শাড়ি। বুক আর পেটের কাছটা অল্প ছেঁড়া। তার নাম মালিনী। বাবা ডাকত, মালু। মাকে ওর মনে নেই। তবে ভদ্রমহিলার একটা ফিনফিনে ছবি মাঝে মাঝে হাওয়ার সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে ওর সামনে দিয়ে চলে যায়। ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুলে ডানদিকে সিঁথি। ভাঙা গাল। বাঁ-কানে একটা কালো টিপের মতো দুল। ডান কানের জায়গাটায় লেখা- ‘পাগল নাকি!’। চোখের জায়গাগুলোয় কাচের গুলির বদলে ইঁদুরের গর্ত। হাঁ করে আছে অন্ধকার। সেখান থেকে খানিকটা করে মাঞ্জা বেরিয়ে ফর্সাপানা গালের ওপর ঝুলছে। এরকম একটা শরীর নিয়ে থেবড়ে বসে তিনি এক বাটি দুধের মধ্যে চুবিয়ে চুবিয়ে জিলিপি খাচ্ছেন। এই পুরো ছবিটা ওর সামনে তিন সেকেন্ডও টিকত না। তবু দেখাটা হয়ে যেত। দেখাগুলো যেমন হয়ে যায়। এই দৃশ্যের বর্ণনা ও ওর বাবাকে করেছিল। বাবার নাম অমলতাস। পাতার নামে নাম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে পাওয়া যায় প্রধানত। তা, অমলতাস শুনেছিল। কয়েক মুহুর্ত পর ফুসফুসে জমে আঁট হয়ে যাওয়া হাওয়াকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে বলে দিয়েছিল- তাহলে ঠিকই দেখেছিস। তোর মা-ই! ঘুড়ি ওড়াতে খুব ভালবাসত তো…

বাবার কাছেই মানুষ ও। ওর ছোটবেলায় বাবা একটা মুদির দোকানে খাতা লিখত। দোকানের নাম- দাস ভান্ডার। প্রো:- আশিষ দাস। ব্র্যাকেটে লেখা ‘বিজনে‌সম্যান’। অমলতাস পেন ব্যবহার করত না। পেনসিলে লিখত। লেখার সময় পাতার ওপর জোরে চাপ দেওয়ার ফলে শিষটা খালি ভেঙে যেত। দিনে অন্তত আঠারো থেকে উনিশ বার। মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বার। এতবার শিষ ভাঙলে মোটামুটি যতগুলো পেনসিল নষ্ট হতে পারে তার একটা হিসাব করে আশিষ দাস অমলতাসের মাইনে থেকে ওই টাকাটা কেটে নিত। তাতে লেখার ভঙ্গী বদলানো যায়নি একটুও। বরং, শেষের দিকে এমন হয়েছিল, পেনসিলের জন্য কেটে নিতে নিতে মাইনের আর কিছুই বাকি থাকত না।

চাকরিটা গেল। তারপর অমলতাস আসল এক মশলা কোম্পানীতে। সেখানকার সেলসম্যান হিসাবে কাজ শুরু করল। কোম্পানীর নাম- ঝক্কাস মশলা। এই কোম্পানীর ভাজা পাঁপড় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করতে হত তাকে। বিক্রি করার বদলে বেশিরভাগ দিনই নিজেই খেয়ে ফেলত পাঁপড়গুলো। জীবনে লাক্সারি বলতে ছিল এটুকুই। কোম্পানী যে দিন জানতে পারল, সে দিন থেকে সে স্বাধীন! জরিমানা হয়েছিল চল্লিশ হাজার টাকা। সে টাকা দিতে না পারায় জেল খেটে এল সাতদিন। এসব বছর পনেরো আগের কথা। শিভাস তখন সবে সাত ঘর থেকে এগারো ঘরের নামতায় ঢুকেছে।

আপাতত পুরুষাঙ্গ’র জায়গাটার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছে ও। খানিকক্ষণ অজ্ঞান হয়েছিল। কিছুটা রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল সেই সময়। জ্ঞান ফেরার পর জায়গাটাকে শুকনো দেখাল। তিনটে বড় পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পেছনটা উঁচু। ও উঠে পড়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের একটা বোতল বের করে সদ্য অবসর নেওয়া জায়গাটার ওপর ধীরে ধীরে ঢালল। ঢালার সময় একবার এক থেকে একশো আরেকবার জেড থেকে এ অবধি গুনল মনে মনে। ব্যাস! তারপর আর কোনও কষ্ট নেই।

সে রাতে আর পাজামাটা পরা হল না।

রাত দুপুরে জানলা দিয়ে এইভাবে পেচ্ছাপ করার পিছনে একটা কারণ রয়েছে। সেই কারণটা জানার আগে শিভাস চক্রবর্তী সম্পূর্ণভাবে ঘেঁটে যাওয়া যে জায়গাটায় থাকে, সেটা সম্বন্ধে কিছু জানা দরকার। জায়গাটার নাম- পূর্বপাড়া। একটা জায়গাকে চট করে ‘ঘেঁটে যাওয়া’ বলে দেওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়। তার কারণগুলোও পরিষ্কার করা দরকার। নইলে বিতর্ক আসতে পারে। বিতর্ক খুব ভাল জিনিস নয়। তাতে বাজে ছবি ওঠে। জায়গাটা মফসস্বল এরিয়া। যানবাহন বলতে স্রেফ অটো। পঁয়ষট্টিটা অটো রয়েছে। একাত্তর জন চালক। এদের মধ্যে সবথেকে পরিচিত- বাচ্চু পাল। তার অটোর একটা বিশেষত্ব আছে। সেখানে কোনও হর্ন নেই। বাচ্চু পাল হর্ন ব্যবহার করে না। নো পলিউশন। মিডিয়াতে এই নিয়ে একবার বড়ো কভারেজ হয়। কাগজে ছবি বেরোয় বাচ্চু পালের। ছবিটা তোলার সময় তার মাথার ওপর দিয়ে একটা দু-সপ্তাহ বয়সী প্রজাপতি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তেল চপচপে চুলের বাচ্চুর মাথার ওপর ইয়াং প্রজাপতি দেওয়া হাসিমুখের ছবির ক্যাপশন হয়ে গেল- শান্তির দূত। ছবিটা বাচ্চু নিজের অটোতে রাখল এক কপি। বাড়িতে আরেকটা। ছেলে বিকাশ ক্লাস নাইনে পড়ে। বাবার ওই ছবিতে ডেইলি নমস্কার করে ইস্কুলে যায়। বউ বন্দনা মাঝেমাঝে বিকেলের দিকে ছবির সামনে এক টুকরো গরম আলুর চপ রাখে। মানুষটা খেতে ভালবাসে তো খুব। বাচ্চু পাল তখন হয়তো সন্ধ্যার ব্যস্ত ট্রিপ তাড়াতাড়ি ধরার জন্য ঝাঁঝাঁ করে স্পিড বাড়াচ্ছে। বেশি গরমে এই সময় গোটাকতক আলুর চপ খেলে ছোট্ট সাইজের একটা আগুন পিত্ত থেকে ধাঁ করে মাথা অবধি উঠে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে দেয়। গ্যাস-অম্বলের সমস্যা আছে ওর। তাছাড়া সকাল থেকে অটোর তেলকালি খেয়ে শরীরটা ‘হিট’ হয়ে থাকে। এরপর পেটে তেলেভাজা গেলে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান একদম ঘাড় মটকে দেয়। বন্দনা এসব ভেবেই ছবির সামনে একটার বেশি রাখে না।এই বাচ্চু পালই তিনদিন আগে বিষ খেয়ে ফেলে। পুলিশ আসে। বডির পাশ থেকে চিরকুট উদ্ধার করে। সেখানে লেখা ছিল একটাই বাক্য- চাঁদের আলোয় পেচ্ছাপ না করলে অমরত্ব পাওয়া যায় না।

লাইনটা অব্যর্থ কবি, ক্লাবের পুজোর সেক্রেটারি, জমির দালাল ইত্যাদির মতো একস্ট্রা অর্ডিনারি বখেরাদের সঙ্গে মুখ-টুখ বাড়িয়ে শিভাসও দেখেছিল। বাচ্চু পালের হাতের লেখাটা নতুন কেনা বালিশের মতো। ফুলশয্যার সময় এসব বালিশে হেলান দিয়ে অল্পবয়সী বউ ডানদিকে মুখ ঘুরিয়ে আট বছরের বড় স্বামীর দিকে তাকিয়ে পোজ দেয়। এরকম হাতের লেখার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ঘুম পেয়ে যায়। পাঁজরের ভেতর টুপটুপ করে শিশির পড়ে। শিভাসের ও তাই হচ্ছিল। ও মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা মাথা থেকে সরল না। লাইনটা মাথা ঘুরিয়ে দিল ওর। ন’খানা শব্দ বেলুন চাকী হয়ে রেলায় গড়াগড়ি খেতে লাগল গুরুমস্তিষ্কের অন্ধ লেন ধরে। চারদিকে এত বই, এত জ্ঞানী-গুণী, ইন্টারনেট, মহিষাসুর-- এই সহজ ইকোয়েশনটা তো কেউ কোনওদিন দেয়নি!

তিনদিন পরেই আসল পূর্ণিমা। পঞ্জিকার একশো সাতাশ পাতায় লেখা- “পূর্ণিমা, দিবা ঘ ৬।০৬ মি:। শ্রবণানক্ষত্র রাত্রি ঘ ১।২৫ মি:। প্রীতিযোগ দিবা ঘ ১০।১৮ মি:। ববকরণ।“ এসব পড়ে দু-বোতল জল খেয়ে সময়মতো জানলার ধারে দঁড়িয়েছিল ও। পেশায় খবরের কাগজের ফ্রিল্যান্সার। যোগ্যতা- উচ্চমাধ্যমিক পাশ। বাংলায় একষট্টি পেয়েছিল। অমলতাস খুশি হয়নি…

ঘন্টাখানেক কেটে গেছে। কাত করে রাখা তানপুরা হয়ে ঘুমিয়েছে শিভাস। শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি পরা। আকাশ থেকে শ্যাওলা মুছে যাচ্ছে। হাওয়া দিচ্ছিল। এই হাওয়া কোনও লেখাপড়া শেখেনি। খোলা জানলা দিয়ে এসে চুলকে দিচ্ছিল শিভাসের চুলের গোড়া অবধি। গাছের ডালপাতা, কচি ঘাসের ডগা, পুকুরের জলের ওপর পোকা খাওয়ার জন্য মাথা তুলে রাখা খলসে মাছ- সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। এরকম একটা সময়েই বাচ্চু পালকে স্বপ্নে পেয়ে গেল ও। স্বপ্নের বাচ্চুর রঙটা একটু ফর্সা। উপরের জল-হাওয়া! লুঙ্গিটা বুক অবধি তুলে এঁকেবেঁকে অটোটা চালাচ্ছে। হর্ন দিচ্ছে না। তার বদলে নামিয়ে এনেছে একটা চিৎকার। সেটা বাড়ছে। বাড়তেই থাকছে- শালোরা আমার নুনু খায়ে ফ্যালসে। শালোরা আমার নুনু খায়ে ফ্যালসে…

বরিশালের রক্ত। গুটখার নেশা ছিল।



এর দিন পনেরো বাদেই শিভাস প্রথম টের পেল ব্যাপারটা। ও গাছ হয়ে যাচ্ছে। পুরুষাঙ্গ চলে যাওয়ার পর দিনের আলো থাকতে পাজামাটা খোলা যেত না। দুটো মৌমাছি এসে কাটা জায়গাটায় বসে পড়ত। এটা ছাড়াও, পুরুষাঙ্গ চলে গেলে আর যা যা ঘটতে পারে, সে সব এর মধ্যে ঘটছিলই। কি কি ঘটতে পারে, তা সবটা বলার প্রয়োজন নেই। অনেকেই জানেন। তবে এর মাঝেই দুটো ঘটনা ছিল চেনা জানার বাইরের…

১) প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ওর মনে হত দুই বগলের তলা থেকে দুটো হাইওয়ে বেরিয়ে এসেছে। খানিকটা যাওয়ার পর তারা একসঙ্গে মিশেছে! এই হাইওয়ে দিয়ে কোনও গাড়ি চলে না। স্রেফ মানুষ চলে। হাইওয়ে দিয়ে হাঁটতে থাকে তারা। প্রত্যেকের মাথায় একটা করে সুতির কাপড় বাঁধা। কাপড়টা প্রায় দু-মিটার লম্বা। তাতে কালো, আকাশি, হলুদ, গেরুয়া- সহ অজস্র রঙ এলোপাথারি মাখানো। লোকজন চলতে চলতে মাঝে মাঝে মাথায় হাত দিয়ে কাপড়টা ঠিক করে নিচ্ছে। কারুর কোনও তাড়া নেই। বগল থেকে হাইওয়েগুলোর এই বেমক্কা বেরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেই কারণে ও রাস্তায় বেরোনোর সময় বগল দুটো প্রাণপণে চেপে চলাফেরা করতে থাকে। এইভাবে হাঁটতে গিয়ে মাঝেমাঝেই পড়ে যায়। আবার উঠে বগল চেপে হাঁটতে থাকে। এই অবস্থায় ওকে দেখলে বন্ধ দোকানের শাটারের গায়ে সেঁটে দেওয়া মিছিলের বিজ্ঞাপনের মতো লাগে।

২) দুপুর বারোটা চল্লিশের পর একটা কালো আলখাল্লা পরা পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চি উচ্চতার লোককে ও দেখতে পায়। লোকটা একটা বড় আপেল খেতে খেতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মাথায় চুল নেই। তার জায়গায় ঝুলছে জামরুল গাছের কচি পাতা। দুই কানের ওপর দু’খানা গ্যাস বেলুন স্ট্যাচু হয়ে আছে। জামরুল পাতাগুলো তার ওপর পড়ছে মাঝেমাঝে। ছরর ছরর শব্দ হচ্ছে তখন। লোকটার অবস্থানের বিশেষত্ব হল, সে সব সময় ওর থেকে খানিকটা উপরে থাকে। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক ওই সময় ও বাড়ির বিছানায়। লোকটা তাহলে আলমারির ওপরে বসে থাকবে। ওর অফিসটা ছ’তলায়। টপ ফ্লোরে। ও যদি অফিসের ছাদে থাকে সেই পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চি তখন হয়তো ছাদের ট্যাঙ্কে বসে রয়েছে। এরকম। লোকটা কখনও কখনও আপেল খাওয়া থামিয়ে ওকে কিছু বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার জিভ নেই। সেই জায়গায় লকলক করে ঝুলছে একটা বড় পাটকাঠি। এই পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চির ধড়ের ওপর যে চৌকো জিনিসটা খাপছাড়াভাবে বসানো, সেটা অমলতাসের। প্রতি সন্ধ্যায় এই লোকটাই হামাগুড়ি দিতে দিতে ওর ভেতর ঢুকে যায়…

গাছ বলতেই কতকিছু মনে পড়ে গেল! আপাতত আবার শুরুর বাক্যে ফেরা যাক। শিভাস টের পেল ও গাছ হয়ে যাচ্ছে। অফিসে গেছিল। সপ্তাহে তিনদিন যেতে হয়। সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলছিল। একজন লোককে খুঁজে পাওয়া গেছে। সে নারকোল গাছের পাতা দিয়ে হাইওয়ের দু’ধারে ঘর বানিয়ে চলেছে। শেষ চারমাসে বানিয়েছে তিনশো সত্তরটা। কেন বানাচ্ছে কি জন্যে বানাচ্ছে তা সে কাউকে বলে না। সরকারি খাতায় নারকোল ঘরের কোনও পরিচয় নেই। এই মানুষটি তা নিয়ে ভাবিতও নয়। নিজের মনে একের পর এক ঘর উপহার দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে। কেউ পাহারা দেওয়ার নেই। তার ফলে কোনওটায় বসছে চোলাই-এর আড্ডা। কোনওটায় আবার রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে মেয়ে নিয়ে ঢুকে পড়ছে কেউ। কোনওটায় রয়েছে চন্দ্রবোড়া কিংবা ভাম। কোনওটায়, কেউ না। এই মানুষটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের বাতাসকে চেখেছে। বাঁ-হাতটা নেই। বয়স আশি পেরিয়েছে। এক হাত দিয়েই যা কিছু। কারুর সঙ্গে এমনিতে কোনও কথা বলে না। তবে দু-একবার যা বলছে টলেছে তা অত্যন্ত ক্লিশে। যেমন, আমি এই কাজটা করতে করতেই মরে যেতে চাই। যেমন, এটার মধ্যে যে সুখ পাই তা অন্য কিছু-তে পাই না। যেমন, একটি গাছ তিনটি প্রাণ। এতগুলো কথা নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে বলার পর প্রশ্ন করেছিল শিভাস- এটা নিয়ে কি কোনও ‘স্টোরি’ করা যাবে? প্রশ্নের উত্তরে সম্পাদক বলল সম্পূর্ণ অন্য কথা। তোমার গা থেকে এত জামরুলের গন্ধ বেরোচ্ছে কেন?

প্রশ্নটা শুনে শিভাসের শরীরের ভেতরের নর্দমা দিয়ে হুড়হুড় করে খানিকটা রক্ত তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। এই ধরনের তাড়াহুড়োকে ক্লাস এইটের ভৌতবিজ্ঞান বই ‘তরঙ্গ’ বলে ডাকে। ঠিক এই মুহুর্তেই পাঞ্জাবির তলায় হাতের জায়গাটায় একটা ছাল-বাকল লাগানো পাতলা স্পেসিমেনের অস্তিত্ব অনুভব করছিল ও।

গাছ হওয়ার আগে সব মানুষেরই এরকম হয়। প্রথমে হাতগুলো পাল্টে যায়। তারপর আস্তে আস্তে শিরদাঁড়াটা সম্পূর্ণ ফেটে গিয়ে ওখান থেকে বড় কান্ড উঠে যায় টানটান হয়ে। হাত পাল্টে যাওয়ার একুশ দিন বাদে শিরদাঁড়ার এই পরিবর্তনটা ঘটে। কান্ডটার ভার শরীর সহজে নিতে পারে না বলে সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে থাকতে হয়। এই সময় থেকে পায়খানা বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। তবে তাতে কোনও কষ্ট হয় না। নিজেরও না। অপরেরও না। জলের খরচটা বাঁচে। কান্ড আসারও একশো উনিশ দিন বাদে প্রথম পাতা গজায় পেটে। নাভির ঠিক উপরে। এই সময়ের অনুভুতিটা সন্তানের জন্ম দেওয়ার মতো। এই গোটা প্রক্রিয়া জুড়েই শরীর থেকে ছিটকে বেরোতে থাকে একটি গন্ধ। যে যে-ই গাছ হবে, তার গা থেকে বেরোবে সেই গাছের গন্ধ। এই হল নিয়ম। একেবারে শেষে গিয়ে ঝটকাটা নেমে আসে মাথার উপর। সেটা হাত-পাতলা হওয়ার তিনশো আশি দিন বাদে কান্ডটা আস্তে আস্তে শক্ত হতে হতে মাথাটাকে সম্পূর্ণ দুমড়ে দেয়। পৃথিবীতে একটি গাছের সংখ্যা বাড়ে।

অমলতাস এসব বলতো। শিভাস জানে, এমনটাই হয়।




পূর্বপাড়ার যেখানে অটো স্ট্যান্ড, তার থেকে অল্প একটু এগোলেই বিশাল হাউসিং কমপ্লেক্স। সেখান থেকে সব সময় হাওয়া দিচ্ছে। দিনের যে কোনও সময়ই যে কেউ এই হাওয়া খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে পড়তে পারে সেখানে। শুধু দাঁড়ালেই হবে না! গোটা শরীরের কলকবজার ভেতর দিয়ে হাওয়াটাকে ভাল করে পাস করিয়ে সেগুলোকে ঝালাই করে নেওয়ার জন্য হাতদুটো টানটান করে হাওয়াটার অভিমুখের দিকে মেলে দেওয়াটাই ঠিক পোজ। সিনেমায়ও এমনটাই দেখায়। শিভাসও এমন ভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল। মুখটা হাঁ-করা। এইভাবে কিছুক্ষণ থাকতে পারলেই বেশ খানিকটা আকাশ পেটে চলে যাবে। তার ফলে শরীর ঝরঝরে থাকে। রাতে ঘুম ভাল হয়। এই হাঁ-করে থাকাকালীন আশেপাশের কেউ কেউ ওর দিকে নাক কুঁচকে তাকাল। বোঝা গেল, জামরুলের গন্ধ বাড়ছে।

এই হাউসিং-এর জায়গাটায় বছর খানেক আগেও ছিল ধানের জমি। মোট বারোশো বিঘা। অমলতাস প্রত্যেক দিন শিভাসকে নিয়ে হাঁটতে বেরোত। এদিক ওদিক ঘুরে এক সময় চলে আসত এই জমির কাছে। আকাশের তলায় এই বড় সবুজ মলাটকে দেখভালের জন্য তখন কয়েকগন্ডা চাষি। চাষের সময়টুকু এক হাতে শিভাসকে ধরে নিজের মনে কথা বলে যেত ধান চাষ সম্বন্ধে। “এই জমিতে ভাল ফলন চাইলে ধান লেগে যাবে বিঘা পিছু সাড়ে সাত কেজি মতো। এরা তো পাঁচ কেজি মতো দিচ্ছে দেখছি। তা-ও আই.আর.এইট! কেমন হবে জানি না! তবে এমনিতে পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যে বীজ ভেঙে বুড়ো আঙুলে টিপে টিপে নিয়ে প্রতি খোপে তিন-চারা করে রুয়ে দিতে পারলেই, ব্যাস! সে চারা তিন হপ্তা যেতে না যেতেই পোড়া টোস্টের মতো রঙ নিয়ে নেবে। তখন থেকে গোড়া খোঁচানো। ঘাঁটাঘাঁটিতে শেকড় ছিঁড়ে গিয়ে আপনা থেকেই আরও অনেক চারা বেরোতে থাকবে খোপে খোপে। এইগুলো একবার ঠিকঠাক করে হয়ে গেলে তখন আর দেখে কে!” এই জমির তলায় টানটান হয়ে ঘুমিয়ে আছে এক নদী। বছর সত্তর আগেও যা প্রবলভাবে জেগে ছিল। দু’আনায় তখন এক সের চাল। নদীটি পশ্চিমদিকে অনেকটা বয়ে ডানদিকে একটা আচমকা বাঁক নিয়ে গঙ্গার সঙ্গে মিশে গিয়ে ভূগোলের সিলেবাসে জায়গা পেয়েছিল। সেই নদীর ওপরে চড়া পড়ে গিয়ে প্রথমে জমি, তারপর তার ওপর চাষ, তারও অনেক পরে সমস্তটাকে রবার দিয়ে মুছে ফেলে তৈরি হল এই হাউসিং। অমলতাসের আসল উৎসাহ ধানে নয়, ছিল এই নদীতেই। সে বিশ্বাস করত সপ্তদশ শতাব্দীতে জোব চার্ণকের বজরা বাগবাজার ঘাটেরও আগে এসে ধাক্কা খেয়েছিল এই পূর্বপাড়ার ঘাটেই। তখন তো ‘পূর্বপাড়া’ বলে কিছু ছিল না। ঘাটও ছিল না। তার জায়গায় ছিল কিছু হায়না আর জোনাকি। তাই ব্যাপারটার কোনও ‘রেকর্ড’ নেই। এসব ব্যাপার নিজে বিশ্বাস করা এক, আর অন্যকে বিশ্বাস করানো, আরেক। যদিও লোককে বিশ্বাস করানোর তেমন কোনও দায় তার ছিল না, তবুও, দেড়খানা মানুষকে সে জারিত করে ফেলতে পেরেছিল নিজের বিশ্বাসে। এর মধ্যে অর্ধেক জন হল শিভাস। বাকি একজন হল তার মা, মালিনী।

জোব চার্ণক সংক্রান্ত কথাগুলো শিভাসকে বলার সময় অমলতাস পঞ্চাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে সে। এই সময়ের থেকে মুন্ডুটা ঘুরিয়ে কুড়ি বছর পিছনে নিয়ে ফেলতে পারলে স্পষ্ট দেখা যেত- বছর ত্রিশের রোগা এক যুবক তার থেকে অন্তত বছর দশেকের ছোট খুব অনাকর্ষণীয় দেখতে একটি মেয়েকে ঠিক এই কথাগুলোই বলে যাচ্ছে। মেয়েটি অবাক হয়ে একমনে শুনে যাচ্ছে যুবকটির কথার প্রত্যেকটি দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন। আস্তে আস্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা ছবি। সেই ছবিতে বিশাল বজরা নিয়ে দুলে দুলে আসছে জোব চার্ণক ও তার সঙ্গীরা। সে বজরা এসে ধাক্কা খেল ঠিক মেয়েটির পায়ের কাছে। ধাক্কা খাওয়ার পর ইংরেজিতে কিছু বলাবলি করছিল লোকগুলো। জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। এর মধ্যে ‘রিডিকিউলাস’ এবং ‘প্যাথেটিক’- এই দুটো শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল ও। বজরার মুখ ঘুরল তারপর। আকাশে চন্দনের ফোঁটার মতো কয়েকটা তারা। অন্ধকারের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক। এরকম একটা সময়েই খুব নির্ভয়ে যুবকটির হাত ধরল মেয়েটি। ফিসফিস করে বলল- তোমার কথাগুলোকে আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম অমলদা।

ধান জমির সামনে একশো বছরের পুরনো অশ্বত্থ গাছ, যা পরে হাউসিং হওয়ার সময় কেটে ফেলা হয়, সেটাকে শিভাস বলত ছোট পিসেমশাই। অমলতাসই শিখিয়েছিল। তার মতে, সব মানুষই মরে যাওয়ার পর গাছ হয়ে যায়। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও আছে। তাদের শরীরে বেঁচে থাকতে থাকতেই গাছ হয়ে যাওয়ার সমস্ত লক্ষণ ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে। বাইরে থেকে দেখলে তা বোঝা যাবে না। যার হয়, সে ছাড়া অন্য কেউ জানতেও পারবে না ব্যাপারটার কথা। শুধু গাছ হয়ে যাওয়ার দিনটিতে বা তার দু-একদিন আগে সে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে নিরূদ্দেশ হয়ে যাবে। ছোটবেলা থেকে শিভাস কোনও গাছকেই নাম ধরে চেনে নি। চিনেছে তাদের সামাজিক পরিচয় দিয়ে। খালপোলের মাঠের সামনের ছোট আতা গাছটা তার পিসতুতো দাদা। রেললাইনের ধারের মেয়েদের হাইস্কুলের পাশের সুপুরি গাছটা ওর ঠাকুর্দার প্রথম পক্ষের বউ। বড় রাস্তার ধারের নিমগাছটা আসলে তুলি নামের একজন, যিনি একটি কসমেটিক্সের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। এসব চিনতে চিনতেই ওরা দুজন বাড়ি ফিরত। ততক্ষণে বিকেল সরু হয়ে গিয়ে সন্ধ্যের কিংবা সন্ধ্যে সরু হয়ে গিয়ে ঢুকে যাচ্ছে রাতের কানের ভেতর। বাড়ি ফিরে চটের ব্যাগের ভেতর থেকে বের করা হতো একটা ছেঁড়া তাঁতের শাড়ি। এটা পরে মালিনী ঝুলে পড়েছিল সিলিং থেকে। মালিনীর ঝোলার সময় সেটার রঙ যে সাদা ছিল, এখন শাড়িটা চোখে পড়লে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। তার গায়ে কালো, আকাশী, গেরুয়া, হলুদ- সহ অজস্র রঙ মাখানো। সেই মাখানোর মধ্যে কোনও ছিরিছাঁদ নেই। প্রত্যেকদিন বাড়ি ফিরে ওরা শাড়ির উপরে রঙ মাখিয়ে যায়। রঙ মাখানো শেষ হলে খেয়েদেয়ে বা না খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরেরদিন আবার ওই রঙের উপরেই রঙ মাখায় প্রাণপণে। মাঝে মাঝে রঙের বড় পাত্রের মধ্যে পা চুবিয়ে শাড়ির ওপর লাফায় দুজনে মিলে। এইভাবেই চলে আসছিল বছরের পর বছর। রঙের পরে রঙ জমে। শাড়িটা দু-মিটারের। শিভাসের বগলের তলা দিয়ে বেরিয়ে পড়া হাইওয়েতে যারা হাঁটে, তাদের মাথায়ও এই শাড়ি। সেটার গায়েও এই রকমই ব্যাকরণ উল্টে পাল্টে দেওয়া রঙের বাহুল্য। শিভাস দেখেছে, ওর মায়ের ধর্ষণ এবং মৃত্যুর প্রসঙ্গটা উঠলেই বাবা কেমন আমতা আমতা করত। কে বা কারা ধর্ষণ করেছে তা জানে বাবা স্পষ্ট কিন্তু সেই বিষয়ে কোনওদিন একটা কথাও বলেনি। মায়ের মৃত্যুদিনটাও গুলিয়ে ফেলত। কখনও বলত, ওই তো মঙ্গলবার। কখনও বুধবার কি সোমবারও বলত। শিভাসকে তখন বাধ্য হয়েই বলে দিতে হত, ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী ডেট-টা হল শনিবার।

জোব চার্ণক নিয়ে অমলতাস এবং মালিনীর দাবি কেউ মানে নি। তার বদলে জুটেছিল তুমুল টিটকিরি। রাস্তা দিয়ে গেলে আচমকা আড়াল থেকে ঢিল বা ছেঁড়া জুতো ছোঁড়া। মানুষের ব্যবহার নিয়ে অমলতাস কোনওদিন বিন্দুমাত্র অনুযোগ করেনি। তবে মাঝেমাঝে, শেষরাতে, যেমনভাবে সব কিছু হারিয়ে ফেলা প্রেমিক ছাগলের পেটে কান দিয়ে থলিতে দুধ জমা হওয়ার শব্দ শোনার চেষ্টা করে, ঠিক সেই ভঙ্গীতেই ঘুমন্ত শিভাসের পেটে মুখ গুঁজে দিয়ে ডুকরে উঠত সে- তুই কিছু দেখতে পাস? বুঝতে পারিস? হ্যাঁ? বল না...একদম একা তো! একটু সাহস পাই তাহলে! বল না, পারিস?

এরকমই এক রাতে, দূরে কোথায় পুজোর পরের জলসা হচ্ছিল, অমলতাস চটের বস্তা হয়ে যাওয়া সেই রঙিন শাড়িটাকে মাছ কাটার বঁটি দিয়ে আধাআধি করে ফেলল। তারপর সেটার একটা ভাগ নিজে রেখে বাকি ভাগটা দিল শিভাসের কাছে। বিস্মিত শিভাস জানতে চাইল– এটা কী করলে?

অমলতাস বলল, রেখে দে।

কেন? আর রঙ মাখাবো না?

আর দরকার নেই।

কেন?

প্রশ্ন করিস না। যাওয়ার সময় মনে করে নিয়ে যাস।

কী বলছ! কোথায় নিয়ে যাব?

ঘুমো।



তিনদিন বাদে নিজের ভাগের শাড়িটাকে নিয়ে নিরূদ্দেশ হল অমলতাস।





নাভির ওপর বেশ কয়েকটা পাতা গজিয়েছে শিভাসের। ও এখন বড় হাতার ঢিলেঢালা ফতুয়া পরে। খাওয়া দাওয়ার খরচা প্রায় নেই। ভোরের প্রথমে ঘুম ভাঙে। অল্প একটু সূর্যের আলো গায়ে এসে পড়লেই পিত্তটা ভরে ওঠে। শরীর তাজা হয়ে যায়। মনটা ফুরফুরে থাকে সব সময়। এত আনন্দ ছড়ানো রয়েছে চারদিকে! প্রকৃতির নিজস্ব মেশিন থেকে প্রতি মুহুর্তে বেরিয়ে আসছে টাটকা আলো-জল-বাতাস দেওয়া খাবার। যখন তখন ঘাড়টা ডানদিকে হেলিয়ে দিয়ে একটু হাঁ-করলেই হল! এর মাঝেই কত লোক যুদ্ধ করছে! কত লোক নাকটা ভাল করে ঝাড়তে পারছে না বছরের পর বছর। ওর হিসেব আলাদা! সূর্য ডুবলেই ঘুম এসে যায়।

ও অফিস যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। বসের সঙ্গে দেখা হলেই তিনি জামরুলের গন্ধ নিয়ে প্রশ্ন করেন। প্রথম প্রথম এই বিষয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। এখন আর নেই। শেষ যে দিন অফিসে গেল, বসের সেদিনও এক প্রশ্ন। শরীরের ভেতরে এক অন্যরকম তরলের নড়াচড়া ও টের পেয়েছে বেশ কয়েক সপ্তাহ হল। সারা শরীর চ্যাটচ্যাট করতে থাকে সারাক্ষণ। অথচ বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। একটু অসতর্ক হলেই গায়ে পিঁপড়ে এসে বসে পড়ে। সারাদিন মাথাটা ভার হয়ে থাকে। কয়েকটা পাখি এসে একটু যদি ঠুকরে দিত বা কোনও ছেলে-পিলে শরীর বেয়ে উঠে যদি কামড়ে দিত কয়েকটা জায়গায়, তাহলে দারুণ হত- এমন কথা প্রায়ই মনে হয় ওর।

মেরুদন্ড ফাটিয়ে ফেলার পর একেবারে হিসাব করেই ওর মাথাটা লক্ষ্য করে এগোতে শুরু করেছিল কান্ডটা। লক্ষ্যে সফল হয়ে সেটা প্রচন্ড জোরে খুলির ওপর চাপ দিতে আরম্ভ করল যখন, তখনই একটা ফাঁকা জায়গার খোঁজে হাঁটতে শুরু করল শিভাস। ঘন্টাখানেকের মধ্যে খুলিটা ফেটে নোনতা বাদাম হয়ে যাবে। ওর যাওয়ার পথে উড়ছিল একটি খাপু পাখি, নতুন আশ্রয় পাওয়ার লোভে। পাখিটাকে এই সময় মনে হচ্ছিল ঝকঝকে উড়ন্ত জাহাজ, যা হাওয়ার ধাক্কায় মাস্তুলসহ গুঁড়িয়ে হয়ে যাবে ফুরফুরে রঙের পাতা, তারপর গাওয়া ঘি-এর মতো গন্ধের আলো নিয়ে ঘুরে বেড়াবে ওর চারপাশে। ওর সঙ্গে টুকটুক করে এগোচ্ছিল ‘টুকুন+টুম্পা’-নামের কুকুরটিও। পুরুষাঙ্গ খাওয়ার পরে ঘা’টা মিলিয়ে গিয়ে গ্ল্যামার বেড়েছে। শিভাসের করোটির জায়গাটা ফাঁকা-গহ্বর। তার ভিতর থেকে মাঝেমাঝে নি:শব্দে হেসে ওঠে সে। পিঠে আলগোছে লেপ্টে রয়েছে মালিনীর কাটা শাড়ি। চলতে চলতেই থেমে যায় ও। আবার হাঁটতে আরম্ভ করে তিনগুণ উৎসাহ নিয়ে। গোধূলি মরবে এক্ষুণি। অটোস্ট্যান্ডের সন্ধ্যার ট্রিপ শুরু হয়ে যাবে খানিকক্ষণের মধ্যে।


পৃথিবীর ভিতরের নাড়িভুঁড়ির মধ্যে মিশে যাওয়া ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই। নেই…



লেখক পরিচিতি
বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য
জন্ম:- ১৯৯০, কলকাতা 
শিক্ষা:- স্নাতক ( গণিত) 
পেশা:- সাংবাদিকতা, লেখালেখি 
নেশা:- লেখালেখি, বই, সিনেমা, ওয়ান লাইনার, সিগারেটের শেষ টান এবং হুইস্কি।

২টি মন্তব্য: