বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

তাপস গুপ্ত'র গল্প : আঙুরফল বিষ

বিখ্যাত লিওনার্দো দা ভিঞ্চি জন্মেছিলেন ১৫এপ্রিল, ১৪৫২তে। আমি ১৫ই এপ্রিল, ১৯৫২। পাঁচশো বছরের তফাৎ। জন্মের প্রথম দিনই শুধুমাত্র তারিখের কাকতাকীয় সমাপতনে একটা বেখাপ্পা নাম জড়িয়ে গেল আমার জীবনে। বাবা নাম রাখলেন লিও। লিওনার্দো দত্ত। শিল্পী, বিজ্ঞানী প্রেমিক ইত্যাদি অনেক কিছু হওয়ার অভিশাপ সেই দিনই বাবা বুনে দিলেন আমার জীবনে। মা মুখো ছেলে আমি, অজগাঁয়ের এক মাঠ ঘাট আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে সুখেই বড়ো হচ্ছিলাম। পিছুপিছু বড়ো হচ্ছিলো আমার অভিশাপ। বাবা মা দু’জনেই আমাকে বিংশশতাব্দির লিওনার্দো তৈরি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেগেলেন। আমার অঙ্কবিজ্ঞানী হওয়ার উপাদান ছিল কঞ্চির কলম, চিত্রশিল্পী হওয়ার জন্যে পেয়েছিলাম নারকেল ছোবরার আঁশ দিয়ে তৈরি তুলি, আর ত্রিভূজ প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়েছিয়াম জিগরিদোস্ত সেলিমকে। আমার নামের সংগে মানিয়ে নিতে ওর নাম ছেঁটেছুটে বানিয়ে নিলাম ‘লিম’। গাঁয়ের একমাত্র কো-এড টিউটোরিয়ালে পড়তে গিয়ে পেয়ে গেলাম মিলিকে। ও আমাদের চেয়ে চারক্লাশ নিচে পড়তো। দুইবন্ধু মিলে ওকে বানিয়ে নিলাম ‘লি’।

তাহলে বলা যায়, ‘লিও’ ‘লিম’ ‘লি’র একটা গল্প এখান থেকে শুরু হল।

বাবার ছবি আঁকতে জানার দৌলতে আমি হয়ে উঠছিলাম শিল্পী। বাংলাদেশের জলহাওয়ার গুণে লিম হয়ে উঠল কবি। আর আমাদের গুণমুগ্ধ প্রেমিকা হওয়ার জন্যে জন্মেছিল লি।

ত্রিভূজ প্রেমের অভিশাপ আমাদের প্রথম স্পর্শ করল যেদিন নাড়ুকাকা মারা গেল।


নাড়ুকাকা গরীব। রাত থাকতে উঠে পুকুর পাড়ে, বিলের ধারে গর্তে হাত ঢুকিয়ে কাঁকড়া ধরত। আর জলথেকে গেঁড়ি, গুগলি, শামুক, তুলে, বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। গেঁড়ি গুগলি ঝিনুক ভেঙে একটা ভাঁড়ে, আর কাঁকড়াগুলোর ঠ্যাং মুড়িয়ে, দাঁড়াসুদ্ধু আর একটা ভাঁড়ে ভর্তি করতো। হাত-পা ভাঙা ঠুঁটো কাঁকড়াগুলো নিজেদের জঙ্গলে নিজেরায় জটলা করে মারামারি পাকাতো। কলসির মধ্যে, গর্তের মধ্যে নাড়ুকাকার হাতের আঙুল, তালু কতোবার কামড়ে ফালাফালা করে দিত। জলে ভিজে রক্ত জমে ফ্যাকাসে অসাড় হয়ে যাওয়া নাড়ুকাকার আঙুলে হাজার কামড়েও রক্ত বেরুত না। জ্বালা যন্ত্রণাও হত না। নিত্যনৈমিত্তিক জলভাতের মতো কামড়টামড়, কাকা পাত্তাই দিত না।

চৈত্রমাস। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে। ভোর হয়ে আসছে। কাকা একটা গর্তের কাঁকড়া কিছুতেই টেনে বের করতে পারছিল না। আঙুল কামড়ে রক্তপাত করে দিয়েছে। এদিকে বেলা চড়ে যাচ্ছে। বাজার ধরতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। রাগে আর আপশোষে শেষ পর্যন্ত গর্তের মুখে ইটচাপা দিয়ে কাকা বাজার চলে গেল। যাওয়ার পথে, আটকে রাখা কাঁকড়ার কথা ভাই হারুকে বলে গেল। হারুকাকাও কাঁকড়া ধরতে ওস্তাদ। পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ইট চাপা গর্তে হাত ঢুকিয়ে কাঁকড়ার বদলে হিড়হিড় করে টেনে আনল একটা পদ্মগোখরো। পদ্মের মধু, পোকামাকড় খেতে জলের ধারে এরা কালেভদ্রে কাঁকড়ার গর্ত দখল করে থাকে। হারুকাকার মনে পড়ে গেল, সাপটা দাদাকে কামড়েছে। আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় হারুকাকার স্নান হল না। যমদূতটাকে একটা হাঁড়ির মধ্যে ভরে বাড়ি ফিরে এল। নাড়ুকাকা তখন সবে বাজার থেকে ফিরে কুয়োতলায় নিচু হয়ে হাত-পা ধুচ্ছে। ভয়ার্ত গলায় হারুকাকা বলে উঠল,

–দাদা, তোকে পদ্মগোখরো দংশেছে।

মুখ না তুলে নাড়ুকাকা অবিশ্বাসের গলায় বললে –যাঃ!

হারুকাকা তীব্র আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল –না দাদা, এই দ্যাখ ধরে এনেছি।

হাড়ির ভিতর থেকে সাপের লেজ টেনে উঁচু করে দেখায়। ভয়ে নাড়ুকাকার মুখ তখন সাদা হয়ে গেছে। গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না। ক্ষীণস্বরে জজ্ঞেস করে --সত্যি?

-সত্যি সত্যি সত্যি। তিন সত্যি।

হারুকাকার বলাও শেষ, নাড়ুকাকা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল, কুয়োতলাতেই খেল খতম।


ঘটনাটা গত চারবছর ধরে মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছে। বিচার বিশ্লেষণ অনুসন্ধান করে বুঝেছি, শুধুমাত্র ভয়ের একটা খবর নাড়ুকাকাকে মেরে ফেলল। ছোবল মারার পর ঘাড় কাত না করতে পারলে সাপ বিষ ঢালতে পারে না। কাঁকড়ার সোজা সরু গর্তে সাপটা কামড়েছে। ঘাড় কাত করার জায়গা পায়নি। বিষও ঢালতে পারেনি। নাড়ুকাকাও মরেনি। ভয়ের খবর নাড়ুকাকার নার্ভকে এমন বিকল করে দিয়েছে যে, হার্ট কোলাপ্স মেরেছে কিংবা ভয়ের তীব্র ধাক্কায় ব্রেন স্ট্রোক হয়ে গেছে।

এই রহস্য সমাধান করার পর তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টির রিসার্চ করে চলেছি। শিল্পী স্বত্বার পূর্ণ বিকাশ ঘটাবার লক্ষ্যে প্রত্যেক রঙে রেখায় আবিস্কার করে চলেছি শিল্পসম্মত ভয়। পুরোনো জমিদারি আমলের পড়ো একটা বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়েছি। বাইরে থেকে মনে হয়, বাড়িখানা জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে, ভুতুড়ে। ভেতরে দিব্যি বাস করা যায়। ভয় তৈরির গবেষণাগার হিসেবে আদর্শ। খাওয়ার ঘরখানাকে দারুণ স্টুডিও কাম ল্যাব বানিয়েছি। আস্ত ঘরখানা আমার পটভূমি। রাত জেগে চলে শিল্পের গবেষণা। ভাঙা চুনবালি ছেনি দিয়ে কেটে কেটে দেওয়ালে বিকট মূর্ত, বিমূর্ত আকৃতির জন্ম দিয়ে চলেছি। পুরাণে বর্ণিত সাঁইত্রিশ নরক-নরকা; কোরাণের জাহান্নাম, দোজখ, সভ্যতার বিবর্তনে মানুষহত্যার ঐতিহাসিক, মর্মন্তুদ মুহূর্তগুলি এঁকেছি। দেঁতেল ইটগুলোকে তেলরঙে ভীষণ সাজাচ্ছি। একটা ভয়ের আবহ এখেনে বেঁচে থাকার আতঙ্ককে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভয় এখানে মৃত্যুর কারণ। আমি মৃত্যুর কারণ সৃষ্টি করে চলেছি। গত সাতবছর ধরে গবেষণা এবং ছবি আঁকার মধ্যে লালন করে চলেছি মৃত্যু সৃষ্টির আবেগ। ধরে নিয়েছি, হারুকাকাই নাড়ুকাকাকে খুন করেছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিংশশতাব্দি সংস্করণ, আমি এক অজ লিও, লিমকে একই কায়দায় খুন করব। কায়দাটা আমার বেশ পছন্দ, নিরাপদ। শিল্পী হিসেবে ভিঞ্চির মতো খুনটাকে বিজ্ঞান সম্মত শৈল্পিক রূপ দিচ্ছি মাত্র।


লিমের পুরো নাম সেলিম সাইফুল, বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর। ও আমাকে খুনি তৈরি করেছে। অথচ আমার কলজে ফোটানো ভালবাসার নিদর্শণ ওর নাম। ও এখন শহরে ‘কবিলিম’ নামে খ্যাত। ওর প্রত্যেকটি কবিতা আমার শিল্পবোধ সম্পৃক্ত হয়ে জন্ম নেয়। যখন প্রেম সিরিজের কবিতা লিখতে শুরু করেছে তখনই সন্দেহ করেছি। ওর হৃদয়ে প্রেম নয় পাপ বাসা বেঁধেছে। নতুন কবিতা লেখা মাত্র, প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, দাঁড়ি, কমা, রেফ না দেখিয়ে ওর ঘুম আসতো না। প্রেমের কবিতাগুলো পড়তে হচ্ছিলো বাজারি পত্র-পত্রিকা



থেকে। কষ্ট হচ্ছিলো। মূল পাণ্ডুলিপির সাথে ও নিজেকেও সরিয়ে নিয়েছিল দূরে। বিশ্বাসঘাতক লিম আমার প্রেমকে কলুষিত করেছে, পিষে মেরেছে। আমাকে হিংস্র, ভয়ংকর করে তুলেছে। সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

‘আমি ওকে খুন করব।’

লি ওর নয়, আমার প্রেমিকা। লিকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালবাসি। সে আমার বাগদত্তা।

হত্যা নয়, হত্যা শব্দে সামন্ততান্ত্রিক, দাসযুগীয় হিংস্রতা মিশে আছে, হিংস্র শব্দটির সাথে নিজেকেও আমূল বদলে ফেলেছি। গণতান্ত্রিক খুনি হতে চাই। ওকে ‘নিকেষ’ দেওয়াই আমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। আর লি, মানে মিলি, বিশ্বাসঘাতকিকে শিল্পের খাতিরে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। পরকীয়া প্রেমে অবশ রমনীর সামনে তার প্রিয়তম পুরুষের মৃত্যু যন্ত্রণা অবশ্যই একটা কবিতার শেষ লাইন হতে পারে।

‘তুলে আনি হত্যানামক স্পর্ধাভার সামান্য রাত্রির আধারে।’?

কবিতাটি বিশ্বাসঘাতক কবি সেলিম সাইফুলেরই রচনা। আমার বিশ্বাস, লির সাথে লিম প্রথম আলিঙ্গনের রাতে আমার প্রেমকে লক্ষ্য রেখে এই কবিতাটি রচনা করেছিল। লিমকে হত্যা করে কবিতাটি আমি লির মধ্যে দেখতে চাই। ‘স্পর্ধার’ বদলে পরকীয়াপ্রেমে‘প্রতিস্পর্ধা’ লি কতোদিন বহন করে!


মে দুই, ১৯৯৪।

ঠিক পাঁচবছর আগে রাত ন’টার বেডরুমে হঠাৎ আলো জ্বালিয়ে দিলাম। ভুল করিনি। বিছানার মাঝখানে লি আর লিম আলিঙ্গনাবদ্ধ। নিরাবরণ। প্রাণপন আশ্লেষে একে অপরের মধ্যে ঢুকে যেতে চাইছে। বিশাল চুম্বনে পরস্পরকে খেয়ে ফেলছে।

রক্ত মাথায় উঠে গেল। লি আমার বাগদত্তা। লিম প্রাণের বন্ধু। ছবি আঁকা সরঞ্জামের ভিড়ে একটা রিভলবার লুকিয়ে রেখেছিলাম। জানতাম, দরকার হবে। স্টুডিওয় ঢুকে পড়লাম। মুহূর্ত দেরি করিনি। ওটা নিয়ে ছুটে এলাম। দাঁতে দাঁত রেখে শব্দ তোলার মতো যন্ত্রটা কটকট শব্দ করে উঠল। ওই বেডে ওরা বিভোর হয়ে লদকালদকি করছিল। নেই। পালিয়েছে। কাপুরুষের দল! যেখানে পাবো শুয়োরের মতো গুলি করে মারবো। উত্তেজনায় দিশেহারা হয়ে শুন্য বিছানায় গুলি চালিয়ে দিলাম। ছুটে বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে। আমার তখন মস্তিষ্ক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। আর ঘরে ফিরিনি। ফুটো বিছানায় কোনোদিন শুইনি। হন্যে নেকড়ের মতো খুঁজে বেড়িয়েছি পথে পথে, শহরে, গ্রামে, গঞ্জে।

ভুলেগেছিলাম, নাড়ুকাকার হত্যাকাণ্ড, ভুলেগেছিলাম গণতান্ত্রিকহিংস্রতা। ঝড় যেমন মলয় বাহনে গোপন হয়ে আসে, ধীরে ধীরে শিল্পীস্বত্বায় ফিরে এলাম।

শুরু হল আমার হত্যা বিষয়ক অন্বেষণ।

এ বিষয়ে নাড়ুকাকাকে হত্যার মতোই লিমের রচিত কবিতাটির প্রথম ক’টিলাইন আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

‘জিঘাংসা আমার জমে গাছ হয়ে আছে।/ আমি তার নীচে পাষাণ পুরুতের মতো বসে/ যেনো দু’হাত বাড়ালেই নীল ডালপালা শিল্পিত হনন’


মে দুই, ১৯৯৯।

দীর্ঘ পাঁচবছর পর, সন্ধে ছ’টায় ওরা দু’জন আমার বাসায় এসেছে। ডিনারের নিমন্ত্রণ করেছি। বসিয়েছি শোয়ারঘরে। পাঁচবছর আগে ওদের লদকালদকির চাদরখানা পেতেছি বিছানায়। নিমন্ত্রণ সেরে একদিনের জন্য বাড়ি ফিরে ছিলাম। কেবল এই চাদরখানা বিছানা থেকে তুলে এনেছি। ড্যাম ধরা চাদরের ভ্যাপসা আঁশটে গন্ধে, রিভলবারের গুলির পোড়াছিদ্র দেখে কী কিছু মনে পড়বে না? আমি মনে মনে চাইছি, লিম ভয়ের অতীতস্মৃতিতে দুর্বল হতে শুরু করুক।

লি আমার অনুরোধে এবং লিমের পাহারা দেওয়ার গোপন বুদ্ধিতে রান্নাঘরে, রাঁধুনির তদারকিতে ব্যস্ত। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ওদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা ওদের স্বস্তি দিচ্ছিলো না। আমার বন্ধুত্ব ফিরে পাওয়ার অসহ্য যন্ত্রণা থেকে সন্ধি করার প্রবল বাসনা ওদের এখানে টেনে এনেছে। আবার বিশ্বাসও করতে পারছে না, আমি ফের বন্ধু হয়ে উঠতে পারি কি না! লি রাঁধুনিকে আদর যত্ন করে প্রত্যেকটি খাবার খাইয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিচ্ছে, কোনো মশলা কিংবা মাংসে বিষ মিশিয়েছি কিনা? একদিকে লি, লিমকে নিশ্চিন্ত করছে, খাবারে বিষ মেশানো আছে কি নেই? অন্যদিকে আমি ভাবছি, লিম মরবেই। মরার আগে ভেবে যাক, বিষ যদি মিশিয়ে থাকে লি নিজে হাতে মিশিয়েছে। মনের গহন অতলে হলেও লিম বিশ্বাস করে লি আমাকেই ভালবাসে। প্রেম থেকে বিশ্বাসঘাতকতা যার রক্তে একবার জন্ম নিয়েছে, সে তার প্রেমিকাকে জীবন নিংড়ে কোনদিনই বিশ্বাস করতে পারে না। আমার অনুরোধে আর লিমের গোপন নির্দেশে খাবার পরিবেশন করার দায়িত্ব নিয়েছে লি।

এতদিন ধরে আঁকা পটভূমিতে আজ শেষ আঁচড় টানবো। তুলির প্রথম টানে একপোঁচ হাল্কা অন্ধকার টেনে দিয়েছি ঘর জুড়ে। অন্য সমস্ত আলো বন্ধ। টেবিলের মাঝ বরাবর ইলেকট্রিকতার বেয়ে নেমে আসা ভি শেডের নীচে পাঁচভোল্টের মরাহলুদ আলোয় টেনেছি দ্বিতীয় আঁচড়। ঘর জুড়ে ছড়িয়েছি মৃত্যুর অন্ধকার। ত্রিকোণ টেবিলে ছড়িয়েছি মৃত্যুর রঙ।

মৃত্যুর রঙ আবিস্কার করেছিলাম, সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কুয়োতলায় পাটপাট হয়ে পড়ে থাকা নাড়ুকাকার মৃতদেহ থেকে। সেই আলোর রঙ ছড়িয়েছি মৃত্যুর খোঁয়াড়ে। আলোর নীচে বসলেই লিমের যেনো মনে পড়ে যায় মৃত্যুর সেই রঙ। দুইবন্ধু একপাড়ায় একসাথে বালক বয়স পেরিয়েছি। হাতধরাধরি করে পা টিপে গিয়েছিলাম নাড়ুকাকার মৃতদেহ দেখতে। বীভৎস ফুলেওঠা হলুদ মড়া। ভিড় ঠেলে উঁকিমেরে দেখতে দেখতে কখন হাত ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে টের পাইনি। ভয়ে দু’জনের অজান্তে দু’জনেই ছুটতে শুরু করেছিলাম। ফ্যাকাশে মৃতমুখের উদভ্রান্ত ভয় নিজেদের মুখে নিয়ে দুজনের দেখা হয়েছিল রক্ষেকালি মন্দিরের পিছনে। দু’জনেই হাঁপাচ্ছি। সেদিন লিমের মুখে ফুটেওঠা ঘাম, আতঙ্ক, গোল্লা গোল্লা চোখ আজ আবার দেখতে পাবো। হলুদ মরাআলোর নীচে ঘষা কাচের ত্রিভূজ টেবিল। ত্রিকোন প্রেমের ইঙ্গিতবাহি কাচ প্রতিফলিত আলোর সম্মোহনি বৃত্তে তিনখানা গাঢ়বাদামি বার্ণিশের চেয়ার, নিঁখুত সাজানো। চেয়ারে হাতল রাখিনি। শূন্য কোল পেতে দাঁড়িয়ে আছে। হার্টফেল কিংবা ব্রেনস্ট্রোক হয়ে মরার সময় লিম যেনো বিনি বাধায় পড়ে যেতে পারে। কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছি, লিম মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। চেয়ারে জন্ম নিয়েছে নতুন শূন্যতা। আমি সেই শূন্যতা দেখছি।

ন’টা বাজতে এখনো তেরোমিনিট পঞ্চান্নসেকেন্ড বাকি। আমি আজ অত্যন্ত টাইমবাজ। তুলির নিখুঁত টানের আঁচড়ে চলাফেরা করছি। ন’টার টার্গেটে নিশ্চিত। ১৯৯৪ সালের দোশরা মের রাত্রিতে ন’টার অপরাধ বোধ ওদের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে চাই।

ডিনারের একমাত্র মেনু মাটনবিরিয়ানি। লির কড়া পাহারায় রান্না হয়েছে। কবিতার মতোই মাটনবিরিয়ানি রান্নায় লিমের হাতযশ আছে। রান্না করে অনেকবার খাইয়েছে। বাদশাহি স্বাদ। কতবার চেয়েছি, কিছুতেই শেখাইনি আমাকে। লি শিখেছে। গুরুমারাবিদ্যে লি আজ ফেরত দেবে। শেষে ফলাহার। আমার নিজে হাতে ফলানো থোকাথোকা আঙুরফল।




বারান্দার টবে লতিয়ে ওঠা কার্ণিসে পেকে টসটস করছে। ডিনার টেবিলে আজ লিমকে প্রথম উৎসর্গ করব। খাবার পরিবেশন করবে লি। আমি ওদের বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ এবং পবিবেশন করার অনুরোধ করে এসেছি। রমনীশূন্য, পুরুষের সংসারে লির হাতে পরিবেশন ডিনারকে সম্মানিত করবে। লি রাজি হয়েছে।

সে নিজে হাতে আঙুরগাছ থেকে প্রথম ফল আহরণ করেছে। আমার ইচ্ছেকে সম্মান জানাতে, প্রথম থোকাটি তুলে রেখেছে লিমের জন্য। বহুদিনের অদেখা, দূরত্ব, বিদ্বেষ মুছে মিলনের উপহার তুলে দেবে আমাদের দু’জনকে। মিলনের এই আঙুরবৃক্ষকে তিনবছর ধরে তিল তিল করে ফলবতী করেছি। আঙুরের চারা বপন করেছি নিজে হাতে। জল সেচ, জৈবখাবার দিয়েছি, পোকা মাকড়, অসুখ বিসুখ দুহাত দিয়ে আগলেছি, শুধু এইদিনটির জন্য। আমার এক এবং একমাত্র প্রেমিকাকে দু’চোখ ভরে দেখবো, সে আমার রান্নাঘর থেকে বিরিয়ানির হাড়ি বয়ে আনছে। কাচের জামবাটিতে আঙুর সাজিয়ে আনছে। ‘ঘরেতে এলনা সেতো মনে তার নিত্য আসা যাওয়া।’ আমি তাকে একটা মাখন-সাদা বেনারসি উপহার দিয়েছি। অনুরোধ করেছি, অতীতের প্রতি সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবশত লি আজ রাতে অন্তত শাড়িখানা যেনো পরে। কথা রেখেছে সে এবং আমার দেওয়া গরদের পা-চাপা পাজামা, হাঁটু পর্যন্ত ঢোলা পাঞ্জাবিতে লিম সেজে এসেছে। টেবিলের আলোয় লিমের নিশ্চয় মনে পড়ে গেছে, গরদের হালকা হলুদ আসলে মৃত্যুর রঙ।

লিম আর আমি সেই পুরোনো দিনের মতো হাতধরাধরি করে ডাইনিংএ এলাম। পাশাপাশি বসলাম বাদামি চেয়ারে।

লিম জিজ্ঞেস করল –ঘরখানা কি তুই সাজিয়েছিস?

উত্তর দিলাম না। পালটা জিজ্ঞেস করলাম – ‘যতদূর যাই ওই হেমলক ছায়া হাত মেলে ধরে /যতদূর যাই, পরকীয়া প্রেম শুধু ঋজু মৃত্যুর দিকে টানে।’ তোর এই লাইনগুলো মনে আছে?

লিম জিজ্ঞাসু চোখ বন্ধ করে স্মৃতি উসকে উত্তর দিলো -কবিতা সংগ্রহের প্রথম কবিতা।

বুঁদ হয়ে পরের লাইন আবৃত্তি করল -‘জিগীষা আমার জমে আয়ুষ্মান গাছ। / তার গূঢ় সচেতন বাকলে হাত রাখি।’

পরক্ষণে ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করল। -তুইতো জানিস আমি ভীতু। ভয় দেখাচ্ছিস কেনো?

লি তিনখানা কাচেরপাত্রে ত্রিভূজের চূড়ার মতো আঙুর সাজিয়ে রেখে গেল টেবিলের তিন বাহু বরাবর। কাচের টেবিলে ফুটে উঠল আঙুরের ছায়া। ছায়ার মধ্যে লিমের মুখচ্ছায়া থেকে একটা আঙুর ছিঁড়ে নিলাম। বললাম – হাঁ কর।

খাইয়ে দিলাম। বললাম –প্রথম তুই।

বললাম –দু’বছর খোঁজার পর তোদের পেয়েছি। দু’বছর ধরে খুঁজেছি আর প্রতিদিন রাগ, হিংসা, প্রতিশোধকে শোধন করেছি। দেওয়ালে ঝোলানো ওই ভয়ের সিরিজ দেখছিস। ওই সময় আঁকা। চল দেখাই।

লিম আড়ষ্ট স্বরে উত্তর দিলো –না থাক, ছবিগুলো সত্যিই ভয়ংকর এঁকেছিস। আজকের দিনে ভয় পেতে চাইছি না।

স্বাভাবিক ভাবের আড়ালে লিম আড়ষ্ট হাসি হাসলো।

বললাম –তোরা নিমন্ত্রণ নিবি। আমাকে মেনে নিবি, বিশ্বাস করিনি। হিংস্র প্রতিহিংসায় তোদের খুন করার জন্য রিভলবারটা এক বছর, প্রতিমুহূর্ত কোমরে বয়ে বেড়িয়েছি। ভেবেছিলাম, যেখানে পাবো শুয়োরের মতো গুলি করে মারবো। দু’বছরের মাথায় ছুড়ে দিয়েছি ফারাক্কায়, গঙ্গা-পদ্মার বিভাজনে। ফিরে আসার পথে কিনে এনেছিলাম ওই আঙুরের চারা। আজকের প্রতীক। তিল তিল করে মানুষ করেছি। তিনবছর অপেক্ষা করেছি। তার প্রথম ফসল। হাঁ কর।

বলে আর একটা আঙুর ওর মুখে ঢুকিয়ে দিলাম।

বিরিয়ানির হাঁড়ি এনে লি টেবিলের মাঝখানে রাখলো।

পাক্কাগৃহিনির মতো বললো –রাঁধুনিকে ছুটি দিয়ে দিলাম।

বললাম -বসে পড়ো।

কোমর থেকে তোয়ালে খুলে মুখ মুছে চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে যেনো ক্লান্তি নামিয়ে বসে পড়লো।

বললাম –দুখিঃত। আজকের রাতে ফ্যান বিট্রে করল।

লি খুশিতে ঝলমল। সেই পুরোনো প্রেমিকার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল -ছাড়োতো। বরং শাপে বর হয়েছে। বিরিয়ানি ঠাণ্ডা হতে সময় নেবে। তারিয়ে তারিয়ে অনেক সময় ধরে খাবো আর গল্প করব, সেই পুরোনো দিনের মতো।

বলে মাখন রঙা বেনারসির আঁচলে মুখ আরও একবার মুছে নিলো।

বললো -সেলফ সার্ভিস। যে যারটা তুলে নাও।

থোকা থেকে আবার একটা আঙুর ছিঁড়ে লিমের মুখে তুলে দিলাম। বললাম – হাঁ কর। আমার হাতে তৈরি আঙুর কেমন লাগছে বল?

লি বলে উঠল –অওয়াসম। আমি আগেই টেষ্ট করেছি। শিল্পী না হলে তুমি ফাসক্লাস চাষি হতে।

ইচ্ছে করে চমকে উঠলাম। বললাম –প্রথম ফল লিমকে খাওয়ানোর কথা ছিল। কেনো খেলে লি? তুমি কোনদিনই কথা রাখোনি।

ছোটবেলার সেই খুব চেনা স্বভাবে লি খিল খিল করে হেসে উঠল। আমার কষ্টের অভিযোগকে বাতাসে উড়িয়ে দিলো। সে আজ কথা বলেই চলেছে – আমার একটা শর্ত আছে। খাওয়া শেষ হবে। আমি টেবিল ছেড়ে উঠে যাবো। তার আগে এটা কেঊ স্পর্শ করবে না।

ঝোলা থেকে দুটো ভদকার বোতল বের করে লি বলেই চলেছে –লিমের পক্ষ থেকে আমার উপহার।

বললাম –যদিও ভদকা আমার প্রিয়। তবু ধৈর্য ধরবো, হে আমার অতীত প্রিয়া। কোনদিনই তোমার চাওয়া অপূর্ণ রাখিনি। আমার কষ্ট, আমার হারিয়ে ফেলা সব কিছুই তোমাকে দিয়েছি।

লি এটাই করতো। আমরা দুইবন্ধু যখন মদ খেতাম। প্রতিবাদ হিসেবে সেখান ছেড়ে চলে যেতো। মদ পান ও পছন্দ করে না। ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখতো না। আজ মিলনোৎসব উপলক্ষে বোতল নিজে হাতে টেবিলে রাখলো। পাঁচবছরে এটুকুই বদলেছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোতলদুটো দেখছিলাম। বহুদিন পর দুইবন্ধু একসঙ্গে মদ খাবো। লি হাত থেকে বোতল কেড়ে নিয়ে বললো –দেখাও চলবে না।

লিম জুলজুল চোখে ভদকার ভিতর দিয়ে আমাকে দেখছে। ওর চোখদুটো জিজ্ঞাসু, কিন্তু আশঙ্কাতাড়িত, খুদে। একটু অস্থির। অন্য মনস্ক। আমিও ভদকার ভিতর দিয়ে ওকে দেখছি। বুঝলাম ভয়ের ওষুধ ধরেছে। ওর গলা শুকিয়ে আসছে। অস্থিরতা ঢাকার জন্য থোকা ছিঁড়ে টুকটাক একটা দুটো আঙুর খেয়ে গলা ভেজাচ্ছে, নিজেকে আড়াল রাখছে ব্যস্ততায়। মনে মনে বলছি – খা শ্লা লিম, আঙুর খা। আরো খা।



হোস্ট হিসেবে প্রথম একহাতা করে বিরিয়ানি আমিই তিনটে প্লেটে তুলে দিলাম। ইচ্ছে করে প্লেটগুলো এলমেলো পাল্টাপাল্টি করে নিলাম। সুক্ষ্ম দৃষ্টি রাখলাম লিমের চোখে। লিমও আমার প্রত্যেকটা কাজ সন্দেহের চোখে দেখছে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে না। এটা আমারই কারসাজি। চাইছি, প্রকৃত গরমের চেয়ে গরম বেশি লাগুক। প্রথম গ্রাস মুখে তোলার আগেই ঘামছে। মুখে নয়, টেনশানের ঘাম কপালেই প্রথম দেখা দেয়।

বললাম –চিয়ার্স। দোশরা মে। একটা স্মরণীয় দিন। আমি নই। সেই লিও, বিখ্যাত লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মৃত্যুদিন। সাতষট্টি বছর বয়সে মারা গেছেন। সেটা পনেরোশ নিরানব্বই। আজ ঊনিশশো নিরানব্বই। তারিখের মিলটা রেখেই তোমাদের নিমন্ত্রণ করেছি।

প্রকাশ্যে লিই গল্প শুনতে বেশি ভালবাসে। তাই লি কে লক্ষ্য করেই শুরু করেছি। খাওয়াটা যেনো নেহাত গেলা না হয়। গল্পে গল্পে রসিয়ে আজকের ডিনার উদযাপন করতে চাই। লিমও ভয়ের গোপন চুম্বক থেকে আমার প্রতিটি বাক্য, শব্দ, উচ্চারণ, আবেগের প্রতিটি ইঙ্গিত হিসেব করে অনুভব করছে। আমিও তাই চেয়েছিলাম।

বললাম -আজ লিএর প্রেমিক লিওর প্রতীকি মৃত্যু হবে। এরপর আমরা বন্ধু। শুধু বন্ধু। এই ব্যঞ্জনা তৈরি করার জন্য দিনটিকে নির্বাচন করেছি।

বলে, হেসে উঠলাম। শয়তান হতে পারি। আত্মহত্যা করতে পারি। প্রেমিকত্ব ছেড়ে কখনও বন্ধু হতে পারবো না। হাসির মধ্যে হিংস্রতা ঢেকেছিলাম অভিনয় দিয়ে। লিম, লি ধরতে পারেনি।

লির চোখ ছলছল করে উঠল। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। প্রেমিকারা তার কোনো প্রেমিকের মৃত্যুই চায় না। শেষবার দেখেনিচ্ছে এক বিদায় কালীন প্রেম, সৌন্দর্য পিপাসু এক হতভাগ্যের প্রতীকি আত্মহত্যা। ছোট গ্রাস তুলে লি মুখের কাছে ধরে আছে। কথা বলার ফাঁকে খুব ঠাণ্ডা গলায় বললাম – মনে আছে লিম, আজকের তারিখে তোরা আমার ঘরের বিছানায় প্রথম মিলিত হয়েছিলি? তোদের প্রথম মিলন আমি সুখের হতে দিইনি। সেই থেকে তাড়া করে চলেছি, ভেবেছি লিকে আমার চাই। যেখানে পাবো লিমকে শুয়োরের মতো খুন করে লি উদ্ধার করব। আড়চোখে লিমের প্রতিক্রিয়া খেয়াল রাখছিলাম। আর বলছিলাম,

-ঠিক আমাদের মতোই লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবনে ত্রিকোন প্রেম এসেছিল।

লিম একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলো। লি ডাগর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে গ্রাস তুলতে ভুলে গেল। লিকে বললাম -খাও।

মাথার উপরে হলুদ হিপ্নোটিক আলো আমার ইচ্ছা মতো মৃত্যুরছায়া ছড়াতে আরম্ভ করেছে।

মরাআলোর প্রভায় ম্লান হয়ে আসা লিমকে লক্ষ্য করে বললাম –খাওয়া বন্ধ করছিস কেনো? খেতে খেতে শোন। ধর, আজ থেকে পাঁচশোবছর আগের ঘটনা। ইতিহাস নাকি ফিরে ফিরে আসে। লিও মানে ভিঞ্চি ছবি আঁকে, লিওর বন্ধু কবিতা রচনা করে। আমাদের জীবনে একই ঘটনা, কী অদ্ভুত সমাপতন! প্রেমিকা হাতছাড়া হলে, পাঁচশো বছর আগে কিংবা পরে, লিওনার্দো ভিঞ্চি আর লিও দত্তর কিছু তফাৎ থাকে না। ভিঞ্চিও আমার মতো কিছুদিন খ্যাপাটে আচরণ করে ধীর স্থির হয়ে গেলেন। তিনিও টবে আমার মতো আঙুরেরচারা পুঁতলেন। একটুএকটু জল, খাবার দিয়ে বিষবৃক্ষ গড়ে তুলতে লাগলেন। তাঁর চোখের আড়ালে কবিবন্ধু, আপনপ্রেমিকা পরকীয়াপ্রেমে মত্ত। আর প্রতিভাবান লিও অবিশ্বাসী প্রেমের জ্বালা থেকে আবিস্কার করে ফেললেন মারাত্মক বিষ। গ্রিসদেশীয় গোখরোসাপ সেই বিষের উৎস। প্রতিদিন মৃদুবিষ যতটা সহ্য করতে পারে সেই পরিমান খাদ্যের সাথে মিশিয়ে আঙুরগাছকে হত্যাকারী করে তুললেন।

এই পর্যন্ত বলে লিমের দিকে তাকালাম। লিম ঘাড় হেঁট করে আছে। তার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মুখের ভিতর একটা গ্রাস স্থির হয়ে ছিল। আমি তাকিয়েছি বুঝতে পেরে, ভয় গোপন করতে গ্রাসটি না চিবিয়ে গিলে ফেলল। তার কপাল থেকে এক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়লো খাবার প্লেটে।

গল্প বলার আবেশে লি’র দেওয়া শর্ত ভুলে গেছি। ভদকার বোতলে ছিপি খোলায় ছিল। একসিপ ঢেলে দিলাম গলায়। পরম তৃপ্তির আস্বাদে কবোষ্ণ তরল নেমে গেল গলা দিয়ে। লি নিজেও আবেশে অবশ। প্রতিবাদ করল না।

লি বললো – লিও, আমার কেমন ভয় করছে। শুনতেও ভীষণ ইচ্ছে করছে। তুমি বলো।

-গাছে যখন আঙুর পাকলো, আমি যেমন প্রথম আঙুর রেখেছি লিমের জন্যে, ভিঞ্চি পরীক্ষা চালিয়েছিল খোঁয়াড়ে পোষা শুয়োরের উপর।

এই পর্যন্ত বলতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। চোঁ চোঁ টেনে একঢোকে অর্ধেক ভদকা মেরে দিলাম। কিন্তু হাঁপাচ্ছি। লিম অনাবশ্যক ঝুঁকে পড়েছে খাবার প্লেটে। মনে হল, মেরুদন্ড ভেঙে পড়েছে। সোজা রাখতে পারছে না। রাত বাড়ছে। হলুদ ঘোলাটে আলো ক্রমাগত বুঁজে আসছে। আমার গলাও ঘোলাটে আলোর মতো জড়িয়ে আসছে –শুয়োর এক থোকা আঙুর খাওয়ার কিছুক্ষণ পর তীক্ষ্ণ চিৎকার করে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর...


লির হাতে গ্রাস থেমে গেছে মুখের সামনে। জলবসন্ত গুটির মতো ডুমোডুমো ঘামে ভরে গেছে মুখ। ডাগর চোখদুটো বিস্ফারিত। লিমের মুখ দিয়ে অস্পষ্ট গোঙানি বেরিয়ে এল। ভয়ার্ত শরীর মুচড়ে অসহ্য কষ্ট, যন্ত্রণার উপচে ওঠা অভিব্যক্তি । তারপর কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। দেওয়াল ঘড়িতে ঠিক ন’টা বাজে। ঘড়ির ঘন্টা আর লিমের গোঙানি মিশে গেছে।

লি আর্তনাদ করে উঠল -কী হল?

বলার আবেগে বলে চলেছি –কিন্তু বন্ধুত্বের নামে শপথ নিয়ে বলছি, ভিঞ্চির সাথে দত্তর এখানেই তফাৎ। আমি বিষ মেশাইনি। বিষের বিজ্ঞানে আমি আকাট মূর্খ।

চেয়ার থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে দেখলাম আমিও টলছি। ভদকার নেশা মিটিমিটি মটকায় ওম তুলে দোল খায়। কী রকম ভদকা! বুক পেট জ্বলছে? কোনরকমে নিজেকে সোজা রেখে লিমকে হিঁচড়ে টেনে বিছানার দিকে নিয়ে যেতে চাইলাম। লি ছুটে এল সাহায্য করার জন্য। বেশিদূর না, দু’জনে মিলে শোয়ার ঘরে পৌঁছানোর অনেক আগেই লিমের পাশে চিত হয়ে পড়ে গেলাম।

লি আর্তনাদ করে উঠল – লিও..ওঃ...হো.. লি...ম...

লিম আমার কানের কাছে জড়িয়ে আসা গলায় বললে –মদে বিষ।

আমার গলা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বরের বদলে মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে। নিজেকেই বললাম –মূর্খ লিও।

চোখ বন্ধ করে আবছায়া স্মৃতির অতলে নিঃস্বরে আউড়ে চলি কবিতার অবশিষ্ট পংক্তিগুলি।

‘নিঁখুঁত অস্তিস্ব ছিঁড়ে আত্মহত্যা পান করি / দীপ্রশাখায় যার ঝুলে আছে হেমকান্তি জয় / হেমলক পরাজয়। / জয়-পরাজয় ভেঙে নস্যাৎ করি, / বল্কলে উপহার দিই ত্রিভূজ প্রেমসমাহার।’


-----------------------------
নোট।
( অনৈতিহাসিক, নিছক প্রচলিত দা ভিঞ্চির গল্পটি এবং ব্যবহৃত কবিতাটি উল্টেপাল্টে লেখা। মূলকবিতাটি ‘পাষাণ পুরুত’। ‘হে বদ্ধকাপালিক’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা। কবি সমীরণ ঘোষ)



লেখক পরিচিতি
তাপস গুপ্ত
বরহমপুর, পশ্চিম বঙ্গ।

গল্পকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন